শনিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২০

মাহবুব লীলেন'এর সাক্ষাৎকার : পাঠ ও পাঠকৃতি


এমদাদ রহমান :
কোন লেখক আপনাকে প্রভাবিত করেছেন এবং কীভাবে প্রভাবিত করেছেন? 

মাহবুব লীলেন : 
সম্ভবত সকলেই অথবা কেউ না। লিখিত এবং না-লিখিত যত লেখকের রচনার সামনে গেছি; মনে হইছে এই অদ্ভুত বিষয়টা কেমনে খেলল তার মাথায়; কেমনে সে গুছাইল অত জটিল বিষয়খান। আবার যখন একজন ছাইড়া আরেকজনের রচনার সামনে পড়ছি; আগেরজন কিছুটা ঝাপসা হইয়া নতুনজন হইয়া উঠছে প্রধান…

লেখক বলতে সাধারণত যারা কলমে কিংবা টাইপে কিছু রচনা করে তাগোরে বুঝায়; কিন্তু আমার মনে হয় একটা বড়ো অংশের রচনাকার অক্ষর দিয়া কিছুই প্রকাশ করে না। ওরা মগজে রচনা কইরা মুখে বলে নিজেগো পরিমণ্ডলে। আমি এমন কিছু কিছু রচনাকারের সামনে গেছি; শুনছি। বিস্মিত হইছি শব্দ বয়ন আর দুইটা শব্দের মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় অনুভব প্রক্ষেপণের ক্ষমতায়… 

কিন্তু এককভাবে মনে হয় না কেউ নমস্য আছেন আমার… 


এমদাদ রহমান :
এখন কোন বইগুলো পড়ছেন, খাটের পাশের টেবিলে কোন বইগুলো এনে রেখেছেন পড়বার জন্য? 
মাহবুব লীলেন : 
ঠিক একক কোনো বই না। একটা বিষয় চটকায়া নির্যাস বাইর করার চেষ্টায় আছি। সেইটা হইল গৌতম বুদ্ধের আফগানি-ইরানি অরিজিন। জেসন রেজা জরজানি আর হার্ভি ক্রাফটসহ বেশ কিছু গবেষকের দাবি হইল গৌতম বুদ্ধ মূলত কাবুলের শক বা সিথিয়ান বা স্কেথিয়ান বা স্কুদাত গোষ্ঠীর মানুষ… 

পুরানা ইরানি ভাষায় প আর ব প্রতিস্থাপনমূলক ধ্বনি হইবার কারণে তার কাবুলি পরিচয়টাই পরে কপিল কিংবা কপিলাবস্তুতে রূপান্তরিত হয়। সেই কালে কাবুল পারস্যেরই অংশ আছিল। আবার তার শক্য মুনি পরিচয় তার শক বা সিথিয়ান পরিচয়েরই স্মারক… 

এই গবেষকগো আরেকটা দাবি হইল, চীনের তাওবাদ বা দাওবাদের জনক লাওয়েৎসু আর গৌতম বুদ্ধ একই ব্যক্তি। চীনা মান্দারিন ভাষায় লাওয়েৎসুর নাম লাওতান। লাওতান কথাটার মানে হইল লম্বা কানওয়ালা মানুষ; যেইটা বিতর্কহীনভাবে আছিলেন স্বয়ং গৌতম বুদ্ধ… 

প্রাচীন চায়না ভাষায় লাওয়েৎসু বা লাওতানের নাম আছিল কাওতাম; এবং প্রাচীনতর চীনা ভার্সনে গাওতামা; মানে বাংলায় যারে আমরা গৌতম বইলা জানি; তিনি। কিন্তু বিদেশি গাওতামা নামখান চীনাগো কানে অপরিচিত ঠেকায় দেইখা তারে ডাকা হইত লাওতান নামে… 

লাওয়েৎসু বা গৌতম চীনে আছিলেন পরদেশি। শেষ বয়সে যখন তিনি নিজের দেশে ফিরার লাইগা সীমান্তে আসেন; তখন সীমান্তরক্ষীরা তারে আটকায়া কয়- আমাগোরে একখান ধর্মপুস্তক লেইখা না দিলে তোমারে যাইতে দিমু না। তখন সেইখানে বইসা গাওতামা রচনা করেন তাওবাদের পুস্তক দাওদেজিং। দাও কথাটা আবার প্রাচীন চায়না ভাষায় উচ্চারিত হইত দারওয়া হিসাবে; যার মানে হইল ধর্ম… 

মানে সমীকরণটা হইল; পুরানা সিথিয়ান-পার্শিয়ান অধ্যুষিত উত্তর-পশ্চিম চীনে স্বদেশ থাইকা নির্বাসিত রাজনীতিবিদ গাওতামা প্রচার করছেন দারওয়া। মানে হইল কাবুলি শক্য গৌতম প্রচার করছেন ধর্ম; মানে লাওয়েৎসুর তাওবাদ… 

গৌতমরে যে চীনে নির্বাসিত রাজনীতিবিদ বলা হইতেছে; সেইটার পক্ষে দাবিনামাটা হইল; পারস্য সম্রাট সাইরাস দ্য গ্রেটের (খিপূ ৬০১-৫৩০) রাজকীয় আদালতের এক বিচারক ও যাজক গোমাতাই হইলেন গিয়া আমাগো পরিচিত গৌতম বুদ্ধ… 

সাইরাসের মৃত্যুর পর পারস্য সাম্রাজ্যে নেতৃত্ব শূন্যতা তৈরি হয়। তখন আদালতের বিচারক বা যাজকেরা শাসন ক্ষমতা নিজেগো হাতে নিয়া নেয় আর তাগো পক্ষে রাজা ঘোষণা করে এই গোমাতা বা গৌতমরে। মানে গৌতম বুদ্ধ আদিতে আছিলেন সাইরাসের পরে পারস্যের স্বল্পকালীন সম্রাট… 

এই গোমাতারে হটায়া পারস্যের ক্ষমতা দখল করে দাইরাস দ্যা গ্রেট (খিপূ ৫৫০-৪৮৭)। পরে আরো আঠারো জন রাজা নিয়া গোমাতা একাধিকবার দাইরাসের লগে যুদ্ধ করেন। এক পর্যায়ে দাইরাসের হাতে বাকি আঠারো নেতা মইরা গেলে গৌতম ভাগল দিয়া সীমান্ত এলাকায় শুরু করেন দর্শন প্রচার; যার মূল বিষয় হইল পারস্য সাম্রাজ্য ও সেই সাম্রাজ্যের পৃষ্ঠপোষকতায় বিস্তার হওয়া জরথ্রুস্টবাদের বিরুদ্ধবাদী দর্শন। আর সেইটারই ফলাফর হইল তাওবাদ আর শমনবাদ বা বর্তমানের বৌদ্ধ ধর্ম… 

এই গবেষণাগুলার আরেকটা দাবি হইল; শমনবাদ বা বৌদ্ধ ধর্মের উৎপত্তি বেদ বা ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধিতায় না; বরং সেইটা তৈরি হইছে জরথ্রুস্টবাদের বিরোধিতায়। দাইরাসের কালে জরথ্রুস্টবাদ চূড়ান্ত প্রভাবশালী হইয়া উঠে। একই সাথে দাবি করা হয় ওই আদি বৌদ্ধ বা শমনবাদ গঠিত হইবার কাছাকাছি কালেই ইরানিগো অন্য শাখায় পারস্য সাম্রাজ্য এবং জরথ্রুস্টবাদের প্রতিক্রিয়াতেই তৈরি হয় ব্রাহ্মণ্যবাদ বা বৈদিক সংস্কৃতি। সেই কালে আফগান-ভারত পুরাটাই আছিল পারস্যের অধীন… 

গৌতম বুদ্ধের গোষ্ঠী আধা যাযাবর শক বা সিথিয়ানগো হাতেই কিন্তু জরথ্রুস্ট খুন হন। সাইরাসও মরে এদের হাতে। কেউ কেউ দাবি করেন শকরাই মূলত সাইরাসরে মাইরা তাগো বংশের যাজক গোমাতা বা গৌতমরে পারস্যের রাজা বানায়। কিন্তু তারে হটায়া দাইরাস ক্ষমতা নিয়া রাজকীয় দর্শন হিসাবে গ্রহণ করে জরথ্রুস্টবাদ; ফলে সেইটার বিরুদ্ধাচারণ করতে করতে গৌতম পয়দা কইরা বসেন দুইখান ধর্ম; তাওবাদ আর বৌদ্ধ… 

আমি এই সমীকরণটা মিলানোর চেষ্টায় আছি আমার সহজিয়া রামায়ণ লেখার অংশ হিসাবে। রাজেশ কচার মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই প্রমাণ করছেন যে রাম এবং রাবণ দুইজনই আছিল আফগানি মানুষ। রাবণের লঙ্কা আছিল আফগান হরি রুদ নদীর একটা চর আর তার তীর ঘেঁইষা আছিল রামের অযোধ্যা… 

তো গৌতম বুদ্ধের কাবুলি পরিচয়টার একটা সমীকরণ পাইলে রামায়ণে জাবালি বা শবরীর মতো বৌদ্ধগো উপস্থিতি; রামের বৌদ্ধ বিরোধিতা কিংবা বৌদ্ধ রামায়ণে রাবণরে বৌদ্ধ দাবি করার একটা যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা পাওয়া যাইতে পারে… 

অন্য দিকে আফগানিস্তানের বলখ বা ব্যাকট্রার বাসিন্দা আদি বাল্মিকী চ্যাবন মুনি থাইকা শেষ বাল্মিকী রত্নাকর ভালিও পর্যন্ত রামায়ণ লেখক গোষ্ঠীর সকলেই আছিলেন ভার্গব বামুন। এই এই ভার্গবরা হইল গিয়া ইরানি স্পিতামা গোত্রের মানুষ; মানে যেই স্পিতামা গোত্রের মানুষ আছিলেন শক বা গৌতম বুদ্ধের বংশের শত্রু এবং তাগো হাতে নিহত জরথ্রুস্ট্র স্বয়ং। মনু সংহিতার মনুও আছিলেন ভার্গব; গীতাও ভার্গব অবদান। শুক্রাচার্যের বংশ লতায় জন্মানো কৃষ্ণও ভার্গব উত্তরাধিকার। মোট কথা পুরানা বৈষ্ণব ধর্ম কিংবা বর্তমান হিন্দু ধর্মটা ভার্গবগো হাতেই তৈরি… 

ফলে হইলে হইতেও পারে যে; বৌদ্ধগো লগে বামুনগো বিরোধিতা; কিংবা বামুনধর্মের বিপরীতে বৌদ্ধগো অবস্থানের মূল গোড়াটা শক বা সেথিয়ানগো লগে স্পিতামা গোত্রের আদি শত্রুতারই ধারাবাহিকতা… 


এমদাদ রহমান :
 সর্বশেষ কোন শ্রেষ্ঠ বইটি আপনি পড়েছেন? 


মাহবুব লীলেন :

হঠাৎ কইরা একটা দুর্দান্ত বই পড়লাম কয়েকদিন আগে। পাঠ তালিকায় আছিল না। বইটা হইল অমলেন্দু দে’র গবেষণাপুস্তক ‘সিরাজের পুত্র ও বংশধরদের সন্ধানে’… 

এককালের জমিদার যুগলকিশোর রায় চৌধুরীর বাড়িটা সিলেটে যুগলটিলা নামে পরিচিত; ওইখানে এখন ইস্কন মন্দির। ওইখানে যুগলকিশোরের কবরও আছে। ছোটবেলা থাইকা শুইনা আসছি যে যুগলকিশোর মূলত আছিলেন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পুত্র। কাহিনীটা লোককথা নাকি ঐতিহাসিক তা আর ঘাইটা দেখা হয় নাই। এর মাঝে কয়দিন আগে জয়দীপ দে শাপলুর লগে কথায় কথায় প্রসঙ্গটা উইঠা আসে। শাপলু পলাশির পটভূমিতে কাসিদ নামে একটা উপন্যাস লিখতেছেন। শাপলু বইটার সন্ধান দিলেন। বহুদিন পর এক বৈঠকে একটা বই শেষ করলাম… 

পরিবারিক দলিলের ওপর নির্ভর কইরা অমলেন্দু দে নিশ্চিতভাবেই প্রমাণ করছেন যে যুগলকিশোর হইলেন সিরাজের পুত্র। যুগলের মামা আছিলেন সিরাজের আমাত্য মোহনলাল। মোহনলাল পলাশির যুদ্ধে মরেন নাই; পলায়া ময়মনসিংহের এক জমিদার বাড়িতে ছদ্ম পরিচয়ে ভাইগনারে দত্তক রাখার ব্যবস্থা করেন। যুগলকিশোর পরে সিলেটে গিয়া বসতি করেন… 

বইটাতে একটা বিস্ময়কর ইঙ্গিত আছে; যুগলকিশোরের এক বংশধর দাবি করছেন; মোহনলালই নাকি আছিলেন সন্ন্যাসী বিদ্রোহের নেতা ভবানী পাঠক। ভাইগনার বন্দোবস্ত কইরা তিনি সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন কইরা মারা যান… 


এমদাদ রহমান : 
 আপনার প্রতিদিনকার পাঠের অভিজ্ঞতার কথা বলুন, কখন কোথায়, কী এবং কীভাবে পড়েন? 

মাহবুব লীলেন : 
পড়ার কোনো ঠিক ঠিকানা নাই। কামলা ও গেরস্থ জীবনের চিপায় যখন যেমন সুবিধা করতে পারি তেমনি পড়ি। এই অবস্থায় পড়ার লাইগা ছাপা পুস্তকের চেয়ে আমি এখন ইবুক প্রেফার করি… 


এমদাদ রহমান 
কোন বইটি আপনার খুব প্রিয় কিন্তু অনেকেই বইটির কথা জানে না 

মাহবুব লীলেন : 
আমি জানি না। আর প্রিয় বই কথাটার মানে ঠিক আমি বুঝি না। প্রিয় বই কথাটারে কেমন জানি ভক্তিমূলক কথা মনে হয়। ধার্মিকগো বাধ্যতামূলকভাবে এক বা দুইটা বই মাথার উপর তুইলা রাখতে হয়। ফলে তাগো কাছে প্রিয় বই কথাটার একটা মানে থাকতে পারে। কিন্তু পাঠকতো এক বই ফালায়া আরেক বই ধরে। প্রিয় বই বইলা তো গলায় ঝুলায়া রাখে না কিছুই। একজন পাঠকের প্রিয় বিষয় থাকতে পারে; কিন্তু প্রিয় বই কেমনে হয় বুঝি না… 


এমদাদ রহমান
কোন বইটি জীবনে একবার হলেও প্রত্যেকের পড়া উচিৎ? 

মাহবুব লীলেন : 
কোনো বইই না। এই কথাটা হইল গিয়া ছটাকি পণ্ডিতগো নিজেরে জাহির করার একটা কৌশল; মানে তাগো পড়া অমুক পুস্তক না পড়লে দুনিয়ার মানুষের জীবন বৃথা। এইগুলা ফালতু কথা। দুনিয়ার বেশিরভাগ বইয়ের কথাই বেশিরভাগ মানুষ জানে না। বাংলা ছাড়া অন্য ভাষার হাতে গোনা কয়েকজন লেখকের নাম জানি আমি। দুনিয়ার বেশিরভাগ ভালো বইই আমি পড়ি নাই; না পড়লেও চলে। সকলেরই চলে… 


এমদাদ রহমান : 
ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, সমালোচক এবং কবিদের মধ্যে এখনও লিখছেন এমন কাকে আপনি সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করেন? কেন করেন? 

মাহবুব লীলেন : 
আমি ভক্তিমূলক মানুষ না। শ্রদ্ধাভক্তি কিংবা পূজা বন্দনা কাউরেই করি নাই কোনোদিন; দরকারও মনে করি না। আমি বই ধইরা ধইরা হিসাব করি। সেই ক্ষেত্রে একজনের একটা বই নিজের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হইলে; অন্যটা নাও হইতে পারে। এবং সেইটা বদলায়; প্রতিটা নতুন বই পড়ার লগে লগে বদলায়… 


এমদাদ রহমান :
লেখক হিসেবে তৈরি হতে কোন বইটি আপনার মনকে শৈল্পিক করে তুলেছে এবং কীভাবে? 

মাহবুব লীলেন : 
নির্দিষ্টভাবে কোনোটাই না। নির্দিষ্ট কোনো বই কাউরে কিছু কইরা তোলে বইলা মনে হয় না। একজন পাঠকের ধারাবাহিক পাঠই তার চিন্তার নিজস্ব কাঠামো তৈরির পিছনে কাজ করে। ফলে আমি যা ভাবি; তার পিছনে আসলে পড়া সবগুলা বইয়েরই ভূমিকা আছে… 


এমদাদ  রহমান
কোন বিশেষ ভাব কিংবা পরিবেশ কিংবা পরিস্থিতি আপনাকে লিখতে বাধ্য করে? 

মাহবুব লীলেন : 
নাহ। ওরকম কিছু টের পাই নাই জীবনে। পরিকল্পনা কইরাই লিখতে বসি আমি… 


এমদাদ রহমান :
 আপনি কীভাবে আপনার বইগুলোকে গুছিয়ে রাখেন? 

মাহবুব লীলেন : 
এখন রাখি না। এখন আমার বই-ই নাই। দুইটা লাইব্রেরি আছিল আমার। একটা সিলেটে একটা ঢাকায়; বিষিয়ভিত্তিকভাবে গোছায়া রাখতাম। সব মিলায়া হাজার সাতেকের মতো বই আছিল। শেষে সাকুল্যে চাইরখান বই নিয়া দেশ ছাড়ছি। তবে আমার ডিজিটাল বইয়ের লাইব্রেরি আছে; বিষয়ভিত্তিকভাবে সাজানো; 


এমদাদ রহমান : 
 এই বইগুলো পড়ার পর কোন বইগুলো পড়বেন বলে ভেবেছেন? 

মাহবুব লীলেন : 
আশা করি আগামি দুই বছরের মাঝে আমার পুরাণ নিয়া লেখাপড়া শেষ হবে। এর পরে উপন্যাস আর কবিতা পড়ব একটানা বহুদিন… 


এমদাদ রহমান :
শব্দকে আপনি কীভাবে অনুভব করেন? আপনি কি কখনও শব্দের গন্ধ পেয়েছেন? 

মাহবুব লীলেন : 
দুপুরবেলা বাঁশঝাড়ের তলায় বাঁশপাতার ফাঁক দিয়া যেমনে আলোছায়া নড়াচড়া করে; আলোর জায়গায় ছায়া আর ছায়ার জাগায় আলো যাওয়া-আসা করে; কোনোটাই স্থির থাকে না; কোনোটাই স্পষ্ট না; তেমনি কিছুটা স্পষ্ট আর কিছুটা অস্পষ্ট অর্থ নিয়া শব্দ নড়াচড়া করে আমার মাথায়। কোনো সময় তারে ধরা যায়; কোনো সময় যায় না… 

শব্দের শব্দ শুনি আমি; মানে আওয়াজ। কিন্তু গন্ধ পাই নাই কোনোদিন… 


এমদাদ রহমান :
 সাম্প্রতিক কোন ক্ল্যাসিক উপন্যাসটি আপনি পড়েছেন? 

মাহবুব লীলেন : 
বহুত বহুত বচ্ছর ফিকশন পড়ি না। এক্কেবারে কাঠখোটট্টা বইপুস্তক পড়তে আছি বহুদিন… 


এমদাদ রহমান : 
আপনি যখন একটি বইয়ের কাজ করছেন, লিখছেন, সম্পদনা করছেন, কাটাকাটি করছেন, সেই সময়টায় আপনি কোন ধরণের লেখাপত্র পড়েন? আবার ঠিক এরকম পরিস্থিতিতে কী ধরণের লেখা আপনি এড়িয়ে চলেন? 

বিষয় ধইরা পড়ি। যেই বিষয়ে কাজ করতেছি সেই বিষয়টাই পড়ি। মাঝে মাঝে অবশ্য ছোটখাট অন্য বিষয় পড়া হয়; কিন্তু চেষ্টা রাখি মূল বিষয় থাইকা আমারে দূরে সরায়া নিয়া যাইতে পারে এমন বিষয়ে উঁকি না দেওয়ার… 


এমদাদ রহমান : 
সম্প্রতি পঠিত বইগুলো থেকে এমন কোনও বিস্ময়কর ব্যাপার কি জেনেছেন যা আপনার লেখক- জীবনকে ঋদ্ধ করেছে? 

মাহবুব লীলেন : 
না; আমার সাম্প্রতিক পড়া বইগুলা বহুত প্যাচ লাগানো; কোনো বিস্ময় নাই… 


এমদাদ রহমান : 
আপনি কোন ধরণের লেখা পড়তে আগ্রহ বোধ করেন, আর কোন ধরণটি এড়িয়ে চলেন?
  
মাহবুব লীলেন : 
আমি পড়ার বিষয়রে দুইভাগে ভাগ করি। পয়লা ভাগের বিষয় হইল পড়তে ভালো লাগার বই আর দ্বিতীয় ভাগের বই হইল পড়া প্রয়োজনের বই। পড়তে ভালো লাগার বইগুলা ভালো লাগলে আগাই; নাইলে ফালায়া দেই। আর দরকারি বইগুলা ভালো না লাগলেও নিজেরে চাইপা ধইরা পড়াই… 


এমদাদ রহমান : 
 আপনার জীবনে উপহার হিসেবে পাওয়া শ্রেষ্ঠ বই কোনটি? 

মাহবুব লীলেন : 
নাহ। লেখকদের দেওয়া সৌজন্য পুস্তক ছাড়া জীবনে কোনো বই উপহার পাইছি বইলা মনে পড়ে না। চুরি করছি। প্রচুর। যেইকালে আমার বই কেনার পয়সা আছিল না সেইকালেই আমি বেশি বই পড়ছি; প্রায় সবই চুরি। বিভিন্ন পাবলিক লাইব্রেরি; কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়; ব্যক্তিগত সংগ্রহ থাইকা চুরি করা বই… 


এমদাদ রহমান : 
ছোটবেলায় কেমন বই পড়তেন? সেই সময়ে পড়া কোন বই এবং কোন লেখক আপনাকে আজও মুগ্ধ করে রেখেছে? 

মাহবুব লীলেন : 
ছোটবেলা আসলে যা পাইতাম তাই পড়তাম। আমি বই বাছাই করতে শিখছি বিশ-বাইশ বছর বয়সে। বই বাছাই করতে শিখার আগে আমি একজনের সংগ্রহ থাইকা বেশ কয়েকটা রচনাবলী পইড়া ফালাইছিলাম। এর মাঝে শরৎ বঙ্কিম আর শেক্সপিয়রও আছে। এর বাইরে সপ্তায় দুই টাকা ভাড়ায় আইনা পড়তাম রোমানা আফাজের দস্যু বনহুর আর কাজী আনোয়ার হোসেনের কুয়াশা সিরিজের বই… 

রোমানা আফাজের বিষয়ে আমার এখনো বিস্ময় আছে। উনি বনহুররে ঘোড়ায় চড়ায়া মঙ্গলগ্রহে পাঠাইছেন; ঠিকাছে। কিন্তু পঞ্চাশের দশকে লেখা ওই পুস্তকে মঙ্গলে গিয়া বনহুর যে কায়দায় তার বৌর লগে কথা কয়; সেইটারে কিন্তু এখন আমরা মোবাইল ফোন বলি। ক্যান জানি মনে হয় দুনিয়াতে মোবাইল ফোনের ধারণার পয়লা দাবিদার রোমানা আফাজ হইলেও হইতে পারেন… 


এমদাদ রহমান :
 এ পর্যন্ত কতগুলো বই অর্ধেক কিংবা পড়া শুরু করে শেষ না করেই ফেলে রেখেছেন? 

মাহবুব লীলেন : 
অনিচ্ছায় বোধহয় ফালায়া রাখি নাই কোনো বই। তবে পড়া শুরু কইরা পড়ার উপযুক্ত না বইলা ফালাইছি বহুত বই… 

এমদাদ রহমান : 
কোন বইগুলোয় আপনি নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন? 

মাহবুব লীলেন : 
শেক্সপিয়রের টেম্পেস্টে ক্যালিবান মনে হয় নিজেরে; ইলিয়াসের চিলেকোঠার সেপাইয়ের হাড্ডি খিজির মনে হয়… 


এমদাদ রহমান : 
 কোন বইগুলো জীবনে বারবার পড়েছেন এবং আরও বহুবার পুনর্পাঠ করবেন? 

মাহবুব লীলেন : 
গবেষণাগ্রন্থগুলা বারবার ঘাটাইতে হয়। এর বাইরে কবিতার বই ছাড়া বারবার কোনো বইই পড়া হয় না… 

এমদাদ রহমান : 
লেখালেখির নিরন্তর প্রক্রিয়ার সঙ্গে কীভাবে একাত্ম থাকেন? 

মাহবুব লীলেন : 
জুতার তলায় পেরেক ঢুকলে যেমন সেইটা নিজ দায়িত্বে খোঁচায়া আপনেরে ল্যাংড়াইতে বাধ্য করে; লেখার বিষয়ও ওই রকম গুতায়া লেখকরে লাইনে ফালায়… 


এমদাদ রহমান : 
 কে সেই লেখক যাকে আপনি পাঠ করেন গভীর আনন্দের সঙ্গে, যিনি আপনার ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেন? 

মাহবুব লীলেন : 
একক কেউ নাই। প্রায় সব লেখাই আমি পইড়া মজা পাই। মনে হয় না একক কারো প্রভাব আছে আমার উপর… 


এমদাদ রহমান : 
 গল্প লিখতে শুরু করেন কীভাবে? একজন রিপোর্টারের মতোই কি আপনি চারপাশটাকে অবিরাম পর্যবেক্ষণে রাখেন? আপনি কি নোট নেন? 

মাহবুব লীলেন : 
আমি গল্প বলার চেষ্টা করি; বলতে বলতে টাইপ করার চেষ্টা করি। আমি পর্যবেক্ষণ করি; তবে রিপোর্টারের মতো না; বরং চোরের মতো। নোট নেই; প্রচুর। সব কিছুর। এমনকি কবিতারও… 


এমদাদ রহমান : 
লেখালেখির সবচেয়ে কঠিন দিক হিসেবে কোনটিকে চিহ্নিত করবেন? 

মাহবুব লীলেন : 
নিজেরে সামলায়া রাখা; নিজেরে লাইনে রাখা। লোভ আটকায়া রাখা; লেখার ফোকাসটা ঝাপসা হইতে না দেওয়া…


এমদাদ রহমান : 
আপনাকে ধন্যবাদ।

মাহবুব লীলেন : 
আপনাকেও ধন্যবাদ। 

1 টি মন্তব্য: