শনিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২০

তন্বী হালদারের গল্প : অজয় নামের নদ


মুখ আর মুখোশ এখন আমি আর আলাদা করতে পারি না। মুখের আড়ালে মুখোশ বা মুখোশের আড়ালে মুখকে চিনতে এখন আমার শিকড়ে টান পড়ে।

এক বগ্‌গা ফনফনে স্পষ্ট জলটাকে কে বিনধে দিলে গো – ও তো নদী লয় নদ। গীতগোবিন্দের আঁতুড় ঘর। যার তীরে বালুজোছনায় জয়দেব তার প্রণয়ীর কাছে নিজেকে আহূতি দিয়েছিলেন। নিজেকে প্রণয়িনী পদ্মাবতীর দয়িত ছাড়া কিছু ভাবতে পারতেন না।

রাধি অজয়ের দিকে তাকায়। তার বুকের ভিতরটা উথালিপাথালি করছে। অজয়কে শুনিয়ে সে যেন নিজেকেই বলে –কিমন নদ বটে রে? মানুষগুলান তুরে বিনধে দিল আর তু মরদের গতর লিয়ে পাইপের ভিতর সিঁধাই গেলিক, থুঃ থুঃ মারি ......। মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই ভেউ ভেউ করে কেঁদে ওঠে রাধি। দুহাতে হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে অজয়ের বুকের বালি সরায়। প্রতিদিন দিন-রাতে সে যে এমনভাবে কতবার বালি সরায় তার ঠিক নেই। সরাতে সরাতে কখনও বিনবিন করে কাঁদে। কখনও খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। দুহাতে বালি নিয়ে সারা অঙ্গে মাখে। এখানকার বিভিন্ন আখড়ায় শোনা গীতগোবিন্দের শ্লোক থেকে নিজের মতো করে দুয়েকটা শব্দ বা কখনও আস্ত একটা শ্লোক পরিত্রাহি চীৎকার করে বলতে থাকে। চেঁচাতে চেঁচাতে বুক চাপড়ে কাঁদে। ঠিক যেন প্রিয়জনের মৃত্যুশোক। যে শোকে শুধুই ব্যথার জল জমে। জমতে জমতে বরফের শক্ত চাঁই হয় কিন্তু শুকোয় না কোনদিন। এখন যেমন রাধি গলা ফাটিয়ে চ্যাঁচাচ্ছে – হার মুদারম, হার মুদারম।

রাধামাধবের মন্দিরের সেবাইত দূর থেকে রাধিকে দেখে। আপন মনে সে উচ্চারণ করে – স্তনবিনি মপহতি হার মুদারম। রাধির শরীরের দিকে দূর থেকে নজর করে সেবাইত। শেষ পৌষের কনকনে বাতাস বইলেও চাঁড়াল রোদটাকে এই খরার দেশে বাগে আনা যায় না। যতই ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে যাক শুকনো রোদ মানুষের শরীরের রক্তরস যেন চুষে খেয়ে নেয়। অজয়ের বালি যেন ফুটন্ত কড়াই, তাতে ধান ফুটে খই হয়ে যাচ্ছে। রাধির বয়স অনুযায়ী যৌবন থাকলেও তাকে আর যুবতী বলা যায় না এখন। আউল বাউলের আখড়ায় পড়ে থাকে, চেয়ে চিন্তে খায়। গাঁজার কল্কে দেখলে যতক্ষণ না তাকে কয়েক টান দেওয়া হবে সে বাদুরের মতো তার হাতে পায়ে ঝুলে থাকবে, আর একনাগাড়ে বলে যায় – মম শিরসি মুন্দনং ...............।

সেবাইতের চোখ তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঝলসে ওঠে। এত দাবদাহে তার শরীর আরও উষ্ণ হয়ে ওঠে – কাম জাগ্রত হয়। চোখে আবেশ নেমে আসে। ফিসফিস করে উচ্চারণ করে – দেহি পদপল্লব মুদারম।

হোহো করে ঠাণ্ডা বাতাস উল্টো বাগে বইতে থাকে। হিলহিলে সময় বেয়ে কত মড়িঘর, রাজপাট, দিনক্ষণের হিসাব না রেখে বোবা মন কথা কয়ে ওঠে দ্বাদশ শতাব্দীতে। জন্মের আগেও জন্মের বিশ্বাসে আমাদের রাধি তখনও ছিল। এদিনের মাজা নদের বুকে সেদিন জল বইতো দক্ষিণে। এই গ্রামেই জন্ম নিয়েছিলেন ভোজদেবের ঔরসে বামা দেবীর গর্ভে কবি জয়দেব। পদ্মাবতীকে ভালোবাসতেন জয়দেব। তার পত্নী, প্রণয়ী, নাটগীতি দলের নৃত্যরূপের শিল্পী সবটুকুই ছিল পদ্মাবতী। সেনরাজ লক্ষণ সেনের কবিপঞ্চমের শ্রেষ্ঠ কবি ছিলেন জয়দেব। মানমর্যাদা খ্যাতিবিত্তে ভরেছিলেন জয়দেব। জয়দেব ভাবতেন তাঁর প্রেমকীর্তি অমর হয়ে থাকবে। পদ্মাবতীর মনোরথের একজনই যাত্রী, তিনি হলেন কবি জয়দেব। কথিত আছে জয়দেব প্রতিদিন গঙ্গাস্নানে যেতেন। একবার মকর সংক্রান্তির পুণ্য লগ্নে কীকারণে যেতে পারেন নি। মনোব্যথায় অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়েন। তখন স্বয়ং মা গঙ্গা তাঁকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেন – তোমার স্নানে ব্যাঘাত ঘটবে না। আমি কালই হাজির হব কদম্বখণ্ডীর ঘাটে। দেখবে উজানে পদ্মা বইছে। বুঝতে পারবে আমি এসেছি। 

তাঁর রাধামাধবের মূর্তিপ্রাপ্তিও এই কদম্বখণ্ডীর ঘাটে। ঐ যে অদূরে আজও দেখা যাচ্ছে জয়দেবের সিদ্ধিপ্রাপ্ত অষ্টদল পদ্মাঙ্কিতপাথরখণ্ডের সমাধিমন্দির। ফুলেশ্বর ঘাটের কাছে সিদ্ধাসন, যেখানে বসে জয়দেবের প্রেয়সীর উদ্দেশ্যে লেখা গীতগোবিন্দের অসম্পূর্ণ শ্লোক পূণর্তা পায় –

​স্মর গরল খণ্ডনং ​মম শিরসি মণ্ডনং

​ দেহি পদ পল্লব মুদারম। 

এ সকল ইতিহাস পুরাণের সংমিশ্রণ। কিন্তু যে ঘটনা কেউ জানে না শুধুমাত্র রাধি খেপী দাবী করে, সে জানে। সে যা জানে তা হল দ্বাদশ শতাব্দীতে সে ছিল পদ্মাবতী। রাধি আলুথালু শাড়ি সামলাতে সামলাতে ফুলেশ্বর ঘাটের দিকে চলেছে। রোদে বৃষ্টিতে জ্বলে যাওয়া শীর্ণ খড়িওঠা চেহারাটায় আর যাই হোক রূপবতী পদ্মাবতীর শাঁকালুর মতো দুটো বকসাদা উন্নত স্তনকে মনে পড়ায় না। রাধি ভাবে সেদিনও পদ্মাবতীর বুক থেকে কোনও দুধ গড়িয়ে নামে নি। স্তনবৃন্তের দুটো চোখ থেকে নেমে আসতো কান্না, নিছক জল হয়ে। রাধিকে এলাকার মানুষ জয়দেবের পদ্মাবতীই ভেবে সম্ভ্রম করে। তাই হয়তো সাদা জোছনায় বালির চর যখন লুটোপুটি খায় অথবা স্লেটরঙা আকাশটায় অসংখ্য বরফকুচির মতো টিমটিম করে তারা, গ্রহগুলো জ্বলতে থাকে, সে সময়ও রাধি বাঁশঝাড়, অজয়ের পাড়, মন্দিরের দ্বারে খরগোশের মতো ছুটে ছুটে বেড়ায়। কখনও বুক চাপড়ে কাঁদে, কখনও সারা গায়ে বালি মেখে অজয়কে সোহাগ করে। ঠোঁট টিপে হেসে বলে –হামাকে ছেড়ে তুর খুব কষ্‌টো হয় লারে অজয়? হামারও হয়। তাইতো হামি তুর সব জল হামার ভিতরকে লিয়ে লিছি বটে। মানুষগুলান তো জানেক লাই, তুকে হামার থেকে সরাই লিয়ে মেরে পুঁতে দিয়ে ভাবলেক অজয়ের বুক থেকে রাধিকে সরিয়ে লিবে। পারবেক লাই, পারবেক লাই। এই দেখ তুর সব জল হামি কীমন পানা সিধিয়ে লিচ্ছি। ওরা জানেক লাই হামার কান্নাতো তোরই জল। 

রাধিকে এখানে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে – হ্যাঁরে তুই কবে থেকে আছিস এখানে?

রাধি শনের দড়ির মতো চুলের মধ্যে নখের ভিতর বালিশুদ্ধু সরুসরু আঙ্গুলগুলো ঢুকিয়ে ঘ্যাঁসঘ্যাঁস করতে করতে চটপট জবাব দেয় – কেনে জয়দেব যবে আনলেক মোকে ...... উহার সাধনসঙ্গী করে বটে।

প্রশ্নকর্তা মুচকি হাসে – তা জয়দেব বুঝি তোকে খুব ভালোবাসতো?

বিরক্ত হয় রাধি খেপী – হ তা বাসতেক। হামায় লিয়েই তো পুঁথি লিখলেক বটে।

প্রশ্নকর্তার ছদ্ম বিস্ময় – ওমা তাই নাকি! তা কি পুঁথি লিখলে শুনি?

রাধি এবার চোখ বুজে ধ্যানস্থ হয়। তারপর তারস্বরে চীৎকার করে – গী ত গো বি ন্দ । 

প্রশ্নকর্তা সজল কৌতুকে শুধোয় – শোনা দেখি শ্লোক। 

দুহাত শূন্যে তুলে অর্ধ-উলঙ্গ আমাদের রাধি খেপী লাফিয়ে লাফিয়ে নাচতে থাকে আর ছেঁড়া ফাটা ব্লাউজের ফোঁকর গলে শুকনো গাব ফলের মতো অসহায় একটা বুক যেন লজ্জায় ভুঁইয়ের দিকে নতমুখে চেয়ে থাকে। রাধি লাফিয়ে লাফিয়ে নাচে আর নাচতে নাচতে গাইতে থাকে – হার মুদারম, হার মুদারম / হার মুদারম, হার মুদারম। 

এবার প্রশ্নকর্তার হেসে খুন হওয়ার পালা। সে এবার জিজ্ঞেস করে, ‘তা তুই বুঝি কবি জয়দেব মানে তোর স্বামীকে খুব ভালবাসতিস?’

রাধির অজয়ের রোদে পোড়া বালির দিকে দৃষ্টি আনত হয়। চোখ ভিজে আসে। গাল বেয়ে টসটসে পুঁতির দানার মত জল নামে। বলে, ‘না গো বাবু সে হামার ভালোবাসা বুঝতোক লাই, হামিও তাকে ছুঁতে লাচার আঁচিলাম গো’। 

এমন সোজাসাপটা উত্তরে প্রশ্নকর্তার দম বন্ধ হয়ে আসে। সে এবার সিরিয়াসভাবে জানতে চায়, ‘তবে তুই কাকে ভালোবাসতিস?’

লজ্জা পায় রাধি পাগলি। এক ছুটে অজয়ের বুকের উপর চলে যায়। ছুটতে ছুটতে বলে, ‘কেনে, অজয়কে। অজয় নামের নদের মত মরদটারে। যে দু’কুল ভাসাইতে জানতো, ডুবাইতে জানতো। যে আমার পীরিত বুঝতো’। বলেই বাঘিনীর মত একবার ঘাড় ঘুরিয়ে ফোঁস করে ওঠে রাধি। 

পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে কোনোরকমে আব্রু ঢেকে রাখা রাধির শরীরটাকে এই মুহূর্তে দেখলে অনেক পুরনো কোন বটগাছ বলে মনে হবে। যাকে শিকড়ের ঝুরিতে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে রেখেছে। চোখ দিয়ে আগুন ঝরে রাধির। গলায় আগুন ঢালে, ‘এ বাবু মকরসংক্রান্তির দিন তুরা পুণ্য মারাতে সিনান করতে আসিস না, শুনে রাখ জয়দেবের জন্য মা গঙ্গা আসেক, উসব মিছা কথা। অজয় আসে। অজয়ই আসে। একবার মান করে বলেছিলাম, তুকে ছেড়ে অনেক দূর চলে যাব। তাই অজয় ফুল লিয়ে আসে। পদ্মফুল। হামার লিগা সোহাগ করতে আসে। ই বছরও আসবেক। ঐ দিন হামার অজয়কে কেউ বিন্ধে রাখতে পারবেক লাই’। 

রাধি পাগলি মাঝ অজয়ের তপ্ত বালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। দু’হাতে আষ্ঠেপৃষ্ঠে বালিগুলোকে জড়িয়ে ধরে। কান্নার দমকে তার শীর্ণ শরীরটা ওঠানামা করে। প্রশ্নকর্তার চোখে ধাঁধাঁ লাগে......... কে ও সত্যি রাধি খেপী! ওর শরীরের মুদ্রায় মনে হচ্ছে সে বুঝি নিজেই সম্ভোগ করছে অজয় নামে মরদ নদটিকে। 


নদনদী নিয়ে কীসব লেখালেখি করবে বলে শহর থেকে একদল ঝকঝকে চেহারার ছেলেমেয়ে এসেছে। কিন্তু রাধির কানে কে ফুঁসমন্তর দিয়েছে, ‘তোর অজয়কে এখন তো শুধু পাইপভরে মাটির তলা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, এরপর এরা যন্ত্র করে অজয়কে নিয়ে চলে যাবে’। 

ব্যস সেই থেকে শুরু হয়েছে রাধির মুখখারাপ করে গালাগালি।

জনে জনে শুধিয়ে বেড়ায় রাধি, ‘হ্যাঁ গো হামার অজয়কে সত্যি সত্যি বেটাবেটিগুলান যন্ত্র ভরে লিয়ে যাবেক?’

রাধামাধবের মন্দিরের সামনে হাপুসভাবে কাঁদতে লাগে। সেবাইতের দু’পা ধরে মিনতি জানায়, ‘তুমি উয়াদের বুঝাও না কেনে? তুমি তো ঠাকুর আছো – তুমার কুথা তো গাঁয়ের লোকে শোনে। ঐ শহরের বেটাবিটিগুলানকে তুমি টুকুন বুঝাও না কেনে ঠাকুর’।

প্রসন্ন হাসে সেবাইত। রাধির খড়িওঠা হাতপাগুলোয় সে হাত বোলায়। বলে, ‘তুই তো পদ্মাবতী’।

অভিমানে ঠোঁট ফোলায় রাধি, ‘হ তো’।

সেবাইতের আঙুল খেলা করে রাধির ঘাড় হয়ে গলায় -‘পদ্মাবতী কত সুন্দরী ছিল। সে জন্যই তো অজয় তাকে অত ভালোবাসতো। তুই এত নোংরা থাকিস বলেই অজয় আর তোর কাছে আসে না, তোকে আর ভালোবাসে না’।

রাধি হাতের কাছে পড়ে থাকা ঢেলাটা কুড়িয়ে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ছুড়ে মারে সেবাইতের কপালে। সেবাইত ‘মাগো’ বলে হাত চেপে বসে পড়ে। ডানদিকের কপালটা ফুলে আলু হয়ে গেছে। দাঁত কিড়মিড় করে ওঠে সেবাইত, ‘তোর আর অজয়ের পীরিতের দফারফা না করে ছেড়েছি তো ........................’। 

রাধি তখন ধুলো ঘাঁটছে আর আপনমনে বিড়বিড় করতে থাকে। তার ফেলে আসা ধূসর অতীতে ব্যক্তিজীবনের বিনিসুতোয় গাঁথা সম্পর্কটা আবছা মনে পড়ে যায় মাঝেমাঝে। বাপ-মায়ে দিখাবিহা দিল। সোয়ামি ভাল। ভাত-কাপড়ের কষ্‌টো দিতেক লাই। কিন্তু বাঁশি বাজাতে জানতেক লাই। যে মরদ বাঁশি বাজাতে জানেক লাই তাকে কি রাধি কখনও ভালবাসতে পারে? পারে নি। অজয় বাঁশি বাজাইতে জানতো। তাইতো উহাতে মজে গেলাম। মনে মনে দেহে দেহে হয়েছিল চৈচৈ ভাব। কিন্তু সোয়ামী জানলে। সালিশি ডাকলে। সক্কলে পাত্থর ছুড়ে ছুড়ে থেঁতলে মারলে অজয়কে। রাতারাতি জোয়ান মরদ মানুষটা গায়েব হয়ে গেলো। লোকে বললে – তারে নাকি এই বালির তলায় পুঁতে দেওয়া হইছে। তাই নাকি অজয় মাটির তলায় পাইপের ভিতর সিধাই গেছে।
সেবাইতের কৌতূহল বাড়ে, ‘তোর বাড়ি কোথায় রে রাধি?’

‘মনে পড়েক লাই’।

‘কতদিন আগে কেঁদুলিতে এসেছিস?’

ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে রাধি। কপালের আলু হয়ে যাওয়া জায়গাটায় হাত বুলিয়ে সেবাইত রাধির কাছে আর্দ্র হয়। ঘন হয়ে বসে। বলে, ‘মন খারাপ করিস না। আর তো কদিন পরেই মকর সংক্রান্তি, তোর অজয়কে সেদিন পাইপের ভেতর থেকে মুক্তি দেওয়া হবে। তোর জন্য উজানে পদ্মফুল নিয়ে আসবে। আর সেদিন ব্রাহ্মমুহূর্তে আমি তোকে অজয়ের সাথে মিলিয়ে দেবো’।

খুশিতে চকচক করে ওঠে রাধি পাগলির মুখ। খিলখিলিয়ে হেসে উঠে বলে, ‘সত্যি বটে?’

সেবাইত তিন সত্যির কিড়া কাটে। বলে, ‘তোকে আমি নতুন ছাপা শাড়ি দেব। সাবান দেব। তুই স্নান সেরে নতুন শাড়ি পড়ে মাঝরাতেই এই মন্দিরে চলে আসবি। আমি থাকবো’।

এমন কথা শোনার পর থেকে রাধি আর মন্দির থেকে নড়ে না। ফি দিন ঝুরো ঝুরো স্বরে আর্তি জানায়, ‘হামার অজয়কে হামার সাথে মিলিয়ে দিবেক তো ঠাকুর?’

সেবাইত ঘাড় নাড়ে, ‘হ্যাঁরে বাবা হ্যাঁ। তোর কাছে না এসে অজয় যাবে কোথায়’।

সরকারি মতে মকর সংক্রান্তির স্নান উপলক্ষ্যে তিনদিনের মেলা হলেও তার পরেও কিছুদিন থেকে যায় আউল, বাউল, কীর্তনিয়ার দল। ধুলোট হয়ে মেলার শুরু, দধিহরিদ্রা হয়ে শেষ। মকরের স্নানের জন্য কাতারে কাতারে পূণ্যার্থী আসে। মনের প্যাঁকাশি কাটিয়ে সারা বছরের জন্য সাফসুতরো হতে চায়। সেখানে রাধি নামের এক পাগলি যে কিনা নিজেকে পদ্মাবতী মনে করতো আর অজয় নামের নদটাকে তার ভালোবাসার মরদ বলে মনে করতো সে এই ভিড়ে ধর্ষিতা হয়ে খুন হয়ে অজয়ের বালির নীচে চাপা পড়ে থাকলে তার খবর প্রশাসনের রাখা সম্ভব নয়। মানুষের মুখে মুখে ফেরে রাধি পাগলি নাকি এই সংক্রান্তিতে তার অজয়ের সাথে মিলে গেছে। রাধামাধবের মন্দিরে মিটিং হয়েছে যদি ‘রাধিখেপীর আখড়া’ খোলা যায় সেই নিয়ে। এ ব্যাপারে সেবাইত খুব উদ্যোগ নিয়েছে। 

সময় যায়। সময় আসে। মুখ আর মুখোশ আলাদা করে চেনা যায় না। এখন শুধু আদ্যিকাল শ্যাওলা হয় কদম্ব খণ্ডীর ঘাটের কাছে।

৩টি মন্তব্য: