শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

শিপা সুলতানা'এর গল্প : কবর

সাদ্দাম বার্বুচিকে বলা হয়েছিলো ৬/৭শ' মানুষ হিসাব করে রান্না পাকাতে, চুদির ভাই পাকাইছে পাঁচশ' মানুষের! তিন মসজিদের জন্য তিন ডেকচি আখনি আর বাড়ির মেহমানের জন্য দুই ডেকচি। সাথে মাংসভুনা, মুরগিভুনা, আর দই। ঘরে রান্না হবে মাছের দুই/তিনটা আইটেম, নতুন মেহমানদের জন্য। সবই ঠিকঠাক আছে কিন্তু মানুষের সমাগম দেখে মনে হচ্ছে এই খাবারে ফেইল মারবে। জাহেদা বেগমের বাপের বংশ বিশাল, হিসাব করলে জাহেদা বেগম প্রথম কন্যা, যিনি এই বয়সে মারা যান, তার বংশ বিরাদর কেউ আর বাকি নাই আসতে শেষবিদায়ে। এখন যদি খাবারে টান পড়ে!


উঠানে ছোটচাচার করা হল্লা ঘরের ভেতর থেকেও শোনা যাচ্ছে। জাহেদা বেগমকে নিয়ে জানাজার জন্য আত্মীয় অনাত্মীয় পুরুষরা যখন মসজিদ মাঠে চলে গেলো, তখন না কি কেউ কেউ ঘরের মেহমানের কথা বলে মাংসভুনা পাঠিয়ে দিয়েছে নিজ নিজ বাড়িতে। বাবুর্চি চুদির ভাই ভাবছে ঘরের নারীদের হয়তো আগেভাগে খাইয়ে দেয়া হবে, জানাজার পর পর প্রায় সকলেই চলে যাবে বাড়িতে। থাকতে হলে মৃত বাড়িতে চারদিনের শিন্নি পর্যন্ত থাকতে হয়। সে বালতি ভরে মাংস পাঠিয়েছে, সেসব চলে গেছে বাড়ির বাইরে।

মায়ের বিছানায় শুয়েছিলো রুমি। এদিক সেদিক খুঁজতে লাগলো নিজেদের কেউ আছে কি না। ঘরের ভেতরে অনেকেই আছে, যাদেরকে সে চিনে না। আত্মীয়স্বজনই হবে, তবে সবাই অল্প বয়েসি বলে সম্পর্কে কে কী হয় জানে না। আশপাশের রুম থেকে পরিচিতদের কণ্ঠ ভেসে আসছে, কেউ কেউ চিৎকার করে কেঁদেই চুপ হয়ে যাচ্ছে। কে যেন শব্দ করে হাসলোও, রুমি পাশেই বসে থাকা একটি তরুণিকে বললো, বোন, দেখো তো কেউ আছেন কি না, ডেকে আনতে পারবে?

ফুফু, আমি বোন না, আপনার ভাইজি লিয়া।

ওহ স্যরি।

রুমি তবু বুঝতে পারে না কোন বাড়ির কোন ভাইয়ের মেয়ে এই লিয়া! কেউ একজন নারী এসে তাকে জড়িয়ে ধরে জাহেদা বেগমের জন্য গলা ছেড়ে কাঁদতে লাগলো, তখন রান্নাঘরের দরজায় দেখা গেলো বড়খালার আভাস। কান্নারত নারী দ্রুত চলে গেলো তার দিকে। প্রচণ্ড শব্দ আর গরমে জ্ঞান হারালো রুমি।

জ্ঞান ফিরে আসে অধিক শব্দে এবং অত্যধিক গরমে। বেশিরভাগ মানুষের খাওয়াই শেষ হয়ে গেছে, চা কফি পর্ব চলছে বুঝা গেল, এবং স্বস্তির বিষয় যে কেউ খেয়ালই করে নাই সে এতোক্ষণ অজ্ঞান হয়ে ছিলো। হয়তো ভাবছে কয়েকদিনের অঘুমা আর গরমে কাহিল হয়ে ঘুমাচ্ছ, ঘুমাক। সে শুয়ে শুয়েই ঘরের ভেতর চোখ বুলিয়ে আনে। এই ঘরটা বাবা মায়ের, বিশাল ঘর, দুইটা কিঙ-সাইজের খাট জোড়া লাগিয়ে শোবার ব্যবস্থা। ঘর ভর্তি নতুন মুখ, তবে এবার দু-একজনকে চেনা যাচ্ছে, তবে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না তার। মায়ের কোলবালিশ জড়িয়ে যেভাবে শুয়েছিলো, সেভাবেই শুয়ে থাকে সে। এ পর্যন্ত দুইবার কোলবালিশের আড়ালে ফিক করে হেসে ফেলছে সে। শীত এলেই নতুন লেপ আর সবার জন্য আলাদা আলাদা কোলবালিশ বানিয়ে আনতেন আব্বা। পুরান লেপ বালিশের তুলা দিয়ে তোশক। যত আরাম আর নরমই হোক আম্মার পছন্দ হবে না। সবচেয়ে ভাল আর নরম তুলা দিয়ে ফের এদিক সেদিক করে এনে দিতেন আব্বা। সেই কোলবালিশ কেউ ছুঁতে পারবে না। গতবার যখন রুমি দেশে আসলো, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলতে লাগলেন কোলবালিশটি নতুন, খুব আরামের। রুমি তার বেডে ঘুমালে কোলবালিশ ব্যবহার করতে পারবে, এমন আরামের বালিশ উনি জীবনেও দেখেন নাই। রুমি ঘুমাতে পারেনি, তার ছোট তখন ছয়মাসের, রাতে দু-তিনবার উঠতে হয়, বাবা মার বারবার ঘুম ভাঙবে। আম্মার সেই আরামের বালিশে মুখ ডুবিয়ে ফের গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় সে।

শাওয়ার না করেই খেতে বসেছে রুমি। কী দিয়ে খাবে, কি রান্না হয়েছে জানে না। হলরুমে, রান্নাঘর, শোবার ঘরের খাটে, ড্রয়িংরুমে যে যেখানে পারে বসে খাচ্ছে এবং খাবার পর হাত ধুয়ে বেডশিটে, লেপের কভারে, পেছনের উঠানে মেলে রাখা কাপড় চোপড়েও মসলামাখা হাত মুছচে। সামনের উঠানে পুরুষদের খাবার ব্যবস্থা, সেখানে দইয়ে টান পড়ছে বুঝা গেলো। যে হৈ চৈ করছে সে পাঁকা লোক, এমনভাবে প্যাচিয়ে প্যাচিয়ে খোঁচা দিচ্ছে যে ইজ্জত কা সওয়াল ভেবে গোপনে রাখা পাতিল থেকে একটা বের করতেই হবে! 'শিন্নি খেতে আসছে বলে কি তার ইজ্জত নেই, সে কি বাড়িতে না খেয়ে থাকে, মেহমানদারী, তায় জস্টিমাসি গরম, দই ফই অফুরান রাখতে হয় মিয়া...'

চুদির ভাই মজনু...কুকুরে নু মুখ দিলার ডেকচিত?

মজনু হয়তো কোনো কামলার নাম, তার দিকে তেড়ে যান ছোটচাচা, তখন রুমি'র সামনে মাংসের বড় একটা বউল এনে রাখে একজন সাহায্যকারী মহিলা এবং বলে যে কিছুক্ষন যেন অপেক্ষা করে, তার জন্য তার চাচি আর খালারা এখনো খান নাই

মাংস ছাড়া আর কিছু নাই?

মুরগি আনতেছি।

না, আমি খাই না।

মাছ ভাজা আনি?

না, দেখতো টক কিছু আছে কি না।

রুমি এদিক সেদিক তাকায়, তার ভাইবোনেরাও দীর্ঘ জার্নি করে এসেছে, তারা কে কোথায় আছে, কিছু কি খেয়েছে, কাকেই বা এইসব জিজ্ঞেস করবে!

সবার পাতেই দই তুলে তুলে দেবার কথা ইশারায় বলে ছোটচাচিকে। খেতে বসলে জাহেদা বেগম টেবিলের চারপাশে চক্কর দিতেন দইয়ের পাতিল হাতে। অগোছালো দ্ই খেতে পারে না বলে রুমি'র জন্য প্রথমেই দই তুলে রাখতেন বাটিতে। খাবার নিয়ে নখরামি নেই তার এই মেয়ের, তবে একটা শুটকি বা টক তরকারী রাখলে খুশি হয় বলে কাজের মানুষদের ব্যস্ত করে তুলতেন!

বৃষ্টি হবে না তো চাচী?

সবাই দোয়া করতেছি বৃষ্টি হোক, তুমি এসব কী বলো ছোট আম্মা?

আম্মার কাদাপানি ভাল লাগে না চাচী...ভাতের প্লেট সরিয়ে উঠে পড়ে রুমি।

রুমি দেখে সবার প্লেটে দই আছে কি না, তারপর বাবা-মার পুরান শোবার ঘর দিয়ে রান্নাঘরে যায়। ঘরের শেষ রুম এই শোবার ঘরখানা। বাবা-মা এই ঘরেই থাকতেন রাতে, তারপর সে যখন ছেড়ে গেলো বাড়ি, মাঝের শোবার ঘরে চলে এলেন তারা, তারপর যখন ছোট বোনটিও চলে গেল দূরে, রাস্তার দিকের বড় ঘরখানাতে চলে গেলেন তারা। আবার ছেলেমেয়েরা যখন ফিরতো, পুরনো শোবার ঘরে চলে যেতেন দু'জন। সে যখন দেশ ছেড়ে চলে যায়, বাবা-মার ঘর বলতে এই ঘরখানাই। বিশালাকার খাট, পুরনো আলমিরা, ছাদ লাগোয়া শোকেস, বেডসাইড টেবিল, নামাজের চৌকি আর আলনা। এই ঘরেই সন্ধ্যা হলে চা নিয়ে খাটের ওপর বসতো সবাই। জাহেদা বেগম কোলের ওপর পানদানি নিয়ে সুপারি কুটে ডিব্বায় রাখছেন, পান ধুয়ে দিয়ে গেছে লাইলি তবু কোথাও ময়লা রয়ে গেছে, চুনের ডিব্বা থেকে শুকনা চুন ফেলে নতুন চুন ভরে দিয়ে গেছে, কিন্তু মুখ ঝামটা দিয়ে গেছে হারামজাদী!

আরে বাদ দেও, এই পানচুন তোমাকে খাবে, দুনিয়ার যত বদ অভ্যাস তোমার।

আমি তোমার বিড়ি খাওয়া নিয়া কিছু বলি?

বিড়ি না, বিদেশি ফাইভ ফাইভ।

ঝগড়ার মুখে মুখে তারা উঠে গিয়ে যার যার রুমে ব্যস্ত হয়ে পড়তো। বাবার ঐ এক বাক্যই শুরু আর শেষ কিন্তু ঘণ্টাদেড়েক মায়ের কথা চলবেই। তারমধ্যে আছে--সতেরো বছর আগে তাকে দশদিনের কথা বলে বাপের বাড়ি দিয়ে আট দিনের দিন গিয়ে নিয়ে আসা, পরেরদিন তার মেজো ফুফুর বাড়ি যাবার কথা ছিলো বোনেদের নিয়ে! সবকিছু তার মনে আছে!

আর সে-বার জাহেদা বেগম যে দশদিনের নাইওর গিয়ে পনেরদিনের দিন ফিরলেন শেওলা সেতু ভেঙে গেছে অজুহাতে? তারও মনে আছে সব।

রান্নাঘরের টেবিলে, মেঝেতে পিঁড়ি পেতে, চালের বস্তার ওপর যে যেভাবে পারে কয়েকজন মহিলা ভাত খাচ্ছেন। কেউই তার পরিচিত কাজের মানুষ নয়, তবে তাদের একজনের পেছনে আস্ত একটি দইয়ের পাতিল আছে বুঝা গেল। ভাতের পর পর চা খাওয়া লাগে রুমি'র, কোথাও তার পুরান মগটি নেই। সে আসার আগে আগে শোকেস থেকে বের করে পরিষ্কার করিয়ে রাখতেন জাহেদা বেগম। পুরো আধালিটার চা ধরে নকশীকাটা মগটিতে। চার চামচ গুঁড়াদুধ, তিনচামচ চিনির সাথে ঘন লিকারের চা। নিজে রান্নাবান্না প্রায় ভুলেই গেছিলেন জাহেদা বেগম, কাজের লোকদের একবার দেখিয়ে দিতো রুমি, তারপর ঘণ্টায় ঘণ্টায় বানিয়ে দিতো তারা, মগটি কোথাও চোখে পড়ছে না তার। পেছনের উঠানের দরজা খুলে বাইরে বের হতেই মনে হলো আবার জ্ঞান হারাবে সে। আগুনের হলকা যেন তার মুখের চামড়া পুড়িয়ে দিয়ে গেল! এতো গরম কি আগে ছিল? ছিল বোধ হয়। খালি পায়ে পেছনের উঠানে নেমে আসে সে, এই উঠানে মানুষজন কম, তবে কেউ কেউ বনের ভেতর ঢুকে আনারস পাড়ছে দ্রুত, মোচড় দিয়ে একটা কাঁঠাল পেড়ে একজন দ্রুত মিলিয়ে গেল বনের ভেতর। মাত্র এক বছরে বাড়িটি জঙ্গল হয়ে গেল। আগের মতো মেছু বাঘেরা ঘাপটি মেরে থাকে হয়তো! রুমি চোখ ফিরিয়ে এনে পেঁপেগাছ খুঁজতে থাকে। তাদের বাড়িতে সব ধরনের ফলের গাছ হলেও লুকলুকি আর পেঁপে হয় না। রুমি'র শাশুড়ি দুইটি লুকলুকির চারা দিয়েছিলেন জাহেদা বেগমকে, ঝাড়েবেড়ে বিশাল সে গাছে একটা ফুলও আসেনি কোনোদিন। প্রতিবছর আফসোস করতেন ফলের জন্য। তবে চারদিন আগে শেষ যখন কথা হলো মায়ের সাথে, রুমিকে বিরাট একটা সংবাদ দেবার মতো বলছিলেন যে তার একটা পেঁপেগাছে প্রচুর পেঁপে এসেছে এবার, কয়েকটা পেঁপে ইছারাঙ্গাও হয়েছে, তিন চারদিন গেলে খাওয়া যাবে... কাউকে পরিচিত দেখছেও না জিজ্ঞেস করবে পেঁপে গাছটি কোথায়!

তোমার পিছেই তো পেঁপেগাছ!

আম্মা...

চমকে পেছনে তাকাতে গিয়ে গাছের সাথে তার ধাক্কা লাগে আর সেই ধাক্কায় একজোড়া পাকা পেঁপে হুড়মুড় করে পড়ে তার পায়ের কাছে বালুর ওপর। জ্ঞান হারাতে হারাতে রুমি দেখে দূরে একটা কাঁঠালগাছে হেলান দিয়ে সিগারেট খাচ্ছেন তার ভাই, এবং তার প্রচণ্ড ভয় হয় যদি কোনো সাপের ওপরে পড়েন তার ভাই, অনেকক্ষণ কেউ জানবেও না...

দূরে কোথাও আজান হচ্ছে, রুমি চমকে উঠে, ঐ মসজিদের পর পর সীমাদের বাড়ির নিজেদের মসজিদে আজান হয়, ভাবতে ভাবতে পশ্চিমের গাঁ থেকে শোনা গেল আজান, তবে আগের সেই মোয়াজ্জেন নয় শিওর। এর পর পর তাদের মসজিদের মাইকে টুং করে একটা আওয়াজ হলো, এমনই সময়ে তার আব্বা যখন খাট থেকে নামতেন টেবিলের কোনা ধরে, টেবিলের ওপর রাখা পানির গ্লাস সামান্য টুং করে থেমে যেত আর দ্রুত বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়তো রুমি। বিয়ের পর অভ্যাস চলে গেছিলো, রাত জেগে লিখলে সাদাতের কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু সে বেডে না গেলে সাদাতও যাবে না, লেখা শেষ করার তাগাদ দেবে, কফি বানাবে, হাঁটাহাটি করবে। দীর্ঘদিন পর বুকের কাছে হাঁটু মুড়ে মা বাবার বিছানায় বসে থেকেছে সারারাত। দূরের গাঁ থেকে আসা আজান শেষ হবার সাথে সাথে উঠানের লোহার গেটে চাবি লাগালো রুমি, চাবি ভেতরেই থাকবে, অনেকেই শেষরাতে ঘুমিয়েছে, অনেকে এখুনি জাগবে নামাজ পড়ার জন্য।

গেটের বাইরে ঘুমিয়েছিলো তিনটা কুকুর, রুমি শুনেছিলো তার আব্বা মারা যাবার পর তাদের পুরনো কুকুরটি নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে, এক বছরে নতুন কেউ এলে বাড়ির ভেতরেই ঘুমাবার কথা। তিনজনের পেটে ভারি, প্রচুর ফেলনা খাবার খেয়েছে মধ্যরাত পর্যন্ত, হৈ চৈ মারামারিও শোনা গেছে আধিপত্য নিয়ে, ওদের পাশ কাটিয়ে বড় রাস্তা পেরিয়ে মাঠের ওপর নেমে আসে রুমি। মাঠের ভেজা ভেজা ঘাষ, কুয়াশার মত ঝিরিঝির বৃষ্টি দিয়েছে বোধহয় রাত। মাঠের বাঁকে বাঁকে টিলা, টিলার ফাঁকে খোপ খোপ কোয়া, কোয়ার পার ঘেঁষে ঘেঁষে হেঁটে গেলে মাইল খানেক পর গোরস্থান। মেইন রোড এভোয়েড করা যেনো পরিচিত কারো মুখোমুখি হতে না হয়, কেউ যেন রে রে করে সঙ্গ না ধরে।

আর মিনিট বিশেক হাঁটলেই বরইটিকি, রুমি সেখানে যাবার আগে বসতে চায়, তার একা একা বসা দরকার, তার নিজেকে জোড়া দেয়া দরকার প্রথমে। ভাঙ্গাচোরা রুমিকে দেখলে আব্বা আম্মা বিরক্ত হবেন। দুজনই জীবনভর পরিচ্ছন্ন, গোছানো, রুচিশীল নরনারী, বিশেষ করে মা। রুমি নিজের পোশাকের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠে। তার পরনে জেগিন্স আর একটা নীল রঙের জিন্সের শার্ট, খালি পা। আস্তে করে রুমি শার্টের আরেকটি বোতাম লাগিয়ে নেয়, ছাড়া চুল হাতখোঁপা করে কুয়ার জলে মুখ ধুবে ভাবে। কুয়ার পানি মার্বেল পাথরের মত স্বচ্ছ নয়। কেনো নয়, ভাবতে ভাবতে মনে পড়ে কোথাও কোনো অক্ষত টিলা নেই আর। মুকি, বরবটি, শিম না হলে বিদেশি গাছ লাগিয়ে তছনছ করে দিয়েছে প্রত্যেকটি টিলাকে। যেনো প্রচণ্ড আক্রোশ মানুষের, যেমন আক্রোশ থাকে পরশ্রীর প্রতি! জায়গায় জায়গায় ঘা, ক্ষয়া। শীতে যেমন তেমন, বর্ষায় ফাঁটল দিয়ে পানি ঢুকলে আর সামলাতে পারে না টিলাগুলো, এখান ওখানের মাটি ভেঙে পড়ে, নতুন লাল লাল মাটি বের হতে থাকলে কাঁচা রক্ত দেখে হতভম্ব হয়ে থাকে টিলাগুলো। চিকন রক্তের ধারার মত পানির রেখা নিরুপায় হয়ে ঘুরতে থাকে টিলার ফাঁকে ফাঁকে, গ্রাম জুড়ে, সারাটি বর্ষাকাল। কোনো একটা টিলা থেকে গোলাপি চিকন পানির একটা স্রোত এসে যোগ হচ্ছে কোয়ার পানিতে। মুখ না ধুলেই অদূরে মাঠের ভেতর ঝামা পাথরে গিয়ে বসে রুমি। শাদা বালুর ওপরে হাত দেড়েক মাথা বের করে আছে পাথরটি, তুলতে গেলে দেখা যাবে মাস দিন লেগে যাচ্ছে! তিন চারদিন না কি বৃষ্টি দেয় নাই, মাটিতে পায়ের বুড়ো আঙ্গুল গেঁথে আন্দাজ করতে চাইলো রুমি, অল্পতেই পানি উঠে এলে কথা মিথ্যা। না পানি উঠে নাই, তখন পাথর থেকে নেমে এসে বালুতে হাঁটু গেড়ে বসে, তর্জনি সোজাসুজি মাটিতে গেঁথে নেয়, তারপর আঙ্গুল বের করে আনে। অহো অহো, বালির কালার বদলে যাচ্ছে, দ্রুত বালি ভিজে আসছে, রুমি এবার হাতের চার আঙ্গুল কাজে লাগিয়ে ইঞ্চি চারেক ব্যসার্ধের একটি গর্ত করে, দ্রুত করতে হয়, তারপর খলবল করে উঠতে থাকে পানি। রুমি পিছিয়ে গিয়ে আরেকটি গর্ত করে, তারপর আরেকটি গর্ত, তারপর আরেকটি, যেনো পানিদের হাত পা কণ্ঠ আছে, কুলকুল করে উঠে আসছে মাটির ওপরে। এবার রুমি আঙ্গুল দিয়ে টেনে গর্তগুলোর মিলন ঘটিয়ে দেয়, তারপর বন থেকে একমুঠ লুকটিফুল তুলে এনে প্রথম নাবতলায় ছেড়ে দেয়, ফুলগুলো দ্রুত ছুটতে থাকে পরের নাবতলার দিকে, রুমি জানে কয়েক মিনিটের ভেতর পানির ফোয়ারা বন্ধ হয়ে যাবে, গর্তগুলো বুজে আসবে, কেবল গোলাপি গোলাপি ফুলগুলোর বোকার মত পড়ে থাকবে শাদা বালির ওপর। নাবতলাগুলো ফের বালিতে বোজার আগে আগে বৃষ্টি এলো ঝেপে। এমন বৃষ্টি যে টিলা থেকে টিলা, কোয়া থেকে কোয়া, মাঠ থেকে মাঠের ব্যবধান মুছে গেলো কয়েক মুহূর্তে। একে তো ভোর, সূর্যের আভাস আছে, কিন্তু আলো আটকে আছে ঘন মেঘের আড়ালে আড়ালে। এখন এমন ঘন বৃষ্টি, কয়েক মুহূর্তের জন্য দিক হারিয়ে ফেললো রুমি!

বৃষ্টির সাথে বজ্রপাতও হচ্ছে। বাতাসও আছে প্রচণ্ড, হয়তো ঝড় আসবে। ঝড় আসলে ঝামেলা। নামে টিলা, আসলে পাহাড়ই। দুই তিন গ্রাম মিলে চাতলা টিলা, ঝড়ের সময় বিপদ আছে এর ঘেরের ভেতর থাকলে, রুমি সেখানেই আছে। লাফ দিয়ে একটা ছড়া পার হয় রুমি। কিছক্ষণের ভেতর তুমুল গোলাপি স্রোতে দূর্দান্ত হয়ে উঠলে এমন লাফ দিয়ে আর পার হওয়া সহজ হবে না। ছড়া পেরিয়ে রুমি গোরস্থানের দিকে দৌঁড়াতে থাকে। বজ্রপাত হলে প্রচণ্ড ভয় লাগে আব্বার, জোরে জোরে দোয়া দরুদ পড়তে থাকেন, সন্তানদের কাছে এসে অভয় দেন, আম্মার অপছন্দ কাদাজল, রুমি'র উচিত হয় নাই মাঠে বসে বসে সময় নষ্ট করা। বৃষ্টি বাদলার দিন, তার উচিত ছিলো আরো ভোরে উঠে বাবা মার কাছে চলে আসা। বৃষ্টি কি খুব ঘন হয়ে পড়তেছে! শরীর খুব ভারি মনে হচ্ছে রুমি'র, হয়তো তেমন ভারি নয়, উঁচু নিচু ঢালের ওপর দিয়ে এমন করে দৌঁড়ায় নি অনেকদিন, হয়তো এই কারণেই এখনো বাবা মার কাছে পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে তার। রুমি ভেবেছিল বাড়ি যেদিন ফিরবে, ঘরে না গিয়ে আব্বার কবরের পাশে চুপচাপ শুয়ে থাকবে আধাদিন, যা যা আগ্রহ, সব ডিটেইলস বলবে আব্বাকে, তারপর ভোর থাকতে চলে আসার কথা বলে বাড়িতে যাবে। এখন গিয়ে কাকে প্রথমে ডাকবে সে, কাকে ছুঁবে প্রথমে! বরাবরের মত আব্বাকে? ছুঁয়াছুঁয়ি পরে, আম্মার কবরের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে হবে আগে, বৃষ্টির পানিতে আম্মা কুকড়ি মুকড়ি লেগে গেছেন জানে সে। বৃষ্টি ঠেলে ঠেলে আব্বা আম্মার কবরের দিকে দৌঁড়াতে থাকে রুমী...

1 টি মন্তব্য: