শনিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২০

সিলভিনা ওকাম্পোর গল্প : কাচে লেপটে থাকা মুখ

অনুবাদ :  জয়া চৌধুরীর অনুবাদ

গত পনের বছর ধরে এমিয়ে দারখেরে র ওপর দিদিমার আমলে গড়া একটা কলোনীর দেখভাল করার দায়িত্ব ছিল। গরীব বাচ্চাদের জন্য তৈরী বাড়িটা ছিল সমুদ্রের তীরে। সেখানে অ্যাসাইলামের একটা পাশেই সবচেয়ে ওপর তলায় ছোটবেলা থেকে থাকত মেয়েটা।
প্রথম দিককার বছরগুলোয় সে দোতলাতেই থাকত। কিন্তু রাতের বেলায় কাচের জানালায় দেখতে পেত একটা জ্বলন্ত মানুষের মুখ। এক বীভৎস লাল রঙের মুখ। সে মুখ কাচে এমন লেপটে থাকত যে দেখে মনে হত শার্সির গায়ে আঁকা ছবি। সে তখন তিন তলায় গিয়ে থাকতে শুরু করল। সেই এক মুখ সেখানেও হাজির।

তারপর পাততাড়ি গুটিয়ে চারতলায় গিয়ে বসল। একই মুখ তাকে সেখানেও ধাওয়া করে গেল। বাড়ির

প্রত্যেকটা ঘরে পাল্টে পাল্টে সে থাকতে লাগল। কিন্তু প্রতিবার এক মুখই তার পিছু পিছু ঘুরতে লাগল।

এমিয়ে দারখেরে ছিল অসম্ভব সুন্দরী আর পুরুষেরাও তাকে খুব পছন্দ করত। কিন্তু এসব ঘটনায় একটা নাছোড় দুশ্চিন্তা তাঁর মাথায় জাঁকিয়ে বসে থাকত যা তার ভুরুর মাঝখানে লম্বা লম্বা ভাঁজ ফেলে দিয়েছিল। ব্যাপারটা তার সৌন্দর্য কয়েক মাত্রা কমিয়েই দিত। রাতগুলো ছিল অনিদ্রা জরজর। ঘুমের ঘোরে শুনতে পেত ছোট ছোট শিশুরা সাদা রাতপোশাক পরে ওদের কুড়িটা শোবার বিছানাওয়ালা ঘরে গান গাইছে, বড় মিষ্টি সে গানের কোরাস।

সমুদ্রতীরের সকালগুলো ছিল নির্মল ফিনফিনে। বেঢপ সাইজের সাঁতারের পোশাক পরে বাচ্চারা সেখানে চলে আসত। আর তারপর হাঁটতে গিয়ে সেসব শুদ্ধু জড়িয়ে মড়িয়ে পড়ত। এমিয়ে ভাবত – এসব মোটেও জামার দোষ নয়। বাড়ির ছাতের খোলা টেরেসে রেলিং লাগানো। সেখানে হেলান দিয়ে বসে থাকত দারখেরে। পোশাকগুলো যদি এর অর্ধেক মাপেরও হত, তাহলেও কিভাবে সেসব গায়ে জড়ালে কিম্ভূত লাগবে না সেসব বাচ্চারা জানত না। সমুদ্রে চান করানোর জন্য একজন কালোমানুষ তাদের লাইফ গার্ড থাকত। সে তাদের যন্ত্রণাদায়ক ডুবকি দেওয়াত। ওই জোর জবরদস্তির হাত থেকে কেউই ছাড়ান পেত না। যদি আদৌ কেউ পেত সে হল লাইফ গার্ড নিজে। এমিয়ে কিন্তু বাচ্চাদের কান্নার আওয়াজ শুনতে পেত না। তার মনে পড়ত তার নিজের ছোটবেলায় লাইফগার্ড দের সঙ্গে থাকার অভিজ্ঞতার কথা। 

সেইসব সকাল এখনো তার স্বপ্নকে সামুদ্রিক ঢেউয়ের নাকানচোবানিতে ভরিয়ে রেখেছে।

বিকেলে সমুদ্রের তীর যখন শুনশান ফাঁকা হয়ে যেত এমিয়ে তখন হাঁটুজলে পা ডুবিয়ে স্নান করত।

কখনসখনো সঙ্গে একটা বইও রাখত। তবে সে বই পড়ত না। স্নানের পর সমদ্রতীরেই ঘুমিয়ে পড়ত। তার বিশ্রাম নেবার জন্য দিনের ওটাই একমাত্র সময়। সে ছিল দেড়শ ছেলেমেয়ের মা। সমুদ্রতীরে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো পাওয়া সত্ত্বেও সেই ছেলেমেয়েগুলোর গায়ের রঙ ফ্যাকাশে ছিল। ডাক্তারদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী তাদের খাওয়ানো হত, তা সত্ত্বেও তারা হিস্টেরিক্যাল ছিল।

এমিয়ে দারখেরে তার নিজের রূপের জন্য যত প্রশংসা পেত সেসব বাচ্চাদের কথা ভেবে তা হুড়মুড়িয়ে ঝেড়ে ফেলল। তার কাছে আশ্রয় নিয়ে যেসব বাচ্চারা যেত তাদের কিছুটা শান্ত করল। বড় বড় ডাক্তারদের বলা সেরা পুষ্টিকর খাবারের চাইতেও বেশি খাইয়ে তাদের মোটা করে দিল। কিন্তু সেই জ্বলন্ত মানুষের মুখ তার পেছন ছাড়ল না। জানলার মধ্য দিয়ে উঁকি মারতেই লাগল ততদিন পর্যন্ত, যতদিনে না সেটা একটা ভয়ংকর ঘটনায় রূপান্তরিত হয়। একদিন রাতের ঘটনা। সে রাতে সে এক মিনিটের জন্যও ঘুমায় নি। মাথাটাও অদৃশ্য ছিল। সেটাকে সে পর্দার পেছনে খুঁজল। ব্যাপার দেখে প্রথমে জেগে রইল, তারপর ভাবল এবার সে শান্তিতে ঘুমোতে পারবে। মনে হচ্ছে মুখটা বরাবরকার মত অদৃশ্য হল। পরদিন, বাচ্চাদের ডরমিটরিতে একটা অদ্ভুত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। তারা প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমিয়ে। দারখেরে ভাবছিল স্বপ্ন দেখছে – সামনের বিল্ডিং য়ে বুড়োদের অ্যাসাইলাম চলে।



ওখান থেকে একটা লোক বেরিয়ে নীল সাঁতারের পোশাক পরে সমুদ্রতীরে প্যারেড করে যাচ্ছে সঙ্গে তার বাড়ির একজন মেয়ে ক্যারোলিনা। বাড়ির আর সবার ভেতর শুধু ওকেই সাঁতারের পোশাকে সবচেয়ে বেশি মানাত। মেয়েটা হঠাত সেই লোকটার জাপটে ধরা হাত ছাড়িয়ে পালিয়ে গেছিল।

সেদিন সকালে সমুদ্রতীর কান্নায় ভরেছিল। সে শব্দ ঢেউয়ের মাঝে ধাক্কা খাচ্ছিল। মন খারাপ করে রেলিং এর গায়ে হেলান দিয়ে বসেছিল এমিয়ে দারখেরে। সাধারণত ওখানে বসলে তাপে তার

রূপ ঝলসে যেত। কিছুক্ষণ বসার পর ঘরের আয়নাটা দেখতে দৌড়ে গেল। হুট করে সেই জ্বলন্ত মানুষের মুখ আয়নার ভেতর ভেসে উঠল। খুব কাছ থেকে দেখে ওটাকে বসন্তের দাগওয়ালা এক মুখ লাগছিল। পুডিং এ যেমন থলথলে মিষ্টি ভাব থাকে সেইরকম আবেগ ভরা একটা মুখ। জ্বলন্ত তরলে ফোটা সূক্ষ্ম চামড়ার মত লাগছিল এমিয়ে দারখেরের। মুখটাকে চুনভরা অলিভ তেল দিয়ে চেপে ধরল। কিন্তু জ্বলন্ত মুখটা আয়নায় লেপটে বসে রইল।






অনুবাদক পরিচিতি
জয়া চৌধুরী
অনুবাদক। কবি। প্রবন্ধকার।
স্প্যানিস ভাষার শিক্ষক।
কোলকাতায় থাকেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন