শনিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২০

অবনী ধর'এর স্মৃতিকথা

আমার দুঃখী মা 

ফরিদপুর পাঙ্গাশিয়া গ্রামে আমার মামাবাড়ি। সেখানেই আমার জন্ম। মামাবাড়ি থেকে দশ মাইল দূরে আমার বাবা আর ঠাকুমা থাকত! মা মাঝে-মাঝে সেখানে যেত। আমার জন্ম হবার পর থেকেই বেশ কয়েক বছর মা অসুস্থ হয়েছিল। দিদিমাই আমার দেখাশুনা করত। ঠাকুমার এক জা থাকত মধুপুরে। সে মাসে মাসে কিছু টাকা পাঠাত। তাই দিয়ে বাবা আর ঠাকুমার চলে যেত। বাবা জীবনে কখনও চাকরি করে দেখেনি। দিনরাত বাইরে বাইরেই কাটাত। মাসে দু’দিনও, মার পাশে শুতো না। ঠাকুমার কথা খুব শুনতো। মাঝে মাঝে মাকে মারধরও দিত। মা কখনও আধপেটার বেশি খেতে পেত না। খেতে বসে মা মাঝে মাঝে খাবারের পরিমাণ দেখে কেঁদে ফেলত। বাবার পাশে যদি কখনও মা শুতো তাহলে ঠাকুমা মশারির কাছে এসে উঁকি মেরে দেখত—আর বিড় বিড় করে গালাগালি দিত। মাকে আলাদা বিছানা পেতে শুতে বলত।

একদিন রাতে বাবা বাড়ি ছিল না। মশারির ভেতর থেকে মা দেখতে পেল, ঠাকুমা লুকিয়ে লুকিয়ে ভাত খাচ্ছে। সামলাতে না পেরে মা বলতে শুরু করল—‘ভগবান সইবে না। আমাকে কষ্ট দিলেন, একদিন এর শাস্তি পাবেন।’ আবার বলল-‘ছি ছি, লোকে শুনলে কী বলবে?’ ঠাকুমা তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে মায়ের কাছে এল। আদর করে মাকে ডাকল—‘ও বৌ-বৌ, দুটো ভাত খাবে নাকি?’ মা কোনো কথা বলল না। মায়ের পিঠে হাত বুলোতে বুলোতে ঠাকুমা বলল—‘শাশুড়িরা দু'কথা বললে তাতে রাগ করতে নেই।' ঠাকুমার এই সব কথায় গলে গিয়ে মা হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল। পা জড়িয়ে ঠাকুমার কাছে ক্ষমা চাইল। তারপর মাকে সঙ্গে নিয়ে ঠাকুমা খেতে বসল। 

পাশের এক গ্রামে কোনো ধোপার মেয়ের সঙ্গে বাবার ভাব ছিল। সেখানে সে রাত কাটাত। মা জানত। ঠাকুমা কোনোদিন আপত্তি করেনি। হঠাৎ রটে গেল—বাবা নিরুদ্দেশ। সংসার ত্যাগ করে নাকি বৈষ্ণব হয়ে গেছে। এদিকে সেই ধোপার মেয়েটিকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। 

মা মামাবাড়িতে চলে এল। আমার তখন বয়স তিন বছর। অন্যের মুখে বাবা ডাক শুনে আমিও বাবার কথা ভাবতাম। আত্মীয়-স্বজনেরা বলত—তোর বাবা সাধু হয়ে চলে গেছে, আর ফিরবে না। এখানেও মামির সঙ্গে মার বনত না। দু'জনের মধ্যে ঝগড়াঝাটি লেগেই থাকত। মামি মাঝে মাঝে রাগ করে বাপের বাড়ি চলে যেত। তখন মা আর দিদিমাকে না খেয়েই থাকতে হত। ভাড়ার ঘরের চাবি থাকত মামির কাছে। দিদিমা আমাকে প্রায়ই লুকিয়ে খাওয়াত। একদিন আমার জন্য মাছ চুরি করতে গিয়ে মামির হাতে ধরা পড়ল। আর যায় কোথায়? একেবারে উনুনের মধ্যে ঠেসে ধরে বুড়ির নাম ভুলিয়ে দিল। আর একদিন—কি নিয়ে যেন মায়ের সঙ্গে মামির ঝগড়া বেঁধে গেল। মাকে চিৎ করে ফেলে বুকের উপর পা দিয়ে পাড়াতে লাগল। 

‘মেরে ফেলল, মেরে ফেলল, ধরো ধরো' বলে মা চিৎকার করতে লাগল। পাড়ার কয়েকজন ব্যাটাছেলে এসে মামিকে থামাল। দিদিমা তখন চিৎকার করে কাদছে। আমি ভয়ে আর কাঁদিনি। বারান্দায় দু'হাত দিয়ে একটা খুঁটি জড়িয়ে ধরে নুনু ঠেকিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। 

মামা তখন কলকাতায় সামান্য মাইনেয় চাকরি করে। দু'মাসে ন'মাসে একবার বাড়ি আসত। মামি এক চিঠি লিখল--‘এক্ষুনি তোমার বোনকে সরাও, নইলে আমি গলায় দড়ি দেব।' মামা চিঠি পেয়েই বাড়ি চলে এল। সেই সময় মাকে মধুপুরে নিয়ে যাবার জন্য ঠাকুমার জা এক চিঠি লিখল। আমিও মায়ের সঙ্গে চলে গেলাম। 

মধুপুর। এখানে ভাতের কষ্ট ছিল না। ঠাকুমার জাকে আমি বুড়োমা বলে ডাকতাম। বুড়োমা ঘরের দরজা বন্ধ করে দুধ, ঘি দিয়ে নানা রকমের খাবার বানাত আর একা একা বসে খেত। মাঝে মাঝে মা চুরি করে এনে আমায় দিত। বুড়োমা দু’একদিন মাকে একটু দিত। মাসের মধ্যে কুড়িদিনই মার সঙ্গে বুড়োমা কথা বলত না। অনেক করে হাতে পায়ে ধরে মা ক্ষমা চাইত। তারপর কথা বলত। 

বুড়োমার আড়ালে মা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদত। আর ধরা গলায় বলত—'তুই বড়ো হয়ে চাকরি করে আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাবি—যাবি তো?' ‘হ মা'—বলে আমি মায়ের চোখ মুছিয়ে দিতাম। 


তুমি বড়ো ভাগ্যবান হে 

সেদিন আমি তিন নম্বর খালাসিদের লাইনে দাঁড়িয়েছি। মুখে পাইপ লাগিয়ে লম্বা রোগা এক সাহেব এল। ঘুরে ঘুরে সকলের নলি দেখছে। যাকে পছন্দ হচ্ছে তার নলি নিয়ে সাহেবের সঙ্গের বাবুর হাতে দিয়ে দিচ্ছে। সকলেরই মুখ খুব শুকনো। সকলের মুখ চোখ সাহেবের দিকে, করুণ। যদি সাহেব দয়া করে একবার নলিটা নিয়ে ফেলে। সাহেব ঘুরতে ঘুরতে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। আমার হাত পা কাঁপছে। সাহেবের দিকে সোজা চোখ ফেলে তাকাতে পারছি না। ক্রমেই বুক টান করে সোজা হয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করছি। নড়াচড়া করছি না। সাহেব ইংরেজিতে আমার নাম জিজ্ঞেস করল—আমি খুব স্মার্ট হয়ে বুক ফুলিয়ে মুখ তুলে বললাম—'মাই নেম ইজ শ্রীঅবনীকুমার ধর স্যার।' ‘আই সি' বলে আমার নলিটা হাতে নিয়ে সাহেব একবার আমার ফটোটা আর একবার আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখছে আর মিচকি মিচকি হাসছে। সাহেব আবার জিজ্ঞেস করল 

'হাউ ওল্ড ইউ?’ 

‘এইটিন ইয়ার্স স্যার।’ 

'বহুত বাচ্চা হায়...'। 

সাহেবের কথা শেষ না হতেই আমি বলে ফেললাম-- ‘নেহি সাব হাম সব কাম করনে সাকেগা।’ 

‘‘তুমি ভাগকেতো নেহি জায়গা?’ 

‘নেহি সাব, কভি নেহি ভাগেগা। আপ হামকো টেস্ট করকে দেখিয়ে।' 

সাহেব হাসি হাসি মুখে আমার নলিটা নিয়ে নিজের কাছেই রাখল, বাবুর হাতে আর দিল না। আমি বুঝতে পারলাম না আমাকে পছন্দ হলো কিনা। একবার ভাবলাম পছন্দ না হলে আর নলি নিল কেন? আবার ভাবলাম বোধ হয় অফিসে গিয়ে সাহেব বলবে যে এত ছোটো ছেলেকে কেন নলি দিয়েছ? তাহলে কি আমার নলি ক্যান্সেল হয়ে যাবে? আবার মামাবাড়ি ফিরে যেতে হবে? কেঁদে কেঁদে ভগবানকে ডাকতে ইচ্ছে করছে কিন্তু অত লোকজনের মধ্যে লজ্জায় আর কাঁদতে পারলাম না। সাহেবের লোক বাছাই করা শেষ হয়ে গেছে। সাহেব গাড়ি করে চলে গেল। সাহেবের সঙ্গের বাবুটি শুধু রইল। মেরিন হাউসে তার অনেক কাজ আছে। আমি আস্তে আস্তে বাবুটির কাছে গিয়ে ভয়ে ভয়ে মাথা চুলকে জিজ্ঞেস করলাম—‘স্যার আমার নলিটার কী হল?' বাবু আমাকে দেখে হেসে জবাব দিল—‘সাহেব তোমাকে খুব পছন্দ করেছে। তুমি বড় ভাগ্যবান হে। জাহাজে উঠতে না উঠতেই সাহেবের নজরে পড়ে গেছ। ভালো করে কাজ করবে। যে যা বলে তা শুনবে...'। একগাদা জ্ঞান দিতে শুরু করল বাবুটি। আমি তখন আর আমার মধ্যে নেই। বুকটা যেন ফেটে যাবে। আনন্দের চোটে চোখে জল এসে গেল। আঃ--মামাবাড়ি আর ফিরে যেতে হবে না। বাঁচলাম। 

আমি যে জাহাজে সাইন করব সে জাহাজের নাম ‘ক্ল্যান ম্যাকলিলান'। জাহাজ কোচিন পোর্টে আছে। সেখান থেকেই জাহাজে উঠতে হবে। বাবুর পেছন পেছন একটা হলঘরে গিয়ে বসলাম। সেখানে আরও অনেক খালাসি জটলা করছে। তাদের নানান কথার টুকরো আমার কানে ভেসে এল—‘আইজগোর ডাক্তারটা হারামি আছে। হালা ঘুষ খায়। ঘুষ না দিলে ডাক্তারি পাশ করাইবো না।' 

‘কত কইরা নিবোরে বো?’ 

‘পাউজগা টেহার কম না।’ 

‘দ্যাহো ক্যাডা ক্যাডা রাজি আছে। হ্যাগোরথাই একলগে টেহা লইয়া দিয়া অহিগ্যা।' 

‘চুপ থাকে মিঞা, টেহা দিমু কিয়ের লইগ্যা, চঁইয়ার মাথা কি ফোলসে?...দিলে হালা মাগীরেই দিয়া হারা রাইত থাইক্যা আমু। ডাক্তারের দিমু কিয়ের লইগ্যা ?’ 

‘তোমাগোরে যদি চুলকায় তয় যাও হালা গোয়া দিয়া আহোগিয়া...ধোনে হালা কড়া পইড়া গেল কোন হালারে এউগ্যা পয়সা দিলাম না, আইজ হালা ডাক্তারের দ্যান লাগবো টেহা ?'... 

‘আরে থোও ফ্যালাইয়া, হালা ডাক্তারের গুষ্ঠি কিলাই।'... 

এক সময় ডাক পড়ল। কেউ কেউ ঘন ঘন ডাবের জল খেয়ে নিচ্ছে। কেউ পকেটে ভারী ভারী বাটখাড়া পুরছে। কেউ ‘আল্লা আল্লা’ বলে ডাকছে। সকলকে একটা ঘরে লাইন দিয়ে দাঁড় করানো হলো। একজন চাপরাসি এসে প্যান্ট, জামা, গেঞ্জি, জাঙ্গিয়া সব খুলে দাঁড়াতে বলে গেল। সবাই চটপট করে খুলে ফেলল। সকলের দেখা দেখি আমিও সব খুলেই দাঁড়ালাম। কেউ কারো দিকে সোজাসুজি দেখছে না। সবাই সামনের দিকে বীর জওয়ানের মতো তাকিয়ে আছে। আমার ভীষণ হাসি পাচ্ছিল। একটু বাদে আমি আড় চোখে অন্যদের বাঁড়া দেখতে লাগলাম। সকলেরই সাইজ বেশ বড়ো। সবারই টুপি ওল্টানো, বাঁ দিকে কাত হয়ে আছে। কারোর কুচকুচে কালো, কারোর তামাটে, কারোর মোটা, কারোর সরু লিকলিকে। ডগার দিকটা এট্টু লাল, সকলেরই বাল কামান। আমার নুনুটা সোজা হয়েই কুঁকড়ে আছে। সবে বাল গজিয়েছে বলে ট্রেনিং সিপের ডাক্তার বলে দিয়েছিল—‘আভি তোমহারা বাল কাটনে কা জরুরৎ নেহি।’ তাই কামাইনি। স্টেথিসকোপ গলায় ঝুলিয়ে মোটা বেঁটে মাথায় টাক পড়া এক হোঁৎকা ডাক্তার এলো। সবাইকে এক নজরে দেখে নিল। হঠাৎ আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। আমি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। নুনুটা আরও ভেতরে চলে গেছে। মনে হল বিচি দুটো ওঠানামা করছে। ডাক্তারবাবু আমাকে লাইন থেকে ডেকে তার ঘরে নিয়ে গেল। পেছন ফিরে উবু হয়ে দাঁড়াতে বলল। আমি সেইভাবেই দাঁড়ালাম। একটা টর্চলাইট দিয়ে আমার পোঁদের গর্তের মধ্যে কী যেন দেখল বার বার। তারপর আবার সামনের দিকে ফিরে সোজা হয়ে দাঁড়াতে বলল। দাঁড়ালাম। বিচির তলায় হাত রেখে জোরে জোরে কাশতে বলল। জোরে জোরে, আহ আহ, করে কয়েকবার কাশলাম। তারপর নুনুটা ধরে দু-তিনবার হাত মারার কায়দায় নাড়ানাড়ি করে এক হ্যাঁচকা টান দিল। প্রাণটা বেরিয়ে যাবার জোগাড়। কানের ছেঁদা, গলার ছেঁদা, চোখ, বুক, পেট, পিঠ টিপে টিপে এক এক করে সব দেখে বলল—‘যাও ফিট’। আমি গম্ভীর হয়ে নুনুটা নাচাতে নাচাতে ডাক্তারের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে জামা প্যান্ট পরে ফেললাম। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ডাক্তারি পরীক্ষায় আমার ফেল করার কোন চান্স নেই তা সবাই জানত। একজন লাইন থেকে আস্তে আমায় বলল—‘যাও তোমার হইয়া গ্যাছে, বহো গিয়া।’ বাইরে এসে একটা বেঞ্চিতে বসে পড়লাম। একে একে সকলেরই ডাক্তারি পরীক্ষা হয়ে গেল। কেউই ফেল করল নয়। কোম্পানির বাবুটি এল। সবাইকে ডেকে নিয়ে আর একটি হল ঘরে ঢুকল। আবার লাইন দিয়ে সবাই দাঁড়ালাম। একজন একজন করে নাম ডাকছে আর দু'হাতের বুড়ো আঙুলের টিপ সই নিয়ে এক মাসের যার যা মাইনে আগাম দিয়ে জাহাজে ওঠার তারিখ বলে দিচ্ছে। আমারও ডাক হল। গেলাম। দুই বুড়ো আঙুলের টিপ সই দিয়ে একশ টাকা পেলাম। টাকাটা খুব সাবধানে রুমালে বেঁধে পকেটে রেখে দিলাম। 


লাথি মারি কলকাতাকে 

মেরিন হাউস থেকে গঙ্গার পাড় ধরে ট্যাকসি করে সোজা ধর্মতলায়। সাজানো জামাকাপড়ের দোকানগুলি ঘুরে ঘুরে দেখছি। কত কী যে কিনতে ইচ্ছে হচ্ছে। কিন্তু খুব দরকারি জিনিসপত্র ছাড়া আর বেশি কিছু কেনা যাবে না। ঠিক করলাম মাকে কিছু টাকা পাঠাব! ঘুরতে ঘুরতে একটা চামড়ার সুটকেসের দোকানে ঢুকলাম। পঁচিশ টাকা দিয়ে একটা সুটকেস কিনে ফেললাম। বিদেশে টিনের বাক্স চলে না। সুটকেস কেনার পর হিসেব করে দেখলাম, টাকায় কুলোবে না। অত দাম দিয়ে সুটকেস কেনাটা ঠিক হয়নি। আবার দোকানে ফিরে গিয়ে বললাম—'ভাই, বাড়িতে খুব গালাগালি করছে। আমাকে টিনের বাক্স কিনতে বলেছিল, আমি ভুল করে চামড়ার সুটকেস কিনে ফেলেছি। এটা ফেরৎ নিয়ে নিন।’ দোকানদার অসন্তুষ্ট হয়ে আমার দিকে কুঁচকে তাকাল। অবশ্য সুটকেস ফেরৎ নিয়ে আমায় টাকাটা ফিরিয়ে দিল। আমি ওখান থেকে আর কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা বাসে চেপে গোপালনগর রোডের কাছে একটা চোরাবাজারে গেলাম। সেখানে হরেক রকমের পুরানো মাল পাওয়া যায়। বাজারের মধ্যে ঢুকে চামড়ার সুটকেস দেখতে লাগলাম। অনেক বাছাবাছির পর একটা পছন্দ হলো। পনের টাকা চেয়েছিল। বারো টাকা দিয়ে কিনে ফেললাম। ওখান থেকে চামড়ার সুটকেসটা নিয়ে চলে গেলাম খিদিরপুর। জাহাজিদের পুরানো পোশাক কিনতে। সেখান থেকে বেছে বেছে একটা পুরানো কোট, একটা প্যান্ট, একটা ফুলহাতা উলের সোয়েটার, মোজা, মাথার টুপি কিনলাম। তারপর বাইরের দোকান থেকে একটা গেঞ্জি, তোয়ালে, সাবান, টুথপেস্ট, টুথব্রাস, আয়না চিরুনি, মাথার তেল, একটা নোট বুক, পেন, কালি, চিঠি লেখার প্যাড...একে একে সবই কিনে ফেললাম। সুটকেস বোঝাই হয়ে গেল। এইসব কেনাকাটি করতে প্রায় পঞ্চাশ টাকার বেশি খরচ হয়ে গেছে। মাকে কুড়ি টাকা পাঠাব ঠিক করলাম। এখনও বিছানা বালিশ কিনতে হবে। জাহাজে শুধু একটা গদি আর দু'টো কম্বল ছাড়া আর কিছুই দেয় না। খিদিরপুরেই এক দোকানে একটা তোষক আর একটা বালিশ তৈরি করতে দিলাম। এতে পনেরো টাকা লাগবে। মশারি কিনতে হবে না। ট্রেনিংশিপ থেকে বলে দিয়েছিল—জাহাজে মশা মাছি নেই। একটিন লজেন্সও কিনলাম। মাঝে মাঝে জাহাজে খাব। কয়েকটা খাম পোস্টকার্ড কিনে ফেললাম। মাকে, মামাকে কয়েকজন বন্ধুদের যাবার আগে চিঠি লিখব। কেনাকাটি প্রায় সবই হলে একটা ট্যাকসি করে সোজা ট্রেনিং শিপে পৌছলাম। তখন সন্ধ্যা হয় হয়। ট্রেনিং শিপে উঠে প্রথমেই চিফ অফিসারকে জাহাজে সাইন করার কথা জানালাম। এখনও তিনদিন ট্রেনিং শিপে আমাকে থাকতে হবে তাও বললাম। চিফ অফিসার আমার পিঠ চাপড়ে বলল—‘ভেরি গুড় ভেরি গুড। ঠিকসে জাহাজমে কাম করেগা। বদমাশি নেহি করেগা–ঠিক হ্যায়।' ‘ইয়েস স্যার' বলে এক সেলুট ঠুকে ট্রেনিং শিপে আমাদের থাকার জায়গায় সুটকেসটা নিয়ে রেখে দিলাম। ভালো করে দেখে নিলাম তালা দেয়া ঠিক আছে কিনা। তারপর মুখ হাত ধুয়ে একটা পায়জামা আর সার্ট পরে বাইরে খেতে চলে গেলাম। খেয়ে দেয়ে হোটলের পাওনা চুকিয়ে পানের দোকানে গিয়ে একটা মিষ্টি পান খেলাম। এক প্যাকেট কাঁচি সিগারেট আর একটা দেশলাই কিনে মেজাজে পান চিবুতে চিবুতে ডকের মধ্যে এসে জেটির উপর বসে সিগারেট টানতে লাগলাম। ডকের ভেতর বিভিন্ন দেশের জাহাজ বাধা। বড়ো বড়ো ক্রেনে করে জাহাজ থেকে মাল খালাস করছে। আবার বোঝাই করছে। আমিও ওই রকম জাহাজে চড়ে লন্ডন যাব। কত দেশ বিদেশ ঘুরব। ইংরেজিতে কথা বলব। সুট-টাই পরব। যখন দেশে ফিরব, মামা-মামি দেখে ট্যারা হয়ে যাবে। এবার জাহাজ থেকে ঘুরে এসেই আলাদা বাসা ভাড়া করে মাকে নিয়ে থাকব। কলকাতায়। মামা-মামি দেখে তখন জ্বলে পুড়ে মরবে। আফসোস করবে আর ভাববে—কেন আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছিল। 

জেটি থেকে উঠে পড়লাম। ট্রেনিং শিপে শোবার জায়গায় গিয়ে মাকে মামাকে আর শুনুকে চিঠি লিখলাম। মাকে লিখলাম—‘মা, আমি বিলেতে যাইতেছি। আমার জন্য চিন্তা করিও না। তোমাকে কুড়িটা টাকা পাঠাইলাম। ইচ্ছেমতো খরচ করিবে। বিলেত হইতে ফিরিয়া আসিয়া মধুপুর হইতে তোমায় লইয়া আসিব। পরে জাহাজের ঠিকানা দিয়ে চিঠি দিব।' 

মামাকে লিখলাম—‘আমি ইংলন্ডে যাইতেছি। সেখান হইতে আফ্রিকা তারপর অস্ট্রেলিয়া ঘুরিয়া ইন্ডিয়ায় ফিরিব। দেশে ফিরিতে বছরখানেক লাগিবে। মাকে টাকা পাঠাইয়াছি।’ 

শুনুকে লিখলাম—‘আমি ইংলন্ডে চলিয়া যাইতেছি। আবার কবে দেখা হইবে জানি না। পরশু সকাল আটটায় হাওড়া স্টেশনে আসিলে আমার সঙ্গে দেখা হইবে। তোর অপেক্ষায় থাকিব।’ 

চিঠিপত্র সব লিখে সুটকেসটা খুলে ভালো করে জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখলাম। একটা হোলডল কিনতে হবে। আর একটা ইংরেজি ওয়ার্ড বুকও কিনে নিয়ে যাব। জাহাজে ছুটির সময় ওয়ার্ডবুক পড়ে ইংরেজিতে কথা বলা শিখব। রাত দশটার মধ্যে ট্রেনিং শিপে শুয়ে পড়ার নিয়ম। সুটকেশে ভালো করে তালা লাগিয়ে শুয়ে পড়লাম। ভোর ছটার আগে ওঠার নিয়ম। আগেই উঠলাম। নতুন কেনা টুথব্রাস দিয়ে দাঁত মাজতে কীরকম মায়া লাগছে। ঠিক করলাম জাহাজে উঠে নতুন ব্রাস দিয়ে দাঁত মাজব। একদিন আগের মতোই আঙ্গুল দিয়ে মাজি। মুখ হাত ধুয়ে বাইরে গেলাম। মামলেট টোস্ট, চা খেয়ে ট্রেনিং শিপে ফিরে এলাম। স্নান করে প্যান্ট সার্ট পরে বেরিয়ে চলে এলাম ধর্মতলার দিকে। হোলডল দর করলাম। সাত-আট টাকায় পাওয়া যায়। ঠিক করলাম বিকেলে ফেরার পথে কিনব। পোস্টঅফিসে গিয়ে চিঠিগুলি ডাকবাঙ্গে ফেলে দিয়ে মাকে কুড়ি টাকা মনিওর্ডার করলাম। ধর্মতলা স্ট্রিটের ফুটপাত ধরে হাঁটছি। আর এ দোকান সে দোকান ঘুরে ঘুরে দেখছি। বারোটা বাজে। খুব খিদে পেয়েছে। একটা হোটেলে ঢুকে মুরগির মাংস আর ভাত খেলাম। এদিক ওদিক আর একটু ঘোরাঘুরি করে হঠাৎ টিকিট কেটে মেট্রোতে ঢুকে পড়লাম। কী বই দেখেছিলাম মনে নেই তবে বেদম মারামারি, দৌড়াদৌড়ি, আর পিস্তলের গুলি ছোঁড়াছুড়ি এই-ই মনে আছে। 

সিনেমা দেখে বেরিয়ে এসে হোলডল কিনে সোজা খিদিরপুর। সেখান থেকে বিছানা নিয়ে হোলডলে পুরে ট্রেনিং শিপে ফিরলাম। 

পরদিন সকালে উঠে একবার ভাবলাম—মামাবাড়ি গিয়ে দেখা করে আসি। আবার ভাবলাম—না, চিঠি লিখে দিয়েছি, এমন যাওয়াটা খারাপ দেখায়। একবার ভাবলাম—পাড়ায় গিয়ে ঘুরে আসি। কিন্তু মামার বাড়ির কেউ যদি দেখে ফেলে? যাগগে। লাথিমারি কলকাতাকে। কলকাতায় আমার কে আছে? আজকের দিনটা কাটাতে পারলেই আর কোনো চিন্তা নেই। কয়েক দিন ট্রেনে কাটবে। তারপর জাহাজ সমুদ্র আর সমুদ্রের জল। কোচিন থেকে জাহাজ ছেড়ে বাইশ দিন পর লন্ডন পোর্টে পৌঁছবে। লন্ডনে গিয়ে কী কী কিনব ভাবতে লাগলাম। আগে একটা সুট আর টাই তো কিনবোই তারপর একটা ঘড়ি, একটা ক্যামেরা এই সব কিনে পরে বাকিটা। ভাবতে ভাবতে দিনটা কেটে গেল। রাতও ফুরোল। ভোরবেলায় উঠেই ভগবানকে ভক্তিভরে প্রণাম করলাম। মাকে মনে মনে প্রণাম করে আশীর্বাদ চাইলাম। বিছানা সুটকেস বেঁধে স্নান করে একে একে ট্রেনিং শিপের সমস্ত অফিসারদের সঙ্গে দেখা করলাম। কাল্টুদার সঙ্গে দেখা করে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলাম। 

তারপর দু'হাতে সুটকেস আর হোলডল ঝুলিয়ে বেরিয়ে গিয়ে একটা ট্যাকসি ধরে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছালাম। তখন সাতটা বাজে। আটটার মধ্যে পৌঁছবার কথা বলে দিয়েছিল। আর তিন চার জন আমার আগেই এসে পৌঁছেছে। ওদের জিনিসপত্তরের সঙ্গে আমার সুটকেস, আর হোলড়ল রেখে চা খেতে গেলাম। একে একে সকলেই এসে গেছে। কোম্পানির বাবুও এসেছে। সকলের মালপত্র ওজন করল। কুলিরা মাল নিয়ে প্লাটফর্মে চলে গেল। বাবু সকলকে ডেকে লাইন করে দাঁড়াতে বলল। এক একজনের রোজ তিন টাকা হিসেবে তিন দিনের খোরাকি বাবদ ন'টাকা দিয়ে বলল—‘সবাই বারো নম্বর প্ল্যাটফর্ম গিয়ে দাঁড়াও।' আমার জন্য কেউ আসছে কিনা দেখবার জন্য এবার বাইরে গেলাম। প্ল্যাটফর্মে গাড়ি এসে গেছে। কুলিরা আমাদের জিনিসপত্র সব লাগেজ ভ্যানে তুলে দিয়েছে। বাবু এসে আমাদের দুখানা রিজার্ভ করা বগি দেখিয়ে দিল। স্টল থেকে একটা খবরের কাগজ কিনলাম। গাড়ি ছাড়তে দেরি আছে। একটা সিগারেট ধরিয়ে প্ল্যাটফর্মে ঘুরছি আর দেখছি কেউ আসে কিনা। হঠাৎ চেয়ে দেখি ছোটো দুই মামাতো ভাইকে সঙ্গে নিয়ে মামা হন হন করে এগিয়ে আসছে। মামাকে দেখে আনন্দে বুক ভরে উঠল। ছুটে গিয়ে মামাতো ভাই দুজনের হাত ধরলাম। মামা জিজ্ঞেস করল--‘কোন কামরায় উঠেছিস?' মামাকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের কামরাটা দেখালাম। মামা কামরায় ভেতর উঠে সকলের দিকে একবার চেয়ে দেখল। তারপর কেমন ঘাবড়ে গিয়ে একে ওকে ডেকে বলতে শুরু করল—'আপনারা একটু ওকে দেখবেন। একেবারেই ছেলেমানুষ। একলা কোনোদিন বাড়ির বাইরে যায়নি।’ 

আমাকে ডেকে বলল—‘খুব সাবধানে থাকবি। যেখানেই যাস চিঠি দিবি।' গাড়ি ছাড়ার সময় হয়ে গেছে। মামার আড়ালে দুই মামাতো ভাইয়ের হাতে একটা করে টাকা গুঁজে দিলাম। গার্ডের হুইসেল পড়ল। মামাকে প্রণাম করে গাড়িতে উঠে পড়লাম। গাড়ি ছেড়ে দিল। মামার দু'চোখ বেয়ে জল ঝরছে। আর আমার দিকে চেয়ে ক্রমাগত হাত নাড়াচ্ছে। আমিও যতদূর পর্যন্ত দেখা যায় রুমাল নাড়িয়ে গেলাম। তারপর এক সময় ওই রুমাল দিয়েই চোখ মুছে ফেললাম। 



আমার বৈষ্ণব বাবা 

কলকাতা থেকে তিরিশ মাইল দূরে একটা রিফিউজি কলোনিতে মাকে নিয়ে থাকি। বাড়ি থেকে ডেলি প্যাসেঞ্জারি করে কলকাতায় একটা মার্চেন্ট ফার্মে চাকরি করছি।। 

এক ছুটির দিন বিকেলবেলায় আমাদের বাড়ির পাশেই একটা ময়দানে জনসভা হচ্ছিল। আমি সেখানে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শুনছিলাম। হঠাৎ দেখি কলকাতা থেকে আমার এক মামাতো ভাই আমাকে হন্তদন্ত হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমি দেখেই ওকে ডাকলাম। ও হাঁপাতে হাঁপাতে। এসে বলল—‘শিগ্রি বাড়ি চল।’ আমি ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম—'কী হয়েছে?’ 

বলল--পিসেমশাই এসেছে।' 

--‘পিসেমশাই? কে পিসেমশাই?’ 

ভাই হেসে বলল-‘তোর বাবা।’ 

‘ আমার বাবা? কোত্থেকে এলো?’ 

ভাই বলল—'কলকাতার এক রাস্তা দিয়ে পিসেমশাই যাচ্ছিল। বাবা দেখতে পেয়ে ধরে নিয়ে এসেছে। তারপর আমার সঙ্গে এখানে পাঠিয়ে দিল।’ 

তাড়াতাড়ি মামাতো ভাইকে নিয়ে বাড়ি এলাম। দরজায় মা দাঁড়িয়েছিল, আমার জন্যেই অপেক্ষা করছিল। মা আমাকে দেখেই চুপি চুপি বলল—‘তোর বাবা এসেছে।’ আমি মাকে ইশারা করে বাড়ির বাইরে ডেকে নিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলাম—'তুমি ঠিক চেনোতো?' 

মা হেসে বলল—‘কী বলিস—আমি চিনবো না। যা-প্রণাম।’ 

মা ঘরে চলে গেল। মায়ের মুখখানা খুব হাসিখুসি দেখলাম। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে ভাবছি—কীভাবে গিয়ে বাবা ডাকব। 

জীবনে কখনও বাবা বলে কাউকে ডেকেছি মনে পড়ে না। জ্ঞান হবার পর থেকে কখনও বাবাকে দেখিনি। মা-ও দু'বছরের বেশি বাবার সঙ্গে ঘর করেনি। বাবা স্বার্থপরের মতো মাকে আর আমাকে ফেলে চলে গেছে। শালা এখন এসেছে বাবা মারাতে। 

ঘরে ঢুকলাম। লম্বা চওড়া বেশ মোটাসোটা চেহারা। শ্যামবর্ণ। গেরুয়া কাপড়, কপালে তিলক। মেয়েদের মতো মাথায় চুল। বৈষ্ণব বেশে একটা চেয়ারে পা ছড়িয়ে বসে আছেন আমার বৈষ্ণব বাবা। আমি সামনে এসে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বাবাকে দেখছি। বাবাও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মা আর মামাতো ভাই আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে দেখছে। 

বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করল—‘তোর চেহারা এত খারাপ কেন?’ আমি কোনো উত্তর দিলাম না। কী ভাবল জানি না। বাবা মুখ ঘুরিয়ে আবার বলল-“খুব রোগা হয়ে গেছিস। এবারও আমি কোনো উত্তর না দিয়ে ঝপ করে একটা প্রণাম করেই ভেতরের ঘরে চলে গেলাম। পাশে রান্না ঘরে দেখি--গেরুয়া কাপড় পরা মোটাগাটা তেলতেল চেহারার কালো একটি মেয়ে তরকারি কুটছে। মাকে ইশারা করে জিজ্ঞেস করলাম—‘এ আবার কে?' মা আমাকে বাইরে নিয়ে গিয়ে বলল—‘ও ওর সেবাদাসী। ওর সঙ্গেই ও এখন থাকে।' বলেই মা আমায় বলল—‘থাক, তুই কিছু ওদের বলিস না। আমার ভাগ্যে যা আছে তাই হবে।’ মা ঘরে চলে গেল। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম। ইচ্ছে করছিল--ঘাড় ধরে ওই মাগীটাকে বার করে দিই। আবার ভাবলাম—শেষে এই নিয়ে পাড়ায় একটা কেলেঙ্কারি হবে। যাগগে! 

একটা থলি হাতে নিয়ে বাজার করতে গেলাম। কিছু মিষ্টিও কিনে আনলাম। বাড়িতে বাজারের থলে রেখেই বেরিয়ে পড়লাম। রাস্তায় হাঁটছি আর ভাবছি—বাবাকে কী বলব! কিছুই ভেবে ঠিক করতে পারছি না। বাড়ি ফিরে এলাম। আমার জন্য সবাই অপেক্ষা করছিল, এক সঙ্গে খেতে বসবে বলে। আজ আবার সেবাদাসীই রান্না করছে। সে-ই আমাদের সকলকে খেতে দিল। মা এক কোনায় বসে বাবাকে আর সেবাদাসীকে একমনে দেখছিল। মাঝে মাঝে আমাকে মা ইশারায় বলছিল-“ওদের কিছু বলিস না। 

আমি মুখ গুঁজে চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছিলাম। আমার মামাতো ভাই আমার চেয়ে ছ'মাসের বড়ো, সেও আমার সঙ্গে আর কথা বলছে না। বাবাও চুপ করে বসে খাচ্ছে। হঠাৎ সেবাদাসী বলে উঠল—‘খোকাকে এবার একটা বিয়ে দিয়ে দাও।’ কেউ কোনো উত্তর দিল না। সেবাদাসীর কথা শুনে আমার মেজাজটা আরো খাট্টা হয়ে গেল। ইচ্ছে করছিল ভাত ফেলে উঠে চলে যাই। মা’র ইশারার কথা ভেবে চুপচাপ খেয়ে উঠে পড়লাম। 

বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছি। সবার খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেল। আমি ঘরে ঢুকলাম। মা ভেতরের ঘরে দুটো বিছানা করেছে আর সামনের ঘরে একটা বিছানা। ঘরে ঢুকে বাবার সামনে একটা চেয়ারে বসে পড়লাম। বাবা আমার দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে থেকে বলল—‘তুই যদি ম্যাট্রিকটা পাশ করতে পারতিস, তাহলে রেলে ঢুকিয়ে দিতে পারতাম।’ 

আমি কোনো কথা বললাম না। দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ। একটু বাদে আমি গম্ভীর হয়ে বাবাকে বললাম—‘শুনুন, এখানে যদি থাকতে চান তাহলে ওই মাথার চুল আর এই গেরুয়া ছাড়তে হবে। আমি একটা মুদি দোকান দিয়ে দেব তাই নিয়ে থাকবেন।’ বাবার মুখ চোখ কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল। কোনো উত্তর দিল না। 

আমি আর বসে থাকতে না পেরে সামনের ঘরের বিছানায় শুয়ে পড়লাম। মামাতো ভাইও আমার পাশে এসে শুলো। 

মা, বাবা আর সেবদাসী ভেতরের ঘরে শুতে গেল। ভেতরের ঘরে কে কোথায় শুলো তা আমি জানি না। 

ভোর বেলায় উঠে দেখি আমি ওঠার আগেই বাবা তার সেবাদাসীকে নিয়ে চলে গেছে। মা আমার সঙ্গে কোনো কথা বলছে না। আমি মাকে জিজ্ঞাসা করলাম—‘কী বলে গেল?' মা দেখলাম একটু ভেঙে পড়েছে। আমায় বলল—‘তোর উপর খুব রাগ করেছে।’ 

কিছুদিন বাদে ভবানীপুরে আমার এক পিসতুতো দিদির কাছে শুনলাম—বাবা আর মা খাটে শুয়েছিল আর সেবাদাসী শুয়েছিল নীচের বিছানায়৷ বাবা নাকি মাকে বলেছিল—‘তুমি ইচ্ছে করলে আমার উপর উঠে করতে পারো।’ মা নাকি বলেছিল—‘আমি ওই রকম ভাবে করতে পারি না।’

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন