বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২০

অলোকপর্ণার গল্প: এইসব বিড়ম্বনা

ছাপোষা টিয়াটির নাম মিঠু, রাজুর দেওয়া। আর ছাপোষা মানুষটির নামরাজু। তার মায়ের দেওয়া। মা এখন সুপুড়ির মত বিছানায় লুটোপুটি। মাএখন বিছানায় শুয়ে থেকে চৈত্রের বাতাস লাগা জানালার পাল্লার মতএপাশ থেকে ওপাশে ধীরে ধীরে বয়। রাজু কাগজের সাথে পেন্সিলি খোসগল্প চালায় ভরদুপুরে, আর থেকে থেকে বিকেল হয়ে আসে। রাজু ডাকছেড়ে মাকে বলে, “মা বিকেল হয়ে যায়, শুধু বিকেল হয়ে যায়...”

কাগজের উপর আঁকা হয়ে পড়ে থাকেন পেন্সিলের স্নেহলতা, রাজুর মা, রাজুর মায়া হয়ে।

মানস এসেছিল আজ বহুদিন পর। রাজুর বুকের কাছে আঁচিলের মতচুপ করে পড়ে ছিল দুপুরবেলা। তারপর ব্লাউজ কুড়িয়ে, ন্যাকড়ার মন্ডদিয়ে নিজের বুক গড়ে তুলে বেরিয়ে চলে গেছিল। ন্যাকড়ার মন্ডদুটোরপ্রতি বড় লোভ হয় রাজুর। কোনো কিছুর প্রতি খুব বেশি লোভ হলেরাজুর তা খেয়ে ফেলতে মন চায়। যেমন সে ভাবে একদিন গিলে ফেলবেমানসের বুকের এই মন্ডদুটোকে। একদিন ঠিক লুকিয়ে ফেলবে মানসেরদুটো বুক,- এই প্রত্যাশায় রাজু মানসের মানসী হয়ে ওঠার দিকে তাকিয়েথাকে। 

“মানস, তোকে ভালোবাসি,”

“কতবার বলেছি আমাকে মানস বলবি না,”

“মানস মানস মানস মানস”

মানস এগিয়ে এসে রাজুর গালে ফট করে একটা চড় মারে। মানসেররুক্ষ হাতের ছোঁয়া শাশ্বত হয়ে থাকে রাজুর গালে। মানস মানসী হয়েচলে যাওয়ার পরেও মানসের হাত যেন রাজুর গাল ছুঁয়ে আছে। যেনমানস হাতটা রাজুর গাল থেকে সরিয়ে নিতে ভুলে গেছে। রাজু আহতগালে হাত বোলায়।

বিকেল হয়ে যায়, শুধু বিকেল হয়ে যায়,

স্নেহলতা এখন ভুলে যেতে শুরু করেছেন। প্রথমেই তিনি রাজুকেভুলেছেন, তারপর ভুলেছেন ঘর বাড়ি। মাঝে মাঝে বেরিয়ে যেতে চাইছেনচাঁদ লাগা সিদ্ধার্থর মত। অথচ তিনি কোনো নির্বানের সন্ধানে রত নন। রাজু ভাবছে যদি দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয় তাহলে তা মায়ের পক্ষে কতটাঅবমাননাকর হবে,

রাজু সাদা একটা কাগজ নিয়ে খসখস করে মানসের বুকের মন্ডদুটোএঁকে ফেলে। তারপর কাগজটাই মন্ড পাকিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয় মনের এককোণায়। সেটা কোথায় যে গুম হয়ে গেল কেউ খবর রাখে না। হয়তোরাতের দিকে, হয়তো জীবনের ঘোরতর রাতে, রাজুর মনের ভিতর যতইঁদুর- তত ইঁদুর বেরিয়ে আসবে, রাজুদের বসতবাড়ির সমস্ত ইঁদুর, রাজুরশরীরের সমস্ত ইঁদুর, কুটকুট করে মানসের বুকের মন্ডদুটোকে ছিন্ন ভিন্নকরে দেবে। আর মানসের মানসী হওয়া হবে না। রাজু জ্বল জ্বল চোখেঅন্ধকারে তাকিয়ে তারিয়ে তারিয়ে মানসের মানসী না হয়ে ওঠা দেখছে।

মানসকে সে প্রথম দেখেছিল বইমেলায়। তরুণা প্রকাশনীর স্টলের বাইরেএকটা ডাকবাক্সের প্রকান্ড কস্টিউম পরে বাচ্চাদের সাথে হাত মেলাচ্ছে। সেলফি তুলছে। লাল সূর্যের মত ভারতীয় ডাকের ম্যাসকট মানসেরদিকে এগিয়ে গিয়েছিল রাজু। ভিড় ছাপিয়ে প্রশ্ন করেছিল, “চা খাবেন?”

তারপর সন্ধ্যায় মেলা শেষে চায়ের দোকানে গিয়ে বসেছিল রাজু আরমানস। রাজু দেখেছিল মানসের ঠোঁটে ডাকবাক্সের মত লাল রঙেরলিপ্সটিক লাগানো। মানসের কপালে লাল টিপ। মানসের গালেআধদিনের উঠতি দাড়ি। রাজু জিজ্ঞেস করেছিল, “আপনি কিবিবাহিত?”

মানস সালোয়ারের ওড়না ঠিক করে নিতে নিতে বলেছিল, “না”

রাজু চায়ে সুলুৎ করে চুমুক দিয়ে তবে বুঝেছিল চা অতিরিক্ত গরমএখনো। বেপরোয়া পোড়া জিভ নিজের মুখের মধ্যে বুলিয়ে নিয়ে রাজুজিজ্ঞেস করেছিল, “আপনি কি আমার সাথে আসবেন,”

মানসের গাল আরক্ত হয়ে উঠতে দেখেছিল রাজু। লাল সূর্যের মত। ভারতীয় ডাকের ম্যাসকট ডাকবাক্সটার মত।

ছাপোষা বেলাটির নাম বিকেল। এখনো রাজুর গালে মানসের হাতেরছোঁয়াচ জেগে আছে। রাজু বসে আছে তরুণ অন্ধকারে। তাকে ঘিরেমেঝেতে পড়ে আছে অসংখ্য সম্ভাবনাময় কাগজের মন্ড। একেকটি মন্ডমানসের একেকটা বুকের সমান। রাজুর চারপাশে পড়ে আছেসম্ভাবনাময় মানসের একেকখানি বুক। ছাপোষা বুক। ছাপোষা দেহেরমানসকে আষ্টেপৃষ্টে ধরতে ইচ্ছে করছে রাজুর। পরিবর্তে রাজু নিজেকেধরছে। অন্ধকারে রাজু নিজেকে হাতড়াচ্ছে। রাজু হাত মারছে। অন্ধকারে।

ফ্যাত ফ্যাত সাই সাই/ ফ্যাত ফ্যাত সাই সাই

যেন বৃষ্টির মধ্যে রাজুকে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে এক বাক্স আতসবাজি। আর বলা হয়েছে সেই বাক্সটা পৌঁছে দিতে হবে সোনারপুরের কোনোঠিকানায়। আর রাজু শ্যামবাজারে। এবং রাজুর কোনো ছাতা নেই। নেইবর্ষাতিও। এমনই জীবন পেয়েছে সে। রাজু একবার ট্রামে উঠছে। রাজুএকবার বাসে। তবু জল টপ টপ করে ঝরছে আকাশ থেকে। আরআতসবাজির বাক্স ভিজে ভিজে যাচ্ছে। রাজু ঘুমের মধ্যে কথা বলছে, “মানস মানস মানস মানস”

একা ঘরে রাজু সুস্পষ্ট স্বরে কথা বলছে ঘুমের ঘোরে। কেউ শুনছে না। রাজু ঘুমের মধ্যে কথা বলছে!

মানস রাজুর এই স্বভাব জানেনা। কারণ মানস শুতে আসে, ঘুমোতেনয়। রাজুর বুকের নরম লোমগুলো কাঁদে যখন মানস উঠে যায় বিছানাছেড়ে আর ন্যাকড়ার মন্ড দিয়ে বুক তৈরি করে ফেলে। রাজুর হাতেরনখগুলো কাতরায় যখন মানস ঠোঁটে লিপিস্টিক ঘষে। রাজুর লিঙ্গপোড়খাওয়া সাপের মত গর্তে ঢুকে থাকে, ডিমে তা দেয়। নিজেকে প্রস্তুতকরে। কিন্তু ফোঁস করে ওঠে না। মানস মানসী সেজে বেরিয়ে চলে যায়।

ছাপোষা একটা টিয়া রাজুদের খাঁচার ভিতর চুপ করে বসে আছে একপায়ে। আরেক পা সে নিজের ঠোঁট দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করার চেষ্টা করছেঅনেকক্ষণ ধরে। রাজু চুপ করে মিঠুর মনস্তাপ দেখছে। খাঁচায় থাকারবিড়ম্বনা! মিঠুটি ছাপোষা টিয়ে, নিজস্ব পা ক্ষতবিক্ষত করার ব্যর্থ প্রচেষ্টাকরছে। এমন সময় কোথাও বাজ পড়ে।

রাজু চমকে ওঠে। মানস, মানস, মানস, মানস...

কাল মানস আসবে। শোবে। আর্ত ডাকবে “ওহ ড়াজু! ড়াজুউউ!” তারপর চলে যাবে। পরশু মানসকে কারা যেন শুধু মাত্র রূপান্তরকামীবলে জ্যান্ত পুড়িয়ে দেবে লাল ডাকবাক্সের কস্টিউম সমেত। উত্তুঙ্গআগুনে জ্বলতে জ্বলতে,- রাজু ভাবে,- মানস তখন “মানস”, না“মানসী”?

বিকেল হয়ে যায়, শুধু শুধু বিকেল হয়ে যায়।

যেন বৃষ্টির মধ্যে রাজুকে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে এক বাক্স আতসবাজি। আর বলা হয়েছে সেই বাক্সটা পৌঁছে দিতে হবে উলুবেড়িয়ার কোনোঠিকানায়। আর রাজু বারুইপাড়ায়। এবং রাজুর কোনো ছাতা নেই। নেইবর্ষাতিও। এমনই জীবন পেয়েছে সে। রাজু একবার ট্রেনে উঠছে। রাজুএকবার অটোয়। তবু জল টপ টপ করে ঝরছে আকাশ থেকে। টপ টপজল ঝরছে সিলিং থেকে। টপ টপ জল ঝরছে দুচোখ বেয়ে আরআতসবাজির বাক্স ভিজে ভিজে যাচ্ছে। রাজু ঘুমের মধ্যে কথা বলছে, রাজু ঘুমের মধ্যে বৃষ্টিকে বলছে- “খামোশ! খামোশ! খামোশ! খামোশ!”


---------------
ঋণ- ফ্যাতাড়ু


লেখক পরিচিতি
অলোকপর্ণা
গল্পকার।
কোলকাতায় থাকেন। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন