শনিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২০

ওলগা তোকারচুক 'এর গল্প : লেখকের সাথে একটি সন্ধ্যা

ভাষান্তর: নাহার তৃণা 

রাতের বেলাতেই চমৎকার ভাবনাগুলো এসে ভর করে আমার মাথায়, যেন দিনের আমি এবং রাতের আমি দুজন সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ। সে বলতো, ওসব ফালতু ধারণা। তারপর প্রসঙ্গ পাল্টে ‘আমি’ যুক্ত একটি বাক্য তৈরী করে বলতো তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে পরিষ্কার ভাবনাগুলোর উদয় ঘটে দিনের শুরুতে, প্রথম কফিটা শেষ করার পর।

যেদিন দৈবপাকে(হায়,দৈবপাকই বটে!) পত্রিকায় প্রকাশিত খবরটিতে আমার চোখ পড়লো, প্রুশিয়া থেকে সে অ্যালেনস্টাইন আসছে, সেদিন থেকে আমি দুচোখের পাতা এক করতে পারিনি। কারণ ওই শহরটির দূরত্ব আমার এখান থেকে খুব বেশি না। ওখানে হাজির হওয়া মানে আমার কাছাকাছি আসা। আর তাতে যেন আমার সমস্ত অতীতটারও ফিরে আসা । অথবা ফিরে আসা নয়, ওটা যেখানে থাকবার কথা সেখানেই ছিলো, হারিয়ে যায়নি কখনও। আমি বিছানায় হেলান দিয়ে বসে তার সাথে দেখা হবার সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া বা ফলাফল সম্পর্কে আকাশ কুসুম ভাবতে থাকি। 

আমি একটা অচেনা শহরের ট্রেন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বসে আছি, বিপরীত দিক থেকে সে হেঁটে আসছে, আমাকে দেখামাত্র চোখেমুখে বিস্ময় ফুটে উঠবে। চমকে উঠে আমার দিকে তাকাবে তার সেই দৃষ্টি নিয়ে যে চোখের দৃষ্টি একদা আমাকে উত্তেজনায় শিহরিত করতো, অবিকল সেই দৃষ্টিতে। 

অথবা একদম অন্যরকমও হতে পারে ব্যাপারটা। কোনো এক রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনে কোনো মার্কেটের(অ্যালেনস্টাইনের মার্কেটগুলো দেখতে কেমন?) সামনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি আমি, সে (আবারো উল্টোদিক থেকে আসছে) এক পুরুষ ও মহিলার পিছু পিছু হেঁটে আসছে। আমি বুঝতে পারলাম সে আমাকে চিনেছে, কারণ দেখামাত্র তার চেহারা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে কারণ সে রাস্তার লোকদের 'এক্সকিউজ মি' বলতে গিয়ে কেমন বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে। কাঁপা কাঁপা হাতে সে মাথা থেকে টুপিটা খুলে হাতে নেবে (তাঁর চুল পাতলা হয়ে গেছে, এতদিনে পাতলা হবার বয়স হয়ে গেছে না?)। আমি এমনিতে খুব আড়ষ্ট মানুষ, তবু তাকে হাতের ইশারা করলাম। তারপর তার নাগাল পাওয়ার জন্য সমস্ত মার্কেট চক্কর দিলাম এক ঘন্টা ধরে। 

অ্যালেনস্টাইন কী খুব বড় শহর? হয়তো অনেক বড়, হয়তো মে মাসের ভিড়ের মধ্যে আমরা একে অপরের পাশ কাটিয়ে চলে যাবো, হয়তো ওরা তাকে গাড়িতে করে স্টেশন থেকে সোজা হোটেলে নিয়ে যাবে, হয়তো সেখানে কোন মার্কেটই নেই, হয়তো তখন বৃষ্টি হবে, হয়তো সে আসবেই না, হয়তো শেষ মুহুর্তে সে স্ত্রীর অসুস্থতার জন্য প্রোগ্রামটা বাতিল করবে। হয়তো সে জার্মানীতেই আটকা পড়বে কোন একটা প্রকাশনা সংক্রান্ত কাজে। এখন তো সে বিখ্যাত একজন মানুষ, বিদ্বান লোকদের সাথে ওঠাবসা। হয়তো আমিই একমাত্র মানুষ যে তার সবকিছুকে সুক্ষ্ণভাবে অনুসরণ করি, তার সম্পর্কে পত্রিকার ছোট্ট সংবাদটিও আমার দৃষ্টি এড়ায় না। হয়তো একমাত্র আমিই জানি যে বুকস্টোরে তার দুই খন্ডের উপন্যাসটি কোথায় রাখা আছে, ওটার পাশ দিয়ে যাবার সময় দোকানিকে অন্য একটি বই দেখাতে বলে আমার দস্তানা পরা হাত দিয়ে প্রচ্ছদের উপর ছুঁয়ে দেই আলতো করে। 

সকালে জেগে উঠে রাতের চিন্তাভাবনাগুলোকে আমার নিতান্ত পাগলামি মনে হলো। জোহান ব্রেকফাস্ট করতে যাবার সময় আমার কোমর জড়িয়ে ধরে একটা চুমু খেলো। ঘন্টাখানেকের মধ্যে বাচ্চাদের গানের শিক্ষক আসবে। ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসে যখন আমি আমার আধসেদ্ধ ডিমের খোসা ছাড়াচ্ছিলাম, তখন নিজের আঙুলের দিকে চোখ গেল, শুষ্ক এবং সরু আঙুলগুলো যেন কখনো আমার নিজের নয়, কেমন একটা নিদারুণ গ্লাণিবোধ জেগে উঠলো আমার ভেতর। তারপর আমি ফস্ করে যা বলে বসলাম তার জন্য নিজেও প্রস্তুত ছিলাম না- কয়েকদিনের জন্য আমি ডানজিগে বাবার কাছ থেকে ঘুরে আসতে চাই। কথাটা শুনে আমার স্বামী মোটেও অবাক হলো না। রুমাল দিয়ে তার মুখে লেগে থাকা খাবারগুলো আলতো করে মুছলো। তারপর টেবিল থেকে উঠে গিয়ে একটা সিগারেট ধরালো। কাজের লোকটাকে ডেকে জানালা খুলে দিতে বললো। জানলা খোলামাত্র পাশের রাস্তা দিয়ে চলাচলরত গাড়ি ও ঘোড়ায় টানা ট্রামের শব্দ এসে ডাইনিং রুমে হুমড়ি খেয়ে পড়লো। সেই সাথে ভেসে এলো বাড়ির সামনের বাগানে সদ্য ফোটা লাইলাক ফুলের সুগন্ধ সমৃদ্ধ হাওয়া। 

টুপির বাক্সে একটি প্রশস্ত ঝুলের টুপি, গাঢ় রঙের একটি জর্জেটের স্কার্ট, বুকজোড়া ফ্রিলওয়ালা একটি সাদা ব্লাউজ, লেস লাগানো শৌখিন একটি ছাতা। একটি ঝুড়ি এবং বেশ বড়সড় একটি চামড়ার ব্যাগ। জুতোজোড়ায় বোতাম লাগানো আছে। ভেলভেট অন্তর্বাসের ভেতর ছোট্ট পারফিউমের শিশি , বেশ কয়েক জোড়া হাতমোজা। এই হলো আমার লটবহর। ডানজিগের স্টেশন পৌঁছে আমি অ্যালেনস্টাইনের যাবার একটি টিকিট কিনলাম এবং নির্ধারিত ট্রেনের অপেক্ষায় তিনঘন্টা কাটাবার জন্য কাছাকাছি একটা কফির দোকানে গিয়ে বসলাম। শৌচাগারের আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে আমি কেমন একটু চমকে গেলাম- নিজেকে আমি এখনও তরুণী ভাবি, কিন্তু আয়নার প্রতিবিম্ব আমার ভুলটা ভেঙে দিলো। ট্রেনে নিজের নির্ধারিত বগিতে বসে আমি নিউ ডয়েচে রুনডশো নামের জার্মান সাহিত্য পত্রিকার একটি পুরনো সংস্করণ পড়ার চেষ্টা করলাম, যেখানে তার একটি গল্প রয়েছে। এক সময় এই সংস্করণের পুরোটাই আমার মুখস্থ ছিলো, এখন দেখলাম তার অনেকাংশই ভুলে গেছি। 

এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার। অ্যালেনস্টাইন এবং ভেনিস যেন একে অন্যের পরিপূরক। দশ বছর পর তারা হঠাৎ করে আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের দুটি পরিণতির যোগসুত্র হতে যাচ্ছে। এরা যেন উত্তর এবং দক্ষিণ। দুপুর এবং মধ্যরাত। যুক্ত এবং বিযুক্ত। অতীত এবং সময়শূন্যতা। পেছনে তাকানো এবং সামনে আগানো। এ যেন দুটো ভারসাম্যহীতার কেন্দ্রবিন্দু। 

আমি তাকে প্রথম দেখি সমুদ্র সৈকতে। তার পরনে ছিল রঙচঙে পোশাক আর মাথায় একটি ঝা চকচকে টুপি। আমি তাকে ভুলিনি , সাধারণত একবার কাউকে দেখলে আমি সহজে ভুলি না। সমুদ্রতীরে সে ছিলো বেপরোয়া আর প্রাণোচ্ছল এক তরুণ। তারপর যখন পরিচয় ঘটলো তখন আমার মনে হলো সে একটা মুখোশ পরা মানুষ। পরিচয় পর্বে তরুণটি বলে, "আমি একজন লেখক", কিন্তু সেটা আমার কাছে আদৌও তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিলো না। সে একটু দ্বিধায় পড়ে যায়। এমনকি আমার চোখের দিকেও তাকাতে পারছিল না। আমাদের দুজনের পরিচিত একজন তার চেয়ার ছেড়ে দ্রুতপায়ে উঠে এসে জানায়, সে একটা নিরেট গর্দভ! 

পরে তার সাথে সবকিছু হয়ে যাবার পর প্রথমবারের মতো আমি যখন হোটেলে তার বাথরুমটি দেখি, তখন মনে হলো এইমাত্র বুঝি আমি তাকে ভালো করে চিনতে পারলাম। সারা সন্ধ্যার ঘনিষ্ট মেলামেশা, আবেগের চুড়ান্ত পর্যায়, দুজনের শরীরের ঘনিষ্টতম অবস্থান, যার মাধ্যমে একজন পুরুষের সবচেয়ে গভীরে প্রবেশ করা যায়, সেইসব কিছুই নয়। এই হোটেল বাথরুমের চেহারা দিয়েই আমি তাকে সবচেয়ে ভালোভাবে চিনতে পারলাম। তার তোয়ালেটা গোসলখানায় দলামুচড়া অবস্হায় পড়ে আছে, তার দাড়ি কামানোর সরঞ্জাম, দাঁতের ব্রাশ, যার হাতলটা দাগ লেগে বিশ্রী চেহারা হয়ে গেছে এবং তার কাঠের সাবানদানী। এসব জড়বস্তুই হলো একটি জীবন্ত মানুষের অস্তিত্বের চরিত্রের জ্বলজ্যান্ত স্বাক্ষী। বাথরুমের জিনিসগুলো ছুঁয়ে দেখি আমি, তখনও সে ঘুমিয়ে ছিলো কিংবা হয়ত ততোক্ষণে জেগে উঠে আমার জন্য অপেক্ষা করছে ( আগের সন্ধ্যার তুমুল প্রেমময় সময়ের পর, সকালের এই নীরবতা একটু অস্বস্তিকর), এমনসময় হঠাৎ করে আমার ভেতরটা কেঁপে উঠলো। মনে হলো ঠাণ্ডা আয়নাটায় মাথা ঠেকিয়ে খানিক কেঁদে নিতে পারতাম যদি। 

সেই মুহূর্তের কথা আমি কখনো ভুলতে পারি না। সম্ভবত ওটাই আমার প্রেমের সূচনা। প্রেম মানে কী অন্য একজনকে গভীরভাবে জানতে চাওয়ার আকুলতা? শরীরের কামনাটা তো নেহাত আনন্দের জন্য নয় বরং প্রিয়জনের সম্ভাব্য নিকটতম অবস্থানে পৌঁছানোর জন্য। দুজন দুজনের দেহের নানান অলিগলিতে অনুসন্ধান করে, জোর করে সীমানা ছাড়িয়ে আরো ভেতরে প্রবেশ করার যে তীব্র বাসনা তার ভেতরেই রয়েছে নৈকট্যলাভের তীব্র আকুলতা। 

যা ভেবেছিলাম অ্যালেনস্টাইন স্টেশনটি তারচেয়েও ছোটো। কয়েক মুহূর্তের জন্য আমি কেমন আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। নামতে গিয়ে আমার হাত দুটো আপনাআপনিই ট্রেনের দরজার হাতলে চেপে বসেছিল। কিন্তু ক্যাব চালক যখন আমাকে শহরের সেরা হোটেলটিতে নিয়ে গেলো তখন আমি হঠাৎ নিজের ভেতর দারণ আত্মবিশ্বাসের অস্তিত্ব টের পেলাম, মনে হলো দুনিয়াটাকে বশ করার যথেষ্ট ক্ষমতা আমার আছে। এখানকার লোকজন কেমন যেন নীরস প্রকৃতির, দুনিয়াদারী সম্পর্কে তেমন কিছু জানে না, তেমন কিছু ভাবে না, অনেকটা রক্তমাংসের যন্ত্র যেন। রাস্তার ধারে মলিন ছোটো ছোটো দোকানপাট, দোকানের খদ্দেরের অপ্রতিভ মুখশ্রী, যেটা মসৃণ কফির কাপে চুমুক দেয়া বাদে কিছু করে না। তাদের আত্মকেন্দ্রিক জীবন এবং হাস্যকর চলাফেরা দেখতে দেখতে যেতে থাকি। কেউ কেউ মাথায় হ্যাট পরে বেতের ঝুড়িটা এক হাতে ঝুলিয়ে নিয়ে অন্য হাতে ছোট্ট ছাতাটা যতটা সম্ভব শক্ত হাতে ধরে রেখে চলছে। দেখেশুনে মনে হয় এরা ঘরে ফিরে নিত্যদিনের বিরক্তিকর সন্ধ্যাগুলো ছেঁড়া ডিভানে অলস বসে থেকে অতীত স্মৃতি হাতড়ে কাটায়। গাড়িতে করে যেতে যেতে পুরুষের ভঙ্গিতে পা ছড়িয়ে বসে এসব দৃশ্য দেখতে দেখতে আমার মনে হলো আমি এই পরিবেশটাকে ভালোবাসি। আমি তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল বটে, কিন্তু এটাকে করুণা বলা যাবে না। এটা এমন এক ধরনের ভালোবাসা, যা অনুগত সন্তানদের প্রতি পিতামাতা অনুভব করে থাকে, যারা কোনো লক্ষ্য ছাড়াই তাদের ইচ্ছা অনুসারে পড়াশোনা করে। আমি এই গাড়িতে বসে আরো উঁচু থেকে যেন ভালমতন দেখতে পাই এসব বিষয়। যেতে যেতে মনে হয় যেন আমি কোনো এক সম্রাজ্ঞীর মতো তাদের জন্য আইন করে দিয়েছি, সময় নির্ধারণ করে দিয়েছি, তাদের দায়িত্ব ভাগ করে দিয়েছি, তারা সবাই আমার আইন মান্য করে চলছে। 

বেনামে রুম বুকিং করে হোটেলের রেজিস্টার খাতায় সই করার সময় মুখ ফসকে রিসেপশান কর্মীকে জিজ্ঞেস করে বসলাম, "এটা কি সত্যি যে বিখ্যাত লেখক 'টি' আজ রাতটা এই হোটেলে থাকবেন?" 

রিসেপশান কর্মীটি আমার দিকে মুখ তুলে তাকালেন, চশমার ঘোলাটে কাঁচের কারণে তার চোখ জোড়া অদ্ভুত দেখাচ্ছিল। কথাটা শুনে তিনি যে প্রাণপণ চেষ্টায় তার উত্তেজনা আর গর্ব সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন সেটা পরিস্কার বোঝা যাচ্ছিল। 

"হ্যাঁ, কথাটা সত্যি। সঙ্গীত এবং সাহিত্য বিষয়ে আগামিকাল তাঁর বক্তৃতা দেবার কথা। আগামিকাল বিকেলে।" কর্মীটি উত্তর দেবার পর হঠাৎ চুপ মেরে গেলেন। তারপর কিছুটা নীচু স্বরে বললেন, "তিনি যে আমাদের এই হোটেলে উঠেছেন, সেটা কাউকে বলবেন না দয়া করে, যদিও এটা ঠিক যে আমাদের হোটেলের মতো এত ভালো জায়গা এখানে নেই, এটাই এই শহরের সেরা হোটেল। আর তাঁর জন্য আমাদের হোটেলে একটি বিশেষ স্যুইট বরাদ্দ আছে। রুমটি বেশ কয়েকদিন ধরে তাঁর অপেক্ষায় আছে। 

কর্মচারীটি রোমান সংখ্যায় লিখিত ‘এক’ এর নীচে ঝুলতে থাকা চাবিটির দিকে ইঙ্গিত করে বললেন "আমাদের ভয় তাঁর পাঠকদের নিয়ে, তাঁকে একটুও শান্তিতে থাকতে দেবে না।" 

"তিনি কি সত্যিই অতটা জনপ্রিয়?" ফস্ করে জিজ্ঞেস করে বসলাম আমি। 

"আমার স্ত্রী তাঁর লেখা সব বই পড়েছে।" কর্মচারীটি এমন ভাবে বললেন যেন তার এই কথার ভেতরেই লেখক সম্পর্কিত সব কিছুর ব্যাখ্যা রয়েছে। 

"ট্রেন বার্লিন থেকে কখন এসে পৌঁছাবে? আমি জানতে চাইলাম, "আমি একজনের জন্য অপেক্ষা করছি।" 

কর্মচারীটি সন্দেহভরা চোখে আমার দিকে তাকালেও ঠিকই সময়টা বলেছিলেন। 

আমাকে যে হোটেল রুমটি দেয়া হয়েছে, সেটি বেশ হতচ্ছিরির। প্রধান ফটকমুখী দুটি লম্বা কাঁচের দরজা হাট হয়ে খোলা। কার্নিশে একদল কবুতর ভালোই আড্ডা জমিয়ে বসেছে। 

পরিস্হিতির ধকলে বেশ ক্লান্তবোধ করছিলাম,স্বস্তি পেতে হাতমুখ ধুয়ে বাথরুমের খসখসে তোয়ালেতে মুখ মুছে নিলাম। পরনের ব্লাউজটা বদলে নিয়ে আমার উচ্চতার পক্ষে বেশ উঁচুতে ঝোলানো আয়নাটির সামনে দাঁড়িয়ে মাথার চুল আঁচড়ে যত্নের সাথে ক্লিপ দিয়ে বেঁধে নিলাম। আয়নাটা এত উঁচুতে ঝোলানো যে আমি শুধু আমার চোখ আর কপাল দেখতে পাচ্ছি। আঙুলে খানিকটা সুগন্ধি নিয়ে ত্বকে ঘষে নেই। ভাবছিলাম এখনও হাতে অনেক সময় আছে, বাইরে গিয়ে এক চক্কর ঘুরে আসতে পারবো। কিছু কেনাকানা করা যাবে। ঘুরতে ঘুরতে দোকানের কাঁচের জানলায় নিজের প্রতিবিম্ব ছেড়ে আসবো মার্কেটের উন্মুক্ত চত্বরে। ছাতার নীচে বসে আয়েশ করে লেবুর সরবত পান করবো। 

সাজসজ্জা সেরে টুপিটা পরে নিলাম, কিন্তু দরজার কাছে গিয়েও কী একটা মনে হওয়ায় দ্রুত ফিরে এসে ধপাস করে বিছানায় এলিয়ে পড়লাম। বেরুবার জন্য তৈরী হয়ে যে অবস্থায় ছিলাম, সেই অবস্থাতেই আমার হাতের ছোট্ট ছাতাটিসহ হোটেল রুমের নিপাট বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লাম। শুয়ে শুয়ে সিলিং এর ফাটলগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হলো তাদের মধ্যে রহস্যময় কোন বর্নমালার সংকেত দেখা যাচ্ছে। 

গোটা দিনটা আমরা শহরময় হেঁটে বেড়ালাম। ভেনিস খরতাপে পুড়ছিল, আর খালগুলো পুঁতিগন্ধ ছড়াচ্ছিল। আমাদের হাঁটার গতি সবসময় এত বেশী থাকতো যে মনে হতো কোথাও যাওয়ার তাড়া আছে। "আহ! সবসময় আমাদের এত তাড়াহুড়ো কেন?" কথাটা বলে আমরা দীর্ঘশ্বাস ফেলতাম তারপর হাসিতে ভেঙে পড়তাম। আসল কথা হলো আমরা যখন পাশাপাশি হাঁটতাম আমাদের দুজনের হাত দুটো পরস্পর ঘষা খেতো, আমাদের কাঁধের সাথে কাঁধের স্পর্শ লাগতো, হঠাৎ হাওয়া এসে আমাদের একজনের ঘ্রাণ অন্যের কাছে পৌঁছে দিতো। আমরা পরস্পরের দিকে না তাকিয়েও কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে হেঁটে যেতাম এবং দুজন দুজনকে নিবিড়ভাবে খেয়াল করতাম। এটা কীভাবে সম্ভব? সে আমাকে অনবরত তার পরিবারের কাহিনি বলে যেতো। এটা আমার খুব অবাক লাগতো। কারণ ওই বিষয়ে আমার তেমন কিছু বলার থাকতো না। কিন্তু সে বকবক করেই যেতো, যেন সে নিশ্চিত করতে চাইতো তার অস্তিত্ব। সে জার্মানীর কোন প্রাচীন বংশের জিন বহন করছে, তাদের পূর্বপুরুষের কীর্তি ইত্যাদি বিষয়ে কথা বলে যেতো। সে তার পুরোনো সময়ের অনেক গল্প করতো। এই কারণেই সে লেখক হতে পেরেছিল পরবর্তীতে। সে তার পূর্বপুরুষদের অনেকের নাম ধাম কীর্তি খুব পরিষ্কারভাবে বলতো। তাদের কথা এমন প্রশংসার সাথে উচ্চারণ করতো যেন তারা প্রত্যেকেই ছিল একেকজন বিশিষ্ট চরিত্রের মানুষ। আমি তার সব গল্প বিশ্বাস করতাম না। তাদের সবার পক্ষে এত আকর্ষণীয় চরিত্র হবার কথা নয়। এটা অযৌক্তিক। পৃথিবীটা হলো জনসংখ্যার ভিড় ঠাসা একটা জায়গা, এখানে অল্প কয়েকজনই বিশিষ্ট হতে পারে। এটাই আমি বিশ্বাস করি। আমার কাছে মানুষ হলো সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো, একটি থেকে অন্যদিকে আলাদা করা যায় না। শুধু আমরা যাকে ভালোবাসি তাকেই আমরা বিশেষ চোখে দেখি। সবাইকে ভালোবাসা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। 

শুধুমাত্র যখন আমরা স্বল্প সময়ের জন্য কোনো ক্যাফেতে, জনশূন্য কোন সৈকতের চেয়ারে, কিংবা কোনো ঘাটের পাটাতনে একটু সুস্হির হয়ে খানিক বসতাম কেবল তখনই একে অপরের দিকে অপলক চেয়ে থাকার অবসর মিলতো। সে মুহূর্তের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আমি তখন তার মধ্যে বিলীন হয়ে যেতে চাইতাম। যতবারই সে আমার দিকে তাকাতো তার সে দৃষ্টির সুগভীর দ্যোতনা আমি স্পষ্ট অনুভব করতাম নিজের শরীরে। সপাট, উজ্জ্বল নীলাভ সে চাহনীতে কোন রাখঢাক থাকতো না। 

সন্ধ্যায় আমরা দুজন আরো অনেকের সাথে হ্রদ মুখী চত্বরে বসে থাকতাম। গাছের পাতাগুলো সন্ধ্যাবাতির আলোয় হলুদ হয়ে অদ্ভুত বুনো পরিবেশ সৃষ্টি করতো চারপাশে। আমাদের চারপাশে যেসব বন্ধু পরিচিতজন ছিলো তারা যেন আলাদা একটি দ্বীপ যেখানে আমরা কিছু সময়ের জন্য নোঙর করতে পারতাম, কিন্তু তার চেয়ে আমরা পাল তুলে খোলা সমুদ্রে ঘুরে বেড়াতেই বেশি পছন্দ করতাম। 

….বাড়িটা ছিল ঝোপঝাড়ের আড়ালে। চারদিকে উঁচু বেড়া। সে ওই বাড়িতে আছে জেনে আমি চুপি চুপি ওই বাড়ির কাছাকাছি গেলাম তাকে এক নজর দেখার জন্য। হঠাৎ মনে পড়লো যে আমি নগ্ন, সাথে সাথে লাফ দিয়ে রাস্তা থেকে সরে গিয়ে ঝোপের ভেতর ঢুকে গেলাম। ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে বাড়ির পেছনের বাগানে পৌছে যাবার পর দেখতে পেলাম খাবার ঘরের জানালা দিয়ে আলো দেখা যাচ্ছে। সেখানে কোনো একটা সংবর্ধনা জাতীয় অনুষ্ঠান হচ্ছে। লোকজন পাণীয়ের গেলাস হাতে ঘোরাফেরা করছে। তাদের ঠোঁট নিঃশব্দে চুমুক দিচ্ছে গ্লাসে। নীল পোশাক পরা যে মহিলাকে দেখা যাচ্ছে সে তার স্ত্রী। সে সবাইকে হাসিমুখে আপ্যায়ন করছে। কী চমৎকারভাবে মেয়েটা সবকিছু আয়োজন করেছে। ঝোপের ধারালা কাঁটা আমার চামড়ায় বিদ্ধ করছিল। কিন্তু সে ওখানে নেই, খাবার ঘরে তাকে দেখা যাচ্ছে না। সে নেই ওখানে। 

ঘুম ভেঙে হঠাৎই আমি ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। টুপিটা গলার কাছটায় বিরক্তিকর ভাবে খোঁচাচ্ছিল। উঠে আয়নার কাছে গিয়ে নিজেকে দেখে নিতে চাইলাম। চোখ দুটো হালকা ফোলা আর ভেজা ভেজা। হাত ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বুঝলাম সময় হয়ে গেছে। 

অ্যালেনস্টাইনের দুইমুখি রাস্তার আকৃতিটা ছিলো ক্রসের মতো, সেই রাস্তার উপর ছিলো একটি দূর্গ, একটি টাউন হল, আর পুরো জায়গা জুড়ে ছিলো প্রাচীন রীতির আমেজ। সেখানে বসবাস করাটা অসম্ভব হলেও দর্শনীয় জায়গা হিসেবে ছিলো অনবদ্য। প্রুশিয়ান রীতি আর এশীয় বিষন্নতা, জলের অদ্ভূত গন্ধ সব মিলিয়ে জায়গাটা দর্শনের জন্য উপযুক্ত হলেও বসবাসের জন্য আদৌও মানানসই ছিলো না। ঘড়ির কাটা তিনটের ঘরে পৌঁছানো মাত্র আমি কফির অর্ডার দিলাম। আমার বাড়ির কথা মনে পড়লো। বাচ্চাদের এখন ঘুমিয়ে থাকার কথা। হঠাৎ তাদের গায়ের গন্ধের জন্য নিজের ভেতর কেমন এক তৃষ্ণা অনুভব করলাম- কেন যেন শিশুদের চুলে সব সময় বাতাসের গন্ধ লেগে থাকে! কপিশফের কর্মচারিটি বিল নিতে এসে খানিকটা কৌতূহলের চোখে টাকাটার দিকে তাকালো, তারপর আমার দিকে তাকালো একটু প্রলুব্ধ চোখে। বিল চুকিয়ে আমি ধীর পায়ে স্টেশনের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। হঠাৎ যেন আমার শান্তভাবটি উবে যায়। আমার হৃদপিণ্ডটি খুব দ্রুত লয়ে চলতে শুরু করে। নিজের মধ্যে কেমন দ্বিমাত্রিক একটা বোধ অনুভব করলাম, যেন এই মুহূর্তে আমার কোনো অস্তিত্ব নেই, নেই আমার কোনো অতীত কিংবা ভবিষ্যত। একজন মহিলা স্টেশনের দিকে হেঁটে যাচ্ছে ব্যস, এর বাইরে যেন আর কিস্যু নেই। 

প্ল্যাটফর্মটা প্রায় জনশূন্য - ফুলের তোড়া হাতে এক তরুণ, দুটো বাচ্চা সমেত এক মহিলা এবং দেরীতে এসে সবসময় ট্রেন ফেল করে তেমন কিছু যাত্রী ছাড়া আর কেউ ছিলো না। আমার পরপর একদল লোক এসে ঢুকলো প্ল্যাটফর্মে। তাদের মধ্যে গোলগাল ভারিক্কী চেহারার একজন, অভিজাত কালো স্যুট এবং একচক্ষু চশমা পরিহিত একজন (দেখে মনে হচ্ছে তিনি এইমাত্র কোন অন্তেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান সেরে এসেছেন)। এর বাইরে তৃতীয় এবং চতুর্থজনকে দেখে ব্যক্তিত্বহীন মনে হলো। মনে হচ্ছে এরা হলেন অ্যালেনস্টাইনের সম্মানিত সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদল যারা লেখককে অভ্যর্থনা জানাতে এসেছেন। এরপর সুসজ্জিত ছাত্রছাত্রীদের বেশ বড় একটা দল এসে ঢুকলো প্ল্যাটফর্মে। অল্পসময়ের মধ্যে নির্জন প্ল্যাটফর্মটির চেহারা বদলে গিয়ে সরগরম হয়ে উঠলো। এত ছাত্রছাত্রীর ভিড় দেখে মনে হচ্ছে এরা কোনো শিক্ষাসফরে যাচ্ছে, অথবা বনভোজন, আজ কী প্রুশিয়া স্কুলগুলো ছুটি নাকি? দলের বয়স্ক শিক্ষক দলটির শৃংখলার বজায় রাখার চেষ্টায় হিমশিম খাচ্ছিলেন। 

ভাবতে অবাক লাগে, সে রীতিমত কেঁদে ফেলেছিল ভেনিসে যখন আমাদের ছাড়াছাড়ি হয়। সে আমার হাত আঁকড়ে ধরে রেখেছিল, তার নীল চোখ দুটো ছিলো জলে ভরপুর। সে বলছিল, “কী বোকাটে ব্যাপার, আমাদের তো আবার দেখা হবে তাই না?” আমি ভেবেছিলাম সে হয়তো আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে, কারণ সে খুব প্রথাসিদ্ধ মানুষ। “কী বোকাটে ব্যাপার, বিয়ের প্রস্তাব করাটা, আমাদের তো আবারো দেখা হবে” আমিও তাই ভাবছিলাম এবং কথাগুলো আমার মাথায় অনবরত খোঁচা দিচ্ছিল। অন্য কোনো সম্ভাবনার কথা কল্পনাতেও আসেনি তখন। 

পরে বুঝেছিলাম আসলে সে কেঁদেছিল তার নিজের কথা ভেবেই। "আমি তোমাকে চারখানা চিঠি লিখেছিলাম।" পঞ্চম চিঠিতে সে এভাবে স্মৃতিচারণ করছিল। " কিন্তু চিঠিগুলো তোমাকে পাঠাইনি। ওগুলো একটা ক্ষতকে এমনভাবে খুঁচিয়ে তুলছিল যা এতদিনে প্রশমিত হয়ে যাবার কথা ছিলো। তুমি এত সুন্দর, এত পবিত্র যে মনে হয় যেন পৃথিবীর কোন মলিনতা তোমাকে স্পর্শ করতে পারেনি। তুমি যেন অন্য কোনো জগত থেকে আবির্ভূত হয়েছো। তোমাকে হারানোর ভয় তোমাকে পাওয়ার আকাঙ্খাকে প্রবলভাবে বাড়িয়ে দেয়। আমার কাছে মনে হচ্ছিল চিঠিটা কেমন যেন বিক্ষিপ্ত, অসংলগ্ন- যদিও কেন ওরকম মনে হচ্ছিলো তা বুঝতে পারছিলাম না। যেন চিঠিটা অন্য কারো কাছে লেখা। 

স্টেশনে অপেক্ষামান ছোট্ট ভিড়টার মধ্যে একটু চঞ্চলতা দেখা গেলো। ফুলের তোড়া হাতে তরুণ বেঞ্চ ছেড়ে উঠে পড়লো। কালো কোট পরা ভদ্রলোকটি এক চক্ষু চশমা মুছতে লাগলেন দ্রুত। বয়স্ক শিক্ষক বেয়াড়া ছাত্রের দলটাকে দুটো সারিতে শৃংখলাবদ্ধ করার জন্য প্রবল চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এসব কর্মকাণ্ড দেখে বুঝতে পারলাম এই মানুষেরা 'তার' জন্যই অপেক্ষামান। সেই ‘টি' ভদ্রলোক এখন আর আমার একার না, তিনি এখন অনেকের। উপস্হিত এই সব শিশু, এবং কালো কোটের ওই ভদ্রলোক, আর ওই ফুলের তোড়া হাতের তরুণ, অভ্যর্থনাকারীরা আর তাদের বই পড়ুয়া স্ত্রীসকল, সব্বাই এখন লেখকের উপর অধিকার রাখে। 

কিন্তু তারা আসলে লেখক সম্পর্কে কতটুকু জানে? তারা কী তার বিখ্যাত উপন্যাস কিংবা পত্রিকায় প্রকাশিত ছোটো গল্পের মাধ্যমে তার সম্পর্কে জেনেছে? কে সে, যাকে তারা জেনেছে? সে যা কিছু লিখেছে তাতে নিজের সম্পর্কে তেমন কিছু নেই, যা কিছু আছে তা কেবলই আধখেচড়া ধরনের জগাখিচুড়ি। সে কি তার নিখুঁত, স্পষ্ট আর প্রত্যয়ী বাক্যগুলোর মতো জীবনযাপন করে? ভেনিসে আমাদের বিরতিহীন পথ চলার সময় অবিরাম গল্প হতো ওর সাথে। সে সবসময় সংক্ষেপে কথা বলতো, অনুভূতির সুক্ষ্ণ তরঙ্গ ভেসে বেড়াতো। আমি বুঝতে চেষ্টা করতাম এখনো কী সেই কথাটা বলার সময় হয়নি? এমনকি কোন দাড়ি কমার মধ্যেও তার ইঙ্গিত কী নেই? তার কাহিনির বর্ণনা বা উপখ্যানের কোথাও কি সে উপস্হিত থাকে? সে একটা কৌতুকও বলতে পারে না ঠিকমত। সে কীভাবে নিজেকে নিয়ে তৈরী বানোয়াট চরিত্র দিয়ে পাঠককে বোকা বানাতো? কাজটা কী তার পক্ষে খুব সহজসাধ্য ছিলো। অথবা হয়ত ততটা সহজ ছিলো না, হয়ত আমি একাই বোকা বনেছিলাম। প্রবল প্রেম আর কামনার তাগিদে বেহুঁশ হয়ে আমি হয়তো তার ভেতরে অন্য কাউকে দেখতে পেয়েছিলাম। নাহ্ তার লিখিত একটা লাইন পড়েও আমি তাকে চিনে উঠতে পারি না। লেখার কোত্থাও সে থাকে না। নিরেপেক্ষ বর্ণনাকারী হিসেবেও কাহিনিতে তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। সে ওখানে ছিলো না কখনোই। একজন জীবন্ত সাহিত্য স্রষ্টার ভেতরে অনুসন্ধান চালানোর ব্যাপারটা সত্যি খুব চমকপ্রদ ব্যাপার ছিলো। শব্দ দিয়ে যে পৃথিবী শাসন করে। যখন সে চিত হয়ে ঘুমিয়ে থাকে, সম্পূর্ণ অচেতন হয়ে, তখন তার নিঃশ্বাসের ওঠানামার মধ্যে তাকে আবিষ্কার করার চেষ্টা, তার চোখের আড়ালে থেকে তাকে আবিষ্কার করার চেষ্টা, তাকে আইসক্রিম খাবার সময় চেয়ে দেখা, সে কী অন্য সাধারণ লোকদের চেয়ে আলাদা কিনা, সাধারণ লোক যা পছন্দ করে সে তা পছন্দ করে কিনা, তার স্নায়ু অন্য লোকদের মতো মগজে কোনো বার্তা নিয়ে যায় কিনা, ইত্যাদি। নিশ্চয়ই সে সাধারণ মানুষের চেয়ে আলাদা। হঠাৎ আমার মনে পড়ে গেলো ভেনিসে তার গোঁফজোড়া গজিয়ে উঠছিল। সে প্রায়ই হাতের আঙুল দিয়ে উপরের ঠোঁটের উপরে স্পর্শ করে খরখরে গোঁফের অস্তিত্ব অনুভব করতো। 

ট্রেনটাকে আসতে দেখা যাচ্ছিল। রেলের ইঞ্জিন থেকে নির্গত ধোয়ার কুণ্ডুলি অপেক্ষামান মানুষগুলোর মাথার উপর দৃশ্যমান হতে দেখা যায়। আমার হৃৎপিণ্ডে বুঝি কেউ হাতুড়ি পেটানো শুরু করলো, মনে হলো ঠোঁটজোড়া শুকিয়ে কাঠ। টুপির ঝুলটা আরেকটু নামিয়ে দিয়ে স্টেশন সংলগ্ন রেস্তোঁরার সাইনবোর্ডের পেছনে সরে দাঁড়াই। কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেন প্লাটফর্মে এসে থামলো, তবে সেরকম কিছুই ঘটলো না। কিছু সময়ের জন্য স্টেশন চত্বরটি কেমন থমকে থাকলো। চারজন লোক অস্হির হয়ে উদ্ভ্রান্তের দৃষ্টিতে এ গাড়ি সে গাড়িতে ছুটাছুটি শুরু করলো। তখন আমার চোখে পড়লো অভ্যর্থনাকারী দলটি হঠাৎ ডানদিকে সরে গিয়ে একেবারে ট্রেনের সামনের দিকে চলে যাচ্ছে। ভিড়ে মধ্যে এতক্ষণ আড়ালে চলে যাওয়া দুই শিশুসহ মহিলাটিও দলটিকে অনুসরণ করে এগিয়ে গেলেন। ফুলের তোড়া হাতের তরুণটি সবার আগে, সে প্রায় ছুটতে শুরু করেছে। 

ছোটোখাটো একটা ভিড় পরিবেষ্টিত হয়ে লেখক যখন স্টেশনের দরজা পেরিয়ে চলে যাচ্ছিল, তখনই আমি তাকে দেখতে সক্ষম হই। বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলাম সে এখন আরো স্থুলকায়, বাহুল্যবর্জিত, জুবুথুবু হয়ে গেছে। সেই একই মুখ, যা আমার খুব চেনা ছিলো, কিন্তু এখন বদলে গেছে, এখন সেখানে কঠোর বাস্তবতার ছাপ এঁটে বসেছে। ভক্তদের ভিড়ে আড়াল হয়ে গেলো সে। লেখকের স্বাক্ষর নেবার জন্য যুবকটি একটি অটোগ্রাফ খাতা এগিয়ে দিলো। একচক্ষু চশমা পরা ভদ্রলোকটি নিজের শরীর দিয়ে এবার লেখককে পুরোপুরি আড়াল করে ফেললেন। চারপাশের এই উচ্ছ্বাস কোলাহলের মাঝে লেখক ঝড়ের কেন্দ্রবিন্দুর মতো স্থির শান্ত অবিচল। 

তার মানে এখন দেখা হবার সুযোগ নেই। পরে হবে। আমি নিরাশ হৃদয় নিয়ে দূর থেকে অনুসরণ করলাম ওদের। আমি তাদেরকে একটা গাড়িতে উঠতে দেখলাম। 

লেখকের সাথে সান্ধ্যকালীন অনুষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছিল শহরের নানান জায়গায়। ‘বিখ্যাত লেখক টি আজ সন্ধ্যায় বক্তৃতা দেবেন….’ আমিই সবার আগে অনুষ্ঠানে হাজির হলাম। আস্তে আস্তে লোকের ভিড় বাড়তে বাড়তে অডিটোরিয়াম ভর্তি হয়ে গেল। মহিলারা তাদের সেরা পোশাক পরে এবং সুগন্ধী মেখে শহুরে কেতায় হাজির হলো। তাদের কুমড়োপটাশ স্বামীদের ওয়েস্টকোটের পকেটে চেনযুক্ত ঘড়িতে সময় মিলিয়ে দেখতে অস্হির পায়ে ছুটোছুটি করতে দেখা যায়। আরো উপস্হিত হয়েছেন অ্যালেনস্টাইনের বুর্জোয়া শ্রেণির কিছু প্রতিনিধি। 

সবচেয়ে মার্জিত ভাবে উপস্হিত হয়েছেন যাঁরা, তাঁরা সম্ভবত শিক্ষক, স্হানীয় সচেতন বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়। স্টেশনের সেই তরুণটিও এখানে উপস্হিত হয়েছে, এখন অবশ্য তার হাতে কোনো ফুলের তোড়াটোড়া নেই। তিনজন মহিলা নিজেদের মধ্যে কী একটা নিয়ে হাসছেন আর ন্যাকামিপূর্ণ ভাবে চোখ পিটপিটাচ্ছেন। তারা কী অভিনেত্রী নাকি? হয়তবা। ছাত্রদের একটা দলও হাজির হয়েছে। তো এরাই হলেন আজকের অনুষ্ঠানের মূল ব্যক্তিত্ব বিখ্যাত লেখক টি.'র ভক্ত অনুরক্তের দল যারা পূর্ব প্রুশিয়া থেকে তার বক্তব্য শুনতে এসেছেন। 

“লেখালেখি ছাড়া আর কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয় আমার কাছে, আমি জানি তুমি আমাকে বুঝবে”। তার শেষ চিঠির শেষ লাইনটি ছিল এরকম। আমি কথাটা একেবারেই বুঝিনি। সেখানে এমন কিছু অসঙ্গতি ছিল, যা খুঁজে পেতে আমি ব্যর্থ হয়েছিলাম। আমার তো টাকার অভাব ছিল না। সে চাইলে আমার সঙ্গে ভেনিস কিংবা অন্য যে কোন জায়গায় বাস করে লেখালেখি করতে পারতো অনায়াসে। ওটাই হয়তো সমস্যা ছিলো। হয়তো আমি যথেষ্ট শিক্ষিত ছিলাম না, হয়তো আমার পরিবার যথেষ্ট উপযুক্ত ছিলো না। আমার মনে পড়ে সে যখন ‘প্রফেসর’ শব্দটা শুনতো তার কান খাড়া হয়ে যেতো, সটান দাঁড়িয়ে পড়তো। এটা খুব অদ্ভুত লাগে ভাবতে যে তার মতো একজন খ্যাতির মোহে এতই কাবু ছিলো। শেষমেষ অবশ্য সে এক প্রফেসরের কন্যাকেই বিয়ে করেছিল। কিন্তু আমাদের ভেনিস পর্বের এক বছর পূর্ণ হবার আগেই সে কীভাবে আরেকটি মেয়ের প্রেমে পড়তে পারলো, তাকে বিয়ে করতে পারলো? আমার বিশ্বাসই হতে চায় না যে সে সত্যি আরেকজনের প্রেমে পড়েছিল। নিশ্চয়ই তার অন্য কোন মতলব ছিলো। হয়তো ওখান থেকে কোনো একটা বোকাটে গল্পের সুত্রপাত ঘটেছিল তার। তাছাড়া কোনো লেখকের পক্ষেই কেবল ভালো ভালো জিনিস লিখে যাওয়া সম্ভব নয়, মাঝে মাঝে সেখানে ছন্দপতনও ঘটে। সেই সময় আমি কেবল নানান খুঁত বের করতাম। যার অধিকাংশই ছিল পরেরটির মতো অবান্তর। 

আমি তাকে দীর্ঘ একটি চিঠি লিখেছিলাম। কিন্তু সে কোন উত্তর দেয়নি। চিঠিটা পড়ে সে নিশ্চয়ই দলামোচড়া করে ময়লার ঝুড়িতে ছুঁড়ে দিয়েছিল। কিংবা হয়ত পুড়িয়ে ফেলেছিল, কারণ সে তখন তার ভবিষ্যত, তার আত্মজীবনী নিয়ে ভাবিত ছিল, সে হয়তো চেয়েছিল তার আত্মজীবনীটা নিখুঁত হোক, সেখানে যেন অতীতের কোনো দাগ যেন লেগে না থাকে, সেই লক্ষ্যটাই প্রাধান্য পেয়েছিল। জীবনটা এমন না যে আমরা তাকে দিয়ে যা করাতে চাই সবকিছু সেভাবে ঘটে। বরং জীবনই আমাদের চালিয়ে নিয়ে যায়, যেসব লক্ষ্যে পৌঁছানো কঠিন, সেগুলোর পেছনেও আমাদের ছুটতে বাধ্য করে। এই ভাবনাটা মাথায় আসার পর আমি হঠাৎ এতটাই আতঙ্কিত বোধ করি যে তখুনি শহরের রৌদ্রকরোজ্জল রাস্তায় বেরিয়ে পড়বার জন্য মরিয়া হয়ে উঠি। 

তারপর থেকে সে আমাকে আর একটা শব্দও লেখেনি কোনদিন। খোঁজ নিয়ে পরে জানতে পেরেছিলাম সে বিয়ে করেছে এবং তাদের ঘরে সন্তানও এসে গেছে। এক বা দুই সন্তান হয়ত বা, সঠিক জানি না। পত্রিকায় তার যে কোনো লেখা প্রকাশিত হলে সেখানে আমার বিষয়ে কোন ইঙ্গিত আছে কিনা সেটা খোঁজার চেষ্টা করতাম। সে যেভাবে লিখতো আমি ঠিক সেভাবে পড়তাম। অনেকটা মোহাচ্ছন্ন হয়ে আমি তার প্রত্যেকটা লেখার ভেতর আতিপাতি করে খুঁজে ফিরতাম কোথাও এমন কোনো সংকেত চিহ্ন আছে কিনা, যেখানে সে আমার সম্পর্কে কিছু বলতে চেয়েছে বা বলেছে। যেখানে তার সেই মারাত্মক কথাটার ব্যাখ্যা থাকবে - “লেখালেখি ছাড়া জীবনে আর কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয় আমার কাছে”। 

আগতরা মূল অনুষ্ঠানের যেখানে লেখক বক্তব্য রাখবেন সে জায়গায় আস্তে আস্তে তাদের আসনে এসে বসতে শুরু করেন। আমিও অন্যদের অনুসরণ করে লাল মখমলের কাপড়ে ঢাকা টেবিলটি থেকে যতটা সম্ভব দূরে গিয়ে বসি। ঘরে প্রায় কোনো প্রাকৃতিক আলো ছিলো না, উপর থেকে টেবিলটির উপর ঝুলন্ত আলোর ব্যবস্হা ছিলো। এটাই ভালো হয়েছে, ওখান থেকে এই আলোতে লেখকের আমাকে দেখতে পাওয়ার কথা নয়। স্পট লাইটের আলোকচ্ছটা তার দৃষ্টিকে বাধাগ্রস্থ করবে। 

গোটা পরিবেশটা ছিলো থিয়েটারের। শ্রোতারা নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করছিল, কেউ কেউ কৌতূহলি হয়ে চারপাশে তাকাচ্ছিল। স্হানীয় একজন ফটোগ্রাফার নিঃশব্দে তার ক্যামেরার তেপায়াটি স্হাপন করলেন। অবশেষে দরজার দিক থেকে একটা মৃদু গুঞ্জন ভেসে এলো। লেখক টি. স্বশরীরে আবির্ভূত হলে। সে ছিলো নিখুঁত পরিপাটি, উপস্থিত অন্য সকলের চেয়ে আলাদা। কীভাবে আলাদা সেটা বলতে পারি না। এক ধরনের শুচিতা ফুটে বেরোচ্ছিল তার অবয়ব থেকে- তার নরম শেভকৃত ফ্যাকাশে মুখমণ্ডল, পরনের সাদা শার্ট আর কলারের স্পষ্ট রেখা, তাঁর রূপালি চশমা, ইস্পাত ধুসর রঙের স্যুট। এত দূর থেকে তার জুতো জোড়া দেখা সম্ভব হচ্ছিল না, দশ বছর আগে তার জুতো জোড়া দেখতে কেমন ছিলো সেটা মনে করার চেষ্টা করলাম- তখন সে বেশিভাগ সময় বাদামী রঙের একজোড়া জুতো পরতো যার আগাটা ছিলো সরু এবং কিছুটা সমান। তার নগ্ন পদযুগলের স্মৃতিও মানসপটে ভেসে উঠলো। দিব্য দৃষ্টিতে তাকে মিলয়াতন জুড়ে নগ্ন পায়ে হেঁটে বেড়াতে দেখলাম। 

তার বয়স বেড়েছে। বেশ বদল এসেছে তার মধ্যে। উপস্হিত শ্রোতাদের দিকে সে একদমই তাকাচ্ছিলো না। তাকে দেখে বোঝা যাচ্ছিলো আরাম চেয়ারটিতে বসে সে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। তার সামনে একটা জলের বোতল আর গ্লাস দেয়া হয়েছিল। সেগুলো ঠেলে এক পাশে সরিয়ে রাখলো। 

জ্যাকেটের ভেতরের পকেট থেকে কিছু কাগজ বের করলো, গলাটা পরিস্কার করে নিলো এবং তারপর মিলনায়তনের দিকে তাকালো। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সে একবার দর্শক সারিতে চোখ বুলিয়ে নিলো। তাতে আমি কেমন কেঁপে উঠলাম, কারণ এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো তার দৃষ্টি বুঝি আমার শরীরে চোখ বুলিয়ে গেলো! কিন্তু সে আমাকে চিনতে পারেনি। চেনার কথাও না এতটা দূরত্বে । আমি কিন্তু তাকে যে কোনো সময়, যে কোনো দূরত্ব থেকে যে কোনো মুহূর্তে চিনে নিতে পারবো, যত ভিড়বাট্টাই হোক না কেন। 

"ভদ্রমহিলা এবং ভদ্রমহোদয়গণ, আমাকে যে বিষয়ে বলার জন্য এখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে..." 

কোনো ভূমিকা ছাড়া সরাসরি তার বক্তব্য উপস্থাপন করতে শুরু করলো। এই শহর নিয়ে কিছু বললো না, উপস্থিত জনসমাগমের উদ্দেশ্যে একটু হাসলো না, নিজের পরিচয় দিলো না, বললো না সে কী ছিলো অতীতে, কী কারণে এখানে এসেছে, এখানে এসে তার ভালোমন্দ কিছু লাগছে কিনা। কিছু বললো না মে মাসের সূর্যের সাথে তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের ব্যাপারে, বললো না উপস্থিত ভদ্রমহিলাদের কেতাদুরস্ত হ্যাট কিংবা তাদের স্বামীদের দামী ঘড়ির চেইন সম্পর্কেও। 

বক্তব্য দেবার সময় কন্ঠস্বরে কোনো ওঠানামা নেই, কোনো দীর্ঘশ্বাস নেই, মুখের কোন অভিব্যক্তি নেই। পরিষ্কারভাবে তার বক্তব্য পেশ করে যাচ্ছিল, যদিও একঘেয়ে সুরে কথা বলছিল, তবু এক ফাঁকে তার বো-টাইটা হাত দিয়ে ধরে দেখে নিল ওটা ঠিক জায়গায় আছে কিনা। সে অতি সাধারণভাবে তার শব্দের আঘাতে ঘায়েল করতে চাইছে যেন সে চরম নিরপেক্ষ ও প্রজ্ঞাবান ইউরোপীয়ান লেখক হয়েও অতি সাধারণ একজন মানুষ। সে যেন নিজের আদর্শকে অস্পষ্ট রাখতে চায়। মার্জিত আভিজাত্য সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব তার, মাপা মাত্রায় কোথাও কমও না আবার বেশিও না । এগুলো আমার চেনা, খুব চেনা। ভাবতেই উত্তেজনা হচ্ছিল তার এই মুখোশ যে কোনো মুহুর্তে খসে পড়বে। তার এই বৈপরীত্যই সবচেয়ে আকর্ষণীয় উত্তেজনাকর। তার এই স্বভাবটাই আমি সবচেয়ে বেশী ভালোবাসি। সে এই বিষয়ে একজন ওস্তাদ বটে। 

সে ধীরস্হির আর সুনিদির্ষ্টভাবে বক্তব্য রাখে, কথার মাঝখানে ছোট্ট বিরতি দিয়ে তাঁর নীলচোখ তুলে সিলিংয়ের দিকে তাকায়। বক্তব্যের দাড়ি, কমা, সেমিকোলন ইত্যাদি মেপে মেপে বিরতি নেয়। সে সত্যিই অনেক উন্নতি করেছে। সঙ্গীত সম্পর্কে আলোচনা করলেও সাহিত্য বিষয়ে কিছুই বলেনি। উপস্হিত শ্রোতাদের অনেকেই হয়ত তাতে হতাশ হন, কারণ একজন লেখক সাহিত্য নিয়ে কথা বলবে সেটাই কী স্বাভাবিক নয়? 

“...এবং মনে হচ্ছে সঙ্গীতের বিবর্তনটা যেভাবে হয়েছে তা হলো আদিযুগের কোনো গুহাবাসীর কোনো কর্কশ এককসঙ্গীত থেকে যৌথসঙ্গীত, তারপর সম্মিলিত সুসমন্বিত সঙ্গীতে রূপান্তরিত হওয়া, যাকে সাধারণত প্রগতিশীলতার বিজয় বলে ধারণা করা হয়, যদিও বাস্তবে সেটা হলো বর্বরদের বিজয়….” বক্তব্যের মধ্যে কোনমতে এটুকুই ধরতে পারলাম স্মৃতি হাতড়ানোর ফাঁকে। 

...তার মুখটা আমার মুখের উপর নেমে এসেছিল অভিকর্ষের টানে, সেখানে কিছুটা পবিত্রতা আর কিছুটা ক্রুরতা মেশানো একটি বালকের হাসি... আনন্দের বদলে ব্যথায় কুঁচকে থাকা মুখে ভেসে আছে কয়েকটি ঘামের ফোঁটা...ব্লাউসের একটা বোতাম ছিঁড়ে গেল...। 

বক্তব্য শেষ হলে সবাই উঠে দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে এমনভাবে তাকে অভিনন্দন জানালো, যেন সে একজন কিন্নরকণ্ঠী অপেরা গায়িকা। এরই ভেতর কিছু লোক তার টেবিলের কাছে গিয়ে ভিড় জমালো। অটোগ্রাফ প্রার্থীদের স্বাক্ষর দেবার জন্য সে তার পকেট থেকে যে কলমটি বের করলো স্পট লাইটের আলোয় সেটা ঝকমক করে উঠলো। সে বইয়ের উপর ঝুঁকে স্বাক্ষর দেয়া শুরু করলো। 

আমি বেরিয়ে এলাম অনুষ্ঠানস্থল ছেড়ে। হোটেলের দিকে দ্রুত পা চালালাম। প্রবল হতাশার আবর্তে নিমজ্জিত হয়ে আমার নিঃসঙ্গতা যেন দ্বিগুন, তিনগুন, বহুগুন বেড়ে গেল। কোথাও কোন আশা দেখছি না। আমি আসলে কিছুই বদলাতে পারি না। আমার তো সব আছে তবু তার জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিতে পারি না কেন? কেন এতসব পেয়েও সন্তুষ্ট হতে পারি না। কেন যা নেই তার জন্য এত হাহাকার জেগে থাকে সবসময়? মানব হৃদয়ের এই অতৃপ্তির উৎস কী? 

হোটেল রিসেপশন ডেস্কে কেউ ছিলো না। টাটকা কেক তৈরির গন্ধে গোটা হোটেলটি যেন ম ম করছে। রিসেপশনিস্টের জন্য আমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরও তার পাত্তা মিললো না। সম্ভবত সবাই ঝেটিয়ে লেখক মহাশয়ের কথামৃত পানের উদ্দেশ্যে থিয়েটার হলে গেছে, নিজের রুমে যাবার জন্য চাবিটি তো চাই আমার নাকি! কি আর করা ভেবে নিজেই চাবি ঝুলতে থাকা বোর্ড থেকে নিজের রুমের নিদির্ষ্ট চাবিটা তুলে নিতে গিয়ে কি যে হয়ে গেলো ভেতরে নিজেও বুঝলাম না, রোমান সংখ্যায় লেখা ‘এক’ এর নীচে ঝোলানো চাবিটা তুলে নিলাম নিঃশব্দে। ওরা এমন অসর্তক হলো কেমন করে! একজন বিশিষ্ট লোকের রুমের চাবি এভাবে ঝুলিয়ে রাখে কোন বুদ্ধিতে! যাকগে! চারপাশটায় নজর বুলিয়ে আমি চোরের মতো সিঁড়িতে উঠলাম। 

খুব সাবধানে স্যুইট রুমের দরজাটা খুললাম। আলো জ্বালানোর কোনো প্রয়োজন হলো না, বাইরের ঝকঝকে সূর্যের উদ্দাম আলোতে পুরো ঘরটাই ভেসে যাচ্ছিলো। রুমের সাথে বিশাল একটা ব্যালকনি, দৃষ্টিনন্দন, বিশেষভাবে ভাঁজ খেলানো দামী কাপড়ের পর্দা প্রায় সিলিং থেকে মেঝে স্পর্শ করে ঝুলছে, ঘরের সাথে মানানসই সুবিশাল একটা বিছানা। দেখেই বুঝতে পারলাম বাক্সপেটরা খোলার সময়ও পায়নি সে। সুটকেসটা খোলা অবস্হায় বিছানায় পড়ে আছে। সদ্য প্রকাশিত বইয়ের তিনখানা কপি দেখা যাচ্ছে পাশেই, একদম আনকোরা,, সম্ভবত আনকাট। আরাম চেয়ারের উপরে একটা ভেজা তুলতুলে তোয়ালে পড়ে আছে, সম্ভবত বিশেষ অথিতিটির আগমন উপলক্ষে হোটেল কর্তৃপক্ষ এই দামী এবং আরামদায়ক বস্তুটি আমদানি করেছে। খুব সন্তর্পণে তোয়ালেটা স্পর্শ করলাম। পাশেই বিশাল বাথরুম। জানালার নীচে স্নান করার স্থান, সাথে প্রুশিয়ান পেতলের তৈরী কল। একপাশে হাতমুখ ধোবার একটা বেসিন। সেই বেসিনে রাখা আছে সেই পুরোনো কাঠের বাক্সটা, যাতে দাড়িকামানোর সাবান থাকতো। 

অবিশ্বাস্য! এত দিন ধরে সে একই সাবানদানী ব্যবহার করছে নাকি! এটা কীভাবে সম্ভব, ভেবে পেলাম না। সাবানদানীটা তুলে নাকের কাছে নিয়ে শুঁকলাম- সেই পরিচিত গন্ধ! আমি ভেবেছিলাম এই সাবানের সুগন্ধ আমার উপর এখনো প্রভাব বিস্তার করে। ওহ, এই সাবানটি হন্যে হয়ে কতো যে খুঁজে মরেছিলাম একসময়। খুঁজে না পেয়ে এমন হতাশ হয়েছিলাম। শেভিং ব্রাশটা একটু স্যাঁতসেঁতে, অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে সে নিশ্চয়ই শেভ করেছে। আঁশ দুমড়ে যাওয়া টুথব্রাশটা শুকনো পড়ে আছে পাশেই। বাথরুমের মোজায়েক মেঝেতে কালো একজোড়া পরিত্যাক্ত মোজা। বাথটাবের কিনারে বসে পড়ে আমি অদ্ভুত এক ভাবনায় আচ্ছন্ন হলাম। তাকে যথার্থভাবে ভালোবাসার জন্য আমাকে তার মতো হতে হবে। আমাকে তার জায়গায় বসাতে হবে। তাহলে তার শরীরটাকে নিজের মতো করে আদর করা যাবে, যে নিজেকে যতটা যত্ন করতে পারে তার চেয়ে অনেক ভালোভাবে যত্ন করা যাবে। যদি আমরা দুজন একসঙ্গে থাকতাম, তাহলে এটা সম্ভব ছিলো। সে তার মতো লেখালেখি চালিয়ে যেতো যদি এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়, আর আমি তার যত্ন নিতাম। এতে কোন পাপ নেই, কোন ব্যত্যয় নেই, নেই কোন বাধ্যবাধকতা। এটা কেবল নিজের প্রতি নিজের নির্দোষ ভালোবাসা, যা বাথরুমের চার দেয়ালের নিস্তব্ধতার মধ্যে সীমাবদ্ধ। নিজের শরীরে নিজের স্পর্শটা তো আসলে আদর নয়, এটা ঠিক প্রেমও নয়, এটা বড়জোর ত্বকের উপযোগী সেরা সাবানটি আবিষ্কার। আমি ভাবছিলাম, আমি তার শরীরের প্রতিটি সেন্টিমিটার সম্পর্কে জানি। আমি তার মুখের ভেতরটাকে তার জিহ্বার মতো জানি, তার প্রতিটি দাঁতের আকৃতি আমি চিনি, তার গায়ের ঘ্রাণ আর কারো মতন নয়, এটা শুধু আমারই। আমিই তাকে শিশুর মতো আগলে রাখবো। 

নীচ থেকে ভেসে আসা শব্দ পেয়ে আমি প্রায় দৌঁড়ে রুম থেকে বেরিয়ে নিজের ফ্লোরে চলে আসি। 

ডাইনিং হলের দেয়ালে হেলান দিয়ে আমি যখন হোটেলের বিল চুকিয়ে দিচ্ছিলাম, যখন সবাই অনুষ্ঠান থেকে ফিরে আসে। সে কারো সাথে কোনো বিষয়ে আলাপ করছিল, তার কণ্ঠস্বর ভেসে এলো আমার কানে। 

“ওই তো উনিই বিখ্যাত লেখক ‘টি’, আমার স্ত্রী ওঁর সব বই পড়েছে।” ফিসফিস করে অভ্যর্থনা ডেস্কের কর্মচারিটি বেশ গর্বের সাথে জানান দিল। 

আমি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেও আড়ষ্ট পা দুটিকে নাড়াতে পারলাম না। কেমন বোকার মতো স্হির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। যেন দম দেয়া কলের পুতুল যার হাত দুটো কেবল টাকা গোনার জন্য নড়চড় করছে। 

হোটেলের বাইরে অপেক্ষমান ক্যাবে উঠে বসার পর নিজেকে হঠাৎ কেমন নিঃস্ব মনে হলো। মনে হলো শরীরের ওজন বেড়ে যেন এক টন হয়ে গেছে, হয়ত এমনটা একটন বোঝাবাহী একটা ঘোড়াও অনুভব করে, তখন সে আর একদমই নড়তে চায় না। 

“কোথায় যাবেন ম্যাডাম?” আমাকে দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকতে দেখে ক্যাব চালকটি জিজ্ঞেস করলো। 

আমি বললাম, “স্টেশনে।” 

অ্যালেনস্টাইনের মতো শহরের সবকিছু বোধহয় স্টেশনেই শুরু হয় এবং শেষও হয় স্টেশনেই। 

--------- 

লেখক পরিচিতি: 
 পোলিশ লেখক ওলগা নভোয়া তোকারচুকের(Olga Nawoja Tokarczuk) জন্ম ১৯৬২ সালের ২৯ জানুয়ারি পোল্যাণ্ডের জিয়েলোনা গোরার নিকটবর্তী সুলেচো শহরে। ইতিহাস এবং সমাজ বিষয়ে তিনি সব সময়ই ভীষণ সচেতন। যার প্রভাব ওলগার সাহিত্যে যথেষ্টভাবে উপস্হিত। ২০১৮ সালে রচিত তাঁর ‘ফ্লাইটস’ উপন্যাসের জন্য তিনি ম্যান বুকার আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন। একই বছরে সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতির জন্যে ওলগা তোকাচুক নোবেল পান। মনোবিজ্ঞানী হিসেবে তিনি যতটা পরিচিত তারচে’ ঢের বেশি পরিচিত একজন অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে। নিজের দেশে তিনি একজন প্রথম শ্রেণির সাহিত্যিক হিসেবে পাঠকের পছন্দের তালিকায় রয়েছেন। 



1 টি মন্তব্য: