বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২০

এ্যানি এনরাইটের গল্প : নৈশ সাঁতার

ভাষান্তর :  নাহার তৃণা 

বেনকে তিনি বন্ধুর বাড়ি নিয়ে যাচ্ছিলেন, দিনের এই বাড়তি ভ্রমণের কারণে তিনি একটু বিরক্ত, তার হাতে আরো কাজ ছিল। যদিও গাড়ির নির্জনতা তার পছন্দের, সাইড মিররটা পরীক্ষা করে টার্ন নেবার জন্য গাড়িটা স্লো করতে গিয়ে তার মনে হলো বেনের কণ্ঠস্বরটা যেন কাঁধের উপর থেকে অনুভব করছেন। বেন বুস্টার সীটে বসে ছিল, আট বছরের তুলনায় সে দেখতে ছোট্টখাটো, যখন তিনি তার ফোনের ম্যাপ ধরে পথের হদিশ জেনে নিচ্ছিলেন, বেন তখন জানালা দিয়ে বাইরে শহরতলীর রাস্তা এবং পার্ক করা গাড়িগুলো দেখছিল।
দেখতে সুবিধা হয় সেজন্য ফোনটা তিনি ধুসর প্লাস্টিকের ড্যাশবোর্ডের উপর খানিকটা উঁচু করে রেখেছিলেন। বেনের কারণে ফোনটার চিড় ধরা স্ক্রীনে ছোটো তীর চিহ্নগুলো পড়ে নেয়াটা বেশ ঝকমারি। সারাক্ষণ ফোন নিয়ে খোঁচাখুঁচি না করলে চলে না যেন, হাতফস্কে পড়ে না যাওয়া পর্যন্ত জিনিসটা বেনের হাতেই থাকা চাই। বাইরের দুনিয়া থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বেন বাস্তব জগতে চোখ রাখে এবং যেন একটু অবাকই হয় সেটা সেখানেই অনড় আছে দেখে। 

" আমি ব্যারি ম্যাকেইনটায়ার কে পছন্দ করি না।" দুম করে কথাটা বললো বেন। 

"কেন করো না?" 

গাড়িতে বসে তাদের আলাপ বেশী জমে। এখন যদি বাড়িতে থাকতো, তার উত্তর খুব সংক্ষিপ্ত হতো, যেমন 'জানিনা' কিংবা "এমনি...." 

কিন্তু গাড়িতে থাকার কারণে মুখ ফুটেছে তার - "যদিও আমি ছেলেদের পছন্দ করি, আসলেই পছন্দ করি। " 

"অবশ্যই তুমি পছন্দ করো" তিনি বেশ জোর দিয়ে বললেন। তিনি ভেবে পাননা মুখোমুখি বসলে ছেলেটা কেন মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকে। তাঁর চোখে এমন কি আছে যে কথা শুনলেই জামার ভেতর শরীর মুচড়িয়ে শ্রাগ করে। 

"তুমিও একটা ছেলে" 

"আমি সেটা জানি।" বেন বলে। তিনি তো তার মা, কাজেই যখন তিনি ছেলের দিকে তাকান তাতে হয় নিয়ন্ত্রণ থাকে কিংবা থাকে প্রশংসাসূচক প্রশ্রয়। যদিও তিনি সেটা না করার চেষ্টা করেন। তিনি সত্যিই সেইসব মহিলাদের মতো ছেলেকে বলতে চান না, "সোজা হয়ে বসো" অথবা "চুলগুলোকে নিজের মতো থাকতে দাও" 

"ঠিক আছে তাহলে।" 

তিনি একপলক রিয়ারভিউ মিররে তাকিয়ে বেনের মাথার একটা পাশ দেখতে পেলেন। 

গোটা শীতকালে তার চুল ঘন কালো ছিল। এক বা দু বছরের ভেতর এটি পুরোপুরি বাদামি বর্ণ ধারণ করবে। 

"বাস্কেট বল আমি খুবই অপছন্দ করি।" 

“আসলেই করো?" 

" হ্যাঁ, সত্যিকার অর্থেই করি।" 

সম্প্রতি বেন অপমানকর বা অপছন্দনীয় বিষয়ে 'সমপ্রেমী' শব্দটা প্রয়োগ করা শুরু করেছে। রাতে খাবার টেবিলে বসে সে শব্দটা প্রয়োগ করে বলেছিল, " ওটা যথার্থই সমপ্রেমী", এবং স্বাভাবিকভাবেই তার ছোটো বোন সবটা বুঝতে ব্যর্থ হয়। 

"অবশ্যই তুমি বাস্কেটবল পছন্দ করো।" তিনি খানিক অস্হিরতার সাথে বলে ওঠেন। 

"কথাটা ঠিক না।" বেন কোনো উত্তর দিলো না। 

"ব্যারি ম্যাকেইনটায়ার কি বাস্কেটবল খেলেন?" 

রিয়ারভিউ মিরর দিয়ে তিনি বেনের হাতটা আড়ালে থাকা মুখের দিকে এগোতে দেখলেন। 

"নাক খুঁটিও না!" ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠলেন তিনি। 

এভাবে বারণ করা বেশ কঠিন। তার সন্তানেরা কদাচিত সুশীল থাকে , যখন তারা লক্ষী থাকে তখন খুব ভালো, কিন্তু যে কোন সময় আবার বাঁদরামি শুরু করে দেয়। তিনি তাদের এত ভালোবাসেন যে তাদেরকে নিজের মতো থাকতে দেন। 

তিনি যখন গাড়ি চালাচ্ছিলেন বেন তখন ডাবলিনের শহরতলী, বসন্তে গজানো গাছপালা, একদেয়াল দ্বারা সংযুক্ত বাড়িগুলো, কুকুর নিয়ে হাঁটতে বেরোনো আপাদমস্তক ঢাকা বয়স্ক মহিলা ইত্যাদি মন দিয়ে দেখছিল। ফোনের অ্যাপটি তাকে একটা পরিচিত রাস্তায় নিয়ে যাচ্ছিল, যদিও এই রুটটা ছিল অপরিচিত, এমন একটা অচেনা পথ সম্পর্কে তার তেমন আগ্রহও নেই। 

বেনের নতুন বন্ধুটির নাম আভা। সে সেন্ট ক্লিয়ার ক্রিসেন্টে থাকে, যা মোটরওয়ের কাছাকাছি কোথাও একটা হবে। কিন্তু তারা বড় রাস্তা ছেড়ে সরু সরু গলিপথের একটা জটাজালের ভেতর ঢুকে পড়লেন, এদিক দিয়ে তিনি আগেও গেছেন, ঠিকমত বাঁক নিতে পারলে চোখ বন্ধ করে একটার পর একটা মোড় পেরিয়ে ঠিকঠাক গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়া যায়। এই পথ দিয়ে বাগানের কেন্দ্রে পৌঁছানো যায় যেখানে কুকুর পরিচর্যাকারীরা অবস্থান করে। 

"তুমি বরং...?" কথাটা অসমাপ্ত রেখেই বেন থেমে গেল। 

বেন যদি বুঝতে পারে আপনি তার কথায় কান বা গুরুত্ব দিচ্ছেন না, তবে সে কথা চালিয়ে যেতে উৎসাহ দেখায় না। 

"কি?" অবশেষে তিনি বললেন। 

এখন যেহেতু বেন বুঝতে পারে মা তার কথায় যথেষ্ট মনোযোগ দেবেন, তাই সে বলে ওঠে, 

"মা তুমি বরং এক কাপ লাভা পান করো অথবা লাভা হ্রদে ডুবে যাও।" 

"ওহ ঈশ্বর!" 

"তুমি বরং?" 

" আবার শুরু করো না।" 

"কোনটা?" 

"তুমি লাভা পান করতে পারো না।" 

"হ্যাঁ তুমি তা পারো।" 

"কাপে করে লাভা?" 

"হ্যাঁ, পাথরের কাপ" 

"আমি তোমাকে হ্রদে নিয়ে যাবো।" 

"তুমি কি ছাদ থেকে পড়তে চাও নাকি চাও তোমার মাথায় একটা গাছ ভেঙে পড়ুক?” 

বেন সবসময় তার নিজের মনগড়া ভাবনায় আচ্ছন্ন থাকে, বিশেষ করে যে কোনো অসম্ভব ভাবনা তাকে বেশি আচ্ছন্ন করে। 

"কোনোটাই না। আমি বরং চাইবো এর কোনোটাই যেন আমার সাথে না ঘটে।" 

"তুমি বরং ছাদ থেকে পড়ো.." জেদি শোনালো বেনের গলা, "বা তোমার মাথায় গাছ ভেঙে পড়ুক?" 

বেন হয়ত নিজেই মৃত্যু চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। যা থেকে কিছুতে বেরোবার পথ খুঁজে পাচ্ছিল না, কোনদিকেই যেন পথ খোলা নেই তার। 

"ছাদ" খানিক বাধ্য হয়ে নিজের পছন্দটা জানালেন। 

"ঠিকাছে।" 

"তোমার কোনটা পছন্দ?" 

"হ্যাঁ, আমার পছন্দও ছাদ " বেন নিজের সম্মতি জানায়। 

"এটা তোমার সেরা পছন্দ নয়।" তিনি বললেন। 

বেন খানিকক্ষণ নিশ্চুপ থাকে, সে চ্যালেঞ্জটা নেয়। 

"তুমি বরং আগুন পিঁপড়ের বিষ কামড়ে মারা যেতে পারো বা তোমার পায়ের আঙ্গুলে একটা বড় ক্রেন ততক্ষণ পর্যন্ত বেঁধে রাখা হবে যতক্ষণ না তোমার মাথাটা ফেটে চৌচির হয়?" 

"চমৎকার!" 

তিনি কথার প্যাচে পুরোপুরি আটকে না যাওয়া পর্যন্ত বেন তার অদ্ভুতুড়ে কথাবার্তা চালিয়েই যাবে। 

"ক্রেন, প্লিজ।" তড়িঘড়ি নিজের পছন্দটা জানান দেন তিনি। 

"তুমি কি অন্ধকারে ডুবে যেতে চাও? নাকি অন্ধকার তোমার শ্বাসরোধ করুক সেটি চাও?" 

মায়ের মৃত্যু নিশ্চিত না করে বেন যেন থামবে না। 

"সত্যি তুমি তা চাও?” 

"পাঁকাল মাছে ভর্তি একটি বিশাল অন্ধকার হ্রদ।" 

"নাআআআ। কক্ষণো না। মোটেও না। অসম্ভব। এটা আমি কক্ষণো চাই না! 

কথাটা বলার সাথে সাথে পুরোনো একটা নৈশ সাঁতারের স্মৃতি ধাঁ করে গ্রাস করলো তাকে, বেনের জন্মের বহু বছর আগের ঘটনা। ওটা ঘটেছিল আইরিশ গ্রামাঞ্চলের দিকে অবস্থিত একটি হ্রদের মধ্যে। তাদের দলটা গ্রামের একটা শুড়িখানা থেকে মাতাল হয়ে ফিরছিল। সেদিন আকাশে চাঁদ ছিল না, শরীর মন ছিল কামনা বাসনার উর্ধ্বে, সে রাত কিংবা ভোরে কিংবা আগের রাতে। ছুটি কাটাবার ছোট্ট ঘরগুলোতে অবকাশকালীন কামনা মদির সময়ের ভেতর যখন তাদের মত্ত থাকার কথা ছিল, সেগুলো ভুলে তিনি অন্ধকার চিরে হ্রদের দিকে যেতে যেতে মাথার উপর দিয়ে জামা খুলে ফেললেন। অবশ্য সেই দলে তার প্রেমিকের উপস্থিতি না থাকলেও, ছিল অন্য একজন, যে কিনা এক নিষিদ্ধ মানব। তবে দলের পুরুষদের কেউ পরবর্তীকালে পেছনের সিটে বসা বাচ্চাটির বাবা হয়নি। মাঝরাতে সেই নির্জন বনভূমিতে নগ্ন হয়ে যাওয়া তাদের দুজনের জন্যই একটা বিদ্রুপের মতো ছিল, দুজনের যে কোন একজন নগ্ন হলেও। 

এই ঘটনাটা অনেক দিন আগে ঘটেছিল। 

তার পরনে ছিল ঢিলেঢালা মানানসই নীল রঙের লীনেনের জামা, কিন্তু তার অন্তর্বাসটা বেশ সৌখিন এবং যুগের তুলনায় একটু অত্যাধুনিক। তারও তখন বেতস লতার মত টানটান আর সুন্দর শরীর ছিল, যদিও সেটা তখন তিনি অনুভব করেননি। এবং তিনি মাতাল ছিলেন তাই হ্রদে নামার পথটা পুরোপুরি মনে ছিল না, এদিকে নামার অভিজ্ঞতাও ছিল কম। অন্ধকারটা আস্তে আস্তে চোখে সয়ে আসছিল, তিনি তাঁর জামা খুলে তখনো শুকনো থাকা তক্তার উপর রাখলেন। ওখানে দাঁড়িয়ে জলের দিকে তাকালেন। হ্রদের উপরিভাগে ভেসে থাকা খুদে পানাগুলো জড়ো হয়ে এমন একটা সুক্ষ্ম বাদামী আস্তরণ তৈরী করেছিল, যেটা দিনের বেলায়ও দৃশ্যমান। এখন, এই মধ্যরাতে, যখন কল্পনাতীত ভয়ানক অন্ধকার চারপাশে, সামনে খোলা জায়গা আছে কিনা বোঝার জন্য ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের উপর নির্ভর করা ছাড়া কোন উপায় নেই। যখন নীচের দিকে তাকালেন তখন তিনি তেলের আস্তরণের মতো অন্ধকারের চিকচিকে ঔজ্বল্য দেখতে পেলেন। তিনি ডেকের কিনারায় বসে অর্ন্তবাসের হুকটা এক ঝটকায় খুলে ফেললেন। একজন পুরুষের কণ্ঠস্বর শোনা গেল যে কিনা তাকে থামতে বলছিল। অন্য পুরুষটি কিছুই বলেনি। এক নারীর গলা শোনা গেল, ‘না অমন পাগলামি কোরো না মিশেল’। কিন্তু কে শোনে কার কথা। ততক্ষণে তিনি কাঠের পাটাতন থেকে লাফ দিয়ে বিপুল জলরাশির অন্তরালে থাকা তরল নৈঃশব্দের আড়ালে চলে গেছেন। কিছুক্ষণ পর আটকে থাকা দমটা ছাড়ার জন্য ভেসে উঠে প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিলেন মুক্ত বাতাসে। গভীর কৃষ্ণ জলরাশির উপর ভেসে থাকা গভীর কালো বাতাস। 

ভেসে উঠে তিনি যখন ঘুরলেন তার চামড়ার নীচে অ্যালকোহলের ঝাঁজটা বেশ টের পাওয়া যাচ্ছিল এবং জলের ঠাণ্ডা স্পর্শটা ভোঁতা লাগছিল অথবা তার চামড়া সাড়হীন হয়ে গিয়েছিল। জলের মধ্যে সাঁতার কেটে এগোবার সময় তার পাশ দিয়ে জলের ধারা সরসরিয়ে পেছনে চলে যাচ্ছিল। তারপর হঠাৎ কিসের একটা টান এসে তাকে সবার কাছ থেকে দূরে টেনে নিয়ে যেতে শুরু করলো, যদিও আপাত চোখে মনে হচ্ছিল তিনি একই জায়গায় আছেন । কিন্তু তার তীরের সঙ্গীদের কন্ঠস্বর ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছিল বলে তিনি দূরে সরে যাবার ব্যাপারটা বুঝতে পারছিলেন। সরে যেতে যেতে হ্রদের মধ্যখানে চলে যাচ্ছিলেন। 

যদি ওটা আদৌ মধ্যখান হয়ে থাকে। কখনো মনে হচ্ছিল জায়গাটা হলো জলের উপরিভাগ যেখানে তিনি সাঁতার কাটছিলেন। জায়গাটা এমন নিকষ অন্ধকার এবং আর্দ্র যে তার চোখ দুটো খোলা আছে নাকি বন্ধ, সেটা বোঝাই মুশকিল। তিনি একটু ভাবনায় ছিলেন যে সাঁতার কাটতে গিয়ে জলের সাথে সমতা বজায় রাখতে পারছেন কিনা, কিন্তু তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন যখন দেখলেন তিনি উল্টে গিয়ে ক্রমশ নীচের দিকে তলিয়ে যাচ্ছেন যেখানে শুধুই অথই জল, নিঃশ্বাস নেবার কোনো উপায় নেই। তীর থেকে সম্মিলিত চিৎকারগুলো আরো বিক্ষিপ্ত হয়ে অস্পষ্টতায় ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ছিল। তিনি যতই ঘুরতে ঘুরতে তাদের দিকে ফিরতে চাইছিলেন, ততই ব্যাপারটা কঠিন হয়ে পড়ছিল, মনে হচ্ছিল তারা হাল ছেড়ে দিয়েছে। তীর থেকে ভেসে আসা শব্দের ভগ্নাংশগুলো তার কাছে দিগন্তের নিশানা হিসেবে কাজ করছিল 

এবং তিনি বুঝতে চেষ্টা করছিলেন কোনদিকে গেলে জলের উপর ভেসে ওঠা যাবে। তিনি শরীরের দুপাশে দুহাত দিয়ে জল কেটে এগিয়ে যাবার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন, যদিও প্রাণপণ চেষ্টায় শরীর মুচড়িয়ে এগিয়ে যেতে চাইছিলেন তবু তিনি নিশ্চিত ছিলেন না তিনি জায়গা থেকে আদৌও সরতে পেরেছেন কিনা। তিনি নিজের অবস্থান বোঝার জন্য একটু থামার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু থামতে পারলেন না, বলা ভালো তিনি নিজেও থামতে চাননি। এটাই ছিল সবচেয়ে অদ্ভুত। যেন ব্যাপারটা হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া একটা গোপনীয় ব্যাপার, যেটা খুবই উপভোগ্য। কোনদিকে কী আছে কোনটা উপর কোনটা নীচ কোন আগামাথা কিছুই জানা নেই। তিনি যেন নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে পুরো বিষয়টির ভেতর মিশে গেছেন। তিনি এখন ডুবে যেতে পারেন। 

তিনি এক ঝলক তার ফর্সা বাহুটা দেখতে পেলেন যার চকচকে প্রতিফলনই তার একমাত্র দিক নির্দেশক ছিল, যতক্ষণ না তিনি তীর থেকে একটা পুরুষের কন্ঠ শুনতে পেলেন যার সাথে তার শোবার কথা ছিল, দেখলেন আরো একজনের হাতের সিগারেটের আভা যার সাথে তার শোবার কথা না( তার সাথে কখনোই শোবার চিন্তা করেননি, মনে হয় তাকে তিনি মানুষ বলেই ভাবতেন না)। 

সেরাতে যা ঘটেছিল সেটা নিয়ে তার বিশদ বর্ণনাও বুঝি অনেক কম হয়ে যায়। অবশেষে অনেক কষ্ট সহ্য করে কোনমতে হ্রদের কিনারায় এসে পৌঁছালেন যেখানে গভীরতা কম। সেখানে ধারালো পাথরের আঘাতে তাঁর পায়ের তালুতে ক্ষত হয়ে গিয়েছিল। তিনি হ্রদ থেকে উঠে যেখানে গেলেন, সেখানে অপেক্ষা করছিল নিরন্তর অভিযোগ এবং শীতল সঙ্গম। 

আগের রাতে হ্রদে হাবুডুবু খেয়ে পানি গেলার ক্লিষ্ট অভিজ্ঞতাটা ভুলে গিয়ে পরদিন সকালে তিনি নতুন অনুভবে জেগে উঠলেন। 

ওটা সম্পূর্ণভাবে তার অচেতন অবস্থায় ঘটেছিল। তিনি বিছানার কিনারায় বসে গভীরভাবে শ্বাস নিলেন। তিনি বেঁচে আছেন, ওটাই এখন তার একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ওটাকেই মগজের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করলেন। আর কখনোই ওরকম পাগলামি করতে যাবেন না তিনি। মাত্র চব্বিশ বছর বয়স ছিল তার অথচ মৃত্যুর কাছে কেমন করে সমর্পণ করেছিলেন নিজেকে। মাতাল বা সুস্থ আর কোন অবস্থাতেই তিনি অন্ধকারে কোন হ্রদের ধারে যাবেন না। 

"তুমি জানো বেন, তোমার কখনই রাতের বেলা সাঁতার কাটা উচিত না" কুড়ি বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হবার পর তিনি এখন নিজের হুন্দাই হাইব্রিড গাড়িতে বসে কথাটা বললেন। এক্সিলারেটর, ব্রেক, মিরর, ক্লাচ। 

" তুমি কাটবে?" বেন জানতে চাইলো। 

"না, সত্যিই আমাকে কথা দিতে হবে তুমি এমন কাজ করবে না কখনও না। কোনো হ্রদে সাঁতার কাটতে যাবে না, শরীরকে উপরে ভাসিয়ে রাখা জন্য সেখানে কোনো লবনের অস্তিত্ব থাকে না, এবং বিশেষ করে সমুদ্রেও যাবে না। তুমি অবশ্যই সমুদ্রকে নিরন্তর সমীহ করে চলবে। সে তোমার চেয়েও বিশাল। তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছো? তুমি কখনোই মদ খেয়ে সাঁতার কাটতে নামবে না। এমনকি তোমার বন্ধুরা সেটা করলেও তুমি কখনোই করবে না। তোমার কোনো বন্ধু যদি বিয়ার টিয়ার খেয়ে বলে "এসো সাঁতার কাটি মজা হবে" তুমি তখন কি বলবে? 

বেন খুব ধীরস্হির হয়ে উত্তর দেয়, “তুমি কাটবে?” 

" না না, আমি মোটেও তাতে রাজি হবো না, রাজি হবার প্রশ্নই ওঠে না। আমি কোনোভাবে মরতে চাইবো না, কোনো ভাবেই না। তোমার সমস্যাটা কী বেন?" 

তারা যে রাস্তা ধরে যাচ্ছিলেন সেখানে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে সদ্যনির্মিত ছোটো ছোটো সব বাড়ি, যতদূর চোখ যায় এমন একঘেয়ে একই চেহারা যে বিরক্তি ধরে যায়। ছোটো ছোটো বাগানে রোয়ান, চেরি, বার্চ, কৃত্রিম উইলো গাছ এবং একটা লাঠির আগায় বাঁধা হতশ্রী পমপম। হঠাৎ তার মনে হলো তিনি জানেন না তিনি এখানে কী করছেন, কেন এসেছেন। হ্রদের স্মৃতি যেন তার পিছু নিয়ে এখানেও এসে হাজির হয়েছে। যেন তার সন্তানদেরও ছাড়বে না ওটা - তার নিজের বোকামির জন্য, ওটা সেই জল থেকে উঠে এসে তাকে অনুসরণ করে যাচ্ছে। সেই নৈশ সাঁতারের অবসান ঘটেনি এখনো। তার পিছু তাড়া করেছে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এমনকি বছরও। কারণ তুমি সেই হ্রদকে ত্যাগ করে এসেছো ঠিক, কিন্তু তার রাহুগ্রাস থেকে মুক্তি পাওনি, মুক্তি পাওনি তার অবান্তর ইচ্ছা থেকে। 

তবুও ব্যাপারটা কিছুটা সহনীয় হয়ে উঠেছিল, সত্যিকারের একটা কিছু পাওয়া হয়েছিল, পেছনে বসে থাকা শিশুটির অস্তিত্বের কারণেই এটা সম্ভব হয়েছিল। 

বেন প্রশ্ন করে, "তুমি কি টার্কির ভেতর থাকো নাকি তোমার ভেতর টার্কি বাস করে? 

কি? 

নাহ্ বলছিলাম - বেন তার কথার পুনরাবৃত্তি করে " তুমি কি টার্কি(বিশেষ জাতের মোরগ)র ভেতর থাকো নাকি তোমার ভেতর টার্কি বাস করে? 

"প্রশ্নটা খুবই দারুণ" তিনি বলেন। 

"তুমি বরং?" 

"এটা সত্যিই একটা দুর্দান্ত প্রশ্ন। এখন পর্যন্ত এটাই সেরা প্রশ্ন।" 

তিনি গাড়ির রেডিওটা চালু করেন যেন বেনের মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরে যায়। 

"এটা কি আমাদের গন্তব্যের জায়গা?" অ্যাপ অনুযায়ী গাড়িকে ডান দিকে মোড় নিতে নির্দেশ দিচ্ছে। 

"আভা কি এখানেই থাকে?" 

"আমি জানি না।" 

"সে তোমার বন্ধু।" 

"মোটেও না, সে আমার বন্ধু না। সে আসলে খুব মাতব্বর ধরনের একটা মেয়ে” 

বাঁক নিয়ে খোলা প্রশস্ত গেট পেরিয়ে তিনি যখন একটা চত্বরে ঢুকে পড়লেন, বেন তখন পাশে রাখা ব্যাগের উপর হাত রেখে স্হির হয়ে বসে ছিল। 

তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটাই কি সেই জায়গা?’ গোলকধাঁধার মতো ভেতরে খোলা সবুজ ঘাসের মাঠ। তার মাঝখানে তিনতলা যে দালানটি দাঁড়িয়ে আছে সেটাই সান্তা ক্লারা। 

এখানেই আভা থাকে। এখান থেকে পাঁচ মাইল দূরত্বে তিনি এক দশক ধরে বাস করে আসছেন অথচ কখনও বুঝতে পারেননি যে সান্তা ক্লারা এখানেই অবস্থিত। তিনি প্রায়ই এর পাশ দিয়ে চলাচল করেন, অন্য কোথাও যাবার সময় এই পথের পাশ দিয়ে কতবার গেছেন খেয়ালই করেননি। 

আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর আগে ট্যাক্সিতে চেপে তিনি ঠিক এই জায়গায় এসেছিলেন, সেসময় চারপাশ জুড়ে শুধু সবুজ ক্ষেত ছিল। গন্তব্যে পৌঁছে ট্যাক্সিচালক তাকে পাগল না ঠাওরে বসে সেটা ভেবে তিনি আতঙ্কিত হয়েছিলেন, যদিও তিনি মোটেও অপ্রকৃস্হ ছিলেন না, ছিলেন আগাপাশতলা একজন ভেঙ্গে পড়া মানুষ। তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে ট্যাক্সিচালক জানে তার ট্যাক্সির ভেতর একজন ভাঙাচোরা মানুষ আছে। গেট পেরিয়ে যাবার সময় কিংবা ভেতরের বাগান পেরিয়ে দালানটির দিকে যেতে যেতে তার দিকে ফিরে তাচ্ছিল্য ছুঁড়ে দিতে পারতো সে। 

দ্য সিস্টার অফ সেন্ট ক্লেয়ার এবং সেন্ট অ্যাগনেস একটি বেসরকারি সেবাদান কেন্দ্র। এটা তখন 'স্ক্র্যাগি অ্যাগি'স' নামে পরিচিত ছিল। সব আবর্জনা এসে জমতো এখানে। তবে তিনি তার ছেলের ফোনে ঠিকানাটা টাইপ করার সময় ওসব কিছু ভাবেননি। 

"তুমি বরং?" বেন বললো। বেনের উদ্ভট সব প্রশ্নের কারণে হ্রদের স্মৃতি তাকে ধাওয়া করেছিল। ছেলেটা আবার কি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় বোঝা মুশকিল। 

বাইরে থেকে ভবনের দিকে তাকিয়ে খুব অদ্ভুত লাগছিল। এখনকার একটা ছোট্ট ঘরে জীবনের কিছুটা সময় তিনি কাটিয়েছিলেন এবং খুব সম্ভবত দুবারের মতো ভবনটিকে বাইরে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল তার: প্রথমবার, যখন তিনি এখানে এসে আড়ষ্টভাবে সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে যাচ্ছিলেন। আরেকবার, খুব সম্ভবত বাবার সাথে বাড়ি ফিরে যাওয়ার সময় পেছন ফিরে একনজর দেখেছিলেন ভবনটা। 

এখানে থাকাকালীন তিনি কখনও সবুজ বাগানের ধারে কাছে যাননি, সেসব জায়গায় এখন ছিমছাম নতুন বাড়ি গজিয়েছে। খুব সম্ভবত বাগানে যাওয়ার অনুমতি ছিল না তার। অথবা এমনও হতে পারে পরবার মতো কোনো কাপড়-চোপড় তাকে দেয়া হয়নি। সারাদিনে প্রচুর ঘুমাতেন তিনি, অথবা তার হাসপাতালের বিছানায় নিঃসাড়ে পড়ে থাকতেন। এটাও মনে পড়ে তিনি প্রায় জানলার কাছে দাঁড়িয়ে থাকতেন, সেটা সম্ভবত তিনতলায় হবে, যেখানটায় স্ফীত গোলাকার একটা গম্বুজ ছিল। তিনি জানতেন যে চুড়ায় ওঠার জন্য এক সারি সিঁড়ি আছে যেটা চুড়া থেকে দেখা যায়, এ যেন রূপকথার পাতা থেকে উঠে আসা কোনো নারীর গল্প, যদিও তার জীবন রূপকথার ছিল না, তিনি ছিলেন মগাডনের কুয়াশার মতো, আরো যেসব ছাইপাস তিনি সোনামুখ করে দুইবেলা গিলতেন তাদের কথা নাই বললাম। ওসব নিয়ে কারো মাথাব্যথাই ছিল না। বরং তারা তোমার অনুভূতি নিয়ে ভাবিত ছিল। যদিও ‘ভাবিত’ কথাটা শুদ্ধ হয় না। তারা বরং তোমার পরিণতির বিষয়ে খেয়াল করতো। 

“মা" বলে বেন ডেকে উঠলো। এ শব্দটা সে তখনই ব্যবহার করে যখন সত্যিই কোনো বিষয়ে সে বিরক্ত বোধ করে। এমন মুহূর্তে তিনিও সাড়া দিয়ে ‘কি’ বলতে ভুলে যান - 

"কি?" একটু সময় নিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করেন। 

"তুমি কি টার্কির ভেতর থাকতে চাও?" 

"এটাই কি সেই জায়গা?" তিনি জানতে চান " সে কি এখানেই থাকে?" 

নির্জন রাস্তার মাঝামাঝি থামুন নির্দেশকের কাছে তিনি গাড়িটির গতি কমিয়েছিলেন। ছোটো ছোটো দুটো বাচ্চা, যার মধ্যে একটি নেহায়েত শিশু, বড় বড় গ্রানাইটের টুকরো দিয়ে সাজানো পথের উপর খেলছিল যে পথটা স্ক্র্যাগি অ্যাগি'স নামে পরিচিত দালানটির সদর দরজা পর্যন্ত চলে গেছে। 

জায়গাটি এখন বহুতল অ্যাপার্টমেন্টে পরিণত হয়েছে- এসব করতে কর্তৃপক্ষ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে হয়ত। অট্টালিকার সামনের অংশের দিকে তাকিয়ে অন্য একটা স্মৃতি তার মনে পড়ে গেল: ভবনটায় ঢোকার মুখে বড় হলঘর ছিল যেখানে তিনি সাইন ইন করেছিলেন। সেবিকাদের বসবার জন্য একটা বড় ঘর ছিল, যেখানে তার বাবা রংচঙে একটা আরাম চেয়ারে বসে ছিলেন। বাড়ি ফিরে যাবার তাড়া নিয়ে তিনি দরজার কাছে আসতেই বাবা উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। হাতের বামদিকে খুব উঁচু ছাদের ঘরটা, যেখানে শিশুদের মায়েরা পর্দায় পিন আটকে রেখে খেলায় মগ্ন শিশুদের দিকে নজর রাখতেন যেন তারা দূরে কোথাও চলে না যায়। 

সেখানে দিনের অলস সময় কাটাবার জন্য একটা যেনতেন ঘর ছিল, যেখানে অনেকেই ধূমপান করতে যেত- তিনি চিন্তা করলেন সে ঘরটা কোথায় হতে পারে। কাঁপা হাত, সুন্দর পোশাকের শহরতলীর ভগ্নহৃদয়ের মহিলারা দিনে কুড়িটার মতো সিগারেটের ধোঁয়া উড়াতেন। তারা নোংরা ঘরটার প্লাস্টিকের আচ্ছাদনে মোড়া আরাম কেদারায় বসে নিজেদের কব্জির দিকে তাকিয়ে অনবরত ধুমপান করে যেতেন। 

এখন সেখানে কে বাস করে? এখন যে বাস করে সে হয়ত খুব ব্যস্ত কোন তরুণী। একদা যে জানালাটা পেরেক মেরে বন্ধ করা ছিল, এখন সেখানে অর্কিডের চারা লাগিয়েছে সে। সে নিশ্চয়ই ধুমপায়ী না। সে এখন তার প্রাইভেট ফ্ল্যাট থেকে পাবলিক করিডোরে বেরিয়ে আসে, যেখানে সেই সব দিনে বিষন্ন মানুষেরা পায়চারী করতো। আর নিঃশব্দে কাঁদতো, কাঁদতো না ঠিক, বিষন্ন চোখে তাকিয়ে থাকতো টেলিফোনের দিকে। 

"এটা ৭৪ নম্বর না" তার ছেলেটি গাঢ় বিতৃষ্ণার সাথে নম্বরটা উচ্চারণ করলো। তখন তিনি খেয়াল করলেন তিনি এখনও তার অতীত স্মৃতির বলয়েই আটকে আছেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে কিশোর এবং শিশু দুজন আসলে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ছিল। সিঁড়ির উপর থেকে তারা তাদের ট্রাই সাইকেলটি গড়িয়ে সমতলে আনার চেষ্টা করছিল। তারা প্রান্ত ঘেঁষে দাঁড়ায়নি মোটেও। 

ছোটো শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ পরীক্ষার কাজে তিনি জীবনের আটটি বছর ব্যয় করেছিলেন। 

তাদের গাড়ি ধীর গতিতে চলায় বেন সবুজ প্রান্তমুখী বাড়ির নম্বরগুলো পড়ে যাচ্ছিলো ৬৭, ৬৯, ৭১। 

"জোড় নম্বরের বাড়িগুলো গেল কোথায়?" বললেন তিনি,তারা দালানটির চতুর্দিকে ধীরে ধীরে এমনভাবে ঘুরপাক খাচ্ছিল যেন একটা ফাঁদে আটকে পড়েছে। চরম দুর্যোগটি নেমে আসার আগে তার জীবনটাও এভাবে আটকা পড়েছিল, সব দুষ্টচক্র যেন গভীরভাবে সংযুক্ত। এবং এখন আবারো সেটা ঘটছে যেন, এই অপ্রিয় ভ্রমণ, অনাহুত পছন্দ এবং সেই ব্যাপারটা, তার ছেলেও জানে সেটা, নিশ্চয়ই জানে। এখনো তাঁর গায়ে তার গন্ধ লেগে আছে, সেই হ্রদের অভিশপ্ত নোনা জলের গন্ধ। 

তিনি দ্বিতীয় তলায় অবসর কাটাবার ঘরের জানলাটি সনাক্ত করেন; এবং তার মনে হয় নিজেও যেন সেই ঘরে এখনও রয়ে গেছেন, সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে নিজের কব্জি পরীক্ষায় মগ্ন। কয়েক সপ্তাহ ধরে দেয়ালের কাটাকুটির দিকে তাকিয়ে আছেন। বেন কে তিনি চেনেন না। কন্যা সন্তানটিও তার অপরিচিত। তখনো তাদের অস্তিত্ব তার শরীরে দানা বাঁধেনি; তখনো তারা জন্ম নেয়নি। 

"এই তো পাওয়া গেছে!" চুয়াত্তর, চুয়াত্তর!" 

তিনি গাড়িটা থামিয়ে হাতের ব্রেকটি টেনে নিজের সীট থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে ছেলে দিকে তাকালেন, যে কিনা তখন নিজের সীটবেল্ট খোলায় ব্যস্ত ছিল। বেন প্রশান্ত মুখে তাঁর দিকে তাকালো, ছেলেটা দেখতে দেবশিশুর মতো সুন্দর হয়েছে! তার চুল আঁচড়ানো প্রয়োজন, এবং তার নাকের নীচে কিছু একটা চকচক করছিল, কিন্তু সেসবের প্রতি বেনের কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না, নিজেতেই বিভোর সে। সে তার ঘন পাপড়ির চোখ তুলে তার দিকে তাকালো, দৃষ্টির ভাষাই বলছে সে বহুদিন ধরে তাকে চেনে, এবং তিনি মোটেও বিল্ডিংটার ভেতরে ছিলেন না, এখানেই ছিলেন বেনের সাথে বাইরের এই খোলা জায়গায়। 

"লক্ষ্মী হয়ে থেকো।" বেনকে বললেন তিনি, বেন রাত্রিযাপনের জন্য সাথে আনা ব্যাগটা নিয়ে চলে গেল। যে ছেলে মেয়েদের পছন্দ করে না, সেই কিনা দ্রুত পায়ে আভাদের সদর দরজার দিকে হাঁটা দিয়েছে। 

"আগামিকাল এগারোটায় তোমাকে নিতে আসবো।" 

অতি দ্রুতই বেনকে ফিরে আসতে দেখা যায়, কয়েক মুহূর্তের জন্য তিনি ভেবেছিলেন হয়ত সে বিদায় চুম্বন দেবার জন্য আসছে, কিন্তু বেন তার ফেলে যাওয়া ফোনটি নিতেই ফিরে এসেছিল। তিনি জানলা দিয়ে ফোনটা বেনের হাতে দিলেন, তারপর দুষ্টুমি করে নিজের মুখটা বাড়িয়ে রাখলেন। 

“মমমম” মুখ কুঁচকে তিনি বলতেন। ঝটতি মায়ের গালে একটা চুমু দিয়ে বেন বাড়িটার দিকে দৌঁড় দিলো যেখানে আভা পোর্চে দাঁড়িয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানাবে বলে অপেক্ষা করছে। স্বর্ণকেশি আভা দেখতে ঠিক ছোট্ট একটা পরী, চুমকির হৃদয় আঁকা একটা টীশার্ট পরনে, বেনকে দেখে লম্ফঝম্প দিচ্ছিলো। 

বেন চুমুটা দিয়েছিল আনাড়ির মতো। লজবজে আর ক্ষিপ্র। বেনের নাক থেকে একফোঁটা সর্দি তার গালে লেগেছে। 

"বেন!" তিনি চিৎকার করে ডাকেন। " দাঁড়াও বেন!" 

"কি?" ঘুরে দাঁড়ায় বেন। 

"আমি বরং চাইবো টার্কিটা আমার ভেতরেই থাক।" 

"ঠিকাছে।" সে মায়ের উত্তরটা যথেষ্ট গুরুত্বের সাথেই নিলো। 

"এটি নিয়ে আমরা আর বির্তক করবো না।" 

তিনি ভাবলেন এটা নিছকই একটা প্রশ্ন। গাড়িটা টান দেবার আগে রিয়ারভিউ মিররটা তিনি একবার পরীক্ষা করে নিলেন। 



লেখক পরিচিত: এ্যানি টেরেসা এনরাইট(Anne Teresa Enright) আইরিশ লেখক। জন্ম ১১ অক্টোবর ১৯৬২ সাল। ছয়টি উপন্যাস, প্রচুর ছোটোগল্প এবং নিজের অভিজ্ঞতা প্রসূত নন ফিকশন "Making Babies: Stumbling into Motherhood" এর রচয়িতা। তাঁর লেখায় পরিবার, প্রেম-ভালোবাসা, সম্পর্কের জটিলতা, মাতৃত্ব, আত্মপরিচয় ইত্যাদি অন্বেষণের তীব্র ঝোঁক লক্ষণীয়। তাঁর লেখন ভঙ্গি জুড়ে থাকে গোলকধাঁধার কুহক। এ্যানি এনরাইটের লেখা আত্মস্হের জন্য পাঠকের চাই নিবিড় মনোযোগ। "দ্য নেকেড আই(The naked I)" সত্তর দশকের পেপারব্যাক এই ফিকশন গল্পসংকলনটিসহ সিলভিয়া প্লাথের "জনি প্যানিক এণ্ড দ্য বাইবেল অফ ড্রিমস(Johnny Panic and the Bible of Dreams)," রবার্ট কোভার(Robert Coover), জন শেভার(John Cheever), এবং মৌমাছি নিয়ে জন বার্থের (John Barth) চমকপ্রদ গল্প “Ambrose, His Mark” এ্যানি এনরাইটের লেখক জীবনে সবচে বেশি প্রভাব ফেলেছে বলে তিনি মনে করেন করেন। ২০০৭ সালে 'দ্য গ্যাদারিং' উপন্যাসটির জন্য তিনি বুকার পুরস্কার লাভ করেন। 



অনুবাদক
নাহার তৃণা
গল্পকার। অনুবাদক।
আনেরিকায় থাকেন। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন