শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

মধুময় পাল'এর গল্প : কাকবেলা

গরালির খাল থেকে চরণের ডাঙা পর্যন্ত লোকালয় ছানবিন করে তিন জিপ আর পাঁচ ভ্যান ভরতি পুলিশের হরেক মাপের অফিসার, কনস্টেবল, উর্দি, বুট, তকমা, আগ্নেয়াস্ত্র, খিস্তিখেউড়, বারফট্টাই, চুকলিবাজির বিশাল বাহিনী ধোঁয়া আর দুলো ওড়াতে ওড়াতে সেতু পেরিয়ে গেল। কেব্‌ল লাইনে দিনভর খুনখারাবি, হরণধর্ষণের বিশ্বায়িত বিনোদনের হিমঘরের মালের মধ্যে লোকাল টাটকা জিনিস অধিবাসীরা ভালোই খায়। বিশেষ করে কেসটার জটিলতা আছে, গুণ্ডামি-মালকড়ি-রাজনীতি ছাড়াও টেকনোক্র্যাট-ব্যুরোক্র্যাটের মিশেলে এক অনাস্বাদিত খাদ্যদ্রব্যের মোহমায়া পেয়ে যায়।

তখন হয়তো ধূসর অন্ধকারে ত্রস্ত কাক ছোটো ছোটো উড়ানে দেখে নিচ্ছে কোথায় আলো কিংবা মেঘলা দুপুরের ঠান্ডা বাতাসে গাঁজার মাঠে ইন্ডিয়ান পার্লামেন্ট খেলছে শালিখের দল। 

তখন হয়তো পাখিমামা সুমিতেন্দ্র পত্রনবীশ বারান্দায় হাঁটতে হাঁটতে বলে উঠলেন, কোন বনেতে কটার বাসায় বাড়ছে ছোটো ছানা/ডাহুক কোথায় ডিম পেড়েছে তার নখের আগায় জানা। 

ধানবাদ থেকে বাবার চিঠি পায় সায়ম। লিখেছেন, সঞ্জয়ের কাছে শুনলাম, তুমি টাউন লাইব্রেরির সম্পাদকের সঙ্গে বিবাদ করেছ। শুনে আমি শঙ্কিত। ওরা অসম্ভব ক্ষমতাশালী। ওদের সংগঠন আছে, দল আছে। ওদের হাত কতদূর যায় তুমি জানো না। ওরা তোমাকে একঘরে করে দিতে পারে, তুমি যে দু-চারজন শিক্ষিত মানুষের বাড়ি যাও সেটা বন্ধ হতে পারে, তোমাকে নানাভাবে অপমান করতে পারে, তোমার ইন্টারভিউ লেটার আটকে বা মাঝপথে ফেলে দিতেও পারে, প্যানেলে তোমার নাম শেষ মুহূর্তে ধ্বংস করতে পারে। সঞ্জয় বলল, তুমি নাকি লাইব্রেরিতে কিছু সিরিয়াস বই আনার জন্য চাপ দিচ্ছিলে। যা-সব বই কেনা হয়, বেশিরভাগই রাবিশ বলেছ তুমি। আমি তোমার চিন্তাকে সমর্থন করি, কিন্তু কাজের বিরোধিতা করি। যা ভাবো, সেটা না করাই ভালো। চিন্তাশক্তিকে প্রখর রাখো, আচরণকে সময়োপযোগী করে নাও। তুমি ভেবো না যে লাইব্রেরির বই সম্পর্কে তুমি একাই এরকম ভেবেছ। অনেকেই ভাবে, বলে না। তুমি হয়তো জানো না যে, লাইব্রেরির বই কেনা হয় পয়ঃপ্রণালী দিয়ে, যার পঙ্কিলতা ও দূষণ থেকে সমাজ কোনোভাবে রেহাই পেতে পারে না। তোমার সম্পাদক হয়তো সেই প্রণালীর বাসিন্দা। পার্টির বই কেনার বাধ্যবাধকতাও আছে লাইব্রেরির পরিচালকদের। সুতরাং কী দরকার! আমি তোমাকে ভালো বই কিনে দিতে পারিনি। দু-বেলা ঠিকমতো খাবারই জোটাতে পারিনি। আমি অনুতপ্ত। আশীর্বাদ করি, তোমার সন্তান যেন প্রচুর ভালো বই পায়। সেই আর্থিক যোগ্যতা যেন তোমার হয়। 

সল্ট লেক থেকে অরূপ ঘটক বলছি। হ্যাঁ, বলুন। খুব সুন্দর সুন্দর গান বাজাচ্ছেন, পালদা! আমাকে পালদা বলেন শুধু ভাটপাড়ার বৈদ্যনাথ মজুমদারমশায়। উনি জানিয়েছেন, ওঁর বয়স সেভেনটি-সিক্স। আপনারও কি সেরকমই ঘটকমশায়? না না, আমার ফিফটি-ফোর। তাহলে আমার চেয়ে সামান্য জ্যেষ্ঠ। বলুন, অরূপবাবু, গানের কথায় আসা যাক। বলি কী, পুরনো দিনের বাংলা গান কী ভালো ছিল। হুঁ। যত শুনছি মন ভরে যাচ্ছে। কবেকার গান আজও বারবার শুনতে ইচ্ছে করে। এখন তো সব হাপ্পুলুপ্পু বাজিয়ে কেওড়ামি করে। কাজের কথাটা বলে ফেলুন। বলি কী, একটা দেশাত্মবোধক হয়ে যাক। আমাদের সময়ে দারুণ একটা গান ছিল, ওই যে, ও আমার দেশের মাটি তোমার পায়ে লুটাই মাথা। অরূপবাবু, আপনাদের সময়ে, আমাদের সময়েও স্কুলে পড়া ভুল করলে মাস্টারমশাই বেঞ্চের ওপর দাঁড় করিয়ে রাখতেন। এখনই ভুলটা শুধরে নিন। 

মিতুলদির গান শুনতে পায় সায়ম। গরালির খাল পুবের বাঁকে নদী নদী ভাব, ডিঙি আসে, ভাসে, গাঙচিল ওড়াউড়ি করে, সজনের ডালে মাছরাঙা ঝুঁকে থাকে, ধৈর্যের ভারসাম্যের ছবি হয়ে দাঁড়ায় বক, আকাশের বাঘের মতো কোড়ল চিল বিশাল ডানায় সাঁ করে নেমে এসে তীক্ষ্ণ কঠিন আঙুলে পাকড়াও কাতলা নিয়ে উড়ে গিয়ে বসে অশথের চূড়ায়, তুমুল বৃষ্টি আর হাওয়ায় ঝাপসা ছবি থেকে ঝলসে ওঠে গভীর সবুজ, ভূমধ্যসাগরের জলজ উদ্ভিদের সঙ্গকামনায় অস্থির হয়ে ওঠে বাংলার কলমি কচু বোধকুমারী, রাতের অন্ধকারে চরাচর জুড়ে গোটাকতক আলো ভেসে বেড়ায় পবিত্র গ্রন্থের স্মৃতির মতো, শকুন্তলার হারানো আংটির খোঁজে জল আর অন্ধকার তোলপাড় করে কতিপয় ধীবর, মিতুলদি এ কী লাবণ্যে পূর্ণ দেহ, আলোকের স্তম্ভিত ঝরনাধারা মিতুলদি গায়, সুদূর কোন নদীর পারে/গহন কোন বনের ধারে/গভীর কোন অন্ধকারে হতেছ তুমি পার। 

সায়মের দিদিমা সুনয়নী দেবী রামায়ণ পড়েন, আলোচনা করেন। জানালায় হেমন্তের দুপুর বা চৈত্রসংক্রান্তির সন্ধ্যা। তাঁর সুরেলা পাঠ থেকে ছবির পর ছবি ফুটে উঠতে থাকে : জটায়ু নামেতে পক্ষী গরুড়নন্দন।/দূর হতে শুনিল সে সীতার ক্রন্দন।/আকাশে উঠিয়া পক্ষী চতুর্দিকে চায়/দেখিল রাবণ রাজা সীতা লয়ে যায়। জটায়ুকে দেখে সীতা কান্নায় রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, আর্য জটায়ু! দেখো এই দুরাত্মা রাক্ষস আমাকে অপহরণ করছে। এই দুর্মতি অত্যন্ত ক্রূঢ়, বলবান ও গর্বিত। এর হাতে অস্ত্রশস্ত্র আছে। তখন গিরিশৃঙ্গাকার প্রখরতুণ্ড বিহঙ্গ বললেন, রাবণ! আমি সত্যসঙ্কল্প, ধর্মনিষ্ঠ ও মহাবল। আমি পক্ষীগণের রাজা, নাম জটায়ু। আমার সমক্ষে এইরূপ গর্হিতাচরণ উচিত নয়। কোনো বোধ নাই তোর রাজা দশানন/কোন জ্ঞানে করিলি পরস্ত্রীহরণ। তোর মতো পাপাচারী দেবযান বিমান লাভ করল কীভাবে? তোর মতো দুর্বৃত্ত রাজৈশ্বর্য লাভ করল কীভাবে? তোর মতো অহিতবুদ্ধি প্রজাপালন করে কীভাবে? রাবণ, আমি বহুকাল পৈতৃক পক্ষীরাজ্য শাসন করছি। আমার বয়স ষাট হাজার বছর। আমি বৃদ্ধ, তুই যুবা, তোর হাতে শরাসন সর্বাঙ্গে বর্ম, তুই নভোরথে উড্ডীন। তথাপি আমি তোর কুকর্মে বাধা দেব। দুই পাখা পসারিয়া আগুলির বাট।/রাবণেরে গালি দিয়া মারে পাখসাট।/কী কব হয়েছি বৃদ্ধ, ঠোঁট হইল ভোঁতা। নতুবা ফলের মতো ছিঁড়িতাম মাথা। সভ্যতার সেই প্রাচীন পর্বেও লুণ্ঠিত হয়েছে নারী, বাধা দিয়েছে পাখি, প্রকৃতির প্রতীক। অকুতোভয় জটায়ু...। কাহিনী চলে। 

বড়োমামা সুধীরেন্দ্র পত্রনবীশের আর্তনাদ শোনে সায়ম। একদা যিনি দক্ষিণ ও উত্তর বাংলার মাইল মাইল জুড়ে চলমান থেকেছেন, পাস-করা বাঙালিরা অনুপ্রাসের কেরদানি করে ‘কাকদ্বীপ থেকে কালিয়াচক’, ‘খড়গপুর থেকে খড়িবাড়ি’ ইত্যাদি যে বলেন তা সুধীরেন্দ্রের জীবনে অনেকটাই ঘটনা, পুলিশ যখন শিলিগুড়িতে তাঁর থাকার খবর পেয়েছে, তখন তিনি সিউড়িতে, ‘পত্রপুট’-এর দোতলার পশ্চিমের ঘরটাই হয়ে উঠেছে তাঁর শেষ জীবনের পৃথিবী, ইতিহাস, স্বপ্ন, সংকল্প। বালিশে ভর দিয়ে হাড্ডিসার শরীরটা বহু কষ্টে খাড়া করতে করতে সুধীরেন্দ্র বলতে থাকেন, তোমরা আমার কষ্ট কোনোদিন বুঝবে না। তোমাদের বলা বৃথা। মাটি বোঝে, পাথর বোঝে, গাছ বোঝে। তোমরা বোঝো না। তোমরা বিশ্বাস করো না যে আমার কষ্ট হয়, মাথার ভেতরটা জ্বলে যায়, শিরায় শিরায় আগুন, মাথাটা যেন ধুনুচি, পুড়ে যায়। মিতুল, তুই আমাকে বিশ্বাস করিস না। তুইও চলে যাবি আমাকে ছেড়ে! কে আমাকে স্বস্তি দেবে? আমি যে আর সহ্য করতে পারি না। মিতুলদি এসে টেবিলের ওপর রাখা বই খুলে পড়তে শুরু করে, ঝরঝরিয়া বটতলির মসজিদ। পাহাড়শ্রেণির বুক চিরে একটা নালা পশ্চিমদিক দিয়ে সমতলভূমিতে পড়েছে। বিপ্লবীদের মাথার ওপর সুনীল আকাশ। নীচে পাহাড়ের লাল মাটি। মনে যুদ্ধের সাধ। শত্রুসেনাকে পরাস্ত করার জন্য বিপ্লবী তরুণদের উত্তেজনা চরমে। মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করার পরমলগ্ন সমাগত। দেশপ্রেমিক বীরেরা ক্ষুধা তৃষ্ণার কথা ভুলে গেলেন। বিপ্লবীদের দৃষ্টি পাহাড়ের নীচের দিকে। তাঁরা দেখতে পাচ্ছেন, গুর্খা সৈন্য কাতারে কাতারে ছোটো ছোটো গাছের আড়ালে আড়ালে পাহাড় বেয়ে ক্রমে এগিয়ে আসছে। যুদ্ধ মানেই জীবন দেওয়া-নেওয়ার পালা। জেনারেল বল দেখলেন, শত্রুসৈন্য রাইফেলের গুলির পাল্লার মধ্যে এসে গেছে। তিনি নির্দেশ দিলেন, ফায়ার। পাহাড়ের বুকে প্রতিধ্বনি হল। গর্জে উঠল বিপ্লবীদের অস্ত্র, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। সুধীরেন্দ্র ঘুমিয়ে পড়েন, শিশুর মতো। 

একটা অদ্ভুত মন্তব্য করে সেজমামা সুখেন্দ্র পত্রনবীশ দু-একদিনের জন্য ‘পত্রপুট’ স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন। দিদিমা পুরাণ পড়েন না, বড়োমামা আর্তনাদ করেন না, পাখিমামা পাখির কথা বলেন না, মিতুলদি গায় না। গোটা বাড়ি যেন পুকুরের পাঁকে ডুবে-থাকা কবেকার হবিষ্যির মাটির হাঁড়ি। বড়দার সঙ্গে মিতুলের গোপন সম্পর্ক আছে। না হলে বড়দা মিতুলের বিয়েতে এত আপত্তি করবে কেন? 

সেজমামাকে বেশি হলে পাঁচ-সাতবার দেখেছে সায়ম। কলকাতায় থাকেন। বড়ো চাকরি করতেন। ছেড়ে দিয়েছেন। ব্যবসা করেন। সরকার বলতে যাদের বোঝায় সেরকম মন্ত্রী-আমলার সঙ্গে লেনদেনের সম্পর্ক আছে। সেই সূত্রে প্রচুর সম্পত্তি করেছেন, দুর্নীতিদমনের ভাষায় যাকে বলে, হিসাব-বহির্ভূত। তিনি খেলা উপলক্ষে, পুজো উপলক্ষে, জলসা উপলক্ষে, বন্যা উপলক্ষে, ভূমিকম্প উপলক্ষে দান করেন। বিভিন্ন জায়গায় তাঁর নাম ও ছবি দেখা যায়। পোশাক-আশাক মূলত সাদা, স্যুটগুলো রঙিন। গণতন্ত্র বলতে যে রাজনীতি-সম্পৃক্ত মানুষজন বোঝায়, সেখানে তাঁর মান্যতা আছে। সায়মকে তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন, সব ক্ষীর কলকাতায়। গরালিতে থেকে হবেটা কী? যদি গরালিকে ভালোবাসো, কলকাতায় কামাও, এখানে ঢালো। সেজমামার তীক্ষ্ণতা এড়ানো যায় না। ব্যর্থ মানুষের জীবনে অনেক গল্প থাকে, ভেজা ভেজা, পবিত্র পবিত্র, ধূপের গন্ধ-টন্ধ ছাড়ে, পুন্যির পাপড়ি-টাপরি ওড়ে। কাজের লোকদের গল্প নেই, কাজটাই পরিচয়। সে-সব শুনতে খুব একটা ভালো লাগার কথা নয়। তোমার অন্য মামাদের মতো আমার জীবনে গল্প নেই। প্রচণ্ড পরিশ্রম, প্রচণ্ড টেনশন, নিদ্রাহীন রাত আর স্বস্তিহীন দিনের কথা তোমার শুনতে ভালো লাগবে কি? জনগণ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নেওয়া সোজা, বাস্তব থেকে সরে যাওয়া সোজা, সেটা তো দায়িত্ব থেকে পালানো। কল্পিত স্বর্গ মূর্খের ঠিকানা, আমার নয়। দিদিমার অসুস্থতার সময় বাড়িতে তাঁর হকের ভাগ পাকা করতে এসেছিলেন সেজমামা। গরালিতে আমি থাকব না, আমার পরিবারেরও কেউ আসবে না, তাই বলে আমার প্রাপ্য তোমরা মেরে দেবে? তোমরা জীবনে কিছু করতে পারোনি বলে আমাকে কেন বঞ্চিত হতে হবে? এ যুক্তি প্রতারকের বা ভিখিরির। তোমরা তো তেমন নও। বড়োমামার সঙ্গে মিতুলদির অবৈধ সম্পর্ক থাকার সম্ভাবনা ব্যাখ্যা করে উজ্জ্বল হেসে, হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে গাড়িতে উঠতে যাচ্ছেন, পাড়ার লোকজন তাঁকে নমস্কার করতে লাগল, তাঁর কাছাকাছি আসতে ঠেলাঠেলি করতে লাগল, ভিড় বাড়তে থাকল, জানালায়-বারান্দায় মেয়েরাও স্থির হল, তিনি নানাভাবে সবাইকে ছুঁয়ে গেলেন। 

ধানবাদ থেকে চিঠি আসে বাবার : কল্যাণীয়েষু, সঞ্জয়ের কাছে শুনলাম, তোমাকে টাউন লাইব্রেরির পরিচালকমণ্ডলীর সদস্য হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন স্বয়ং সম্পাদক। তুমি ফিরিয়ে দিয়েছ। তোমার যুক্তি কী আমি জানি না। হয়তো অসাধুতার সঙ্গে তুমি থাকতে চাও না। হয়তো তোমার চিন্তা গুরুত্ব পাবে না বলে নিজেকে দূর রাখছ। এটা যদি যুক্তি হয়, আমার তাতে সায় নেই। তুমি ভুল করছ। নিজেকে বিচ্ছিন্ন করছ, অপ্রয়োজনীয় করছ। দূর থেকে তুমি একা কিছুই করতে পারো না। একরকমের তৃপ্তি পেতে পারো। সেটার কোনো মূল্য নেই। কিন্তু পরিচালকমণ্ডলীতে গেলে দু-একটা হলেও ভালো বই কেনার কথা বলতে পারতে। দু-চারজনকে বোঝাতে পারতে। না-ই বা থাকল তোমার কথা, একটা গ্রহণযোগ্যতা তৈরির সুযোগ পেতে। পদের এখানে অনেক গুরুত্ব। পদে থাকলে পাহাড়, না থাকলে বালিহাঁসের পালক। তোমার কাছে ঘুরঘুর করবে লোকজন। তারা কী ভীষণ বিনীত। তোমার হয়ে কাজ করবে, তোমার হয়ে কথা বলবে, লড়াইও করতে পারে। নিজের গোষ্ঠী তৈরি করতে পারো। তাহলে জোর আরও বাড়ে। কিছু পাইয়ে দেওয়ার মতো জায়গায় তুমি আছ বলেই এটা সম্ভব। ক্ষমতাহীন মানুষের ভালো ভালো কথা নিয়ে লোকে ঠাট্টা করে, ভদ্রতাবশত করুণা করে। তুমি বলবে টাউন লাইব্রেরির পরিচালকমণ্ডলীর সদস্য— এ আর এমন কী পদ! মানছি, খুবই ছোটোখাটো ব্যাপার। কিন্তু এসব জায়গাই পাঠশালা। শেখার সুযোগ অনেক। চুপচাপ দেখবে, অন্য সদস্যরা কীভাবে নিজেদের লোককে পাইয়ে দেয়, বিনিময়ে নিজেরা পায়। দেখবে, কী সৌজন্যপূর্ণ আচরণে আপত্তিকর কাজকর্ম করে যায়। দেখবে, তারা নিজেদের কাজকর্মের পক্ষে কীভাবে যুক্তি সাজায়। দেখবে, তারা দারুণ কথা বলে। এ-সবই শেখার। জীবন গঠিত হয়। ধরো, তুমি পরিচালকমণ্ডলীর সদস্য হয়েছ। লাইব্রেরির সদস্য হওয়ার জন্য কাউকে অ্যাক্‌নলেজ করার অধিকার তোমার আছে। এটা একটা সম্মান। কাউকে ছোটো মাপের হলেও অনুগ্রহ দেওয়ার মতো জায়গা তোমার হয়েছে। দেখবে, তুমি সামাজিক মর্যাদা পাচ্ছ। বিশেষ করে বই-টই জড়িত ব্যাপার তো। দেখবে, সাধারণ পাঠক কোনো বই সম্পর্কে তোমার মতামত জানতে চাইছে। অর্থাৎ তুমি মতামত দেওয়ার জায়গায় পৌঁছেছ। যেহেতু তুমি পরিচালকমণ্ডলীর সদস্য, তোমার কথা ফেলনা নয়। এসময় কোনো সংকীর্ণতা দ্বারা চালিত হওয়া উচিত নয়। পরিচালকমণ্ডলীর অন্য সদস্যদের দেখে শিখে নাও কী বলতে হয়, কীভাবে বলতে হয়। তাদের চেয়ে ভালো বলা অভ্যাস করো। খেয়াল রাখবে, তুমি বুদ্ধিজীবী হতে চলেছ। তাই ভারসাম্য রাখতে শেখা খুব দরকার। একদিন তুমি সে-জায়গায় পৌঁছবেই, যখন তুমি যে-কোনো বইকে নস্যাৎ করে দিতে বা মহৎ করে দিতে পারো। বৈষয়িক দিকটাও বিবেচনা করবে। কিছু রগরগে উপন্যাস বা বহু-বিজ্ঞাপিত বইয়ের সবসময়ই একটা চাহিদা থাকে। সেরকম বই কোনো পাঠক বা পাঠিকাকে ভেতর থেকে পাইয়ে দিলে। সবাই এই কর্ম করে। তোমার লজ্জিত হওয়ার কারণ নেই। ভেতর থেকে পাইয়ে দেওয়া তোমাকে বিশেষ ক্ষমতাবান হিসেবে পরিচিত করে। অনুগৃহীতের সংখ্যা বাড়ে। পাড়ায় মধ্যবিত্ত পরিবারে খাতির-যত্ন মেলে। দু-চারজন পাঠিকার সাথে সম্পর্ক হতে আপত্তি কী। বড়ো হচ্ছ, এই বয়সে নারীসঙ্গ, সঠিকভাবে বললে নারীশরীর, লাগে। লাইব্রেরির বই কেনায় তোমার ভূমিকা থাকবে না কেন? সেখানে কমিশনের ভাগ তোমারও প্রাপ্য। গোপনে কমিশনের ভাগ নিচ্ছ, আর ২৫ বৈশাখ রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে ভাষণ দিচ্ছ— এ ছবি আমি দেখতে পাই। আশীর্বাদ করি, জীবনে বড়ো হও, সফল হও। 

‘মালঞ্চে পুষ্পিতা লতা অবনতমুখী,/নিদাঘের রৌদ্রতাপে একা সে ডাহুকী/বিজনতরুর শাখে ডাকে ধীরে ধীরে/বনচ্ছায়া-অন্তরালে তরল তিমিরে।’ গরালির খাল ধরে পশ্চিমে হাঁটতে হাঁটতে এক বৈশাখের দুপুরে আবৃত্তি করেছিলেন পাখিমামা সুমিতেন্দ্র পত্রনবীশ। জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কার কবিতা বলতে পারিস? সায়ম চারটি লাইন আবার শুনতে চাইল। ‘মালঞ্চে পুষ্পিতা লতা’, ‘নিদাঘের রৌদ্রতাপ’, ‘বিজন তরু’, ‘বনচ্ছায়া অন্তরালে’ শুনতে শুনতে তার রবীন্দ্রনাথ-রবীন্দ্রনাথ মনে হয়। রবীন্দ্র-অনুসারী অন্য কেউও হতে পারেন। গোটা কবিতা শুনলে অনুমান করা যেতে পারে। কিন্তু পাখিমামা অনেক চেষ্টা করেও পুরোটা মনে করতে পারেন না। তাঁর স্মৃতি খুবই জোরালো। তবু হাঁটতে হাঁটতে নানাভাবে আলো ফেলেও হারিয়ে যাওয়া পঙ্‌ক্তিগুলো উদ্ধার করতে পারলেন না। সায়ম হয়তো রবীন্দ্রনাথ বলেই দিত, খটকা লাগল ‘তরল তিমির’-এ। পাখিমামা বললেন, শুনতে পাচ্ছিস? ডাকছে। লালন ফকিরের মতো। লালন ফকিরের গলা শোনেনি সায়ম। শুনেছে কি পাখিমামা? সম্ভব নয়। লালনের গানে পৃথিবীর মাটিতে ছায়াময় এক পৃথিবীর কথা বলছেন কি পাখিমামা? সেটাই কি ‘তরল তিমির’? আমরা তাঁকে চিনি প্যাঁচার কবি রূপে। ‘প্যাঁচার ধূসর পাখা উড়ে যায় নক্ষত্রের পানে’, ‘আমরা বেসেছি যারা দীর্ঘ শীতরাত্রিটিরে ভালো,/খড়ের চালের পরে শুনিয়াছি ডানার সঞ্চার :/পুরনো প্যাঁচার ঘাণ; অন্ধকারে সে কোথায় আবার হারালো’, বা বিখ্যাত সেই ‘আট বছর আগের একদিন’-এর ‘থুরথুরে অন্ধ প্যাঁচা এসে বলেনি কি : বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনোজলে ভেসে?/চমৎকার!/ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার! জানায়নি প্যাঁচা এসে এ তুমুল গাঢ় সমাচার!’ পাখিমামা একটু থামতেই সায়মের ভেতর সূর্যোদয়ের মতো উঠে এল, ‘পিপুলের গাছে বসে পেঁচা শুধু এক/চেয়ে দ্যাখে; সোনার বলের মতো সূর্য আর/রূপার ডিবের মতো চাঁদের বিখ্যাত মুখ দেখা।’ পাখিমামা হাততালি দিলে গরালির নির্জন প্রান্তরে বেজে বেজে ছড়িয়ে যায়। তখন খালের দু-পাশে জলাভূমি দুপুরের রোদে তপ্ত শ্বাস ফেলত। অশরীরী যন্ত্রণা যেন কাদায় শুয়েও স্বস্তি পেত না। সেইসব দুপুরে কোকিলও ডাকত পেশাদার বিরহীর মতো। পাখিমামা বলতেন, কোকিল বিখ্যাত আর সস্তা কবির মতো জনপ্রিয়। আহাম্মকরাও তার গানে মুগ্ধ হয়, বধিররা তার সুরের প্রশংসা করে। ঘুঘুর ডাক শোনো। পৃথিবীর মূল সুর বিষণ্ণতা আছে ওর বুক জুড়ে। মা-র কাছে শুনেছি, ঘুঘু নাকি কেঁদে কেঁদে নিজের ছেলের মৃত্যুর কাহিনী বলে। গুগুগু গুগুগু/আপন পুত বুকে থু/হতী পুত পিট্‌টে থু/গুগুগু। ঘুঘু ছিল রূপসী নারী। প্লাবন থেকে বাঁচতে নিজের ছেলেকে বুকে আর সতীনের ছেলেকে পিঠে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে জলে। স্বাভাবিক সাঁতারে বুক থাকে জলের নীচে। তাই জলে দমবন্ধ হয়ে কখন নিজের ছেলে বুক থেকে খসে গেল। সতীনের ছেলে বেঁচে রইল। এই দুঃখেই সেই নারী ঘুঘু হয়ে যায়। সব শোকভারাতুর নারী নাকি ঘুঘু হয়। বাঁশঝাড়, বেতবন, কড়ুই, শিমূল, আম, বেলগাছে ঘুরে ঘুরে কাঁদে। নিজের ছেলে মানে দেশজ সংস্কৃতি মরে গেল। পিঠে চেপে বেঁচে রইল বহিরাগত সংস্কৃতি। এ কান্না কোনোদিন থামার নয়। হাঁটতে হাঁটতে বাঁশের সেতু পেরিয়ে রফিক, আসাদদের শিমূলতলিতে যেতেন পাখিমামা। চরণের ডাঙা থেকে কবে কোন গহর আলি জমি ছিনিয়ে নিজের নামাঙ্কিত করেছিল বলে ধর্ম-দলীয় হিংসায় শিমূলতলি পুড়িয়ে দিয়েছে দুষ্কৃতীরা। তারাই আজ সংস্কৃতি চালায়। দিদিমার গলায় ‘সোজনবাদিয়ার ঘাট’ শোনে সায়ম : থেকে থেকে বনের মাঝে ডাক দিতেছে হুতুম পাখি/নিশীথিনীর তিমির বুকে গাঢ়তম তিমির পাখি। তরল তিমির থেকে গাঢ়তম তিমিরে পৌঁছয় সায়ম। 

হেমন্তের কাকভোরে, কাকের ঘাড়ের মতো ঘষা অন্ধকারে ‘পত্রপুট’ ছেড়ে মিতুলদি চলে গেল। নিজের হাতে সুটকেস গুছিয়ে, কাঁধের ঝোলায় টুকিটাকি জিনিস ভরে, কী-ই বা আছে তার নেওয়ার, যা আছে তা নেওয়া যায় না, এই জানালা, এই বারান্দা, এই থামের সারি, একতলার চাতালে ঝরা বকুল, আমের বোলের গন্ধ, শিরীষের ঝিরিঝিরি, কদমের ছায়া, দিদিমার পুরাণ-পাঠ, জর্দার সুবাস, গরালির জলে আহ্নিকগতি— কিছুই নেওয়া যাবে না, অথচ কিছুই ভোলা যাবে না, তেমন সার্টিফিকেট-টিকেট তো নেই যে পাখির ছানার মতো আলগোছে নিতে হবে, ভঙ্গুর কিছুই নেই, অথবা সবটাই, মিতুলদি এইসব ভাবতে ভাবতে হয়তো সুটকেস গুছিয়েছিল কিংবা নিজেকে লণ্ডভণ্ড করার প্রাক্‌-মুহূর্তে দাঁড়িয়েছিল, বুঝেছিল তার অনেক আছে কিন্তু সে নিঃস্ব, সারারাত হয়তো হেঁটেছিল এই বারান্দায়, এই জানালায়, পূর্ণতা ও নিঃস্বতার মাঝখানে হেঁটে হেঁটে নিজেকে খুঁজেছিল, তার কেউ নেই যে এটা-ওটা নেওয়ার কথা বলবে, তার কেউ নেই যার কাছে সে বিদায় নেবে, তার কেউ নেই যে বিদায় জানাতে এগিয়ে আসবে, দিদিমা জেগে আছে, পাখিমামা জেগে আছে, বড়োমামা নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে, কোনোদিন ভাবেনি সে এ-বাড়ি থেকে চলে যেতে হবে, কিন্তু সে যাবেই, এভাবে না গেলেই ভালো হত, অন্যভাবে যাওয়া কি সম্ভব ছিল, মিতুলদি একা শূন্য হাতে, শূন্যতা রেখে চলে গেল। দূরে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল মিতুলদির ঘর সংসার বৈধতা। বাংলার নরম নদীর মতো সায়মের চোখের জলে ডিঙি ভেসে গেল। মিতুলদির কি অন্যভাবে যাওয়া সত্যিই সম্ভব ছিল না? না-ই বা হল আর পাঁচটা মেয়ের মতো গায়ে-হলুদ, কন্যাসম্প্রদান, মন্ত্র, আহুতি, সাত পাক, শয্যা-তোলা, আহার-ভোজন, হাসিরাশি, মিতুলদিকে ওসব মানায় না, সেই সম্পর্কে মিতুলদির বিশ্বাস নেই যা বাইরের অনুষ্ঠান দিয়ে প্রগাঢ় করতে হয়, তবু এটুকু তো হতেই পারত, দিদিমা তাকে আশীর্বাদ করলেন, শীর্ণ আঙুলে থুতনি ধরে চোখে চোখ রেখে অভয় দিলেন, একতলার চাতাল পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন পাখিমামা শুভকামনায়, আগামীদিনের কাছে পৌঁছে দিল সায়ম সাবালক ভাইয়ের সম্পন্নতায়, এটুকু হতেই পারত। বড়োমামাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখতেই হত, নাহলে যাওয়া যেত না। তিনজনই জেগে, তিনজনই জানে, তবু মেয়েটাকে একা চলে যেতে হল। পাখিমামা ভেবেছে, এভাবেই ওরা যায়। ওর বাবা সুরেন্দ্র পত্রনবীশ স্বীকৃতির আশায় গিয়েছিলেন। কেউ শুনল না, কেউ জানল না, কেউ কিছু বলল না, এভাবে কতকাল গান গাওয়া যায়। ওরা ভাবে, ফিরে আসবে। হয় মাথার ভেতরে থাকা পথরেখা হারিয়ে ফেলে, নয়তো ওড়ার ক্ষমতা হারায়। মিতুলও ফিরে আসার কথা ভাববে। পারবে না। দিদিমা ভেবেছে, এটা অপহরণ। মিতুল নিজেকে অপহরণ করেছে। গ্রহণের সুখ পেতে স্বেচ্ছা-অপহৃতা হয়েছে। নিজেরই অপহরণকারী প্রবৃত্তির ক্রোড়সঙ্গিনী হয়েছে সে। এরকম হওয়াই স্বাভাবিক। সায়ম ভেবেছে, তাকে বাঁচাতেই মিতুলদি পালাল। সায়মের ভেতরে মিতুলদির শরীর ঘিরে যে দুর্নীতি বড়ো হচ্ছে, সেটা হয়তো মিতুলদি টের পেয়েছিল। সায়মকে সে নষ্ট করতে চায়নি। নষ্ট-অনষ্ট সম্পর্কে মিতুলদির ধারণা কি এতটাই চিরাচরিত? সায়ম ভেবেছে। মিতুলদি হয়তো বুঝেছিল সায়মের পক্ষে তার সঙ্গে লিপ্ত হওয়াই স্বাভাবিক, হোক না আত্মীয়, মিতুলের পক্ষেও তা-ই, সেই স্বাভাবিকতাকেই ভেঙে দিতে সে চলে গেছে। অজ্ঞাতপরিচয় কোনো পুরুষের সঙ্গিনী হল সে, যে-সম্পর্কটা অস্বাভাবিক, তবু তা বৈধ, সামাজিক। বড়োমামা জেগে উঠে ‘মিতুল, মিতুল’ ডেকে সাড়া পাননি। তাঁকে কিছুই জানানো হয়নি। তিনি অনেকক্ষণ শূন্য দেওয়ালে তাকিয়ে থাকেন। তারপর নিজেই বই টেনে নেন। পড়েন। বিপ্লবীরা দেখলেন পাহাড়ের গা ঘেঁষে একটি খাল ধীরগতিতে এগিয়ে চলেছে। তাঁরা প্রাণ ভরে জল খেলেন। বিশ্রাম নিলেন। তারপর পুনরায় যাত্রা শুরু করলেন। বড়োমামা যন্ত্রণা নিয়ে একা। 

গরালি তখন প্রেসার কুকারের বাষ্পের দেশ। ভাপে সেদ্ধ হচ্ছে জীবন যৌবন তোশক বালিশ কসমেটিকস কূটকচাল ধর্মগ্রন্থ। সরকারি ত্রাণের মতো আকাশে মেঘ ঝুলে আছে প্রায় এক সপ্তাহ। স্থানীয় আবহাওয়া দপ্তর বলছে, বর্ষণের সম্ভাবনা নেই। শরীরের পচা গন্ধে পাউডার মেরে মানুষ ভরসা খোঁজে বিশ্বাসযোগ্য বিবিসি সিএনএন-এ। ভোরের জানালায় তাকালেই রাশি রাশি বৃষ্টির বিপুল সুসংবাদ নিয়ে নেমে আসা মেঘ দেখে মন নেচে ওঠে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেঘ একটু একটু করে সরে যায়, দূরে যায়, এ কী কৌতুক, শৃঙ্গারের নয়, স্বাধিকারপ্রমত্তার খেলার মতো। এর চেয়ে প্রচণ্ড রোদে পুড়ে যাওয়া, ঝলসে যাওয়া ঢের ভালো, এর চেয়ে ঢের ভালো ভেসে যাওয়া। একটা অদ্ভুত বাষ্প শরীরটা পাকে পাকে জড়াচ্ছে, শরীরের ভেতর ঢুকে পেশি মেদ মজ্জা হাড় শিথিল নির্জীব মৃত করছে। একটা দুঃসহ যন্ত্রণা মাথার কোষে কোষে স্নায়ুতে তপ্ত শিকের মতো খোঁচাচ্ছে। জানালা দিয়ে সায়ম করুণাহীন মেঘের আকাশ দেখছিল। হঠাৎই গঞ্জের ধার থেকে উঁচু হইহই উঠে এল। 

বছর পনেরো আগে, তখনও পাঁচ-সাতটা সিপাই, এক-আধটা এস আই আর চারটে সাইকেল, খাটিয়া, টেবিল, চেয়ার, উনুন-হাঁড়ি-কড়াই-খুন্তি, বিস্তারিত গামছা-লুঙ্গি-লেঙ্গট নিয়ে ফাঁড়ি বসেনি, এরকম হইচই মাঝেমধ্যেই শোনা যেত। কোনো স্কুলের ছেলেরা বা ক্লাবের ছেলেরা হয়তো খেলায় জিতে ফিরছে। এখন তো মাঠই নেই, প্রোমোটার খেয়েছে, পার্টি খেয়েছে, পুলিশ খেয়েছে, সবাই খেয়েছে। হয়তো গঞ্জে চোর ধরা পড়েছে। এখন চোর ধরা পড়ে না, পড়লে বিপদ আছে। চণ্ডীতলায় যাত্রা বা কবিগান হয়তো জমেছে। এখন সেসব আর হয় না। গাজনের চড়কে সন্ন্যাসীরা হয়তো ঝাঁপ দিচ্ছে। সেসবও আর হয় না। এ-পাড়ায় সে-পাড়ায় লড়াই বাধলেও এরকম হইচই হত। এখন গুলির শব্দে এ-গোষ্ঠী সে-গোষ্ঠীর হিসেবনিকেশ হতে থাকে। এখন টিভিতে অতিদূর দেশের খেলা দেখে মানুষ চেঁচায়। এখন ভোটের হুল্লোড়ে চেঁচামেচি হয়। পুলিশ ফাঁড়ি বসার পর সব বেআইনি কাজকর্ম নীরবে সংসাধনের অনুমোদন পেয়ে গেছে। উঁচু হইচইয়ের কারণ অনুমানের চেষ্টা করে সায়ম। অনুমান করার প্রক্রিয়ায় সায়ম বুঝতে পারে, আসলে সে কিছু ঘটনার কথা মনে করছে, ইতিহাসের দ্বারস্থ হচ্ছে। অনুমানের অন্য একটা আবছা দিকও উঁকি দিয়েই মিলিয়ে যায়, তা হল, তোলাবাজ-খুনে-মন্দিরওয়ালা-মসজিদওয়ালা-ধর্ষণকারী-প্রোমোটার-পেডলার-দালাল-খোচর ইত্যাদি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে মার খাওয়া সাধারণ মানুষ চরম মার দিতে পথে নেমেছে এবং এদের রক্ষাকর্তা পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে অনিবার্য যুদ্ধ বেধেছে, কিন্তু এটা শুভকামনা শুভস্বপ্নের বেশি সত্য নয়। বরং বাস্তব থেকে একটা সম্ভাব্যতা পাওয়ার চেষ্টা করে সায়ম। বছর পাঁচ-সাত আগে বটতলায়, স্কুলফেরত একটি মেয়ের ওপর চড়াও হয় কিছু ছেলে। পথে বহু লোকজন ছিল, তাদের শিক্ষাদীক্ষা উন্নততর চিন্তাভাবনা উৎকৃষ্ট বাচনপদ্ধতি ছিল। কিন্তু মেয়েটার সাহায্যে কেউ এগিয়ে আসেনি। মাতৃ ভাণ্ডারের রোয়াকে বসে জুতো সারাই করতে করতে রামদাস ব্যাপারটা লক্ষ করে ও প্রতিবাদ জানায়। ছেলেগুলো রামদাসকে তোল্লাক্যালান পিটিয়ে তার ডানহাতের তিনটে আঙুল কেটে ফেলে। রামদাসের অপরাধ, সে আঙুল তুলে ছেলেদের শাসিয়েছিল। ছেলেগুলো আদিম ও অবিচক্ষণ বলে মারপিটকাটাকাটির লাইনে গেছে। রামদাস প্রৌঢ় অন্ত্যজ দরিদ্র। সুতরাং তার ওপর হিন্দি বা বিদেশি ছবির অ্যাকশনে তুরীয়ানন্দে পাঞ্চ, কাট, ফ্লাই, কিক, টিক চালিয়ে এবং শরীরের দু-চার পিস আলগা করে রক্তপাত ঘটিয়ে বেশ একটা সন্ত্রাসের বাতাস তৈরি করেছে। বন্দুকের নল হইতে ক্ষমতার জন্মের প্রাজ্ঞতা থাকলে ওরা অক্লেশে রামদাসকে নিখুঁত নামিয়ে দিতে পারত। তাতে ক্ষমতার আরেকটি কেন্দ্রের জন্মসংবাদও ঘোষিত হত। যাই হোক, এরকম ঘটনার পর গরালিপুরের কোথাও কোনো শব্দটব্দ হয়নি। সায়মের মনে পড়ে, স্কুলে ঢুকে গোকুল বসুকে ভোগে করে দেয় কয়েকটি ছেলে। দুটো ফুটো, মাথায় এবং বুকের বাঁদিকে। অমন যে গোকুল, একশো কেজির ওপরে লাশ, কালীর বারোয়ারি আর ইটভাটায় লেবার সাপ্লাই করে কোটিপতি, তবু হাইস্কুলের ল্যাবোরেটরি অ্যাসিস্ট্যান্টের চাকরিটা ছাড়েনি; তরুণদের সঙ্গে, শিক্ষার সঙ্গে, সংস্কৃতির সঙ্গে থাকার গর্ব করত, বেসিক্যালি কালচার্ড ফ্যামিলির ছেলে তো, গব্বরের স্টাইলে শ্রমিক দিবসের সভায় ও রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যায় ভাষণ-টাসন দিত, শরিকি দুষ্টামিতে গতবার টিকিট না আটকালে এম এল এ হওয়া ঠেকায় কে, সেই গোকুলকে ব্ল্যাকির মাত্র দুটো ছোবলে দোতলার বারান্দায় ফেলে রেখে সিঁড়ি দিয়ে নেমে লন পেরিয়ে সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল ছেলেরা। গোকুল নাকি আগে দু-চারজনকে মায়ের ভোগে করেছে। আদি কমিউনিস্ট পার্টি এটা নিয়ে দুটো সন্ধ্যা মাতামাতি করার চেষ্টা করে, তবে জমাতে পারেনি, শহরের নেতা আনা যায়নি, অপূরণীয় ক্ষতির দ্ব্যর্থক দীর্ঘশ্বাস ভেসেছিল বাতাসে। হ্যাঁ, খালপাড়ের বসতি উচ্ছেদের সময়ে কিছুটা হইচই হয়েছিল। সায়ম মনে করতে পারে, গরালিপুর ম্যাদামারা হয়ে গেছে বলে রাগ দেখিয়েছিল উচ্ছেদবিরোধীরা। মানুষের কী হল, এত অন্যায়েও রা করে না। শরীরে বেঁচে থাকার লক্ষণ কই? এ কি মরা মানুষের দেশ? এইসব শুনে-টুনে কিছু লোক বার খেয়ে ক্ষুদিরাম হওয়ার পুরনো অভ্যাসে উচ্ছেদের দিন খালপাড়ে প্রতিবাদ জমায়েত করল। সকাল থেকে দেশাত্মবোধক সংগ্রামমুখী জীবনমুখী গান-টান হল। কিন্তু, গত কুড়ি বছর যারা নদীর ভাঙন থেকে উঠে-আসা মানুষজনকে খালপাড়ে বসিয়েছে, ‘সংগ্রামই জীবনের সারসত্য’, ‘বিপ্লবই মানুষের মুক্তির পথ’ ইত্যাদি বুঝিয়েছে, তারা যখন বুলডোজার, ডাম্পার, সুপারহ্যামার এবং সশস্ত্র পুলিশবাহিনী ও শান্তির আবেদন নিয়ে সেই মানুষজনকে উৎখাত করতে ঝাঁপিয়ে পড়ল, তখন হইচই উঁচু হওয়ারই কথা ছিল। তারপরই শান্তিকল্যাণ বধিরতা। 

সেরকম কোনো ঘটনা আজ ঘটতে পারে? সায়মের বিশ্বাস হয় না। গায়ে জামা গলিয়ে সে বেরিয়ে পড়ে। ভাপে সেদ্ধ হচ্ছে গরালিপুর। আকাশে ময়লা মেঘ চাপ হয়ে আছে। হাঁটতে হাঁটতে বটতলা, চণ্ডীতলা, গঞ্জের ধার এবং ফিরে আসা। কোথাও কোনো অস্বাভাবিকতা নেই, সব ঠিকঠাক চলছে, বরং অন্যদিনের চেয়ে একটু বেশিই নীরব। মামুলি কথার মামুলি জবাব দিতেও যেন নিস্পৃহ লোকজন। এখন কথা বলা যায় না, কথা বলার সময় নয়। কারণ ফিসফিস দুটি বাক্য : আজ ভোরে যে-মাফিয়াকে তুলে নিয়ে গেছে পুলিশ, তার ডায়েরিতে মুখ্যমন্ত্রীর নাম, ফোন নম্বর পাওয়া গেছে। নীরবতা নিস্তব্ধতা এত উঁচু হতে পারে যে হইচই বলে ভ্রম হয়? মেঘ-চাপা গরালিপুরে গরম বাষ্পই বাতাস। 

রথ বেরোলে ট্র্যাফিক জ্যামের সম্ভাবনার কথা ভেবেই শুঁড়িপাড়া রোড দিয়ে ঘুঘুডাঙার দিকে গাড়ি ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বকুলতলা রোডে দুপুরের পর থেকে গাড়ি চলাচল বন্ধ। হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন, রথ যদি অন্যের পথ আটকে দেয়, সেটা কি আর জনপথ থাকে? দু-দশজনের হাতে সেটা রথের রশি হলেও বাকিদের কাছে রথের ফাঁস। না, জল জমার আশঙ্কা নেই। বৃষ্টিই হচ্ছে না। বাইপাসে সকালের দিকে কিছুটা যানজট ছিল। ভোরে তিনটে কলিসন হয়। এখন পরিষ্কার। দুর্ঘটনায় মৃত্যুর খবর নেই। পথ নিয়ে ভালো গান বাজান। পথে এবার নামো সাথী, পথেই হবে পথ চেনা। ‘পথ ও পথিক’ নামে রবীন্দ্রসংগীতের হেভি কালেকশন আছে। একটা ফোন ঢুকছে। দেখা যাক। হ্যালো... হ্যালো... আপনার কথা আমাদের কানে পৌঁছচ্ছে না। 

কালিয়াচক থেকে বাবার চিঠি আসে এক পউষের বিকেলে। লম্বা লম্বা ছায়ার খাটিয়ায় শোয়ানো ‘পত্রপুট’ কবেকার ফ্যাঁসা বেনারসির মতো আলোয় শরীর মুড়ে যেন অন্তিম যাত্রার অপেক্ষায় ছিল। আশ্চর্য এক পোস্টম্যান চিঠিটা দিয়ে গেল, যাকে সায়ম কোনোদিন দেখেনি, যার বয়স বোঝা খুব কঠিন, সব চুল সাদা নরম ঘন, কৃষ্ণসাগরের মতো মুখ, চোখ আর হাসি যেন তিনটে দ্বীপ, উচ্ছল শরীর-ভাষা, সাইকেলের গতিতে তার পিঠের জামা ফুলে উঠেছিল। এসময় কোনোদিন পোস্টম্যান আসে না। এখন ডাকঘর শুনশান হওয়ার সময়। মাস্টারমশাই হয়তো ক্ষুদ্র সঞ্চয় প্রকল্পে নতুন আমানতের হিসেব খাতায় তুলছেন অধিকন্তু আলো জ্বেলে। কাজের সময়ের সীমানা স্বেচ্ছায় লম্বা করে এ কোন অবাস্তবিক। বাবা লিখেছেন চিঠি দিতে দেরি হল। ধানবাদের কারখানা থেকে ছাঁটাই হয়ে শিলিগুড়িতে চুক্তির চাকরি জুটিয়েছি। সেল প্রোমোট করতে না পারলে ঘাড়ে ধাক্কা। তবে বেতন ভালো। সেই কারণেই অধস্তনদের প্রচুর সম্মান শ্রদ্ধাভক্তি স্তুতিভজনা পেয়ে থাকি। দারুণ লাগছে। মিথ্যে বলতে পারার চেয়ে শ্রেষ্ঠ গুণ আর হয় না, এটা বুঝতে কেন যে এত দেরি হল আমার! খোকা, এতদিন যা তোমাকে বলেছি, নিজে করতে পারিনি। কেন? কোন অলীক বিশ্বাসে, কোন কুসংস্কারে, কোন অকর্মণ্যতায়, কোন প্রতিবন্ধিতায়? খোকা, আজ গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, আমার মালিক একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি, উত্তরবঙ্গে তার স্বনামে বেনামে দশ-বারোটা সংস্থা আছে। একদা ব্যাংকের কেরানি ছিলেন। কয়েক কোটি টাকা জালিয়াতির দায়ে ধরা পড়েন। এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে এক কোটি খাইয়ে প্রমাণাভাবে ছাড়া পান। ইচ্ছে করলে চাকরিতে ফিরতে পারতেন। ফেরেননি। হৃত সম্মান পুনরুদ্ধারে তিনি দেশের কাজে ব্রতী হন। বাকিটা উপকারী প্রাণীর রচনার মতো : এক কর্মবীর, দানবীর, চিন্তাশীল, বিদ্যোৎসাহী, সমাজসেবী, নীতিপরায়ণ মানুষের কাহিনী যা হামেশাই ফলাও করে ছাপা হয় এবং বলা হয় যে, ইহার সব কিছুই মানুষের উপকারে লাগে। কয়েক কোটি টাকা ঝাড়তে পেরেছিল বলেই না এসব হল। ওটাই ভিত, তার ওপর দাঁড়িয়ে মেঘ-মাথা সৌধ। যাই হোক, এতদিনে মনে হয় একটা হিল্লে করা গেছে। সমাজের বড়ো বড়ো লোকজনের সঙ্গে পরিচয় হচ্ছে। এরা স্বচ্ছ ও সৎ মানুষ, স্বপ্নটপ্ন দেখায় না, বাঁজা কথা বলে না, পার্সেন্টেজ ঠিকঠাক হলেই নির্বিঘ্নে কাজ হয়ে যাবে। তুখোড় সন্ন্যাসী সওদাগর। এদের কাছে মিথ্যে চলে না। সেটা লোয়ার লেভেলে, যেখানে এক-একটা আইটেম ধরে রূপকথার জগৎ তৈরি করতে হয়। তুমি বলতেই পারো, আমি লোচ্চা হয়ে গেছি। আমি বলব, আমি ভালো আছি। তোমার মা ভালো আছেন। যে অনিশ্চয়তা আমাদের সারাজীবন তাড়া করে বেরিয়েছে, আমাদের সম্পর্ক নষ্ট করেছে, তার হাত থেকে মুক্তি পেয়েছি। অনেক আগেই এটা হতে পারত, পঁচিশ-তিরিশ বছর আগেই। মর্যাদায় বাঁচতে পারতাম। মূল্যবোধের ন্যাতা-নেংটি জড়িয়ে মানবিকতার অলীক ভরসায় কারও কৃপার করুণার পাত্র হতে হত না। দুর্মর আদর্শের পীড়নে মৃতবৎ বাঁচতে হত না। খোকা, ঘাড়ে ধাক্কা আমি আর খাব না। এখন যেসব কাজ করতে হচ্ছে তার গ্রহনীয়তা মান্যতা অনেক বেশি, নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র। নিজের স্বার্থে আমাকে রক্ষা করবে প্রশাসন। এভাবে পাঁচ বছর চললে কয়েকটা নিজস্ব ধান্দা বানিয়ে নিতে পারব। শেষ জীবনটা সুখে আনন্দে সপরিবার বাঁচতে চাই। খোকা, সঞ্জয়ের কাছে শুনেছি, আমার চিঠিতে তোর বিরক্তি হয়। হতে পারে। কিন্তু ভেবে দেখ, বাবা হয়ে ছেলেকে আমি কীভাবে গভীর দুঃখে ঠেলে দেব? অর্থহীন, মানহীন, মর্যাদাহীন, প্রতারণাময়, লাঞ্ছনাময়, উপহাসময় ভবিষ্যতের দিকে যেতে দেব? নিজের সন্তানকে ফেকলু বানাব? খোকা, এটা কি হতে পারে না, নিজের রক্তে থাকা স্বপ্নের দোষের আতঙ্ক থেকে চিঠি লিখেছি। তোকে দোষমুক্ত শুদ্ধ রাখতে চেয়েছি। খোকা, এটাই হয়তো সত্য, ওইসব লেখার মধ্যেই আমার প্রস্তুতি ছিল। যুক্তির আয়োজন, লোচ্চা হওয়ার মহড়া ছিল। 

অন্ধকার হয়ে গেছে, গাছের বাকলে, পাতার শিরায়, ফুলের গর্ভে জমে থাকা অন্ধকার নেমে এসেছে, দিঘির তল থেকে উঠে এসেছে অন্ধকার, মাটি ফুঁড়ে বাতাসে উড়ছে, চিঠির অক্ষরগুলো ঝাপসা হয়ে যায়, সায়ম আর পড়তে চায় না, বাবার মুখ দেখতে পায়, ভালো থেকো। 

এ এক কঠিন প্রশ্ন। মহাভারত দ্বিখণ্ডিত হয়ে আছে। দিদিমার ঘর থেকে হাঁপানির টান আর মহাভারতের কথা মিলেমিশে অন্ধকার বাতাসে ঘুরে বেড়ায়। দেবাসুরযুদ্ধের পর ইন্দ্র ত্রিলোকের অধিপতি হয়ে নানা স্থানে বিচরণ করতে করতে পূর্বসমুদ্রের নিকটে বক ঋষির আশ্রমে উপস্থিত হলেন। বক পাদ্য অর্ঘ্য আসনাদি নিবেদন করলে ইন্দ্র বললেন, আপনার লক্ষ বৎসর হয়েছে, চিরজীবীদের কী দুঃখ, আমাকে বলুন। বক বললেন, অপ্রিয় লোকের সঙ্গে বাস, প্রিয় লোকের বিরহ, অসাধু লোকের সঙ্গে মিলন, পুত্র-দারাদির বিনাশ, পরাধীনতার কষ্ট, ধনহীনতার জন্য অবমাননা, অকুলীনের কুলমর্যাদা, কুলীনের কুলক্ষয়— চিরজীবীদের এইসব দেখতে হয়, এর চেয়ে অধিকতর দুঃখ আর কী আছে? ইন্দ্র আবার প্রশ্ন করলেন, চিরজীবীদের সুখ কী তা বলুন। বক উত্তর দিলেন, কুমিত্রকে আশ্রয় না করে দিবসের অষ্টম বা দ্বাদশ ভাগে শাকভক্ষণ— এর চেয়ে অধিক সুখ কী আছে? আপন গৃহে শাকমাত্র পাক করে জীবনধারণ করলেও তা-ই সুখ। পরস্য তু গৃহে ভোক্তুঃ পরিভূতস্য নিত্যশঃ।/সুমৃষ্টমপি ন শ্রেয়ো বিকল্পহয়োমতঃ সতাম। পরগৃহে অপমানিত হয়ে সুস্বাদু খাদ্য ভোজনও শ্রেয় নয়। রাত্রি ঘনায়। কুকুর ডাকে। পথের ধারে বেকার ছেলে গুমটি খুলে ক্যাসেট-সিডির বিকট হিন্দি গান বাজায়। দিদিমার গলা শুনতে পায় সায়ম। নিজের অর্জিত শাকান্নে তৃপ্ত থাকা মহতের গুণ। কিন্তু যখন ধর্ম লোপ পায়, লোকে পরস্পরকে বঞ্চনা করে, অনাবৃষ্টির ফলে খাদ্যাভাব হয়, জীবিকার সমস্ত উপায় দস্যুর হস্তগত হয়, সেই আপৎকালে কীভাবে জীবনযাত্রা নির্বাহ করা উচিত? শরশয্যায় ভীষ্মকে প্রশ্ন করেন যুধিষ্ঠির। ভীষ্ম বিশ্বামিত্রের কাহিনী বলেছিলেন। ত্রেতা ও দ্বাপর যুগের সন্ধিকালে দ্বাদশবর্ষব্যাপী ঘোর অনাবৃষ্টি হয়েছিল। কৃষি ও গোসম্পদ নষ্ট হয়, চোর ও রাজাদের উৎপীড়নে গ্রাম নগর জনশূন্য হয়, মানুষ ক্ষুধিত হয়ে পরস্পরের মাংস খেতে শুরু করে। সেই সময় মহর্ষি বিশ্বামিত্র স্ত্রী-পুত্রকে কোনো জনপদে ফেলে রেখে খাদ্যের সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন। একদিন তিনি চণ্ডালবসতিতে হাজির হয়ে দেখেন, ভাঙা কলস, কুকুরের চামড়া, শুয়োর আর গাধার হাড়, মৃত মানুষের বস্ত্র চারদিকে পড়ে যাচ্ছে। কোথাও খাদ্য নেই। সহসা তাঁর চোখে পড়ল সদ্যোনিহত কুকুরের মাংস। ভাবলেন, প্রাণরক্ষার জন্য চুরি করলে দোষ হবে না। রাতে চুরি করতে গিয়ে চণ্ডালদের হাতে তিনি ধরা পড়লেন। পীড়নের ভয়ে আত্মপরিচয় দিয়ে বিশ্বামিত্র বললেন, ক্ষুধায় মৃতপ্রায় হয়ে আমি তোমার কুকুরের জঘনমাংস হরণ করতে এসেছি। আমার বেদজ্ঞান লুপ্ত হয়েছে, আমি খাদ্যাখাদ্য বিচারে অক্ষম, অধর্ম জেনেও আমি চৌর্যে প্রবৃত্ত হয়েছি। চণ্ডালরা সেই ধর্মাগ্রণীকে অপবিত্র মাংসভক্ষণ থেকে নানারূপে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করল। সেই ধর্মাত্মাকে রক্ষার জন্য সাধ্যমতো আবেদন-নিবেদন করল। কিন্তু প্রাণরক্ষা ধর্মরক্ষারই অঙ্গ, এই যুক্তিতে বিশ্বামিত্র কুকুরের মাংস নিয়ে বনে চলে গেলেন। সপরিবার ভোজন করলেন। আখ্যান শেষ করে ভীষ্ম বললেন, বিপদাপন্ন হলে বিদ্বান লোকেরও যে-কোনো উপায়ে আত্মরক্ষা করা উচিত। জীবিত থাকলে তিনি বহু পুণ্য অর্জন ও শুভলাভ করতে পারবেন। 

মিতুলদি সারা দুপুর জুড়ে কী খুঁজছিল? বিছানার চাদর উলটে উলটে, তোশক সরিয়ে সরিয়ে, টুটা-ফুটা জাজিম ঘেঁটে ঘেঁটে কী খুঁজেছিল? কুলুঙ্গির ধূসরতা, পূর্বপুরুষের ছবির প্রছনে ঘন মলিনতা দু-হাতে মেখে কী খুঁজেছিল? খাটের সিংহ থাবা পায়ার ভার বহু ক্লেশে তুলে গোল শ্বেতপাথরের ওপর কী খুঁজেছিল? সাপের খোলস? মিতুলদিকে বারবার কবিতার মতো একটা লাইন বলতে শুনেছে সায়ম। সাপের খোলসের মতো পড়ে আছে নদী। বিপুল বৃষ্টির পূর্বাভাস থেকে ঝিরঝির জল ঝরছিল, জানালায় গাছের ব্যাকুল ছায়া, গরালির খাল থেকে বাতাস আসছিল। মিতুলদি চেয়ারে দাঁড়িয়ে তাক থেকে ‘পুষ্পলতার নিজের বাকসো’ লেখা তোরঙ্গটা যখন পাড়ল, সায়ম দেখেছিল শরীর কাহাকে বলে, শরীরের ভাঁজে ভাঁজে খাঁজে খাঁজে দাগে দাগে ভাগে ভাগে যে-শরীর থাকে, তাহাই শরীর। বাকিটা তো অস্তিত্ব মাত্র, নানাবিধ সম্পর্কের টানে পৃথিবীতে আসে যায়, স্নেহ পায়, ভালোবাসা পায়, শ্রদ্ধা পায়, হয়তো প্রেম-ট্রেমও পায়। শরীরের কোনো সম্পর্ক নেই, কোনো বশ্যতা নেই, সমাজ গঠনের আগেকার পতাকার চিহ্নই তার পরিচয়। এইসব ভেবেছিল সায়ম। এই প্রথম? অসম্ভব। একদিনে এসব ভাবনা আসে না। পুষ্পলতা মিতুলদির মা। তিনিই প্রথম এ-বাড়িতে নিজের বাক্স করেন। স্বামী সুরেন্দ্রর সঙ্গে তার এ ব্যাপারে ঠিক বিতণ্ডা নয়, বিতর্ক হয়। সুরেন্দ্রর যুক্তি, তোমার নিজস্ব তো অনেক কিছুই আছে, কেউ হাত দেবে না, তবু এভাবে নিজের বলে দাগানোর কি দরকার? পুষ্পলতার যুক্তি, দরকার বলেই দাগিয়েছি। নইলে নিজের বলে ভরসা পাই না। সুরেন্দ্রর যুক্র, এর মূলে আছে অবিশ্বাস, সন্দেহ। পুষ্পলতার যুক্তি, তোমার ব্যাখ্যার মূলে আছে প্রভুত্ব আর ভয়। সুরেন্দ্রর যুক্তি, নিজেকে প্রতিপক্ষ হিসেবে ভাবতে পারার মধ্যে স্বাধীনতার সৌন্দর্য আছে বটে, তবে অযথা বৈরিতা ডেকে আনাকে কখনওই সুন্দর বলব না। পুষ্পলতার যুক্তি, অন্যের নিজস্বতা অস্বীকার করার অর্থই স্বৈরাচার। তা সে যত নরম মিঠে দরদি শব্দে করা হোক। সুরেন্দ্রর যুক্তি, নিজস্বতা কারও স্বীকার-অস্বীকারকে ভয় পায় না। পুষ্পলতার যুক্তি, ভয় পায় না বলেই তো নিজের জায়গা ঘোষণা করেছে আর তাতে প্রভুরা ভয়ে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। এভাবে ‘পুষ্পলতার নিজের বাকসো’ ঘিরে একটা অমীমাংসিত বিতর্ক দীর্ঘ সময়-সময়ান্তরে কেবলই জাল প্রসারিত করেছে। সায়ম তখনও এ-বাড়িতে আসেনি। মিতুলদির মুখে শুনেছে। মিতুলদি বলত, শেষ পর্যন্ত কেউই হারেননি, জেতেননি। মা বোধহয় এক ধরনের বিপন্নতা থেকে নিজের ব্যাপারটা আড়ালে রাখতে চেয়েছিলেন। গরমের দুপুরে, শীতের বিকেলে, সরস্বতী পুজোর ভোরে, পূর্ণিমার রাতে মাকে মিতুলদি দেখেছে নিজের বাক্স খুলে বসতে। সত্যি বলতে কী, তাতে কিছুই ছিল না। রাজার আমলের গোটাকতক পাইপয়সা, আধলা, আনি, দুয়ানি, চারানি, পেতলের ছোট্ট গণেশ, বাপের বাড়ির কয়েকটা চিঠি, এক জোড়া কাপ-ডিশ, দুধের খালি কৌটো দুটো, বিয়েতে পাওয়া নরেন দেবের মেঘদূত, বটতলার ব্রতকথা, আর কয়েকটা ফুলতোলা রুমাল। খাটের তলা থেকে টেনে ধুলো ঝেড়ে বাক্স খুলে বসাটা যে পুষ্পলতার কাছে পরম সুখের ব্যাপার ছিল তা মিতুলদি ছোটোবেলাতেই বুঝেছে। কী পেতেন মা? সুখ। অতীতের, মৃত স্বপ্নের মুখ দেখার সুখ, স্বপ্ন জমিয়ে তোলার স্বপ্নের সুখ। মিতুলদি যখন স্কুলের উঁচু ক্লাসে পড়ে, সুরেন্দ্র পত্রনবীশ দেশান্তরী হন, আর ফেরেননি। কেউ বলেন, স্বীকৃতির খোঁজে, কেউ বলেন, স্বপ্নের খোঁজে, কেউ বলেন, নিজেকে ব্যর্থ বুঝে, কেউ বলেন, ওটাই ছিল নিয়তি। অনেকদিন অপেক্ষার পর পুষ্পলতা স্বামীর গানের খাতাগুলি, নাটকের খাতা কয়েকটি, রঙিন সুতোর কাজ-করা শখের পাঞ্জাবি আর কাশ্মীরি শাল নিজের বাক্সে ঢুকিয়ে রাখেন। তখনই বাক্সটা কিছু ভারী হয়। পুষ্পলতার মৃত্যুর পর আরও ভারী হয়ে বাক্স উঠেছে তাকে। মিতুলদি সায়মের সামনে বাক্স খুলতে চায় না। কী আছে ওতে? কিচ্ছু না। এত ভারী? মড়া খুব ভারী হয় বলে মিতুলদি হাসতে হাসতে ঝাড়পোঁছ করে তুলে রাখত। এই নামানো ও তোলা বহুদিন ধরে দেখেছে সায়ম, নিজে বড়ো হয়েছে বুঝে নামিয়ে বা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে মিষ্টি সুরেলা হাসির প্রত্যাখ্যান পেয়েছে, মিতুলদির নিজের বাক্স ওটা, এ-দেখা একটা অভ্যাস হয়ে যাওয়ার কথা, অভ্যাসে নতুনত্ব থাকে না, কিন্তু তারই মধ্যে সে কবে যেন মিতুলদির শরীর আবিষ্কার করে ফেলে, এক মহাদেশ, যা মেঘাবৃত, যা ঊর্মিবেষ্টিত, যা পলায়নপর, যা হননোদ্যত। এই মহাদেশ দেখার লোভ কবে যে সায়মকে আবিষ্ট করল, ক্রমে দখল করল, কবে যে সায়ম বুঝতে পারল তার সীমাবদ্ধতা, অসহায়তা, কবে যে পাপ-অপাপের কুয়াশা কাটিয়ে বেরিয়ে এল, সেসব বহুযুগের গান, প্রাচীন পালার খাতা, যার মর্ম জানা হয়ে গেছে। কিন্তু সেদিন মিতুলদি কী খুঁজেছিল? সাপের খোলসের মতো পড়ে আছে নদী। যে আলমারি ভীষণই পরিপাটি, অতি-পরিমিত জিনিসপত্র নিয়ে ছিমছাম, কোনো ভার নেই, আবেগ নেই, যন্ত্রণা নেই, তারও দরজা হাট করে দাঁড়িয়েছিল মিতুলদি। দেওয়ালের শেলফ একেবারেই ফাঁকা, শুধু নীচেরটায় ফিনাইলের শিশি, ছেঁড়া চটি, ছাতার কাপড়, নষ্ট ছিটকিনি, কাটা বালব ছাড়া কিছু নেই, সেখানে অনেক দাঁড়াল মিতুলদি। খুঁজতে খুঁজতে মিতুলদি ভিজে যায়। তার সেই শরীর সায়মের গলা টিপে ধরে। সায়মের নাভির নীচে ধুনুচি জ্বলে ওঠে। পায়ের একটু দূরে থমকে আছে নাচ, হাতের একটু দূরে, সায়ম ছুঁতে পারে না। সাপের খোলসের মতো পড়ে আছে নদী। খাট থেকে নামার সময় পায়ের বুড়ো আঙুলে জড়িয়ে মিতুলদির শাড়ির কিছুটা ফেঁসে গেল। শবগন্ধ, কুশাসন, ন্যায় ও বিস্মৃতি— বলতে বলতে মিতুলদি আভাঙা শরীরে দোতলার দক্ষিণে সুধীরেন্দ্র পত্রনবীশের ঘরে চলে গেল। 

গরালিতে তিনি এত জনপ্রিয়, তা হঠাৎই টের পেলেন সুখেন্দ্র পত্রনবীশ। এই টের পাওয়া তার ভেতর পুরনো ক্ষত বিষিয়ে দেয়। গরালিপুর একদিন তাঁকে দুর্নীতিগ্রস্ত বলে বর্জন করেছিল। ত্রাণের তেরপল-কম্বল ঝেড়ে-দেওয়া মন্ত্রীর সঙ্গে সুখেন্দ্রর হব্‌নবানি গরালিপুরের মানুষ ভালোভাবে নিতে পারেনি। ‘পত্রপুট’-এর মতো জনদরদি বাড়ির ছেলেকে চোরের ঘনিষ্ঠ হতে দেখে মানুষ কষ্ট পেয়েছিল। ‘পত্রপুট’ সে অর্থে কখনওই অভিজাত পরিবার নয়। প্রজার সর্বনাশ করে নটীবিলাসের কিংবদন্তি নেই। লেঠেল লাগিয়ে খুনখারাবির বীরগাথা নেই। সম্পত্তি নিয়ে রক্তপাতের ইতিহাস নেই। কোনো সাহেবসুবোর পদার্পণ ঘটেনি এ বাড়িতে। কোনো ধর্মাবতার কখনও এ-বাড়িতে ধ্যানস্থ হয়নি বা অলৌকিক মন্তব্য করেনি। বাঘ-সিংহ মারার ঐতিহ্য নেই। শিক্ষামূলক বা নারীজাগরণপ্রয়াসী কোনো পত্রিকা-টত্রিকা করার কথা এ-বাড়ির পূর্বপুরুষেরা ভেবেছিলেন বলে শোনা যায় না। নেহাতই সাদামাটা, আর পাঁচটা ভদ্র পরিবারের মতোই গসিপ্‌হীন। গরালিপুরে প্রথম আসেন মুনীন্দ্রনাথ পত্রনবীশ। কম পয়সায় বেশি জায়গা-জমি নিয়ে গাছগাছালি রোদবৃষ্টির সঙ্গে নিরিবিলি জীবনযাপন ভালোবেসে। অনেকেই যখন গ্রামজীবনের জন্য লিখিত হাহাকার করছে আর শহরে প্রকৃত ঘর-বাড়ি গড়ছে, মুনীন্দ্রনাথ তখন উলটো পথে হেঁটেছিলেন। তাঁর দ্বিতীয় পুত্র সুধীন্দ্রনাথের সময় এই দালান তৈরি হয়। তিনি ছিলেন ডাক্তার। পত্রনবীশদের কিছু গল্প এই সুধীন্দ্রনাথকে ঘিরেই আছে। তাঁর বাড়ি তৈরির কাজে স্থানীয় মানুষ স্বেচ্ছাশ্রম দেয় বলে জানা যায়। তিনিই বাড়ির নাম রাখেন ‘পত্রপুট’। সুধীন্দ্রর চার পুত্র সুধীরেন্দ্র, সুরেন্দ্র, সুখেন্দ্র ও সুমিতেন্দ্র। জনদরদি ভাবমূর্তিটা সম্ভবত ডাক্তারবাবুর আমলেই হয়। পরে আর কেউ ডাক্তার না হলেও মানুষের সঙ্গেই ছিলেন। ছিটকে গেলেন সুখেন্দ্র। জীবন ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী নিস্তরঙ্গ রেখা তাঁর অসহনীয় মনে হয়েছিল। অনেক পরে চলে যান সুরেন্দ্রও, তবে সে যাওয়া অন্যরকম। সুখেন্দ্র বুঝেছিলেন, পুরনো ভাবমূর্তি মৃত্যুকালীন সংকীর্তনের বেশি সান্ত্বনা দিতে পারে না। নতুন সময়ের ভাবমূর্তি তৈরি হচ্ছে ক্ষমতার বৃত্তে। 

ঠিকই বুঝেছিলেন সুখেন্দ্র। গত তিরিশ-চল্লিশ বছরে ‘পত্রপুট’ ছিন্নপত্র হয়ে গেছে। বাতিল হয়ে গেছেন সুধীরেন্দ্র, সুমিতেন্দ্র। এখন গরালিপুর শুধু তাঁরই কথা বলে, তাঁর বুদ্ধি, শ্রম, নিষ্ঠা, সাহস ও স্বপ্নের কথা বলে, তাঁকে আদর্শ করার কথা বলে। গরালিপুর স্বীকার করে যে, সুখেন্দ্র তাদের গর্ব। একদিন যারা তাঁকে আঘাত করেছিল, তারাই এখন পুজো করে। সুখেন্দ্র ইচ্ছে করেই সেসব প্রসঙ্গ তোলেন না, থাক না একটু ক্ষত জীবনসংগ্রামের চিহ্ন হয়ে। একদা জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া দলের ঘনিষ্ঠ সুখেন্দ্র আজ সাম্যবাদী দলের উপদেষ্টা— এতে নিজের মতাদর্শের কোনো রূপান্তর নেই, সবটাই চলেছে ক্ষমতার আবহমান ধারায়, সুখেন্দ্র শুধু নৌকো বদলেছেন মাত্র। যারা তাঁকে দুর্নীতিগ্রস্ত বলেছিল, তাদের যদি একটু আপশোস হয়, হোক না। যারা তাঁকে ‘পত্রপুটে’র কুলাঙ্গার বলেছিল, তারা যদি নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হওয়ার সুযোগ পায়, পাক না। সুখেন্দ্রকে ঘিরে আছে গরালিপুরের শ্রেণিনির্বিশেষ। সায়ম দোতলার বারান্দা থেকে দৃশ্য দেখে : এই লোকটা বন্যাদুর্গতদের তেরপল না পাঠিয়েই বিশ কোটি টাকার বিল বের করতে সাহায্য করেছে বলে প্রাক্তন বিরোধীরা অভিযোগ করেছিল, এই লোকটা শিল্প করার নামে জলের দরে সরকারি জমি বের করে ব্রাউন সুগারের দামে বেচে দিয়েছে বলে এখনকার বিরোধীরা অভিযোগ করেছে, শিলিগুড়িতে চা-বাগান উচ্ছেদ করে নতুন টাউনশিপ তৈরির কাজে একটা অবাঙালি ফার্মের হয়ে উমেদারি করছে বলে সবাই জানে, এই লোকটার নাম ব্যাংকের ঋণখেলাপি তালিকায় আছে বলে শোনা যায়। লোকটাকে এক প্রবীণ বুকে জড়িয়ে ধরল, কিছু তরুণ প্রণাম করল, কয়েকজন খুব কাছাকাছি এসে নমস্কার জানাল, তারাই লোকটাকে ঘিরে ফেলল যেন ভিড় কোনো প্রবলেম না করে, বহু লোক উঁচু জায়গা বেছে নিল তাঁকে ভালোভাবে দেখার জন্য। আমের বোলের মতো মুগ্ধতার নরম গন্ধে বাতাস ভরে গেল, কারা যেন স্লোগান দিল, ‘সুখেনদা জিন্দাবাদ!’ নষ্ট বাগানের আগাছা দেখতে দেখতে সুখেন্দ্র পত্রনবীশ দোতলায় উঠে সায়মের মুখোমুখি হতেই মনোরম হেসে বললেন, কেমন আছ, সায়মবাবু? তুমি কিন্তু আমার প্রশ্নটার জবাব আজও দাওনি। এমন একজন জীবিত মানুষের নাম বলতে পারোনি যার কথা ভেবে আমি সৎ জীবনে ফিরতে পারি। ব্যর্থ মানুষের নাম শুনতে চাই না। আগেই বলেছি, সততা বলতে যেন ব্যর্থতা না বোঝায়। সায়মের হাত ধরেন সুখেন্দ্র। সুধীরেন্দ্রর ঘরের দিকে হাঁটতে থাকেন। বলেন, খুঁজে পাবে না। নেই। অরণ্যদেবের নাম তুমি নিশ্চয় করবে না। কমিক স্ট্রিপ থেকে নাম নিশ্চয় তুলে আনবে না। ওসব এন্টারটেনমেন্ট। তোমাদের ভাবনাও তাই, সায়মবাবু। দেওয়ালে একটা ফাটলে আঙুল রেখে সুখেন্দ্র বলেন, দেখেছ, বাড়ছে? আরও বাড়বে। একদিন হেলে পড়বে। এটাই রিয়ালিটি। তুমি চোখ বন্ধ করে থাকলেও তা বাস্তব। তোমাকে আমি একটা কথা বোঝাতে পারিনি সায়ম। এটা আমার ব্যর্থতা। আমরা মিডিওকার, তুমি, আমি, এ বাড়ির সবাই। আমাদের বড় হওয়ার একটাই পথ। কোনো মতাদর্শে না ভোগা। কোনো ফিকসেশন নয়। যখন যা সামাজিক গতি তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা। তুমি অসাধারণ প্রতিভাবান হলে হয়তো সেটার দরকার হত না। হয়তো। তুমি আর পাঁচজনের মতো। আর পাঁচজন যা করে তোমাকেও তাই করতে হবে। নাহলে তুমি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তুমি বিচ্ছিন্ন হলে অন্যের সুবিধে। এই বিচ্ছিন্ন করার জন্যই পুঁথিতে ভালো ভালো কথা লেখা থাকে। সেসব পড়ে যদি আরাম পেতে চাও তো পড়ো, সেসব বলে সুখী হতে চাও তো বলো। জীবনের আলো নিভে-আসা লোকজন হাঁটু আর মুণ্ডু জড়ো করে বসে সৎকথামৃত শুনবে। কিন্তু নিজের জীবনের আলো নিভিয়ে দিও না, প্লিজ। জীবিতের দেশে ফিরে এসো, সায়ম। জানি, তুমি আমার কথা শুনবে না। আমার বৈভব, আমার প্রতিষ্ঠা, আমার প্রভাব তোমাকে সেই রমাঁ রল্যাঁর কারও বাড়ির মাপ দেখে তার অসাধুতার মাপ বোঝার কথা মনে পড়িয়ে দেয়। রমাঁ রল্যাঁর কথা আমি অস্বীকার করছি না, কিন্তু উনি তো লুপ্ত পৃথিবীর প্রত্নবস্তু হয়ে গেছেন। মিউজিয়মে তাঁকে দেখে হয়তো কোনোদিন ভাবব, পৃথিবীটা একদিন এরকম ছিল। সুখেন্দ্রকে আজ কথায় পেয়েছে। গরালিপুরে স্বতঃস্ফূর্ত গণ-সম্বর্ধনা তাঁকে উদ্দীপ্ত করেছে। গরালিপুর আজ তাঁকে বিজয়ীর সম্মান দিয়েছে। সেই পতাকা তিনি সায়মের সামনে গুটিয়ে নেবেন কেন? সায়মকেও তিনি জয় করতে চান। তাঁর জয় মানে সায়মের হার নয়। সায়মেরও জয়। সুখেন্দ্রর কথাবার্তা যত এগোচ্ছিল, বাবার স্বর শুনতে পাচ্ছিল সায়ম। অদ্ভুত মিল। বাবাকে পোলিটিকাল সাফারার মনে করে সায়ম। একটা ভুল রাজনীতি তাঁকে শেষ করে দিয়েছে। অথচ সেই রাজনীতিকেই তিনি আজও সত্য বলে বিশ্বাস করেন। নিছক ঠিক নয়, সত্য। তিনি ছেলেকে যখন সুখে থাকার পথ বাতলান, বোঝা যায় সেই পথকে তিনি কতটা ঘৃণা করেন। বাবা চিঠিতে আর্তনাদ করে ওঠেন, মিথ্যাচার জিতে গেছে, চক্রান্ত জিতে গেছে, বিশ্বাসঘাতকতা জিতে গেছে, গুপ্তচররা জিতে গেছে, হত্যাকারীরা জিতে গেছে। এসবের বিরুদ্ধে যারা দাঁড়িয়েছিল, তারা হেরো হেরো হেরো। প্রাক্তন আর্বান গেরিলা যখন ভোটের রাজনীতির প্রয়োজনের কথা বলে জোটে ভেড়ার তাল করে, অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা উদ্ধৃত হয় বাবার চিঠিতে— তখন তরাই ছিল, এখন ডিভান/চক্রব্যূহে লাশ হয়ে পড়ে আছে সেই ছেলে/তুমি আজ রাজা হবে তার রক্ত পায়ে দলে/তখন বারুদ ছিল, এখন বাগান। সুখেন্দ্রর সত্য অন্যরকম। তাঁর মতে, ইতিহাসে যেসব নাম আলোকিত হয়ে আছে, যেসব নাম হামেশাই উচ্চারিত উদ্ধৃত হয়, তাঁরা সবাই গ্রেট ম্যানিপুলেটর। ভালো করে ঘেঁটে দেখ, আদর্শ-ফাদর্শ নয়, ম্যানিপুলেশন, যে যত ভালো পেরেছে, সে তত বেশি জিতেছে, যে পারেনি, হেরে গেছে। একটা কলম বা হাতুড়ি বা পিস্তল, যতই এফেক্টিভ হোক, কী করতে পারে? শিক্ষামন্ত্রী হবে? শ্রমমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী? লাঙল হবে কৃষিমন্ত্রী? হয়েছে কোনোদিন? হতে পারে? ওসব ইমেজ বিল্ডিংয়ে হয়। সায়ম, আদর্শের ঠুলি পাবলিকের জন্য। তুমি কি পাবলিক হয়ে মরতে চাও? শোনো, তুমি লিটল ম্যাগাজিনে লেখো বলে শুনেছি। ওই লিটলওয়ালারা ঢের ভালো কথা ছাপে, আর আমার মতো খারাপ লোকের হাতে-পায়ে পড়ে বিজ্ঞাপনের জন্য। দিই, বুঝিয়ে দিই, ভালোলেখা স্পনসরড বাই খারাপলোক। এই যে লক্ষ লক্ষ টাকা দামে ছবি বিক্রি হয়, কোত্থেকে আসে সেই টাকা? সৎপথে? টাকা আছে বলেই না তারা শিল্প সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক! এবার উঁচু জমি ছেড়ে নীচে এসো, এক লেখক প্রায়ই বলেন, ভালো লেখা লিটল ম্যাগাজিনেই বেরোয়, শেষ পর্যন্ত লিটল ম্যাগাজিনই টিকে থাকে। অথচ তিনি নিজে বড় কাগজে লেখার জন্য অক্লান্ত চক্কর মারেন। তোমাদের এই জগৎ সম্পর্কে আমার বিশেষ জানা নেই, তবে মনে হয় এখানেও ইতিহাসের একই স্রোত, ইতিহাসের একই সত্য। একজন অন্যজনকে বলে, সেন্টারে যেতে চাওয়া একটা লালসা, একটা কদর্যতা। যে বলছে, সে কিন্তু সেন্টারে পৌঁছনোর জন্য লড়ে যাচ্ছে। 

সুধীরেন্দ্রর ঘরে মিতুলদি তখন অগ্নিযুগের কথা পাঠ করছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞান-বহির্ভূত হতাশা ধীরে ধীরে উপশম হয়ে ঘুম নামছিল বড়োমামার ভেঙেচুরে দলা-পাকিয়ে-যাওয়া শরীরে। সুখেন্দ্র কোনো কথা না বলে হাঁটতে শুরু করলেন মা-র ঘরের দিকে। দিদিমা সবে কথাসরিৎসাগর খুলে বসেছেন। সুখেন্দ্র বললেন, মিতুলের বিয়ে কি তোমরা হতে দেবে না? মামারা ওর একটা করে সম্বন্ধ আনছে, আর তোমরা ভেঙে দিচ্ছ। বড়দা যা করছে সেটা অন্যায়, আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি। বড়দার অবদমিত কামের শিকার হচ্ছে মিতুল। শুনতে খারাপ লাগবে, মিতুল একটা নারী, সে যুবতী। তাকে সহচরী করে বড়দা নিজের স্বপ্নের জগতে বাস করে। এতে একধরনের আধা-শরীরী আনন্দ হয়। ব্যর্থ বিপ্লবের কাহিনী নারীর গলায় একরকম সফলতা পায়, ভেতরে ভেতরে পুরুষের ক্ষরণ হতে থাকে। ব্যাপারটা বোঝাতে পারছি কি না জানি না, সুস্থ শরীর যা পায়নি, কামনা সত্ত্বেও যা নিষিদ্ধ জ্ঞান করেছে, নিজেকে দমন করেছে অলীক আদর্শে, আজ সে-ই নারীশরীরের জন্য উন্মাদ হয়ে উঠেছে, বদলা নিচ্ছে প্রাকৃতিক ধর্ম। অনেক বিপ্লবী আমরা দেখেছি, যারা নিজের মা আর কালীঠাকুর ছাড়া নারীমুখ দর্শন করত না, বিয়ের পর সাত-আটটা বা তারও বেশি ছেলেমেয়ের বাপ হয়েছে এক দমে। এসব শুনতে খারাপ লাগে। বড়দার কামের শিকার মিতুল। মিতুলের যখন বিয়ের বয়স থাকবে না, ওর শিকার হবে সায়ম! কিছুক্ষণ পর সুখেন্দ্র আহত বিক্ষত স্তব্ধ ‘পত্রপুট’ থেকে বেরিয়ে জনতার আলোয় আনন্দে ভেসে ভেসে গরালির ওপারে চলে গেলেন, খাল তখন সাপের খোলসের মতো পড়ে। সায়ম অশ্বমেধের ঘোড়ার নিশান যত দূর চোখ যায় দেখেছিল। 

শ্রীকাকুলাম থেকে বাবার চিঠি পেল সায়ম। লিখছেন, তোমার মা-কে নিয়ে দাক্ষিণাত্য ভ্রমণে বেরিয়েছি। তুমি হয়তো জানতে চাইবে না, রাতারাতি এত টাকা আমি কী করে পেলাম। যে কোনোদিন বিষ্ণুপুর বা মুর্শিদাবাদ যেতে পারেনি, সে হঠাৎ হাজার মাইল পাড়ি দিচ্ছে? তবু বলি, আসলে দাক্ষিণাত্য আর তেমন দূর নয়। পশ্চিমবঙ্গ থেকে শয়ে শয়ে লোক চিকিৎসা করাতে রোজ আসছে। কলকাতার ডাক্তারদের ওপর ভরসা নেই। বাঙালির হুজুগ আর আদিখ্যেতা বাদ দিয়েই বলছি, বাঁচার আগ্রহ বেড়েছে, সুচিকিৎসা পেতে চায় এবং গত পঁচিশ বছরে বাঙালি মধ্যবিত্তের হাতে বিপুল খরচ করে চিকিৎসা করাবার মতো টাকা যেভাবেই হোক এসেছে, আরও আসবে। গঙ্গার পাড় বাঁধানোর বড়ো একটা কন্ট্রাক্ট পেয়েছে কোম্পানি। কর্তার বিশ্বাস, সেটা আমার জন্যই পেয়েছে। আমার দায়িত্ব ছিল, কোম্পানির হয়ে সরকার আর পার্টির মধ্যে কথাবার্তা চালানো। যদিও আমি ডাইরেক্টলি এই কোম্পানির স্টাফ নই। বোঝো, আমি কতটা ধুরন্ধর হয়েছি। বোঝো, চুরিচামারির সমস্ত চুক্তি আমি নিখুঁতভাবে করেছি। এর জন্য বখশিস পেয়েছি এক লাখ, ইয়েস, আপাতত। আমার আদর-যত্ন, সম্মানের বহর ভাবা যায় না, জীবনে ভাবিনি এত সুখ পেতে পারি। পাঁচ লাখ টাকার পাথর— এহাঁ কা মাল ওহাঁ করে পাঁচ কোটি টাকা বখরা হয়ে যাওয়া, আগে ভাবলে, শিউরে উঠতাম, এখন পুলকিত হই। অক্টোবরে আরেকটা কাজ করতে হবে। একটা প্রায়-বন্ধ কারখানার জমি কেনাবেচা করতে হবে। বামপন্থী ঐতিহ্যের রাজ্য তো, খুব একটা অসুবিধা হবে না। দু-চারজন ভূতের রাজাকে খুশি করতে পারলেই জবর জবর বর মিলে যাবে। তোমাকে এসব বলে নিজের বিপদ ডেকে আনছি না তো? কীই বা বিপদ? তুমি নিশ্চয় চাইবে না তোমার মা খারাপ থাকুন। তুমি নিশ্চয় চাইবে না তোমার মা সারাদিন দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে ঠাকুরের কাছে এ-পোড়া জীবন থেকে মুক্তি প্রার্থনা করুন, প্রতি সন্ধ্যায় মৌনী হয়ে একশো আট বার ভুল বানানে দুর্গানাম লিখুন। উনি এখন ভালো আছেন, চোখমুখ পালটে গেছে। আমার প্রেসার, সুগার কোলেস্টেরল, ইউরিক অ্যাসিড ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য যথেষ্ট সময় দেন। তোমাকে না বললে কাকেই বা বলি! বলার দরকারই নেই। তবু বলা এই জন্যে যে, এভাবে বাঁচার কথা তো আগে ভাবিনি। বলতে পারো, স্বীকারোক্তি করে নিজের যন্ত্রণা লাঘব করা। এই স্বীকারোক্তির মতোই হঠাৎ মধ্যরাতে শ্রীকাকুলাম স্টেশনে নেমে পড়েছি। এই একটি নাম একদিন আমাদের রক্তে আগুন ধরিয়েছে। রাত জেগে জেগে দেওয়ালে লিখেছি এই নাম। সে-লেখার পেছনে কতটা যুক্তি ছিল, কতটা আবেগ, কতটা প্রচার, কতটা অন্ধতা, সেই তর্কে যেতে চাই না। আমি তো ছিলাম শুদ্ধ পবিত্র। আমরা। আমাদের আকাঙ্ক্ষায় কোনো ধান্দা ছিল না, ক্ষমতার স্পৃহা ছিল না, ভোগের মতলব ছিল না। শোষিত পীড়িত মানুষের জন্য একটা প্রশ্নহীন কল্যাণকামনায় আচ্ছন্ন ছিলাম। পাওয়া নয়, নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার ছিল সেই যুগ। আজ শোষিত পীড়িত শব্দগুলি শুনে কেউ সন্দেহ করতেই পারে। কিন্তু তার জন্য সেই সময় দায়ী নয়। সেই সময়ের নিষ্ঠা ঐকান্তিকতা নিয়ে মতলববাজ ছাড়া কেউ প্রশ্ন তুলবে না। আজ যখন বলা হয়, সে-দশক মুক্তির ছিল না, যুক্তিরও ছিল না, হতে পারে, তবে সে-দশক চুক্তির ছিল না, যে-চুক্তি খাল কেটে কুমির ডেকে আনে, যে-চুক্তি ১৫ শতাংশ মানুষের ভোগের কথা ভাবে, যে-চুক্তি নদীর পাড় বিপন্ন করে কিছু মানুষের জীবন সম্পন্ন করে। শ্রীকাকুলামের মাটিতে দাঁড়িয়ে সেই শুদ্ধ পবিত্র দীপ্ত জবাকুসুমসঙ্কাশ মহাসময়কে প্রণাম জানালাম। 

বড়োমামা শরীরটা কোনোক্রমে উপুড় করে, বালিশে বুক চেপে, হাতের ভরে মাথা তুলে অগ্নিযুগের কথা পড়ছিলেন, সায়ম দেখছিল। শুনেছিল, কর্ণফুলি নদীর ব্যালেস্টাইন ঘাটের কাছে রজত সেনের বাসা। বিপ্লবীরা রজত সেনের বাড়ি গেলেন। রজতের মা বিনোদিনী সেন বিপ্লবীদের মাসিমা। তিনি সকলকে আশ্রয় দিলেন। রজত সেন বাড়ি এসেছে, এ খবর পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে পেয়ে গেল। বিপ্লবীরা খেতে বসেছেন। রজতের ছোটো ভাই দৌড়ে এসে খবর দিল, পুলিশ আসছে। ভাত আর খাওয়া হল না। থালার ভাত থালায় পড়ে রইল। বিপ্লবীরা বেরিয়ে পড়লেন। কর্ণফুলির ঘাটে একখানা সাম্পান বাঁধা ছিল। মাঝি নেই। বিপ্লবীরা সাম্পান চালাতে লাগলেন। পুলিশ লঞ্চ নিয়ে ধাওয়া করল। প্রাণপণে সাম্পান চালিয়ে বিপ্লবীরা অপর তীরে পৌঁছে গেলেন। তীরে এসেই দৌড়তে শুরু করলেন। পুলিশ গ্রামবাসীদের উদ্দেশে চিৎকার করে বলল, ওরা ডাকাত। ওদের ধরো। গ্রামবাসীরা বিপ্লবীদের তাড়া করল। একজন গ্রামবাসী দেবপ্রসাদ গুপ্তের কাঁধে দা দিয়ে সজোরে কোপ মারল। দেবপ্রসাদের ডান হাত ঝুলছে। পেছনে তাড়া করছে পুলিশ। সামনে ইটপাটকেল ছুঁড়ছে গ্রামবাসী। খেতের ওপর ছুটছেন বিপ্লবীরা। তাঁদের পথ ক্রমেই সংকীর্ণ হচ্ছে। ঘিরে ফেলছে গ্রামবাসীরা। ‘ডাকাত ডাকাত’ চিৎকারে আশেপাশের গ্রামের মানুষও ডাকাত ধরতে ছুটে আসছে। অন্ধকার এসে বিপ্লবীদের আত্মগোপনের সুযোগ দিল। সেই অন্ধকারে পুলিশ ডাকাত খোঁজে। গ্রামবাসীরা ডাকাত খোঁজে। আর মাতৃভূমির মুক্তিসাধনার ব্রতে যাঁরা ঘরের সুখ, মায়ের স্নেহ, প্রিয়ার সঙ্গ ছেড়ে দুঃখ-ক্লেশপূর্ণ অনিশ্চিত জীবনকে বরণ করেছেন, সেই বিপ্লবীরা আরও অন্ধকার, আরও অরণ্য, আরও গুহা খোঁজেন। 

আরে, তুমি এলে কোত্থেকে? এই অকালে, এই অদেশে? হিজলের জারুলের শিরীষের ছায়া কবেই সাফ হয়ে গেছে। এখন পাথর আর রোদের প্রাণান্তকর খেলা। আনারসের বাগান কবেই লোপাট। নেই বাঁশবন, নেই সুপুরির সারি, নেই বেতের ঝাড়, নেই পাতাঝরার শব্দ, নেই ঝরাপাতার মাটি, নেই জলাজমির বাতাস। তবু তুমি এইখানে কেন এলে বাপু? আর কি মরার জায়গা জোটেনি তোমার? সেইরকম সেজে এসেছ, লেজে কাজল মেখে, আলতায় পা ডুবিয়ে। সেই গান ধরেছ? বোঝা বা শোনার মতো মনই নেই। হৃদয়ের সমাধিক্ষেত্রে এসেছ তুমি, শ্যামা! এই যে দেখছ চরাচর জুড়ে জানালা কপাট বারান্দা পাঁচিল, সবই সমাধিসৌধ। একদিন তালগোল পাকিয়ে বিশাল ঢিবি হয়ে যাবে। তা তুমি কি বাপু হাজার হাজার বছরের সাজ নিয়ে এসেছ হৃদয় জাগাবে বলে? শোনো, এই ঘরে এসে বোসো। পুরনো বাড়ির মেঝে স্যাঁৎসেতে, ঠান্ডা। ভালোই লাগবে। কার্নিশে পা পুড়ে যাবে, তুমি যা সুখী পাখি, রোদে তো বেরোতেই না। ছায়ায় ছায়ায় ঘুরতে যাতে রং না জ্বলে যায়। ঝোপের ভেতর পাতার শীতল মঞ্চে বসে গান গাইতে। এখন যদি তুমি এই সর্বখাকি রোদে, আগুনের গোলাছোটা বাতাসে উড়ে উড়ে গান গাও, লোকে ভাববে ভিখিরি এসেছে। মাফ করো বলতে পারে, দরজা বন্ধ করে দিতে পারে, কুকুরও লেলিয়ে দিতে পারে। দু-চার পিস ধান্ধামূলক দরদি আছে, যারা তোমার গান ক্যাসেট করে নাম কিনবে, মালকড়ি কামাবে, এক পয়সা রয়্যালটি দেবে না। মানুষের এই স্বভাবে তুমি দুঃখ পেতে পারো। তোমাদের স্বতঃস্ফূর্ত পাঠশালা ব্যর্থ হয়ে গেছে ভেবে কষ্ট পেতে পারো। কী দরকার? এর চেয়ে ঢের ভালো নয় কি অন্য কোনোখানে চলে যাওয়া? কোথাও কি এখন নদী নেই, জলাভুমি নেই, সবুজ নেই, বৃষ্টি হয় না, আকাশ পালটে পালটে ঋতু আসে না, ঋতু পালটে পালটে জীবন বয়ে চলে না? সবখানেই কি সবকিছু অবরুদ্ধ হয়ে গেছে, সব দেশই কি আত্মরক্ষামূলক পরমাণু বোমার তাপে বসে আছে? শ্যামা, বলি কী, শোনো, আমাকে সিনিক ভেবো না, পারো তো মুছে যাও, লুপ্ত হয়ে যাও। এখানে সঙ্গীও পাবে না যে একটু প্রেম করবে। আর যদি থাকতেই হয়, কাক হয়ে যাও। রূপের বালাই নেই, গানের বালাই নেই। সারাদিন কা কা করবে, উচ্ছিষ্ট খাবে, খাবারের জন্য দুয়ারে দরজায় জানালায় ঘুরঘুর করবে, তক্কে তক্কে থেকে ছোঁ মেরে নেবে। খাওয়া ছাড়া দিনভর কোনো কাজ নেই, অনন্ত লোভে ঠোঁট বেঁকে পুড়ে পৃথিবীর বীভৎসতম রাত্রির মতো কালো হয়ে আছে। কোনো চরিত্র রেখো না, অহংকার রেখো না, অভিমান রেখো না শ্যামা, গড়পড়তা হয়ে যাও। বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজনের কেউ আক্রান্ত, আহত বা মৃত হলে এক-আধ ঘণ্টা বিক্ষোভ সমাবেশ কোরো। সে-সময় ডাস্টবিনে মরা ইঁদুর নজরে পড়লে বা পচা কুকুরের খোঁজ পেলে সমাবেশ ছেড়ে চলে যেও। শ্যামা, তোমাকে পিণ্ডিখেকো কাক বলে সব উপকথা ভেঙে মেনে নেব। 

সায়ম পাখিমামার সংলাপ শোনে। 

পাখি গান গায়। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন