শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

বিশ্বদীপ চক্রবর্তীর গল্প: জলছাপ

সময়ের পলি চেনাকে অচেনা করিয়ে দেয়। যে রাস্তার প্রতিটা খানাখন্দ প্রাত্যহিক অনায়াসে টপকে যাওয়া যেতো, এখন প্রয়োজন প্রতি পদক্ষেপে সতর্কতা। অবশ্য আগে শুধু রিক্সা আর সাইকেল ছিল। এখন অটো, টোটো আর মাঝে মধ্যে গাড়ি বা জিপের দখলে রাস্তা। আগাছাঘেরা বাগানওয়ালা একতলা বাড়ির ভাগের আলো কেড়ে নেওয়া ঝাঁ চকচকে ফ্ল্যাট। সদ্য কিছু গজিয়ে ওঠা দোকানে কচি গোঁফ। কোন পুরনো দোকান আবার হারিয়ে গেছে। লোকেরাও। যেমন শশীদার সেলুন। শশীদার কাছে চুল কেটেছি টানা কত বছর। এরকম ধবধবে সাদা পোষাকে আমি আর কাউকে চুল ছাঁটতে দেখিনি। উড়ন্ত কাটা চুলকে চ্যালেঞ্জ জানানো সাদা পাঞ্জাবি, গলার পিছনে পুরু সাদা পাউডার, সাদা ঢোলা পাজামা। চুল কাটতে কাটতে মুখ চলত অফুরন্ত। বাবা কেমন আছেন? আমগাছে আম ফলেছে? পাশের বাড়ির কনা কি শ্বশুরবাড়ি থেকে একেবারেই চলে এলো? থুথু ছিটতো না একটুও।

অনভ্যস্ত চোখ আনাচে কানাচে খুঁজেও সেলুনটার হদিশ করতে পারল না। বন্ধ হয়ে অন্য কোন দোকান হয়েছে বুঝি। আর শশীদা? দুটো দোকান বাদেই শাড়িঘর। চেনা নাম দেখে ঢুকে পড়লাম। দোকানে সাদা ফরাসে বাবু হয়ে বসে আছে – আরে অরূপদা না? মাথার চুল একটাও নেই আর। কিন্তু পুরু সাদা কালো গোঁফ। চেহারাটা বেশ গোল হয়ে গেছে। ইতস্তত পায়ে বেরিয়ে যাবার কথা ভাবছিলাম। 

মনি? মণিময়? টালমাটাল খেতে খেতে উঠে দাঁড়াল অরূপদা। চিনতে পেরে পানের দাগলাগা ঠোঁট ছাপিয়ে সোনা বাঁধানো দাঁতে আলো ঝিলিক দিল। কতদিন বাদে দেখলাম তোকে। 

কেমন আছো? দোকান তো বেশ ভালোই চলছে! কিছু বলতে হয় বলে দিলাম। 

কোথায়? আজকাল শাড়ি পড়ে মেয়েরা কত আর? তবু এটায় বাবার দোকান মনে করে বসি। আমার আসল দোকানটা হল ফ্যাশন হাউজ, দেখবি স্টেশন রোডের সবচেয়ে বড় দোকান। সব মডার্ন ডিজাইন। ইংলিশ। ওখানে বিকেলে যাই। 

শশীদার দোকানটা? 

শশীদার স্ট্রোক হয়ে ডানদিকটা পড়ে গেল রে। দু বছর। ছেলেরাও তো এই লাইনে আসেনি। তাই দোকানটা বেচে দিল। মোবাইলের দোকানটা দেখছিস না? অরূপদা দোকানের দরজা দিয়ে উল্টো ফুটের মোবাইল ওয়ার্ল্ড দেখাল। ওটাই।

তোমার ছেলে মেয়ে? 

সবাই বড় হয়ে গেল রে। একই ছেলে। নিজে পছন্দ করে বিয়ে দিলাম, ফ্যাশন হাউজটা ওই দেখে। গর্বের হাসি ছড়াল অরূপদার গোঁফের আনাচে কানাচে। তোর?

বুঝলাম জীবনটাকে বেশ গুছিয়ে নিতে পেরেছে অরূপদা। কিছু কিছু স্মৃতিতে পলি পরে না। তাই গরম তেলের মত ছ্যাঁক ছ্যাঁকে কিছু প্রশ্ন ঠোঁটে জড়ো হয়েছিল। কিন্তু গিলে নিলাম। আমার তাড়াও ছিল। যে জন্য ঢুকেছিলাম জানা হয়ে গেছে। কাটিয়ে দেবার ভঙ্গীতে বললাম, ওরা পড়াশোনা করছে। পরে কথা হবে অরূপদা। বাজার দেখতে বেরিয়েছিলাম, রান্নার মাসী বসে আছে আমি মাছ কিনে নিয়ে যাবো বলে। 

আমার রাগের কারণটা অরূপদার জানার কথা নয়। বেরিয়ে আসছিলাম। পিছন থেকে বলল, আসিস না একদিন। আমাদের বাড়িটা ভেঙ্গে বড় ফ্ল্যাটবাড়ি তুলিয়েছি। আমি উপরতলায়। 

অরূপদাকে চিনি আমরা যখন হাফপ্যান্ট বেলবটস। 

বেলবটম মানেই সত্তরের দশক। হরে রাম হরে কৃষ্ণ। বেলবটমদেখেছিলাম অমর আকবর অ্যান্টনির পোস্টারে। সিনেমা হলে গিয়ে হিন্দি সিনেমা দেখা তখনো এক্তিয়ারের বাইরে। তাই শুধু পোস্টারে।আর দেখেছি পাড়ার দাদাদের পরনে। তাদের প্যান্টের ঘের দিনে দিনে বেড়েই চলেছিল। মাটিতে লুটানো এই বেলবটম দেখে মা মাসীমারা বলতেন – ব্যাস, আর ঘর ঝাঁট দেওয়ার দরকার নেই রে, বেলবটম পড়ে হেঁটে গেলেই হল। 

আমাদের তখনো ফুল প্যান্টের বয়স নয়। আমরা শুধু দেখতাম।স্বপনদা সাইকেল এককাত করে হিপ পকেট থেকে চিরুনি বের করে ল্যাম্প পোস্টের তলায় দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াত। বেলবটমের ঘেরে সাইকেলের প্যাডেল হারিয়ে যেতো। দরকারও ছিল না। বেলীদি যতক্ষণ হলদে বাড়ির দোতলার রেলিং ঝুঁকে পড়ে দাঁড়িয়ে থাকত, স্বপনদা থোড়াই প্যাডেলে চাপ দেবে! 

অরূপদার বেলবটমের ঘের আরও বেশী। তার চোখ ছিল ঝর্নাদির উপর। আমাদের ঝন্টুর দিদি। অরূপদা আসলে তাই ঝন্টু নড়েচড়ে বসত। অরূপদা ঝন্টুকে সাইকেলের রডে বসিয়ে নোলেদার চায়ের দোকান অবধি নিয়ে যেতো। কিনে দিতো ক্রিম রোল। পঁচিশ পয়সা দাম ছিল একেকটার। আইসক্রিম খাওয়ার মত চুষে চুষে খেতো ঝন্টু। ওফিরলেই ঘিরে ধরতাম সবাই। কি বলল রে? ঝন্টু মুখ গম্ভীর করে বলত, বাড়ির কথা তো, গোপন। বলা যাবে না। কথার ভাগ না দিলেও, ক্রিম রোলের ভাগে কার্পণ্য ছিল না। ক্রিম রোল খেতে খেতে অরূপদার প্রতি সবার সহানুভূতি চাগাড় দিত। বাবান তো সরাসরি ঝন্টুকে খোঁচাতদিদির কাছে সুপারিশ নিয়ে যাবার জন্য। ঝন্টুর কথা, দিদি বলে দিলে বাবা কেলাবে। 

আমি অরূপদার হয়ে সালিশ করিনি কখনো। ওকে আমার খেলোলাগত। অন্যদিকে ঝর্নাদির জন্য ছিল এক বিশেষ আসন। ঝন্টুদের বাড়িতে সত্য নারায়ানের পূজায় ছোটবেলা থেকে যেতাম। স্মৃতিতে জ্বলজ্বল সেই ছবিতে ঝর্নাদি মায়ের সঙ্গে সঙ্গে হাতে হাতে প্রসাদ বিলির ব্যাবস্থা করছে। ফুল, ধুপের গন্ধের স্নিগ্ধতার মাঝখানে নিবিষ্ট যেন সাক্ষাৎ দেবীরূপ। অন্তত আমার কাছে। ঝন্টু আর অন্য বাচ্চারা হুটোপাটি করছে। আমি ওদের সঙ্গে না গিয়ে ওখানেই নিষ্পলক। ভাবছি হাত থেকে কেড়ে যদি কোন কাজ করে দিতে পারি। ঠিক সেই সময়ে চোখের হাসি কথায় ছড়িয়ে ঝর্নাদি আমাকে বলত, কি রে নাড়ু চাই? দাঁড়া বলে ডিঙ্গি মেরে নৈবেদ্যর মাথা থেকে নাড়ু নাবিয়ে আমার হাতে।আমি সত্যি কি চাই সেটা বোঝার বয়স তখনো আমার হয়নি। 


সেই চাওয়াটা শরীর পেয়েছিল আরো পরে। সেটা ছিল দিদির বিয়ের পরের দিন। দিদিদের ট্যাক্সিটা তখন সবে মোড় ঘুরেছে, উলুধ্বনি ছাপানো কান্নারা স্তিমিত। আমি প্যান্ডেলের নীলসাদা কাপড় ধরে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছি। আহারে মনি, দিদি চলে যাবার বড় কষ্ট রে ভাই! বলে ঝর্নাদি আমাকে বুকে টেনে নিয়েছিল। ঝর্নাদির বয়স তখন আঠেরো কি উনিশ। আমার কানের কাছে ফিসফিস করে আশ্বাস দিয়েছিল, দেখবি আবার মজাও হবে, কলকাতায় দিদির বাড়ি যেতে পারবি। কেউ অমন নরম গলায় কথা বললে যেন আরও বেশি কান্না পায়। ফোঁস ফোঁস করে কাঁদতে কাঁদতে দম নিতে মুখ সরিয়ে আবার রাখতে গিয়েই ঝর্নাদির বুকের নরমটা খুঁজে পেয়েছিলাম। নারীস্তনের দৃঢ় কোমলতায় দুঃখ ছাপিয়েও কি এক আকুলতায় নিমেষে বিবশ আমি।মনের চোরাস্রোতে হঠাৎ স্লুইস গেট খুলে দেওয়া জলের কলরোল। একই সঙ্গে পাপবোধে জর্জরিত সদ্যকিশোর মন। ঝন্টুর দিদি তো আমারও দিদি। দিদি তক্ষুনি গেছে। ঝর্নাদি সেই ক্ষত বুজানোর চেষ্টায় ভাইয়ের ভালবাসায় আমাকে বুকে জাপটে ধরেছিল। কিন্তু একই সঙ্গে আমার সুপ্ত ভাবনার বন্ধ থলিটাও খুলে দিয়েছিল নিজের অজান্তে। 

ঝর্নাদি কলেজ যাবার সময় কি এক অমোঘ আকর্ষণে জানালার পর্দার আড়াল থেকে লুকিয়ে দেখতাম। বুকটা ধকধক করত। ওর জন্য কিছু করার ইচ্ছায় মনটা টনটন করত। ভাবতাম যদি কোনভাবে ঝর্নাদির কাছে যেতে পারি। ওই একটি দিনের মত। কিন্তু সুযোগ কোথায়?একদিন আগ বাড়িয়ে রাস্তায় ধরে বললাম, ঝর্নাদি, একটা কথা বলবো? দু বেনী ঝুলিয়ে কাঁধের ব্যাগ সামলাতে সামলাতে কলেজের পথে দৌড়াচ্ছিল তখন। নাকের উপর এক চিলতে ঘাম, রোদের তাপে গাল লালচে। থমকে দাঁড়িয়ে বলল, বল না মনি, কি বলবি। আমার ততক্ষণে গলা শুকিয়ে গেছে। তবু ত ত করে বললাম, ও পাড়ার একটা ছেলে, আমাদের দাদা মতন। অরূপদা। রোজ এসে ঝন্টুকে ক্রিম রোল খাওয়ায়, তোমার খোঁজ নেয়। একবার দম নিয়ে শেষ কথাটা জোরের সঙ্গে ছুঁড়ে দিলাম। আমার ভাল লাগে না। 

এই কথাটা কিভাবে বলবো তার অনেক মক্সো করেছিলাম। বিছানায় শুয়ে। ভাবনায় এই কথা শুনে ঝর্নাদি আমাকে বুকে জড়িয়ে চুলে বিলি কেটে দিত। বেলীর কুঁড়ির মত দাঁত ওর দুঠোঁটের কিনারায় ঘাই মারত। তোর মত আমার জন্য কেউ ভাবে না রে মনি। ঝর্নাদির শরীরের সুগন্ধ ভাবনা আমাকে তোলপাড় করত। আলটাগরার তলায় লুকোনো স্বরে বলতাম,আমি তোমার জন্য সব করতে পারি ঝর্নাদি। 

কিন্তু আসলে তেমন কিছুই হল না। বরং শুনে নিমেষে ওর মুখে ছায়া ঘনাল। ও তাই? ঝন্টুর সঙ্গে কথা বলবো তো। বলে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল। 

আমার সঙ্গে আর কোনদিন কথা বলেনি ঝর্নাদি। তবে এরপর অরূপদা ঝন্টুকে আর ক্রিম রোলও খাওয়ায় নি। আমাদের সামনে দিয়ে সাইকেল চালিয়ে চলে গেল, কিন্তু ঝন্টুকে ডাকল না। একদিন, দুদিন। লাল্টুজিজ্ঞেস করল, এ কিরে! সাপ্লাই বন্ধ হয়ে গেল কেন?

ঝন্টু বোধহয় এই প্রশ্নের জন্যই অপেক্ষা করছিল। একেবারে ফেটে পড়ল। ঠোঁটের কোনে ফেনা। কোন শুয়োরের নাতি দিদির কাছে চুকলি করেছে, একবার যদি নাম জানতে পারি না - খচ্চরটার বিচি খুলে হাতে ধরিয়ে দিতাম। বলে একবার আমাদের সবার উপর সার্চ লাইট ফেলার মত চোখ বোলাল।


নিমেষে আমার মুখ শুকনো। জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটলাম। ঝর্নাদি নাম বলেনি জেনে ধরে তাও বাতাস এলো। 


ওর এত শোকতাপ শুধু ক্রিম রোলের জন্য, এটা আমি বিশ্বাস করি নি। খানিক পরে বেরিয়েও গেল কথাটা। ঝর্নাদি অর্ধেক দিন কলেজে টিফিন না খেয়ে ঝন্টুর জন্মদিনে একটা সত্যিকারের বেলবটম বানিয়ে দেওয়ার জন্য পয়সা জমাচ্ছিল। সেটা নট হয়ে গেছে। 


ঝন্টু ওর হাফপ্যান্ট বেলবটসের পকেটে হাত ঢুকিয়ে প্রায় স্কার্টের মত দুদিকে ছড়িয়ে দিয়েছিল আর গলায় চেপেছিল উদ্গত কান্না। ভেবেছিলাম এবার পুজায়- 

আমাদের হাফপ্যান্ট বেলবটস নামটা বাবানের দেওয়া। সেটা বড় বড় থান থেকে বাড়ির সব ছেলেদের এক রকমের জামা প্যান্ট বানানোর যুগ। রেডিমেড বলে কিছু ছিল না। চাপা প্যান্টের প্রশ্নই নেই। সেই সব প্যান্ট হত ঢলঢলে, ছিরি ছাঁদ হীন। হারাধনদা কেন যে শুধু কোমরের মাপ নিয়ে ছেড়ে দিত না! বাবানের প্যান্টটা তার মধ্যে আরও সরেস। ওর পায়ের মত চারটে পা ঢুকে যাবে অনায়াসে। বাবান উদাস মুখে বলতো, অনেক সুবিধাও আছে রে। কল ছাড়তে বোতাম খুলতে হয় না। হাওয়াবাতাসও ভাল খেলে। 


সময় থমকে ছিল না, আমরাও ফুলপ্যান্টের দিকে এগোচ্ছিলাম। এরমধ্যে একদিন অরূপদা আর ঝর্নাদিকে ট্রেন থেকে একসঙ্গে নাবতে দেখা যায়। নেবেই দুজনে দুদিকে। কিন্তু বাবান হলফ করে বলল, ওরা না কি একসঙ্গেই কোথাও থেকে আসছিল। ঝন্টু ছিল না তখন, থাকলে আর এসব কথা হত না। কিন্তু আমি খুব দমে গেছিলাম। যদিও আমার বীনার তার আগেই কেটে গেছিল। তবে একতরফা প্রেমে তখনো পুরোপুরি ভাঁটা পড়েনি। ঝর্নাদি সত্যি বড় ভাল ছিল যে। ওর ঝলক লাগান চোখ, গালে টোল ফেলা বেলকুঁড়ি হাসি এক অমোঘ আকর্ষণী শক্তিতে টানতো আমাকে। যখন গাছকোমর বেঁধে পাড়ার পূজার আয়োজনে লেগে যেতো, চারদিকটা কেমন যেন আলো আলো হয়ে যেতো। তার তুলনায় অরূপদা যেন মিয়ানো মুড়ি। হয় না একেকজন? একটু দুঃখী দুঃখী ভাব। বাবানের ভাষায় লাথখোর চেহারা। দেখে মনে হয় না জীবনে জোর গলায় কিছু চাইবার সাহস আছে। অথচ পেয়ে তো গেল, ঝর্নাদির মত মেয়েকে। এরপর মাঝে মাঝেই অরূপদা আর ঝর্নাদির একসঙ্গে কোথাও দেখতে পাওয়ার খবর শুনতাম আর আমার কেন মনে হত এর জন্য আমিই দায়ী। যদি ঝর্নাদিকে আমি কিছু না বলতাম তবে কি অরূপদারএই চাওয়ার খবরটা কখনো পৌঁছাতে পারত? কোনদিন জানব না। 

এর মধ্যে একদিন সকালে লাল্টু হাঁফাতে হাঁফাতে এলো। শুনেছিস? 

জানলাম অরূপদা আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছে। ধুতরো ফুলের বীচি খেয়ে। হাসপাতালে নিয়ে গেছে। ঝন্টুর কাছে জানলাম ঝর্নাদিও দেখতে গেছে। এই নিয়ে তার বাড়িতেও তুলকালাম। 


অরূপদা আর ঝর্নাদির সম্পর্কে কিছু সমস্যা ছিল। এক তো অরূপদারা সাহা, ঝন্টুরা ব্রাম্ভন। এরকম বিয়ে তখন সচরাচর হত না, হলেও নিশ্চিত পরিবার পরিজনের অমতে। বাড়ির থেকে আলাদা হয়ে। সেখানেই দ্বিতীয় সমস্যা। অরূপদাদের পৈতৃক শাড়ির ব্যাবসা। তখনই দুটো শাড়ির দোকান – শাড়ি মহল আর শাড়ি ঘর। দুই ছেলে দুটো দেখবে এমনই ভাবনা। কিন্তু বাড়ির অমতে বিয়ে হলে অরূপদার কপালে ফ্যা ফ্যা গোবিন্দ। জানা গেল অরূপদা সাহস করে কথাটা বাড়িতে তুলেছিল। ফলাফল ধুতরো বীচি। 


ঝন্টুদের অবস্থা অত কিছু ভাল নয়। ওর বাবা রেলের টি টি। কিন্তু তাই বলে ওর বাবা কোন টাকাওয়ালা সাহার বাড়িতে মেয়ের বিয়ে দেবার জন্য তৈরী নয়। সুতরাং ঝর্নাদির গতিবিধি নজরদারিতে চলে এলো। ধুতরো বীচি হজম করে অরূপদা সুস্থ দেহে বাড়ি ফিরে গেল। শাড়ি মহলে আরও বেশী বেশী বসতে দেখা যেতে লাগল। হয়তো বাড়িতে ভেবেছিল ফ্যা ফ্যা করে না ঘুরে কাজকর্মে মন দিলে প্রেমের ভূত ভাগবে। 

কিন্তু ভাগেনি। আগে ওরা মাঝে মাঝে ঘুরতে যেতো, আড়ালে আবডালে। তাই নিয়ে ফিসফিস হত। বলে না, ন্যাংটার নেই বাটপাড়ের ভয়। অনেকটা সেরকম। সবাই তো জেনেই গ্যাছে। এবার দুজনে দেখিয়ে দেখিয়ে ঘুরতে শুরু করল। নিশ্চিত এই সাহস অরূপদার হত না, ঝর্নাদির মদত না থাকলে।


কিন্তু সাহস দিলেও ফল ফলছিল কোথায়? অরূপদা আবার ধুতরো বীচি খেলো। পেট পাম্প করে বেঁচেও গেল। কিন্তু তাতে বাড়ির লোককে গলাতে পারেনি মোটেই। মাঝের থেকে অরূপদা খোরাক। সাইকেল চালিয়ে গেলে ছোট ছোট বাচ্চাদের মুখেও ধুতরো বীচির টিটকারী। 


ওদেরকে তারপরেও একসঙ্গে ঘুরতে দেখা যেতো। অরূপদা সাইকেল হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে চলেছে, ঝর্নাদি পাশে পাশে। কোন কোনদিন ঝর্নাদিকে সাইকেলে বসতেও দেখেছি। আবার কখনো এক ফুটে সাইকেল হাঁটিয়ে চলেছে অরূপদা, অন্য ফুট দিয়ে হন হন করে হাঁটছে ঝর্নাদি। মানে ঝগড়া হয়েছে। জানালার ধারে আমার পড়ার টেবিল ছিল। বুক ফাটলেও যতক্ষণ চোখে পড়ে দেখতাম। ওদের দুজনের একসঙ্গে যাওয়াটা অরূপদার বারবার ধুতরো বীচি খাওয়ার মতই সবার চোখ সওয়া হয়ে গেছিল। আমাকে বাদ দিয়ে।

আমি ছাড়াও আর একজন এটা সহ্য করতে পারত না। সেটা ঝর্নাদির বাবা। ঝন্টুর মুখ ফসকে কখনো কখনো সেটা বেরিয়ে গেছে বলে জানি। অতবড় মেয়েকে হাত তুলতে শুধু বাকী রেখেছে। যা নয় তাই নাকি বলে, ওর মা থামাতে পারে না। ঝন্টু ছলছল চোখে বলেছে, দিদি মুখ বুজে সব সহ্য করে যায় রে। কলেজ পাশ করে একটা চাকরি পেলেই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে।

সেটা হয়তো ওর বাবাও আঁচ পেয়েছিলেন। তাই সাত তাড়াতাড়ি মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করলেন। ঝন্টুর কাছে শুনলাম ওর বাড়িতে ধুন্ধুমার চলেছে। দিদি বিয়ে করবে না, বাবাও অনড়। এর মধ্যেই বিয়ের ব্যবস্থা এগিয়ে চলল। ঝর্নাদি আর অরূপদাকে তখনো সাইকেলে দেখা যেতো। তবে বেশীর ভাগ সময়েই একসঙ্গে থেকেও একটু আলাদা। কিংবা অরূপদা মিনমিন করে কানের কাছে কিছু বলছে, আর ঝর্নাদি রাগের সঙ্গে ওকে ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছে। 

তখনই শেষবারের মত অরূপদা ধুতরো বীচি খায়। ঝর্নাদি দেখতেওযায়নি। উল্টে ঝর্নাদিকেই পরদিন থেকে খুঁজে পাওয়া গেল না। চারদিকে খোঁজ খোঁজ। কোথাও নেই। পুলিশ এলো। 

শুনে অবধি আমিও অস্থির হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। সামনেই স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা, কিন্তু পড়ায় মন নেই। সবার মুখে ঝর্নাদির কথা। আমার বাড়িতেও। কথাগুলো তত ভাল নয়। কেউ ঝর্নাদিকে খারাপ কথা বললে মনে হয় আমার কানে গরম সীসে ঢেলে দিচ্ছে। খুব খারাপ লাগত। 

ঝন্টুটা শুকনো মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। ওকে পাকড়াও করলাম। কিন্তু বুঝলাম কেউই কিছু বুঝতে পারছে না। সকালে ঘুমে থেকে উঠে আর বাড়িতে পাওয়া যায় নি। 

কিচ্ছু সঙ্গে নিয়ে যায়নি, হ্যান্ড ব্যাগও নয়। 

তাহলে?

জানি না রে। ঝন্টুর মুখ দেখে মায়া হল। দিদিকে বড় ভালবাসত। আমাকে আগের দিন জড়িয়ে ধরে খুব আদর করেছিল দিদি, আমার তখনই বোঝা উচিত ছিল রে। হাউ হাউ করে কান্না জুড়েছিল ছেলেটা। 

কিচ্ছু সঙ্গে নেয়নি দেখেই পুলিশের সন্দেহ হল। বোসপুকুরে জাল ফেলল। উঠে এল ঝর্নাদির বডি। তখন আর ঝর্নাদি বলে চেনা যাচ্ছিল না। সারা শরীর ফুলে ঢোল। গায়ে কচুরিপানা জড়ানো। চুলে শেওলা। সবুজ হয়ে যাওয়া মুখের এখানে ওখানে মাছে খুবলে খেয়ে নিয়েছে। আমি দেখেই বমি করতে করতে বাড়ির দিকে ছুট। 

বত্রিশ বছর আগের কথা। অরূপদাকে দেখে সব আবার জীবন্ত হয়ে উঠল। মনে হচ্ছে যেন গতকালের ঘটনা। আমার মুখ দেখে মার কি মনে হল কে জানে। পাতে ডাল দিতে দিতে বলল, ঘুরে আয় না মনি এদিক ওদিক। দেখবি পাড়ায় অনেক উন্নতি হয়েছে। জানিস তো আমাদের বোসপুকুরটা বুঁজিয়ে দিয়েছে। 


বুঁজিয়ে দিয়েছে? ভাতমাখা বন্ধ করে জিজ্ঞাসু চোখে মার দিকে তাকালাম। ঝর্নাদি চলে যাবার পর আমি আর কখনো পুকুরটার ধারেকাছে যেতে পারিনি। অথচ ছোটবেলায় গরমকালে ওটাই ছিল আমাদের দাপাদাপি করার জায়গা। 

হ্যাঁ, ওখানে ছোটদের জন্য একটা পার্ক করেছে এখন। ছোটদের খেলার সব জায়গা তো চলে গেছিল। বেশ হয়েছে দেখতে। যাস একবার।

বিকেলবেলা যাবো কি যাবো না করতে করতে পৌঁছে গেলাম পার্কটায়। একসময় এই জায়গাটা জুড়ে যে এত বড় একটা পুকুর ছিল কে বলবে! পুকুরের সব চিহ্ন মুছে দিয়ে রেলিং ঘেরা একটা সবুজের আস্তরণ। এত বড় নয় যে ছেলেরা ফুটবল বা ক্রিকেট খেলতে পারবে। তবে একদম ছোটদের জন্য ভাল। দোলনা, স্লিপ এসব করেছে। পার্কের পাঁচিল ঘেঁষে সারি দিয়ে ফুলের গাছ। গাঁদাই বেশী, যত্ন কম করতে হয়। বসার বেঞ্চি আছে খান দুই। শেষ বিকেলের কুসুম কুসুম আলোয় চারদিক বড় মায়াময়। ছোট ছোট বাচ্চারা হুটোপাটি করে খেলছে। আমি আড়াআড়ি পার হয়ে বেঞ্চিতে বসতে গিয়েই অরূপদাকে দেখলাম। একটু দূরের অন্য বেঞ্চিটায় বসেছিল। আমায় দেখে উঠে এলো। 

নাতিটাকে নিয়ে এই সময় পার্কে আসি। তারপর আবার সন্ধ্যা বেলায় দোকানে বসতে যাবো। কেমন একটা কৈফিয়ত দেবার ভঙ্গীতে বলল। 

আমার কথা বলতে ইচ্ছা করছিল না। অরূপদা কি বুঝল, আমাকে আর কিছু বলেনি। 

একই বেঞ্চির দুই কোনায় আমরা দুজনে বসে রইলাম। সূর্যের নিভে আসা আলোর মত উত্তাপহীন। চুপচাপ। অনেকক্ষণ। 




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন