শনিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২০

সাগুফতা শারমীন তানিয়া'র গল্প : একটি পার্শ্বচরিত্রের গল্প

১. 

আষাঢ়-শ্রাবণ মাসটা হরবখত আকাশ কালিঝুলি হয়ে থাকে। এমনিতে মহানন্দা বড় খেয়ালি, কখনো সাপিনীর মতো লচক দিয়ে স্রোতের তোড়ে উড়িয়ে নিয়ে যায় নাও, কখনো গাভীন নদীতে চর জাগে আচমকা কোথাও। আমার তকদিরের মতোই। শম্‌শানঘাটার কাছে একটা পুরনো ছনের ঘরে থাকতাম আমি। নদী একদিন পাড় ভেঙে উঠে এসে সেই আস্তানা নিয়ে গেল, আমি গিয়ে উঠলাম বিবির বাগিচাতে।
গরমকালে বওলা গাছটার ছায়ায় শুয়ে থাকি, শীতে উঠে আসি নাজিমপুর মসজিদের ভাঙা আঙিনায়। ইয়ারবন্ধুরা এসে মিলতো-জুলতো সেখানে, সন্ধ্যায় সেখানেই শামা জ্বালিয়ে আমরা ফকিররা মিলে মর্সিয়ার দুঃখী সুর তুলে ভিক্ষা করতাম কিংবা কপাল দেখে তকদির বলে দিতাম। মুলকচাঁদ শরদর্দের মালিশ দিত, দোয়া ফুঁকে দেয়া সুপারি দিত, মানুষজনের কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এলে বাতলে দিত- “পিপ্পল পাতায় এই আয়াত লিখে দিচ্ছি, চেটে খাও আচ্ছাসে।” দানেশের একখানা টিয়া ছিল, বড় চতুর পাখি। সে আমায় দেখলেই সরু গলায় ডাকতো- “কানকাটা শাহদানা।” আর আমার মাথায় খুন চেপে যেত। পরে ভাবতাম আমার খনখনে হাতে খুন হওয়াটা ওর নসীবে নেই, থাকলে হয়ে যেত। আমার বিশ্বাস। 

একটি কান আমার কাটা জরুর, সে মামুলি কারণে থোড়ি কাটা, বাদশাহী হুকুমে কাটা। জুলপি আর লম্বা চুল দিয়ে ঢেকে রাখি, কারণ ঘাও দেখিয়ে বেশিদিন হামদর্দী পাওয়া যায় না। লোকে বড় ভুলে যায়। মির্জাসাব আমাকে ডাকতেন শয়তান। কখনো রেগে কখনো হেসে। কত ভালবাসতেন ফকির-মিসকিনদের। মির্জাসাবের ওফাতের পর সবাই তাঁকে ভুলে গেল না? পরথম পরথম একটু দুখ পৌঁছায় বুকে। বাজারে বাঈ নতুন বাজাতে শুরু করলে তার যেমন লাগে। কিন্তু ঐ যে বললাম, হামদর্দী বেশিদিন টেকে না, সদমাও না, লোকে বেমালুম ভুলে যায়। 

কিন্তু আমি ভুলি কি না, সে আমি কাউকে বলবো না। তীক্ষ্ণ নজরে মহানন্দার দিকে তাকিয়ে আমি কার পরওয়ানার অপেক্ষায় থাকি আমি তা কাউকে বলবো না। ঐ দানেশ বা মুলকচাঁদকেও না। পরওয়ারদেগার একদিন ভাসিয়ে আনবেন মঞ্জিলে মকসুদকে, অপেক্ষমানের কাছে। আমীন। 

সেদিন খুব বারিশ- দোয়াতের মতো কালো আসমান। আমাদের তুকতাক করবার শুকিয়ে রাখা ভোজ পাতাগুলি, জাফরানের কালির বদলে চালাবার কুসুমফুল, দোয়া ফুঁকবার মিছরি- সুপারি, আমাদের চাদর ভিজে একসা। এইসব দিনে আমি আকছার সারা দুনিয়ার সাথে বেজার হয়ে শুয়ে থাকি, কিন্তু ঘুমাই না। টের পাই সুবহে কাজেবের আকাশে রোশনাইয়ের পুচ্ছ জাগছে, এরপর জেগে উঠবে বাজারের সারি সারি তন্দুর, তারপর রোটির ঘ্রাণ। মির্জাসাবের বাড়ির পুরানা ঘন্টাঘরে আর সকালের ডঙ্কা দেয় না কেউ, তন্দুরের গনগনে ঘ্রাণে আমরা জেনে যাই ভোর হলো, অনাহারীর আরেকটি দিনের শুরুয়াত। মুলকচাঁদ কার মেয়ের বিয়ে যাদুটোনা করে বন্ধ করছিল আঙিনায় বসে, তার বড় বিবি এসে বেশ খানিকক্ষণ তকদিরকে আর মুলককে গালিগালাজ করে দোপ্যাহরিয়া মাতম করে গেল একসময়। বিরক্ত হয়ে আমি বিছানা ছেড়ে উঠলাম। না খেয়ে খেয়ে গলার হাড় টোটার মতো বের হয়েছে চামড়ার ভেতর থেকে। রাতের বাতাসে খবর রটে যায় ফওরন, ইমামসাবের মুখে গতরাতে দানেশ আর মুলকচাঁদ যখন থেকে শুনেছে তোষাখানা খুলে দেয়া হয়েছে, নবাব যুদ্ধ করবার জন্য লোকবল চাইছেন- তখন থেকে তারা ভাবছে মুর্শিদাবাদ যাবে, ফকিরি আর করবে না। তা কুঁজোর চিত হবার মর্জি তো হতেই পারে! 

দুপুর ফুরানো ঝাপসা আলোয় দেখলাম বাজারের দিকে যাবার ধনুষের মতো বাঁকা বাদশাহী পুলটার ওপর কে যেন চাদরমুড়ি দিয়ে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘদেহী লোকটার হাতে সুরাহী। অচেনা চেহারা। মির্জাসাব বলতেন আমি শয়তানের মতো বেশ বদল করি, করলাম, আদবের সাথে তার পরিচয় জানতে চাইলাম। মাঝিশ্রেণীর এক কমবখত আগেই জবাব দিয়ে দিল- “ওগো আমরা ভগমানগোলা থেকে আসছি।” আহা তাই বলো। এখানকার লোকজন কাকে না চিনি। শুধুই কি লোক। কে বদখোয়াব দ্যাখে, কার ঘুসঘুসে জ্বর, কার পিলে কত বড়, কার বিবি ভেগেছে, কার বাচ্চাকে পেঁচোয় পেয়েছে সব তদবীর জানি। এইসবই তো বলছিলাম, লোকটা আমায় অ্যায়সা এক ধমক দিলো যে আমার আস্ত কানটায় তালা লাগলো। তার তাড়া ছিল বাজারে যাওয়ার, নৌকোয় নাকি তিনদিনের ভুখা পরিবার বসা, বড় ভাই, তার বিবি, তার ফুটফুটে বাচ্চা জোহারা বিবি। আহা, জোহারা, কী মিষ্টি নাম, পূব আকাশের নক্ষত্রের নাম। লোকটা খপ খপ করে হেঁটে বাজারে গেল, তার চলন মির্জাসাব কী খাজাসাবের মতন, ওগো, দেয়াল ফুঁড়ে যেমন বুরুজ বের হয়ে আসে- তেমনি করে শানদার আদমির শানশওকত বের হয়ে আসে। আমি তবু পিছে পিছে এলাম, সদাই কিনবার সময় দরদস্তুর করে দিলাম, এও আশা যদি হাতে তুলে দেয় কিছু... মাঙতে হবে কেন। 

আসমানে তখন একদিকে ফিরোজা আরেকদিকে মরকতের রঙ ধরেছে। সন্ধ্যার মায়ুসি ধরেছে নদীর গায়ে, তার অতল থেকে উঠে আসছে কালামোতির রঙ। শরবনের কাছে আড়াল করে রাখা নৌকো। প্রায় অন্ধকারে আমি প্রথম পেলাম সুবাস, রওজাহে আতাহারের সুবাস। বিবি-বাচ্চা সহ চাদরমুড়ি দিয়ে আরেকজন মানুষ বসে আছে নৌকোর ছইয়ের নীচে। ব্যাকুল ছোট্ট মেয়েটি চাদর ঠেলে উঠে এলো খাবারের গন্ধে, হাত বাড়িয়ে বল্লো- পানি! পানি! মায়াবী আলোয় ঝিকমিক করে উঠলো তার গায়ে ফুলদার মসলিনের ওড়না। আমার মনে হলো, ইমাম হোসেনের বংশধর কেঁদে উঠলো পানি চেয়ে। মেয়ের বাপ দ্রুত মেয়েটিকে কোলে নিলেন, আমি নিমিষেই একজোড়া বাদশাহী জুতা দেখতে পেলাম। মাঝিমাল্লা আর কারপরদাজ খিচ্‌ড়ি রান্নার এন্তেজাম করতে শুরু করলো, বাজারে পরিচয় হওয়া লোকটা আমার হাতে একখানা মোহর দিয়ে খেদিয়ে দিল। আমি শাহদানা ফকির সন্ধ্যার অন্ধকারে টিমটিম করে জ্বলতে জ্বলতে ফিরলাম। 

ওগো, আমি কি এই চেহারা ভুলতে পারি? পাগড়ি-পেশওয়াজের অভাবে কি আর রাজপুরুষ চেনা যায় না? তার মাথা যে গম্বুজের মতো ফুঁড়ে ওঠে আসমান। আমার কাটা কানে আপনা থেকে আমার হাত এসে পড়ে। ঠুঁটো লোক কি তার জখম ভোলে? আমার অন্তরে ভাগীরথীর বাঁধ আর পলাশীর আমগাছে ঝুঁরছে অন্ধকার। কে বলে বারিশে গোলাবারুদ ভিজে যায়। নবাবী গোলা ভিজতে পারে, আমার বুকে গোলা বেঁধে বসে আছি সে কোন জমানায়... আঁসু অব্দি ভিজাতে পারে না তাকে। মুলকচাঁদ আমায় বলেছিল তো, ইমামসাব বলেছেন- মুনসীতে এখন রাজা হবে, নমকহারাম এখন নবাব হবে, বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাবের বয়স এক যুদ্ধে বেড়ে গেছে, আগে ছিল পঁচিশ আর এখন হয়েছে পঁয়ষট্টি। নাম মীর জাফর আলী খান। 

বলেছি তো, এই মহানন্দার দিকে বাজপাখির মতো চেয়ে চেয়ে আমি কত ইন্তেজার করেছি মঞ্জিলে পৌঁছবার। মুর্শিদকুলি খাঁয়ের তোপ দাগার শব্দে গর্ভনাশ হতো মেয়েদের, ভাগীরথীর জলে খিজিরপীরকে শিন্নি মেনে ভাসতো বিশাল ভেলা আর আলোয় উজালা বজরা, রোশনিবাগ সাজতো আলোর ঝালরে... সেইসব দবদবা রবরবার দিনের শেষ রোশনি দপ করে নিভিয়ে দিতে পারি তো আমি। বলেছি তো, মির্জাসাব আদর করে বলতেন আমি শয়তানের মতো রূপ বদলাই, একবার ফেরেশতাদের সর্দার, আরেকবার খোদার উপর খোদকার। 

২. 

আমায় কেউ ঢোল চড়িয়ে খুঁজলো না, তোপের মুখে দেগে দিল না, মায় থুকলো না পর্যন্ত, ইমামসাব খড়ম ছুঁড়লেন না, ভেবেছিলাম ভাও বুঝে গা-ঢাকা দেব, তার দরকার হলো না। শুধু মুলকচাঁদের বড় বিবি একবার গলা চড়িয়ে আমায় ‘নাফরমান’ গালি দিয়ে বলে গেল- কালের ফেরে আমার আরেকটা কানও কাটা পড়বে! বিবির বদতমিজিতে আমার দোস্ত ঘাবড়ালো না, মাফিও মাঙলো না। এবারের নওয়াবসাব নাকি ভরি ভরি আফিম খেয়ে ঘুমোতে থাকেন, নবাব যা করে তার রায়তও তাই করে... ঝিমোয়, নিঁদ যায়... আমরাও নিঁদের ঘোরেই শুনতে পাই এবারের নবাবজাদা নাকি সেরাজউদ্দৌলার বেওয়া লুৎফাকে শাদী করতে চান। লুৎফা ফির বেগম হলে কি আর শাহদানাকে ভুলবেন, যার বেঈমানিতে তাঁর মেয়ে উম্মে জোহারা বাপ হারালো, মুলকচাঁদের বড় বিবির আঁখ খুশিতে নাচে। কিন্তু তাকেও ঘুমের নেশায় ধরেছে, ‘আচ্ছে করম’ করবার তাগিদ কমে আসছে খিদের জ্বালায়। ঝিমোতে ঝিমোতে সেও রোটি পুড়িয়ে ফ্যালে, তাকিয়ে দেখে যেন ফতেচাঁদ জগতশেঠ মিলে ভাগীরথী নদীর মোহানা পয়সায় বাঁধিয়ে দিতে গিয়ে গলতি করে আকাশ ভরে দিয়েছে সিতারায়... আকালের আকাশ। 

সময়ের চরকি ঘুরে যায় নির্ভুল। মসজিদের খিলানের নীচে হেলান দিয়ে বসে কে কপাল চাপড়ায় আজ এতদিন পর। দানেশের মাথাটা একেবারে গেছে, সে কখনো মালেকুল মওতের অপেক্ষা করে, কখনো মোহম্মদী বেগের অপেক্ষা করে। আমরা এখনো মসজিদের ভাঙা আঙিনায় থাকি। প্রতি সন্ধ্যায় শামা জ্বালিয়ে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার তাড়াতে তাড়াতে দানেশ জিজ্ঞেস করে- “শাহদানা, মীরকাশেমের লোককে তুই নবাবের কথা বলে দিলি?” 

আমি মাথা নাড়ি- হ্যাঁ। দানেশ আবার জিজ্ঞেস করে- “মুর্শিদাবাদের রাস্তায় নবাবের হাতি নবাবের বোটি বোটি করা লাশ পিঠে নিয়ে বের হলো?” 

আমি মাথা নাড়ি- হ্যাঁ। দানেশ আলোয় উড়ে আসা পোকা তাড়াতে তাড়াতে কাঁদোকাঁদো গলায় বলে- “নবাবের আম্মির সামনে হাতি এসে বসে গেল?” 

আমি মাথা নাড়ি- হ্যাঁ। দানেশ বলে- “আমার নবাবের কাটা টুকরোতেই তার আম্মি চুমা খেতে লাগলেন?” 

আমি মাথা নাড়ি- হ্যাঁ। রাজনন্দিনী আমেনা বেগম, হোসেন কুলী খাঁয়ের গোপন মাশুকা, নবাবের আম্মিজানকে অন্ধকারেই ঠাহর করে দেখতে চায় দানেশ। নির্দোষ হোসেন কুলী খাঁয়ের রক্তের বদলা নেয়া হলো এইসব আমি দানেশকে বোঝাতে যাব ভাবি কিন্তু কী ফায়দা। অনেকক্ষণ পর দানেশ অবশেষে গায়েবী চাল দিয়ে জিজ্ঞেস করে- “শাহদানা, ফিন তুই নবাব হলি?” 

আমি মাথা নাড়ি- হ্যাঁ। দানেশ নিস্তেজভাবে হাসে। আফিমের নেশা যেমন খেয়াল কি আঁখোসে দেখায়, তেমনি করে আন্ধারে আমি আর দানেশ দেখি আমাদের খোশহাল- আমরা নবাবী হাতিতে চড়ে রাজ্য দেখতে বের হয়েছি। বাগে চম্পা থেকে ভুরভুর সুবাস আসে। অন্দর থেকে আসে রোটি আর কাবাবের ঘ্রাণ। রৌশনচোকি থেকে সানাইয়ের শব্দও হয়। শুধু আন্ধার ভেদ করে দানেশের চশ্‌ম্‌খোর টিয়াপাখি ফুকরে ওঠে- “দুই কানকাটা শাহদানা!” 

-“চোপরাও!”, বলি আমি। পরে ভাবি, আহা লোকে ভুলে যাবে, যেমন ভুলে যায় রাজরাজড়ার নানান গল্প, যেমন ভোলে দারুণ দুঃখ... পাখিও এই ডাক ভুলে যাবে, মুফতে একটা প্রাণ নষ্ট করি কেন। 


৩১/১০/২০১৮

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন