শনিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২০

শিপা সুলতানা'র গল্প : আসামযাত্রা

: কইন্যা বেটি...ও কইন্যা বেটি... 

ফাতিমা বেগম রা কাড়েন না। চুলার ওপর চড় চড় করে তেল ফুটছে। মাছ নামানোর পর গোল চামচে ভরে ভরে তেল ফেলতে হচ্ছে প্রত্যেকবার। সাবধানে মাছ ভাজতে হয়। মুখের ওপর শাড়ির আঁচল পেঁচিয়ে খুন্তি ধরে বসে আছেন তিনি। দরজার পাশে শিলপাটা নিয়ে বসেছে হুসনা। কতদিন বলেছেন স্বামীকে, এই এক পিষা-নিশার কারণেই বাড়ি চলে যাবে সে। দুনিয়া ভরে গেছে গুঁড়া মসলাতে, না সেসব নাকি ইটের গুঁড়া আর পলিমাটি। হুসনা যদি চলে যায়, কাঁচা মরিচ দিয়েই তিনবেলা রান্না করবেন ফাতিমা, এই এক শপথ তার।

মাছের লেজ, কাটামাটা সবার শেষে ভাজতে হয়। মাছ ছাড়তেই চড় চড় করে ওঠে, ফের 'ও কইন্যা বেটি...' 

যেন এই প্রথম শুনছেন, এমন ভাবে সাড়া দেন ফাতিমা। জি খউক্কা রে বো... ও রিমা... সাথে সাথে মেয়েও উঠে আসে। একটা পিরিচে দুই টুকরা ভাজা ইলিশ মেয়ের হাতে দেন, চাচাকে দিয়ে আসার জন্য। তারপর একটা বাটিতে ভাতের ওপর ইলিশের তেল, দুই টুকরা পেটি আর দুটি চামচ দিয়ে চোখের ইশারা করেন পড়ার টেবিলে বসতে। ভাইবোন তেলমাখা ভাত খেতে খেতে বাকি পড়া শেষ করবে এখন। আরেকটা বাটিতে কিছু তেল আর পোড়াপোড়া কলিজা রেখে বাকি তেল রান্নাঘরের জানলা দিয়ে বাল্লায় ছুঁড়ে ফেললেন ফাতিমা। পিষাপিষি শেষ হলে তাতে দুই খাবলা ঠাণ্ডা ভাত ফেলে আস্ত একটি নাগামরিচই শেষ করে দেবে হুসনা। কোনো কোনোদিন ইলিশের পেট ভালো থাকে না, ভেতরের তেলটেল গলে পানি। সেদিন মাছ কুটতে গিয়ে দুনিয়ার দুঃখ উঠলে ওঠে তার। পরেরদিন বোয়াল মাছের শক্ত শক্ত কলিজা ভাজি খেয়েই আগের দিনের দুঃখ ভুলে হুসনা। 

: ও কইন্যা বেটি... মাছো ডিম নাই নি? 

ফাতিমা বেগমের বিরক্তির শেষ থাকে না। কোন মাসে ডিম থাকে ইলিশে আর কোন মাসে থাকে না, এই আক্কেলও নাই? বুড়া বয়সে ভাসুরের বুদ্ধির ছিরি-শোভা দেখে ফাতিমা বেগমের রাগ ওঠে। 

না রে বো চাচা, মাছর পেটো ডিম নাই, কিতা গজব আইলো দুনিয়াত! বলে মুচকি মুচকি হাসে হুসনা। খেতে বসে সেও ডিমের ভাগ পায়, মুখে পুরলে দলাদলা বালুর মতো লাগে তার। মাছের ডিম নিয়ে মানুষের আক্ষেপ আহাজারি তাজ্জব করে তাকে। তবে মুখ থেকে ফেলেও দেয় না, ভালো জিনিসের গুণ চট করে ধরা পড়ে না, ছবর করতে হয়, নিশ্চয় কোনো মরতবা আছে! 

: তে চাইরটা ভাত দেও চাই রে গো... 

নতুন ভাত এখনো চুলার ওপরে, দুপুরের ঠাণ্ডা ভাত থেকে হুসনার জন্য একদলা রেখে বাকিটা একটা থালায় ঢেলে তার ওপর দুপুরের শিমের তরকারি আর দু'টি কাঁচামরিচ দিয়ে ফের মেয়েকে ডাকেন ফাতিমা। খেতে খেতে যতক্ষণ মুখ বন্ধ থাকে ভাসুরের! 

আছরের নামাজ শেষ করে টুপি ভাঁজ করতে করতে বাজারে ঢুকেন বাচ্চাদের বাবা। বাজার তখন সবে ডানা মেলছে। মাছ পান কলা, বাজারের হলা অর্থাৎ হলহলা। সব কিছু প্রথমে কেনা চাই তার। তারপর দোকানের কোনো কর্মচারীর হাতে বাজার লাগোয়া বাড়িতে পাঠিয়ে দেবেন। নামাজ শেষ করে কাটাবাছা করতে করতে মাগরিব। ফের নামাজ শেষ করে উঠলে চার কাপ চা বানিয়ে নিজে দু'খানা টোস্ট বিস্কিট রেখে বিস্কিটের টিনটি ফাতিমা বেগমের ছেলে মেয়েকে দিয়ে আসে হুসনা। ফাতিমা বেগম তার চায়ের কাপ হাতে চুলার পাড়ে গিয়ে বসেন তখন। কিছুক্ষণের মধ্যে আজমত আলীর গলা খাঁকারি শোনা যাবে বাড়ির মাথায়। চাচাতো ভাসুর। পাশের গ্রামেই বাড়ি। ডেকচির তলায় কিছু চা রেখে দেয় হুসনা। ফাতিমা বেগম দুধ চিনি মেশাতে মেশাতে কাপ নিতে আসে সে। আজমত আলী এসেই বাজারের থলে টেবিলের তলায় চালান করে দিয়ে টেলিভিশন ছেড়ে দেবেন। কায়দা করে ঘুরিয়ে নেবেন নিজের দিকে যাতে ভাতিজা ভাতিজিদের পড়ার মনোযোগ নষ্ট না হয়। ফাতিমা বলেছেনও অনেকদিন, ভলিউম কম রাখলেও বাচ্চাদের মন পড়ে থাকে টিভিতে। আজমত আলীর কোনো বিকার নেই। চা খেতে খেতে টিভির সামনে বসে দুনিয়ার নসিহত। ভাসুর শ্বশুরের বাড়া। না হলে কিছু বয়ান দিয়ে দিতেন ফাতিমা। এই যে দু/তিন বছর পর পর আসামের বায়ু চড়ে মাথায়, নয় নয়টি সন্তান আল্লার হাওলা করে নিরুদ্দেশ হওয়া কোন নীতিতে পড়ে! 

: ও ফুফু আম্মা... 
হুসনা হলুদ মাখা হাতে উঠে আসে। লবণের বয়াম থেকে এক খাবলা লবন তুলে মাছের থলে আন্দাজ করে লবন ছুঁড়ে দেয়। আন্দাজ করবে কি, যে থলেতে তলানি পড়ে আছে সেটাই মাছের। কোনো কোনোদিন আগবাজারে দেখা হলে ফাতিমা বেগমের স্বামী একটা বোয়াল কি ইলিশ কি বড় কোনো মাছ কিনে দেন। দিয়ে বলেন পচানোর আগে যেন বাড়িতে চলে যান। কেবল সেইসব দিনেই ফাতিমা বেগম স্বস্তিতে রান্নাবান্না করেন। বাদবাকি দিন গ্রামের শেষ ব্যক্তি হিসেবে গ্রামে ফিরেন আজমত আলী। মাঝেমাঝে এতো লবন দেয়ার পরেও মাছে পচন ধরে যায়, গলা ছেড়ে কাঁদতে বসেন আজমত আলীর বউ। তখন মধ্যরাতে আবার জেগে ওঠে গ্রাম। 

: ও ফুফু আম্মা... 

আহ্লাদ করে ডাকলেও বিরক্তি নিয়ে ফিরে আসে হুসনা, আর তরকারি নাড়তে নাড়তে মুচকি মুচকি হাসেন ফাতিমা। 

হুসনা ঝুপ করে বসে আজমত আলীকে কদমবুসি করে শিলপাটার কাছে ফিরে আসে। মাছের থলেতে লবন ঢেলে আসার সময় পা লেগে গিয়েছিলো আজমত আলীর জুতোর কোনায়। মনে করেছিলো বুড়া খেয়াল করবে না। লেকচার দেবার আগেই কদমবুচি সেরে ফেলে সে। না-হলে তার আদব-লেহাজ নিয়ে এবং বিবাহের বিলম্বের কারণ দর্শাতে দর্শাতেই এশার আজান! 

: কইন্যা বেটি... 

আজ আর নিস্তার নেই। উঠে আসারও উপায় নেই। কোথা থেকে ব্যাঙের উৎপাত শুরু হয়েছে খুব। সেদিন চোখের সামনে ফুটন্ত মাছের কড়াইয়ে লাফ দিয়ে পড়লো একটি ব্যাঙ। না-দেখলে সেই জিনিস সহ খেতে বসতো সবাই। কড়াই শুদ্ধ বাল্লায় ফেলে এক তরকারি দিয়ে খেতে দিলেন ফাতিমা। ভাসুরকে কিছু একটা বলা দরকার। দুই চুলায় তরকারির হাঁড়ি দুটিতে ঢাকনা দিয়ে সেখান থেকেই বলতে লাগলেন উনি... 

দুতিন বছর পর পর এই এক জ্বালা। স্বামী সন্তানদের নিয়ে খেতে বসেছেন ফাতিমা বেগম, হুসনা রান্নাঘরে বসেই খাচ্ছে বরাবরের মতো। ফাতেমা বেগম কথাটি তুললেন স্বামীর সামনে। ভাত মুখে তুলতে গিয়ে থেমে গেলেন আব্দুর রহমান। সাতকরা দিয়ে গরুর মাংস ভুনা তার পছন্দের খাবার। সাথে গজার মাছ দিয়ে গোয়ালগাদ্দা উরিও রান্না হয়েছে। সেদিকে ভুলেও তাকাবেন না তিনি। স্বাদের একটি তরকারিই তার যথেষ্ট। খাওয়া মাঝামাঝিতে আছে এমন সময় এই কথা! আজও যখন কসাই মাংস দিয়ে গেলো গদিতে, আজমত আলীকে দেখিয়ে ইশারা করলেন আব্দুর রহমান। কসাই ইশারা জানে, আজমত আলীকে 'আউক্কা চাচা' বলে ডেকে নিয়ে গেলেও এক কেজির বেশি মাংস দেবে না। নয় সন্তানের মধ্যে চার সন্তানই এখন নিজ নিজ সংসারে। সেই চার সন্তানের বিয়েও বাবার দেখার ভাগ্য হয়নি। আত্মীয়-স্বজন আর নিজের উদ্যোগে তাদের বিয়ে দিয়েছেন আব্দুর রহমান। এখন স্বামী সন্তান নিয়ে নাইওর আসার সময়ও তার গদি হয়ে যায় মেয়ে দুটি। আব্দুর রহমান বুঝেন। বিকালে এটা-সেটা কিনে পাঠিয়ে দেন, যাতে মুখ রক্ষা হয় মেয়েদের। খোদ বাপ থাকতে এই যন্ত্রণা করতে হয় তার। 

আব্দুর রহমানদের বাপ-চাচা সাতজনের তিনজনেরই ব্যবসা-বানিজ্য ছিল অবিভক্ত ভারতের আসাম। দেশভাগ তারপর দাঙ্গা, একসময় সকলেই ব্যবসা গুটিয়ে ফেরত আসেন নিজ নিজ গ্রামে। কিন্তু রয়ে যান সবার বড় চাচাতো ভাই। আগরের ব্যবসা তখন ডানা মেলতে শুরু করেছে তার। বিয়েও করেছেন স্বচ্ছল একটি পরিবারে। মন্দ কি। সেই ঠিকানা সম্বল করে দূর দূর আত্মীয় অনাত্মীয়রাও বেড়াতে যান আসামে। আজমত আলী তখন চাচাদের দোকানে কামলা খাটতেন। সবার সাথে তিনিও ফিরে আসেন, কিন্তু শিকড় থেকে যায় আসামের পাহাড়ে পাহাড়ে। সেই মূলে বৃষ্টির জল পড়ে পাতা গজায় আর বাংলাদেশের অখ্যাত এক গ্রামে বসে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে আজমত আলীর। নিরুদ্দেশ হয়ে যান নববঁধুর পেটে পুত্র সন্তান রুয়ে। বছর দুবছর পর এসে ফের নিরুদ্দেশ। এভাবে নয় নয়টি সন্তান বেঁচে থাকে পরের মুখাপেক্ষী হয়ে। প্রথম প্রথম ভাড়ার টাকা জমলেই চলে যেতেন আজমত আলী। থাকা-খাওয়া চাচাতো ভাইয়ের বাড়ি। 

বিরক্তি নিয়ে খাওয়া শেষ করে পান মুখে পুরেন আব্দুর রহমান। চাচাত ভাই। লংলায় যাক না বাঘের পেটে যাক, তার কি! পাঁচশো টাকা দিবেন, আসাম চলে যাবে, কিন্তু বছরের পর বছর রাবনের গুষ্টি পালতে হবে তার। বাকিদের কোনো হেলদোল নেই। আত্মীয়দের ভুখা রেখে তার পেটে ভাত যায় না। আবার ব্যাটাকে আসাম যাবার টাকা না দেয়া পর্যন্তও নিস্তার নাই। যাক যে নরকে যাবে, ঘোড়া আর অচল পুরুষ, লাত্থিরও অযোগ্য। বসে বসে ছেলেদের রুজগার খাওয়ার চেয়ে আসামে গিয়েই মরুক। 

ফাতিমা বেগম টাকাগুলো লুকিয়ে রাখেন। ঘরে লুকানোর জায়গাও কম। আলমিরার চাবি ভাঙ্গা। অন্য কোথাও রাখা যায় কিন্তু টাকাগুলো যেনো কালসাপ। হাত থেকে বেরিয়ে গেলেই নিরীহ একটি পরিবারের মাথায় ছোবল দিয়ে বসবে। সবচেয়ে ভালো হতো টাকাগুলো কাউকে দিয়ে দিতে পারলে। আজমত আলীর সে-মুরোদও নেই চাচাত ভাইকে জিজ্ঞেস করে। থাক টাকার জায়গায় টাকা। যতদিন আটকানো যায় মন্দ কি। 

বরাবরের মতো মাগরিবের পরপর গলা খাঁকারি শোনা গেলো আজমত আলীর। তারপর টিভির শব্দ। ফাতিমা বেগম হলুদ নুন মাখানো কৈ মাছ ছাড়লেন গরম তেলে। হুসনা মরিচমাখা হাতে মাথায় ওড়না তুললো। 

: ও কইন্যা বেটি, তারে কইসলায় নি? 

ফাতিমা বেগম নিঃশব্দ থাকেন। চায়ের কাপের টুঙ টাঙ শোনা যায়। হুসনা হলুদ মাখা হাতে চায়ের কাপ নিতে আসে। আজমত আলীর ঝাপসা মুখ তার তেমন ভালো লাগে না। আজ যেন গলার স্বরও বসা বসা। বাড়িতে টের পেয়ে চাচিও হয়তো মূর্ছা গেছেন, কেঁদে বাড়ি মাথায় তুলেছেন, ছেলেরা হয়তো তেড়েও গেছে বাপের দিকে, তবু বাপকে আটকাতে পারবে না তারা। আগের মতো পায়ে জোর থাকলে হেঁটেই আসাম রওয়ানা দিতেন আজমত আলী। এখন দুই মাইল হাঁটাই দূরঅস্ত। তবে ব্যাটার গুর্দার জোর আছে। একবার শুরু হলে না গিয়ে থামাথামি নাই। প্রথমে গুনগুন, তারপর ঘ্যানঘ্যান, পরে খাওয়া-দাওয়া বাদ। এখন কি শেষ পর্যায়? 

চায়ের কাপে চুমুক দিতে দেখলো না হুসনা। পিরিচের কোনায় বিস্কিটও যেই-সেই। কী আছে আসাম যে, দুদিন পর পর বারনরীর ছিক্কা দিয়ে টানতে থাকে আজমত আলীকে! নিজের গ্রাম, সংসার, সন্তান সব তুচ্ছ আর বিষাক্ত হয়ে পড়ে তার কাছে! 

হুসনা উঁকিঝুঁকি দেয়। সে জানে ফাতিমা বেগমের কাছে টাকা আছে, কিন্তু ইচ্ছা করেই জবান বন্ধ রাখে। এমনিতে সব কথায় কথা বলে দেখে আজমত আলী চিবিয়ে চিবিয়ে বলেন 'ও ফুফু আম্মা, আগে মাতরির বিয়া অয় না'। বিয়ার ইচ্ছা কি হুসনার হয় না! বিয়ে তার হয়েও ছিলো। এখন আরো দুই বোন বাকি। তার যেহেতু বিয়ের নাম লেগে গেছে একবার, বাবা মায়ের আর কোনো তাগদা নাই তাকে নিয়ে। বাকি বোনদের বিয়ে হোক, ঘরদোরের শ্রী ফিরুক, তবে যদি তার পালা আসে। ততো বছরতো ফাতিমা বেগমের ছায়া আছেই মাথার ওপর। 

: চাচাজি, ইবার গেলে আওয়ার সময় বেশ করি কয়পল আনিও রে বা... 

আজমত আলীর কাছ থেকে কোনো সাড়া আসে না। পাঁচ বছর আছে সে এই বাড়িতে। এর ভেতর দুবার আসাম ঘুরে এলেন আজমত আলী। গ্রামের সকলেরই গা সওয়া এই সব গল্প। কিন্তু হুসনা হা হয়ে শুনে আসামের বনে বনে পাঁকা পেঁপে। পেঁপে চিনে না বনের মানুষেরা। বিষাক্ত কিছু মনে করে খায় না। আজমত আলী ইয়ার বন্ধুদের নিয়ে বনে বেড়াতে গিয়ে পাকা পেঁপে খেতে খেতে আর রুচি হয় না। সেই থেকে তাদের দেখে বনের মানুষেরা পেঁপে খাওয়া শিখলো। শুনে হা হয়ে গেলো হুসনা। 

বিদ্যুৎ চলে গেছে, তবু টিভির দিকে ম্লান মুখে চেয়ে আছেন আজমত আলী। যেমন প্রাণপ্রিয় ছায়াছন্দের সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে এমন মুখ হয় হুসনার। হারিকেন জ্বালাতে জ্বালাতে ছোটো করে শ্বাস ফেলে সে। বছরের পর বছর যেন দুই দেশে বাস করে আজমত আলীর আত্মা আর শরীর। শুধু শরীর বয়ে যাওয়া মনে হয় বড়ো বেদনার, বড়ো ভারি। ক'দিনেই আজমত আলীর চামড়ায় ঝুল ধরে গেছে! সেদিন তার পাশ দিয়ে ফরফর করে যেতে গিয়ে ওড়না লেগে গেলো আজমত আলীর দাঁড়িতে। অভ্যাস মতো চলে যেতে যেতে পেছন থেকে 'ফুফু আম্মা' ডাকের অপেক্ষা করলো হুসনা। আজমত আলীর কোনো সাড়া নেই দেখে নিজে থেকেই ফিরে গিয়ে কদমবুসি করে আসলো সে! 

: হুসনা... 

চাচি আম্মার ডাকে রান্নাঘরে উঁকি দেয় হুসনা। ফাতিমা বেগম একটি থালায় ভাত আর তার পাশে এক হাতা গরুর মাংস ভোনা দিয়ে চোখের ইশারা করলেন। সাতকরা দিয়ে মাংস ভুনার ঘ্রাণ ভরপেটেও ক্ষিদা লাগায়। আজমত আলী এমন রান্নার দিন স্থির হয়ে বসতে পারেন না। আজ কি তার ঘ্রাণশক্তিও ভোঁতা হয়ে গেছে! তার বাড়িতে এমন রান্না বছরে দু একবারের বেশি হয় না, ফাতিমা বেগম সপ্তাহে দু'দিন রান্ধেন। তার রান্নার হাতও জগৎ বিখ্যাত। আজমত আলী জোঁকের মতো সেঁটে থাকেন ফাতিমা বেগমের বাড়িতে। আর দমে দমে 'ও কইন্যা বেটি, ও কইন্যা বেটি...' 

ফাতিমা বেগম সময় বুঝে কথাটি পাড়লেন। তিনি অর্থাৎ বাচ্চাদের বাপ বলছেন এবার কোনো টাকা পয়সা দেবেন না। আগে গেছেন গেছেন, এখন বিবাহিত মেয়েদের শ্বশুর বাড়িতে বদনাম হয়। লোকে ভাবে তার আরেকটি সংসার আছে আসামে। তাই ঘন ঘন আসাম যান তিনি। আর সবার যেমন তেমন, ছোট মেয়ের একটা ভালো বিয়ে দিতে হলে তার আসামের গান বন্ধ করতে হবে। বাড়িতে বসে নামাজ কালাম করতে হবে... 

সাতকরা মাংস হলে ভাত শেষ করে আজমত আলী রসভরা মুখে বলবেনই বলবেন 'ও কইন্যা বেটি, হাতকরা বেশি দিছো নি?' 

হুসনা তখন থালা নিয়ে রান্না ঘরে যায়, ফের ভাতমাংস নিয়ে আসে। আজ থালার কোণে একদলা মাংসই রয়ে গেলো। 

কলতলায় গিয়ে হাত ধুয়ে সিঁড়ির দিকে হাঁটতে লাগলেন আজমত আলী। হুসনা দৌড়ে গিয়ে বাজারের থলেটি ধরিয়ে দিলো তার হাতে। চাচা শরীর খারাফ নি রে বা? ওতো সকাল যাইরায় গি? 

কচুর মুকি, চিংড়ি, আর সিঁদেল শুঁটকি দিয়ে তরকারি রেঁধেছেন ফাতিমা বেগম। সাথে মাখা মসলাতে বোয়াল মাছ ভাজি। গতকাল থালায় ভাত মাংস রেখেই উঠে গেছেন আজমত আলী। মনে চোট পেয়েছেন হয়তো। পেলেই ভালো, যদি ভুত নামে। তিনি স্বামীকেও বলেন নি যে টাকাটা তিনি দেন নি আজমত আলীকে। যাক কিছুদিন, পরে বললেই হবে। 

মলামাছ দিয়ে টমেটোতে বাগাড় দিলেন ফাতিমা... 

কষানো মাংস ভুনার সাথে বিন্নি ভাত... 
ডুগি, কাঁঠাল বিচি দিয়ে ইলিশের তরকারি... 

না, আজমত আলী আর বিছানা ছেড়ে উঠেন নি। খেতে আসেন নি। আসামযাত্রা চিরতরে সাঙ্গ হয়েছে তার...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন