শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

শওকত ওসমান'এর গল্প : গোরনিদ্রা

দমকা নির্বাপিত কোলাহলের রেশ বাতাসকে হটিয়ে দিয়ে যে গুমোট সৃষ্টি করে তা কান পেতে শোনা যায় না। কিন্তু রক্তের প্রবাহ তার যেই দুই হাতে তেড়ে ধরে, শত্রুর কাছ থেকে আলিঙ্গন দাবীর ভঙ্গীতে, ছলাচ্ছল বুক তড়পে তড়পে চোখকে সজাগ করে, পায়ে বেড়ি লাগায়। তোমাকে হাঁটতে দিতে চায় না। তবু, তুমি হাঁটো। হৃদয়-সড়কে অন্ধ রাত-ভিখিরীর হাতড়ানি তখন আরম্ভ হয়।

আমি হাঁটছিলাম। জন শূন্যতায় প্রেতায়িত পথ হঠাৎ সুমসাম শরতের নদীর মত আকাশে চোখ রেখে বিশ্রাম প্রার্থী। দু পাশের ইমারৎ শুধু মাথা তুলে তার নক্ষত্র অভিসারে বাধা দিচ্ছে। সন্ধ্যা ত কখন পার হয়ে গেছে। আজ টেরও পাইনি। কিন্তু জানি, সায়ং প্রহর ক্রমশঃ অনেক অনেক অন্ধকারকে ডাক দিয়ে গেছে ঢ্যাঁড়াদার বাদুড় মারফৎ। এই জানা কোন্‌ অনুভূতির মারফৎ পাওয়া, তা বলতে পারব না। 

নিজের শূকর-অভ্যাস ভুলে আকাশের দিকেও চেয়েছিলাম একবার। হাজার হাজার নক্ষত্র ফুটে আছে। কিন্তু চোখ কোথাও ত স্থির থাকতে চায় না। সড়ক-পার্শ্বস্থ গাছের শাখা-প্রশাখারা বেয়নটের মতো খোঁচা খোঁচা কদর্যতায় দৃষ্টিকে ঠেলে ফিরিয়ে দিল। দুঃসহ নির্জনতা এক দানবীয় রূপে আমার পেছন পেছন পা ফেলছে নিছক বিদ্রূপের জন্য। ক্ষীণকায় নাগরিকের অনুকরণ মহড়ায় বিপুল-কদ্‌, মল্লবীরের হাস্যাবতারনার মত। আশে পাশে দাঁড়ায়, এমন দর্শকেরাই হাসে। কিন্তু বিন্দুতম তেমন শব্দ আমার কানে আঘাত করে না, খুব জোর চাপা ফিসফিসানির আওয়াজ আন্দাজে ধরা যায় মাত্র। গ্রাম-জনপদে বাঘের সংবাদে যেমন সূর্যের আলো-নেভার সঙ্গে সব নিশুত হোয়ে যায়, এও তেমনি। পথ ফাঁকা। সড়ক নির্জন। অথচ সবাই জেগে আছে ঘরের মধ্যে খিল এঁটে। আসন্ন দিন ও বিপদের কথা ভাবছে। বাতাসে শুনছে হুঙ্কার বা থাবা-বন্দী মানুষ কি জন্তুর দূরাগত আর্তনাদ। 

হাঁ, সড়কের সারি সারি ঘরে মানুষ এখনও ঘুমোয়নি। কয়েকটা ঈষৎ খোলা খড়খড়ি হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল নিঃশব্দে। ওর পেছনে কি মানুষ নেই? ঝাপসা চাঁদের আলোর আমার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিজালে তা ধরা পড়েছে। 

কিন্তু এই গুমোট থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য কোন দরজায় টোকা দিলে, কেউ সাড়া দেবে না। এই সড়কের বাসিন্দাদের খসলৎ আমার জানা আছে। ভান করবে, তারা ঘুমোচ্ছে আসহাব কাহাফের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। বাতি নিভিয়ে ঘরের কামরায় কি বারান্দায় যদি ওরা হাঁটে, তোমার উপস্থিতি টের পেলে তারা সুট্‌ করে থেমে যাবে-- যেমন গহস্বামীর পদধনি-ভীত চাউলগোলার নেংটি ইঁদুর। 

তাই একা একাই হাঁটছিলাম। থামিনি কোথাও। কথা হৃদয়ের উত্তাপ বিকীরণের স্টেশন। মনের গুমোট থেকে রেহাই পেতে তাই মানুষ খোঁজে মানুষ। একান্ত মনের দোসর না হলেও চলে। কিন্তু এই পল্লীর হদিস আমার জানা আছে বলেই, পায়ের কামাই ছিল না। সব খিড়কী বন্ধ, সব দুয়ার রুদ্ধ। বিচিত্র কিছু নয়। জীবনযাপন পাঁয়তারা মাত্র! বাঁচতে চাও, শুধু পাঁয়তারা কষো। সকাল থেকে চৌপর দিন, সারা রাত্রি। সহজ বাঁচা এ পাড়ার লোকেরা কবেই বিস্মৃত। পাঁয়তারা, পাঁয়তারা। এই কষাকষির হদিস না জানলে তুমি মড়া। দরজা জানালার ওপারে কৌশলবিদরা সব জেগে জেগে ঘুমোচ্ছে। রাস্তা জনহীন। 

আমি কিন্তু এগোচ্ছি। গ্যাসের স্তিমিত আলো আজো জ্বলছে কোথাও কোথাও। জানালার দুই পাল্লা দুই কোন ঘরে একদম সাঁট সাঁটা। পিপীলিকার প্রবেশ ফাঁক করে ঠাণ্ডা বাতাসের জন্য কেউ কেউ দুই পাল্লা হয়ত পেছনে ধরে বসে আছে। গ্যাসের আলোয় দেখলাম, হঠাৎ একটা পাল্লা চট করে খুলে গেল, বেরিয়ে এলো একটা নগ্নহাত। সে হাত নাড়ছে। কার জন্য? হাতের ভাষা আমার জন্যে নিশ্চয়। ইশারার অর্থ ফিরে যাও। একা একা কোথায় যাচ্ছো ওদিকে। নিমেষে হাত উধাও। দোতালা জানালার দুই পাল্লা আবার সেঁটে মিশে গেল। গ্যাসের আলো রং ছুট কাঠের দাঁত খিঁচুনি স্পষ্ট করে তুললে। ঘরের বাসিন্দাগুলো কাঠের তৈরী, বাইরে তাদেরই মুখ দেখতে পেলাম যেন। 

বেদনার ক্রুশবাহী আমি যীশুখীষ্ট। হয়ত ক্যালভেরীর সড়কে এগিয়ে যাচ্ছি। কন্টক মুকুট আমার মাথায়, নয় বুকে। ধর্ষিতা বাতাসও আজ গোঙানি ভুলে গেছে। অসহ্য গুমোট ভেতরে, বাইরে। চোখের জ্বালায় অশ্রুর উঁকি পর্যন্ত অসম্ভব। দগ্ধ ঘায়ের উপর পানির সিঞ্চন কোনকালেই তাপহর ছিল? 

আর এক সড়কে এসে পড়েছি, খেয়াল ছিল না। এখানে দুপাশে মাঝে মাঝে গাছ আছে, আগাছার বন আছে। ঝিঁ ঝিঁ ডাকছে, শুনতে পেলাম। মাথার উপর গাছ-আশ্রিত পাখীর ডাকও কানে গেল। হয়ত পাখী। তখন অত লক্ষ্য করিনি। বনজশীতলতা আছে, এখানে না থাক বাতাস। সড়কের উপর কয়েকটা ছুঁচো ছঁ ছঁ' শব্দে দৌড়াদৌড়ি করছে। এরাও বুঝেছে, সড়ক জনশুন্য। তাই স্বাধীনতা উপভোগ-মত্ত। ছুঁচোরাও টের পায়, স্বাধীনতার মর্ম বোঝে। গর্ত থেকে বেরিয়ে এসেছে পাথুরে সড়কের উপর। আমার উপস্থিতি তাদের ভয়ের কারণ হোল না। কারণ, একটা মানুষ তো আর মানুষ নয়। দল বেঁধে গেলে না ভয় পাওয়ার কথা। তা-ও ছুছন্দর যেমন বোঝে। হুপ্পোড় তুলে জীবগুলো আগাছার রাজ্যে দৌড়াদৌড়ি করতে লাগল। 

সটান সড়ক। চোখ তুলে সামনে দেখে নিই। এবার আমার বিস্ময় সহজে কাটে না। আমার কাছ থেকে দু'শ গজ--হাঁ, কি তার কিছু বেশী দুরে দেখলাম, চারজন লোক হাঁটছে। এই সড়কে আরো মানুষ চলাফেরা করছে। বিস্ময় বৈকি। চোখ কচ্‌লে নিই। ওরা কী যেন বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কাঠের উপর তার লক্ষণ স্পষ্ট। সবকিছু নিজের কাছে আরো স্পষ্ট করে তুলতে আমি দ্রুত পা চালাতে লাগলাম। 

অতি ঢিমালয়ে হঠাৎ আলোড়ন দেখা গেল গাছপালায়। মড়ার খুলির মধ্যে বাতাসের শীৎকার যে ফিসফিসানী তোলে, তারই মৃদু রব কানের কাছে এসে পৌঁছায়। আমি কিন্তু চলা বিস্মৃত হইনি। দুরত্বের ফারাক অনেক কমে এসেছে। হয়ত আর একশ গজও নয়। 

এবার দেখতে পেলাম, সেই জন চতুষ্টয় একটা লাশ বহন করে নিয়ে যাচ্ছে। সকলের কাঁধে শবাধারের ডাঁট। আধেয়টা পরিষ্কার না হলেও চোখে দেখা যায়। লাশ চাদরে ঢাকা। শবাধার একেবারেই নিরাভরণ। কাঠে পালিশ পর্যন্ত নেই। আর ফুলের কোন নাম-গন্ধ কাছাকাছি আছে বলে মনে হোলো না। তা থেকে অনুমান করা যায়, এ মৃত্যু অতি সাধারণ মত্যু। তার কোন আলোড়ন জীবনের ক্ষেত্রে বুদ্‌বুদ্‌ তোলে না। আর শব যে অতি সাধারণ কোন জীব, তা পরিষ্কার বোঝা যায়। মাত্র চারজন শব-বাহক। শোকযাত্রী একজন থাকলেও বোঝা যেত, এই মৃত্যু কিছু রেশ রেখে গেছে পেছনে। 

আমার আর কৌতূহল থাকার কথা নয়। রোজই ত কত মত্যু ঘটে, আর গোরস্তানে কত মড়া পোঁতা হয়—এর আবার খোঁজ নেব কি ? যে মত্যু জানান দিতে পারে, তার খবর শহরে বনাগ্নির মত দাহন তোলে নিমিষেই। 

কিন্তু পথে মানুষ আছে—এই ত আজ বিস্ময়। তা জীবিত কী মৃত দেখার প্রয়োজন কী? আর জীবিত মানুষ ত চারজন রয়েছে। ওদের সঙ্গ আজ না লাভ করলে, অনেক আপসোস থেকে যাবে। পথে যে বেরলাম, তার দাম চাইব না? নিছক কৌতূহল যদি মেটে তাই মন্দ কী। সাথ ধরতেই হবে ওদের। গ্যাসের স্তিমিত আলো হেথাহোথা ছড়িয়ে আছে, চাঁদ উঠেছে ইতিমধ্যেই। তাই পথের ছমছম অস্পষ্টতা দুর হোয়ে গেছে। পথ চলতে তেমন অসুবিধা ঠেকে না। আর সব শ্রান্তি চুরি করে নিয়ে গেছে কৌতূহল। 

মানুষের গন্ধ পাওয়া রাক্ষসের মত আমার দুই চরণ তখন দ্রুততার প্রতীক। 

কিন্তু সাথ ধরা যত সহজ মনে করেছিলাম, তা আর হয় না। আমার অগ্রবর্তীরা বেশ জোরে হাঁটছে। এক শ' গজের ব্যবধান আর ক্ষয় করতে পারছি নে। মনে হয়, কত যুগ না হাঁটলাম। অথচ গন্তব্য পারদতরলতায় পিছলে পিছলে যাচ্ছে। হয়ত দিগন্তের মতই এর অবস্থান মরীচিকাময়। 

আমি রীতিমত ঘেমে উঠলাম। পথ হাঁটতে হাঁটতে শ্রান্তি-জাত বৈকল্যে আমার কানের ভেতর তখন নানা শব্দ উঠেছে। হিসহাস চিচাদ্রুমদাম ঠুংঠাং। গোটা পাওয়ার হাউস্‌ যেন মাথার মধ্যে ঢুকেছে। আমার পা পরাজিত শববাহীদের কাছে। একবার ভাবলাম দৌড় দিয়ে দেখলে কেমন হয়। কিন্তু প্রেতায়িত মৌতাতে বুঁদ শরীর, কোন শক্তি নিয়ে বা দৌড় দেবে? 

পিছু নিলাম ঝানু গোয়েন্দার মত। জানি স্থানের ফারাক দূর করতে পারছিনে, তবু দূর থেকে শুনতে পাচ্ছি, ওরা এগোচ্ছে আর আরবী দরুদ পড়ছে মৃতের আত্মার উদ্দেশ্যে। ওদের সহযাত্রী হতে পারলে ত শব-বাহনের কিছু শ্রম হ্রাস করতে পারি। লোকগুলো একবারও পেছনে ফিরে তাকাচ্ছে না। চীৎকার দিতে গিয়ে নিজের অক্ষমতায় লজ্জা পেলাম। বহুদিন আহার ব্যতীত আমার গলা ত আর বিশেষ কোন কাজে লাগে নি। ছোট বিলের মাছের ফুলকার মত আমার কষ্ট কমজোর। চীৎকারে ওদের চলা থামাতে পারব না। 

জোরেই হাঁটতে লাগলাম। এবার আমার কোনদিকে আর কোন দৃষ্টি নেই। নিজের সমস্ত অক্ষমতা-জাত লজ্জা আমি ভুলে গেছি। এক ওদের সাথ-ধরা ছাড়া আর সব চিন্তাই ঝেঁটিয়ে ফেললাম বুকের দম নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে বেঁধে। পায়ের পেশী তখন হুকুম শুনলে। দ্রুত হাঁটতে লাগলাম। 

কিছুক্ষণ চলার পর টের পাই, আমি ওদের কাছাকাছি এসে পড়েছি। হাঁ, লাশ শবাধার, শববাহক—আমার চোখ বিন্দুমাত্র ভুল কিছু দেখেনি। আমি আরো নিকটবর্তী। ওরা জোরে জোরে আরবী কলমা পড়ছে মৃতের আত্মার উদ্দেশ্যে। আমার কানে তার স্বরে সব ফুটে উঠে। ঘন ঘন কানে ঢেউ আছড়ে পড়ে প্রার্থনার। আমার চোখ শুধু শবাধরের উপর। অন্ধকারে সেদিকে লক্ষ্য রাখাই পথশ্রম থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়। 

চাঁদের আলো হঠাৎ উছলে পড়ল আরো উজ্জ্বল প্রভায়। গাছপালা শন্‌শনিয়ে উঠল বুকের চাপা নিঃশ্বাস ছুঁড়ে ফেলে। ফিকে অন্ধকার স্বপ্নের আবরণের মত দুলে উঠল ঘুম ভাঙ্গার পূর্বে। পাখীর পাখনায় চিড় খায় সড়কের গুহা-নির্জনতা। আমি হাঁটছি। লক্ষ্যবস্তুর উপর নিবন্ধ দষ্টি । 

হঠাৎ খেয়াল হয়, আমার আর মাত্র এক ধাপ দূরে ওরা হাটছে। না,হাঁটছে না। চারজনে থ দাঁড়িয়ে গেছে। এই অভাবনীয় ব্যাপারে আমিও থমকে যাই, দাঁড়িয়ে পড়ি। চোখ কচলে তাকাই ওরা আর নড়ছে না। একদম অনড় দাঁড়িয়ে গেছে। বিশ্রাম নিচ্ছে, তাও নয়। 

তারপর আমার চোখ বিস্ময়ে হাবুডুবু খায়। প্রথমে আমি ত ভয় পেয়ে যাই। কোন ভূতুড়ে কাণ্ড ঘটছে না ত? 

বিস্ময় বিস্ফারিত নেত্রে দেখলাম চাদর ঢাকা শব খাটের উপর বসল শুধু, এক কিনারা ধরে লাফ মেরে নীচে নেমে আমার দিকে এগোতে এগোতে হেঁকে উঠল, “স্লামালেকুম! স্লামালেকুম!” 

আমি ভূতের সঙ্গে কথা বলব? আমার ভয় কাটে না। তব প্রেতেরও মন রক্ষা করে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। কোনরকমে উচ্চারণ করে ফেললাম, ‘আলায়কুম আস্‌সালাম’। 

সদ্য-জীবিত লাশ দ্রুত আমার করমর্দন করতে করতে বললে, ‘ঘাবড়াচ্ছেন কেন? ভূত নই। ঘুমিয়ে নিয়েছিলাম মাত্র। আমি জ্যান্ত। আসলে ওগুলো মড়া, দাঁও-মত আমাকে বয়ে আনছিল। আসুন, দেখুন--।' 

সে আমাকে আঙুল বাড়িয়ে এক একটার কাছে নিয়ে গেল। আশ্চর্য, চারজনই মড়া। মাথার মগজ মাংস বহুদিন উধাও। স্যাঁতলা দাগ পড়ে গেছে। খুলীর মধ্যে দাঁতগুলো বিকট। 

বিপদোত্তর শঙ্কায় চোখ বন্ধ করে নিলাম।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন