শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

রুমা মোদক'এর গল্প : ছিন্ন পাতার ডায়েরি

৫ মে ২০১৭

কনে দেখা আলোর মোহময় রঙে নববধু মুক্তির ঘরে আসার কথা। যখন পশ্চিমাকাশে রক্ত জমাট বাঁধে সোহাগের কামড়ে, দিনমান ক্লান্তি গাছের ডালপাতা বেয়ে শ্রান্ত মাটিতে নেমে জিরিয়ে নেয়। নীড়ে ফেরা পাখিদের কলকাকলিতে ১ ক্রমশ নীরবতায় ডুবে যেতে থাকে চারপাশ। বউ সহ বরযাত্রীর দল যখন সুনামগঞ্জ থেকে রওয়ানা হয়েছিলো, সময়ের হিসাবটা এমনই ছিলো। যখন রওয়ানা হয় আকাশে তখন ঝলমলে রোদ, আকাশ স্বচ্ছ নীল। সুনামগঞ্জের হাওড়গুলোর জলরাশির মতো, যেগুলোর ঠিকানা সভ্য মানুষদের জানা নেই ।

বরের বাড়িতে তৈরি ছিলো পাড়া-পড়শি, বাজনাদারের দল। কিন্তু কয়েক ঘন্টার পথ পাড়ি দিতে না দিতে এদিকে আকাশ ঢেকে গেলো কালো মেঘে। বৈশাখী মেঘ। ঝড়ো হাওয়ায় দুলতে লাগলো রান্নাঘরের পেছনে সুপারির খাড়া শরীর, ভেঙে পড়লো ঠাকুরঘর লাগোয়া আম গাছের কচিআম সমেত আমের ডাল। শাঁখ, উলুধ্বনি সবই হলো বটে, কিন্তু বাতাসের শো শো আর তুমুল ঝড়ের আশঙ্কার সাথে মিশে গেলা ত্রস্ত ব্যস্ততা। সন্ধ্যার সন্ধ্যার আগে আগে কোনরকমে নতুন বউ মুক্তিকে ঘরে তোলে দিয়ে সবাই পালালো, যার যার ঘরমুখী। এই আসন্ন বিপদাশঙ্কায় নিজেদের ঘর সামলানোটাই আগে জরুরী বেশি।

মুক্তিই প্রথম সন্দেহ জানিয়েছিলো রাজীবকে। ঘটনাটা তার কাছে সুবিধার মনে হচ্ছে না। বিয়ের মাসখানেক পর। ভাঁড়ার ঘরে দেখেছে একজন আরেকজনের হাত ধরেছে। রাজীব গায়ে বসা তুচ্ছ পোকার মতো উড়িয়ে দিয়েছিলো কথাটা। দূর এটা কখনোই হতে পারে না। তিরিশ বছর ধরে ঘরে আসে যায় তাজুল, ঘরের ছেলের মতোই। মুক্তির অনভ্যস্ত দৃষ্টিতে হয়তো এই স্বাভাবিকতাই অস্বাভাবিক ঠেকেছে। মনি তাজুলের থেকে কম করে দশ বছরের ছোট, এটা কী করে হয়! রাজীব নববিবাহিত স্ত্রীর প্রতি কঠিন হতে পারে নি বটে। তবে তার সন্দেহের দৃষ্টিটাকে আমলেই আনে নি। মুক্তি তাই হয়তো সাহস করে নিজের মানসিক প্রস্তুতিটা প্রকাশ করে ফেলেছিলো নিঃসংকোচে, হইলেই কি করবেন, ভালবাসায় সাত খুন মাফ। আর যায় কই। তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছিলো রাজীব। অসম্ভব এইডা হইতেই পারে না। মুক্তি বোকার মতো হিসাব মিলাতে চেয়েছিলো, এ কেমন কথা! ঘরে আসবে যাবে খাবে,প্রেম করলেই দোষ। কিন্তু তেলেবেগুনে জ্বলে উঠা রাজীবের ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়ায় নিজের বোকা বোকা ভাবনার পানি ছিটিয়ে আর উত্তেজিত করতে চায়নি তৎক্ষণাৎ। কিন্তু এই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠা ক্রুদ্ধতার আগুন এমন দাউদাউ জ্বলে উঠবে সেদিন ভাবতে পারেনি মুক্তি। আর এর ফলে এমন তছনছ হয়ে যাবে ভূত ভবিষ্যত সব, সেদিন বাড়িতে নবাগত মুক্তি এটা আন্দাজই করতে পারে নি। 

সেদিন রাতে নদীর উপর নতুন নির্মিত ব্রিজে পাশাপাশি বসে সিগারেট টানতে টানতে জীবনের টানাপোড়েন, পাওয়া না পাওয়ার হিসাব করছিলো দু বন্ধু প্রতিদিনের রুটিন মতোই। রাজীবের কী খেয়াল হলো হঠাৎ, 

বোধহয় বন্ধুর বিশ্বস্তটা একটু ঝালাই করতে চাইলো, বিণাকারণে প্রসঙ্গ তুললো সে, মনিরে অহন বিয়া দেওয়া দরকার, কিতা কস তাজুল? প্রসঙ্গহীন হঠাৎ মনির প্রসঙ্গে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো তাজুল। ভ্যাবাচেকার টাল সামলাতে না পেরে হাত থেকে পড়ে জ্বলন্ত সিগারেট ব্রিজের লোহার ফাঁক গলে নদীর গ্রোতের সাথে ভেসে গেলো ভাটির দিকে। রাজীব কী বুঝলো কে জানে। নিজের জ্বলন্ত সিগারেটটাও ছুঁড়ে মারলো নদীর জলে। বহমান নদীর ¯্রােত উজান থেকে নেমে স্বাভাবিক নিয়মেই সিগারেট দুটো সাথে নিয়ে চলতে থাকলো ভাটির দিকে। সেদিন প্রথমবারের মতো এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে একা ফেলে বাড়ি ফিরলো।

সে রাতে ভাত খায়নি রাজীব। মুক্তির অনেক পীড়াপীড়িতেও না। মনি এসেছিলো একবার ডাকতে। চেয়ারে গুম মেরে বসে থাকা রাজিব হঠাৎ ঘুরে গায়ের জোরে থাপ্পড় লাগিয়েছিলো মনির গালে। আকস্মিকতায় মনি নিজেকে সামলাতে না পেরে পড়তে যাচ্ছিলো খাটের কোনায়। রক্তারক্তি হবার কথা। মুক্তি গায়ের জোরে জড়িয়ে ধরে রক্ষা করেছিলো সে ১ রাতে। রাত গভীর হলে, দূরের উঠান থেকে ভেসে আসা কুকুরের একটানা আর্তনাদের মতোই ভয়ার্ত সুরে আদেশ দিয়েছিলো মুক্তিকে, তাজুল য্যানো আর এ বাড়ির ত্রিসীমানায় না ঢুকে।

নববিবাহিতা মুক্তির শরীরে তখন নতুন অভ্যস্ত সোহাগের ডাক। অবাধ্য শরীর কাঁপে, সে একবার হাত রাখে রাজিবের গায়ে। সাপের মতো ঠান্ডা শীতল শরীর, পাশ ফিরে চুপচাপ শুয়ে পড়েছিলো সে। 


১লা জুলাই ২০১৮, আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, সুনামগঞ্জ। 

‘পুরুষ’ এবং ‘মহিলা ও প্রতিবন্ধী’ ‘হজ্বযাত্রী’ তিনটি পাশাপাশি সাইনবোর্ডের সামনে পাশাপাশি তিনটি সারি। সামনে কাউন্টার। কাঁচের আড়াল। গলার আওয়াজটুকু বাইরে বের করে দেয়ার জন্য কাঁচের দেয়ালের মাঝ বরাবর গোলাকৃতি ফোঁকড়ও। আর নীচে, যেখানে কাঠের রেলিং এর উপর থেকে কাঁচের দেয়ালের শুরু, সেখানে অর্ধডিম্বাকৃতি ফাঁক। হাত ঢুকানো যায় মতো আয়তন। পুরুষদের সারিতে গোটা বিশেক পুরুষ আর নারী ও প্রতিবন্ধী লাইনে প্রতিবন্ধীহীন পাঁচ সাত জন নারী। কাউন্টারের ভেতরে দুটো চেয়ারে বসে নাম ডেকে চলছে যে দুজন, তাদের মুখে সংসারের বদমেজাজী কড়া কর্তার মতো  বিরক্তি। যেনো বহন করার ক্ষমতার চেয়ে বেশি দায়িত্ব তার কাঁধে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এই দায়িত্ব ছেড়ে যেতে পারলে বাঁচে তারা। সামনে সারিবাধা প্লাস্টিকের চেয়ারে জনা পঞ্চাশেক পুরুষ-নারী অপেক্ষারত।

কাঁচের ফোঁকড় গলে নিজের নামটা কানে আসা মাত্রই আমি আমি....চিৎকার করে এক ঝটকায় উঠে দাড়ায় রাজীব। ওর চিৎকার সম্মিলিত ফিসফাসে এতোটাই বেমানান প্রতিধ্বনিত হয় সবাই চমকে তাকায় ওর দিকে। ত্রিশোর্ধ পুরুষের একী শিশুতোষ আচরণ। রাজীব টের পায় চিৎকারটা একটু জোরেই হয়ে গেছে। মিনিটখানেক আগে পর্যন্ত ওর ভেতরের উৎকন্ঠাটা এই মূহুর্তে হঠাৎ ফেটে যাওয়া পানির পাইপের মতো ছিটকে উঠেছে আনন্দের উচ্ছ্বাসে।

চেয়ারে বসে বসে ঘামছিলো রাজীব যদিও মাথার উপর ফ্যানগুলো নিয়ম করে বাতাস দিচ্ছিলো ঠিকই। এ ঘাম যতোটা ভ্যাপসা গরমের ততোটাই উদ্বিগ্নতার। লাইন ঠেলে সামনে আগায় সে। ফাঁক ফোঁকড় গলে বেরিয়ে আসা এসির ঠান্ডা বাতাসের কারণেই হোক কিংবা কাক্সিক্ষত পাসপোর্টগুলো হাতে পাবার কারণেই হোক শীতল স্বস্তিতে ডুবে যায় সে। কাগজে সাইন করে তিনজনের পাসপোর্ট হাতে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে রাজীব চন্দ্র দাস।

অনেক প্রতীক্ষিত পাসপোর্ট। হাতে পাওয়ার আগে পর্যন্ত কেবলই মনে হচ্ছিলো যদি কোন কারণে না পাওয়া যায়। গতকাল মোবাইলে এস.এম.এস আসার পরও সন্দেহের ধুকপুকানি থামছিলো না। যদি আনতে যাওয়ার পর বলে আসে নি, কিংবা পাওয়া যাচ্ছেনা। কম ধকল আর দুশ্চিন্তা পার করে নি সে এগুলোর জন্য।

গেটের বাইরে সারিবাধা সুপারি গাছ। ছাল-বাকলা উঠানো অর্জুন গাছ। দুটো কৃষ্ণচূড়া, ফুলে ফুলে লাল হয়ে ছড়িয়ে আছে ডালপালা। নীচে একটা চায়ের টং। চা, বিস্কিট, কেক, সিগারেট। এক কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে নিজেই ফিল্টার থেকে একগøাস পানি খায় রাজীব। খাঁ খাঁ ভেতরটায় যেনো আর্দ্রতার বর্ষা নামে তিনটা পাসপোর্ট হাতে পেয়ে। এর জন্য কতো বড়ো সিদ্ধান্ত আটকে আছে তার। 

পাসপোর্ট জমা দিতে আসা, নিতে আসা দু কিসিমের মানুষের ভীড় এখানে। দালালদের উৎপাত, পুলিশ ভেরিফিকেশনের ভোগান্তি নানান রকম আলোচনা। দু বছরের চুক্তিতে দুবাই যাবে একজন, লাল মেহেদীতে পাকা দাড়ি চুল লাল, চোখে উজ্জ্বল দপদপে স্বপ্ন। পাশেরজন হতাশ সুরে নিবিয়ে দিতে চায় স্বপ্নের বাতি, এই বয়সে আফনে বিদেশ গিয়া কিতা করবাইন? লোকটির স্বপ্ন দপ করে নিভে গিয়ে আবার জ্বলে উঠে, গিয়া দেইখ্যা আই এখবার। স্বপ্নের আভা তার সদ্য মেহেদি করা চুল দাঁড়িতে চমকায় অজানা ভবিষ্যতের সুখ স্বপ্নে। বেঞ্চের এক কোনে বসে চুপচাপ চায়ে বিস্কিট চুবিয়ে খেতে খেতে শোনে রাজীব। কতো মানুষের জীবনে কতো হিসাব, উপর থেকে কেবল কথা শোনে কতোটাই বা এর বুঝা যায়? নিজের পাসপোর্ট গুলো হাতে নিয়ে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখে সে। এখানের কেউ কী জানে এগুলোর ভেতরের সকল গল্প, অতীত থেকে অনাগত ভবিষ্যতের গল্প?


১লা জুলাই ১৯৪৭ 

ললিতা আর সুনীল জিতেন্দ্র বিহারী দাসের একমাত্র ছেলে আর মেয়ে। একদল লোককে বাবার সাথে বাড়িতে ঢুকতে দেখে দৌড়ে উঠান থেকে বারান্দা পেরিয়ে বৈঠকখানা হয়ে অন্দরে ঢুকে যায়। ভেজিয়ে দেয় বৈঠকখানা আর অন্দরের মাঝখানের দরজাটা। জিতেন্দ্র বিহারীর স্ত্রী কাঠের জলচৌকিটা নিয়ে বসে পড়ে ভেজানো দরজার আড়ালে। ললিতা একটু বিরক্ত হয়, তুমি কি বুঝবা মা এরার শলা-পরামর্শ? আমার চুলে দুইডা বেনী পাকাইয়া দেও। ছেলেটা ঘ্যানঘ্যান করে,অমা খিদা লাগছে, গুড় মুড়ি দিবা? ছেলে মেয়ের কথায় কান দেয়ার সময়-সুযোগ-ইচ্ছা কোনটাই এখন নেই জিতেন্দ্র বিহারীর স্ত্রী প্রফুল্ল দেবীর। আজ এই বৈঠকখানার আলোচনার উপর অনেক কিছু নির্ভর করছে নিয়তির, শুধু এটুকু বুঝে সে। ইতিহাসের গতি-প্রকৃতি বুঝার মতো বুঝজ্ঞান তার নেই। দরকারও নেই। কিন্তু গত কদিন অনবরত জিতেন্দ্র বিহারীকে বুঝিয়েছে সে। কাজটা ঠিক করছে না জিতেন্দ্র বিহারী। কিন্তু জিতেন্দ্র বিহারী অনড়। 

বৈঠকখানার লম্বা ঘরের এক কোনায় কালো মেহগনি কাঠের একপায়া গোলটেবিলে কুর্শিকাঁটায় বোন নকশা করা ঢাকনা। কাঁসার জগে ডাবের জল আর রেকাবিতে নকশাকরা ঢাকনায় ঢাকা ঘরে তৈরি ক্ষীরের সন্দেশ। কয়েকটা কাঁসার গøাস উল্টে রাখা ট্রেতে। সারি সারি করে রাখা মেহগনি কাঠের চেয়ার। শুধু চেয়ারগুলোর নীচে মখমলের মাদুর। সামনে পুরো ঘরময় বিছানো শীতল পাটিগুলোও দখল হযে যায় নিমিষে। এ পাড়ায় কয়েকশ নমশুদ্র পরিবার। প্রায় প্রতি গোষ্ঠীঘর থেকে একজন মুরুব্বী উপস্থিত হয়েছে আজ এখানে।

এরা কেউ কৃষক, কেউ পার্শ্ববর্তী সূত্রধর পাড়ায় কাঠের চেরাই কলে কাঠ চিরে। কেউ দিন শ্রমিক। মহকুমা শহরের বর্ণহিন্দুদের বাড়িতে গৃহপরিচারক আর নারীরা গৃহপরিচারিকার কাজও করে। এদের নির্দিষ্ট কোন পেশা নেই। দিন আনে দিন খায়। সূর্যের আলো ফোটার সাথে সাথে এরা বেরিয়ে পরে জীবিকার সন্ধানে। হাতে গোনা গুটিকয় কৃষক। আর বাদ বাকি সবাইকে জীবিকার সন্ধানে ছুটতে হয় মহকুমা সদরের দিকে। পাড়া থেকে বেরিয়ে কয়েকমাইল ক্ষেতের আল আর কাঁচামাটির রাস্তা পেরিয়ে শহরে ঢোকার প্রান্তের রাস্তা ছুঁতে প্রায় ঘন্টা লেগে যায়। সন্ধ্যায় ক্লান্ত শ্রান্ত বাড়ি ফেরে কুপির আলোতে শুটকি ভাত কিংবা মরিচ পোড়া ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে যায় সবাই। কখনো কেরোসিনের অভাবে কারো ঘরে ঘরে কুপিও জ্বলে না। ভাত নিয়ে তারা বারান্দায় বসে, মাথার উপর খোলা আকাশের হিসেবহীন উদার আলোর ভরসায়। শুক্লপক্ষ হলে তো কথাই নেই, কৃষ্ণপক্ষেও আকাশ তার নিজস্ব আলো থেকে বঞ্চিত করেনা বঞ্চিত মানুষগুলোকে।

বঞ্চিত মানুষদের পাড়ার এক বেখাপ্পা সফল মানুষ এই জিতেন্দ্র বিহারী দাস। প্রাইমারি স্কুলের প্রাচীর ডিঙিয়ে মহকুমার জুনিয়র স্কুল, এমনকী সিলেট জেলা সদরের কলেজেও সে পড়েছে, মাথার জোরেই পড়েছে। আর মাথার জোরেই ১৯৩৭ সালে আসাম পার্লামেন্টারি মেম্বারও নির্বাচিত হয়েছিল সে। এই সিলেট অঞ্চলে লক্ষাধিক তফসিলী স¤প্রদায়ের লোকের বাস। জিতেন্দ্র বিহারী দাস তাদের নেতা, শুধু তাদের বলাটা আসলে ঠিক নয়, সে পুরো আসামের তফসিলীদের নেতা। আসাম তফসিলী জাতি ফেডারেশানের সাধারণ সম্পাদক।

আজ এই বৈঠকখানায় মিটিং এ বসার আগে দিল্লীতে শেষবারের মতো পারস্পরিক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে দেশ হবে দুটো, হিন্দুস্থান ও আর পাকিস্তান। রেডক্লীফ সীমানা নির্ধারণের কাজে খাওয়া ঘুমহীন দিন পার করছেন। শুধু অনির্ধারিত ঝুলে আছে আসামের সিলেট জেলার ভাগ্য। ৬ ও ৭ জুলাই গণভোটে নির্ধারিত হবে ওরা কোনপক্ষে যাবে।

সিলেট শাহী ময়দানে স্বয়ং জিন্নাহ এসে এই অঞ্চলের মানুষকে অনুরোধ জানিয়ে গেছে পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দেয়ার জন্য। আগামীকাল আসছেন বাকেরগঞ্জের প্রখ্যাত নেতা শ্রী যোগেন মন্ডল। তার আগমন উপলক্ষেই এই সভা। রাতের খাবার না খেয়েই আজ নমশুদ্র পাড়ায় পুরুষগুলো এসে জমায়েত হয়েছে জিতেন্দ্র বিহারীর বৈঠকখানায়। লম্বাটে ঘরটায় কড়িকাঠে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে গোটা ছয়-সাতটা হ্যাজাক বাতি। আলো ছড়িয়ে পড়েছে ঘরময়। বাইরে উঠানের এক কোনায় জমায়েত হয়ে নিশ্চুপ বসে আছে জনাকয় কৌতুহলী নারী। শহরে সম্ভ্রান্ত হিন্দুদের দেশছাড়ার বেদনা-উৎকন্ঠা-হাহাকার সংক্রমিত হয়েছে তাদের মাঝে। রাজ্যের ক্লান্তি নিয়েও ঘরের চাটাইয়ে শুয়ে ঘুম আসছিলো না তাদের। 

মাঝের চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন জিতেন্দ্র বিহারী। পাশের চেয়ারে বসে আছেন সিলেট রেফারেন্ডাম বোর্ডের সভাপতি আব্দুল মতিন চৌধুরী। তার পাশে সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট আব্দুল হাফিজ। দাঁড়িয়ে যোগেন মন্ডল সম্পর্কে সমবেত জনসমাবেশকে ধারণা দিলেন জিতেন্দ্র বিহারী দাস। বর্ণহিন্দুদের নিপীড়নের বিপরীতে বহুজনবাদী রাজনীতির প্রবক্তা শ্রী যোগেন মন্ডল। এই বর্ণহিন্দুদের দল কংগ্রেস কখনোই দলিত নিচুশ্রেণিকে কিছুই দেবে না। হিন্দুস্তানে গেলে এই নীপিড়িত নির্যাতিত জীবনই মেনে নিতে হবে তাদের। কখনোই শিক্ষার আলো কিংবা অর্থের প্রাচুর্য তাদের ঘরে ঢুকতে দেবে না বর্ণহিন্দুরা। বরং মুসলমানদের সাথে গেলে তারা বৈষম্যহীন সুযোগ লাভের অধিকারী হবে। কারণ বঞ্চিত মুসলমানেরাই কেবল বঞ্চিত নি¤œবর্ণের হিন্দুদের দুঃখ উপলব্ধি করতে পারবে। কাল যোগেন মন্ডলের সভায় তাই সবাইকে শপথ করতে হবে পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দেয়ার। বক্তব্য দেন রেফারেন্ডাম বোর্ডের নেতারা। সমবেত নমশুদ্ররা একমত হয়, সত্যিতো কী পেয়েছে তারা বর্ণহিন্দুদের কাছে। কারো ঘরের বারান্দায় উঠা যায়না। জলের গøাসটায় জল এমনভাবে ঢেলে দেয় যেনো ছোঁয়া না লেগে যায়। তাদের জন্য থালা বাটি সব আলাদা উঠানের এক কোনে আলাদা করে রাখা। এসবই এতোদিন স্বাভাবিক মনে হতো এদের। কিন্তু এ যে ঘৃণা এ যে বৈষম্য জিতেন্দ্র বিহারী বাবু না থাকলে আর এই রেফারেন্ডাম না হলে তাদের জানাই হতো না কোনকালে। 

নেতারা বিদায় নিয়ে চলে গেলে, বৈঠকখানায় হ্যাজাক লাইটগুলো নির্দিষ্ট দূরত্বে এনে রাখা হয় উঠানের মাঝ বরাবর। লম্বা বাঁশ পেতে দেয়া হয় দু পাশে। একজন পেতে দেয় কলাপাতা, বাঁশের উপর পা ঠেস দিয়ে পাছা লাগিয়ে সবাই বসে পরে সারিবদ্ধভাবে। কলাপাতায় সাদা ভাত, মাসকালাই ডাল আর পুকুরের রুই মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খেতে খেতে তারা কোথায়, বুকের কোন এক কোনে চিনচিনে ব্যাথা টের পায়। শহরের বাবুদের বাড়িতে যে বেদনা-বিষাদের হাহাকার, উদ্বিগ্নতা-অস্থিরতা তা যেনো নিজেরই মনে হয় তাদের। হাসতে থাকা, খেলতে থাকা, ভরপেট ভাত খেতে থাকা, পোয়াতী বউ এর সাধ খাওয়ানো-শাঁখ বাজানো অনুষ্ঠানগুলো, ছেলের অন্নপ্রাশনে পেটচুক্তি পাকা ফলার খাওয়ানো আয়োজনগুলো কেমন হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেছে সেখানে।

দিনমান পুকুর ঘাটে বাসন কোসন ধুতে ধুতে, বাবুর পেছন পেছন মাছ আর সবজির ঝাঁকা বয়ে নিয়ে যেতে যেতে তারা টের পায় কোথায় ছন্দের তাল কেটে যাচ্ছে। নেমে আসছে সুরহীন-ছন্দহীন অমানিশার অন্ধকার। সে অন্ধকারের বিষাদ তাদের স্পর্শ করে। কিন্তু এর কোন তল তারা খুঁজে পায় না।


২রা জুলাই, ২০১৮

মোবাইলে পাসপোর্ট আসার মেসেজটা পড়ে দীর্ঘদিন দমবন্ধ একটা দীর্ঘশ্বাস ছুটে যায় বুক ছেড়ে। শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল পাসপোর্ট। কে ঘাবড়েই না গিয়েছিলো প্রথম পুলিশের ফোন পেয়ে। হ্যালো রাজীব কুমার দাস বলছেন? জ্বী, আমি সদর থানার ওসি আব্দুর রব। জ্বী স্যার, বলেন স্যার। আপনার আব্বা, সরি পিতার নাম? সুনীল কুমার দাস স্যার। মাতা- প্রতিভা রানী দাস। ঠিকানা- পুরাণ চৌধুরী পাড়া.....। নিজের বাড়ি, না ভাড়া বাসা? জ্বী ভাড়া বাসা। আগে বলবেন না? খট করে ফোনটা কেটে দেয় ওসি আব্দুর রব। রাজীবের কৌতুহল আর দুশ্চিন্তা সীমা ছাড়ায়। ঘটনা কী, ওসি তাকে হঠাৎ ফোন দিলো কেন? পূর্ব-অভিজ্ঞতার দুর্বিষহ স্মৃতি তাড়িত করে, অস্থির করে। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতটা ভোর হবার অপেক্ষায় থাকে সে।

বুকে সাহস সঞ্চয় করে পরদিন থানার সামনে এসে দাঁড়ায় রাজীব। এসব থানা-পুলিশ সংক্রান্ত ঝামেলার ধারেকাছে তার ঘেঁষতে হয়নি কোনোদিন। ভয় পাওয়ার মতো কোন কাজও করে নি সে,তবু কিছুতেই নিঃসংকোচে ভেতরে ঢোকার সাহস সঞ্চয় করতে পারে না। ভেতরে আসা যাওয়া করতে থাকা কয়েকজনকে 'হ্যালো ভাই' বলে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। কী করবে ভেবে উঠতে পারেনা সে, হঠাৎ ওসি সাহেবের ফোনটা তাকে নির্বিকার ফিরে যেতেও বাধা দেয়। অপেক্ষা করে রাজীব।

একজন কনস্টেবল রিক্সা থেকে নামতেই তাকে মোটামুটি টেনে দেয়ালের পেছনে হিজল গাছের নীচে নিয়ে যায় সে।শোনা অভিজ্ঞতায় সে জানে, এদের হাতে নোট গুঁজে দিলেই অনেক সমস্যার সমাধান। কনস্টেবলটির বুকের পিনে নাম লেখা “অপূর্ব”। নিঃসন্দেহে হয়েই ‘দাদা’ ডাকে সে, দাদা একটা উপকার করবাইন? কনস্টেবল অপূর্ব প্রথম পুলিশ সুলভ দাপট দেখায়, আরে আরে সমস্যা কী? অবস্থা বুঝে পকেট থেকে বের করে দ্রæত একশ টাকার নোট গুঁজে দেয় তার হাতে। এবারে কন্ঠ একেবারে সপ্তম থেকে ফিসফিসানিতে নেমে আসে, বলেন কী করতে হবে? ঘটনা বিস্তারিত বয়ান করে রাজীব। কনস্টেবল কেইস আঁচ করে ফেলে, পাসপোর্ট করতে দিছিলেন? হ, হ, হালে পানি পায় রাজীব। আসেন আমার সাথে আসেন। রাজীবকে সাথে নিয়ে ওসির রুমে ঢুকে অপূর্ব। সেবার পাঁচশো টাকার নোট ওসির হাতে গুঁজে দিয়ে এলে ওসি কথা দেয়, দুদিনের ভেতর পুলিশী তদন্তের রিপোর্ট দিয়ে দেবে। কিন্তু দুদিন নয়, দুইদুইটি মাস পার হয়ে যাবার পরও পাসপোর্ট সংক্রান্ত কোন খবরাখবর না পেয়ে দালালের সাথে যোগাযোগ করে রাজীব। জানতে পারে পুলিশ রিপোর্ট দিয়েছে এরা এখানকার স্থায়ী অধিবাসী নয়। ভাড়া বাসায় থাকে।

পরেরবার আর এ ভুল করে না সে। পুলিশ ফোন দিলে সে নির্দ্বিধায় বলে এটাই তার স্থায়ী ঠিকানা। দালালের পরামর্শ মতো আগেই ওসির হাতে কড়কড়ে একহাজার টাকার নোট গুঁজে দিয়ে আসে। ওসি কথা দেয়, আর ভুল হবে না। পরদিনই পাঠিয়ে দেবে রিপোর্টটা। কিন্তু এবার দু মাস নয়, প্রায় চারমাস পর রাজীব জানতে পারে, যথারীতি ভাড়া বাসার রিপোর্টই গেছে তার। পাসপোর্ট হবে ন।

এই শহরে ঠিক কয়পুরুষ ধরে বসবাস ঠিকঠাক জানেনা রাজীব। আজ ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হলেও একদা বিশাল উঠান, দোতালা কাঠের বনেদী বাড়ি, ঠাকুর মন্ডপ, বাঁধানো ঘাট কী ছিলো না তাদের? অথচ শেষ পর্যন্ত কীনা শশুরবাড়ি লাগোয়া কিনে রাখা তিনশতক জমির দলিল দেখিয়ে শশুরবাড়ির এলাকা থেকে পাসপোর্ট নিতে হলো তাকে?

পাসপোর্টগুলো হাতে বাড়ি ফিরলে, স্বামীর হাতে এগুলো দেখেই মুক্তির মুখে অভিমান আর কান্না ভীড় করে অবাধ্য দুষ্টু মেয়ের মতো। এই বছর খানেকে যতোটা চিনেছে রাজীবকে। কোনভাবেই তাকে টলানো যাবে না তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে। কী কুক্ষনেই না, তাজুলের কথাটা বলেছিলো সে! তারপর কতো মরা বাপ-মায়ের দিব্যি কেটে অস্বীকার করেছে মনি। তাজুলও রাজীবের অবর্তমানে কসম কেটে মুক্তিকে বলে গেছে রাজীবকে বুঝানোর জন্য। সব মিথ্যে সন্দেহ।

কিন্তু রাজীব কোন কথাই আর কানে তুলেনি। সিদ্ধান্তে সে অটল। মুক্তি যখন ঘ্যান ঘ্যান করে, এক্কেবারেই যখন যাবেন, তে পাসপোর্ট করলেন কেন, লুকাইয়া বর্ডারটা পার হইয়া গেলেগাই তো অইতো। আপাতত উত্তরহীন চুপ করে থাকে সে। সিদ্ধান্তটা গুরুত্বপূর্ণ। জীবনের সব সিদ্ধান্ত তার হুট করে নেয়া। কিন্তু এই সিদ্ধান্তটা অনেক ভেবে চিন্তে নেয়া। মাথা গরম করে হঠকারিতায় সব হারিয়েছে সে, কিছুই ধরে রাখতে পারে নি। এই চাতুর্য্যরে দুনিয়ায় আবেগ বড়োই মূল্যহীন। মুক্তির ক্রমাগত প্যানপ্যানানির মুখে মাথা ঠান্ডা রেখেই মিনমিন করে নিজের সাথে,হ যামুনে পাসপোর্ট ছাড়া। গত মাসে দুইজনরে গুলি কইরা মারছে বি এস এফ। একবার মানে মানে একবার বর্ডারটা পার হলেই হলো। আর পায় কে! 


২রা জুলাই ১৯৪৭

প্রফুল্লদেবী ভেতরে ভেতরে তীব্র ক্ষেপে ছিলো। জিতেন্দ্র বিহারী অন্দরে ঢুকলে তেলে-বেগুনে খেপে উঠে সে। মৃত সহোদরদের শেষ দেখাটা দেখতে পারেনি প্রফুল্ল,গ্রামে পৌঁছানোর আগেই ছাঁই হয়ে নোয়াগাওয়ের মাটিতে মিশে গিয়েছিলো তাদের নশ্বর দেহ। সেই যন্ত্রনা ভেতরে তুষের আগুনের মতো জ্বলছে অহর্নিশ। শৈশব কৈশোরের স্মৃতিরা কামড়ে ধরে আছে হৃৎপিন্ড। এ সময় তাঁর স্বামী জিতেন্দ্র বিহারী কিনা পাকিস্তানের পক্ষে ভোট টানার জন্য এভাবে উঠেপড়ে লেগেছে! নিজেকে সান্ত¡না দিতে পারে না প্রফুল্ল দেবী।

মিটিং শেষ করে এলাকাবাসীদের বিদায় দিয়ে প্রায় ভোর রাতে অন্দরে আসে জিতেন্দ্র বিহারী। উদীয়মান সূর্যের আলো তখন ঘুলঘুলি গলে আছড়ে পড়ছে ঘরময়। রক্তলাল চক্ষু প্রফুল্লকে বসে থাকতে দেখে নীরবে শুয়ে পড়ার আয়োজন করে জিতেন্দ্র বিহারী। কোন ভনিতাহীন উচ্চারণ করে প্রফুল্ল দেবী, কামডা ঠিক করতাছইন না, মাশুল দেওন লাগবো এর। মাশুল দেওন লাগবো এর, কথাটা কেমন ইতারে ভাসা দৈব বাণীর মতো সে ভোরে সারা ঘর ময় অজানা ভবিতব্যের বিশাদময় অন্ধকার ছড়িয়ে দেয়। 

হ্যাজাক লাইট নেভানো পোড়া তেলের গন্ধ ঘাপটি মেরে আছে কালো কুচকুচে কাঠের খাটের ফুল-পাতা আলপনার ফাঁক ফোঁকড়ে। সব গন্ধ ছাপিয়ে তবু সেদিন নোয়াপাড়া গ্রামের শবদাহের তীব্র কটু গন্ধ মস্তিষ্কের স্মৃতিকোঠর ভেদ করে আক্রমন করে এই বিষন্ন ভোর। এক ভয়াবহ ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মুখোমুখি সব।

পাকিস্তানে বিপক্ষে ভোট দেবে জেনে লাখাইয়ের নোয়াগাওয়ের হিন্দু পাড়াগুলোতে অতর্কিত হামলা চালিয়েছিল আশেপাশের কয়েকটা গ্রামের মুসলমানেরা। হিন্দুদের সম্মিলিত প্রতিরোধের আগেই মৃত্যু ছিনিয়ে নিয়েছে প্রফুল্লর পিঠাপিঠি দু ভাইকে। তিনদিন পর প্রফুল্ল সহ নোয়াগাঁও যখন পৌঁছেছিল জিতেন্দ্র বিহারী, তখন লন্ডভন্ড পুরো গ্রাম। বাতাসে শবদাহের ভারী কটু ধোয়া। কবরও খুঁড়ছে কোথাও। শোকের গলাটিপে ধরে প্রফুল্লর পরিবার তখন সীমান্ত পাড়ি দেয়ার জন্য তৈরি। পেছনে পড়ে থাকা দুই ভাইয়ের স্মৃতি, চৌদ্দ পুরুষের ভিটা, গোয়ালের গরু, সিন্দুক ভর্তি কাঁসা-পিতল, ঠাকুমার জলচৌকি, ঠাকুর্দার কাঠের খড়ম! সব, সবকিছু। পবিরারটির কাছে বেঁচে থাকা একমাত্র বোন নির্মাল্য আর একমাত্র ভাই নিকুঞ্জকে বাঁচিয়ে রাখাটা অনেক মূল্যবান এই স্থাবর সম্পত্তির চেয়ে। জিতেন্দ্র বিহারী সেই ফুরিয়ে যাওয়া বিকেলের বিষন্নতায় অনেক বোঝায় তাদের, আশ্বস্ত করতে চায়, যোগেন মন্ডল আসছে। একবার পাকিস্তানের পক্ষে ভোটটা দিলেই হলো, নমশুদ্ররা এবার জাতে উঠবে। আর মুসলামানরা তো নমশূদ্রদের মারতে আসেনি। এসেছিলো জমিদার শ্যামবাবুর বাড়ি আর কায়স্থাপাড়া আক্রমন করতে। এরা তো সব বর্ণ হিন্দু। 

প্রফুল্লর বিপর্যন্ত পরিবার তখন সব বিশ্বাস আর আশ্বাসের উর্দ্ধে। তাদের চোখে মুখে ভয়ার্ত আতঙ্ক-অনিরাপত্তা হাঁপাতে হাঁপাতে তবু একবার উত্তর করে প্রফুল্লর বাবা, কালীপূজা, দুর্গাপুজা তো কায়স্থদের লগে একলগেই করি বাবা। এরা চলে গেলে আমরা থাইক্যা করমু কি!

ধ্বংসস্তুপ আর মৃত্যুর ধোঁয়াশায় থ মেরে দাঁড়িয়ে থাকে প্রফুল্ল। নির্বাক দৃষ্টিতে তার কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা। কেউ দেখেনা, সেখানে থৈ থৈ করে এক থালা দুধভাত। এক কাঁসার থালায় দুধভাত খেয়ে বড় হয়েছে সে। দিনময় এপাড়া ওপাড়া ছুটে বেড়ানো আর কাঁচা আম, কৎবেল চুরি করে দিনান্তে ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে মায়ের হাতের লোকমা মুখে নিতো তারা। আর প্রতি লোকমা শেষে ঘুম ঝেড়ে বড় চোখ করে দেখতো থালার কোনায় রাখা গুড়ের চাকায় কে কতো বড়ো কামড় বসালো। কিলাকিলি.....একসাথে গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা। দশ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে যাবার পরও বছরে এমাথা ওমাথা নাইওর এসে শাড়ি কোমরে গুঁজে এক্কাদোক্কা খেলতে লেগে যেতো ভাইদের সাথে। কেমন একবেলায় সব শূন্য হয়ে গেলো। এ ভিটায় তার আর আসা হবে না কোনদিন। এর ধুলায় মাটিতে মিশে থাকা স্মৃতিতে আর কোনদিন গড়াগড়ি করা হবে না তার। স্মৃতি, আক্ষেপ, বিষাদের যন্ত্রনা বড় বড় অশ্রুর ফোঁটা হয়ে ভেজাতে থাকে চৌদ্দ পুরুষের পদচিহ্ন মাখা ধুলি। সেই বিকালটা এতো দ্রæত ভুলে গেছে জিতেন্দ্র বিহারী? পাকিস্তানের পক্ষে ভোট নিশ্চিত করে ঘুমাতে এসেছে সে। 


৬ জুলাই রোজ ২০১৮

রাজীবের থ মারা নীরবতায় মুক্তি আঁচ করে রাজীবকে সিদ্ধান্ত থেকে টলানো অসম্ভব। ননদ মনির কাছে শুনেছে, শাশুড়ী বেঁচে থাকতে বলতেন এই একগুঁয়েমি এদের বংশের ধারা। তার শশুর বারকয়েক মেম্বার ইলেকশন করে অর্ধেক সম্পত্তি খুইয়েছে। রাজীবও যখন যা গো ধরেছে অর্বাচীন, অবিবেচক, গোঁয়ারের মতো তাই করে ছেড়েছে। কেউ বুঝিয়ে সরাতে পারেনি তাঁকে। তাজুলই বিশ্বস্ত বন্ধুর মতো বারবার বুঝিয়েছে তাকে। নিজের পায়ে কুড়োল মারা সব সিদ্ধান্ত থেকে সরাতে চেয়েছে।

এই পরিবারে রাজীবের বন্ধু তাজুল, ঘরের ছেলের মতোই। প্রায় দুপুরে বারান্দায় টেবিলে খেতে খেতে তাজুল ভুলে যেতো সে এ বাড়ির ছেলে নয়। ডুবো তেলে ভাজা নালি শাকের বড়া, কলার মোচার ঘন্ট, এঁচোড়ের লাবড়া, তাজুল একেকদিন একেকটা খেয়ে পঞ্চমুখে প্রশংসায় রাজীবের মাকে মা ই ডেকে ফেলতো, অ মা কেমনে রান্ধেন এগুলা? আমার আম্মা পারে না কেন? আনন্দে আটখানা রাজীবের মা আরো খানিকটা ঢেলে দিতেন তাজুলের পাতে আনন্দে-আদরে, আর মনে হতো কী ভালো ছেলেটা। আহা, শেখ অইলে কীতা অইবো? কিন্তু তাজুল চলে গেলেই বারবার বলতেন,আমার শাশুড়ি যে কইয়া গেছেন মাশুল দেওন লাগবো! বড় ভয় লাগেরে বাবা! কিন্তু রাত না পোহাতেই আবার তাজুলই ভরসা, নদীতে খেয়া পাড়ি দেয়ার মতো আবশ্যিক সে এ সংসারে।

রাজীবের সমস্ত পাগলামী সিদ্ধান্তে যখন চোখেমুখে পথ দেখতেন না শাশুড়ি, তাজুলকেই ডেকে পাঠাতেন তিনি । বাপের মতো যেবার রাজীবের 

মাথায় চাপলো ওয়ার্ড কমিশনার ইলেকশন করবে। খরচের জন্য হাত পড়লো বাপের রেখে যাওয়া অর্ধেক ভূসম্পত্তিতে। মাথা থেকে ভূত নামানোর জন্য তাজুলকেই ভরসা করে ডেকেছিলো শাশুড়ি। রাজীবকে কত বুঝিয়েছে তাজুল তখন। বুঝেনি রাজীব। বেচে দিলো বাড়ির বামপাশটা, গ্রীষ্মে লাল রঙের লিচুর গন্ধে মৌ মৌ করতো যে পাশটা। রাজীবের নির্বাচন শেষ হতে না হতেই লিচুগাছ কেটে সেখানে একচালা টিনের ঘর সারিসারি উঠিয়ে ভাড়া দিলো ক্রেতা বাচ্চু মিয়া।

সেই লিচু গাছটা চোখ বন্ধ করে দেখতে পেতো রাজীবের মা, কাঠবিড়ালীর হুটোপুটি, টিয়ার ঝাঁক। সবুজ পাতাদের মাদক গন্ধ গিলে খেয়ে তখন দুপুরের রোদ প্রাণহীন টিনে খা খা রোদ চমকায়। রাজীবের মা লুকিয়ে আঁচলে মুখ মুছলেও রাজীবের গোঁ থামে না। আমতলা বিক্রি করে ট্রাক কিনতে চায় সে। সেবারও তাজুল হাতে পায়ে ধরে তার। মাথা ঠান্ডা কর রাজীব, দোকান ভিটার ভাড়ায় যে টাকাডা আয় তিনজনের সংসার ত ভালোই চলে। মাথা থেকে ভূতটা নামা। রাজীবের মাথায় তখন বড়লোক হবার ভূত নামবার নয়। তাজুলকে শত্রু মনে হয় তার। পূবের ভিটার সিঁদুরে মিষ্টি আমগাছটায় যেদিন কুড়ালের আঘাত পড়ে, সেদিনই স্ট্রোক করে রাজিবের মায়ের। আর আমতলা বেচা টাকায় কেনা ট্রাক মাস ছয়েক যেতে না যেতেই উত্তরবঙ্গে মাল সাপ্লাই দিতে গিয়ে হারিয়ে যায়। আর ফিরে আসেনা।

তারপরও বিছানায় পড়েছিলো বছর দুয়েক রাজীবের মা, তার চিকিৎসা খরচ আর কমিশনারের দাপট দেখাতে গিয়ে এই দুই বছরেই সর্বস্ব খোয়ায় অপরিণামদর্শী রাজীব। মূল ভিটাটা যখন বিক্রি করে ভাগ্যিস তখন আর বেঁচে ছিলেন না রাজীবের মা। সেদিন নুতন ব্রিজে তাজুলের পাশে বসে অঝোরে কাঁদছিলো রাজীব। আর পেছন তাকিয়ে দেখছিলো জীবনের দাবার গুটির ভুল চালগুলো। এই চাল আজ থেকে তো নয় ............।


৬ জুলাই ১৯৪৭

দিনব্যাপী ভোটে মোটামুটি নিশ্চিন্ত হয়ে গেছে সিলেট জেলা পাকিস্তানেই যাচ্ছে। মুসলমান আর নমশুদ্ররা থেকে থেকে শ্লোগান দিচ্ছে। লড়তে লেঙ্গে পাকিস্তান। সন্ধ্যায় জিতেন্দ্র বিহারী বৈঠকখানায় বসে গড়গড়ির নলে টান দেয় স্বস্তির। আশেষে সব শংকা কাটিয়ে নিশ্চিত করা গেছে পাকিস্তানের বিজয়। যোগেন মন্ডল জানিয়েছে তার মন্ত্রিত্ব নিশ্চিত। আইবুড়ো মেয়ে বিয়ে দেয়ার মতো বিরাট একটা ভার নামলো যেনো তার ঘাড় থেকে। যোগেন মন্ডলকে দেয়া কথা রাখতে পেরেছে সে, এর স্বস্তিও কম নয়। ভবিষ্যতের মন্ত্রিত্বের আশা তো রইলোই, অকল্পনীয় স্বপ্নের মতো।

প্রফুল্ল দেবী বিছানায় গুমড়ে কাঁদে। শেষ ভরসাটাও শেষ হয়ে গেলো। লাখাই নোয়াগাওয়ের বাপের বাড়ি লুটপাটের পরও এখনো ভিটাখানা বেদখল হয় নি, লোকমুখে শুনেছে সে। ক্ষীন আশা তবু জেগে ছিলো তেলহীন প্রদীপ শিখার মতো। যদি গণভোটে সিলেট হিন্দুস্তানে যায়, হয়তো বাপ মাকে ফিরিয়ে আনা যাবে আবার ভিটায়। সে আশা শেষ হয়ে গেলো আজ। প্রফুল্ল দেবীর ক্রন্দনাক্রান্ত কণ্ঠ চেতন কিংবা অবচেতনে বিড়বিড় করে, কামডা ভালা করলেন না। মাশুল দেওন লাগবো এর। অনেক বড় মাশুল। 


৭ জুলাই ২০১৮

মুক্তি গত কয়েকদিন পুনপুন জেরা করেছে মনি আর তাজুলকে। আলাদা আলাদা করে। নিশ্চিন্ত হয়েছে সে। সন্দেহের অতীত সম্পর্ক তাদের। আশঙ্কার কিছুই নেই। নিজেকেই দোষী সাব্যস্ত করে সে।

কী হয়েছিলো তার,বিয়ের মাস পার হতে না হতেই কেনো রাজীবের মনে সন্দেহ ঢুকিয়ে দিয়েছিলো ঠিকমতো কোনকিছু বুঝে না বুঝে! এ বাড়িতে আসলেই ঘরের ছেলে ছিলো তাজুল। গত বছরখানেক রাজিব কথা বলে না তাজুলের সাথে,তবু সব প্রয়োজন অপ্রয়োজনে তাজুল রাজিবের অগোচরে সব সাহায্য নিয়ে হাজির হয়েছে ঠিকই। চাল মাছ থেকে নগদ টাকা পর্যন্ত। বেকার রাজীবের বাড়িঘর বিক্রির টাকাও তখন তলানিতে। টানাপোড়েনের অভাবী দিনে তাজুল রাজীবের অলক্ষ্যে ছায়ার মতোই থেকেছে তাদের পাশে, একেবারে ঘরের ছেলের মতোই। 

নিজের বিবেচনায় মুক্তি বোঝে তাজুল আর মনি ভালোবাসা করে বিয়ে করলেই কী! ভালোবাসা তো ভালোবাসাই। ভালোবাসা জাত ধর্ম মানে নাকি! মুক্তির যুক্তিবুদ্ধি ঠিক মুখোমুখি হয়না অন্য কোন সত্যের। তাজুলের অর্থনৈতিক ছায়ার লোভ কী তাড়িত করে তাকে? সে তলিয়ে জানতে চায় না। সে দেখে চোখে সর্ষে ফুল দেখা সব সংকটে একমাত্র তাজুলই থাকে পাশে।

কিন্তু রাজীব এসবের ধারেকাছে নেই। সবচে বিশ্বস্ত আর ঘনিষ্ঠ বন্ধুর এই ভূমিকা চরম বিশ্বাসঘাতকতা আর অবিশ্বস্ততা মনে হয়েছে তার। জায়গা জমি, ভিটামাটি সব হারিয়েছে সে। ঘরের ছেলে করে নিয়েছিলো যে তাজুলকে, মুসলমান বলে পাড়া পড়শির কতো বিষের মতো তিক্ত ঠাট্টা টিপ্পনি সহ্য করতে হয়েছে দিনরাত। আজ সেসবই সত্যি হবে! শহরে মুখ দেখাবে সে কী করে? কী উত্তর দেবে মরা বাপ মা কে! মা যে মরার আগেও বলে গেছে,তর দাদায় ভোট দিয়া পাকিস্তান আনছে। আর তর ঠাম্মায় বাপ মা ভাই বোনরে আর দেখতে না পাইরা খালি কানছে আর কইছে মাশুল দেওন লাগবো। দেখিস বাবা মাশুল য্যান দেওন না লাগে! 

না, সব গুছিয়ে এনেছে রাজীব। মুক্তি আর মনিকে নিয়ে রাতেই ছেড়ে যাবে আজ শহর। বাল্লা সীমান্তের কাছে দুর্গাপুর গ্রামে রাতটা থাকবে। সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে। আর ভোরে ভোরেই পাড়ি দেবে বর্ডার। অর্থবিত্তহীন গতর খেটে খাওয়া জীবন এখন। এখানে যা, সেখানেও তা। জাতধর্ম তো দিতে হবে না। মা ঠাকুম্মার আত্মা তো শান্তি পাবে। গেইট থেকে গলা বাড়িয়ে ডাকতে ডাকতে বাড়ি ঢুকে রাজীব, মুক্তি... অ মুক্তি.....। তাজুল বারান্দায়। সামনে নারকেলের নাড়ু ভর্তি প্লেট নিয়ে সামনে মনি, চোখে জল টলমল। 

যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে রাত হয়। তীব্র ক্রোধে উন্মত্ত ফোঁসে রাজীব, সম্পন্ন গৃহস্থের ঘরে হামলে পড়া অবিমৃষ্যকারী ক্ষোভান্ধ ডাকাতের মতো.....মুক্তি মুক্তি......। রান্নাঘরে মুগের ডালে মেথি ফোড়ন দিতে দিতে মুক্তির শরীরের কাঁপুনি হাত পা ছাপিয়ে অন্তরাত্মা পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়, নিশ্চিত রাজীবের মুখোমুখি পড়েছে তাজুল। দৌড়ে বের হয়ে যাওয়ার জোর পায়না সে। মনে হয় কয়েকমণ পাথর বেঁধে দিয়েছে দুপায়ে।

দৌড়ে পালায় মনি। রাজীবের প্রতিক্রিয়া আরো উর্দ্ধমুখী হবার আগে তাজুল চেপে ধরে রাজীবের হাত, ক্যান ইন্ডিয়া যাইতে তাজুল। আমরা আছি না? আমারে ফালাইয়া কেন যাবি তুই? সিদ্ধান্ত বদলা রাজীব। ভুল করিস না। তর দাদার দেশ, তর বাপের দেশ, ক্যান যাবি তুই? এক ঝটকায় তাজুলের হাত ছাড়িয়ে ঘরে ঢুকে যায় রাজীব। 

মনি অঝোরে কাঁদছে পেছনের বারান্দার পাল্লায় ঠেস দিয়ে। ম্ুিক্ত গভীর নদীতে ডুবে যাওয়া নৌকা থেকে ভেঁসে উঠবার শেষ আশায় মনিকে জড়িয়ে ধরে পেছন থেকে শেষবারের মতো সত্য কইরা কতো মনি, তাজুলের সাথে তর কোনো সম্পর্ক নাই তো। মনিও ডুবন্ত যাত্রী, জড়িয়ে ধরে পাল্টা মুক্তিকে। একজনের টানে অন্যজন দুজন একসাথে ভাসতে গিয়ে ডুবে যায় আরো, মনি বলে বিশ্বাস করো বৌদি তাজুল ভাইরে দাদার চেয়ে কম কিছু দেখি না আমি। বিশ্বাস কর আমারে ............। পাল্লায় নিজের মাথা ঠেস দেয় মনি। অ বৌদি দেশের বাতাসে আমি বাপ-মায়ের গন্ধ পাই। তাদের শরীর ছাই হইয়া মিশা আছে এই দেশের মাটিতে। আমারেও এখানে মিশাইয়া রাইখা যাও গো বৌদি। ছিঃ এগুলা কি কস ! মনির মুখ চেপে ধরে মুক্তি, শেষ বার বইলা দেখি তর ভাইরে ! মনি উঠে যায় ঘরের দিকে। 

অমাবস্যার অন্ধকার চরাচরব্যাপী নেমে আসার আগে যেন এই ভর সন্ধ্যায় একটুখানি থমকে দাঁড়ায় বারান্দায়।

তবুও রাতে সেদিন ঠিক চরাচরে প্রতিপদের অন্ধকার নামে, ঘোর অমাবস্যা দ্রবীভূত হয় ইলেকট্রিক পিলার, টিনের চাল আর রাজীবের ঘর বারান্দায়, একে একে নিভে যেতে থাকে একেকটা ঘরের ইলেকট্রিক বাতি। সব গুছানো শেষ হয়ে গেলে বুক ভাঙা কান্না গলায় জমে থাকে এক টুকরো পাথরের মতো। মনিকে ডাকতে যায় মুক্তি, জিনিসপত্র গুছিয়ে ব্যাগপত্র রেখে কই গেলো মেয়েটা? খুব স্বাভাবিক ডাকতে যাওয়াটা ক্রমশ ভয়াবহতা আতঙ্কে রূপ নেয়। মনি নেই, কোথাও নেই। নিজের ঘরে নেই, মুক্তিদের ঘরে নেই, রান্নাঘরে নেই, বাথরুমে নেই.....। পাগলের মতো খুঁজে মুক্তি, তটস্থ ডাকতে থাকে, মনি.... মনি....... ঊঠানের কোনে, তুলসী তলায়, ঠাকুরঘরে কোথাও নেই মনি। মনি কোথাও নেই।

মিনিট পনেরো পর সি এন জি নিয়ে বাসায় ঢুকে রাজীব যখন আবার ডাকে, মুক্তি....মুক্তি.... । মুক্তি তখন নিশ্চল পাথর! পা দুখানা দরজার বাইরে মেলে দিয়ে হতবিহবল বসে আছে চৌকাঠে। 

1 টি মন্তব্য: