শনিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২০

দেবদ্যুতি রায়ের গল্প: এলিজি-১৯৭১


কফিমগে একেকটা আয়েশি চুমুক দিয়ে প্রচেতা ডায়েরিটায় অভ্যস্ত চোখবোলায়। এই ডায়েরি ওর আবাল্য পরিচিত, সেই কোন ছোটবেলায় ডায়েরিটাহাতের আসার পর থেকেই সেটা বলতে গেলে ওর সাথে সাথেই থাকে।সময়ের হাত ধরে কালচে হয়ে আসা নেভি ব্লু রঙের মলাটটার ওপর লালকালিতে বড় করে লেখা ‘এলিজি-১৯৭১’।

প্রায় অর্ধশত বছর বয়সীডায়েরিটা ও কতবার পড়েছে ঠিক নেই। এখনও যতবার পড়ে, একইরকমঅনুভূতিতে ছেয়ে যায় বুকের ভেতরটা। ডায়েরিটা বাবার লেখা, যুদ্ধদিনের প্রবল সময়ে এক পরবাসী তরুণের দিনলিপি।

বাবা ডায়েরিটা শুরু করেছে একাত্তরের আগস্টে। প্রথম তারিখ আগস্ট ০২, ১৯৭১। এ পাতার বয়ান খুব ছোট। কী চমৎকার হাতের লেখা ছিল তখন বাবার! বাবা লিখেছে- “শিতাই থেকে ডাঙ্গিতে এসে পৌঁছেছি আজ দুপুরে।শিতাইয়ে সীমান্ত পেরিয়ে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ সেন্টারে পৌঁছেদেয়ার কাজে কদিন আগে রফিকরা তিন জন যোগ দিয়েছে, আগে এই কাজ করতাম শুধু আমি, অনন্ত আর হীরক। ওরা আসায় লোক বাড়ল। আরআমি তাই চলে এলাম এখানে। আসলে বারী ভাই, সিধুদারা বলল আগের কাজ থেকে আপাতত আমার ছুটি। আবার পরে ডাকলে যেতে হবে। আজ থেকে ডাঙ্গি ক্যাম্পই আমার ঠিকানা।”

প্রচেতা খেয়াল করেছে শিতাই হোক বা ডাঙ্গি, একাত্তরের কথা বলতে গেলেপ্রতিবার বাবার চোখ জ্বলে ওঠে। বাবা যেন এখনও ঘোরে ফিরে যায় আটচল্লিশ বছর আগের সময়টায়। কাল ওরা চার জন যাচ্ছে ডাঙ্গি।আসলে শুধু ডাঙ্গি নয়, এই ফাঁকে দার্জিলিংও ঘুরে আসবে ওরা। ওখান থেকে দার্জিলিংয়ের দূরত্ব সামান্যই। বাবার সারা জীবনের ইচ্ছেটা পূরণ হতে যাচ্ছেভেবে ওর খুব আনন্দ হয়। ছোটবেলা থেকেই শুনছে বাবা ডাঙ্গিতে যেতে চায়আরেকবার, যুদ্ধদিনের স্মৃতিগুলো ছুঁয়ে আসতে। এতদিন এই কাজ সেই কাজে সময়টাই হয়ে ওঠেনি কারও। ও যদি উঠেপড়ে না লাগত তাহলেএবারও হতো না নিশ্চিত।

প্রচেতা ডায়েরিতে মন দেয়। আটচল্লিশ বছর আগের দিনগুলো মানসচক্ষে সে যেন আরেকবার ঘুরে আসে। এই ডায়েরির প্রত্যেকটা ঘটনা, প্রত্যেকটা চরিত্র ওর খুব আপন। সেই আপন মানুষগুলোকে এ যেন হাত বাড়িয়ে আরেকবার ছুঁয়ে আসা। ওর দৃষ্টি এখন যে পাতাটায় নিমগ্ন তার তারিখ১৯৭১-এর তেরই আগস্ট। ঈষৎ হলদেটে রঙের মোটা কাগজের ওপর কালোকালিতে বাবার মুক্তো ঝরানো হস্তাক্ষর এখনও জ্বলজ্বল করে। চশমারফ্রেমটা ঠিক করে নিয়ে ও মনোযোগ দেয় বহুবার পড়া লেখাটায়--

“ক্যাম্পের অবস্থা ভয়াবহ। প্রতি মুহূর্তে দলে দলে আসছে মানুষ। বিশাল বড়এই জায়গাটায় পা ফেলবার জায়গা নেই। তবু ওর মধ্যেই সবাইকে থাকতেহবে। এখান থেকে পরের ক্যাম্প বেশ খানিকটা দূর, তারও চেয়ে বড় কথাসবখানেই এখন একই অবস্থা। আশেপাশের ছোট ছোট ক্যাম্পগুলো তুলেদেয়া হয়েছে কিছুদিন আগে, সব মানুষকে এখানেই আনা হয়েছে। এতআশ্রয়প্রার্থী মানুষ যাবেই বা কোথায়?

মানুষের মানিয়ে চলার ক্ষমতা অদ্ভুত। যে জীবনের কথা কেউ চিন্তাও করেনি, মাসের পর মাস কেমন সে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে।

অঞ্জলি খুব ঝামেলা করছে। কালও লোক পাঠিয়ে বাবাকে ডেকে নিয়েগিয়েছিল। নাকের ডগায় ওর বাড়ি থাকতে ওর বাবা আর দাদা এখানেক্যাম্পে ছন্নছাড়ার মতো থাকবে এটা ও মানতে পারছে না কিছুতেই। মাঝেমাঝে বিরক্ত লাগে। আবার ওর কথাটাও ভাবি, মা আর ছোট ভাইবোনগুলোওর বাড়িতে। বাবা আর আমি এখানে, ওর তো খারাপ লাগারই কথা। বাবারসাথে কতদিন পর একসঙ্গে কাজ করছি! যুদ্ধদিনের এত সব বিভীষিকাময়খবরের এটাই যা ভালো লাগার!”

এ পাতার লেখা এটুকুই। কফিতে শেষ চুমুক দেয় প্রচেতা। কী অদ্ভুত একটাসময় ছিল সেটা! দু’মাইল দূরেই অঞ্জলি অর্থাৎ বড়পিসির বাড়ি ছিল অথচওর বাবা আর দাদু তখন ব্যস্ত রিফিউজি ক্যাম্পে! সে কী এক আগুন সময়! দেশের সীমানা ভুলে মানুষ শুধু কোনোরকম প্রাণটা নিয়েই ছুটেছে। কেউ কেউ অত ছুটেও শেষমেষ রেহাই পায়নি। যারা পেরেছে তারা কোনোমতেওপাড়ে পৌঁছে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। তারপর আবার সর্বশক্তি দিয়ে নতুনভাবেবাঁচার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। মানুষগুলোর তখন ছিল ‘যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ।’

রিখিয়াটা এতক্ষণ ঘুর ঘুর করছিল ওর আশেপাশে। একটু আগে গিয়ে বুকশেলফের খোলা তাক থেকে রণিতের একটা ঢাউস সাইজের ইঞ্জিনিয়ারিংয়েরএকটা বই বের করে এনেছে, সেটা মেঝেতে রেখে গভীর মনোযোগ দিয়ে কীঅত পড়ছে কে জানে! প্রচেতা হাসি আড়াল করে দেখে নেয় ওকে। তারপরআবার পাতা ওল্টায়। পর পর বেশ কিছু পাতা ফাঁকা। উনিশশো একাত্তরেরঐ মাসগুলোতে বাবা রোজ নিয়ম করে ডায়েরি লিখতে পারেনি। ডাঙ্গিশরণার্থী শিবিরের হাজারটা কাজ, তার ফাঁকে হঠাৎ কোনোদিন বড় পিসিরবাড়ি যাওয়া, সবচেয়ে বড় কথা যুদ্ধ শুরু হয়ে আচমকাই দেশহীন হয়ে পড়ারঅনুভূতি, মাসের পর মাস ক্যাম্পের অগোছালো জীবনে যখন একটু ফাঁকপেয়েছে কিংবা হয়ত মন চেয়েছে ছোট করে লিখে রেখেছে ডায়েরিটা।

ডায়েরির পরের তারিখ একুশ আগস্ট, ১৯৭১;

“ কাঞ্চনের খুব মন খারাপ। এই পরিবেশে রাত দিন খাটতে খাটতে কদিনআগেই ছেলেটা পেট খারাপ থেকে উঠল। অনেক ভুগে শরীরটা অর্ধেক হয়েগেছে। তবু কাঞ্চন মন খারাপ করে আগের মতো আর কাজ করতে পারে নাবলে। আমরা দৌড়ে বেড়াচ্ছি সারাদিন আর ওকে ছোটখাট কাজ, রিলিফবিতরণ এগুলো করে খুশি থাকতে হচ্ছে বলে। ওর জন্য আমারও মন খারাপহয়। বাপ-মা মরা কাঞ্চন একা পালিয়ে এসেছিল ফুলবাড়ি বর্ডার পেরিয়ে।খুলনা থেকে ফুলবাড়ি পর্যন্ত ওর পালিয়ে আসার ঘটনা কোনো শ্বাসরুদ্ধকরগল্পের চেয়ে কম নয়।

আমরা রোজ রেডিও শুনি। কত মানুষ সন্ধ্যার পর উন্মুখ হয়ে থাকে যুদ্ধেরখবর, দেশের খবর শুনবে বলে। ভালো খবর পেলে সবাই উল্লাসে চিৎকারদেয়, খারাপ খবরে পিনপতন নীরবতা নামে। মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের গল্প শুনতে শুনতে আমরা হাততালি দিয়ে উঠি। দেশের জন্য জীবন বাজি রেখেছে ছেলেমেয়েগুলো। দেশে হাজারে হাজারে মানুষ মরছে প্রতিদিন, গ্রামজ্বলছে, শহর ভাঙছে।

বাবা বাড়িতে যেমন, এখানেও তেমনই কাজে ব্যস্ত। বাবাকে দেখি আর অবাকহই প্রতিদিন। জীবনের এত পরিবর্তনেও বাবা কেমন হাসিমুখে কাজ করেযায়। ক্যাম্পের ডাক্তার কেদার বাবুর সাথেই তার খাতির বেশি। দু’জনেরউদ্যমও খুব, সারাক্ষণ কিছু না কিছু করছেই, ক্যাম্পটা পরিষ্কার হয়েছে কি নাঠিকমতো, রেশনে কোন পরিবারের খাবারে কম পড়েছে- সব সময় সেগুলোদেখাশোনা করছে। ভলান্টিয়ার দলের জন্য এমন দু’জন নেতা খুব দরকার ছিল। স্ত্রী আর দুই সন্তানকে ফেলে কেদারবাবু কেন বা কীভাবে একানীলফামারী থেকে পালিয়ে এলেন সে গল্প অবশ্য আমাদের অজানা।”

প্রচেতা পড়ে যায় পাতার পর পাতা। পাঁচ অক্টোবর, ১৯৭১;

“সুধাময়ী মাসিমাকে কাল অঞ্জলির বাড়িতে রেখে এসেছি আমি আরঅমিত। উনি আমার মার বোন নন কিন্তু, এই ক্যাম্পেই পরিচয়। ছোটমেয়েকে নিয়ে পাঁচ মাসের অন্তস্বত্তা মাসিমা এই ক্যাম্পে এসে পৌঁছেছিলেনজুলাই মাসে। বড় মেয়ে বেণুকা আর রূপেশ মেসো গত মাসে এসেছেনআলাদা পথে। ক্যাম্পে মাসিমা ভালো ছিলেন না, মেসোরা আসার আগে তো আরও খারাপ অবস্থা ছিল। মন খারাপ হলেই সীমান্ত পাড়ি দেয়ার গল্পবলে বলে কাঁদতেন। বহু দূর হেঁটে এসে বর্ডারের কাছে এক বাড়িতে জল চেয়েপাননি, সে কথা মনে করে তার মন খারাপ করত সব সময়। বড় ঘরের মেয়ে-বউ মাসিমা। এ জীবন এই কৎমাস আগে তার কল্পনারও অতীত ছিল। তবুতিনি ক্যাম্প ছেড়ে যেতে চাননি, এক রকম জোর করেই আমরা রেখে এলাম।অঞ্জলির বাড়িতে ভালোই থাকবেন। কিন্তু বেণুর জন্য আমার মন খারাপকরছে। আশ্চর্য! কাল পর্যন্ত মেয়েটার জন্য কোনোরকম লাগেনি আমার।”

এই পাতাটা প্রতিবার খুব সময় নিয়ে পড়ে ও, পড়া শেষে হাত বুলিয়ে রাখে অনেকক্ষণ। এই পাাতাটা ওর ভীষণ প্রিয়। বাবার হাতের লেখায় মা আর দিদিমার বয়স কেমন সেই অতদিন আগে আটকে গেছে। এই পাতাটা পড়লে ও দিব্যি দুই বেণী ঝোলানো মাকে দেখতে পায়। দিদিমা অবশ্য এখনও সেই দিনের কথা মনে করে কাঁদে। বলে- “এত বড় বাড়ি ঘর সব ফেলে রেখে গেছিলাম দিদিভাই, অথচ ওরা আমাকে এক গ্লাস জল দিল না।”

ক্লাস ফাইভে থাকতে এই ডায়েরিটা বাবা ওর হাতে দিয়েছিল। সেই শুরু।যুদ্ধদিনের যে গল্প শুনতে শুনতে চোখ ছানাবড়া করে মার কোলের মধ্যেলুকোত, সেই গল্পগুলো এই ডায়েরিটার পাতায় পাতায় আরও স্পষ্ট হয়েআছে। কত কত গল্প! ওর শোনা ডাঙ্গি ক্যাম্পের একেক দিনের গল্প নিয়েআস্ত উপন্যাস লিখে ফেলা যায়।

ডায়েরিটা বন্ধ করে ও উঠে পড়ে সোফা থেকে। কাল যাবার সময় ডায়েরিটা সাথে নিয়ে নেবে ও। মার গোছানো কত দূর হলো কে জানে। রিখিয়া ঢাউসবইটা ছেড়ে এখন নিজের দুই হাত নিয়ে খেলতে ব্যস্ত। দু’বছরের মেয়েরচঞ্চলতায় মন ভরে যায় ওর। কী সুন্দর এই বেড়ে ওঠা! রণিত বেচারা আমেরিকা গিয়ে মেয়ের বড় হওয়ার এই সময়টা মিস করে গেল।

--রিখি, চলো, দাদু কী করছে দেখে আসি।

মায়ের ডাকে খেলা ফেলে ঝটপট উঠে দাঁড়ায় রিখিয়া-- তলো মাম্মা।

দুটো বালিশের ওপর বাবা চোখ বন্ধ করে আধশোয়া হয়ে শুয়ে আছে। মাএকটা প্লাস্টিক টুলে বসে আজকের পত্রিকার শেষ পাতাটা মনোযোগ দিয়েদেখছে। প্রচেতারা সে ঘরে পৌঁছলে মানুষ দু’জন নড়েচড়ে বসে। বাবার কাছে গিয়ে প্রচেতা বসে খাটটায়--
তোমরা আজ সকাল সকাল ঘুমিয়ে পোড়ো কিন্তু। কাল একদম সকালে রওনাদেবো। নাহলে বর্ডার ক্রস করতে দেরি হয়ে যাবে।

শিবব্রত চশমাটা খুলে হাতে নেন। দু’হাতে ধরে গভীর মনোযোগে সেটা লক্ষ্যকরতে থাকেন। তারপর হঠাৎই বলে ওঠেন--
আচ্ছা প্রচি, আমি যদি কাল না যাই!

প্রচেতা অবাক হয়ে যায়। বাবা সারাটা জীবন ডাঙ্গি ক্যাম্পে আরেকবার যেতেচেয়েছে। পাসপোর্ট ভিসার চক্করে পড়ে এত দিন হয়ে ওঠেনি। বহু কাঠ খড়পুড়িয়ে চারটা ভিসা, অফিস থেকে দশ দিনের ছুটি ম্যানেজ করতে পেরেছে।শিলিগুড়ি আর দার্জিলিংয়ে হোটেলও বুক করা হয়ে গেছে। এই শেষ মুহূর্তেবাবা এমন কেন বলছে? কী হলো আবার? ও বাবাকে প্রশ্ন করে-
এ কেমন কথা বাবা? যাবে না কেন বলছো?

শিবব্রত কথা বলেন না। চুপ করে বসেই থাকেন হাতে ধরা চশমাটার দিকে তাকিয়ে। বেণুকা পত্রিকাটা মুড়িয়ে হাতের মধ্যে রেখে দিয়েছেন কখন।স্বামীকে খেয়াল করেন তীক্ষ্ন চোখে, মানুষটার কী হলো আবার! এমনিই মাইল্ড মেজর মিলিয়ে সাত সাতবার স্ট্রোক তো কম কথা না। শরীর আবার বিগড়ায়নি তো?
--তোমার কি শরীর খারাপ হোলো, বলো তো? খারাপ লাগছে?

শিবব্রত গলা খাকারি দিয়ে নেন। বোধহয় তার মন খারাপ লাগে সবারপ্রস্তুতিতে আচমকা বাধা দিয়ে ফেলেছেন বলে। তবু অবশেষে তিনি তারধীরস্থির কণ্ঠে উচ্চারণ করেন--
আচ্ছা বেণু, আমার এখন মনে হচ্ছে ওখানে তো ক্যাম্পটাই নেই এখন, একাত্তরের কোনোকিছুই নেই আর। আমি গিয়ে কী দেখব বলো তো? ঐদিনগুলো এখন হারিয়ে গেছে ওখান থেকে।

প্রচেতা কথা বলার ভাষা খুঁজে পায় না। তবু জোর করেই বলে---
হ্যাঁ বাবা, এতদিনে যে সব বদলে গেছে সেটাই তো স্বাভাবিক। আর একটা শরণার্থী শিবির তো আর যুদ্ধের এতদিন পরেও টিকে থাকতে পারে না।

শিবব্রত একটা ছোট্ট দম নিয়ে নেন। যেন যুক্তি খোঁজার চেষ্টা করেন। তারপর মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলেন--
আমি সত্যি জীবনে অন্তত একবার খুব করে যেতে চেয়েছি ডাঙ্গিতে, প্রচি।তোকে কতবার বলেছি। কিন্তু আজ আর পা সরছে না। আচ্ছা বল তো, এইএত বছর পর আমি ওখানে কি কাউকে পাব? বাবাও এখন আর নেই। ওখানে গেলেই বাবাকে খুব মনে পড়বে রে। রবিকে মনে পড়বে। আর কাঞ্চন? ডাঙ্গিতে কাঞ্চনই আমার সবকিছুর সঙ্গী ছিল। ওকে আমি আরেকবার দেখতে তো পাব না, বল!

বেণুকা স্বামীর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। মনেপ্রাণে ভীষণ শক্ত মানুষটার বুকটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে, তিনি জানেন।

শিবব্রত প্রচেতার হাত ধরেন--
তুই যা প্রচি। তুই গিয়ে একবার দেখে আয় সব। আমাকে বলিস, ছবিটবি তুলে আনিস। আমি আর না যাই বুঝলি। তোর মাকেও নিয়ে যা।

প্রচেতার হঠাৎ কান্না পায় বাবার জন্য। ও জানে বাবা না গেলে কাল মাও যাবে না। শেষ পর্যন্ত হয়ত রিখি আর ওকেই যেতে হবে। বাবার ডান হাতটাদু’হাতের মুঠোয় পুরে বসে থাকতে থাকতে ওর মনে পড়ে ডায়েরির শেষ দিনেরছোট্ট লেখাটিা, তারিখ- ষোলই ডিসেম্বর, ১৯৭১;

“দেশ স্বাধীন হয়েছে আজ, চূড়ান্ত বিজয় পেয়েছি আমরা। সবাই খুব খুশি।ক্যাম্পের ভেতরে খুশিতে একাকার সবাই, নিজের ভিটা, নিজের দেশ ফিরে পাওয়ার এ আনন্দের তুলনা নেই। এবার হয়ত ফেরার পালা। কিন্তু কাঞ্চনকেখুব মনে পড়ছে। দেশ স্বাধীন হবার খবর জানতে পারেনি কাঞ্চন। আজভোরে ও মারা গেছে ডায়রিয়ায় ভুগে ভুগে। ক্যাম্পের সবার জন্য খাটতে খাটতে ও নিজের অসুস্থতাকে পাত্তা দেয়নি। আমরা সবাই বাড়ি ফিরে যাবখুব শিগগির কিন্তু ও আজ ছাই হয়ে ডাঙ্গি নদীর বাতাসে মিশে গেছে। স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে কাঞ্চন আর কোনোদিন ফিরবে না।”

২টি মন্তব্য: