বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২০

হারুকি মুরাকামির গল্প - ইপানিমার মেয়েটি

ইংরেজী অনুবাদ-জে রুবিন
বাংলা ভাষান্তর- মৌসুমী কাদের


লম্বা, বাদামি, তরুণী ইপানিমার সুন্দরী মেয়েটি হেঁটে যায়
সে হাঁটে যেন সাম্বা তালে
ধীর লয়ে, মৃদু তালে দোলে
কেমন করে বলি, তাকে ভালোবাসি আমি
হ্যাঁ, সুখী মনেই দিয়ে দিতে পারতাম তাকে পুরোটা হৃদয়

কিন্তু প্রতিদিন যখন সে সমুদ্রের দিকে যায়,
সে সোজা বরাবর তাকায়, আমার দিকে নয়।

১৯৬৩ সালে এভাবেই ইপানিমার মেয়েটি সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকত। এবং এখনও, ১৯৮২, সালে সে একইভাবে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার বয়স বাড়েনি। একটি চেহারায় বদ্ধ হয়ে সে সময়ের সাগরে ভাসছে। যদি তার বয়স বাড়ত, তার বয়স প্রায় চল্লিশের কাছাকাছি হত।

অথবা না। কিন্তু তাঁর একহারা শরীর হয়ত একইরকম থাকত না এবং তাঁর গায়ের রঙ হয়তবা এতটা রোদে পোড়া হত না। সে আগের সৌন্দর্য্য ধরে রাখত কিন্তু হয়ত তার তিনটা ছেলেমেয়ে থাকত আর প্রচন্ড সূর্যতাপে তার গায়ের চামড়া নষ্ট হয়ে যেত।

আমার রেকর্ডে অবশ্য মেয়েটির বয়স বাড়েনি। স্ট্যান গেটজের মখমলি টেনরস্যাক্সের সুরে জড়ানো ইপানিমার মেয়েটিকে ধীর দোলায় সব্সময়ই আকর্ষণীয়। আমি টার্নটেবিল রেকর্ড প্লেয়ারে ডিস্কটা বসাই। তারপর প্লেয়ারের পিনটা ডিস্কের খাঁজে দেই, আর সাথে সাথে সে দেখা দেয়।

কীভাবে বলি যে, আমি তাকে ভালোবাসি। হ্যাঁ, আমি খুশী মনেই তাকে আমার হৃদয় দিয়ে দিতাম। এই সুরটা সবসময় আমার হাইস্কুলের করিডোরের স্মৃতির কথা মনে করিয়ে দেয়- একটা অন্ধকার স্যাঁতস্যঁতে করিডোর। সেই কংক্রিটের মেঝে দিয়ে হেঁটে গেলে তোমার পায়ের ধাপের প্রতিধ্বনি মাথার সিলিং পর্যন্ত শোনা যেত। করিডোরের উত্তর দিকে কিছু জানালা ছিল যেগুলো পাহাড় দিয়ে ঢাকা পড়ে ছিল। আর একারণেই করিডোরটি সবসময় অন্ধকার থাকত। এবং এটা প্রায় সবসময় নীরব থাকত, অন্তত আমার স্মৃতিতে।

আমি ঠিক নিশ্চিত না কেন ‘ইপানিমার মেয়েটি’ আমাকে সেই করিডোরের কথা মনে করিয়ে দিত। এদের দুজনের মধ্যে একেবারেই কোন সম্পর্ক ছিল না। আমি অবাক হই, ১৯৬৩ সালের ইপানিমার মেয়েটি কীভাবে আমার চেতনা গহ্বরে নুড়ি পাথর ছুঁড়ে দিয়েছিল।

যখন আমি হাইস্কুলের সেই করিডোরের কথা ভাবি, তখন আমার একটা পাঁচমিশালী সালাদের কথা মনে হয়: লেটুস, টমেটো, শশা, কাঁচামরিচ, আসপারাগাস, পেঁয়াজকুচি, এবং ‘পিংক থাউজেন্ড আইল্যান্ড’ ড্রেসিং। এমন না যে করিডোরের শেষপ্রান্তে কোন সালাদের দোকান ছিল। না, ওখানে শুধু একটা দরজা ছিল এবং তার পেছনে মলিন একটা ২৫ মিটারের সুইমিংপুল ছিল।

তো, কেন সেই পুরোনো হাইস্কুলের করিডোরটি আমাকে পাঁচমিশালী সালাদের কথা মনে করিয়ে দিত। এদুটোর মধ্যেওতো কোন সম্পর্ক ছিল না। তারা কেবল দৈবক্রমেই একত্রিত হয়েছে, যেন এক দুর্ভাগা নারী সদ্য রঙ করা কোন এক বেঞ্চটিতে নিজেকে খুঁজে পেয়েছে।

পাঁচমেশালী সালাদ আমাকে একটা মেয়ের কথা মনে করিয়ে দেয় যাকে আমি তখন একটু চিনতাম। এদুটোর মধ্যে একটা যৌক্তিক মিল আছে কারণ এই মেয়েটি যা কিছু খেত তা হচ্ছে কেবলি সালাদ।

‘ঐ (কড়্মড় চিবানোর শব্দ) ইংরেজীর হোমওয়ার্কটা (কড়্মড় কড়্মড়) শেষ করেছো?’

‘পুরোটা না (কড়্মড় কড়্মড়)। এখনও আরো একটু (কড়্মড় কড়্মড়) পড়তে হবে।’

আমি নিজেই সালাদের ভক্ত, তাই যখন তাঁর সাথে ছিলাম, আমরা দুজনই সালাদের মত পাঁচমেশালী কথাবার্তা বলতাম। মেয়েটির দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, যদি পর্যাপ্ত পরিমাণে শাকসবজিসহ ভারসাম্যযুক্ত আহার খাওয়া যায় তাহলে সবকিছুই ভাল থাকে। যদি সবাই সবজি খেত তাহলে এই পৃথিবী খুবই সুন্দর ও শান্তির একটা জায়গা হতো, ভালোবাসা এবং সুস্বাস্থ্য দিয়ে ভরা থাকত। কিছুটা ‘দ্যা স্ট্রবেরী স্টেটমেন্ট বইটির মত।

‘অনেক অনেক আগে, একজন দার্শনিক লেখেন, ‘একটা সময় ছিল যখন বস্তু এবং স্মৃতি আলাদা ছিল অধিবিদ্যার অতল গহ্বর দিয়ে।’

১৯৬৩/১৯৮২ সনের ইপানিমার মেয়েটি অধিবিদ্যার সেই রূপক সৈকতের তপ্ত বালুর উপর দিয়ে নীরবে হাঁটছিল । এটা খুবই দীর্ঘ একটি সৈকত, শান্ত সাদা ঢেউয়ে জড়ানো। কোন বাতাস নেই, দিগন্তে কিছু দেখার নেই। শুধু সমুদ্রের ঘ্রাণ। এবং সূর্য, তাপে পুড়ছে।

সৈকতের একটি বড় ছাতার নিতে হাত-পা ছড়িয়ে বসে কুলার থেকে একটা বিয়ারের ক্যান নিয়ে আমি ট্যাবটায় টান দিই। মেয়েটি তখনও হাঁটে, একটা হালকা রঙের বিকিনি তাঁর লম্বা রোদে-পোড়া শরীর আঁকড়ে আছে।

চেষ্টা করে বললাম, ‘হাই, কেমন চলছে?’

‘ও, হ্যালো’, সে বললো।

‘একটা বিয়ার চলবে?’

সে একটু দ্বিধা করলো, কিন্তু হাঁটাচলা করে সে ক্লান্ত এবং তৃষ্ণার্ত ছিলো, ‘আমার ভাল লাগবে,’ সে বললো।

এবং দুজনে মিলে ছাতার নিচে বসে আমরা বিয়ার পান করি।

‘অন্য প্রসঙ্গে বলি,’ নিজে থেকে কথা চালিয়ে যাই, ‘আমার নিশ্চিত মনে হয় যে, ১৯৬৩ সালে আমাদের দেখা হয়েছিল এই একই সময়ে, একই জায়গায়।’

‘সেটা মনে হয় অনেক আগের কথা,’ বলে সে মাথাটা একটু নাড়ালো।

‘হ্যাঁ,’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, তাই।’

সে এক ঢোকেই অর্ধেক বিয়ার খেয়ে ফেলে, তারপর ক্যানের ছিদ্র বরাবর তাকিয়ে থাকে। খুব সাধারণ বিয়ার ছিল সেটা এবং ছিদ্রটাও ছিল খুব সাদাসিধা, কিন্তু সে এমনভাবে ছিদ্রটার দিকে চেয়ে থাকে যেন এর কোন বিশেষ মানে আছে –পুরো পৃথিবীটাই যেন ঐ ছিদ্রের ভেতরে ঢুকে পড়বে।

‘মনে হয় আমাদের দেখা হয়েছিল ১৯৬৩ তে, নাকি? হুম...১৯৬৩। মনে হয় আমাদের দেখা হয়েছিল।’

‘তোমার বয়স একটুও বাড়েনি।’

‘অবশ্যই না, আমি একজন অধিদর্শনের রূপক মানবী।’

আমি মাথা নাড়িয়ে একমত হলাম। ‘সে সময় তুমি জানতে না যে আমার অস্তিত্ব আছে, তুমি সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে, আমার দিকে না।’

‘হতে পারে,’ সে বললো। তারপর স্মিত হাসলো। খুবই সুন্দর একটা হাসি কিন্তু খানিকটা বিষাদে ভরা।

‘হয়তো আমি সমুদ্রের দিকেই তাকিয়ে থাকতাম। হয়তো আমি আর কিছুই দেখতে পেতাম না।’

আমি নিজের জন্য আরেকটা বিয়ারের ক্যান খুললাম আর তাঁকেও একটা বাড়িয়ে দিলাম। সে মাথা নাড়লো, ‘আমি এত বিয়ার খেতে পারি না,’ সে বললো। ‘আমাকে আরও হাঁটতে হবে। কিন্তু ধন্যবাদ।’

‘তোমার কি পায়ের তলার চামড়া গরম হয়ে যায় না?’ আমি জিজ্ঞেস করি।

‘একেবারেই না,’ সে বলে, ‘ওগুলো পুরোই অধিদর্শনের। দেখতে চাও?’

‘ঠিকাছে।’

সে তাঁর লম্বা একহারা পা টা আমার দিকে বাড়ালো, তারপর পায়ের তলাটা দেখালো। সে ঠিকই বলেছে – ওটা ছিল চমৎকার রূপময় অধিদর্শনের পদতল। আমি একটু আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখি। না গরম, না শীতল। আমার আঙুল যখন তার পায়ের তলাটি ছুঁলো তখন একটা বিবর্ণ ঢেউয়ের শব্দ শোনালো। একটা অধিবিদ্যার শব্দ।

আমি এক মুহূর্তের জন্য চোখ বুজি, তারপর আবার খুলি এবং খুব দ্রুত এক ঢোক ঠাণ্ডা বিয়ার গলায় ঢেলে নেই। রোদ একটুও সরেনি। সময় থেমে যায়, যেন সেটি কোন আয়নায় শুষে গেছে।

‘যখনই আমি তোমার কথা ভাবি, আমার হাইস্কুলের করিডোরের কথা মনে পড়ে যায়,’ আমি তাকে এটা বলার সিদ্ধান্ত নেই, ‘ভাবি, এটা কেন হয়।’

‘মানুষের সত্তা জটিলতায় পূর্ণ,’ সে উত্তর দেয়। ‘বৈজ্ঞানিক নিরীক্ষার বস্তুগুলো আসলে বস্তুতে নয় বরং মানবদেহের মধ্যে থাকা বিষয়গুলোর ভেতরেই থাকে।’

‘হ্যাঁ?’

‘যে কোন পরিস্থিতিতেই তোমাকে বাঁচতে হবে। বাঁচো! বাঁচো! বাঁচো! এটাই সার কথা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিই হচ্ছে বেঁচে থাকা। আমি এতটুকুই বলতে পারি। আসলে এটাই সব। আমি শুধুই একটি মেয়ে যার অধিদার্শনিক একজোড়া পদতল আছে।’

১৯৬৩/১৯৮২’র ইপানিমার মেয়েটি ঊরু থেকে বালু সরিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। ‘বিয়ারের জন্য ধন্যবাদ।’

‘না, ঠিকাছে।’

মাঝে মাঝে - কখনও কখনও – আমি তাকে সাবওয়েতে দেখি। আমি তাকে চিনতে পারি আর সেও আমাকে চিনতে পারে। সে আমাকে সবসময় স্মিত হাসি দিয়ে ‘বিয়ারের জন্য ধন্যবাদ’ জানায়। সমুদ্রধারের সেই দিনটির পর আমাদের আর কোন কথা হয়নি, কিন্ত আমি বুঝি যে দুজনের মনের মধ্যে একটা যোগসূত্র আছে। আমি ঠিক জানিনা এই যোগসূত্রটা আসলে কী। হয়তো এই সূত্রটি দূর পৃথিবীর অদ্ভূত কোন জায়গা থেকে এসেছে।

আমি সেই যোগসূত্রটি কল্পনা করার চেষ্টা করি – যেটি আমার চেতনা-জগৎ থেকে নীরবে ছড়িয়ে পড়ে অন্ধকার হলওয়েতে যেখানে কেউ আসে না। যখন আমি এভাবে ভাবি তখন সকল ঘটনা, সকল বস্তু, তিল তিল করে আমাকে নষ্টালজিক করে তোলে। সেখানে কোথাও, আমি নিশ্চিত যে, ঐ সূত্রটি আমাকে আমার সাথে যুক্ত করছে। আমি নিশ্চিত যে, একদিন পৃথিবী থেকে দূরে অন্য অচেনা জায়গায় আমার সাথেই আমার দেখা হবে। এবং এটা নিয়ে যদি কিছু বলতে চাই তাহলে বলব, আমি চাই সেই জায়গাটি যেন উষ্ণ হয়। এবং যদি সেখানে কয়েক ক্যান ঠান্ডা বিয়ার পাওয়া যায়, তাহলে এর বেশী আর কী চাওয়ার থাকতে পারে? সেই জায়গায়, আমিই আমার স্বয়ং এবং আমার স্বয়ংই আমি। কর্তাই লক্ষ্য, আবার লক্ষ্যই কর্তা। কোন দূরত্ব নেই। একটা নিঁখুত মিলন। পৃথিবীর কোথাও না কোথাও এমন একটি অদ্ভূত জায়গা নিশ্চয়ই আছে।

১৯৬৩/১৯৮২র ইপানিমার মেয়েটি উষ্ণ সমুদ্রপার ধরে হাঁটতে থাকে। এবং সে কোন বিরতি না নিয়ে হাঁটতেই থাকবে যতক্ষন পর্যন্ত না শেষ রেকর্ডটি ক্ষয়ে যায়।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন