শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

আকিমুন রহমান'এর গল্প : উরাধুরা কাকপক্ষীরা

দ্যাখো, কেবল সন্ধ্যা হয়েছে কী হয় নাই- ছাদের উল্টা দিগের কার্নিশে কী জানি একটা-কিছুর আছড়ে পড়ার আওয়াজটা পাওয়া গেলো!ঝুম্মৎ! রাইত ঘোর আন্ধারকালে, সেই মাঝরাইতে-এমন আওয়াজ হইলে বুঝতাম, অইটা কিসের আওয়াজ! আর, কে-ই করে সেই আওয়াজটা!

কে আবার সেই আওয়াজ করে? করে, এই মহল্লার বিলাইটায়।

উয়ে আমারে খাওনের মতলব করছে তো! সেই কারণে, প্রায় প্রায় মধ্যরাইতেই, সেয় আমার বাসার আশপাশ ঘিরা ঘোরা-ঘুরন্তি দিয়া চলতাছে। চলতাছেই!

আজকাল,প্রায় প্রায়ই, গহীন রাতে আমার বসতির কাছেদূরে আওয়াজ ওঠে- ঝপ্পত।

কিসের আওয়াজ সেইটা? 

সেইটা হইলো চোট্টার ঘরের চোট্টা, মিচকির হাড্ডি যে বিলাইখান আছে,তার লাফ দিয়া পড়োনের আওয়াজ। 

জাগনা থাকা অবস্থায় যেমুন আমি সেই আওয়াজটারেপরিষ্কার চিনতে পারি, তেমুন কিনাঘুমের মধ্যে থাকলেও, ঠিকই ধরতে পারি সেই আওয়াজটারে। 

ঘুমের ভিতরে একদিকে আমি সেই আওয়াজটা একটু খালি পাই; আর অমনেই, ফড়াৎ কইরা উইটঠা বসোন দেই ! লগে লগে সিধা হইয়া বইসা পড়ি তখন আমি! কই কই! কোনোদিগে দেহা যায় অই হারামীরে! 

অই যে দেখো! ছাদের অই কোনে! অই যে আন্ধারে!

আমি তখনকট কট চক্ষে কতোক্ষণ তাকানী দিয়া থাকি অই বিলাইয়ের দিগে। ছাদের উপরে,উয়েও, থোম হয়ে বসা দিয়া থাকে কতোক্ষণ! চাইয়া থাকে আমার দিগে! থাকে থাকে; শেষে ইলিবিলি হাঁটা দেয়। তখন আমিও ঘুম দিতে যাই আবার। 

তবে এই বিত্তান্তটা ঘটে নিশি মধ্যকালে। সন্ধ্যা রাইতে তো এমন আওয়াজ ওঠাউঠির বিত্তান্ত হয় নাই কোনো সোম,এইখানে! বিলাই-র পুতে তো কোনো সোম সন্ধ্যারাইতে আসে না! 

আজকার আওয়াজটা ওঠছে এই তো সন্ধ্যাকালে! এই যে তিরিতিরি আন্ধারেরসন্ধ্যাকালে। 

সন্ধ্যাকালে এটা কী কারবার! 

আমার চোখ তখন কেবল -এই একটুখানি- লেগে আসছিলো খালি! একটু পরপর হালকা পলকা একটুঢুলানি আসতাছিলো -তখন চোখে । 

সেইটা গহীন ঘুমের কোনো বিষয় না! তখন, চোখখালি এই একটু লেগে যাচ্ছিলো,আবার আঁতকাই খুলে আসছিলোা!

অমন কালে- খোদারে খোদা- আমার বসতির উল্টা দিগের কার্নিশে কী আওয়াজই না ওঠে! ধাপুস ঝুম্মাৎ! 

আওয়াজের চোটে আমার বিশাল পরিমান ঝামেলা হয়। 

আওয়াজের ঠেলায় আমার কাঁচা ঘুমটাই খালিচপ্পাত কইরা উড়াল দিয়া চইল্লা যায় না, আমার পরাণটাসুদ্ধা হরদিশা হইয়া ধড়ফড়ানো ধরে! ধপড় ধপ ধপড় ধপ! আর শরীরে কী কাঁপুনি! 

কিসের এমন আওয়াজ হয় - এই সদ্য সন্ধ্যা কালে? এইটা কেমন আওয়াজ ওঠে- এই টেমরা-টোমরা,ভাঙ্গাছাদটার– অই ঝুরঝুরা কার্নিশে! কে করে আওয়াজ! 

ছাদটা এক্টুখানি। চুনসুরকি খসা, চল্টা-ওঠা, এই এট্টুখানি। সেই ছাদের অই যে শেষ কিনারে এই এত্তটুক এক খুপরি।

সেই খুপরিতে দরোজা আছে, তবে একেবারে লড়বড়া -সেই দরোজার কবাট। 

কোনোরকমে কপাট দুইটারে বন্ধ করে, তাতে ছোট একখান তালা ঝুলায়ে দিয়ে এই খুপরির মালিক রোজ সকালে কোনদিগে জানি চইল্লা যায়। আজকাও গেছে!

সন্ধ্যাবেলার আওয়াজ শুইন্না আমার একবার মনে হয়, এই যে আওয়াজখান উঠলো ; সেইটা কি সেই বেটায় করতাছে নাকি?

না না! খুপরির সেয় তো দেখি কোনোদিকে নাই! অই ঘুপরির মানুষ দূর, তার শরীরের ছায়াও তো নাই ছাদের ধারেপাশে!সে তো এমন সন্ধ্যাকালে, জিন্দিগিতেও কোনোদিনেও ফিরা আহে না। সে আসে সুমসুমা মাঝরাইতে! আবার সে চুপেচাপেও তো আসে না! খক্কর খক্কর কাশি দিতে দিতে আসে সেয়! বান নাই তুফান নাই শীত নাই গরম নাই- কাশি তার চলতেই আছে। 

এই যে কার্নিশে আমি আছি- আমার মাঝঘুমের কালে তার খক্কর খক্কর খ্যাকড়ানীযে আমারে অশান্তি করতে পারে- সেইটা তার কোনোরকম হিসাবে নাই! সে মনে করে য্যান এই পুরা ছাদ আর কার্নিশগুলা তার একলার! য্যান পুরা রাজত্বটাই তার। কতো বড়ো জমিন্দারের নাতিখান সেয়! ফুটানীর চোটে বাঁচে না য্যান!

তবে বিয়ান বেইলে, তারে আরেকরকম লাগে!

বিয়ানের কালে সে রঙ চায়ে চুবান দিয়া দিয়া বাখরখানি খায়! সেই সময়ে সেয় খালি একলা নিজেই খায় না!আমারেও দেয়! প্রত্যেকটা দিন দেয়! গুঁড়াগাড়াঅনেকখানি বাকরখানি। দেয়ই দেয়। 

করে কী- আমার কার্নিশটার সামনের ছাদে সেয় কিনা এক খাবলা ভাঙাভোঙা বাকরখানি, সুৎ করে ফিক্কা মারে।ফিক্কা দিয়া সেয় কতোক্ষণ ঝুম মেরে চাওন দিয়া থাকে আমার দিকে। একটা রাও করে না, ডাকও দেয় না, খালি চাইয়া থাকে। চাইয়াই থাকে।

তখন আমি আর কী করি! আমিও উল্টা চাওন দিয়া থাকি তার দিকে।

‘কি বলবা বল- যেমনেই বল আমি বুঝবই বুঝব।‘ এ কথা আমি তারে বলি। আমার চোখ দিয়া বলি! আমার তেরা করে রাখা ঘাড় দিয়া বলি। 

সে যে আমার কথাবুঝতাছে- সেইটা আমি সেই মানুষের চক্ষের তারা দেখেই বুঝতে পারি। 

তবে সে কিন্তু আমারে কোনো একটা কথা বলে না। একদিনও কোনো একটা কথা বলে না! একবার বলেও না যে, “নে! বাকরখানির গুঁড়াটি খাইয়া ল!”

কেন রে মানুষ- এত তোমার আগলাপাগলা টোমর!

থাকো গা তুমি তোমার টোমর নিয়া! অই মিজাজের খবর দিয়া আমার কী কাম! 

‘এখন, তুমি খাওন ফিক্কা দিলা, আর আমি সেইটা মোখে তুলতে দৌড় দিলাম- আমারে তেমন বিশ্বাসঅলা মনেও কইরো না রে মানুষ!’ মনে মনে এই কথা বলি আমি! আর ঠ্যাঁটা দিয়ে বসেই থাকি কার্নিশে। 

তবে সেই লোকের দিকে চোখ রাখতে কোনো ভুল করি না। এগো কী বিশ্বাস আছে! এগো বিশ্বাস নাই। 

একজনের চোখের দিকে চাইয়া থাইক্কাই তারেকোপটা মারতে পারে এরা! এমুনইপাষাণ !এগো চউখতখন এক ঝলকও কাঁপব না। এগো বিশ্বাস করছো তো জানে মরছো!

যেমন এগো বিশ্বাস আমার ভাইটারে মরতে হইছে! 

আহারে ! কী সোন্দর না আছিলো আমার ভাইয়ে! ঘন নিশিরাইতের মতন মায়াঅলা আছিলো সেয়! আমার জুড়ির ভাই। আমার মায়ের চক্ষের সামনে, আমার ডর-থমথমা নজরের একদম সামনে মরলো সে দিনে-দুপুরে। মরতে হল তারে। 

আহহারে! ক্যান সে গেছিলো অইখানে! মায়ে কেনো তারে কড়া ধাতানি দিয়া আটকায় নাই! কেনো ঢিলামি দিছিলো বাবায়! আমারে তো দেখি কতো বলতো তারা ,“নতুন জায়গা- আমরা এইখানে বিদেশী! চিনপরিচয়ের একজনও নাই কিন্তুক এইখানে! জ্ঞাতি গোষ্ঠী দূর, কুটুমকাটুম দূর, মুখবোলা চেলাজানাও নাই এক ঘর -এইখানে আমাগো! সেইকারণে হুঁশ কইরা আমাগো চলাচলতি করা লাগবে এইখানে। বহুত হুঁশ কইরা!” 

এসব কতো কী কতো কতো বার- আমারে না বলতো! ওরে কী বলে নাই! দুজনের সামনেই তো বলতো তারা অইসব কথা। বলতো না? নানাভাবে কতো যে নড়াচড়া দেইআমার মনেরে। বলি যে,’ মনরে- তর খেয়ালে আসে কিনা বাবা-মায় অরেও অই কথা বলছিলো কিনা! ও অইকথা শুনছিলো কিনা!’ মন কিচ্ছু বলতে পারে না। আমার চক্ষে খালি পানি আসে।

আমার জন্ম এখানে। এই যে চুনসুরকি খসতে থাকা ছাতটার কার্নিশে- এই যে লিকলিকা অশ্বথ গাছটা- এর গোড়ায় আমার বাসা। এ বাসা আমার, তবে আমি বানাই নাই এরে। 

আমাগো জীবনে চলাচলতি আর নিয়মের কথা আসে যদি, তবে বলতে হয় হয় যে; এই কোনোকালের পুরান, বেঁকা- তেরা বাসায় আমার থাকার কথা না। আমার বাসা ফি বছর নতুন করে আমারই বানানোর কথা। মা-বাবায় বলছিলো যে, আমাগো কাকসমাজে বছর বছর, অমন নিজের নতুন বাসা্ , নিজেরেই বানানের নিয়ম। 

কিন্তু এই এতখানি জীবন পর্যন্ত- আমার নিজের বাসা বানানোর জন্য- কোনদিনও যদি এক তিল পরিমাণ সাড়া-তাপ উঠত আমারচিত্তের ভিতরে! মায়ে-বাপে কোনোরকমে কী করছিলো সেই কবে, সেইটাইতেই আমার জন্ম। আমার ভাইটার জন্মও সেইটাতে। সে এখন নাই। সেই ছোটকাল থেকেই সে নাই। মায়ে নাই, বাপে নাই। খালি আমি আছি। একলা। কে যায় বাসা বানাইতে! নতুন বাসা দিয়া আমার কী। কিচ্ছু দিয়া আমার কিচ্ছু না। 

তবে একটা বাসনা কিন্তু আছেই পরাণের গহীনে! জ্ঞান হওয়া থেকেই আছে। 

বাসনা আছে – সেই নিজেগো দেশে ফিরা যামু একদিন! যেই দেশ থেকে বাপে-মায়ে জানপরাণ ঠৌঁটে নিয়া, তরাসভরা শরীর নিয়া, হরদিশা হইয়া উড়াল দিতে দিতে এখানে আইসা ঠাঁই নিছিলো-সেইখানে- সেই দেশে- যাওয়ার বাসনাটা আছে। অনেক ঘন সেই বাসনাখানা! আছে আমার ভিতরে!

আমি যামু গা একদিন সেইখানে! আমি যামু একদিন। 

কেমনে যে যাওয়া লাগে সেইখানে- আমি তা জানি। সেই কথা আমার বাপে-মায়ে তন্ন তন্ন করে বলে গেছে আমারে। এই যে মহল্লা, যেইখানে আমাগো বাসা- তার একটু দূরে গাঙ। সেই গাঙ ধরে উজানের দিকে উড়াল দিতে থাকো-উড়াল দিয়ে যাও যাও যাও- যেতে যেতে যেতে একসময় তোমার ডান ডানার দিকে পড়বে ক্ষেতিখোলা, গাও আর তার গাছগরান!

একদম গাঙঘেঁষা সেইগাও! সেই গাওয়ের যে ফসলি জমিগুলা-তারাও গাঙ-ঘেঁষা। সেইখানে বাতাস নিরালা দুপুরের মতন মিঠা মিঠা। আর তার সুবাস কী! বাতাসেআম-পাকা গন্ধ সেইখানে, সর্বক্ষণ। সেই গন্ধই তোমারে বলে দেবে- এই তোমার বাপ-মায়ের আদি ঠিকানা! এই তোমার দেশ।

এই যে এইখানের গাঙটা আছে,তারেএকপাশে রেখে একটা উড়াল দিলেই হবে আমার। উড়তে উড়তে আমি ঠিক পৌঁছে যাবো নিজের আদি দেশে! একদিন আমি সেই উড়ালটা দিয়া ফেলবো! দেবোই। 

সারাদিন আমি লড়িচড়ি কম। লড়াচড়ার কোনো ইচ্ছা হয় না। সকালে সেই খুকখুকা মানুষটার দেয়া বাকরখানির গুঁড়াগাঁড়া খাই- খুটুর খুটুর। ঠোঁকর দেই দেই, আর দেখি- সেই লোক না আবার ফিক্কা মারে কিছু! না, আমারে ঢিল্লা দিয়া-জানে শেষ করার ব্যবস্থা নিয়া আছে সেই মানুষ! খুব খেয়ালঅলা নজর দিয়া রাখি। 

বিশ্বাস আছে অগো? এক ফোঁটা যে বিষ্টি- সেই এক ফোটা বিষ্টির পরিমাণেপর্যন্ত বিশ্বাসকরোন যায় না এই জাতেরে! আমার ভাইটা শেষ হইছে না তেমন এক ঢিল্লায়? এই দ্বন্দ্ব মনে নিয়া আমি রোজই বাকরখানির গুঁড়া ঠোকরাই। 

কোনো কোনোদিন গুঁড়া থাকে এই অত্তোটা! খাওয়া আর শেষ হয় না। ঠোকর দিতে দিতে হয়রান হয়ে যাই। কোনোদিন সেই লোকে দেয় এই এক চিমটি সমান গুঁড়া। অইটুকু শেষ হইতেকতোক্ষন! অইটুকুতে একজনের সকালবেলার ভোগ মিটে! মিটে না!

পেটের মধ্যে ভোক নিয়া চুনসুরকিই ঠোকরাতে ধরি আমি। ‘দ্যাখো তো- কেমুন নাদান! দেয়ার আন্দাজটা রাখবা তো!’ বলি, আর ছাদ ঠোকরাই। 

পলকের মধ্যে দেখি যে, সেই লোক আবার কিনা এক মুঠ গুঁড়াগাড়া বাকরখানি আমার জন্য নিয়া আসা ধরছে। মুঠাভরা বাকরখানির গুঁড়ানিয়া সেয় আগায়ে আসতাছে ছাদের দিকে!আমি তখন সুৎ করে সরে যাই অন্যদিকে। বিশ্বাস নাই- এগো বিশ্বাস নাই! 

কিন্তু এই মানুষে কী আমার কথা বোঝে নাকি! আমার মনের কথা সে শুনে ফেলতে পারে নাকি! এই যে বাকরখানির গুঁড়া কম হইছে- আমার যে আরেকটু খাওনের বাসনাটা রইছে- সে সেইটা বোঝে কেমনে! এইটা আমি কিছুতেই মিলাইতে পারি না!

আবার, অই যে আমি তারে আসতে দেখলেই ছুত করে উড়াল দেই, সেইটা দেইক্ষা সে আমারে বলে কী, “আমারে ডরাইস না- ডরাইস না।“

ডরামু না, না? তোমরা পারো না কি, অই মানুষ? আমার ভাইটা, কচিভাইটা- মাঘ মাসের আমের বউলের মতন অবুঝ নাবুঝটারে মারলো কে! মানুষই তো মারলো তারে। নাকি! 

সেই মানুষেই কিনা এদিকে আমারে বাকরখানি দিতে আসে! খাওন কম পড়লো কিনা এইটাও নজর রাখে! বিত্তান্তটা আমার কাছে সুবিধার লাগে না! 

আমি সেই কারণে, সকল সময়, অই মানুষটার চলাচলতির দিকে- একটা খাড়া আর কড়কড়া নজর দিয়ারাখি। বাকরখানি খাওয়ার সময়েও সেই নজরটা দিয়া রাখতে ভুল হয় না!

তেরছা একটা নজর দিয়ে রেখে, তবেই আমি ঠোকর দেই গুপগাপ। আমি ঠোকর দেই, সে ঘরের মধ্যে নড়েচড়ে। এইটা রাখে, অইটা টানে। এত্তসব লড়াচড়ি কোন দরকার পড়ে মানুষের! এত্তো লড়ে ক্যান!এত্তা আওয়াজ করতে হয় ক্যান!আমি বুঝ করতে পারি না!

এমনে এমনে লড়াচড়ি করতে করতে সে, সেই সকালে,একসময় দরজার বাইরে আসে! তারবাদেদরোজার কপাট টানা শুরু করে। ততোক্ষণে আমারও বাকরখানি খাওয়া শেষ! দুপ করে লাফ দিয়ে সরে যাই আমি তখন, ফারাকে। 

দেখতে দেখতে আমার এখন জানা হয়ে গেছে যে, এই কপাট টানার কারণ কী। এই মানুষ এখন কপাট দুইটা টেনে, শিকল এটে তালা ঝুলাবে। তারপর নিজের তেরা- বেঁকা শরীরখানারে হেঁচড়ে নিয়ে হাঁটা ধরবে। আমার বসতির উল্টাদিকের কার্নিশের সাথে লাগানো আছে -লকবকা এক মই। সেইটা দিয়েই এই ছাদের খুপরিতেউঠানামা হয়তার। 

আমি দেখি যে,রোজইআমার গুঁড়া খাওয়া শেষ হয়; তারও যেনো আমার কথা মনে রাখার কাজখান শেষ হয়!ওদিকে আমি কিন্তু তারে একটা দণ্ডের জন্য ভুলি না! 

যতোক্ষণ সে খুপরিতে থাকে, ততোক্ষণ তো চেয়ে চেয়ে দেখার চেষ্টাটা করি তারে। আন্দাজে বোঝার চেষ্টা করি যে, ঘরের ভিতরে সেয় করতাছে কী!

আমি চুপচাপ রোজ দেখি, তার সকালের খাওয়া! ঘুমলাগা ঘুমভাঙা চক্ষে, রোজ রোজ, গহীন রাতে তার ফিরা আসাটারেও তো দেখি। 

এইখানে, এই মহল্লায়, আমার কোন মেলমজলিশ নাই। কোনোখানে কারো বাড়িতে, আনা- জানা নাই। কোনোজনের সঙ্গে দাওয়াত- পানি, ময়মেজবানির সম্পর্কটা নাই। আমার বাপ-মায়েরও আছিলো না। তাদের কীদোস্তী পাতানের হাল ছিলো-এইখানে-এই মহল্লায় এসে ঠাঁই নেয়ার পরে? মায়ে বলে গেছে যে, ছিলো না।ছিলো না!

আত্মীয়- কুটুম, সই দোস্ত সব ছিলো একদিন। ছিলো সেই দেশে। যেখানে ঝরঝরা রইদেরও গন্ধ আছে। পোড়াআলুর গন্ধের মতন গন্ধঅলা রইদ -সেই দেশে !সেই গন্ধে জানপরান খুশি হইয়া যায়। গলা দিয়ে সেই খুশি খলবল বাইর হয় সারাদিন! কা কা কা- কা কা কা– আওয়াজ হইয়া বাইর হয়! 

অন্তরের ভিতরে অমন খুশি নিয়া ছিলো নাকি মায়ে-বাপে! আছিলো সেই নিজেগো দেশে! বহুতদিন ছিলো। আমার জন্ম নেয়ার আগেকার দিন সেইগুলা। 

জনমকার মতোন নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার আগে, মায়, আমারে কতো যে বলছে সেই দেশের কথা। 

আমি দেখি নাই তারে, সেই গাও-গেরামরে! কোনোদিন দেখি নাই! কিন্তু সে আমার বহুত চিনা। বহুত বহুত চিনা!

ছোটো গাওখানার শেষ মাথার বাড়িটার পরেই ক্ষেত! এই একটুকরা ক্ষেত। ক্ষেতে নামার মুখেই রান্ধনঘর। সেই ঘরের বেড়া পাটখড়ির, মাথার ছাউনি পাটখড়ির। সেই রান্ধন-ঘরের মাটির চুলায় আগুন জ্বলে তিন বেলা! সকাল দুপুর আর সন্ধ্যাকালে! পাটখড়ির আগুন- লালে লাল। 

রান্ধন-ঘরের পরে আছে একখান সজনা গাছ! বাড়ির শেষ সীমানার সজনা গাছখান! সেই গাছেযখন মন চায়,তখনই আইসা বসা দিয়া থাকে আমার বাপে-মায়ে। সেইখানেই তাদের তাদের বাসা কিনা। 

সারাদিন তাগো উড়া-ঘোরার বিরাম নাই। একটুখানি ক্ষেতটার পরেই গাঙ। গাঙে মাছ ধরা চলতে থাকেই সারাদিন। সেইখানে উড়াচক্কর দিলেই হয়,খাওয়া-খাদ্যের ঝামেলা মিটে! আবার ঘরের খোরাকিটাও ঘরে নিয়া আসা যায়! অনেক খাওন! ফেলা-ছড়া করে করে মাছ খায় তখন বাপে-মায়ে। 

একদিন তারা দেখে যে, সজনা গাছের পুরান বাসাটা য্যান কেমুন একটু ভাঙাচোরা দেখায়! এই না গেলো মাঘ মাসে বানাইলো তারা ঘরখান! বচ্ছর না পুরতেই তারে এমুন ক্যান রঙজ্বলা রঙজ্বলা লাগে দেখতে!

বাপে-মায়ে ঠিক করে যে, অই যেকার্তিক মাস আসতাছে,সেই মাসের গোড়াতেই একদম, নতুন বাসা বানানোর বয়বন্দোবস্ত করবে তারা! 

এই তো এখন যায় ভাদ্দর মাস। নদী ভরভরন্ত খলবলা। বিষ্টি নিয়া নিয়া কালো মেঘেরা আসতাছে তো আসতাছেই এইবার। আর ঝুম বিষ্টি দিতাছে। গাছগরান সব ভিজা ছবছব। এই ভিজা, চুপচুপা বরষার দিনে কী আর বাসা বান্ধে কাকপক্ষীরা। তাগো সমাজে বাসা বান্ধার বিধি হইলো অগ্রহায়ণ মাসে। 

সেইটা আসতেও আরও দুই মাস! এতো দিন বাকি-আগুন মাস আইতে!

দিন গুনতে গিয়া মায়ে নাকি সেইসময় অস্থির হইয়া শেষ! তখন আমার বাপে তারে বুঝ দেয় -অতি মায়াঅলা গলায় বুঝ দেয়! বলে নাকি যে, চউখ ফিরাতে না ফিরাতেই দুই মাস পার হয়ে যাবে। দুই মাস যাইতে তেমন কোনো দেরি হয়না!আগুন মাস আসতে আর বেশি দেরি নাই!মাত্র আশ্বিন- কার্তিক- এই দুই মাস পরেই আগুন মাস। 

মায়ের পরাণ সেই কথা শুনে বুঝ মানে। কিন্তু বাদলার হুড়ুম দাড়ুম আর তার সহ্য হতে চায় না। আদলা-বাদলা ঝুড়ুম ঝড়ুম ঝরে তো ঝরেই। দিন কালাআন্ধার হয়ে আছে তো আছেই।রাইত গুমগুইম্মা পিচলা-আন্ধার হয়ে থাকতাছে তো থাকতাছেই! এইটা কী সর্বনাইশ্যা দশা দুনিয়ার! 

আমার মায়ে কঁকায়! ভিজে ভিজে পিছলা হয়ে যাওয়া সজনাগাছের ডালে বইসা কঁকায়। যতোই ঝাড়া দেয়া যাক লেজ আর ডানা-পানি তার সরেই না সরেই না! ভিজে ভিজে ভোমা, নিঃসাড় হয়ে যেতে থাকে তাদের দুইজনের পাও-পাখনা। এই ঝাড়া দিয়ে পানি সরায়, এই ভিজে চুপচুপা হয়ে যায়। 

সেইদিন হয় কী- মায়ে খালি নিজের ডানাপাখার জ্বালায় থাকে, কিন্তু পানির ঝাপটে ঝাপসা হয়ে যাওয়া বাপের চোখ -ক্যান জানি- খালি গাঙের দিকে যাইতে থাকে! এই যে ক্ষেতটুক- তার পরেই তো গাঙ! আজকার সন্ধ্যাকালে তারেজানিকেমুন কেমুন দেখায়! য্যান থমথমা কালা আর গমগমাএক মেঘের মতন দেখায়! আজকা য্যান থোম ধরা, তুফান আনা আসমানের মতন দেখায় গাঙরে! কী বিত্তান্ত! 

গাঙের পানিতে য্যান কী সব পইড়া যাওনের আওয়াজ উঠতাছে- ধুড়ুম ঝপ। 

শব্দ উঠতে থাকে। উঠতে থাকে! আর গাঙ আগাতে থাকে। 

বাপের চক্ষের পাতাটা পড়ে কী পড়ে নাই-সেয় দেখে- ছোটো ক্ষেতটুক ঝাপুর ঝুপ ঝাপুর ঝুপ -ভাইঙ্গা পড়লো গাঙে ! ওরে সর্বনাশ, গাঙে তো নিতাছে গা দ্যাশ! বাপে আমার চিক্কর দিয়া ওঠে- কা কা কা হায় হায় হায়। 

বাপের চিক্কুর থামার আগেই, এই মস্ত এক চাপড়া ভুঁই, দুড়মুড় করে য্যান ঝাঁপ দিয়া দেয় গাঙে! সঙ্গে নিয়া যায় রান্ধন ঘরটারে, আর কাঁৎ করে রেখে যায় সজনা গাছরে। গিরস্থ বাড়ির বৌঝিরা চিল্লান দিয়া খোদারে ডাকতে থাকে। আসমান থেকে ঝুম বিষ্টি ঝরতেই থাকে। পায়ের তল থেকে চাপড়ার পর চাপড়া মাটি -গাঙে নেমে যেতে থাকে। 

বাপে আমার মায়েরে টান দিয়া উড়াল দেয়ার ফুরসতখান খালি পায়, সজনা গাছ নিয়া বসতবাড়িখান গাঙে নাই হয়ে যাই। 

‘হায়রে আমার বাসাখান! আহারে আমার বাসাখান রে!’ এই কথা বলতে বলতে তখন বোলে আমার মায়ের কী চিক্কুর! সে তার বাসায় জমা রাখছিলো নাকি কতো কতো ধন! 

পাকা কাউনের কতোগুলা শিষই না সে জমাইছিলো! গমের শিষ কতোগুলা, দুই দুইটা পোক্ত ঝিনুক, পথে পাওয়া ঝকঝকা একখান কাগজ- এই সেই কতোকিছুই না বাসায় তুলে রাখছিলো মায়ে! রাখছিলো তার পোলপানদের দেওয়ার জন্য!

পোলপান কেউ হয় নাই তখন, কিন্তু পোলাপান আসব না কী! এই তো! আর কয় দিন পরের ফাল্গুন-চৈত্র মাসেই – পোলাপানে- ঘর তার ভরা থাকবো তো! তার অন্তর জানে সেই কথা। সেইসব জিনিসপাতি মায়ে সেই না-আসা পোলাপানদের জন্য যতন দিয়া জমাইছিলো!

কিন্তু তার অন্তরের সাধ অন্তরেই থাকলো। আশা আর পূরণ হইলো না! চক্ষের পলকে সে হইলো ভিটাছাড়া, ঠাঁই ছাড়া। তখন, এই দুনিয়ায় একটা পাও-ও রাখে- এমন নিজের জায়গাটুকও আর থাকলো না তার!

ভিজা ডানা মেলা থাকতে চায় না। খালি বন্ধ হয়ে আসতে থাকে। অন্তরের জ্বলুনি তারে বলতে থাকে, গাঙের জলে ঝুপ কইরা ডুইব্বা যা ডুইব্বা যা! অদিগে, আমার বাপে শুধু মায়েরে টানতে থাকে- চলো চলো চলো। 

পায়ের নিচে কোথাও এক খণ্ড মাটি দেখা যায় না। খালি তেজি কালো পানি গরজানি দেয়! খালি পানি ছোবল দিয়া ওঠে য্যান!

হায়রে কই যায়- এই দুইজন! কোনখানে ঠাঁই পায়! চলতে চলতে চলতে অবশ শরীর কই জানি ধুপ করে পড়ে যায়। সেই জায়গা এই ঝুরঝুরা ছাদ! এই যে সেই কার্নিশ। এইখানে আমার জন্ম, আমার ভাই- জুড়ির ভাইও -হইছিল এইখানেই! আমার সঙ্গেই একই দিনেই, আসছিলো সে দুনিয়ায়! কিন্তু এখন সে নাই।

এই মহল্লায় এমন কেউ নাই, যে আমারে জিজ্ঞাসা করে -আমি করতাছি কী! আছিটা কেমন! কেউ আমারে ভালামন্দ জিজ্ঞাসা করার নাই। আমি কী তাইলে একলা এক কাকপক্ষী এইখানে? আর কোনো কাকাপক্ষী কি নাই এই দ্যাশে? 

তা ক্যান হইবো! প্রত্যেক ভোর সকালে আমি কী দেখি না- এইখানটা, এই মহল্লাটা, ভইরা যায় দুনিয়ার কাকপক্ষীতে! হাজারে বিজারে কাকপক্ষী- থোম ধইরা বসা দিয়া থাকে এইখানের তার- খাম্বার তারে তারে। 

তারা নিজেরা নিজেরা কথাবার্তা কয়, কই কই যায়, ওড়াবসা করে। কিন্তু আমারে ফিরাও দেখে না। আমারে অগো সঙ্গে নেওয়া তোবহুত দূর- একটা কথাপর্যন্ত কয় না। তারা একেক জনে একঝলক দেখে কী দেখে না আমারে! সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় ঘুরায়ে নেয়। এমন কইরা ঘাড়টা ঘুরায় তারা !য্যান গুমুত দেইক্ষা ফালাইছে! দূর দূর! 

ভাবে বোঝায় যে, আমি থাকতে পারি অগো এলাকায়, কিন্তু অগো কেউ না আমি! আমি বিদেশী একজন! আমাগো দেশ যে সেই কোনদেশে-অরা সগলতে- আমারে এই কথা প্রতিটা দিন স্মরণ করাইয়া দেয়- এমন ভাব- ভঙ্গী দিয়া দিয়া!

আহারে! তাগো দিকে তাকায়ে থাকতে থাকতে আমার পরানটা এই একটুখানি ছাঁৎ ছাতায়! তারা তো আমারে নিলেও পারে তাগো লগে! কিন্তু নেয় না। নেয়ই না।

না নিলে না নিবো! কী আর করমু! একা একলা আছি-একা একলা থাকমু! তারপরেও মাঝে মধ্যেই মনে হয় যে, অই কাউয়ার জাতে তেমুন খারাপ না! ভালোই লোক তারা ! আমি অগো তল্লাটে থাকি- বিদেশী হইয়া থাকতাছি এইনে-এই দোষে সকলে যদি আমারে ঠোকরানো ধরতো!আমি বাঁচতাম তবে? একা একলা আমি কী করতে পারতাম! মরা লাগতো আমারে তবে!হায় হায়! 

তয়,মরলে কীই বা হইতো! মরতাম না হয়!এই যে আমার প্রায় প্রায় জ্বর হয়-জ্বরের চোটে চোখ খোলা রাখতে পারি না,তখন কতো কতো ওল্লা-পিঁপড়া দলে দলে এসে আমারে কামড় দিতে থাকে না? দেয় তো! তখন কী চোট যে পাই-কী জ্বলুনি!

ক্যান ওরা এমন করে!এমন নিদয়া কাম ক্যান করে ? আমি তো বলতে গেলে- এক প্রকারে- অগো নিজেগো জাতই !আমরা কী মানুষ নি, যে নিজের জাতরে নিজে বিনাশ করমু? কিন্তু ওল্লাগুলা আমার লগে -সেই মানুষগো মতোন - নিদয়া বেভার করে! আমারে একলা পায় তো -আমার যে কেউ নাই! 

তখন কান্দতে কান্দতে মায়ের ডাক পাড়ি, মাগো মাগো ওমা -কা কা কা- কই গেলা মা! ক্যান গেলা! কই গেছ তুমি! কইয়া না গেলা যে, এই আসতাছ! বলছিলা না, বাসা ছাইড়া এক পাও-ও লড়িস না! আমি লড়ি না। তুমি আসো তাইলে এইবার। সেই যেমন পরথম বার ঝুপ কইরা আইসা পড়ছিলা এই ছাদে, কার্নিশে বাড়ি খাইছিলা আন্ধাগোন্ধা- তেমন কইরা আবার আসো!

সেই ভাদ্দর মাসের জবজবা ভিজা রাইতে, সেই ডরে থরথর, বেদিশা আমার বাপ-মায়ে আইসা সেই যে ঠাঁই নিছিলো এইখানে, আর কোনোদিন এইখানে থেকে লড়ে নাই। যেই দেশ গাঙের পানিতে গেছে, সেই দেশের খোঁজ তল্লাসটা নেয়ার তাগিদটাও আর তাগো ডানার আসে নাই কোনোদিন। 

সেইখানে যে পইড়া রইলো জ্ঞাতি-গুষ্টি! তারা আছে, না নাই- কোনো সংবাদ আর আমার মায়ে-বাপে পায় নাই। কই গেছে কে- কিছু জানে না আমার বাপে-মায়ে। তবে জ্ঞাতি-গুষ্টির কেউ -এই এলাকায়- এই মহল্লায় - আসে নাই। আসলে, তা অজানা থাকতো না। 

এইখানে আইসা বাপে-মায়ে- দেখে এ এক আজব মুল্লুক। এমন মুল্লুক যে আছে, সজনা গাছের বাসায় বইসা তারা চিন্তাও করতে পারে নাই কোনোদিন! এইখানে সব কোঠাবাড়ি। কোনো এককালে অই কোঠাবাড়িগুলা নতুন আছিলো! তবে সেইটা যে কবে আছিলো, তা নাকি কোঠাবাড়িগুলারও আর মনে নাই।

এখন বহুত দিন হয়, তারা সব হয়ে আছে রঙ-জ্বলা । চল্টা খসা।চুনসুরকি তাদের শরীর থেকে যখন তখন খসতে থাকে ঝুপুর ঝুপ- ঝুরঝুর। ঝুরঝুরা জুবুথুবু একতলা কোঠাবাড়ি সব- যেইদিকে তাকাও সবখানে। 

কোনো কোনো একতলাটারউপরে একটা কী আধাটা ঘর আছে! আন্ধার, গরীব দুঃখি ঘর। তাতে লোক থাকে, আবার থাকেও না। 

চুনসুরকি খসা, গর্তঅলা ছাদের কিনারে বসা আমার মায়ে তখন চারদিকে চায়, আর হায় হায় করা ধরে তার পরাণ!

‘মাবুদ রখমান- এইটা কেমুন দেশে আইসা পড়লাম! মাটির কোনোখানে একটা বিরিক্ষি নাই! একটা গাছও কোনো কোঠাবাড়ির আশেপাশে নাই। খালি কোঠা! বেঁকা-ঝোঁকা,বুড়া-বুড়া,গাও- গতর ছেঁড়ামেরা কোঠা! এই দেশের মাটিয়ে করে কী! বিরিক্ষি ফলায় না! হায় হায়!’

মাটি ক্যান যে বিরিক্ষি জন্ম দেয় না এইখানে- সেইটা বুঝতে মায়ের অনেক দিন লাগছিলো। এইখানে মাটি থেকে ক্যামনে বিরিক্ষি কী লতাপাতারা লকলকাবে আসমানের দিকে! কেমনে!

এইখানে সব কোঠাবাড়ির সবটা চাতাল যে পাকা করা! বাড়ির সামনা কী পিছন কী চিপাচাপা চিলতা আশপাশটুক- সব সুরকি ঢালাই দেয়া পাকা- এইখানে। 

‘হায় হায়! এইটা কই আইসা পড়লাম! আমরা কই থাকমু! ক্যামনে থাকমু!’ মায়ে যখন কপালে মারে আর বিলাপ করে, বাপে নাকি তখন দেখায় আচানক সব গাছ গরানের নিশানা। দ্যাখো, মাটিতে একখানা লতা কী ঝোপ নাই বটে, কিন্তু সকল কোঠায় ছাদের কিনারে কিনারে, নোনাধরা কার্নিশে কার্নিশে- কতো কতো গাছের বসত। বেটে-খাটো লতা তারাকেউ কেউ ! লিকলিকা কাহিল গাছ তারা কেউ কেউ। তবে অনেকেই ভোমা,ভারী ,ভার-ভারান্ত!

আর কতো গাছ চায় আমার মায়ে! বাপে নাকি জিগায় তারে। হায় রে হায়! দালানের মাথায় কী কিনারে-মিনারের চুনসুরকিতে গাছ গজায় এই দেশে! আর মাটি থাকে বন্ধ্যা নিষ্ফল! এইটা কই আইয়া পড়ছে তারা। এইটা কোন দেশ! এইখানের এই ভারী-ভরন্ত ঝোপে কী বাসা বান্ধতে পারব দুইজন! তাগো লাগবো বিরিক্ষি। বিরিক্ষি কই এইখানের কার্নিশে! আছে এইখানে অশ্বথ কেউ, বটগাছও আছে কেউ কেউ! কিন্তু বেটে-বামনা তো সকলে!

তারা মাথায় খালি একটুখানি বাড়া। ডাল আছে, না ডাল নাই - দেখা যায় না।হায় হায় রে! মায়ে কান্দন জোড়তে গেলে, বাপে তারে ধামকি দেয়, আর বলে- এইনেই, যেমনে হোক ব্যবস্থা করোন লাগবো। নাইলে আর কোনদিকে যাইবো দুইজনে! আর কোনোদিকে উড়াল দেয়ার বাসনা নাই বাপের ডানায়- কোনো শক্তি নাই। হাতরথ সব ভাঙা, ভাঙা দেহের ভিতরের চিত্ত। এখন আর বাঁচলে কী-গেলে গা কী! 

এই কথা শুনে মায়ে চক্ষের পানি বন্ধ করে। লগের জনের চিত্তের দুক্ষু আর বাড়াইতে সাধ নাই তার! এখন বাসা তো বান্ধা লাগে! হায় রে একটা ঠাইল্লা নাই কোনোখানে- একটা ডাল কোথাও নাই, না আছে কুটাকাটা শুকনা লতা! বাপে-মায়ে বেদিশা হয়ে হয়ে, শেষে, টোকানো ধরে তারের টুকরা, ফালি প্লাস্টিক, ছেঁড়া স্যান্ডেল, আলি ফালি তেনা, দুমড়ানো হাঁড়ি, দলামোচড়া হয়ে থাকা কাগজ। অইগুলা জড়ো করে করে হিলহিলে এক অশ্বথ গাছের গোড়ায় তারা যে বাসা বান্ধে- এই তো সেই বাসা। এই যে সেইখানে- আমি এখন। 

সেই বাসায় কতো কষ্টে -মায়ে- আমাগো বার করে ডিমের ভিতর থেইকা।চক্ষের পানিতে তার হাঁড়ি কাগজের বাসা ভিজ্জা যায়!“কই রইলো নিজের দেশ, সাজনা গাছের ঝিরিঝিরি পাতার ছায়া! কই গেলো সেই রান্ধন ঘরের ঝলক বলক আগুন। আর তারে দুনিয়ার কোনোখানে দেখা যাইবো না! গাঙের কোন পাতালে তারা সব! আহ রে দুনিয়া!”

সেই চক্ষের পানিতে ভিজে ভিজে আমরা দুই ভাইবোন জন্ম নেই। ফাল্গুন মাসের শেষে- যখন দিনভরা খালি শীত শীত রইদ-সেই দিনে। সেই ছোট্ট ছাওগো মোখে জ্যান্ত পুঁটি মাছ দেয়ার কতো সাধ নাকি ছিলো বাপের! গাঙ তো আছে এই মহল্লার কোলে ঘেঁষা দিয়াই। সেইখানে বাপে কতো দৌঁড়ঝাপ, ওড়া-লড়া দেয়। কিসের মাছ! কিচ্ছু জোটে না। 

তবে অন্য খাওনের কোনো অভাব নাই এইখানে। মহল্লার সব রাস্তায় একটু পরপরই আছে কোটাকাটির জিনিস, ভাঙাচুরা এই সেই, নাড়িভুঁড়ি, তেনা-মেনার স্তূপ। 

সেইগুলা ঘাটে বাপে, নাড়িভুঁড়ি খোঁজে! তারপর সেইসব এনে আমাদের মুখে দেয়। আমরা সোন্দর বাড়তে থাকি। বৈশাখ মাসের গোড়ায়, মায়ে আমাগো দুই ভাইবোনের ডানা নাড়ে-চাড়ে। আর বলে, “কী খুবসুরত পাখনা হইছে পোলাপাইন দুইটার! মাবুদে বঞ্চিত করে নাই আমারে! মাবুদ রাখমান!” 

তারপরে আমাদের দুইজনেরে হুঁশিয়ার করে,” কিন্তুক খবরদার নিচে নামবানা ! নিচে কিন্তুক মাইনষের বসতি। তারা কইলাম আমাগো দেখতে পারে না! নিচে নামবা না! খবরদার! খবরদার!“

মায়ে আমাদের দিন-রাইত ভইরা নিষেধ করতে থাকে। এদিকে মায়ে নিষেধ করে যতো, বাপে দেয় তার চেয়ে বেশী নিষেধ।‘ খবরদার, তোমাগো চক্ষের একটা নজর পর্যন্ত য্যান নিচের দিগে যাইতে না দেখি! বুঝলা ধনেরা ?’

বাপে এইমতে কড়বড় কড়বড় করে মানা করে আমাদের দুইজনকে। আর অদিগে, বাপে যতো মানা করে, ভাইয়ে তত নিচের দিকে তাকানো ধরে। 

বাপে যেই অন্য কোনোখানে যায়, অমনেই সেয় ঘাড় এই লম্বা করে দেয় নিচের দিকে। করে, দেখতে থাকে নিচের দুনিয়া আর মানুষের চলাচলতি। মায়ে যে আশেপাশেই আছে, মায়ে যে চেতাচেতি করতে পারে -সে সেইটা পরোয়াই করে না। খালি সে ফুচকি পারে নিচের দিকে। নিচের দুনিয়া দেখে, আর নিজের ডানাগুলারে ঝটরপটর করে। 

আমি যেই তারে কই,” এমন দেখতে যাইস না! পইড়া যাবি শেষে কোন সময়! ডানা আমাগো পোক্ত না কিন্তু! উড়াল দেয়ার মতন পোক্ত হয় নাই অখনও!” ভাইয়ে আমারে ডানার ঝাপটা দিয়ে উড়াইয়া দিতে থাকে। ‘দূর বইন- তর খালি ডর! কিসের ডর?’ ভাইয়ে জিজ্ঞাস করে। 

কিসের যে ডর- আমি তার কী জানি! তয় মায়ে-বাপে বলছে যে, ডর আছে অইখানে। আমি ডর নিয়া থুইছি পরাণে। ভাইয়ে সেই কথা গেরাহ্যই করে না। মায়ে মনে করে যে, আস্তে আস্তে পোলায় বুঝবো! মা-বাপের বলা ভালো-মন্দ কথাগুলা সে আস্তে আস্তে মাথায় নিবো; আর মান্যি করতে থাকবো সেইগুলা!

কিন্তু আঁতকা কী গজব আসে আমাগো উপর। 

দুপুর হয় হয় সময় তখন। বাপে গেছে গাঙের দিকে- যদি একটা জ্যান্ত মাছ পাওয়া যায়- এই খোঁজে! এদিকে ভাইয়ে আঁতকা কান্দনদেয়া ধরে । তার বোলেভোখ লাগছে ! বহুত নাকি ভোক! বাপে ক্যান আসে না! ভাইয়ে চিল্লায় চিল্লায়। 

মায়ে তারে কতো বুঝ দেয়।সে শোনেই না। খালি চিল্লায়। মায়ে শেষে আমারে বলে, আমি য্যান ভাইয়ের পাশে চুপ দিয়া বইসা থাকি,আর অরে দেইক্ষা রাখি!

ক্যান! মায়ে কই যায়! মায়ে যায় রাস্তার ময়লাপাতি ঘাটতে! তগনগদ যা একটু কিছু পাওয়া যাবে- তাই নিয়া আসতে যাইতাছে মায়ে! পোলার ভোকের মোখে তো কিছু এট্টু দিতে হয়! পরে বাপে আসলে ভাল করে খাওয়া যাবে। 

ওমা! এই মনে নিয়ে যেই মায়ে বাসা ছাড়ে, অমনেই ভাইয়ের চিল্লানি বন্ধ। কান্দন বন্ধ করে সে আমারে বলে, ‘দ্যাখ- নিচে- অই যে কী জানি দেখা যায়! রোজ, এই সময় মানুষেরা এইটা কী জানি রাখে অইখানে!’

কী জিনিস? আমি ঘাড় বাড়াই নিচের দিকে। ও ! ওইটা ফেন! রাখা আছে গামলায়। মায়ে আমারে বলছে এইটা। আমি ভাইরে বলি।

‘আমি অই জিনিস খামু”- ভাইয়ে চিৎকার দিয়া ওঠে।

‘ হায় হায়-অইটা মানুষ গো জিনিস- আমরা খামু ক্যামনে’! আমি বলি তারে।

‘এক ঠোকর মোখে দিমুই দিমু’- বলে ভাইয়ে। বলে ডানা ঝাপটানি দেয়। আমি মনে করি- এই এমন এমনেই বুঝি এমুন করে সে। আমি চেয়ে থাকি ওর দিকে, আর ও করে কী- সুপ করে লাফ মারে নিচের ফেনের দিকে। আমি ধরমু কেমনে অরে! আমি তো বোঝতেই পারি নাই ওর মনের অই ফন্দি! হায় হায়! 

গলা ঝুঁকায়ে দিয়া আমি তারে ডাক দেওয়া ধরি- “ভাই ভাই! ফিরা আয় ফিরা আয়! যাইস না।“ ভাইয়ে আমার ডাকেরে গ্রাহ্যই করে না। নিচে নেমে যায়। আর নিচে পড়েই, সে কিনা, হুড়ুত করে ছুট দেয় সেই ফেনভরা গামলার দিকে।তারপর হুড়ুম-দাড়ুম ঠোকর দিতে থাকে ফেনে। 

উপর থেকে তার কীর্তিকালাপ দেখতে দেখতে ক্যান জানি ডরে আমার শরীর কাঁপা ধরে। অই তো সোন্দর ভাইয়ে গপাগপ ঠোকর দিতাছে! তাইলে আমার ক্যান ঝুম ডর লাগে! 

ভাইয়ে ঠোকর দেয় আমি দেখি, আর কোন দূর থেইকা জানিগোস্বা -হাঁকডাকের আওয়াজ আসতে শুনতে পাইতে থাকি আমি! কোথায় কারা হামকি ধামকি দেয় অতো। ঝাপসা মতো য্যান শোনা যায় কীসব কথা- হারামজাদা কাউয়া! ফেনে মোখ দিতে আইছে! দেওয়াইতাছি তোমারে ঠোকর দেওন! দূরঅ দূরঅ আপদ- যা যা- 

ঠরাম করে উড়াল দিয়া আসে একটা ভারী পিঁড়ি আমার ভাইটার দিকে। ও যে সরবো ফুরসতটাও পায় না। বোঝেই না তো যে, কী হইতাছে! সরবো কী! পিঁড়িটা আইসা অর ঘাড়গর্দানে আছাড় দিয়া পড়ে- থাপ্পুস। ভাইয়ে মোখভরা ফেন নিয়া দাপাতে থাকে-দাপাতে থাকে- উলটি পালটি দিতে থাকে- পাখনা দুইটা আছড়াইতে থাকে। 

আমি হরদিশা হয়ে ডাক পাড়তে থাকি, “ভাই, ভাই, উড়াল দে উড়াল দে! উইট্টা আয় উইট্টা আয় রে!” ভাইয়ে আমারে শুনবো কই! ছটফট ধড়ফড় করতে করতে নিঃসাড় হয়ে যায়। 

আমি জানপরাণ ঠোঁটে নিয়া ডাক দিতে থাকি- কা কা কাকাকা!

মায়ে ঠোঁটে করে নিয়া আসে দুনিয়ার নাড়িভুঁড়ি। আইসাদেখে, ভাইয়ে নাই! দেখে, তার পুতে দুইডানা নিঃসাড় মেলা দিয়া পড়ে আছে নিচে! শেষ তার পুতে। 

সেই পুতেরে যে- আর সে- তুলে নিয়া আসে এই চুনসুরকির বাসায়, শেষ দেখাটা যে দেখে চক্ষু ভইরা- তারও কোনো রাস্তা তার জন্য নাই। ভাইয়ে দাপড়ানি শেষও করে নাই, মানুষগো পোলাপানেরা আমার ভাইয়ের শরীরটা নিয়া কী ফুর্তি করা যে ধরে! 

হই হই হই- আওয়াজ করতে থাকে একদলে, একদল সিটি দিতে থাকে- সুই সুই সুরুৎ। আর এক দল ভাইটার গলায় দড়ি বান্ধে। বেন্ধে সড়ক দিয়া টানতে থাকে! আর কী হাউমাউ আমোদ তাগো! কাকপক্ষী সমাজে না জোট বেঁধে চিল্লাপাল্লা আর ঝামেলা বাঁধানোর রেওয়াজ আছে? একজনের বিপদের কালে না একশ’জন কাকপক্ষী পাশে আইসা দাঁড়ায়? তাদের না বোলে একজোট হয়ে যাওয়া আছে? 

কই, সেই কথা তো সত্য না দেখি! আমার ভাইয়ে যে মরলো- তার শরীর নিয়া মানুষের পোলাপানেরা যে আমোদ ফুর্তি করলো, মহল্লার কাউয়াকুলের একজনও তো তা দেখে একটা কা আওয়াজও করলো না! 

ঠোঁটে ধরা নাড়িভুঁড়ি মায়ের ঠোঁটেই থাকলো- পোলার মোখে আর দেওয়া হইল না। বাপে সেদিন গাঙের ধারে সত্য সত্যই পুঁটি মাছ পাইছিলো একখানা। নিয়ে এসে দেখে, আসমানী গজব আবার নামছে সংসারে।

বাপে কিন্তু হাউকাউ চিল্লাডাক কিছু দেয় না। কার্নিশে থির শরীর নিয়া বসে থাকে সারাটা দুপুর। তার পায়ের পাশে থির পড়ে থাকে এত্তটুক পুঁটি মাছটা। রোদ তারে শুকনা খরখরা করতে থাকে। 

আমি বাসায় কুঁকড়ে-মুকড়ে বসে বসে, কান্দি ভাইয়ের জন্য! কান্দি পেটের ভোকে। মায়ের ঠোঁটে সারাটা দিন ধরা থাকে নাড়িভুঁড়ি। বাপে কার্নিশে বসা দিয়া থাকে সারাটা দিন। একটা আওয়াজ তোলে না কেউ। কেউ নি চায় কারো দিকে! 

কেউ কাউরে দেখে না। কারো কথা কারো মনে থাকে না যেনো! এমনে এমনে সন্ধ্যা আসে। সন্ধ্যার মুখে বাপে হঠাৎ উড়াল দেয়। কই যায়! আমার চক্ষু আউলা হয়ে ডাক পাড়তে থাকে বাপেরে। বাপ একবারও ঘাড় ফিরায় না। একটা সাড়া না শব্দ না- ওই কোন দূরের দিকে সে যায় যায় যায়। 

আমি আর মায়ে চাইয়া চাইয়া দেখি- তার যাওয়া। সেই যে বাপে যায়, আর তার সন্ধান জানি না। সাতদিন, আষ্ট দিন, দশ দিন, এক মাস যায়- বাপে ফিরা আসে না। আমি আসমানের দূর শেষমাথার দিকে চাইয়া থাকি- বাপে নি আসে! আসে না। 

আমি মায়েরে কিছু জিজ্ঞাস করি না। কথা আসে না তো মুখে! মায়ে একদিন নিজে থেকেই বলে যে, বাপে আমার বিবাগী হইয়া গেছে। অমন করে কাকপক্ষীরা যখন উড়াল দেয়, তখন তারা জন্মের মতনই সংসার ছাড়ে। তখন তারা বিবাগী হয়ে ফিরে দেশে দেশে। বাপ -ও বাপ- ও বাপ- আমার পরাণ ছল্লাৎ করে করে অনেক কান্দে! 

বাপে তা কোনোদিন শুনতে পায় নাই। আমার সেই ডরে কালো হয়য়ে, কাঁপতে থাকা ঠোঁট- মায়ের পাখনা কতো কতোবার জাপটা দিয়া ধরছে! মা, আছো তো তুমি -আমার লগে! তুমিও কী বিবাগী হইয়া যাইবা গা আমারে থুইয়া! ও মা!

ভাইয়ের মরণের পরে, মায়ে যে হিমশীতল ঠাসকি লাগা হয়, হয়ই। রাও নাই ডাক নাই, খালি আমার সঙ্গে সর্বক্ষণ বাসায়ক্যাঁৎ হয়ে থাকে । ভোক্ষের চোটে আমি যখন গোঙাতে থাকি, তখন হেঁচড়ে-পেচড়ে কোনোরকমে সে নামে মহল্লার রাস্তায়। যা চক্ষের সামনে পায়, নিয়া আসে। বাছবিচার করে না। 

একবার নিয়া আসে- এক টুকরা নারকেলের মালা। শক্ত খোলসটা এনে আমারে বলে, “খা।“ নারিকেলের মালা খাওন যায়! আমি ঠোকর দেই, খটস খটস। শক্ত আটি ভাঙে না চিরে না লড়ে না। 

মায়ে তখন আমারে কয়, “নিজের খাওন এহন তেনে নিজে আনো গা।“ এখন আমার খাওয়া আমারে জোগাড় করা লাগবে! আমি কি উড়াল দিতে পারি? পারি না। আর, উড়াল দিতে আমার ডর লাগে। ভাইয়ে উড়াল দিতে গিয়া শ্যাষ হইছে না! আমি কোনো দিন উড়াল দিমু না- ডানা খুলমুই না- কোনোদিন না। 

মায়ে কয়,” নিজের পথ নিজে দেখ।“ আমি জাবড়ে ধরি মায়ের পাখনা। মায়ের চক্ষে কোনো মায়াবাসনার ঢেউ দেখা যায় না। এমনে এমনে কয়দিন যায়। 

মায়ে এক সকালে কয় যে, গাঙপাড় যাইতাছে। এই এক্ষণ ফিরবো! গাঙ পাড় ক্যান যায় মায়ে! আমার জন্য একটা দুইটা জীয়ন্ত মাছ যদি পায়! তেমন জিনিস- আমি তো -জীবনেও মুখে দিলাম না! অই তো মহল্লার দক্ষিণে গাঙ- অই দেখা যায়। মায়ে যাইবো, ঘুরান দিবো, আর ফিরা আসবো।

আমি আশায় আশায় বসা দিয়া থাকি। এই বুঝি আসে মায়ে। এই বুঝি আসে! মায়ে আসে না। আসে না। আর আসে নাই। কই গেছো তুমি গো? 

এইখানে আমার আর লড়ালড়ির কোন দরকার নাই। কোনো দিকে চাওনের তাগাদাটা আমার ভিতরে নাই। আসে নাই কোনোদিন। ভোক্ষের সময় একটা মাঝারি লাফ দিয়া মহল্লার সড়কে নামলেই চলে। রাস্তা তো ভরা আছে কত্তোরকম ময়লায়! কত্তোরকম ফেলনা জিনিসে। মরা ইন্দুর চাও-মরা ইন্দুর পাইবা। মাছের কাঁটা আঁশটা চাও- রাস্তা ভরা ছড়ানো আছে অই জিনিস। 

আমি ঠুকরে- ঠাকরে যা পাই, ঠোঁটে তুলে নিয়ে আসি।আইসা, এই হিলহিলা রোগা অশ্বথ গাছের গোড়ায় বসে খাই। জিরাই, আবার খাই। এমনে এমনে দিন তো যায়ই দিনের মতো। 

এইখানে আমার ওড়াউড়ির কোনো ঠেকা নাই। তাও আমি দিনে একটা হালকা উড়াল দেইই দেই। উড়াল দিয়া যাই গাঙপাড়ে। মায়েরে নি পাওয়া যায়! 

না পাওয়া গেলে নাই। গাঙপাড়ে বসা দিয়া চেয়ে থাকি উজানের দিকে। অইদিকে উড়াল দিয়া গেলে- পাওয়া যাইবোআমাগো সেই গাও। মায়ে বলে গেছে না আমারে! আমি জানি। দেই উড়াল, দেই? নিজেরেই জিজ্ঞাস করি। 

নিজেইআবার উত্তর দেই, না! কি কাম উড়াল দেওনের? অচিনা অই দেশে গিয়া হইবো কি? 

বাসায় ফিরা আসি তারপর। রোজ রোজ একই রকম থুবড়ানো থাকে পরাণটা, পাখনা কাহিল হয়ে থাকে একই রকম। ঘাড় বাঁকা হয়ে যেতে চায় একই রকম করে। একই রকম করে ভরা জোছনা রাতে ঘুম ভেঙে যায় সবসময়। আর, সকাল হয়ে গেছে ধইরা নিয়া, ডানা ঝাপড়ানো ধরি আমি, ডাক দিতে থাকি, কা কা কা-

কালকা রাতেও তেমনি হয়েছিলো। পূর্ণিমা গেছে সেই অনেকদিন আগে, আমাবস্যা এই আসে আসে! এমন কালে কিনা শেষরাতের চান্দ- ফকফকা চাঁদনী দেয়। দিয়া, আমার চক্ষুর তেনে ঘুম নাই করে। 

কেমন খলখলা ধলা লাগতাছে আশপাশ! আমি পাখনা ঝাড়া দিয়া ডাক পাড়া শুরু করি -কা কা কা কা- দিন হইছে দিন হইছে!

আমার ডাক শুনে, ছাদের খুপরির লোক য্যান ধড়ফড় করে উঠে বসে। আমি আওয়াজ পাই। তারপর সে দরোজা খুলে বাইরে এসে, আসমানের দিকে চায়। “ইয়াল্লা! রাইত দেখি বহুত রইছে। অই কাউয়ার পো- তুই চিল্লাস ক্যান?” সে আমারে গালি দিতে দিতে ঘরে গিয়া ঢোকে। 

আমি কী শরম যে পাই। শরমে আমার চক্ষে আর ঘুম আসে না। ঘুম আসেই না। 

সারাটাদিন তারপর কী জ্বালা! চোখ ঝিম ঝিম শরীর ঝিম ঝিম পরাণ ঝিম ঝিম! এই ঘুম নিয়া এতো ঝকমারি! দিনেরে কিনা সেই ঘুমের জ্বালায় আর দিন বইল্লা বোঝা যায় না! নিজের শরীরটারে আর কি না নিজের শরীর মনে হইতে থাকে না! খালি ঝিমঝিম লাগে। ঝিমঝিম লাগে!

সেই ঝিম ঝিমানীরে, আজকা সারাটা দিন, কোনোমতে সহ্য করে নিয়া,ক্যাঁৎ হইছি একদম সন্ধ্যাসন্ধি। ধুম ঘুম দিবো- দিন রাইতের সমান লম্বা ঘুম- এই বাসনা মনে ছিলো! কিন্তু এইটা কী ঘটে মাবুদ! চক্ষু বুইজ্জা সারি নাই, কী জানি ঝাঁপ দিয়া আইসা পড়ে চল্টা- ছিলা ছাদে, আমার বাসার সামনে! 

বিলাইটায় তো? মনে করছে আমি তো ঘুমে! এই ফাঁকে আমারে খাপ্পা দিয়া ধইরা- ছিঁড়া ফালাইবো? আর খাইবো? আরে বজ্জাতের ছাও, আয় তরে খাওয়াইতাছি! ঠোকর দিয়া চউখ কানা না করছি- তো কী কইলাম! 

সাঁই করে উঠে বসে আমার শরীরটা। আর, তারপর, সেই আওয়াজের কারণ-বিত্তান্ত বোঝার জন্য জানপরান তড়র-বড়র করতে থাকে আমার শরীরের । 

কোনখান থেকে আওয়াজআসে!কোনখান থেকে!

অশ্বথ পাতার আড়াল থেকে উঁকি ঝুঁকি দিতে দিতে আমার চক্ষুরা দেখে কী- ছাদে হুমড়ি খেয়ে পড়ে- কে জানি হাঁপায়! হাঁপায়! হাঁপায় আর কান্দে। আমার মতোই কে জানি। আমি গলাটা বাড়াই। 

কে রে! কেটায়? অইখানে কে? আমি দেখি আন্ধারের ভেতরে বসা আছে আমারই মতন আরেক কাকপক্ষী! 

এই মহল্লার কোনো কাকপক্ষীজন তো আমার দিকে আসবো না! তারা কোনোদিন আসে না। আসে নাই। তাহলে এটা কে! এইখানে কেনো! কান্দে কেনো সে! বিত্তান্তটা কি? আমার ডর ডর লাগে। কইলজা কাঁপে থরথর, তাও আমি তার দিকে উড়াল মারি। ছোটো উড়াল। ‘অই-অই -কেটায় তুমি? এই রাইতের কালে ,এইনে আইসা কান্দন জোড়াইছ ক্যান?’ আমি জিগাই।

“আমি কেউ না গো। আমি কেউ না। অকামের এক কাকপক্ষী আমি!” সে বলে।

‘বুঝলাম। কিন্তু কান্দ ক্যান?’ আমি তারে বলি।

“কাঁদি শরমে। নিজের জন্য শরম লাগে যে। আর কাঁদি কষ্টে। আমি তাকে বাঁচাতে পারি নি। আহহারে!” সে ফোঁপাতে থাকে। 

কারে সে বাচাঁইতে পারে নাই! সে তা ভাইঙ্গা বলে না।ক্যান বলে না?এখন, ফোঁপাইলে কী বিত্তান্ত বিষয় কিছু বোঝায় উপায় থাকে! 

‘এ্যাই, ভাইঙ্গা কও তোমার কথা। নাইলে, ফোটো এইহান থেইক্কা!’ আমার সাফ কথা!‘এমন কান্দন কতো দেখছি জিন্দিগীতে! দুঃক্ষু কান্দনের লড়াচড়ি আমার ভাল্লাগে না আর।‘

“আমি এসেছি সেই কোন দূর থেকে!” ফোঁপাতে ফোঁপাতে সে বলে, “কোথায় যে এসে গেছি- বাঁচা আছি না মরা- কিছু আমি ধরতেও পারছি না। কোনখানে এলাম!”

‘অই থাম থাম!’ আমি থামাই তারে। এর কথা য্যান কেমুন কেমুন লাগে! এইটা কেমন ধরণের কথা- সেইটা তো আগে বুঝি! পরে দুঃক্ষের কথা শুনমু নে।

“এমনই আমার দেশের কাকপক্ষী সমাজের ভাষা। অইখানে এমন কথারই চল।“ সে বলে। 

আচ্ছা! যেই দেশে যেই ভাও। কও, কও পক্ষী- কী দুঃক্ষু তোমার!

আমি থাকি একনিম গাছে। নিরালা, নিজের মনে থাকা এক নিম গাছ। সে গাছ বসত করে যেই ভিটায়, সে ভিটায় মালিকের আছে ছোটো এক খুকী। খুকী হাঁটে, দৌড়ায়,পড়ে ওঠে; কিন্তু মুখে কোনো শব্দ করে না। ঘরের সকলে চিন্তায় কাঁপাকাঁপি করে। কেনো কোনো আওয়াজ করে না খুকী? ডাকলেও শোনে না যেনো! কেনো?

সকলে শেষে একদিন ধরতে পারে যে, খুকী বোবা হয়েছে। সে কানে শুনবে না কোনোদিন, কথা বলা হবে না তার কোনোদিন। একে সে মেয়ে বাচ্চা। তার ওপর কিনা বোবা! 

সকলে ভয়ে-বিরক্তিতে ছটফট করে, আর বকে খুকীটাকে। খুকী তার কিচ্ছু বোঝে না, খালি ছুট দেয়- এই দিকে ওই দিকে। নিম গাছে বসে বসে এইসব দেখি, আর সকলের সব কথা শুনি। আহারে! কতো যে সুন্দর খুকীটা। সে কিনা বোবা! সকলের সঙ্গে সে খেলতে যায় না, সে থাকে একা একা। ঘোরে একা একা। 

পাতা ডাল মাটি দিয়ে খেলে - একা একা। খুকীটার জন্য পরাণ কেমন যে করতে থাকে আমার! আচ্ছা খুকী, সোনাধন, এই যে আমি- আমার সঙ্গে খেলো। থাকতে না পেয়ে শেষে আমি খুকীর সামনে নেমে আসি একদিন। 

খুকী না আবার আমারে ভয় পায়! 

কোথায় ভয়! 

সে আমার সঙ্গে বরং খেলা শুরু করে। 

খুকী আমাকে ধরতে আসে, আমি লাফ দিয়ে দিয়ে সরে যেতে থাকি। আমার মতো করে সেও পেছনে সরতে থাকে, আমি লাফ দিতে থাকি তার দিকে। খুকী তখন কতো যে হাসে! কোনো শব্দ নেই ওই হাসির! 

বাড়ির পুবে যে পুকুর- তার পানি যেমন থই থই চুপ, খুকী হাসি ঠিক তেমন থমথমা ছলছল। একলা শুকনা পাতাটা যেনো ওড়ে- এমন দুঃক্ষী সেই হাসি। 

আমার যে পোড়া পরাণ- সেও কেঁদে ওঠে ওই হাসি দেখে। 

আমি খুকীর সামনে বসে ডাকি- কা- কা- কা। 

ওর চোখের দিকে চেয়ে চেয়ে বলি, খুকী এই যে দেখো! অনেককরে দেখো! দেখো -কেমনে আমি ঠোট নাড়ি! দেখো! খুকী দেখে সেটা! অনেক করে দেখে!দেখে!

তারপর ঠোঁট নাড়া ধরে, ঠিক আমারই মতন। কিন্তু শব্দহীন। আহা! 

খুকী মাটির টুকরা কুড়ায়। আমি ঠোঁটে করে আনি শুকনো নিমের ডাল, নিম ফুল। লাগবে খুকী এগুলো? খুকী কী সুন্দর হাত বাড়ায়! 

বাড়ির লোকেরা কেনো কে জানে -প্রায় প্রায়ই খুকীর কথা ভুলে যায়। খেলতে খেলতে খুকী নিমগাছের নিচেই ঘুমিয়ে পড়ে। এই খোলা মাটিতে পড়ে থাকলে- খুকীর ঠান্ডা লাগবে না? আর, কতো লাল পিঁপড়া নিমতলায়। ওরা কামড়ে শেষ করবে নাখুকীকে?

ভাবনা করে করে, শেষে, আমি ডাক দেয়া শুরু করি বাড়ির লোকদের। আমার আর ডাক দেয়া কী! করি কা কা কা। 

কেউ আসে না। আবার ডাকি ,কা কা কা কা! আবার। 

বাড়ির যে বুড়িমা, সে জানে ,কাকের অই ডাক বড়ো অলক্ষণের ব্যাপার। 

সে এসে দেখে- খুকী ঘুমিয়ে কাদা, আর এক কাক বসা তার পাশে! এটা তো ভালো কথা না! 

কাকপক্ষী যে বিপদে- বালাই ডেকে আনে, এইকথা এই তল্লাটে কে না জানে! চিরদিন ধরে সকলেই তা জেনে এসেছে! 

দুপুরে, ঠিক দুপুরে, উঠানে কাক ডাকলো, তো, নির্ঘাত জানবে কারো মরণ একেবারে ধরাধার্য। সন্ধ্যার কা কা বলে যে, সঃসারে শনি আসছে। কাক বালা- মুসিবত আনে খালি! আর কিছু না। সেই কাক অই বোবাটার পাশে বসা! আবার, ডাক দেয় তো দেয়ই। 

আরে খেদা তো কাউয়াটারে- খেদা-খেদা! বাড়িতে হইচই শুরু হয়। বাড়ির লোক ঢিল মারতে মারতে তেড়ে আসে অলক্ষী অপয়া কাউয়ার দিকে। কেউ আসে এই লম্বা কোটা হাতে করে। তাড়ায়, হাঁকায়, ভিটা ছাড়া করে সর্বনাশা কাউয়াটারে! অই কাকের একটা ছায়া যেনো আর না পড়ে উঠানে! সকলে কড়া নজর রাখা শুরু করে তারপর।

তারপর থেকে এক পলকের জন্য খুকীর সামনে যাবার উপায় থাকে না। নিমের ডালে যে নিজের বাসা- সেইখানেও যাওয়ার রাস্তা থাকে না কাকের। দেখলেই, খেদানি দেয় কেউ না কেউ! কেউ না কেউ চোখ দিয়েই রাখে সবখানে! আসে নাকি বান্দর কাউয়া! আসলে আর আস্ত রাখা হবে না ওইটাকে! 

কাকপক্ষী কী করে! ঠাঁইছাড়া, বসতছাড়া হয়ে খালি বসে থাকে কদমডালে। পুকুরের ওই পাড়ে ঝাঁকড়া কদম গাছ। সেইখানে বসে বসে খুকীকে দেখে -শুধু দেখে সেই খেদানি- পাওয়া কাক! 

খুকী রোজ রোজ উঠান ভরে তাকে খোঁজে! নিমতলায় খোঁজে, বাড়ির নামায় খোঁজে। একদিন খুঁজতে খুঁজতে, ঘুরতে ঘুরতে আসে পুকুর ঘাটে। পুকুর ভরা কতো পানি! পানি দেখে খুকীর কতো যে লাফঝাঁপ! 

হায় হায়, খুকী যাও যাও! অইখানে যায় না! যায় না! পানিতে পড়ে যাবা তুমি। সরো সরো- কা কা কা! কাক তারে বলে। খুকী তাও পানি ধরতে যায়ই। পানি ধরে খুকী, প্রথমে একটুখানি। তারপর আরো বেশীটা ধরতে যায়। 

ধরতে গিয়ে পড়ে যায় খুকী- ঝপ। 

খুকী খুকী- হায় হায় রে! আমি যে একটা অকামের কাকপক্ষী খালি- আমি কেমনে খুকীকে তুলি পানি থেকে! খুকী যে ডোবে! অই যে তলে যায় খুকী! যাচ্ছে তলিয়ে -অই যে! হায় হায় রে!

দিশা-মিশা না পেয়ে বাড়ির ভিতরে গিয়ে ডাকা ধরি আমি। কতো ডাকি- আসো ঘরের মানুষেরা- খুকী পানিতে পড়ে গেছে। আসো গো তোমরা জলদি! একবার ডাকি- একবার পুকুর পাড়ে আসি- অই তো খুকী ধড়ফড়ায়। আহারে! 

আমার ছোটাতাড়া দেখেও কী ঘরের লোকেরা বোঝে না যে, খারাপ একটা কিছু ঘটেছে! তারা খুকীকে খোঁজে না। তারা তেড়ে আসে আমাকে মারার জন্য। অই লক্ষীছাড়ারে শেষ কর- শেষ কর। কোটা দিয়ে বাড়ি দিতে থাকে তারা আমাকে! ঢিল মারতে থাকে ঝপর ঝপ! আমি তবু ঘাটলার সামনে দাঁড়ায়ে চিল্লান দিতে থাকি,কা কা কা- কা কা কা! আসো গো তোমরা- খুকী ডোবে –অই ডুবে যায়! 

তারা কেউ আমার কথা শোনেই না; খালি কোটা হাতে আমাকে তাড়াতে থাকে কতো জন! ঢিল মারতে মারতে তাড়াতে থাকে। আমাকে পুকুর পাড়ে থাকতে দেয় না। পুকুরের পরে যে ক্ষেত, সেখানে দাঁড়াতে দেয় না। 

তাড়া করে চলে তারা, করতেই থাকে। হরদিশা হয়ে শেষে ছোটা ধরি আমি। মার খেতেখেতে থেতলা হয়ে আসা শরীর নিয়ে ওড়া কী যায়। ওড়া কী আসে! এই যে দেখো- খোঁচা লেগে আন্ধা আমার এক চোখ! ভালো হয়েছে- আন্ধা হয়েছে এই চোখ। ভালো হয়েছে-থ্যাতলা হয়েছে এই গাও-গতর। তাও মরি নাই আমি! খুকীটারে পুকুর নিলো। আর অতো অতো বাড়ি অতো ঢিল্লা আমারে শেষ করতে পারলো না! নিজেরে শেষ করার জন্যই অমনে দিশমিশহারা হয়ে উড়ালে ছিলাম! কই মরলাম- কই মরলাম! আহারে খুকী তুমি-

অচিন মুল্লুকের কাকপক্ষী কান্দে- কোন এক কথা না-কইতে পারা খুকীর জন্য! তাগো দুইজনের দেখাসাক্ষাৎ আছিল, মায়াদোস্তী হইছে- কাকপক্ষী তার বোবা খুকীর জন্য কান্দতেই পারে! কিন্তুক আমার চক্ষে গাঙ্গ গরজায় ক্যান! ক্যান মনে হইতে থাকে যে, অই অবুঝ খুকীটা আর কেউ না- আমার ভাইয়েই জন্ম নিছে বোবা খুকী হয়ে!

আমি কান্দি ক্যান! আমার পরাণ ধড়ফড় করে ক্যান! অগো খুকী! 

‘অই কাকপক্ষী, তুমি ফিরা গিয়া দেখলা না খুকী আছে, না নাই?’ দূরদেশের পক্ষীরে জিজ্ঞাস করি আমি। সে খালি কাঁদে কাঁদে কাঁদে। 

আমার ডানারা জানি কেমন করা ধরে! উড়াল দিতে চায় য্যান- শক্ত মস্ত উড়াল- সেই কোন দূরের দেশের দিকে- উড়াল দিতে চায় য্যান- আমার ডানারা! যেইখানে খুকীগো উঠান, সেইখানের দিকে। 

যাই তাইলে আমি সেইখানে! যাই! যাওয়া ধরি আমি। 

অচিন দেশের পক্ষীও - আসা ধরে আমার লগে লগে। 

আহ! আসমানের কাছে বাতাসেরা এমন তেজী থাক! কোনোদিন এমন হাওয়ার সোয়াদ পাই নাই তো জীবনে! 

আহ! আর আমার কোনো সুরকি ঝুরঝুরা পেছন নাই! আর কোনো ট্যামরা ধরা বাসা নাই। 

বামে কিছু নাই ডাইনে কিছু নাই- খালি এই কালো রাইতে তেজী হাওয়ার নদীতে ভাসা আছে!

যাই যাই যাই আমি- খুকী গো দেশে যাই!আসতাছি গো খুকী!

যেতে যেতে যেতে আঁতকা সেই ল্যাকপ্যাকা মানুষটার কথা মনে আসে! সেয় কালকা সকালে বাকরখানি গুঁড়া দিতে আইসা দেখব যে, আমি নাই। সেয় কি আমারে খোঁজবো?



লেখক পরিচিতি
আকিমুন রহমান কথাসাহিত্যিক, গবেষক ও শিক্ষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে পিএইচডি করেছেন ড. হুমায়ুন আজাদের তত্ত্বাবধানে। গবেষণাপত্রটি ‘আধুনিক বাংলা উপন্যাসে বাস্তবতার স্বরূপ (১৯২০-’৫০)’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় বাংলা একাডেমি থেকে। মূলত ঔপন্যাসিক, গল্পকার এবং প্রাবন্ধিক হিসেবে সুপরিচিত তিনি। লেখালেখির পাশাপাশি দীর্ঘদিন যাবত শিক্ষকতা করছেন। লেখালেখির শুরু আশির দশকের অন্তিমে, তবে ১৯৯৬ সালে ‘বিবি থেকে বেগম’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে তিনি ব্যাপক আলোচিত হন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে- বিবি থেকে বেগম, আধুনিক বাংলা উপন্যাসে বাস্তবতার স্বরূপ, সোনার খড়কুটো, পুরুষের পৃথিবীতে এক মেয়ে, রক্তপুঁজে গেঁথে যাওযা মাছি, এইসব নিভৃত কুহক, জীবনের পুরোনো বৃত্তান্ত, নিরন্তর পুরুষ ভাবনা, পৌরাণিক পুরুষ, বাংলা সাহিত্যে বাস্তবতার দলিল (১৩১৮-১৩৫০ বঙ্গাব্দ), সাক্ষী কেবল চৈত্রমাসের দিন আদি পর্ব, যখন ঘাসেরা আমার বড়, অচীন আলোকুমার ও নগন্য মানবী ইত্যাদি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন