শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

শাকুর মজিদ 'এর গল্প : চিঠি

‘স্যার, আমার কাছে একটা গল্পের প্লট আছে, আপনি কি কাহিনীটি শুনবেন?’ 

‘আমি শুনে কি করবো?’ 

‘যদি আপনি এটা নিয়ে একটা নাটক লিখেন। স্যার, আমি শুধু কাহিনীটা আপনাকে বলতে পারি, নাটক আমি লিখিনা স্যার-ওটা আপনার বিষয়।’ 

‘ঠিক আছে, বলো, শুনি।’ 

‘আমি কি খুব সংক্ষেপে বলবো ? নাকি একটু ইলাবরেট করে..’ 

‘তোমার যেভাবে ইচ্ছা হয় বলো।’ 

লেখক বসে আছেন তার ফ্লাটের ড্রয়িং রুমের কার্পেটের উপর। মনে হচ্ছে কিছুক্ষনের মধ্যে তার আড্ডার বাকী সঙ্গি সাথিরা চলে আসবেন। একটু আগে এক টেলিভিশনের প্রোগ্রাম বিভাগের প্রধান এসে বড় একটা খাম তার পাশে রেখে গেছেন। খামের ভেতর কী আছে, আমি জানি। না গুনে বলতে পারবো- ওখানে কড়কড়ে নোটের পাঁচ লাখ টাকা আছে। আগামী ঈদের দিন তার নাটক প্রচার হবে ঐ টেলিভিশনে। কাচুমাচু করে লোকটি বলে গেছে, ‘স্যার, হাসির নাটক কিন্তু পাবলিক খায় বেশী, একটু দেখবেন।’ একটা নতুন সিগারেট ধরাতে ধরাতে তিনি বলেছেন, ‘যাও এবার।’ হেড অব প্রোগ্রাম একটা তৃপ্তির হাসি নিয়ে চলে গেলেন। স্যারের নিশ্চয়ই এখন নতুন গল্পের দরকার। একারনেই হয়তো রাজী হলেন গল্প শুনতে। 

‘স্যার, গল্পটা কিন্তু বেশ আগের, প্রায় তিরিশ বছর আগের কথা। আমি তখন মেট্রিক পরীক্ষা দিয়ে দীর্ঘ দিন গ্রামের বাড়িতে আছি। আমাদের গ্রামে সে সময় খুব বেশী শিক্ষিত লোক ছিলেন না। গ্রামের অনেক লোক আমার কাছে চিঠি লেখানোর জন্য আসতো। এসব চিঠি লিখতে লিখতে এবং তাদের কাছে আসা চিঠিগুলো পড়তে পড়তে তাদের সবার ঘরের সব খবর আমার জানা হয়ে যেতো। গ্রামের লোকগুলো আমাকে খুবই বিশ্বাস করতো। ওরা জানতো, কখনোই তাদের ঘরের খবর আমি বাইরে দেবো না।’ 

‘গল্পটা বলো।’ 

‘জ্বী স্যার, বলছি। একদিন খুব সকালে ঘুম ভাঙতেই আমি টের পেলাম, পাশের কামরায় আমার মার সঙ্গে এক মহিলা কথা বলছেন। গলার স্বর শুনে আমি তাঁকে চিনতে পারি। তিনি বলাইর মা। এই মহিলার নিজের কোনো নাম থাকলে থাকতেও পারে। কিন্তু গ্রামের সবাই তাকে বলাইর মা নামেই ডাকে। আমার দাদী ডাকতেন ‘বগুড়ী’ বলে। বকের মতো ফর্সা, লম্বা বলেই তার এই নাম। বলাই তাঁর বড় ছেলে। আমরা যখন খুব ছোট তখন বলাই ভাইকে দেখেছিএ। রাজপুত্রের মতো চেহারা, ফর্সা-লম্বা-চওড়া-পেটানো শরীর। আমাদের থেকে ৫/৬ বছর বড়। তার ছোট ভাই মনাই, আমাদের ২/৩ বছর রড়। আমরা এক সাথে ফুটবল খেলতাম, বলাই ভাই রেফারি হতেন। উনার যখন ২০/২১ বছর বয়স তিনি চলে যান দুবাই, সেটা ১৯৭৫-৭৬ সালের কথা। 

৩/৪ বছর পর তিনি তার ছোট ভাই মনাইকেও দুবাই নিয়ে যান। আমি ক্যাডেট কলেজ থেকে ছুটি ছাটায় যখই গ্রামে আসি, তাদের ঘরবাড়ির অনেক পরিবর্তন দেখতে পাই। তাদের বাড়ি পার হয়েই আমাকে সব সময় রড় রাস্তায় উঠতে হয়। এক সময় দেখি তাদের ঘরের বাইরে একটা লেট্রিন বানানো হয়েছে। আগে মুতরা বনের ভেতর বাঁশের উপর ছিলো এই ব্যবস্থা। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় কিছু দূর আমাদের নাক বন্ধ করে যেতে হতো, এখন আর হয়না। আরো কিছুদিন পর দেখি তাদের ঘরে শনের চালা বদলে টিন লাগানো হয়েছে।’ 

স্যার প্রায় অধৈর্য হয়ে যান। বলেন, ‘তোমার গল্পটা কোথায়? ঐ মহিলা কি বলছে, সেটা বলো।’ 

‘বলছি স্যার, আরেকটু বলে নেই। ১৯৭৮-৭৯ সালের কথা। আমি প্রায়ই তাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় দাঁড়িয়ে থাকতাম।’ 

‘কেন?’ 

‘স্যার, গান শোনার জন্য। তাদের বড় ভাই বলাই একবার দুবাই থেকে আসার সময় একটা টু-ইন-ওয়ান নিয়ে এলেন। তখন ব্যাটারির যুগ, গ্রামে ইলেকট্রিসিটি আসেনি। আমরা স্কুলে যাওয়ার সময় দেখতাম, তাদের বারান্দায় একটা টুলের উপর ঐ যন্ত্রটা বসিয়ে দেয়া হয়েছে এবং ফুল ভলিয়মে গান ছাড়া হয়েছে। সব হিন্দি গান। যেমন, ‘মেরা মন দুলে মেরা প্রাণ দোলে..’ এ টাইপের গান। গ্রামের অনেক লোকজন গোল হয়ে বসে থাকতো টেপ রেকর্ডারের পাশে। বাড়ির অন্যঘরের মানুষজন ছাড়াও অন্যবাড়ি থেকে লোক আসতো। আমি দেখতাম বলাই ভাই লুঙ্গির উপর সাদা গেঞ্জি পরে হাঁটতেন, তার হাতে চকচক করতো ঘড়ির বেল্ট।’ 

‘হুম। গল্পটা কি, সেটা বলছো না কেনো?’ 

‘জ্বী স্যার, বলছি, গল্পটা হচ্ছে চিঠি লেখা। আমি চিঠিটা লিখে দেই নি।’ 

‘কেন?’ 

‘বলছি স্যার। তাদের দুই ভাইয়ের সঙ্গেই আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিলো। বলাই ভাইর সঙ্গে দেখা হলেই নানা রকম গল্প করতেন। গাছ থেকে পেয়ারা পেড়ে অনেক দিন আমার হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন। কয়েক বছর পর কারো সাথেই আমার দেখা হয় না। তারা ছুটি ছাটায় যখন গ্রামে আসেন, আমি হয়তো তখন গ্রামে থাকি না। তো স্যার, সেদিন ভোর বেলা আমার ঘুম ভেঙ্গেছে বলাইর মার গলার আওয়াজে। তিনি বারবার আমার মাকে বলছেন-ছেলে কখন ঘুম থেকে উঠবে ? 

মা বলছেন, আরেকটু পর। ওর কলেজে খুব ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠতে হয়। সকালে ঘুমাতে পরে না। এ জন্য আমি জাগাইনা। সে নিজে থেকে যখন উঠবে তখন উঠুক। 

বলাইর মার গলা শুনে কিঞ্চিত অবাক হই আমি। এর আগে বহুবার বলাইর বাপ এসেছেন আমার কাছে চিঠি লেখাতে। আমার পিঠ চাপড়ে বলেছেন বহুবার, “বাপজান, তুমার লেখার মইধ্যে রস আছে। যতোবার তুমারে দিয়া লেখাইছি, ততোবারই টাকা পাইছি।” বলাইর বাপ আমাকে ডিকটেশন দিতেন, আমি সে ডিক্টেশন অনুযায়ী চিঠি লিখতাম। স্যার, কিছুদিন আগের ডিকটেশনের একটা নমুনা দেই। যেমন-“বাবা বলাই, আমার জানের জান, কলিজার টুকরা, আমার দোয়া নিও। আশাকরি তুমি পরম করুণাময়ের অশেষ দোয়ায় আরবের পাকভূমিতে সুস্থ শরীরে আছো। আমরাও আল্লাহ তা’য়ালার কৃপায় ভালোই আছি। গতকল্য তোমার পত্রখানা পাইয়া যারপর নাই আনন্দিত হইলাম। বাবা, লিখিয়াছো, তোমার শরীর কিছুটা খারাপ। আমি আল্লাহ তা’য়ালার কাছে দুই হাত তুলিয়া মোনাজাত করিতেছি। নিশ্চয়ই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমার দোয়া কবুল করিবেন। পর সমাচার এই যে, দক্ষিণের বন্দে যে দুই কিয়ার জমি গত বছর কিনিয়াছিলাম, তার পাশের জমিটা বিক্রি হইবে। পনেরো হাজার টাকা কিয়ার। জমির এমন দাম থাকিবে না, বাড়িয়া যাইবে। এই জমিটা কিনিতে পারিলে ভবিষ্যতে তুমাদের উপকার হইতো। যদি সম্ভব হয়, অতি সত্বর কিছু টাকা পাঠাও। আর শোন, মনাইর জন্য পাত্রী দেখিতেছি। চারিদিক হইতে খবর আসিতেছে কিন্তু পাত্রী আমাদের পছন্দ হইতেছে না। বড় বউয়ের মত রূপবতী, গুণবতী কইন্যা পাওয়া বড় কষ্টের। পাত্রীর সন্ধান পাওয়া মাত্র তোমাদের জানাইবো। ......’’ এ রকম। 

কিন্তু এই চিঠির জবাব আসার আগেই বলাইর মা এসেছেন নতুন চিঠি লেখাতে। তিনি একটা চিঠি নিয়ে এসেছেন। এই চিঠি আমার মা তাকে আরেকবার পড়ে শোনাচ্ছেন। বাবার কাছে এ চিঠি লিখেছেন তার বড় ছেলে বলাই। 

বলাই আর মনাই দু’জন এক সঙ্গে এক ঘরে থাকে। তারা দুইজন একই কোম্পানীতে কাজ করে। কনস্ট্রাকশনের কাজ। কাজ খুব হেভি, কিন্তু বেতন ভালো। দ্ইু ভাই মাসে যা বেতন পান দেশে বাবার কাছে পাঠিয়ে দেন। গত কয়েক মাস ধরে টাকা নিয়মিত আসছে না, কারণ- বড় ভাই বলাইয়ের অসুখ। তার কিডনীতে রোগ ধরা পড়েছে। ওখানকার কোম্পানীর ডাক্তার তাকে বলে দিয়েছে তার দুইটা কিডনীই নষ্ট হয়ে গেছে। একটা কিডনী যদি তাকে দেয়া যায়, সে বেঁচে যেতে পারে। কিন্তু একটা কিডনী সে পাবে কেথায়? এটা নাকি কিনতেও পাওয়া যায়, তবে এটা কিনতে যে টাকা লাগে বাড়ি বিক্রি করেও সেটা হবে না। এখন উপায় একটা আছে। বড় ছেলে লিখেছে যে, ডাক্তার বলেছে, রক্ত সম্পর্কের কারো, যেমন আপন ভাইয়ের একটা কিডনী পেলে সেটা তারা লাগিযে দিতে পারে। ডাক্তার নাকি এও বলেছে যে, একটা কিডনী কাজ করলে নাকি মানুষ বাঁচতে পারে। এখন ছোটভাইকে ওখানে সে এটা বলতে পারছে না। বলাইর একটা পুত্র আছে। নাম রাখছে নাহিয়ান। আরবের বাদশার নামে নাম। মাত্র দু’বছর বয়স তার। এখন এই ছেলেটার কথা বারবার লিখেছে। এই ছেলেরে এতো ছোট রেখে সে দুনিয়া ছেড়ে যেতে চায় না। 

বলাই তার বাবার কাছে চিঠি লিখেছে, বাবা যেনো ছোট ভাই মনাইকে লিখেন, তার একটা কিডনী বড় ভাইকে দিয়ে দিতে। বলাইয়ের বাবা কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না ছোটে ছেলেকে চিঠি লিখতে। কাল সারারাত বলাইর বাবা নির্ঘুম কাটিয়েছেন। ফজরের ওয়াক্তে জায়নামায নিয়ে বসেছেন এখনও জায়নামাযেই আছেন। বলাইর মাকে পাঠিয়েছেন আমাদের বাড়ীতে, নিজে আসার সাহস পাননি। 

বলাইর মা ইনিয়ে বিনিয়ে আমার মা’র কাছে এসব কথা বলছেন এবং তার কাছেও পরামর্শ চাচ্ছেন। আমি পাশের কামরা থেকে খুব স্পষ্টভাবে তাদের কথাবার্তা শুনতে পাই। এক সময় বলাইয়ের মা কাঁদতে কাঁদতে আমার মা’কে বললেন, ‘তোমার ছেলে তো অনেক বিদ্যান শুনছি, তার কাছে এসেছি, সে আমাকে বলে দিবে, আমি কোন ভাষায়, কী বলে ছেলেকে চিঠি লিখবো।’ 

‘তুমি কি লিখলে? ’ 

‘স্যার, আমি আর ঘুমাতে পারলাম না। বিছানা থেকে উঠেই পাশের কামরায় চলে গেলাম। আমার মার হাতে বলাই ভাইর লেখা চিঠি। সেটা একবার পড়লাম। বলাইর মা আমার কাছে প্রথমে জানতে চাইলেন, কিডনী কী জিনিস। ওটা কী কাজে লাগে। আমি যতটুকু জানি তাকে বুঝালাম এবং বললাম, আপনি যা লিখতে চান আরো কয়েকদিন চিন্তা করেন। সপ্তা খানেক পরে তাকে জবাব দেন। এর ২দিন পরেই আমার কলেজ চলে যাওয়ার তারিখ ছিলো, আমি চলে গেলাম। আমি সেদিন এ চিঠির জবাবটি দিতে পারিনি। কিন্তু স্যার, এ বিষয়টা বহুবছর পরও আমার মাথায় রয়ে গেছে। চিঠির জবাবটা আমার লিখে দেয়া উচিত ছিল, তাই না, স্যার?’ 

লেখক বলেন, তোমার লেখা উচিৎ ছিলো, ‘‘এই গাধা, দুইটা কিডনী দিয়ে তুই কী করবি? একটা তোর বড় ভাইকে দিয়ে দে। তাতে তোর কোনো ক্ষতি নাই, মাঝখানে তুই ভাইয়ের জীবন বাচালী।’’ 

আড্ডার লোকজন চলে আসেন সবাই। গল্প শোনায় মন নাই লেখকের । আড্ডা ভাঙে মধ্যরাতে। আমি তার এপার্টমেন্ট থেকে বিদায় নেবো, এমন সময় লেখক বলেন-‘আচ্ছা, তারপর কী হয়েছিল বড় ভাইর?’ 

‘বেশ কয়েক বছর আগে গ্রামের বাড়িতে বিকেল বেলা হাঁটতে বেরিয়েছি। হাঁটতে হাঁটতে বলাইদের বাড়ির কাছেই চলে আসি। দেখি ওই বাড়ি থেকে একটা মটর বাইক বেরুচ্ছে। ১৮/১৯ বছর বয়সী এক ধবধবে ফর্সা তরুণ মটর বাইক চালাচ্ছে, তার পেছনে ১৩/১৪ বছর বয়সী আরেক কিশোর। দুইজনের চেহারাই রাজপুত্রের মতো, যেমন ছিলো বলাই আর মনাইর। 

আমার ইচ্ছা হলো তাদের সঙ্গে কথা বলতে। গ্রামে গিয়ে ছেলেদের নাম জিগ্যেস করে লাভ নাই, চেনা যায় না, জিগ্যেস করতে হয় বাপের নাম, দাদার নাম। আমি সামনের তরুণকে জিগ্যেস করি, তোমার বাবার নাম কি? 

বলাই। 

তোমার নাম কি নাহিয়ান ? 

জ্বী। 

পেছনের ছেলেকে দেখিয়ে নাহিয়ানকে জিগ্যেস করি- ও তোমার চাচাতো ভাই না? 

ছেলেটি বলে, না ও আমার আপন ভাই। আমার বাবার মৃত্যুর পর চাচার সাথে আমার মা’র বিয়ে হয়। 

স্যার, আমি একবার ভাবলাম, যাই- ভেতরে গিয়ে ওর দাদীর কাছে সেই চিঠিটা না লেখার জন্য মাফ চেয়ে আসি। সেদিনের পর, আমি আর বলাইর মার মুখোমুখী হইনি কখনো। 

নাহিয়ানকে জিগ্যেস করি, তোমার দাদী কোথায় ? 

নাহিয়ান ঘরের ভেতর দেখিয়ে বলে, দাদী বিছানায়, বিমার, আপনি যাবেন? 

আমি নাহিয়ানের দিকে চেয়ে থাকি, ভেতরে যেতে সাহস হয় না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন