বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২০

মোহছেনা ঝর্ণা'র গল্প : মায়ের সাথে প্রথম দেখা

‘মায়ের সাথে প্রথম দেখা’ বাক্যটি পড়েই অনেকে হয়তো ভাবছেন এটা আবার কেমন কথা? জন্মের পর পরই তো মায়ের সাথে প্রতিটি সন্তানের প্রথম দেখা হয়। কিন্তু আমাদের ব্যাপারটা একটু ভিন্ন। জন্মের পরও আবার দীর্ঘ সময় পার করে মায়ের সাথে প্রথম দেখা হয়েছে আমাদের। 

বাবা আমাকে আর অনিককে বললেন, তোমাদের মা তোমাদের সাথে দেখা করতে চাচ্ছেন। তোমরা কি দেখা করতে চাও? আমি আর অনিক দু’জন দু’জনের দিকে তাকালাম। আমি তখন ক্লাস এইটে পড়ি আর অনিক ফাইভে।
মায়ের তেমন কোনো স্মৃতি আমাদের মস্তিষ্ক ভান্ডারে নাই। আমার তবু সামান্য কিছু যাও আছে অনিকের কিছু্‌ই নাই। সেজন্য অবশ্য তার দুঃখও নাই। সে বাবা অন্তপ্রাণ। তার জগৎটা বাবাকে ঘিরেই। কিন্তু মায়ের কথা ভুলতে পারি না আমি। ঝাপসা স্মৃতি তোলপাড় করে দেয় দৈনন্দিন বেঁচে থাকাকে। কেমন ছিল আমার মা? কি এমন ঝগড়া হয়েছে বাবার সাথে যে নাড়ীছেঁড়া দুটি সন্তানকে পর্যন্ত ছেড়ে যেতে হবে? হাজারটা প্রশ্নের আনাগোনা আমার ভেতরটাতে। অথচ মুখ ফুটে প্রশ্নগুলো কাউকে করার কোনো অবকাশ নেই। আমার মায়ের জন্য জমিয়ে রেখেছি আমি এক বুক অভিমান। মাঝে মাঝে তাকে খুব নির্মমও মনে হতো। আমাদেরকে ছেড়ে খুব ভাল আছে হয়তো, একথা ভেবে খুব রাগও হতো। ভাবতাম তিনি বোধ হয় আমাদের মা-ই নয়। কারণ মা তো এত নিষ্ঠুর নয়। 

আমার বাবা তার ছোট্ট দুটি দুধের শিশুকে বাঁচানোর জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করলেন। বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী আমাদেরকে মায়ের যে ভয়ঙ্কর রূপ দেখিয়েছে তাতে আর নিজের মায়ের প্রতিও আমাদের আর কোনো আকর্ষণ নেই। বরং আছে ভীতি। দ্বিতীয় মায়ের অত্যাচারে আমি আর অনিক অনেকটাই নিস্তেজ হয়ে গেছি। আমাদের কোনো কিছু বলার বা চাওয়ার অনুভূতি হয় না। আমাদের কোনো সুন্দর স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে করে না। সবকিছুতেই একটা সূক্ষ্ম যন্ত্রণাবোধ। 

এত কিছুর পরও বাবার প্রতি রয়েছে আমাদের সীমাহীন ভালোবাসা। কারণ সেই ছোট্টবেলা থেকে আজ পর্যন্ত শুধু আমাদেরকে ভালোবেসেই বাবা মুখ বুজে হজম করে গেছেন অনেক কিছু। মাঝে মাঝে মনে হয় এই জীবনের সবকিছু ছাড়তে পারব শুধু বাবাকে ছাড়া। বাবাই আমাদের স্বপ্ন সুখের বেঁচে থাকা। তাইতো হঠাৎ করে নিজের মায়ের আগমন এবং দেখা করার আকুলতা আমাদেরকে খুব একটা স্পর্শ করছে না। কি জানি ‘মা’ শব্দটির গভীরতা, তীব্রতা, ব্যাপকতা বোঝার মতো ক্ষমতা বোধ হয় নষ্ট হয়ে গেছে আমাদের। 

শেষ পর্যন্ত বাবা, মায়ের সাথে আমাদের দেখা করিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করলেন। বাবার দীর্ঘদিনের সহকর্মী মামুন চাচার স্ত্রী নাহার আন্টি আমার মায়ের কাজিন। আমাদেরকে ছেড়ে যাওয়ার পর থেকে মা, মামুন চাচা আর নাহার আন্টি থেকেই আমাদের খোঁজ খবর নিতেন। মামুন চাচার সাথে আমি আর অনিক খুব অসহায়ভাবে রওনা হলাম। সুন্দর একটা তিনতলা বাড়ি। মামুন চাচার নিজের বাড়ি। বাড়ির সামনে ছোট করে একটা লন জাতীয় জায়গা। তার আশেপাশে নানারকম গাছ-গাছালি। পাশে একটা ছোট্ট খাঁচায় দুইটা খরগোশ। অনিকের দিকে তাকাতেই দেখি ওর নজর পড়েছে খরগোশের প্রতি। দোতলার দরজা খোলাই ছিল। নাহার আন্টি ভেতর থেকে অনেকটা দৌড়েই এসেছে। কেমন আছে আমার বাবুগুলো দেখি তো বলে একদম বুকের কাছে নিয়ে কপালে চুমু খেলেন। নাহার আন্টি সব সময় এমন করেই ভালোবাসেন আমাদের। আমাদের বাসায় গেলেও জড়িয়ে আদর করেন। 

হঠাৎ করে ভেতরের দিকের দরজায় চোখ পড়তে দেখি তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। সবুজ রঙের একটা জামদানি ধাঁচের শাড়ি পরনে। ইন্ডিয়ান নায়িকা শ্রীদেবীর মতো মনে হচ্ছিল। এত সুন্দর! ছোটবেলা থেকে আমার মনে মায়ের যে একটা ঝাপসা ছবি ছিল সে ছবির সঙ্গে কোনো মিল নেই। নাহার আন্টি ডাকল, এই বকুল আপা দেখো কারা এসেছে। 

কতদিন পর মায়ের সাথে দেখা। তিনি যখন আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন আমরা দু’ভাই বোন বুঝতেই পারছিলাম না আমরা কি করব? সম্ভবত তিনিও পারছিলেন না। সচরাচর নতুন মানুষ দেখলে যা করি সালাম দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি এখানেও তাই করলাম। কিন্তু সচরাচর অন্যপক্ষ থেকে যেমন হয় উত্তর দিয়ে বসতে বলে কিংবা কেমন আছ টাইপের প্রশ্ন করে। এখানে সেরকম কিছু হলো না। তিনি হঠাৎ করেই দ্রুত গতিতে ভেতরে চলে গেলেন। আমার কেন জানি মনে হলো তিনি নিজেকে হালকা করতে গেলেন। তার চোখ দুটি অসম্ভব ভারী মনে হচ্ছিল আমার কাছে। 

আমরা দু’ভাই বোন খুব সংকোচ নিয়ে বসেছিলাম। নাহার আন্টি অতিথি আপ্যায়নের চূড়ান্ত ব্যবস্থা করলেন। আমরা যে এত গুরুত্বপূর্ণ অতিথি সেটা আমরা বুঝতে পারিনি। একটু পরে একজন সুদর্শন ভদ্রলোক এসে বসলেন আমাদের সামনে। নাহার আন্টি পরিচয় করিয়ে দিলেন। ইনি তোমাদের রেজা আঙ্কেল। দরজার পর্দা ফাঁক করে আরও দু’তিন জোড়া কৌতূহলী চোখ আমাদের দেখছিল। আমার কেন জানি নিজেকে খুব চিড়িয়া চিড়িয়া মনে হচ্ছিল। 

আমি আর অনিক আমরা দু’জনেই মায়ের সাথে সহজ হতে পারছিলাম না। সম্ভবত মাও পারছিল না। দুপুরের পরে মায়ের সাথে পাশাপাশি বসে টিভি দেখছিলাম। নাহার আন্টি, মামুন চাচা, রেজা আঙ্কেলও ছিল। কিছুক্ষণ পর তারা ঘুমানোর কথা বলে উঠে গেলেন। এমন সময় দুটি বাচ্চা এসে বলে, আম্মু তুমি ঘুমাবে না? তুমি গল্প না বললে আমরা ঘুমাব না। মা বললেন, এরা দু’জন তোমাদের আপু আর ভাইয়া। ওরা আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, পপ কর্ন খাবো আম্মু। মা বোধ হয় ওদের জন্য পপ কর্ন আনতে ভেতরে যাচ্ছিলেন। ওরাও মায়ের আঁচল ধরে মায়ের সাথে সাথে গেল। ওদের দেখে নিজের মধ্যে কেমন যেন শূন্যতা, ঈর্ষা এবং কষ্ট অনুভব করছিলাম। আমাদের দু’ভাইবোনকে কেউ কোনোদিন দুপুরে মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পড়িয়ে দেয়নি। মায়ের আঁচল ধরে কোনোদিন আমরা কোনো আবদার করতে পারিনি। 

মায়ের ছেলে-মেয়ে দুটির নাম ইফতি এবং সেতু। রেজা আঙ্কেলের সাথে চেহারায় বেশি মিল। সে তুলনায় আমার আর অনিকের চেহারাটা মায়ের সাথে কিছুটা মিলে যায়। 


সন্ধ্যার দিকে মামুন চাচা আমাদেরকে বাসায় পৌঁছে দেয়ার কথা বলতেই মা বলে উঠলেন, মামুন ভাই আজকের রাতটা থাকুক না আমার কাছে। 

মামুন চাচা বললেন, না, বকুল আপা। রাহাত ভাই অপেক্ষায় আছেন। উনি তো নিশ্চিন্তে বসে নেই। 
নাহার আন্টি, রেজা আঙ্কেলও চেয়েছেন যেন আজকের রাতটা আমরা থাকি। কিন্তু মামুন চাচা রাজী হলেন না। আর এতে করে আমাদেরও স্বস্তি লাগল। কারণ আমার বাবার ঐ অশান্তিপূর্ণ সংসার এই নীরবতা, নিস্তব্ধতাপূর্ণ কষ্টের চেয়ে অনেক ভালো। নাহার আন্টির চাপাচাপির কারণে রাতের খাবার খেয়ে আমরা চলে আসার সময় মা আমাদের টেক্সিতে তুলে দিতে নিচে নেমে এলেন। তার আগে অবশ্য আমাকে আর অনিককে র‌্যাপিং মোড়ানো দুটো প্যাকেট দিলেন। সাথে এক বক্স চকলেট। আমরা টেক্সীতে উঠার সময় মা আমাদেরকে জড়িয়ে ধরলেন। মায়ের চোখ থেকে টপটপ করে গড়িয়ে পড়া পানিগুলো আমাদের গালে এসে পড়ছিল। আমরা মায়ের কাছ থেকে নিজেদেরকে ছাড়িয়ে নিতে যাওয়ার সময় মা আরও শক্ত করে আমাদের জড়িয়ে ধরলেন এবং হঠাৎ করে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করলেন। রাতের নিরবতা ভেঙে গেল মায়ের চিৎকারের শব্দে। মৃত্যুশোক ভেবেই হয়তো আশেপাশের ফ্ল্যাটের লোকজন রাতের আঁধার দূর করে ঘরের আলো জ্বালালেন। রেজা আঙ্কেল মাকে উপরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। সিএনজির এমন শব্দের পরও মনে হচ্ছিল মায়ের চিৎকারের শব্দটা কানে লেগে আছে। আমাদের চোখের পানি মুছতে মুছতে খেয়াল করলাম মামুন চাচার চোখও ভেজা। মা হঠাৎ এভাবে সিনক্রিয়েট করবে এমন করে হয়তো কেউ ভাবেনি। 

অনেকদিন পর গতকাল বাবা বললেন, ‘তোমাদের মা দেখা করতে চাচ্ছে’। এরপর একটা কার্ড দিলেন হাতে। হলমার্কের কার্ড। মা মামুন চাচাকে দিয়ে আমার আর অনিকের জন্য কার্ড, চকলেট, পেন্সিল বক্স, রংতুলির মতো সুন্দর সুন্দর গিফট পাঠাতো। এগুলো নিতে আমাদের খুবই অস্বস্তি লাগত। এবারের কার্ডটা নিয়ে আমি কিরণ চন্দ্র চৌধুরীর ‘ভারতের ইতিহাস কথা’ বইয়ের ভেতর ঢুকিয়ে রেখেছি। এখনো খুলিনি। আমি জানি ওতে কি লেখা আছে। মায়ের সাথে দেখা করে আর কষ্ট বাড়াতে চাচ্ছি না। সেই এক দেখার কষ্টটুকু আজও কাটিয়ে উঠতে পারিনি আমি। অনিক এখন ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ে। মায়ের কোনো স্মৃতি নাকি ওর মনে পড়ে না। ও নিজেও অবশ্য মনে করতে চায় না। কিন্তু আমি যে ভুলতে পারি না আমার মায়ের মুখখানি। 

মা র‌্যাপিং পেপারে মোড়ানো যে প্যাকেটটা দিয়েছিল সেখানে একটা ডায়েরি ছিল। সেই ডায়েরির প্রথম পৃষ্ঠায় লেখা ছিল-আমি সেই মা যে মা তার সন্তানের বেড়ে ওঠার স্পন্দন দেখি না , শুনি না। আমার সন্তানদের ভালো মন্দ কোনো কিছুতেই আমার কোনো অংশগ্রহণ নেই। ওরা আমার কাছে দূরের আকাশের তারার মতো। হঠাৎ হঠাৎ করে জ্বলে ওঠে। আমার সন্তানরা বেড়ে ওঠে আমার কল্পনায়। তারপরও আশা, আমার সন্তানরা তাদের সব আনন্দের ঘটনা, কষ্টের ঘটনা লিখবে এই ডায়েরিতে। আর এই ডায়েরি একদিন পৌঁছাবে আমার কাছে। আমি জানব আমার সন্তানদের বেড়ে ওঠার গল্প, যদি ওরা আমাকে জানতে দেয়। 

মার জন্য মাঝে মাঝে আমার অনেক কষ্ট হয়। আমাদের ছাড়া ঐ নতুন জীবনে কি মা খুব সুখে আছে? অনেক সুখের মাঝেও তীব্র কষ্টের উপস্থিতির জন্য তো, মাকে কোথাও তাকাতে হয় না। নিজের কথা ভাবলেই তো মুহূর্তেই সব সুখ ম্লান হয়ে যায়। ঐ ডায়েরির কিছু পাতায় আমি লিখেছি কিছু কথা। যখন মার জন্য তীব্র ভালোবাসা অনুভব করেছি তখনই লিখেছি। আবার যখন তীব্র কষ্ট হতো, কেন আমাদের জীবনটা এমন হলো তখন ইচ্ছে করতো ডায়েরির পাতাগুলো কুটি কুটি করে ফেলি। 

আমাদের একজন মা আছেন যিনি শুধু আমাদেরই মা নন। ইফতি এবং সেতুরও মা এবং দাবিটাও ওদের বেশি। আমাদের একজন বাবা আছেন যিনি শুধু আমাদেরই বাবা নন। আবীর এবং ইমরানের বাবা। এখানেও অধিকারটুকু ওদের বেশি। আমরা আছি দু’পক্ষের মাঝামাঝি একটা প্রাচীর হয়ে। কষ্টের পাহাড়। এক জীবনে চাইলেই হয়তো সবাই ভালো থাকতে পারে না। তারপরও মনে মনে তীব্র চাওয়া তুমি ভালো থেকো মা। আমাদের কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু অভিমানও যে নেই সে কথা দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি না বলেই হয়তো প্রযুক্তির এত অবিশ্বাস্য উন্নতির পরও মা আমাদের কাছে কেবলই স্মৃতি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন