বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২০

র‍্যাচেল কুস্ক'এর গল্প ঃঃ তৃষ্ণা

অনুবাদঃ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ 
---------
লেখক পরিচিতি
র‍্যাচেল কুস্ক কানাডায় জন্মেছেন ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে। পরে আমেরিকার লস এঞ্জেলসে বেশ কয়েক বছর কাটিয়েছেন জীবনের প্রথম দিকে। ১৯৭৪ সালে তিনি বৃটেনে থিতু হন। এখন পর্যন্ত  তিনি দশটি উপন্যাস লিখেছেন। চারটি লিখেছেন প্রবন্ধের বই।  তার আখ্যান একই সঙ্গে মেধাবী এবং হৃদয়ের গভীরে স্পর্শকারী।

---------
  
ভেনিসে আগমনের পর গিবসন পরিবারের মা ও মেয়ে উভয়েই সর্বব্যাপী জলের উপস্থিতি ও বিস্তার দেখে ভীষণ অবাক। অবশ্য বিগত কয়েকদিন যাবৎ মা জুলিয়া গিবসন এই প্রমোদভ্রমণের শুধুমাত্র ব্যবহারিক দিকগুলো নিয়ে ভাবছিলেন।
মেয়ে শারলট এ সম্পর্কে ভাবছিল না বললেই চলে। আসলে জুলিয়ার বন্ধুবৃত্তের মধ্যে একটা ফ্যাশনের মত চলন আছে যে, পরিবারের মা তার বড় মেয়েকে নিয়ে একবার একাকী সংক্ষিপ্ত ভ্রমণে বের হবেন। বিশেষ করে যদি সেই মেয়ে সদ্য যৌবনপ্রাপ্তা হয়ে থাকে। অনেকটা সাধারণ চুক্তির মত, যেখানে পরিবারের নির্দিষ্ট দুইজন সদস্য এই বিশেষ বিবেচনা ও সুবিধার অন্তর্ভূক্ত হবে। এই সুবিধা তাদেরকে পুরস্কৃত বা খুশী করার উদ্দেশ্যে কিনা, সে সম্পর্কেও কোন পরিষ্কার কোন ধারণা তাদের নেই। এমনকি মা-মেয়ে মিলে তিন রাত বাইরে কাটালেই যে বিষয়টা সম্পূর্ণতা পাবে সে সম্পর্কেও তাদের কোন স্পষ্ট ভাবনা নেই। ব্যাপারটিকে শুধুই তুলনা করা যেতে পারে কূটনীতিক বিশ্বে রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের চলাচলের সাথে, যেখানে তারা নিশ্চিত গন্তব্য না জেনেই সারা বিশ্বময় চরকির মত ঘুরতে থাকেন। 

বেশ কিছুকাল যাবত জুলিয়া গিবসন সমস্যাকুল বাস্তব জগতের বাইরে আসেনি। সে ভুলেই গিয়েছিল যে, এই জগতের বাইরেও কোন জগত রয়েছে। সুতরাং আকাশের শুষ্ক নীল অধিবৃত্তের উপরে উড়োজাহাজের সীটে আসীন হয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করার বিষয়টি তার কাছে অযৌক্তিক বলে মনে হল না। আকাশের স্থানে স্থানে সাদা সাদা ডোরাকাটা দাগগুলোকে তার নিকটে মনে হচ্ছিল অন্য কোন উড়োজাহাজের অলক্ষ্য গমনের পথ, যা আকাশকে কিছুটা হলেও মর্যাদাহীন করেছে। দাগগুলোকে মনে হচ্ছিল ব্যবসা ও আনন্দের পরস্পরকে এড়িয়ে চলার সাক্ষ্য, যেগুলো নীচের পার্থিব জীবনের চলমান নাটকীয়তার প্রতি একান্তই উদাসীন ও নির্বিকার। 

বিমানবন্দরে অবতরণ করার পরেই তারা বুঝতে পারল যে, তাদের পরবর্তী ভ্রমণ হবে নৌকায় করে। এবং ঠিকই তারা একটা দোলায়মান পন্টুন ব্রীজের উপরে আধঘণ্টা অপেক্ষমাণ থাকার পর একটা নৌকা দেখতে পেল, যেটা অস্থির জলের উপরে বিশৃঙ্খলভাবে ঔদ্ধত্য নিয়ে দুলছিল। সময়টা ছিল উপকূলের শীতল পরিষ্কার বিকেল। জুলিয়া ও তার মেয়ে দুজনেই দিব্যচোখে দেখতে পেল কি ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে তাদের জন্যে।

“যদি তোমার বাবার ইচ্ছায় সব হত, তাহলে এই সময়ে আমরা মাদ্রিদে থাকতাম।“ জুলিয়া ইঞ্জিনের শব্দের ভেতরেই চিৎকার করে মেয়েকে বলল। কথা বলার সময়ে সে হাতের আঙুল দিয়ে শক্ত করে শারলটের প্যাডযুক্ত কোটের উপর দিয়ে তার বাহু শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ছিল। “তুমি কি জান আমি কী ভাবি? সে কখনই চায়নি আমরা খুব বেশী আনন্দ করি।“ 

প্রায়ই সে সন্তানদের সাথে তাদের পিতাকে নিয়ে এভাবে কথা বলত। এটা ছিল একটা মাধ্যম যা দিয়ে সে নিজের অন্তর্গত কষ্টগুলোকে অন্যদের কাছে অনাবৃত করত। অনিচ্ছাকৃত ভাবে নয়। ইচ্ছে করেই। এভাবেই নিজের জননীসুলভ গোপন পৃথিবীতে সে সন্তানদের বা নিজের কাছে নিজের পোশাক খুলে দুর্বিসহ যন্ত্রণার ক্ষতচিহ্নগুলোকে উন্মোচন করত। যেগুলোতে অবসন্নতার পাশাপাশি কিছুটা কোমলতাও বিরাজ করত। এটা সত্য যে, জুলিয়ার স্বামী তাদেরকে মাদ্রিদে যেতে বলেছিলেন। কেন, সেটাও তিনি ঠিকভাবে বোঝাতে সক্ষম হননি। তিনি শুধু বলেছিলেন, সেখানে গেলে তারা আনন্দ করতে পারবে। 

জুলিয়া কখনই মাদ্রিদে যায়নি। কিন্তু সেখানে যেতে পারার সহজলভ্যতা তাকে বুঝিয়েছিল মাদ্রিদে কি আছে বা থাকতে পারে। তার প্রস্তাবের পিছনে কয়েকটা সম্ভাব্যতা ছিল। প্রথমটি হল তিনি কখনই তাদেরকে খুব বেশী আনন্দ করতে দিতে চাননি। দ্বিতীয় কারণটিও প্রথম কারণের সাথে সম্পর্কহীন নয়। সেটি ছিল তিনি নিজেই ভেনিসে যেতে চেয়েছিলেন। তৃতীয় ও শেষ কারণ সম্ভবত ছিল তার মেয়ে।

“তুমি কি মাদ্রিদে যেতে চেয়েছিলে?” 

বলে পুনরায় সে শারলটের বাহু আঁকড়ে ধরল। আঙুলগুলোকে তার কোটের বাহুর উপরে উঠা-নামা করল। শীতকে প্রতিহত করার জন্যে। তবে শীতটা ছিল তার কল্পনার। কারণ নৌকার ভেতরটা তখন ইতিমধ্যেই উষ্ণ হয়ে উঠেছিল। 

“আমি জানি না,” শারলট বলল। “আমি জানি না সে জায়গাটি কেমন?”

“আমার ধারণা জায়গাটি আসলেই আকর্ষণীয়,” জুলিয়া বলল, অসাধারণ দায়িত্ববোধের সাথে। ভুরুকে কুঞ্চিত করে। “আমার ধারণা সেখানে অনেকগুলো মিউজিয়াম, পাবলিক বিল্ডিং, স্মৃতিসৌধ, এবং এধরণের জিনিস আছে। সম্ভবত মাদ্রিদ বিশাল একটা এডিমিনিস্ট্রেটিভ কেন্দ্রও বটে।“ 

শারলট কিছুই বলল না।

“অথচ ভেনিস …” জুলিয়া হাত দিয়ে জানালার দিকে নির্দেশ করল। সেটার ভেতর দিয়ে লেগুনের উপরে গোধূলির গোলাপী আলো দেখা যাচ্ছিল। “ভেনিস হল যাদুময় রূপকথার জায়গা। এমনটি আর কোথাও নেই। এখানে আসা মানে অতীতে ভ্রমণ করতে যাওয়া। তুমি কি জানতে যে, এই শহরে কোন গাড়ি নেই? একটাও না!” 

“কেন নাই?” শারলটকে উদ্বিগ্ন দেখালো। তার কাছে গাড়ির অনুপস্থিতি অসুবিধা ও অমঙ্গলের সমার্থক। 

“কারণ এখানে কোন সড়ক নেই! সড়কের পরিবর্তে খাল আছে। তুমি কি মনে করতে পার খাল কি? আমি তোমাকে একবার বলেছিলাম।“ 

“না, তুমি আমাকে কখনই খাল সম্পর্কে বলনি।“ 

“বাছা,” জুলিয়া কঠিনভাবে বলল,”আমি বলেছিলাম।“ 

“এটা কি খাল?” শারলট বলল। ধীর হয়ে যাওয়া ইঞ্জিনের কম্পন দ্বারা কিছুটা উজ্জীবিত হয়ে।

তীরের উপরে এক সারি পাথরের তৈরী ইমারত দেখা গেল। বিদ্যুতের উজ্জ্বল আলোতে সেগুলো নৌকার একদিকে নীরবে দৃশ্যমান হচ্ছিল। জলের পটভুমিতে। বর্ণনাতীত রকমের বিশাল ইমারতগুলো পুরো সাগরকে সামনে রেখে একের পর এক দাঁড়িয়েছিল। একটা ইমারতের উপরে লম্বা বোর্ডে লেখা ছিল CAMPARI। 

“যাই হোক, এখানে গাড়ি আছে,” শারলট মন্তব্য করল।

তাদের পাশে জোড়ায় জোড়ায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হেডলাইট দৃশ্যমান হল। অন্ধকারের ভেতরে সুচালো কমলা রঙের আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছিল সেগুলো থেকে। জলের উপরেও ভিড় ছিল। একটা বিশাল জলপাই রঙের ফেরি তাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে গেল। সাগরের দিকে। নৌকায় উপবিষ্ট অর্ধেক সংখ্যক মানুষ দাঁড়িয়ে গেল। দরজার দিকে লাইন করে এগোতে লাগল ব্যাগ/কোট নিয়ে। নৌকার কন্ডাক্টর চিৎকার করে কিছু একটা বলল। 

“এটা ভেনিস লিডো,” জুলিয়া নিশ্চিত স্বরে বলল। “মূল ভেনিস নয়। লিডো হল একটা অবকাশ কেন্দ্র। এখানে বিখ্যাত একটা বেলাভূমি আছে।” 

“সবাই তাহলে ভেনিসের পরিবর্তে এখানে আসে না কেন?” শারলট বলল। তার কন্ঠস্বরের ভেতরে এমন কিছু ছিল যা, জুলিয়ার খুবই অপছন্দ হল। কারণ এভাবে উত্তর করতেই শারলট সারাজীবনের সমস্ত চেষ্টাকে ব্যয় করেছে। 

অন্ধকার লেগুনটি অতিক্রম করার পূর্ব পর্যন্ত জুলিয়া নিশ্চুপ থাকল। ভেনিসের নিকটবর্তী হতেই কাল জলের উপরে শহরটিকে দেখা গেল। সোনার রাজমুকুটের মত দাঁড়িয়ে ছিল। আর্সেনালের এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময়েও জুলিয়া কথা বলল না। কৃত্রিম খালগুলোর উপরে ঘন ছায়াচ্ছন্ন গাছপালা নিয়ে এই শিল্প এলাকাটি। এমনকী সে নিরবতা বজায় রাখল যখন তারা এমন একটা দৃশ্যপটের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিল, যেটাকে জুলিয়া তার পড়াশুনার সময়কাল থেকেই জানে। সান মার্কোর চত্বর বলে। অন্ধকারের ভেতরে চত্বরটা জ্বলজ্বল করে জ্বলছিল। এমনকী তারা ডোঝ প্রাসাদ ও বাসিলিকার সোনালী শীর্ষও অতিক্রম করে গেল নিরবেই। জুলিয়া ভেবেছিল যে, এগুলো সম্পর্কে জ্ঞানদানের পূর্বেই শারলট এগুলোর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে যাবে।

কাঠের তৈরি ঘাটগুলো সর্বত্র জলের উপরে ভাসছিল। এবং সেগুলোর মাঝখানে ভাসছিল অনেকগুলো গন্ডোলা। প্রত্যেকটিই দড়ি দিয়ে আটকে রাখা ও তেরপল দিয়ে শক্ত করে বাঁধা। এই ব্যবস্থা সম্ভবত অসময়ে বা জানুয়ারি’র রাতে চলাচল করার জন্যে। দৃশ্যটা একইসাথে মনোমুগ্ধকর ও সামান্য বিষাদগ্রস্ত ছিল। জুলিয়াদের নৌকা একসময়ে ধীরগতিসম্পন্ন হয়ে ঘুরতে লাগল। তারপর একটা অনুজ্জল বাদামী-হলুদ স্টেশনে ভিড়ল। স্টেশনটির নাম সান মার্কো।

“এটাই সেই জায়গা,” ঐকান্তিকভাবে জুলিয়া বলল। ভাবখানা এই যে, তারা এমন জায়গায় আগমন করেছে, যেখানে সে ইতিপূর্বে একটা পরিপূর্ণ জীবন যাপন সম্পন্ন করেছে, যা অতি সাম্প্রতিক সময়ে আকস্মিকভাবে শেষ হয়ে গেছে। প্লাস্টিকের তৈরী আসন থেকে উঠে স্যুটকেস নিয়ে নৌকা থেকে নামার সময়ে সে অনুভব করতে পারল যে, শারলট দীর্ঘক্ষণ ইতস্তত করার পর অবশেষে আসন থেকে উঠে তাকে অনুসরণ করল। 

জুলিয়ার এক বন্ধু তাকে বলেছিল যে, ভেনিসে অবস্থানের জন্যে একটা মাত্র জায়গাই রয়েছে। যদিও সে জায়গাটি সম্পর্কে বলার সময়ে মাদ্রিদের প্রসঙ্গ টেনেছিল। তথাপি জুলিয়া এই স্থানে অবস্থান করার বিষয়েই মনঃস্থির করে একটা রুম বুকিং দিয়েছিল। জুলিয়া রুমটি পেয়েছে জেনে তার বন্ধুটি কিছুটা অবাকও হয়েছিল। কারণ সে তাকে বলেছিল, “ঘরটি পেতে অন্তত একমাস পূর্বে তোমাকে বুকিং দিতে হবে।“ বছরের এই সময়ে রুম পাওয়া কেন দুষ্কর, তাও সে তাকে ব্যাখ্যা করেছিল।

নৌকা থেকে নামার পর তারা ‘ভাপোরেত্তো’ নামের অন্য একটি নৌকায় উঠল। পূর্বের নৌকার চেয়ে এটি অনেক বেশী ধীরগতি সম্পন্ন ছিল এবং গ্র্যান্ড ক্যানালের ভেতরে ভীষণ রকম গর্জন করতে করতে এগোচ্ছিল। এই শব্দে জুলিয়ার ইতিপূর্বে নিঃশেষিত হওয়া উদ্দীপনা পূনর্জাগ্রত হল।

“আমরা পৌঁছে গেছি!” সে চিৎকার করে বলল। শারলটের কাঁধ আঁকড়ে ধরে। “এটাই হল সেই গ্র্যান্ড ক্যানাল। পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত দৃশ্যপটগুলোর একটি!” 

“তুমি আসলে ওটাকে দেখতে পাচ্ছ না,” শারলট মন্তব্য করল। “বাইরে এখন খুবই অন্ধকার।“

“চিন্তা করো না, আমরা এখানেই আসা-যাওয়ার ভেতরে জীবন কাটিয়ে দেব।“

“সত্যিই?” 

“অবশ্যই। তুমি কি ভেবেছ যে, আমরা এখানে শুধুমাত্র তিনদিন হোটেলে থাকার জন্যে এসেছি?”

শারলট সন্দেহের সুরে বলল, “আমি জানি না।“ 

“তুমি চাইলেই থাকতে পার,” তার মা তাকে বলল, “তবে সেটা হবে লজ্জার।” 

“না, আমি চাইলেই পারব না,” শারলট প্রত্যুত্তর করল। কুয়াশাচ্ছন্ন জানালার ভেতর দিয়ে সে চলমান কাল জল ও বিশাল এক গীর্জার দিকে তাকিয়ে ছিল। “কারণ তুমি আমাকে অনুমতি দেবে না।” 

“কেন থাকতে চাইবে তুমি এখানে?” জুলিয়া মৃদু হাসল। “ভেনিসে একেবারে থেকে যেতে চাওয়া কি অদ্ভুত আবদার নয়?” 

কিছুদিন পূর্বেও শারলট নিশ্চিতভাবে সাড়া দিত এই বলে যে, সে থাকার কথা বলেনি। কিন্তু, এই মুহুর্তে সে কিছুই না বলে শুধুমাত্র তার মাথা ঘুরিয়ে নিল। যা জুলিয়ার ভেতরে একটা নিঃসঙ্গতার অনুভূতি সৃষ্টি করল। জুলিয়া নিশিচত করে জানে না যে, এই অনুভূতির সৃষ্টি কোন ঘাটতি থেকে। তবে তার কাছে এই ঘাটতি একই সঙ্গে যন্ত্রণাপ্রদ ও সংশোধনের অবকাশ রাখে।

তাৎক্ষণিকভাবে সে তার চারপাশে অন্য যাত্রীদের বাদামী-চোখের দৃষ্টি দেখতে পেল, যেগুলোতে তাদের মা-মেয়ের আলাপচারিতার প্রকৃতি দৃশ্যমান হচ্ছিল। এবং মুহুর্তের জন্যে জুলিয়ার নিজেকে মনে হল যে, সে স্থুল সম্পর্কের আভরণে নিজেকে সজ্জিত করে রেখেছে। মনে পড়ে গেল এক বছর পূর্বে, একটা পারিবারিক ছুটি কাটানোর সময়ে সে একজন মহিলাকে নিজের মেয়ের গালে চড় মারতে দেখেছিল। মেয়েটি ছিল শারলটেরই বয়সী। মহিলাটি ছিল সুন্দরী। তার মেয়েটিও। ফলে দৃশ্যপটটি কঠিন নাটকীয়তার সৃষ্টি করেছিল। 

“জল!” বলে সে পুনরায় চিৎকার করে উঠল। এ’সময়ে তারা ভেনিসের পাবলিক ওয়াটার বাস ‘ভাপোরেত্তো’ থেকে নেমে মানচিত্র অনুসরণ করে একটা নীরব সড়ক দিয়ে হোটেলের দিকে এগোচ্ছিল। জুলিয়া দৌড়ে অন্ধকারের ভেতরে ছোট্ট একটা সাঁকোর বাঁকের শীর্ষে আরোহণ করল। হাত থেকে স্যুটকেসটাকে নীচে নামিয়ে রাখল। তারপর সাঁকোর নীচ দিয়ে ফিতের মত বয়ে যাওয়া খালের শীতল স্থির জলকে পটভূমিতে রেখে নিজের দুহাত ছড়িয়ে দিল। সে আশা করেছিল যে, এতে শারলট হাসবে। এবং সত্যিই শারলট মান্যতার সাথে তা করল। “জল, জল সব জায়গায়!” জুলিয়া অবাক হয়ে চিৎকার করল। ফলে সাঁকোর উপর দিয়ে গমনাগমনরত অস্পষ্ট অবয়বের মানুষেরা তার দিকে ফিরে তাকাল।

হোটেল ডেস্কের লোকটি তাদেরকে একটা ত্রাত্তোরিয়া রেস্তোঁরা দেখিয়ে দিল। রাতের আহারের জন্যে। বছরের এই সময়ে খোলা থাকতে পারে ভেবে। যদিও সে নিশ্চয়তা দিতে পারল না। “যদি খোলা থেকে থাকে, তাহলে ভালই,” সে রহস্য করে বলল।

রাতে তিনবার জুলিয়া ঘুম থেকে জেগে উঠল। এক ধরণের শারীরিক তীব্রতার বোধ হতে। প্রতিবারেই সে অবাক হল বোধটিকে প্রবল তৃষ্ণা হিসেবে সনাক্ত করে। বার বার সে বিছানা থেকে উঠল। অস্থিরভাবে অন্ধকারের ভেতরে অস্পষ্ট হয়ে জেগে থাকা আসবাবপত্রের ভেতর দিয়ে আলোকিত ক্ষুদ্র অথচ আলোকিত বাথরুমে ছুটে গেল। জল পান করার জন্যে। জল পান করে বিছানায় ফেরার পথে প্রতিবারেই সে শারলটকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখল। অন্য বিছানায়। প্রতিবারেই সে শারলটের জন্যে তীব্র মায়া বোধ করল। অবোধ্য কোন কারণে। 

পরদিন সকালে শারলটও দাবী করল যে, বিগত রাতে সে অনেকবারই ভ্রমণ করেছে জলের অনুসন্ধানে। জুলিয়ার কাছে বিষয়টি অসম্ভব বলে মনে হল। কারণ সারারাত সে প্রহরীর মত ঘরের ভেতরে ঘোরাফেরা করেছে এবং একবারের জন্যেও শারলটকে দেখতে পায়নি নড়াচড়া করতে।

ব্যাপারটিকে এরকমভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। শারলটের রাতটি জুলিয়ার রাত হতে ভিন্ন কোন রাত ছিল। পরস্পরের সমান্তরাল স্বাধীন দুটি জগত। যে জগত দুটিতে তাদের দুজনেরই সদ্য সাবালিকত্ব প্রাপ্তি ঘটেছিল। 

পরেরদিন সকাল। বাগানের দিকে মুখ করা ছোট্ট ব্রেকফাস্ট কক্ষে কফি এবং বড় একটি রুপোলী জগে দুধ দেয়া হয়েছিল। জগটির চকচকে পৃষ্ঠদেশে জুলিয়ার বিকৃত প্রতিচ্ছবি নড়াচড়া করছিল। এর ভেতর দিয়ে গিবসন পরিবারের দুই সদস্যই অন্য সকল অতিথিদেরকে তীর্যক দৃষ্টিতে নিরীক্ষা করছিল। অতিথিদের মধ্যে ছিল একজন বাদামী মুখের কৃশকায় ভদ্রলোক। গাঢ় নীল রঙের স্যুট পরিহিত। তার পাশেই বসেছিল একটি অল্প বয়সী বালক। বালকটির মুখে নিষ্পাপ ভদ্রতা প্রকাশিত হচ্ছিল। তার কাল চুলগুলো নিপাটভাবে তার মুখমণ্ডল থেকে পেছনের আঁচড়ানো ছিল। তারা খুব এক্সেন্টসহ ইংরেজীতে পরস্পরের সাথে আলাপ করছিল। সেখানে আরও একটা পরিবার ছিল। দুজন বয়স্ক পুরুষ ও নারী এবং দুইজন ছোট কিন্তু উজ্জ্বল চুলের শিশু। যারা সারাক্ষণই হাসছিল। পরস্পরের দিকে তাকিয়ে। এমনকি অন্যদের দিকে তাকিয়েও। 

“আমার মনে হচ্ছে খাবারটি খুবই লবণাক্ত হয়েছে,” শারলট বলল।

“হতে পারে,” জুলিয়া বলল। “তবে আমি টের পাচ্ছি না।” 

“অবশ্যই লবণাক্ত হয়েছে। আমি নিশ্চিত যে, তারা অনেক বেশী লবণ দিয়েছে।” 

“লোকটি ও তার নাতি কেউই ইংরেজ না হওয়া স্বত্বেও ইংরেজিতে কথা বলছে কেন? এ বিষয়ে তোমার ধারণা কি?” 

শারলট তাদের দিকে চকিত দৃষ্টিতে তাকাল এবং নিজের অজ্ঞতা প্রকাশ করল।

“হতে পারে যে, শিশুটি তার নাতি নয়,“ সে বলল। 

“ঠিক আছে, নাতি ছাড়া কি হতে পারে সে?”

“খাবারে লবণ বেশী হবার সাথে এই বিষয়টা কিভাবে সম্পর্কিত হতে পারে?” 

জুলিয়া খেয়াল করল যে, শারলট তার চুলগুলোকে কানের কাছে গুচ্ছ করে জড়ো করেছে এবং সেগুলো ছিপির মত মাথা থেকে পাশে ঝুলে আছে। সে একটা ফিরোজা রঙের ক্ষুদ্র আংটি তার গলার চিকন রুপোর চেইনের উপরে পরে ছিল। এবং তার কবজি থেকে ভারী মেটালের একটা ব্রেসলেট ঝুলছিল। ডেভিড ও জুলিয়ার দেয়া ঘড়িটির সাথে ব্রেসলেটটি ধাক্কা খাচ্ছিল। বার বার। জুলিয়া খেয়াল করে দেখল যে, শারলটের শান্ত চোখের পাতায় নীল রঙের মাসকারাও দেয়া ছিল। 

খাবারে লবণের ক্ষতিকারক প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে খনখন শব্দে শারলটের মনের দেয়ালে ধ্বনিত- প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। জুলিয়ার মনের ভেতরে একটি নতুন ভাবনা এসে ভর করল। সেটা হল যে, শারলটের বড় হয়ে উঠার স্বতন্ত্রতায়, শারলট নয়, জুলিয়া নিজেই শারলটের চুলের সাজ, মাসকারা, উদর ও বক্ষের মধ্যস্থিত পর্দা ইত্যাদি ক্রমশ পরিত্যাগ করেছে। জুলিয়া নিজেই শারলটের অনাকাঙ্ক্ষিত এই পরিবর্তনগুলোতে বিরক্ত হচ্ছিল। শিশুরা যাতে অস্তিত্ববান হয়ে উঠতে পারে - তাদেরকে সেই শিক্ষা দেয়ার জন্যে জুলিয়াকে অনেককিছুই শিখতে হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার এই পর্যায়ে এসে সে দেখতে পাচ্ছে যে, তার আপন শিক্ষাই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে নিজের নিজের সত্ত্বার প্রশ্ন উপেক্ষিত ও অনুত্তরিত রয়ে যাচ্ছে। এ সংক্রান্ত অসংখ্য উদাহরণই সে দেখেছে। তবে কেউই তাকে আশান্বিত করতে সক্ষম হয়নি।

“এখানে আগমন তোমার জন্যে খুব ভাল হয়েছে, তা আমি মনে করি না,” সে বলল। “তবে আমি অদ্ভুত রকমের পরিশুদ্ধ হয়েছি বলে মনে করি। তুমি কি তাই মনে কর না?” 

এই প্রথমবার সন্তুষ্টচিত্তে শারলট এই সমন্বিত চিন্তায় সায় দিল।

“হতে পারে,” সে বলল, মাথা নেড়ে। 

তারা হোটেলের সন্নিকটে অবস্থিত বিশাল এক পাবলিক আর্ট গ্যালারিতে গেল। সেখানে জুলিয়া দেখতে পেল অন্তসারশূন্য অথচ পণ্ডিতি ধরণের কিছু তৈলচিত্র। ইতালীয় তৈলচিত্রের ইতিহাসের গৌরবগাথা প্রকাশ করছে। ছাত্রী হিসেবে সে এক সময়ে ফ্লোরেন্সে শিল্পকলার উপরে কিছুদিন পড়াশুনা করেছিল। সেটার মৃদু স্পন্দন এখনও অনুভব করে সে তার নাড়ীর ভেতরে। এছাড়াও তাদের পরিবারে শিল্পকলাকে শুধুমাত্র আগ্রহের বিষয় বলে মনে করা হত না। ভাবা হত যে, ওটা আসলেই গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রত্যেকেরই উচিৎ সন্তানদের শিক্ষায় এটাকে অন্তর্ভূক্ত করা। গ্যালারীতে অবস্থানকারী বেশীরভাগ দর্শনার্থীই ছিল টুরিস্ট ঋতুতে আগমনকারী পর্যটক। সে ও শারলট গ্যালারীর কেন্দ্রে ককটেল পান করল এবং Giorgione এর তিনটা তৈলচিত্র দেখল। পরিশেষে তারা দুটো কক্ষে গেল, যেখানে Tintoretto এবং Veronese এর চিত্রকলা প্রদর্শিত হচ্ছিল। 

“আমরা আর এখানে সময় নষ্ট করব না,” জুলিয়া বলল। এখান থেকে আমরা সোজা আসল জায়গায় চলে যাব।” 

“আমাদের কি সবকিছুই দেখে যাওয়া উচিৎ নয় কি?” শারলট জানতে চাইল ছবির দেয়ালের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে। যেগুলোর দিকে জুলিয়া একবারের জন্যেও তাকাল না। 

আমি পারি না, জুলিয়া বলতে চাইল। কিন্তু কি সে পারে না, সে সম্পর্কে ভাবাও তার নিকটে সময়ের অপচয় বলে মনে হল। কোনভাবেই তার গাছের সংযোজক টিস্যু, কান্ড, পল্লবগুচ্ছ ইত্যাদির ভেতরে হারিয়ে যাওয়া চলবে না। জীবনের এই বিষয়গুলো নিয়ে সে অনেক বেশীই জানে। একসময়ে সে শুধু বড় পুষ্প, স্বর্ণ – এগুলোই খুঁজত। কারণ এই নয় যে, সে উদ্ধত ও স্থূলচর্ম বিশিষ্ট মানুষ ছিল। কারণ ছিল, হৃদয়ের ভেতরের নির্জনতা ও বন্যতা। যে হৃদয় ছিল এমন একটা ল্যান্ডস্কেপ, যা অন্যদের চাহিদা দিয়ে কাল বর্ণে পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল এবং যার ভেতরে শুধুমাত্র বেঁচে থাকার জ্ঞান অবশিষ্ট ছিল। অনেকটা আগ্নেয়গিরিময় ভূমির মত, যেখানে আবেগের আগমন হত বিশাল আয়তনের উষ্ণ ও সাংঘর্ষিক অনুভূতি সহকারে। তখন প্রায়শই সে নিজেকে রাজকীয় ভাবত, যদিও সেটাও তার ভেতরে বেদনার অনুভূতি সৃষ্টি করত। 

Carpaccioর তৈলচিত্রের একটা প্রদর্শনী চলছিল সেখানে। II Sogno di sant'Orsola তৈলচিত্রটি শারলটের খুবই মনঃপুত হল। অন্যদিকে জুলিয়ার দৃষ্টি আটকে গেল আরেকটি তৈলচিত্রর উপরে। এটি ছিল মেরীর জীবনের ধারাবাহিক দৃশ্যপট সম্বলিত একটি সিরিজ। বাড়ির একটা দৃশ্যমান কক্ষে কতগুলো মহিলা গৃহস্থালির কাজ করছে। শিশু মেরী সদ্য জন্ম গ্রহণ করেছে। তার মা কনুই এর উপরে ভর করে বিছানায় শুয়ে আছেন। কর্মরতা মহিলাদের দিকে তাকিয়ে। তার মুখের প্রকাশভঙ্গী থেকে জুলিয়ার মনে হল যে, কেউ একজন তার শরীর থেকে চলে গিয়ে পুনরায় অন্য একজন হয়ে ফেরত এসেছে। শারলটের তৈলচিত্রটিও ছিল অসাধারণ সুন্দর। সন্ত উরসুলার হলুদ রঙের চুলগুলো খাড়াভাবে তার ক্ষুদ্র অথচ পরিচ্ছন্ন সাদা বিছানার উপরে এলিয়ে পড়েছিল। তার কক্ষটির সবকিছুই ছিল খুবই পরিপাটি করে বিছানো। একজন সুদর্শন চেহারার যুবক দেবদূত দাঁড়িয়ে ছিল এবং তাকে ঘুমাতে দেখছিল। পরবর্তীতে সে গিফটশপ থেকে একটা বুকমার্ক কিনেছিল। সেখানে সেই দেবদূতের ছবি ছিল। 

গ্যালারী থেকে বেরিয়ে তারা সূর্যের গোলাপী আলোতে গোলকধাঁধায় ভরা ভেনিস শহরের যত্রতত্র ঘুরে বেড়াল। খাল ও সাঁকোগুলোর সৌন্দর্য, অপ্রত্যাশিত পিজাঘর, নির্জন গলিপথ, লুকায়িত ও ক্রমশ বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যেতে থাকা গির্জা - সকল কিছুকেই প্রত্যক্ষ করল। এই সময়ে জুলিয়া শারলটের জামার হাতাগুলো দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার সময়ে অনুভব করল যে, সেগুলো পূর্বের চেয়ে কম পিচ্ছিল লাগছে। ফলে সহজেই তাদের পারস্পারিক কথোপকথন উষ্ণতা পেল এবং তারা অতীতের স্বাভাবিক সম্পর্কে ফিরে গেল। সাময়িক সময়ের জন্যে হলেও। বলতে গেলে এই সমস্ত নান্দনিক সৌন্দর্যগুলো জলিয়ার ভেতরের কুৎসিত অনুভূতি গুলো থেকে তার দৃষ্টিকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে গেল। সুতরাং যখন সে একটা ক্ষুদ্র শপের জানালায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেল, সেখানে সে সম্ভাবনার প্রহেলিকা দেখতে পেল। বিকেলে রেস্টুরেন্ট থেকে ফিরে আসার পর হোটেলের সিঁড়িতে তারা পূর্বের সেই বয়স্ক ভদ্রলোক ও বালকটিকে দেখতে পেল। লোকটি একটু পিছু হটে আন্তরিকভাবে আনত হয়ে বলল, “buona sera” এবং বালকটি মৃদু হাসল। বোঝা গেল যে তারা খুশী হয়েছে।

সকালে ব্রেকফাস্ট কক্ষে নতুন লোকজন দেখা গেল। এদের একজন ইংরেজ যুবক। বিশোর্ধ বয়স। দীর্ঘদেহী। দোকান থেকে সদ্য কিনে আনা পদ্মফুলের মত সতেজ। কালো ফ্রেমের চশমা চোখে। খুবই ফ্যাশনেবল। পরনে হালকা হলুদ রঙের কর্ডের ফুলপ্যান্ট। স্বতস্ফুর্তভাবে হেঁটে বেড়াচ্ছিল এবং সঙ্গীর জন্যে খাবার নিচ্ছিল। সঙ্গী ছিল একজন টাকমাথার খাটো মানুষ, খশখশে পশমির স্যুট পরা। তারা জুলিয়া ও শারলটের দিকে তাকিয়ে হাসল, পরিচিতের মত। শারলট বলল যে, রাতে সে কয়েকবার ঘুম থেকে সে আবার উঠেছিল জলপান করার জন্যে। জুলিয়া নিজেও বোতল ভর্তি করে বিছানার পাশে রেখেছিল, এবং সারারাত ধরে সে পান করেছে। 

“তুমি লাকি,” শারলট বলল। “আমাকে প্রতিবারেই বিছানা থেকে উঠে যেতে হয়েছিল।” 

“তাহলে আজ রাতে তুমি আমার মত করতে পার।“

“আমি অন্তত ছয়বার উঠেছি।“

“আমি আজ রাতে তোমার জন্যে জল ভরে রাখব। তুমি বিছানা থেকেই পান করতে পারবে।“ 

জুলিয়া বলল যে, তাদের একদিন Tintorettoর জন্যে বরাদ্দ করা উচিৎ। এই শিল্পী সারাজীবন ভেনিসে বসবাস করেছেন এবং পুরো শহর জুড়ে তার কাজগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। Scuola di San Rocco’তে একটা বিশাল কক্ষ আছে, যেটির দেয়ালে ও ছাঁদে তিনি যীশু খ্রিষ্টের সমস্ত জীবনকে প্রতিবিম্বিত করেছেন। শারলটের হতাশ চোখ বিস্ফারিত হল তার খাবার প্লেটের উপরে। 

“তুমি কি যেতে চাও না?”

শারলট কোন কথা বলল না।

“আমরা গতকালই তৈলচিত্র দেখতে গিয়েছিলাম,” শারলট শেষ পর্যন্ত উত্তর করল। “আমি ভেবেছিলাম যে, আজ আমরা অন্যকিছু করতে যাব।” 

“যেমন?”

“আমি জানি না। ধর, শপিং অথবা সে ধরণের কিছু করতে।” 

জুলিয়ার বান্ধবীরা প্রত্যেকেই জুলিয়ার চেয়ে অনেক বেশী শক্তভাবে বিশ্বাস করে যে, পৃথিবী হল একটা ভয়ানক ও বিপদজনক জায়গা, যেখানে সন্তানদের ইচ্ছাপূরণ করতে যাওয়া হল আবেগকে প্রশ্রয় দেয়া।

“আমরা এখানে শপিং করতে আসিনি,” জুলিয়া বলল।

কথাটা বলে জুলিয়া শারলটকে লজ্জা দিতে চাইল। কিন্তু শারলট লজ্জিত হল না।

“দোকানগুলোও তো এই শহরেরই অংশ, যেমন করে অন্যগুলো।”

“পাঁচশতাব্দী পুরোনো মূল্যবান কি কি জিনিস আছে, সেগুলোতে?“

“ অবশ্যই!” শারলট উদ্ধতভাবে মাথা নেড়ে বলল। “কোনকিছু শুধুমাত্র পুরোনো বা নির্দিষ্ট কোন মানুষের পেইনটিং হলেই তা মূল্যবান হয়ে যায় না।” 

Tintorettoর Slaughter of the Innocents দেখার পর জুলিয়ার পূর্বধারণা নিশ্চিত হল যে, পৃথিবী পূর্ব হতেই একটা ভয়ঙ্কর ও বিপদজনক স্থান। মিউজিয়ামের ইমারতটি ছিল বিষণ্ণ ধরণের। কবর বা স্মৃতিসৌধের মত শীতল। ভগ্নোদ্যম হবার মত একটা পরিবেশ সর্বক্ষণ বিরাজ করছিল সেখানে এবং জীবনের প্রতিপক্ষে যায় এমন সকল পেইনটিং আবিষ্কারের একটা আতিশয্য সৃষ্টি করে রেখেছিল। চিত্রগুলো দুইটি ফ্লোরের প্রতিটা দেয়াল এবং সিলিঙ জুড়ে ছিল। শারলট একটা চেয়ারে অগোছালোভাবে বসেছিল এবং কোনকিছুর দিকেই তাকাচ্ছিল না। জুলিয়া যথেষ্ট সময় নিয়ে প্রতিটা চিত্র দেখছিল। অত্যুৎসাহের সাথে। দেখে মনে হচ্ছিল কিছু একটা তাকে সর্বক্ষণ উদীপ্ত করে রাখছে। কিন্তু কী সেটা? মেয়েদের শরীর এত বিস্ময়কর যে, তারা তাদের নিজেদের জমে যাওয়া জ্ঞান নিয়েই অক্ষম হয়ে বসে থাকে। Tintoretto নারীর শরীরকে এমনভাবে এঁকেছেন যে, তার মাংশল কাঁধ ঈষৎ কাঁত এবং মাথাটি একদিকে ঘুরে আছে। এমন যে, সে মনোযোগের সাথে কারো কথা শুনছে। জুলিয়ার মানসপটে জবাবদিহিতার একটা দৃশ্য ফুটে উঠল। সে কর্তিত মৃত শিশুদের অবয়ব, তাদের ছোট ছোট পা, তাদের নরম বাহু, তাদের কোমল মাথাগুলোর দিকে নিবিড়ভাবে তাকাল। যেহেতু সে নিজের সন্তানদেরকে ভালবাসে, সেহেতু এই মূহুর্তে তার মনে হল যে, এই ভালবাসা হল একটা বিশাল খরচ, যা সে কিস্তিতে কিস্তিতে শোধ করে আসছে। কিন্তু সে বিগত দিনগুলোতে কখনই অনুধাবন করতে পারেনি এই ভালবাসার ভেতরে তার কতটুকু আন্তরিকতার বিস্তার ছিল। নিজেকে তার মনে হচ্ছিল একটা সুদীর্ঘ নাটকের অভিনেত্রী, যাকে প্রতিরাতেই একই নাটকের পুনরাবৃত্তি করতে হয়েছে এবং অভিনয় শেষে একই অবসাদে আক্রান্ত হতে হয়েছে। প্রতিনিয়ত এই মাশুল প্রদান করার বিষয়টিই তার কাছে হতবুদ্ধিকর মনে হয়। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মস্তক ও হাতগুলো দেখে এই অনুভূতিই তার ভেতরে বিষণ্ণ অথচ সহমর্মী তরল অশ্রু প্রবাহের সৃষ্টি করল। অবশ্য তর্কের মূহুর্তে ডেভিড অনেক সময়েই তাকে কাঁদিয়ে দিত। সেই কান্না ছিল তাদের বিশাল প্রাচীন বাড়ির অন্তঃস্থলে, প্রাচীন কোন জলপ্রবাহ সংঘটিত হবার মত। ট্যাপ খুলে দেবার পর লম্বা গজরানির মত, যার শেষে তীব্রবেগে গলগল করে বাদামী জল নির্গত হতে থাকে। 

রিয়ালতো সাঁকোর নিকটে একটা দোকান থেকে শারলটকে রক্তবর্ণের কাঁচ দিয়ে তৈরী একটা ডলফিন কিনে দিল। শারলট ডলফিনটি পেয়ে খুশী হয়েছে বলে জানাল। গোধূলির গোলাপী ও নীল আভায়, ব্যস্ত রাস্তায়, বিশাল, বিবর্ণ শীতল খালের পাশে যেখানে ‘ভাপোরেত্তি’ দুধের মত সাদা জলের উপরে লাঙ্গলরেখার সৃষ্টি করেছিল, সেখানে মা-মেয়ের অমিলগুলো দোলায়িত হতে লাগল। পারস্পারিক শান্ত ও আরামদায়ক লেনদেন হিসেবে। একের পর এক। অপ্রীতিকর, অথচ প্রয়োজনীয় কিছু কার্যক্রম সম্পাদনের মত, যেগুলোর মধ্য দিয়ে দুজনেই ক্রমশ আরোগ্য লাভ করছিল। জুলিয়া শারলটের পছন্দগুলোর মূল্য দেয়ার জন্যে প্রস্তুত ছিল, কিন্তু শারলটের ডলফিন পছন্দের বিষয়টি তার ভেতরে শুধুমাত্র সহানুভূতির অনুভূতিই সৃষ্টি করল। কিভাবে সে একটা মেয়েকে যে, ব্যগ্রভাবে ডলফিন কামনা করে, তাকে দোষ দিতে পারে? জুলিয়া তাকে এক ব্যাগ চকলেট এবং একটা স্প্যানিশ ফ্যান কিনে দিল। ওটার উপরে সান মার্কোর চত্বর আঁকা ছিল। 

রাস্তার পাশের ক্ষুদ্র একটা অগোছালো দোকানে তারা প্রায় একঘন্টা সময় ব্যয় করল একটা ভেনেশীয় মুখোশের দিকে তাকিয়ে। যখন বাইরের শহর ভরে যাচ্ছিল কুয়ার তলায় বসে থাকা পুঞ্জীভূত অন্ধকার দিয়ে। দোকানটি ছিল উষ্ণ, ধূলিমলিন, বৈদ্যুতিক বাল্ব দ্বারা উজ্জ্বলভাবে আলোকিত। দোকানের শরীর থেকে কাঠ ও রঙের গন্ধ বেরুচ্ছিল। কাউন্টারের পেছনে বসে থাকা ইতালীয় যুবতী মেয়েটি তাদেরকে বলেছিল যে, অতীতে ভেনিসের রমণীরা শুধুমাত্র কার্নিভালের সময়েই মুখোশ ব্যবহার করত না, তারা এটাকে ব্যবহার করত রহস্যময়তার যন্ত্র হিসেবে। শারলট একটা নিয়ে নিজের মুখে দিল। মুখোশটি পাখির পালক দ্বারা অলঙ্কৃত করা ছিল এবং সেটার চোখের চারপাশ প্রাচীন ভেনিসীয় স্বর্ণমুদ্রা সিকুয়েন ঝোলানো ছিল।

“কেমন লাগছে, আমাকে?” সে বলল।

অতঃপর সে উল্টো ফিরল এবং আয়নার ভেতরে নিজের দিকে তাকাল। মহিলারা কেন এই ছদ্মবেশ ধারণ করতে চাইত, সে সম্পর্কে সে কিছুই জিজ্ঞেস করল না। জুলিয়া অবাক হল এ বিষয়ে সে জানে কিনা, তা ভেবে। সে দেখল তার মেয়ে আনন্দে উদ্বেলিত ও উদ্ভাসিত হচ্ছে শুধুমাত্র পাওয়ার বাসনা থেকে। জানার ইচ্ছে থেকে নয়। যে প্রাপ্তি শুধুমাত্র জীবনকে নিয়ে যায়, যৌবনের প্রবৃত্তি তাকে যেখানে নিয়ে যেতে বলে। 

“খুব রহস্যময়ী!” মহিলাটি জোরে বলে উঠল হাসতে হাসতে, যেন সে তার দোকানে ক্রেতাদের কাজকর্মে – যেমন শারলট যে কাজটি এ মুহূর্তে করল – একেবারেই ক্লান্ত নয়। 

শারলট অদ্ভুত নিষ্ঠুর পালক পরে তার মায়ের দিকে তাকাল।

“এটা কি আমি নিতে পারি?”

“আমি মনে করি, না,” জুলিয়া চোখে হাসির ঝিলিক নিয়ে মহিলাটির দিকে তাকিয়ে বলল।

“কেন, না?”

“কারণ আমি মনে করি না যে, তুমি এটা ব্যবহার করবে।“

“আমি করব!”

“এবং তুমি ইতিমধ্যেই অনেককিছু কিনেছ বলে,” জুলিয়া বলল পুনরায় হাসির ঝিলিক দিয়ে।

শারলট পুনরায় ফিরে নিজেকে আয়নায় দেখল।

“সে ক্ষেত্রে আমি নিজেই ওটা কিনব,” সে বলল, নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে।

জুলিয়া কোট খুলল এবং দরজার কাছের মুখোশগুলোর দিকে তাকাল।

“কাম অন ডার্লিং,” সে বলল।“ আমাদের ইতিমধ্যেই দেরী হয়ে গেছে। আমি নিশ্চিত যে, সিনোরা তার দোকান বন্ধ করে দিতে চাচ্ছেন।“ 

মহিলাটি আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা হাসির ভঙ্গি করল, এমন বুঝাতে যেন এরকম জিনিস চাইবার ব্যাপারে তার কোনো মতামত নেই। 
“এটার দাম আমি নিজেই দেব। তুমি আমাকে এখন দাও, আমি তোমাকে পরে দিয়ে দেব।“

“আমার কাছে টাকা নেই,” জুলিয়া কোমল স্বরে বলল।

“তোমার কাছে অবশ্যই আছে!”

“না, নেই। সব টাকাই খরচ হয়ে গেছে।“

“ডিনারের টাকা তাহলে কিভাবে দেবে?” শারলট মুখোশের পেছন থেকে উদ্ধতভাবে বলল।

কিছুক্ষণের বিরতি।

“চল যাই এবং এ নিয়ে আমরা কথা বলি,” জুলিয়া অর্থপূর্ণভাবে বলল। 

“আমরা আগামীকালও ফিরে আসতে পারি।“

“আগামীকাল, না,” দুজনের কথার ভেতরে মহিলাটি বাধা প্রদান করল। “আগামীকাল আমরা ছুটিতে থাকব।“

“দেখ, তারা আগামীকাল দোকান বন্ধ রাখবে। আমাদেরকে এখনই কিনতে হবে।“

তিনজনেই পরস্পরের দিকে তাকাল।

“শারলট,” জুলিয়া বলল। “আমি যাচ্ছি।“

সে তার হাতকে দরজার তামার হাতলের উপরে রাখল। মহিলাটি উল্টোদিকে ফিরে কাউন্টারের পিছনে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। অন্য কিছু নিয়ে। জুলিয়া দরজা খুলল এবং বাইরের শীতল বাতাসকে ভেতরে আসতে দিল। কিন্তু শারলট আসল না। রাগে জুলিয়া দোকান হতে বের হয়ে আসল এবং পেছনের দরজা বন্ধ করে দিল। অন্ধকারের ভেতরে পাথরের ছোট গলির ভেতরে দাঁড়িয়ে সে দোকানের জানালা দিয়ে ভেতরের উজ্জ্বল নাট্যমঞ্চের দিকে তাকাল। সেখানে তার মেয়ে ও মহিলাটি দুই অভিনেত্রী হিসেবে দাঁড়িয়েছিল। শারলট তার হাত থেকে মুখোশটিকে ধীরে ধীরে পড়ে যেতে দিল। মাথা নীচু করে সে সেটিকে তুলে তাকের উপরে রাখল। মহিলাটি এবারে তার বাহু ভাঁজ করে তীর্যকভাবে জানালা দিয়ে কোনকিছুর দিকে তাকাল। শারলট তাকে অতিক্রম করতেই সে মাথা নাড়ল। এবং জুলিয়া কাঁচের ভেতর দিয়ে তাকে বলতে শুনল “arrivederci.”

“আমি দুঃখিত,” জুলিয়া বলল, শারলট বেরিয়ে আসার পর। যদিও সে আদৌ দুঃখিত ছিল না।

“আমাকে একা থাকতে দাও,” শারলট বলল, হাত ভাঁজ করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে।

পরবর্তীতে জুলিয়া দুঃখিত হয়েছিল। যখন সে থিওরিটি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেছিল। ওটাতে বলা হয়েছিল যে, পৃথিবী আসলেই একটা ভয়ঙ্কর ও বিপদজনক স্থান। এবং তখনই সে অনুভব করতে সক্ষম হয়েছিল যে, বাস্তব পৃথিবীর বহুবিধ বিশৃঙ্খলার কারণেই জুলিয়া নিজ কন্যার পরীক্ষামূলক সৌন্দর্যের ধারনাকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল। তাদের কি উচিৎ ছিল না পরস্পরের সাথে জড়িয়ে থাকা এবং একে অপরের সাথে সৌহার্দপূর্ণ আচরণ করা? ভাপোরেত্তোতে উঠার পর শারলট রাগান্বিত ও বিষণ্নভাবে পাশের আসনে বসে ছিল। এই সময়ে সে খেয়াল করল যে, তাদের বিপরীতদিকে উপবিষ্ট একটি মেয়ে তাদেরকে পর্যবেক্ষন করছে। মেয়েটি একটি শুভ্র সাদা উলের কোট এবং উঁচু হিলের জুতা পরেছিল। বয়স জুলিয়া ও শারলটের মাঝামাঝি হবে। ঠিক যেন সে জুলিয়া ও শারলটের মধ্যকার বয়সের পার্থক্যটাকে ঘুচিয়ে দিতে সক্ষম। সে কারণেই মেয়েটি সম্ভবত তাদের দিকে গভীরভাবে তাকাচ্ছিল। বড় বড় চোখ ও পরিষ্কার দৃষ্টি দিয়ে। তার সুডৌল চকচকে ঠোঁট দুটি নড়ছিল না। যতই সে জুলিয়ার দিকে তাকাচ্ছিল, ততই জুলিয়া কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা অনুভব করছিল। মেয়েটি দেখতে পাচ্ছিল যে, মা মেয়ে দুজনেই বিমর্ষ হয়ে আছে। এই সময়ে একটা ঘন বিবর্ণ কুয়াশা আকস্মিকভাবে খালটির উপরে নেমে আসল। জানালার ভেতর দিয়ে জুলিয়া দেখতে পেল দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা গন্ডোলাগুলোর মাথা উত্তেজিতভাবে জলের উপরে উঠছে আর নামছে। অন্ধকারের ভেতরে। এই উত্তেজনা জুলিয়ার ভেতরে পুনরায় অস্বস্তিকর অনুভূতির সৃষ্টি করল। উন্মাদনাকর অনুভূতি। সাদা বাতাস যেগুলোকে আবৃত করে রেখেছিল। 

“তোমার পছন্দেই আমরা আজ সবকিছু করব,” জুলিয়া পরেরদিন সকালে তাদের শেষ ব্রেকফাস্টের টেবিলে বলল। “বিকেল পাঁচটার পরে আমাদের ফ্লাইট। তুমি যা চাইবে, আমরা তাই করব আজ।“

“ঠিক আছে, শারলট বলল। তাকে খুব বেশী অবাক হতে দেখা গেল না। সে তার চেয়ারকে সোজা করে নিজের চারপাশে তাকাল নিরীক্ষার দৃষ্টিতে। 

“আমি এতটাই জলপান করেছি যে, আমার মনে হচ্ছে আমি আমার আত্মাকে ধুয়ে ফেলেছি,” জুলিয়া যোগ করল। 

“সেটা কি আদৌ ভাল হয়েছে?” শারলট জিজ্ঞেস করল।

যে জিনিসটা জুলিয়ার সন্তানদের বিষয়ে খুব পছন্দ, তা হল এরকম। সন্তানরা সেই স্থান থেকেই শুরু করে, যা বড়রা অতিক্রম করে এসেছে। অনেকটা রিলে দৌড়ে হাতকে প্রসারিত করে ব্যাটনের আগমনের জন্যে ট্র্যাকের উপরে অপেক্ষা করার মত। সেখান থেকেই তারা ব্যাটন হাতে তুলে নেয়, যা ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয় হয়ে গেছে এবং যাকে নতুন করে বাছাই করে নেয়া সম্ভব নয়। সেখান থেকেই সন্তানরা দৌড় শুরু করে। দৌড়ায় তাদের লম্বা ও রোগা পদক্ষেপ দিয়ে। বড়দের সকল ব্যর্থতা অথবা সন্তুষ্টি অথবা ক্লান্তিকর দোদুল্যমানতাকে সঙ্গী করে। 

“জুলিয়া বলল, “আমি নিশ্চিত যে এটাই সঠিক কাজ।“ 

তারা Tintorettoর বাসস্থানের কাছে গির্জার মন্দিরে একটা তৈলচিত্র খুঁজে পেল। চিত্রটিতে মেরী একজন সোনালী শিশু-মেয়ে। মেরী আলোর বন্যার ভেতর দিয়ে বৃত্তাকার বিশাল একটা সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে উঠছে। বড় বড় বয়স্কা নারীরাও সেখানে আছে। সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে অথবা বসে আছেন। তাদের মধ্য দিয়েই পথ তৈরী করেই সে এগিয়ে যাচ্ছে। সিঁড়ির শীর্ষদেশে দীর্ঘদেহী একজন শ্মশ্রুধারী মানুষ, যাজকগণের পরিচ্ছদ পরিধান করে অপেক্ষা বা বিচার করছেন। মেয়েটি তাকে অতিক্রম করে যেতেই নারীরা তার দিকে সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারা তাকে নিয়ে ভয়ে ছিল। তারা দেখছিল নতুন কিছু।





অনুবাদক পরিচিতি
মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ
গল্পকার। অনুবাদক।
ঢাকায় থাকেন। 

1 টি মন্তব্য:

  1. গল্পটি ভালো। মা ও মেয়ের সম্পর্কের জটিলতা এর উপাদান হলেও, গল্পটি গভীর অন্তস্পরশী। শেষ অবধি শারলটই জুলিয়াকে ছেড়ে নিজের মত পথ করে নেবে সেই ইঙ্গিত আছে এখানে। প্রচলিত ঘরানার বাইরের গল্প।

    উত্তর দিনমুছুন