শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

হারুন রশীদের গল্পঃ একটি অসম্পূর্ণ জীবন বৃত্ত

বলি রে মানুষ মানুষ এই জগতে/ কী বস্তু কেমন আকার পাই নেদেখিতে।।
যে চারে হয় ঘর গঠন/ আগমেতে আছে রচন/ ঘরের মাঝে বসেকোনজন/ হয় তাই জানতে।।
এই মানুষে না যায় চিনা/ কী বস্তু কেমন জনা/ নিরাকারে নিরঞ্জনা/ যায়না তারে চিনতে।।
[লালন সাঁই]


১.

মানুষের জীবনে ধারাবাহিকতা থাকাটা কি আবশ্যক? অথবাধারাবাহিকতা কি স্বাভাবিক বিষয়? সিনেমায় দেখা নায়কের চরিত্রগুলোসম্পর্কে আমরা জানি ছেলেবেলা থেকেই যে ছেলেটা সুবোধ মানবিকদর্শনীয়, বড় হয়ে সেই ছেলেটিই সিনেমার মধ্যমনি। আর যে দুষ্ট ছেলেটিছেলেবেলায় স্কুলের বন্ধুদের মেরে রক্তাক্ত করতো, বড় হয়ে সে ভিলেনইহয়। উপন্যাসেও একই জিনিস দেখি। নায়কের মধ্যে শুধুই সাধুতা, ভিলেনের মধ্যে কেবলই মন্দতা।

সবকিছু কেমন যেন ফরমেট ফরমুলাতে সীমাবদ্ধ। জীবন কি তেমনধারাবাহিক নিয়ম মানে? কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে জীবনেধারাবাহিকতার স্থান নেই। জীবন হলো একটা ওলট পালট সিনেমারস্ক্রিপ্ট। যেখানে একই মানুষের জীবনে অনেক মানুষের গল্প। যেখানেএকই মানুষকে ঘিরে রচনা হতে পারে একাধিক উপন্যাস। একই মানুষকখনো নায়ক, কখনো ভিলেন, কখনো চরম অকাল কুষ্মাণ্ড। যেমানুষটা বাজারে গিয়ে স্মার্ট, সে মানুষ অফিসে ভোদাই। যে মানুষবন্ধুদের সাথে ধূর্ত শেয়াল, সেই মানুষ বউয়ের কাছে ভেজা বেড়াল।এমনকি একই সময়েই একটা মানুষ কয়েক রকমের জীবন যাপন করে।

মিনহাজকে তো চিনেছেন। সেই যে ঘর পালানো ছেলেটি। মায়ের সাথেঝগড়া করে বন্ধুর বাড়িতে তিনদিন লুকিয়ে থেকে হৈচৈ ফেলে দিয়েছিল।ঘুষখোর বাবার থেকে ২০ হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায় করে তারপরঘরে ফিরেছিল সে। সেই ছিল তার শুরু। বাবার উপর প্রতিশোধ নেয়া।বাবা লোকটা ভালো ছিল না। সবার বাবা ভালো হয় না। তার বাবাতাস খেলে, মদ খায়, ক্লাবে গিয়ে টাকা ওড়ায়, বাড়িতে এসে মাকে পেটায়, এরকম আরো নানান কুকীর্তির সাথে জড়িত। বড় হতে হতে সব জেনেগেছে মিনহাজ। ছেলেবেলায় যে বাবাকে মিনহাজের নায়ক মনে হতো, বড়হতে হতে লোকটা হয়ে গেল ভিলেন। বাবার এই পরিবর্তন মিনহাজকেওপরিবর্তিত করতে শুরু করে।

ছেলেবেলায় মিনহাজ খুব দুষ্টামি করলে মা প্রচণ্ড রাগ করে বলতো, "তোর বাবার মতো হচ্ছিস? খবরদার সেরকম দেখলে আমি তোকে লাথিদিয়ে বের করে দেবো! শুয়োরের ঘরে শুয়োরের বাচ্চা হয়েছে!" মায়ের মুখখুব খারাপ হয়ে যায় রেগে গেলে।

মিনহাজের ভেতর ঢুকে গিয়েছিল বাবার মতো হওয়া যাবে না। তাই সেভালো হবার চেষ্টা করে। নলিনী স্যারের কাছে প্রাইভেটে বীজগণিতপাটিগণিত বাংলা ইংরেজি গ্রামার মুখস্থ করে যখন মেট্রিকে হায়ারসেকেন্ড ডিভিশন পেল তখন সত্যি সত্যি মনে হলো সে বাবার চেয়েভালো কিছু হতে যাচ্ছে। সে ইংরেজি শেখার জন্য TOEFL বই কিনেপড়তে শুরু করে, ভর্তি হয় YMCA স্পিকিং কোর্সে। কলেজে পড়ার সময়শিক্ষার গতিবেগ যতটা হওয়া দরকার তার চেয়ে বেশীই ছিল।

কিন্তু একদিন বাসায় ফিরে দেখলো বাবা স্যান্ডেল দিয়ে মাকে বেধড়কপেটাচ্ছে আর অকথ্য গালি বিনিময় হচ্ছে দুই পক্ষ থেকে। মায়ের মুখেওএসব শব্দ সে কল্পনা করেনি। সে গিয়ে থামাতে চাইলে কোন পক্ষইথামলো না। তারপর সে ডাইনিং টেবিল থেকে কাঁচের জগটা তুলেদেয়ালে ছুঁড়ে দিয়ে কিচেন থেকে দা নিয়ে ডাইনিং টেবিলে কোপাতে শুরুকরলো তীব্র চীৎকার দিয়ে। খুন চেপে গেছে তার মাথায়। এবং সাথেসাথে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলো। বাবা ওর দিকে রক্তচক্ষু মেলে তাকিয়েদরোজা খুলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। মা অনিশ্চিত দৃষ্টিতে মিনহাজেরদিকে তাকিয়ে নিরূপণ করার চেষ্টা করলো সে কোন পক্ষের হয়ে হুংকারদিল। কিন্তু মিনহাজ আজ কারো পক্ষে না। গোটা দুনিয়ার উপরই তারবিরক্তি চলে এসেছে।

সেদিন থেকে বাবার মতো হবে না, এই প্রতিজ্ঞার বিপরীত দিকে যাত্রাশুরু হলো তার। ফেন্সিডিল বন্ধুর অভাব ছিল না, ছিল না গাজা চরসহেরোইন বন্ধুরও। সাথে যোগ হলো খারাপ পাড়ায় যাতায়াত। ইন্টারপরীক্ষার আগে বই খুলে লেখা যায় তেমন একটা কলেজে গিয়ে ভর্তিহলো। কোনমতে পাশ করলো। আর পড়ার ইচ্ছে নেই তার।পড়াশোনার ইতি সেখানেই। তারপর বছরের পর বছর আরো গভীরঅন্ধকারে ঢুকে যেতে থাকলো ক্রমশ:। সেই অন্ধকারের একজনের হাতধরে সে একদিন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। শুধু ঘর নয়, তার পরিচিতসমাজের গণ্ডী ছেড়েও অনেক দূরে কোথাও চলে গেল। তাকে আরকখনো দেখা যায়নি এলাকায়। হালিশহরের মিনহাজ অধ্যায় ওখানেইশেষ হলো। কিন্তু তার নষ্ট হবার কাহিনীটা আরো কয়েক মাস মুখে মুখেথাকলো। একসময় তাও মিলিয়ে গেল।

২.

রিভারসাইড ক্লাবটা খুব সুন্দর। পদ্মা অয়েল কোম্পানির গুপ্তখালডিপোর পাশে যে অফিসার্স কলোনি, সেখানেই ক্লাবটির অবস্থান।সবুজে ছাওয়া এলাকা। পতেঙ্গা রোডের তেলের গন্ধ পেরিয়ে ডানদিকেরলোহার গেটের মধ্যে ঢুকলেই হঠাৎ একটুকরো স্বর্গের মতো মনে হয়এলাকাটিকে। বামদিকে টাইলসের সারিবদ্ধ বাংলো, ডানদিকে ছোটখাটএকটা লেক বা পুকুর, লেকের ওপাশেই ক্লাবঘর, একটা সুন্দর কাঠেরসেতু পেরিয়ে ওপাশে যেতে হয়। ছায়াময় কাঠের সেতুটাতে দাঁড়ালে নদীরবাতাসে জুড়িয়ে যায় শরীর মন। লেকের মধ্যে ফুটে আছে সাদা গোলাপীশাপলা। ছোটাছুটি করছে মাছের দল, লেকের চারপাশে ঘন গাছেছাওয়া। পুরো এলাকাটাই যেন একটা পার্ক। সেতু পেরিয়ে ক্লাবেরপ্রবেশপথ। ডানদিকে দুটো দোলনা, তার একটু পর ভলিবল ব্যাডমিন্টনখেলার জায়গা, তার বায়ে গোলাকার জায়গা মাঝে একটা সিমেন্টেরগোলাকার বেদী। আরো বায়ে বিশাল সবুজ একটা মাঠ। এত ঘন ঘাসেছাওয়া মাঠ শহরে দ্বিতীয়টি আছে কিনা সন্দেহ।

এই ডিপোর ম্যানেজারের বাংলোতে কাজ করে নাসিমা। ঠিক বুয়া নাহলেও ঘরের সব কাজ সে করে, পাশাপাশি বাচ্চা দুটো দেখাশোনা।ম্যানেজারের বউ নাসিমাকে বলেছে চাইলে তাদের বাগানের কাজ করতেসে তার স্বামীকে লাগাতে পারে। নাসিমার স্বামী পাশের একটা ডিপোতেসিকিউরিটির চাকরী করতো, তাকে ছাঁটাই করেছে কোম্পানির মন্দারকারণে। এখানে চাকরীর জন্য নাসিমা বলে রেখেছিল। কিন্তু ক্যাজুয়ালবাদে স্থায়ী চাকরী দেবার ক্ষমতা ম্যানেজারেরও নেই। তাইম্যানেজারের বউ নাসিমাকে এই প্রস্তাব দিল। নাসিমা খোদার কাছে বড়ধরনের শোকর করলো দ্বিতীয়বার। প্রথমবার করেছিল যেদিন মিনহাজতাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল।

দেবতা বলতে যা বোঝায় মিনহাজ তার চেয়েও বেশী কিছু। নাসিমাকে কিঅবস্থা থেকে উদ্ধার করে এখনো পর্যন্ত আগলে রেখেছে সেটা কেবলউপরঅলা জানে আর জানে সে। মিনহাজ কেন এই কাজটা করলোসেটা আজো রহস্য। সে চাইলেই অন্যদের মতো কাজ সেরে চলে যেতেপারতো। কিন্তু কি একটা কারণে সে তার কাছেই ফিরে এসেছে। তাকেনিয়ে স্বপ্ন দেখেছে, ঘর বেধেছে, ঘর ছেড়েছে, সেই সাথে ছেড়েছে সকলধন সম্পদের হাতছানি, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, এমনকি নিজের পরিবারও।নাসিমার মধ্যে এমন কি আছে যে সে এত ভালোবাসার যোগ্য? যদিকেবল শরীরের আকর্ষণ থাকতো, সেটা মিনহাজ বিয়ে ছাড়াই পেতেপারতো। এমনকি যখন মিনহাজ তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয় তখন সেরীতিমত অসুস্থ। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে নিজের হাতে সেবা করেসুস্থ করে তুলে, তারপর বিয়ে করা, এটা তার পেশার কেউ কখনো কল্পনাকরেনি। এই মানুষকে দেবতা বললেও কম বলা হয়। বড়লোক বাবারসম্পদের মোহ ছেড়ে সে এখন বস্তি জীবনযাপন করছে গত দশ বছরধরে। তাদের ঘরে দুটো সন্তান। স্কুলে ভর্তি করিয়েছে তাদের।

মিনহাজকে মাঝে মাঝে তার পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখতে বলেনাসিমা। তাদের বিয়ে মেনে না নিলেও তারা তো বাবা মা। যত রাগইথাকুক, সেই মায়ের গর্ভেরই তো জন্ম। তাকে বছরে অন্তত কয়েকবারগিয়ে দেখে আসুক। কিছুদিন গিয়ে সাথে থাকুক। অনেকটা নাসিমারপীড়াপীড়িতে কেবল মায়ের কাছে যায় বছরে দুয়েকবার। মা তার হাতেকিছু টাকাপয়সা তুলে দেয়। কয়েক বছর আগে ফরিদপুরের ওদের গ্রামেরবাড়ি গিয়েছিল মায়ের সাথে। মা গ্রামে বাড়ি করছে। ওখানে গিয়ে কাটাবেশেষ বয়সটা। মা বললো কিছুদিন গিয়ে বাড়ির কাজ দেখাশোনা করতে।নাসিমাকে জিজ্ঞেস করতে নাসিমা রাজী। তোমার তো এখন কাজকর্মনেই, কিছুদিন থেকে আসো। নাসিমার হাতে কিছু টাকাপয়সা তুলে দিয়েসে ফরিদপুরে চলে যায় তিন মাসের জন্য।

৩.
ফুফুরা আজ চলে যাবে। মন খারাপ লীনার। তাই কলেজে যায়নি সে।ফুফুরা আর কখনো তাদের বাড়িতে এতদিন থাকেনি। এবার থেকেছেবাধ্য হয়ে। ওরা তো গ্রামের কথা ভুলেই গিয়েছিল। তবু এতকাল পর কিমনে করে গ্রামে ফিরে আসার চিন্তা করছে কে জানে। একবার যারা গ্রামছেড়ে যায় তারা কখনো ফেরে না আর। অনেক দেখেছে সে। শহরে কিযাদু আছে, মানুষকে আটকে রাখে। পতঙ্গ যেমন আলোর চারপাশ ঘিরেউড়তে থাকে কোন এক বিভ্রান্তিময় কারণে, অথচ আলো পতঙ্গকে মৃত্যুছাড়া আর কোন উপহার দিতে পারে না। শহরের মানুষগুলোকেও তারসেরকম লাগে। প্রত্যেকবার শহর থেকে যখন লাশ হয়ে একেকজন ফিরেআসে তখন তাই মনে হয়। গত তিন বছরে চারজনকে দেখলো সে।মৃত্যুর পরই যেন গ্রামের ঠিকানায় ফিরে আসা। একমাত্র মেজ ফুপুইব্যতিক্রম। উনি বাড়ি করছেন এখানে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস করারজন্যই। ফুফু শ্বশুরবাড়িতে না গিয়ে এখানে কেন বাড়ি করছে সেটা নিয়েঅবশ্য তার কোন মাথাব্যথা নেই। ফুফু এখানে থাকবে, সে ফুপুরসাথে সারাক্ষণ ঘুরঘুর করবে, এটা সেটা এগিয়ে দেবে, আর বকুলভাইয়ের চটকানা খাবে যখন তখন এটাতেই আনন্দ তার। বকুল ভাইয়াএকটা কেমন যেন। সে এখন বড় হয়েছে না? তবু তাকে ছেলেবেলার মতোগাধিনী বলে ডাকবে।

আচ্ছা এত বছরেও বকুলভাই বিয়ে থা করেনি কেন? এটা নিয়ে তারএকটা গোপন কৌতুহল আছে। কিন্তু কাকে জিজ্ঞেস করে? বকুলভাইয়েরবয়স কমসে কম ত্রিশ হবে। ও মা! এত বুড়ো হয়ে গেছে বকুল ভাই? কিএকটা ভেবে আপন মনে লজ্জা পায় সে। ভাবনাটা কাউকে বলার মতোনা, কাউকেই না। এটা সে নিজে নিজে ভেবে সুখ পায়। এমন করে আরকাউকে ভাবেনি সে। তারা তো আত্মীয়ই। এমন করে ভাবা কি ঠিক? তারচেয়ে বকুলভাই ১২ বছরের বড়। এত পিচ্চি একটা মেয়েকে পাত্তা দেবে নাবকুলভাই। সেরকম দেয়ও না। এই বয়সী মেয়েদের দেখলে পুরুষরা অন্যচোখে দেখে, কিন্তু বকুলভাই কেমন অন্যরকম। তাকে যেন দেখেও দেখেনা। আচ্ছা, শহরে বকুলভাইয়ের কেউ নেই তো? শহরের ছেলেরা অনেকসহজে প্রেমট্রেম করে। ধুরো বকুলভাই সেরকম না। ফুপুর সাথে বাড়িরকাজ তদারকি করার পাশাপাশি কেবল রেডিও ঘুরায়, গান শোনে।এদিক সেদিক নজর দেয় না। সেরকম কেউ থাকলে বকুলভাই নির্ঘাতউদাস হয়ে যেতো মাঝে মাঝে। এখানে আছে আজ দুমাসের বেশী।একবারও সেরকম মনে হয়নি।

আজ ফুপুরা নিজের বাড়িতে উঠবে। বাড়িটা ওদের ১০০ গজের মধ্যেই।তবু মনে হচ্ছে ওখানে গেলে বকুলভাইকে আর পাবে না। এখানে এইকদিনের যে খুনসুটি, মায়া গড়ে উঠেছিল, সেসব কি আর থাকবে? বকুলভাই নিশ্চয়ই এরপর শহরে ফিরে যাবে। আবার কবে দেখা হবে।ততদিনে যদি ওর কিংবা বকুলভাইয়ে বিয়ে হয়ে যায় তখন কিআর......ভাবতে পারে না লীনা। তার দুচোখ ঝাপসা হয়ে আসে।রান্নাঘর থেকে মা ডাকছে। আজকে ওদের জন্য বিশেষ বিদায়ীখানাপিনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাবা বলেছে আরো কদিন ওদের জন্য এবাড়ি থেকে খাওয়া যাবে। ফুপুর যেন কষ্ট না হয়। বাবা তার এইবোনটাকে বেশী পছন্দ করে।

বিকেলটা মেঘলা। বৃষ্টি হবে আজ রাতে। আকাশের সাথে লীনারমনটাও একই সুরে কাঁদছে। প্রতিদিন রাতে শোবার আগে সেবকুলভাইয়ের ঘরে এক গ্লাস পানি রেখে আসে। ওটা একটা অজুহাত।আসলে বকুলভাইকে শেষবার দেখে ঘুমোতে যাওয়া। গত দুমাস ধরে এইরুটিনে আজকে ব্যাঘাত ঘটলো। আজকে কি দেখে ঘুমাবে সে? রাতেপানি খাবার অভ্যেস বকুলভাইয়ের। এখন কে দেবে পানি? তার চিন্তারবহর দেখলে বাচ্চাছেলেও হাসবে। তবু সে পাগলামি চিন্তা করে। হাতেচিড়াভাজা নিয়ে মা আসে। হঠাৎ করে বলে বসে-

-আচ্ছা বকুলকে তোর পছন্দ হয়?

-মানে?

-বয়সটা একটু বেশী হয়ে যায়। কিন্তু এত ভালো ছেলে তো আর হয় না।

-মা তুমি কি বলছো বুঝতে পারছি না।

-কদিন আগে কথায় কথায় আপা তোর প্রশংসা করছিল। তারপর তোকেচেয়েছে বকুলের জন্য অবশ্য তুই রাজী থাকলে।

মাথাটা কেমন ঘুরে ওঠে লীনার। এসব কি শুনছে সে। নিশ্চয়ই এটাসত্যি না। এটা স্বপ্ন। সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। তাদের বাগানেরসবজিতে মুখ দিয়ে কচকচ করে খাচ্ছে পাশের বাড়ির ছাগলটা।অন্যসময় হলে চিৎকার করে উঠতো সে। এখন মা এসব কি বলছে।ছাগলটাও কি স্বপ্নের অংশ?

-কি রে চুপ রইলি কেন? তোর বাবাকে বলেছি, তুই রাজী না থাকলেআমি না করে দেবো।

-না মা, আমি এসব কি জানি, আমি বুঝি না

-তবু তোর যদি খারাপ লাগে আমি মানা করে দেবো। আমি জানি তুইওকে বড় ভাইয়ের মতো দেখিস।

-না মা সেজন্য না, আমি আসলে....

-তোর আপত্তিটা কোথায় তাইলে?

-আ....আমার... আমার আপত্তি নাই। তোমাদের যা ভালো মনে হয়করো

অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে আর কোন সমস্যা নেই। খুব বেশী ধুমধামনা। বাইরের কাউকে দাওয়াত দেয়া হলো না। শুধু এ গ্রামের আত্মীয়স্বজনকে নিয়েই বিয়ের অনুষ্ঠান হয়ে গেল। এমনকি ফুপাও আসতেপারেনি। ফুফু বললো তার অফিসের কি ঝামেলায় সে আসতে পারছেনা। লীনার তাতে কোন সমস্যা নেই তার শুধু বকুল ভাইকে পেলেই হয়।আচ্ছা, এখন তো বকুল ভাই ডাকা যাবে না। কি ডাকবে সে? মিনহাজসাহেব? বাসরঘরে হিহি করে হেসে উঠলো মনে মনে। একটু পরেই তিনিআসবেন। এই ঘর থেকে নতুন বাড়ির চুনকাম করা গন্ধটা এখনোযায়নি। বাসরঘরের ফুলের গন্ধ ছাপিয়েও সেই গন্ধটা নাকে এসেলাগছে।

৪.

ঢাকায় এসে মিনহাজ ট্রেন বদলে তুর্না নিশীথায় উঠলো। সে একাইফিরছে। মা ওখানেই থাকবে। সাথে লীনা। মাকে কথা দিয়েছিল অন্তত: একটা কথা রাখবে তার। কেউ জানে না বাবার সাথে মার সেপারেশানহয়ে গেছে বছরখানেক আগে। মা গ্রামে একা থাকবে। কিন্তু এই বয়সেএকজন সঙ্গী দরকার তার। মা একটা বউ চেয়েছিল তার কাছে।চেয়েছিল মায়ের পছন্দের একটা মেয়েকে বিয়ে করুক সে। অনেক ঠাণ্ডাযুদ্ধের পর রাজী হয়েছে লীনাকে বিয়ে করতে। গ্রামের কেউ জানে নামিনহাজের শহরের অধ্যায়। তাই বিয়েটা নিয়ে কোন ঝামেলা হয়নি। যদিসব জানাজানি হয় একদিন? মিনহাজ ওসব নিয়ে ভাবতে চায় না। সেআর কখনো গ্রামে ফিরবে কিনা সন্দেহ আছে। নাসিমার কাছেই তারসব। তার দুটো সন্তান নাসিমার গর্ভেই। ওদের ছেড়ে অন্য কিছু ভাবতেপারবে না সে। লীনাকে নিয়ে তার কোন আবেগ নেই। সে ওকে বিয়েকরেছে মায়ের ইচ্ছে পূরণ করতেই। বাকী জীবন লীনা কি করে কাটাবেসেটা নিয়ে তার কোন ভাবনা নেই। ওটা মায়ের বিষয়। মা নাসিমাকেকোনদিন মেনে নেবে না। সুতরাং মায়ের জন্য আর কিছু করার নেইতার। তার দুটো সন্তানকে মা একবারও দেখতে চায়নি। কত নিষ্ঠুর।নাসিমা খারাপ বলে তার সন্তানও খারাপ হয়ে যাবে? সারারাতমিনহাজের ঘুম আসে না এসব ভেবে। অনেকদিন আগে সে একটাজীবনকে রক্ষা করেছিল। এখন আরেকটা জীবন নষ্ট করলো।

৫.

মিনহাজ অনেক শুকিয়ে গেছে। গ্রামের পরিশ্রমে কালো হয়ে গেছে সে। কীখেয়েছে, কোথায় খেয়েছে কে জানে। চিন্তিত নাসিমা দেখে তার চেহারারমধ্যে কি একটা পরিবর্তন। কেমন একটা বিষন্নতা। আগের মতোছেলেমেয়েদের নিয়ে আহলাদ করছে না। মাকে নিয়ে চিন্তা করছে হয়তো।মা গ্রামে একা আছে সেজন্যই। হাজার হলেও আপন মা তো। নাসিমা কীকরবে বুঝতে পারে না।

৬.

আরো আট মাস পর মিনহাজ খবর পায় লীনা একটা ছেলের মা হয়েছে।এই সংবাদে তার ভ্রু কুঁচকে ওঠা ছাড়া তেমন কোন প্রতিক্রিয়া হয় না। মাতার কাছে একটা নাতিও চেয়েছিল। তাও পূরণ হলো। এই সংবাদ পাবারপর ওদিকের সমস্ত যোগাযোগ ছিন্ন করে দেয়। মাকে দরকার নেই তার।লীনাকেও না। জীবনের ওই অংশটাকে সে মুছে ফেলতে পারলে এইঅংশে কিছুটা সুখী হতে পারে। নইলে এপার ওপার করে তার জীবনটাঅতিষ্ঠ হয়ে যাবে।

৭.

বাগানের কাজটা নিলো মিনহাজ। নাসিমা খুব খুশী। এখন স্বামী স্ত্রীদুজনেই এক জায়গায় কাজ করতে পারবে। এই ম্যানেজার যতদিন আছেচাকরী নিয়ে ততদিন চিন্তা নাই। কোন একদিন স্বামীর চাকরীটা স্থায়ীহয়েও যেতে পারে।

৮.

লীনা জানে না তার অপরাধ কী? পছন্দ না হলে কেন বিয়ে করতে গেলতাকে। তাকে তো জোর করেনি। বিয়ে করে তার একটা সন্তান হলো, চারবছরে তার মুখ দেখতেও একবার এলো না। কেমন মানুষ সে? ফুফু মানেশাশুড়িও এখন তার কোন খোঁজ জানে না। গত চার বছর কোথায়মিলিয়ে গেছে সে। বেঁচে আছে না মরে গেছে জানে না লীনা। কেউ কোনখবর দিতে পারে না। লীনার এখন নিজেকেই ঘেন্না লাগে। ইচ্ছে করেপালিয়ে গিয়ে নিজেকে নষ্ট করে প্রতিশোধ নেয়। শুধু ছেলেটার দিকেতাকিয়ে এখনো টিকে আছে সে।

৯.

অতএব মিনহাজ বৃত্তান্ত অসম্পূর্ণ হয়েই থাকে। প্রতিটি জীবিত মানুষেরবৃত্তান্তই অসমাপ্ত, বৃত্তও অসম্পূর্ণ তাই। এই বৃত্ত সম্পূর্ণ হয় মৃত্যুর পরেই।বাকী জীবনে মিনহাজ কোন পথে হাঁটবে আমরা জানি না। কিন্তু বৃত্তসম্পূর্ণ হবার আগে মিনহাজকে কোন মানুষের সংজ্ঞায় ফেলা যায়?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন