শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

মল্লিকা ধরের গল্প : ঝর্ণাপারের বাড়ি

১।

"পাহাড়িয়া পথে হেঁটে যেতে যেতে 
বুকের ভিতরে সমুদ্র খোঁজে কেউ – 
সবুজের ঘ্রাণে শরীর ডুবিয়ে 
সোনালি রোদের ওড়না জড়িয়ে 
চোখের গহীনে নীল জলে ওঠে ঢেউ - " 

মৃদু ভল্যুমে গান বাজে, প্লেয়ারটা রাখা রান্নাঘরের দেয়ালঘেঁষা টেবিলের এক কোণায় । প্লাগপয়েন্টটা ওইখানে কিনা, তাই । 

অরুণার গান । এখন সে বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী । কত সিডি বেরিয়েছে ইতিমধ্যেই । তাছাড়া টিভিতেও প্রোগ্রাম থাকে মাঝেমধ্যেই । অন্য নানা জায়্গায় তো থাকেই । 

অরুণা আমার বন্ধু ছিল স্কুলজীবনে । ও তখন থেকেই খুব ভালো গান গাইতো । নানা জায়গা থেকে ডাকও পেত গান গাইবার । সেসময় আমিও … থাক সে কথা । 

ওর গান শুনতে শুনতে গুণ্‌গুণাই । গান আমার রক্তে চলে যায়, সুর আমায় পাগল করে দেয় । এই এত সকাল ছাড়া তো সুরে পাগল হবার ফাঁক নেই এই সংসারে! তাই এই সকালটুকু! 

অতীন এখনো ওঠে নি, সে উঠলেই ব্যস্ততা আর হাঁকাহাঁকির চোটে সব সুর মাথায় উঠবে । তারপরে ও বেরিয়ে গেলে মিতুল আর ছোটনকে ওঠানো, স্কুলের জন্য তৈরী করা । তারপরে টুম্পা মানে কাজের মেয়েটি আসবে, দুধ দিতে আসবে পল্টু । তারপর শাশুড়ী-মা উঠবেন, তাঁর আবার বাতের ব্যথা, গরম জল করে দিতে হবে । কাজ অনেক, তবে এখন সব রুটিনের মতন হয়ে গেছে আমার । পরপর সব যন্ত্রের মতন করে যাওয়া । 

টুম্পা এসে গেলে অবশ্য একটু হাল্কা লাগে, ও যতক্ষণে বাসনপত্র মেজে ধুয়ে ঝাড়পোঁছ করে রাখে, ততক্ষণে মিতুল ছোটনকে স্কুলবাসে তুলে দিয়ে ফিরে আসি বড় রাস্তার মোড় থেকে । তারপরে শুরু হয় দুপুরের রান্নার যোগাড়যন্ত্র । টুম্পা আনাজ টানাজ কেটে, ধুয়ে মশলা বেটে দিয়ে চলে যায় । তারপর রান্নাটা আমার । 

এই ভোরে যখন কেউ ওঠেনি, তখন আরেকটা ছোটোখাটো রান্না । অতীনের টিফিন বানানো । ঝাঁঝ-ঝাঁঝ সর্ষেবাটা আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে দিয়ে আলু-টোম্যাটোর তরকারি রাঁধি যত্ন করে, রুটি বানাই । ও তো সকালের খাওয়াটুকুও খেয়ে যেতে পারে না, শুধু চা-বিস্কুট খেয়েই দৌড় । সেই দুপুরে বারোটা কি সাড়ে বারোটায় এই রুটি-তরকারিটুকু খাবে । 

মাঝে মাঝে খুব মনখারাপ লাগে । আচ্ছা, আমাদের অবস্থার একটু ভালোর দিকে পরিবর্তন কি হতে পারে না? অতীনকে এত অমানুষিক পরিশ্রম তাহলে করতে হতো না! 

আহা, আমার নিজেরও যদি কিছু কাজের উপায় থাকতো! কিন্তু সংসারের কলে এমনভাবে বাঁধা পড়ে গিয়েছি, বাইরে গিয়ে কাজকর্ম খোঁজার ফুরসৎ কোথায়? আর ঘুমভাঙা থেকে ঘুমিয়ে পড়া ইস্তক সংসারের ব্যাপারে হাজার হ্যাপা সামলাতে সামলাতে বাইরের জগতে গিয়ে কেরিয়ার তৈরী করার মনটাও কেমন যেন ঘুমিয়ে পড়েছে । প্রথম প্রথম কিছু চেষ্টা যে করিনি তা নয়, কিন্তু অতীন আর শাশুড়ী-মা, কেউই সেভাবে মন খুলে সে চেষ্টাকে সমর্থন করেনি । 

তরকারিটা হয়ে এসেছে । হাত-আছড়া জল দিয়ে ঢাকনা চাপিয়ে আঁচ ঢিমে করে দিই । আটা মাখাই ছিল, এইবারে রুটিগুলো বেলে ফেলি, ঝটাঝট তাওয়ায় গরম করে ঝাঁঝরিতে দিয়ে একে একে ফুলকো রুটি করি । এই ফুলকো হয়ে ওঠাটা দেখতে ভারী মজা লাগে । আজও । 

সুরের একটা ঝাপটা আবার এসে লাগে, "চোখের গহীনে নীল জলে ওঠে ঢেউ .... " রুটিগুলো গুছিয়ে রাখতে রাখতে চোখের উপরে ভেসে ওঠে একটা নীল সমুদ্র, সৈকতে এসে আছড়ে পড়ছে ঢেউ, বালির উপরে সাদা ফেনার ফুল ছড়িয়ে রেখে ফিরে যাচ্ছে আবার । 

নিজের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস পড়ে । কতকাল বেড়াতে যাওয়া হয় নি আমাদের । সেই মধুচন্দ্রিমায় মধুপুর । তারপর আর সেভাবে কোথাও .... 

পুজোর ছুটিগুলো কেটে যায় নিজেদের এই ছোটো শহরেই । মিতুল আর ছোটনের অ্যানুয়াল পরীক্ষার পর বেশ লম্বা ছুটি থাকে ওদের স্কুলে, সেইসব ছুটিতেও কোথাও যাওয়া হয় না । 

ভাবতে অবাক লাগে, এই এতগুলো বছর কেটে গেল এইখানেই? অন্য বিবাহিতা মেয়েরা মাঝে মাঝে বাপের বাড়ি যায়, আমার তো সেই সুযোগও নেই । মামাবাড়ি অবশ্য আছে, মামামামীরা যেতে বলেন অনেক করে, কিন্তু আমারই আর যাওয়া হয়ে ওঠে না । মাঝে মাঝে মাকে দেখতে ইচ্ছে করে, কিন্তু মা তো সেই কতদূরে, তাঁর গুরুজীর আশ্রমে ... 

অতীনের সাড়া পাই পাশের ঘরে । ও উঠে পড়েছে । আস্তে আস্তে হাত বাড়িয়ে গান বন্ধ করে দিই । অতীন এই ব্যস্ততার সময় গান চলছে দেখলে বিরক্ত হবে । 

স্বেচ্ছায়ই বন্ধ করি, তবু প্রতিবার তবু বন্ধ করার সময় কেমন একটা কষ্ট হয় । মনে হয়, আমার অসুবিধে হবে ভেবে এ সংসারের কেউ কি নিজের কোনো শখের বা ভালোলাগার জিনিস বাতিল করে? তা তো কেউ করে না । তাহলে আমাকেই কেন শুধু নিজের ভালোলাগা বলি দিতে হয়? 

তারপরেই মনে পড়ে, সারাদিন খেটেখুটে এই যে অতীন উপার্জন করে, সেও তো আমাদের জন্যই । সেই উপার্জনের উপরে নির্ভর করেই তো আছি আমরা, তার সংসারের সবাই । তবে কোন্‌ মুখে বলি, আমি আমার শখ বজায় রাখবো, তোমার বিরক্তি কেয়ার করি না? 

অতীন এসে পড়েছে মুখটুখ ধুয়ে, চা-বিস্কুট এগিয়ে দিই তাড়াতাড়ি । ও যতক্ষণ চা খায় ততক্ষণে ওর টিফিনবাক্সে গুছিয়ে দিই রুটি-তরকারি । 

অতীন তৈরী হয়ে বেরিয়ে পড়ে । এইবারে একে একে বাকীরা সব উঠবে । রুটিন কাজগুলো সব পরের পর করতে করতে আজ যেন অদ্ভুত একটা ক্লান্তি পেয়ে বসছে । 

কত আগে গানটা বন্ধ করে দিয়েছি, তবু মনের মধ্যে তার রেশ ঘুরে ঘুরে ফিরে আসছে, বুকের মধ্যে ফিরে ফিরে ঝাপটা মারছে, "চোখের গহীনে নীল জলে ওঠে ঢেউ …" । 

অরুণার সেই কিন্নরীকন্ঠ, আহ । কবে সামনাসামনি শেষবার শুনেছিলাম? স্কুলের শেষ বছরে কি? উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার আগে? হুঁ, আগেই হবার কথা । পরীক্ষার পর ওকে আর দেখেছি কি? হ্যাঁ, রেজাল্টের দিন, মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য । তারপর তো ও চলে গেল দূরের শহরে, সেখানের কলেজে পড়তে । আমার দূরে যাওয়া হয় নি । নিজেদের ছোটো শহরের কলেজেই ভর্তি হলাম । পরিচিত পৃথিবীর ছোট্টো গন্ডীটুকুর বাইরে আর ডানা মেলা হল না । 

অরুণার সঙ্গে প্রথম প্রথম যোগাযোগ ছিল চিঠিতে আর ফোনে, তারপর আস্তে আস্তে কখন যেন কমে গেল সব । একসময় যোগাযোগ ছিন্নই হয়ে গেল । 

তারপরে, অনেকদিন পরে, আবার ওকে ফিরে পেলাম টিভি আর রেডিওর গানের অনুষ্ঠানে । ততদিনে ওর গানের কিছু কিছু রেকর্ডও বেরিয়েছে । খুঁজে খুঁজে সব সংগ্রহ করলাম । 

ওর গান শুনলেই যেন হারিয়ে যাওয়া কিশোরীবেলাটা ফিরে আসে, যখন দিনগুলো ছিল তরতর করে বয়ে চলা নদীর মতন, প্রতিটা বাঁকের পরেই যেন অপেক্ষা করছে আশ্চর্য কিছু । তখন স্বপ্ন দেখতে ভয় ছিল না । 

তারপর কখন বাস্তব এত কঠোর হয়ে উঠল? স্বপ্ন দেখার সাহসটুকুও আর রইল না? 


২।

মিতুল আর ছোটনকে স্কুলবাসে তুলে দিয়ে ফেরার জন্য ঘুরে দেখি মোড়ের কৃষ্ণচূড়া গাছটা রাঙা ফুলে ভরে উঠেছে । মনে পড়ে এখন বসন্ত ঋতু চলছে । কতদিন ধরেই হয়তো ফুলগুলো ফুটেছে, কিন্তু আমার নিজের মনই বন্দী হয়েছিল ঘেরাটোপের আড়ালে, তাই দেখতে পাই নি । 

আজ কী যে হয়েছে ! মনে পড়ে কতকাল সেভাবে অনুভবই করা হয় না কোন্‌ ঋতু এল কোন্‌ ঋতু গেল । শুধু দিন আসে দিন যায়, দিন আসে দিন যায়, সংসারের ঘানি টেনে টেনে ফুরিয়ে যায় গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ হেমন্ত শীত বসন্ত । অথচ একসময় প্রতিটা ঋতু কী মহিমময় রূপ নিয়ে ধরা দিত! 

ভাবতে ভাবতে কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম । চোখের উপরে ভেসে উঠল একটা সবুজ পাহাড়, নুড়ি ছড়ানো একটা সরু রাস্তা উঠে গিয়েছে উপরে । রাস্তার দু'পাশে পাইনগাছের সারি । আমাদের স্কুল থেকে একবার এক্সকারশনে নিয়ে গিয়েছিল দার্জিলিং এ, সেই সময়ের স্মৃতি । কবেকার কথা সেসব! বছরের হিসেবে খুব বেশি হবার কথা নয়, কিন্তু অনুভবে সে যেন গতজন্মের মত দূরে । 

হঠাৎ মনে হল একটা নীলচে কুয়াশা এসে যেন ঘিরে ফেলল আমায় । চারপাশের সব দৃশ্য মিলিয়ে গেল । আর, একটা অবাক দৃশ্য দেখলাম । বালিকাবেলায় দেখা সেই পাহাড়ী রাস্তায় গুণগুণ করে গান গাইতে গাইতে হাঁটছি । একা । 

একটু দূরে, এক সারি পাইনগাছ, তার পরেই স্বচ্ছ এক হ্রদ । সেই হ্রদের পাড়ে কে যেন বসে আছে । কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই সে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল । 

বাবা! সেই যুবক বয়সী বাবা, যে বয়সে শেষ দেখেছিলাম তাঁকে । সেই সময়েই বাবা হঠাৎ একদিন নিরুদ্দেশ হয়ে যায় । একদিন অফিসে গেল অন্যসব দিনের মতন, সবকিছু স্বাভাবিক, কিন্তু অফিস থেকে আর ফিরল না । তারপর কত খোঁজখবর করা, কত থানাপুলিশ, কত কী হল, কিন্তু বাবার আর কোনো খবর পাওয়া গেল না । 

সেইদিন বাবা অফিসে বেরিয়ে যাবার সময় হাসিমুখে টা টা করে গেল, সেই মুখটাই মনে রয়ে গেল । তখন আমার ক্লাস সেভেন । সে যে একুশ বছর আগের কথা ! 

বাবা কি তাহলে এই পাহাড়ী জায়গায় এসে থাকছিল বাকী জীবনটা? কিন্তু এত বছর পর এখনও সেই বয়সেই কী করে রয়ে গেল ? অবাক হয়ে বললাম, "বাবা! তুমি এখানে? এটা কোন্‌ জায়্গা? তুমি কি এখানেই থাকো?" 

বাবা হেসে হ্রদের অন্য পাড়ের দিকে হাত দেখাল, সেখানে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে একটা ঝর্ণা, ঝাঁপিয়ে পড়ছে হ্রদে । সেই ঝর্ণার পাশে ঝাঁপালো একটা মস্ত গাছের নিচে একটা ছোট্টো কাঠের বাড়ি । বাবা বললো, "হ্যাঁ, এইখানেই থাকি । ওই দ্যাখ আমার বাড়ি, ঝর্ণাপারে । " 

তারপর আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে হাসিমুখে বলল, "রিনি, তুই আজকাল আর গান করিস না ? কী অপূর্ব গলা ছিল তোর! আমি ভেবেছিলাম তুই গান নিয়েই কাটিয়ে দিবি সারাটা জীবন । " 

আহ, রিনি! ভুলেই গিয়েছিলাম এই নামটা । শুধু এই নাম কেন, পুরো নাম নির্ঝরিণী, সেই নামও তো মুছে গিয়েছে । মিতুল ছোটন ডাকে মা, শাশুড়ী-মা ডাকেন বৌমা, অতীন ওগো হ্যাঁগো দিয়ে চালিয়ে নেয় । সম্পর্কগুলো দিয়ে এখন পরিচয় আমার, ব্যক্তি আমি কোথাও কি আছি আর? 

ধরা গলায় অতলান্ত অভিমান নিয়ে বললাম, "তুমি তো একদিন কোথায় হারিয়ে গেলে । আমার আর গান করা হল না । মামাবাড়িতে তখন আমি আর মা আশ্রিত । পড়াশোনাটুকু কোনোক্রমে হয়েছে তাদের দয়ায় । কিন্তু গান আর হল না আমার । তুমি থাকলে গান হত, তুমিই তো আমার গানের প্রথম গুরু ছিলে । " 

এতক্ষণের অবরুদ্ধ অশ্রু আমার দু'গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে থাকে । বাবা উঠে এসে নিজের চাদরের প্রান্ত দিয়ে মুছে দিতে থাকে আমার অশ্রু । বলে, "বোকা মেয়ে, কাঁদছিস কেন? গান কোনোদিন হারায় না । তুই আবার গাইবি ।" 

কর্কশ হর্ণের শব্দে সম্বিৎ ফিরে পাই । কোথায় পাহাড়ী রাস্তা, কোথায় পাইনের সারি, কোথায় হ্রদ, কোথায় ঝর্ণা ? রাস্তার ধারের বাসস্ট্যান্ডের বেঞ্চিটাতে পড়ে আছি আমি । এখানে কখন এলাম? 

মনে পড়েছে, হঠাৎ মাথাটা ঘুরে উঠল । কাছেই ছিল এই ছাউনিওয়ালা বেঞ্চিওয়ালা বাসস্ট্যান্ড । কিন্তু কী করে এলাম এখানে? তা তো মনে পড়ছে না! 

মাথার কাছ থেকে নরম গলায় কে যেন বললেন, "এখন একটু ভালো লাগছে?" 

উঠে বসে দেখি ব্রততী পিসি! অরুণার পিসি । অবাক হয়ে গেলাম, বললাম, " পিসিমণি, তুমি ?" বলতে বলতে বুকের ভিতরটা কেমন শিরশির করে উঠল, সেই ভোররাত থেকে আজ অরুণার কথা ভাবছি, আর ওর পিসির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ? মনে পড়ল উনিও ভালো গান গাইতেন । 

"হ্যাঁ রে রিনি, আমি । এই পাড়াতেই তো মুনাই, আমার দেওরঝি ও, ওর বিয়ে হয়েছে । ওকেই দেখতে যাচ্ছি । বাস-স্টপে নেমেই দেখি সামনে তুই, মাথা ঘুরে মাটিতে--- কোনোরকমে ধরে ধরে এনে এই বেঞ্চে রাখলাম । ভাগ্যিস, আরো লোক ছিলেন, তাঁরা সাহায্য করলেন । কিন্তু তোর ব্যাপারটা কী? অসুখ বিসুখ কোনো? গা করছিস না? সেই নিয়েই সংসারের হাজার কাজ চালিয়ে যাচ্ছিস?" 

আবার রিনি! কবেকার ভুলে যাওয়া ডাকনাম! শরীর শিরশির করে ওঠে । একটু হেসে বললাম, "পিসিমণি, এমনিতে তো তেমন কিছুই হয় নি । রোজই ছেলেমেয়েকে বাসে তুলে দিতে আসি তো এখানে । হঠাৎ আজকে কেন যে মাথা ঘুরে গেল! ভাগ্যিস তুমি ছিলে! কী যোগাযোগ দ্যাখো, আজই তুমি এখানে । আমাদের বাড়ি যাবে একটু? এই তো মিনিট পাঁচ-সাতের হাঁটা পথ । " 

ব্রততী পিসি বললেন, " না রে, আজ মুনাইদের ওখানে যাবো । এখন তো চেনা হয়ে গেল, প্রায়ই আসবো । তোদের ওখানে যাবো একদিন । তোর ঠিকানাটা আর ফোন-নাম্বারটা লিখে দে তো দেখি । আর শোন, ভালো করে ডাক্তার দেখিয়ে নিস, অবহেলা করিস না, আজকাল কোথা থেকে কী হয়ে যায়।" বলতে বলতে ব্যাগ থেকে এক টুকরো সাদা কাগজ আর পেন্সিল বার করে আমায় এগিয়ে দেয় পিসি। 

কাগজে ঠিকানা আর ফোন-নম্বর লিখতে লিখতে বলি, "অরুণা এখন কোথায় পিসিমণি? কেমন আছে? প্রায়ই ওর গান শুনি নানা প্রোগ্রামে ।" 

ব্রততী পিসি বলে, "অরুণা এখন আবার ওর বাপের বাড়ির পাড়াতেই । ওর তো ডিভোর্স হয়ে গেল গত বছর । এখন পাড়াতেই নিজের ফ্ল্যাট কিনেছে, সেখানে গানের স্কুল করেছে । ও নিজে অবশ্য খুব বেশি শেখাতে পারে না, ওর ছাত্রীরা শেখায় । ওর তো এদিক ওদিক নানা প্রোগ্রাম থাকে । মাসের মধ্যে দশদিনই তো বাইরে বাইরে, নানা গানের অনুষ্ঠানে । অরুণা কিন্তু তোকে মনে রেখেছে, এই তো সেদিন তোর কথা বলছিল । দাঁড়া তোকে ওর ফোন-নাম্বার দিই, একদিন ফোন করে নিয়ে দেখা করতে যাস । এটা ওর ল্যান্ডফোন, মোবাইল ও বেশি ব্যবহার করে না, অফ রাখে বেশিরভাগ সময়েই । তবে বাড়ীর বাইরে প্রোগ্রাম থাকলে তখন … দাঁড়া ওর মোবাইল নম্বরটাও দিই । এই যে । তুই আগে ল্যান্ডফোনেই চেষ্টা করিস । " " 

বাড়ি ফিরে যত্ন করে গুছিয়ে রাখলাম অরুণার ঠিকানা আর ফোন-নাম্বার । আমার চন্দনের বাক্সে । কুমারীবেলার এই একটা জিনিসই এখনও আমার সঙ্গে আছে । বাকী সবই হয় বিয়ে উপলক্ষে পাওয়া নয়তো বিয়ের পরে পাওয়া । 

আলমারী খুলে একস্তূপ ভাঁজ করে রাখা শাড়ীর পিছন থেকে যখন ছোট্টো বাক্সটা বার করে আনছিলাম, তখন শরীর শিরশির করে উঠছিল । এই পঁয়ত্রিশ বছরের পোড়খাওয়া আমার মধ্যে যেন জেগে উঠছিল ঐ তেরো বছরের কিশোরী, সেই অদ্ভুত সময়টা, যখন সে জানতো না আর মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই নিদারুণ আঘাতে তার স্বপ্নদেখার দিনগুলো শেষ হয়ে যাবে, শুধু পড়ে থাকবে বাস্তবের আদিগন্ত ধূ ধূ বালির মরুভূমি । এতদিন পর, এত সব কষ্টপাথর আর দুঃখবালি পার হয়ে আবার কি ফিরে এল সেই দিনগুলো? 

কিন্তু রান্নাবান্না করার তাড়া ছিল, তাই বেশিক্ষণ সময় ওভাবে আলমারি খুলে দাঁড়িয়ে থাকার সুযোগ ছিল না । যেখানকার বাক্স সেখানে রেখে দ্রুত আলমারি বন্ধ করে রান্নাঘরে দৌড় । 

রান্না সারতে সারতে বারে বারে সকালবেলার স্মৃতি ফিরে আসে, কাজে অকারণ বাধা পড়তে থাকে । মনে হয় মাথা ঘুরে পড়ে যাবার ব্যাপারটা কি কারুকে জানানো উচিত? অতীনকে জানাবো? সত্যিই কি ডাক্তার দেখানো উচিত? কিন্তু আর তো কিছু হয় নি! আর তো কোনো সমস্যা হচ্ছে না! 

অতীনের ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে উতরে যায়, ক্লান্ত থাকে খুব । হাতমুখ ধুয়েই খেতে বসে যায় । হ্যাঁ, ওর রাতের খাওয়া তখনই দিয়ে দিই । সত্যি বলতে কি, দিনের মধ্যে সত্যিকার খাওয়া বলতে তো ওইটাই । তারপরে ও বিশ্রাম নিতে চলে যায় আমাদের শোবার ঘরে । টিভিটাও ওই ঘরেই । 

ছেলেমেয়েদের পড়াশুনোয় একটু সাহায্য করা, স্কুল থেকে যে হোমওয়ার্কগুলো ওদের করতে দেয় সেগুলো করতে সাহায্য করা -এতে সন্ধ্যেরাতটা কেটে যায় । ছোটন সবে ক্লাস থ্রীতে আর মিতুল সিক্সে, তাই এখনও ওদের জন্য প্রাইভেট টিউটর দরকার পড়ে নি । তবে মিতুলের হয়তো পরের বছর থেকে অন্তত অংক আর ইংরেজীর জন্য দরকার হবে । তখন আবার বাড়তি খরচ । সেটা সামলাতে চাপ পড়বে অতীনের উপর । 

তারপর খাবারদাবার গরম করে, ছেলেমেয়ে শাশুড়ী সবাইকে খাইয়ে দাইয়ে নিজে খেয়ে রান্নাঘর গুছিয়ে গাছিয়ে উঠতেই সময় যায় অনেক । ছেলেমেয়েদের ওদের ঘরের বিছানায় শুইয়ে মশারি টাঙিয়ে গুঁজে দিয়ে শাশুড়ী-মায়ের ঘরে তাঁর একটু খোঁজ নিয়ে শোবার ঘরে যেতে যেতে আমার বেশ রাতই হয় । কোনো কোনোদিন দেখি অতীন টিভি দেখছে, কোনো কোনোদিন দেখি ঘুমিয়ে কাদা । 

যেদিন জেগে থাকে সেদিন বুঝতে পারি ভালোবাসাবাসির মুডে আছে । আমার সুবিধা-অসুবিধার অবশ্য প্রশ্নই ওঠে না । ও চাইলেই তুমুল ভালোবাসাবাসি, যথাসম্ভব দাপাদাপির শেষে ক্লান্ত আর তৃপ্ত হয়ে ও ঘুমিয়ে পড়ে । তখন তো ওকে আর জাগিয়ে তুলে বলা যাবে না, "ওগো শুনছো, মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলাম আজ সকালে, বাসস্ট্যান্ডের পাশে ।" 

ভাবতে ভাবতে হাসিও পাচ্ছিল, আবার কেমন একটা বিষন্নতাও ভর করছিল । সংসারে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছি কতকাল থেকে, অথচ নিজের সমস্যার কথা বলার মতন একটা মানুষও নেই আমার? সকলেই চায় ঝামেলাহীনভাবে সেবাযত্ন পেতে । এর মধ্যে অসুখবিসুখের ঝামেলার কথা শুনলে উটকো ঝামেলা মনে হবে সবার । 

কিন্তু কেন যেন বিষন্নতা বেশীক্ষণ ধরে রাখতে পারল না আমায়, মনে হচ্ছিল একটা কিছু পরিবর্তন হতে চলেছে জীবনে, খুবই শীগগীর । রান্নাবান্না সেরে স্নানটান করে শাশুড়ী বৌয়ে দুপুরের খাওয়া সেরে উপরের শোবার ঘরে যখন দুপুরের বিশ্রাম নিতে ঢুকলাম তখন বেলা প্রায় দেড়টা । 


৩। 

অরুণার ল্যান্ডফোনের নম্বর টিপে ফোন কানে নিয়ে দুরুদুরু বুকে বসে থাকি । ওপাশ থেকে আবছা একটা "হ্যালো" আসে । কাঁপা গলায় বলি, " হ্যালো, অরুণা চৌধুরী ? " 

ওপাশের গলাটি বলে, "একটু ধরে থাকুন, ডেকে দিচ্ছি ।" 

একটু পরে ওপাশ থেকে স্পষ্ট গলায়, "অরুণা চৌধুরী বলছি । " 

শোনামাত্র অদ্ভুত শিহরণে কেঁপে উঠল আমার জগৎ । অরুণার গলা, সেই অরুণা । সরাসরি যার গলা শেষবার শুনেছি উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্টের দিন । ষোলো বছর আগে । 

মাঝের বছরগুলো যেন কুয়াশার মতন মিলিয়ে যাচ্ছে, সেই অবাক কৈশোরে ফিরে গিয়ে আমি বলে উঠি, "অরুণা, আমায় চিনতে পারছিস না? আমি রিনি, নির্ঝরিণী । " 

ওপাশে উচ্ছ্বসিত ঝর্ণার মতন হয়ে ওঠে অরুণার গলা, "রিনি!!!! কত্তদিন পর । জানিস, প্রায়ই তোর কথা মনে পড়ে । কী অপূর্ব গাইতিস তুই সেই বারো-তেরো বছর বয়সেই । সেই সব গান এখনও আমার মনে আছে । কোথা থেকে বলছিস রিনি? আমার ফোন নম্বর পেলি কেমন করে? " 

বললাম সকালের কাহিনি । 

অরুণা বলে, "তুই কবে আমার এখানে আসবি বল । আমার এখন আগামী সাতদিন কোথাও কোনো প্রোগ্রাম নেই । আমার গানের স্কুল বিকেলে আর সন্ধ্যায় । আমার ছাত্রীরাই শেখায়, আমি মাঝে মাঝে একটু দেখাশোনা করি । টানা এতদিন বাড়িতেই তো থাকি না, গানের প্রোগ্রাম থাকে এদিক ওদিক । তুই আগামীকাল দুপুরে চলে আয় । না বলিস না রিনি, এতদিন পরে এমনিভাবে যোগাযোগ হওয়া মানে হল তোর আর আমার দেখা হওয়া দরকার ।" 

এমন করে বলতে শুধু অরুণাই পারে, ও বদলায় নি বিশেষ । আমার রাজি হতে হল । ও ভালো করে বুঝিয়ে বলে দিল কোথায় ওদের ফ্ল্যাট । আমার চিনতে অসুবিধে হল না , আমাদের পুরনো পাড়াই তো। ক্লাস সেভেন অবধি তো ওই পাড়াতেই থাকতাম । তারপরে থাকতাম না ঠিকই, কিন্তু নিয়মিত স্কুলে তো যেতাম ! ওইখানেই তো আমাদের স্কুল । অরুণা যে বহুতলের ফ্ল্যাট কিনেছে, সেইগুলো নতুন হয়েছে, এই যা । 

রাত্রে অতীন জেগেই ছিল, ভালোবাসাবাসি-পর্ব হয়ে গেলে ওকে বললাম, "অতীন, আমার স্কুলবেলার এক বান্ধবী নেমন্তন্ন করেছে, আগামীকাল দুপুরে ওর ওখানে যেতে । বেশিদূর না, আমাদের স্কুলের পাড়ায় । " 

অতীন অপ্রত্যাশিতভাবে রেগে গেল, সোজা উঠে বসল । কড়া গলায় বলল," না, বান্ধবীর বাড়ি যেতে হবে না । সংসার তোমার প্রধান দায়িত্ব । ছেলেমেয়ের দায়িত্ব, শাশুড়ী দায়িত্ব---তোমার যাওয়া হবে না। বুঝতে পেরেছ? " 

আমি একেবারে থ হয়ে গিয়েছিলাম । এইরকম কথা অতীনের মুখ থেকে শুনবো ধারণাই ছিল না আমার । কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলাম । তারপর বললাম, "আমি যে কথা দিয়েছি ?" 

অতীন আরো রেগে গেল, কেটে কেটে বলল, "নিজের ওজন না বুঝে কথা দিয়ে ফেলা উচিত নয় । যা হয় একটা কিছু বলে কাটিয়ে দিও । ছেলেমেয়ের পরীক্ষা, শাশুড়ীর অসুখ- যা হয় । মোট কথা, তোমার যাওয়া হবে না । আমি আর কথা বাড়াতে চাই না । এইবারে ঘুমের চেষ্টা করি, কাল আবার সকালে ওঠা। " এই বলে দিব্যি পাশ ফিরে গায়ে চাদর টেনে ঘুমিয়ে পড়ল । 

আমার ঘুম এলো না । নিঃশব্দে মশারির প্রান্ত তুলে বেরিয়ে এলাম । জানালার একটা পাল্লা খুলে সেই খোলা পাল্লার সামনে একটা টুলে বসে রইলাম, চরাচরব্যাপী অন্ধকারে দৃষ্টি মেলে ঘন্টার পর ঘন্টা । 

অন্ধকারের মধ্যে একের পর এক ছবি ফুটতে থাকে স্মৃতি থেকে । নতুন গোলাপী ফ্রক পরা এক বালিকা, বছর ছয় কি সাত বয়স, বাবার হাত ধরে পূজামন্ডপে যাচ্ছে ঠাকুর দেখতে । আর একটা ছবি আসে, সেই বালিকাই, আর একটু বড়, বাবার সঙ্গে রেওয়াজে বসেছে । লাল মেঝের উপরে পাতা সাদা কালো ছক কাটা শতরঞ্চিটা, তার উপরে বাবা আর মেয়ে বসেছে হারমোনিয়ম নিয়ে । বিকেলবেলা তখন, কোথা থেকে জুঁইফুলের গন্ধ আসছে । কী স্পষ্ট হয়ে এল ছবিটা ! কোথায় ছিল এই দৃশ্য ? স্মৃতির কোন্‌ কুঠুরিতে? 

অশ্রুতে ঝাপসা হয়ে যায় স্মৃতিচিত্রমালা । আবার সেই মাথাব্যথাটা ফিরে আসে । তারপরে আবার সেই সবুজ পাহাড়, সেই হ্রদ, সেই পাইনের বন, সেই ঝর্ণা । সেই ঝর্ণাপারের বাড়িটা । সকালের সোনালি আলোয় ছলছল করছে সব । আকাশটা নীল, অপরাজিতাফুলের মত নীল । 

পায়ে চলা একটা সরু পথের রেখা ঘাস আর লতাপাতার মধ্য দিয়ে । সেই পথে এগিয়ে যেতে থাকি ঝর্ণাপারের বাড়ির দিকে । আর একটু কাছাকাছি হতেই শুনতে পেলাম গান, বাবার গলায় । আর একটুখানি, একটুখানি । বাবা কী অবাকই না হবে আমায় দেখে ! 

আপনমনে গুনগুন করতে করতে এগিয়ে যেতে থাকি । সংসারের সব কঠিন বাধা পার হয়ে, সুরহারা নিষ্ঠুরতা পার হয়ে এগিয়ে চলি সুরের দিকে, ভালোবাসার দিকে, আনন্দঝর্ণার দিকে । আর তো দেরি নেই, আর তো দেরি নেই সুরলোকের দরজায় পৌঁছনোর! 

৪টি মন্তব্য:

  1. চমৎকার লিখনী। অনেক সুন্দর সেটিং লেখাটিকে মজবুত করেছে। বর্ণনাতো মনমুগ্ধকর।

    উত্তরমুছুন
  2. অনেক ধন্যবাদ। ধন্য হল এই ক্ষুদ্র লেখনী।

    উত্তরমুছুন
  3. আমি আপনার সবকয়টি গল্প পড়া শুরু করেছি। এমনকি ভক্ত হয়ে গেছি। যদিও আমি বেশির ভাগ সামহোয়্যার ইন ব্লগেই থাকি।

    উত্তরমুছুন
  4. শুনে খুবই আনন্দ পেলাম। কেমন লাগল, জানাবেন প্লীজ।

    উত্তরমুছুন