বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২০

জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী'র গল্প : ভূতির মার রেস্টুরেন্ট

ভূতিদের রেস্টুরেন্টটা বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। দোকানের দরজায় ভূতির বাবা এক টুকরো সাদা কাগজে ‘রেস্টুরেন্ট বিক্রয়’ বেশ বড় বড় হরফে লিখে ঝুলিয়ে দিলা কাগজটা দুলতে লাগল বাতাসে।

ভূতির মার রেস্টুরেন্টের সামনে গাড়ি দাঁড়ায়। ভোলানাথ বটব্যাল নামেন। শহরের বিজনেস ম্যাগনেটা সৌভাগ্যক্রমে এবং শহরের একটি বৈশিষ্ট্য বলেও ভোলানাথবাবু থাকেন ভূতিদের বাড়ির একশ হাত দূরে ঠিক রাস্তার উল্টো দিকে তাঁর বিরাট হালফ্যাশনের চারতলা বাড়ি সামনের আকাশটা কালো করে রেখেছে।

এই ছোট্ট দোকানে ভূতির হাতের চা খেতে তিনি দোকানে ঢোকেননি। বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাগজের লেখাটা পড়া শেষ করে ভোলানাথ গাড়িতে ঢুকছিলেন। ভূতির নরম গলা শুনে ফিরে দাঁড়ালেন

‘তুই চা করতে পারিস? ভোলানাথ ভূতির কোঁকড়া চুলের মধ্যে সাদা বিশাল হাত ঢুকিয়ে হাসেন এবং ভূতির পিছন পিছন দোকানে ঢোকেন। ভূতি সারা দুপুর বারান্দায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল চা খেতে কেউ আসে কি না আশ্বিন মাস। এখন তো দুপুরে তেমন গরমও থাকে না, বরং বেশ চা-চা করে মনা তবু খদ্দের নেই। ছিল না।

ভূতি ঠিক জানত না, ভূতি আজ দুদিন ভেবে ভেবে বুঝতে চেষ্টা করছে, ক্রাইসিস কথাটার অর্থ কি। দোকানে আর তেমন খদ্দের ঢুকছে না। এটা ওটা হাতে করে এ টেবিলে ও টেবিলে ছুটোছুটি থেমে গেছে। ভূতিও থেমে গেছে।

ভূতির বাবা ‘বয়’ কেষ্টকে কাল বিদায় করেছে। কাল রাত নটায় দোকানের আলো নিবেছে। আজ সকালে দোকান খোলা হল বটে, কিছু তৈরি করা হয়নি। হবে না।

বাজারের ধরন-ধারণ দেখে ভূতির বাবার তো বটেই, ভূতির মার চোখও চড়কে উঠেছে।

আসলে রেস্টুরেন্ট দিয়েছিল ভূতির মা। গয়না বিক্রির টাকায়। যখন ভূতির বাবার চাকরি যায়। জীবনের মধ্যাহ্নে দাঁড়িয়ে সহজ সরলমন কালীনাথ ডুকরে কেঁদে ফেলেছিল। অফিস থেকে বাড়ি ফিরে মুখের ওপর দু’হাত রেখে কাঁদছিল।

বাবার সতেরো বছরের তাড়াহুড়ো করে ড্যালহৌসির ট্রামে চাপবার তাড়া, ট্রামে চাপবার তাড়ায় তাড়াহুড়ো করে মাথায় জল ঢালা ও ভাত খাওয়া হঠাৎ একদিন থেমে গেল দেখে ভূতিও কম ভয় পায়নি সেদিন বারো বছরের কান দুটোতে অনেক কথা উড়ে উড়ে গিয়ে ঢুকল। চাকরি গেল মানে সব যাচ্ছে। ভূতিরা মরবে। ভূতি ও ভূতির আর চারটে ভাইবোন মরবে।

সকলের বড় মেয়ে ভূতি।

ইস্কুলে নাম কাটা যাবে ওর, বিয়ে হবে না। কিন্তু ভূতির মা ভূতির বাবার চেয়ে শক্ত মানুষ। ভূতিরা এটা আবিষ্কার করল এবং সব চোখের ওপর দেখল। মার চুড়ি বিক্রির টাকা দিয়ে বাবা টেবিল কিনেছে, হার বিক্রির টাকায় টেবিল ও দশটা চেয়ার, আর পাপোশটা এসেছে।

দুটো ফুলের টব বসিয়েছিল দোকানের দরজার দু’ পাশে ভূতির বাবা।

পাড়াটা ভাল ছিল।

বড় রাস্তা সামনে ছিল।

অনেক আশা ছিল রেস্টুরেন্ট চলবার। বেপারিটোলার এই গলির মোড়ে ওরা যুদ্ধের বহু আগে থাকতে দুখানা ঘরে সামান্য টাকা ভাড়ায় বাস করছিল। দুখানা বেশ বড় ঘরা।

ভূতির বাবাকে অনেক আশ্বাস দিয়ে এবং ব্যবসা করাই যে এখন বুদ্ধিমানের কাজ, রাস্তার ওপর সদর খোলা এমন যাদের একটি ঘর আছে তাদের আর ভাবনা কি ইত্যাদি বলে এবং ভেবে ভূতির মা রেস্টুরেন্ট খুলেছিল।

ভূতির বাবা দোকানে বসল। কিন্তু রেস্টুরেন্ট চলল না।

ভূতির বাবা চালাতে পারল না।

দুমাসের মধ্যে দেনার দায়ে জর্জরিত হয়ে গেল বলতে গেলে কালীনাথ একরকম গা-ঢাকা দিয়ে আছে পরশু থেকে। পাওনাদাররা হুলুম হালুম করে তাগিদ দিচ্ছে দিনে দশবার করে।

বাড়িঅলা, দুধ, ডিম, মাংস মুদি। ভূতির মার মাথা ঘুরছিল।

কটা দিন সহস্র ভাবনায় মাথা ঘুরতে ঘুরতে কাল শেষরাত্রের দিকে ভূতির মার মাথা-ঘোরা হঠাৎ থেমেছে। যেমন ইলেকট্রিকের বিল মেটানো হয়নি বলে তাদের মাথার ওপরের পাখা হঠাৎ থেমে গেছে। শুধু থেমে যায়নি, পাখা দুটোও নেই। পাখার লোক কাল এসে পাখা খুলে নিয়ে গেছে।

আজ ভোরে উঠে ভূতির মা ঠিক করে ফেলেছে দোকান বিক্রি করে ফেলবে। আর আশা করা বৃথা।


‘বিক্রি না হওয়া তক দোকানের দরজা অবশ্য ভোলা থাকুক।’ ভূতির মা বলল, নয় তো পাওনাদারদের মনে আরো বেশি সন্দেহ জাগবে।’

কালীনাথ দোকানে নিজে বসবে না। দোকানে এখন থেকে ভূতি থাকবে।

রেস্টুরেন্ট হওয়া অবধি দিনে দশ কাপ চা খাওয়া যেমন রপ্ত করে ফেলেছিল তেমনি চমৎকার তৈরি করতেও শিখেছিল ভূতি চা।

দোকানে বসে থাকতে থাকতে হাই উঠছিল ওর।

তাই এইমাত্র উঠে গিয়েছিল ও দেখতে বারান্দায়। খদ্দের কেউ আছে কি না। গাড়িওলা কোনো খদ্দের তাদের চুপচাপ ঠাণ্ডা প্রায় উঠে যাওয়া দোকানে ঢুকবে ভূতি বিশ্বাস করতেও পারল না।

বার বার ডাগর কালো দুটো চোখ তুলে বটব্যালকে দেখছিল আর মাথা নিচু করছিল।


বটব্যাল ভূতির ছিপছিপে সুন্দর পাখির পালকের মতন হালকা নরম থুতনিটা হাতের মুঠোর মধ্যে নিয়ে বললেন, ‘তুই চা করতে পারিস?’

হাতের মুঠো থেকে থুতনি সরিয়ে নিয়ে ভূতি ঘাড় নাড়ল।

‘আর কি খাবেন?’ ভূতি প্রশ্ন করল।

বটব্যাল ঘাড় ঘুরিয়ে সকৌতুকে দোকানের ভিতরের অবস্থাটা দেখল। কিছুই নেই।

পাঁউরুটি মাখন বিস্কুট ডিম ও ঘিয়ের টিনগুলি খা-খা করছিল। মশলার কৌটোয় মশলা ছিল না।

গেল মাসে বড় রকমের লোকসান দিয়ে ভূতির মা এমাসের গোড়া থেকে সাবধান হয়েছিল। কিছুই আর কেনাকাটা হয়নি এবং এই করে এখন তো দোকানসুদ্ধ বিক্রি হতে চলল। টেবিল চেয়ার উনুন সসপেন কেটলি চামচ পেয়ালা পিরিচ বালতি ঝাঁটা। দরজার পর্দা দুটো।


সুন্দর পাপোশটাও বিক্রি করে দেওয়া হবে দোকান আরম্ভ করার সময় বেশ বড় একখানা পাপোশ কেনা হয়েছিল। ভূতির মা ওটা সাধ করে দোকান ও অন্তঃপুরের দরজার মাঝখানে বিছিয়েছিল। দানাপুরের কারিগরের হাতের তৈরি পাপোশ। মাঝখানে দুটো বড় গোলাপ।

এদিকে পর্দার ওপারে দাঁড়িয়ে, দোকানে অবস্থার কথা ভাবতে ভাবতে ভুতির মাও যাকে বলে ‘ডাকসাইটে’ বড়লোক খদ্দেরকে হঠাৎ দোকানে ঢুকতে দেখে চমকে উঠল।

বুকের ভিতর ঢিব ঢিব করছিল ভূতির মার। বটব্যাল তার কোলের কাছে ভূতিকে টেনে নিয়ে আদর করছে আর কথা বলছে।

‘তোর বাবা কই, খুকি?’

‘মাল কিনতে গেছে।‘ ভূতি বলে। কেননা ভূতিকে এই বলতে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে। পালিয়ে বেড়াচ্ছে বললে পাওনাদাররা আরো গণ্ডগোল করবে, দোকানে ঢুকবে, ভিতরের ঘর পর্যন্ত ধাওয়া করে ভূতিদের বাক্স-পেঁটরা বাসন-কোসন বিছানা-পত্তর হাতের কাছে যা কিছু টেনে নিয়ে নিয়ে চলে যাবে। ডিমওলা ভূতির বাবার কাছে একুশ টাকা পায়, গয়লা পায় পঞ্চান্ন, মুদি পায় (রেস্টুরেন্টের ও সংসারের তেল-মশলা আলু এবং কাঠ নিয়ে) একশ পঁচিশ, মাংসের মদন বসাকের ছাপ্পান্ন টাকা পাওনা হয়েছে। সকালবেলার মধ্যে দুবার এসে ওরা ভূতির বাবাকে খুঁজে গেছে। তাগিদ দিয়ে গেছে টাকার জন্য বস্তুত ভূতিদের ঘরেও আজ উনুন ধরানো হয়নি। চাল ডাল, এতটুকু নুন পর্যন্ত নেই। কাল বিকেল থেকে সব ফুরিয়েছে। দুটো বাচ্চাকে একমুঠো আটা ভেজে খাইয়ে এবং ভূতিকে কিছু আটা ও কিছু ছোলাভাজা খাইয়ে ভূতির মা নিজে পেট ভরে কুঁজোর জল খেয়ে পর্দার কাছে ঘন ঘন এসে দাঁড়াচ্ছিল। কেউ যদি দোকানটা কিনতেই আসে। এইবেলার মধ্যে আজকের মধ্যে ওটা বিক্রি হলে সন্ধ্যার দিকে যাহোক কিছু বাজার সওদা করা যায়। রান্নাবান্না করলে ছেলেমেয়েগুলো খেয়ে বাঁচে।

কিন্তু তিনি তো আর দোকান কিনবেন না, যেন শুধু চা খেতেই এসেছেনা ভূতির মা পর্দার ফাঁক দিয়ে বটব্যালকে দেখতে দেখতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কান খাড়া করে শুনতে লাগল কথা।


‘মাল কিনতে গেছে? কোথায়? বটব্যালের লাল মেদস্ফীত মুখে হাসি। ‘তোদের দোকানটা বিক্রি করে ফেলছিস?’

ভূতি কথা কইছে না একবারও।

নুয়ে কেটলির জল গড়াচ্ছে।

বটব্যাল আসন ছেড়ে উঠে খুকির পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। ভূতির মা চোখ দুটোকে পর্দার ফাঁক দিয়ে আরো বড় করে এ ঘরে পাঠিয়ে রুদ্ধশ্বাস হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

ঘাড় নাড়ছিল বটব্যাল ভূতির দিকে তাকিয়ে। ‘এমনি নয়, এমন করে চা করতে হয়।’

বটব্যাল কেটলি ও ছাকনি নিজের হাতে তুলে নিয়ে খুকিকে চা করে দেখায়। ভূতি মিটমিটি হাসে।

এতক্ষণ পর ওর জড়তা কেটেছে যেন। তরুলতা ঠোঁট টিপে হাসল।

বটব্যালেরও মেয়ে আছে। এই ভূতির বয়সী। দিব্যি গাড়ি চড়ে সেজেগুঁজে ইস্কুলে যায়।

গৌরী। ওর মেয়ের নাম গৌরী। পর্দার এপারে দাঁড়িয়ে ভূতির মার মনে পড়ল।


একসঙ্গে ইস্কুলে পড়ে। তাই বাড়িতে অনেক তথ্য কুড়িয়ে নিয়ে আসে ভূতি নিত্যা তিনটি বাড়ি করেছে বটব্যাল কলকাতা শহরে। তিনখানা তাঁর গাড়ি।

সব পেরেছে এই লোক বুদ্ধির জোরে। তাঁর ব্যবসায়ী বুদ্ধি।

চোখ বড় করে তরুলতা তাঁর চা তৈরি করা দেখতে লাগল। ‘এমনি চা করতে হয়। এমন করে যদি তোর বাপ চা তৈরি করতে পারত, তোদের দোকান ফেল পড়ত না।’ ভূতি চুপ।

মুখে আঙুল গুঁজে কথা শুনছে। ভূতির মা’র গা শির শির করছিল।

লোহালককড়ের কারবারি। শহরে তিনটে দোকান হাতের ছোঁয়ায় হরে হরে লোহা সোনা করে দিচ্ছে। সেই কারবারির হাতের তৈরি চা সোনার মত টলমল করবে ভুতির মার জানা ছিল বৈকি। ভূতিকে আবার কোলের কাছে টেনে নিয়ে সেই সোনালি চা একটা কাপে খানিকটা ভূতিকে দিয়ে বাকিটা নিজের জন্যে ঢেলে রেখে বড়লোক আবার খুকির সঙ্গে গল্প শুরু করল।

ভূতির মা একবার অন্তঃপুরে গিয়ে ছোট শিশুটাকে কোল থেকে নামিয়ে বিছানায় শুইয়ে রাখল। বড়টাকে এক টুকরো মিশ্রি হাতে গুঁজে দিয়ে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ঘরের মাঝখানে বসিয়ে রেখে আবার চলে এল পর্দার কাছে।

না, আরো বেশি কৌতূহল হচ্ছিল ভূতির মা’র এই জন্যে এই ভেবে যে সমান-বয়সী কালীনাথ কত অক্ষম, অপদার্থ একলা মানুষ এই লোক কি না করেছে।

বটব্যালের নিয়মিত মদ, মাংস, কলা, দুধ, ডিম ও সবজি খাওয়া উজ্জ্বল স্বাস্থ্যমণ্ডিত চেহারার দিক থেকে ভূতির মা এক সময় চোখ ফেরাতে পারল না।

তাঁর গিলে-মারা এন্ডি, শান্তিপুরী ধুতি, চকচকে পাম্পশু, সোনার বোতাম-আংটি, দামী সিগারেটের সুন্দর গন্ধ দোকানের আবহাওয়া বদলে দিয়েছে। না, রেস্টুরেন্টে কি আর দু’টি চারটিও খদ্দের আসেনি তাদের! আসত।

বেশির ভাগ এসেছে বেকার, বাউণ্ডুলে।

ধার খাওয়ার গোষ্ঠী।

এদের জন্যেই দোকানটা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারল না ভূতির মা ভেবেছে। আর বটব্যালের মত বড়মানুষরা গাড়ি হাঁকিয়ে চলে যায় সোজা সাহেবপাড়ার রেস্টুরেন্টে কি জানাশোনা কোন দেশী চায়ের দোকানে যেখানে ভাড়াটে মেয়ে রাখা হয়েছে, বাবুদের টেবিলে চা তুলে দিতে হেসে সোহাগ করে একটা দুটো মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে চা-এর সঙ্গে আরো দু’পদ খাবার গছিয়ে দিতা

ভূতি তাঁর হীরে-বসানো আঙুলের আংটিটার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে দেখছিল কি। চা খাওয়া শেষ করে ভূতির গালে আর একটি চুমো দেয় বড়মানুষ। ‘আপনি তো আমাদের দোকানে আসেন না।’ যেন আরও এক ধাপ সাহস বেড়েছে মেয়ের, বেশ সাজিয়ে-গুছিয়ে প্রশ্ন করছে।

‘আসব এখন থেকে, রোজ আসবা’ চায়ের বাটি হাত থেকে নামিয়ে রেখে বটব্যাল হঠাৎ যে কেন কথাটা বলল, ভুতির মা ঠিক বুঝল না। বাইরে ‘রেস্টুরেন্ট বিক্রি’ ঝুলছে কী বড়মানুষের। চোখে পড়েনি?

পর্দার সঙ্গে একরকম লেপটে দাঁড়িয়ে ভূতির মা চুপ করে রইল। কৌতুকবোধ করল ও। গরিবের দোকানে পা দিয়ে শহরের নামজাদা সওদাগরটি তার নোংরা ফ্রক-পরা তেরো বছরের। মেয়ের সঙ্গে কেমন মজার গল্প করছে।

‘বেশ তো, যদি রোজ এমন সুন্দর চা করে খাওয়াতে পার, আমি রোজ আসব।’

ভূতি কথা বলছে না। চোখে ওর অবিশ্বাসের হাসি তরুলতা টের পেল।

‘বেশ তো, রেস্টুরেন্ট বিক্রি হয়ে যাবে, এই তো তোমার ভাবনা? সিগারেট ধরিয়ে বটব্যাল খুকিকে বোঝাল, ‘আমি রোজ এসে তোমার হাতের চা খাব, আর চা-এর দাম একশ টাকার একটা নোট তোমার হাতবাক্সে ফেলে যাব, কেমন? কোথায় তোমার হাতবাক্স?

ভূতি এদিক ওদিক তাকায়।

পোড়ারমুখী ভূতি কথাগুলো কি বিশ্বাস করছে? ভূতির মা কড়িকাঠের দিকে চেয়ে একটা নিশ্বাস ফেলল।

ভূতি বড়মানুষের কোলের সঙ্গে আহ্বাদে একেবারে লেপটে গিয়ে এখন কথা গিলছে।

না থাক। আমি একজন একশ টাকায় এক পেয়ালা চা খেয়ে গেলে আর কি হবে আরো খদ্দের চাই। তার চেয়ে বরং—’ যেন ব্যবসায়ীর হিসাবে ভুল হয়েছে, এদিক-ওদিক তাকিয়ে সিগারেটের সবটুকু ধোঁয়া মুখ থেকে বার করে দিয়ে খুকিকে আর একটু আদর করতে করতে অন্য প্রস্তাব দেয়, তার চেয়ে তোমাদের দোকানটা কিনে নেওয়াই ভাল কিছু বেশি টাকা দিয়ে এ বিউটিফুল সাইট ফর এ শপ। দোকানের পক্ষে ঘরখানা চমকার।’

পর্দার এপারে দাঁড়িয়ে তরুলতা লোকটির শুভ্র কঠিন সুন্দর মজবুত দাঁতগুলি দেখল।

লোকটির মধ্যে যে প্রচুর ক্ষমতা, উৎসাহ ও বুদ্ধি আছে, যেন তাঁর দাঁতে সেকথা লেখা আছে।

হ্যাঁ, দোকানের দিকে চোখ গেছে। ঘরখানাই চাইছে কারবারি। একশ টাকার এক পেয়ালা চা খাওয়ার কথাটা কিছু না।

টেবিলটার দর হচ্ছে নাকি?

ভুতির মা কান খাড়া করে রাখেন।

কত, বল, বল তোমার সুন্দর টেবিলটারই আগে দাম শোনা যাক।’

লোহার সঙ্গে তিনি চা-ও চালাবেন। এমন না হলে ব্যবসায়ী, এমন না হলে পুরুষ!

কিন্তু, কিন্তু এসব প্রস্তাব খুকিকে কেন? একরত্তি মেয়ে বোঝে কি?

এখন আর শট, হাজার লাখ।

টেবিল, চেয়ার, মিটসেফ, বাসন-কোসন, পেয়ালা-পিরিচ, চামচ সব তাঁর পছন্দ হয়েছে, সব তাঁর চাই। একটি একটি করে ভূতির চুপ করে থাকা সত্বেও, তিনি দামের লেবেল এঁটে দিচ্ছেনা যেন এক্ষুনি দোকানটা কিনে ফেলবেন।

একটা আঙুল মুখের মধ্যে খুঁজে ভূতি ড্যাবড্যাবে চোখে বড়মানুষকে দেখছে।

না কি তাঁর যে অনেক টাকা আছে, আড়াই টাকা ডজন চামচের জন্য তিনি পঞ্চাশ টাকা ইচ্ছে করলে দিতে পারেন, ত্রিশ টাকার টেবিল তিনশ টাকায় কিনতে রাজি শোনাতে খুকিকে ভাল লাগছিল, তরুলতা ভাবল এবং ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বেশ কঠিন ভঙ্গিতে পর্দায় বুক ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

‘ওটা কত দাম? ভারি সুন্দর জিনিস!

এবার চোখ পড়ল যেন এতক্ষণ পর অন্তঃপুর ও দোকানের মাঝামাঝি অংশে বিছানো সুন্দর পাপোশটার দিকে চেয়ে থেকে তিনি হঠাৎ চুপ করে যান।

পর্দার এপারে দাঁড়িয়ে তরুলতার বুকের ভিতর ঢিবঢিব করছিল। ভূতির চোখে এখন আবার হাসির ঝিলিক লেগেছে। অর্থাৎ ও টের পেয়েছে মা পাশে দাঁড়িয়ে সব শুনছে। বাবা তো আর কাছে নেই। দোকান কেনা সংক্রান্ত গুরুগম্ভীর কথাগুলো মা’র সঙ্গে হতে দোষ কি ভাবছিল কি ও? বিশেষ এত চড়া দামে যখন সব তিনি কিনতে চাইছেন?

তা ছাড়া, তা ছাড়া তরুলতা আর একটা নিশ্বাস ফেলল। কালীনাথ কখন ফেরে, তার ঠিক নেই। আজ তিনদিন উস্কখুস্কু চুল গালভরা দাড়ি নিয়ে বন্ধুদের কাছে ঘুরছে। কেউ যদি দোকানটা কিনে নেয়া এ দোকানের মার নেই, বলছে সে মুখে, পর্যাপ্ত মূলধনের অভাবে চালাতে পারেনি, আরো ক’দিন ঘর থেকে দিয়ে চালিয়ে যেতে পারলে চলত।

কিন্তু কেউ আসছে না।

কারো সাহস নেই কালীনাথের এই রোগা টিংটিঙে চা-এর দোকান নিয়ে চালাবে।

কি কুক্ষণে যে তরুলতা সাহস করে এখানে দোকান খুলেছিল এখন ভাবে।

বল বল কত দাম?’ মনিব্যাগ বার করছেন তিনি। পাপোশটা তাঁর এত বেশি পছন্দ হয়েছে যে, যেন এর জন্য যে কোনও মূল্য দিতে তিনি প্রস্তুত। ভূতি শুধু একবার বললেই হয়।

সাহস পাচ্ছেনা খুকি।

কি করে পাবে?

দোকানে আর পাঁচটি জিনিসের মত এটিও তরুলতার গয়না বিক্রির টাকায় কেনা হয়েছিল। তরুলতা নিজে গিয়ে পছন্দ করে রাধাবাজার থেকে এনেছিল, পাপোশ আর ঝাড়ন দুটো।

বলতে কি, দোকানের আর পাঁচটি জিনিস ভালো দামে বিক্রি হলে তরুলতা ঠিক করে। রেখেছিল ওটা হাতছাড়া করা হবে না। দোকান থেকে অন্তঃপুরে টেনে নেবে। কিন্তু কত টাকা তিনি দিতে চাইছেন, এত ভাল জিনিসটির জন্যে

না কি তিনিও সাহস পাচ্ছেন না, এর উচিত মূল্য ধরতে। তা কি করেই বা পাবেন, ভাবল তরুলতা, সাধের জিনিসের মূল্য টাকা দিয়ে যাচাই করা চলে না।

আঃ তবু যদি কারবারি জানত, এই দোকানের চামচ-পিরিচ থেকে আরম্ভ করে ঝাঁটা-বালতিটা পর্যন্ত তরুলতার হার, চুড়ি, দুল বিক্রির সাক্ষী হয়ে ওখানে পড়ে আছে।

কি হল?

চোখের তারা ঝিকিয়ে উঠল ভূতির মা’র।

ভূতি পাপোশের ন্যায্য মূল্য কত বলতে না পেরে ফ্যালফ্যাল চোখে পর্দার দিকে চেয়ে আছে, পর্দার এপাশে পাপোশের প্রান্ত ঘেঁষে মা’র ফরসা দু’টি পা দেখছে কি বোকা মেয়ে!

নাঃ, তুমি দেখছি একেবারে আনাড়ি দোকানদার। তুমি যদি নিজে থেকে একটিরও দাম না বল, কি করে আর আমি এই রেস্টুরেন্ট কিনি বল?’ কারবারির মনিব্যাগ পকেটে ঢুকল। ত্রস্ত চোখে তিনি হাতঘড়ি দেখেন। আর তাঁর সময় নেই, অনেকক্ষণ কাটল এখানে, এই বেলা শেয়ারের বাজারে ডাক উঠছে, ছুটতে হবে তাঁকে এক্ষুনি।

বটে! তরুলতা ঢোক গিলল।

একশ টাকার পেয়ালা চা খাওয়ার মতই তিনশ টাকার আমকাঠের টেবিল কেনার প্রস্তাবটাও তাঁর বাতাসে ঝুলে রইলা

সত্যি কেবল খুকিকে কোলে নিয়ে চুমো খাওয়া, তার পর রেশমী ঝাঁকড়া চুলে আঙুল চালানো

ওটা কি? বড়মানুষের দুই আঙুলে একটা আধুলি। ‘দু’আনা তোমার চা-এর দাম। বাকি পয়সা দিয়ে লজেন্স খেও, কেমন?

আদুরে মোটা গলায় কথা বলতে বলতে তিনি মুদ্রাটি ভূতির হাতে গুঁজে দিয়ে উঠে দাঁড়ান। শুকিয়ে অপরাজিতার কলির মত নীল সাদাটে হয়ে গেছে খুকির মুখ দেখে তরুলতার কষ্ট হল।

আজ তরুলতা না ভেবে পারল না, কোন বেকার বাউণ্ডুলে দোকানে ঢুকে ভূতিকে এভাবে ফাঁকি দিলে ভূতি কি করত! কামড়ে দিত, নখ দিয়ে আঁচড়ে দিত আত্মসম্মানে ওর লাগলে খুকি। যে আজকাল বেশ ফোঁস করে ওঠে, তরুলতা লক্ষ্য করেছে বৈকি। শিবু তো গত পরশু থেকে ‘ধারে বিক্রি বন্ধ করে দেওয়াতে বেকার বাউণ্ডুলেগুলো আর ওমুখো হচ্ছে না। উঃ কি সব খদ্দের! ওরা ধার খেয়ে খেয়ে রেস্টুরেন্টটা তো খায়নি, তরুলতার গায়ের গয়নাগুলো চিবিয়ে খেয়েছে। সেজন্যেই ওগুলোর ওপর তরুলতার আরো বেশি রাগা তা ছাড়া অস্বীকার করবে কে, আজ ভূতি একলা দোকানে আছে দেখলে রক্ষে নেই। দোকান ছাড়বার নাম করত না একটিবার, অষ্টপ্রহর মাছির মত বিজ বিজ করত। চা খেত আধ পেয়ালা থেকে বড় জোর দেড় কি দু’কাপ ওই খেয়ে রাত আটটা পর্যন্ত চলত আড্ডা না এক টুকরো রুটি, না একটু মাংস মাঝখান থেকে ভূতির বারোটা বাজতা হ্যাঁ, ওই একরত্তি একটা ফ্ৰকপরা মেয়ের পিছনে লাগতে অসভ্য জানোয়ারগুলো ইতস্তত করত নাকি। অবশ্য এক্ষেত্রে তরুলতা সেসব কিছু ভাবল না।

কিন্তু তিনি এ কি করলেন। বাপস! এত আদর ও চুমো খাওয়ার পর শেষে ছ’আনা বকশিশ।

কিন্তু, কিন্তু ভূতি যে শেষ পর্যন্ত এত বড় লোকটাকে এভাবে ঘায়েল করবে, তরুলতা ভাবেনি।

‘আপনি ভয়ানক ভীরু।’ খুকি মুখ খুলল। ‘ভয় পেয়ে যাচ্ছেন, আমাদের দোকানটা কি আপনিও চালাতে পারবেন না, এত বড় কারবারি মানুষ, শুনি।’

বটব্যাল চৌকাঠের দিকে পা বাড়িয়েও ফের ঘুরে দাঁড়ান।

‘জানেন? বাবা চালাতে পারল না বলে আমাদের দোকান ফেল পড়লা। মা হার, চুড়ি বেচে বাবাকে এই রেস্টুরেন্ট করে দিয়েছিল।’

‘তাই নাকি!’ সহানুভূতির ভঙ্গিতে তিনি ঈষৎ ঘাড় নাড়েন। একটি সেয়ানা মেয়ের মতই দুই হাত কোমরে রেখে ভূতি বলছিল, মা রাতদিন বাবাকে বোঝাচ্ছে দোকান হিসাবে ঘরটি ভাল। রাস্তার ওপর ডবল দরজার ঘর, চাল ডাল তেল নুন কাঠ কাপড় আলু ডিম ফল ফুল কড়াই বালতি যে কোন জিনিস এখানে চলে।’

‘তাই তাই। ‘ বটব্যাল মৃদু হেসে মাথা নেড়ে আবার ভূতিকে আদর করেন।

‘কিন্তু বাবার তো ব্যবসায়ে মাথা নেই! হরহর করে ভূতি বলে চলল—’চায়ের মত সোজা ব্যবসাই চালাতে পারল না যখন—

পর্দার এপারে দাঁড়িয়ে তরুলতার দুই কান লাল হয়ে গেল। ভূতি যে চোখেমুখে এত কথা বলতে শিখেছে, তরুলতা জানত না। বয়সের তুলনায় মেয়ে একটু বেশি পেকে গেছে নাকি! তরুলতা খুকির ওপর রাগ করল, আবার করলও না। এটা অবশ্য বাড়ির ওপর রেস্টুরেন্ট খোলার মন্দ দিক। কিন্তু এ আর কতটুকু মন্দা ক’দিন ভুতিকে রেস্টুরেন্টে যেতে দিয়েছে ও? তা না, সে একটা কথা নয়। বরং বল, দোকান বলে দোকান, মেয়ের হাত ধরে তরুলতার যে এখন রাস্তায় দাঁড়াবার অবস্থা পাওনাদাররা বাড়িতে ঢুকে অপমান করতে চাইছে। তারা ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছেছে। স্বামীর অবর্তমানে স্ত্রী-ই তো সব ঘরবাড়ি আছে, দোকান আছে, কালীনাথ যদি ফেরার হয় ক্ষতি নেই, পর্দার ওপারে না থেকে কত্রী যদি এপারে এসে আমাদের সঙ্গে বোঝাপড়ার চেষ্টা করেন, তবু তো মনে সান্ত্বনা পাই। আমরা কতকাল আর পাওনা ফেলে রাখব। বলছিল সব হাত নেড়ে।

কিন্তু এখন আদরের চাপে ভূতি কি বেশকিছুদূর এগিয়ে যাচ্ছে না। এত সব ওঁর কানে তুলছে কেন?

‘ক ভাই-বোন তোমরা?’ খুকিকে আবার তিনি কোলে নেন।

‘তিনটি।’

‘তুমি বড়?’

‘হুঁ, ভূতি বলল, ‘জানেন, এটা আগে দোকান ছিল না। আমাদের শোবার ঘর ছিল। বাবার চাকরি যাবার পর থেকে দোকানা’

বটব্যাল নীরব।

‘এখানে আমার পড়ার জায়গা ছিল, ওধারে ছিল মা’র লক্ষ্মীর আসন। মাঝখানে পড়ত খাট।’

বটব্যাল ঘাড় ফিরিয়ে ফিরিয়ে আবার দোকানটা দেখল।

‘কিন্তু এত করে কি হল।’ গলার অদ্ভুত সুর করে খুকি বলে, মা এত সব করেও বাবাকে। তুলতে পারল না।’কথা শেষ করে ও পর্দার দিকে তাকায়।

এবার তিনিও তাকান।

তারপর, তারপর ভূতি যে কথা বলে, শুনে তরুলতা এক মনে হাসে, আর এক মনে দাঁতে দাঁত ঘষে মেয়ের মুণ্ডপাত করে। বোকা মেয়ে। ও কি ভেবেছে, ঘরের সব খবর তাঁর কানে তুললেই গলে যাবেন, আর আড়াই টাকার পাপোশ পাঁচশ টাকায় কিনে নেবেন! পাকা ব্যবসায়ী। তোমার বাপ নয়।

‘মা রোজ বাবাকে বলে, তোমার হাতের চা খেতে ভাল-খদ্দের জোটে না, আসে যত এক পয়সার মা-বাপ-মরা ইতর ছোটলোক, জানোয়ার, আমি যেদিন চা তৈরি করব, সেদিন শহরের সব বড়লোক ছুটে আসবে এ দোকানে। কিন্তু তা তো আর হচ্ছে না। তা হলে এই দোকান দিয়ে আমাদেরও তিনখানা বাড়ি হত, গাড়ি হত।’

ভয়েলের কাপড়ে পর্দার কি-ই বা থাকে!

বটব্যালের সঙ্গে প্রায় চোখাচোখি হয়ে যায়। পর্দার একটা পুরু অংশে চোখ সরাবার চেষ্টা করে তরুলতা বিফল হয়।

‘সত্যি আপনি একটি জিনিয়াস’ বটব্যালের চোখে মোলায়েম মিষ্টি হাসি খুকির মুখে সব শুনলাম। যতটা করার করেছেন আপনি কিন্তু, কিন্তু সত্যি খুব প্রোস্পেক্ট ছিল এই দোকানে, তা কেন যে চালাতে পারল না খুকির বাবা—’ বলে তিনি একবার থামেনা তরুলতা অবশ্য এই মুহূর্তে আর স্বামীর অক্ষমতার কথা ভাবল না। বিব্রত হল ভূতির ডাকে। ‘তুমি এস না মা, এসে ভাল করে ওঁকে একটি কাপ চা করে দাও। দোকানে আর এখন কে-ই বা আছে।’

‘ভেঁপো।’ভূতির মাদন্তে দন্ত ঘর্ষণ করে আর একবার মেয়ের মুণ্ডপাত করল।

কিন্তু ভূতি ইতিমধ্যে পুরোপুরি নিজের মধ্যে ফিরে গেছে। আর একটা চুমো খেয়ে আহ্লাদে ওর দুই গাল থৈ থৈ করছিল।

বটব্যাল ওর রেশমী চুল নিয়ে খেলা করছিল।

জিহ্বাকাটা ভূতি পরিষ্কার করে বলল, ‘আমার চা খেয়ে উনি একশ টাকা দিচ্ছিলেন, তোমার চা খেয়ে ক’ হাজার টাকা দেন দেখা যাক।’

শুধু রাগ নয়, লজ্জায় তরুলতার কর্ণমূল আরক্ত হয়ে উঠেছিল।

বটব্যালের দৃষ্টি এড়াল না।

সূক্ষ্মবুদ্ধি কারবারি সুন্দর হেসে বলল, ‘ভালই তো। খুকির বাবা যখন ঘরে নেই, আপনিই তো সব। চা খাওয়ার প্রস্তাবটা তেমন কিছু না, ধরুন দোকানখানা আমি কিনছি। কিনতে চাইছি। অবশ্য ন্যায্য মূল্যে, সুতরাং সামনাসামনি কথাবার্তাটা—

‘তা তো বটেই।’ কারবারির মনের কথাটা বুঝতে তরুলতারও কষ্ট হয় না।

‘আপনি বসুন।‘ আর লজ্জা না করে তরুলতা তৎক্ষণাৎ উত্তর করল। তারপর পর্দা ছেড়ে চলে এল অন্তঃপুরে

আর ভূতির উপর রাগ করল না সে।

ছেলেমানুষ ও, বোঝে কি।

তরুলতা শুধু বুঝল, দোকান কেনার আগ্রহ তাঁর প্রবল ভূতিকে ফাঁকি দিতে চেয়েছিলেন, তরুলতাকে আর কারবারি ফাঁকি দিতে চান না। সত্যিকারের দরদস্তুর করতে কথা বলতে চান। কিসের কারবার করবেন তিনি?

ঘরে সাবান পাউডার ছিল না।

এমনি মুখখানা একটু বোয়ামোছা করে সারল তরুলতা ভূতির একটা ফরসা কাপড় বাঁচানো ছিল। তাই পরে নিল।

কিসের কারবার করবেন তিনি? তরুলতা সিঁথিতে সিঁদুর এবং চোখে কাজল পরতে পরতে আবার ভাবল, ‘তেল চিনি নুন আটা ডিম ফল ফুল মধু না কি সেই চা?

চা, আশ্চর্য! চা-এ কত লোক ডুবল, কতজন উঠল।

পর পর দুটো দীর্ঘশ্বাস ফেলে তরুলতা বাকি প্রসাধনটুকু সংক্ষেপে যখন শেষ করল, দরজায় আবার গাড়ির শব্দ শুনে চমকে উঠল তাড়াতাড়ি পর্দার কাছে গিয়ে উঁকি দিয়ে দেখল, চিনল গাড়ি।

মশলার হালদার।

রোজ দু’বেলা এই দোকানের সামনে দিয়ে তিনি বড় বড় হোটেল রেস্টুরেন্টে চা, ডিনার লাঞ্চ পার্টি খেতে গেছেন।

এই মাছি ভন ভন কানা রেস্টুরেন্টে আজ তাঁর কি দরকার?

কৌতূহলী লোহালককড়ই আগে প্রশ্ন করল।

‘এই দোকান আমি কিনবা ‘মৃদু হেসে হালদার বলল, ‘এ বিউটিফুল সাইট ফর এ শপ।’

‘ও বুঝেছি, আপনারও এ দোকান মনে ধরেছে। ‘ কোনরকম ভূমিকা না করে পাকা মেয়ে ভুতি এবার হুট করে বলে বসল, বসুন। আগে এই দোকানের চা খেয়ে দেখুন কি তার দাম হতে পারে, তারপর তো রেস্টুরেন্ট কেনার কথা হবে।’ বলে খুকি পর্দার দিকে তাকিয়ে ফিক করে হাসল।

ভূতির দুষ্টু ভুরুর দিকে তাকিয়ে তরুলতা তৃতীয়বার দন্তে দন্ত ঘর্ষণ করল আর সেই মুহূর্তে মিহি ভয়েলের ওপিঠে এলাচ ব্যবসায়ীর এলাচের মত ছোট ঈষৎ চ্যাপ্টা চোখের সঙ্গে তরুলতার চোখের ঠোকাঠুকি লাগল।

‘ও, আপনারই দোকান?’ হাসল হালদার।

‘বসুন।’ এবার আর ততটা আরক্ত না হয়ে তরুলতা ঘাড় নাড়ল। এবং সেই মুহূর্তে, দেখে আরও অবাক হল না, ঢুকল তেলকলের তালুকদার। তিনিও দোকানটা কিনতে চাইছেন।

‘বেশ তো, বসুন বসুনা’ প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে আড়নয়নে তাকিয়ে এলাচ সিগারেটের টিন থেকে সিগারেট তুলল।

কে? আবার কে? তরুলতার বুকের ভিতর দুরদুর করছিল। তুলার মার্চেন্ট নন্দী। ধারেকাছেই থাকেন বুঝি?

লক্ষপতিরা আরো লক্ষ লক্ষ টাকা করতে চাইছেন এখানে ব্যবসা দিয়ে এই দোকান ভাঙিয়ে। দোকানের দরজায় চুনের কারবারি চাকলাদারের সুন্দর বিশাল পন্টিআক দেখে ভূতির মার যত

চোখ জুড়ালো শরীর টাটাল তাঁর শতগুণ। কিসের দোকান? এক চা ছাড়া আর কি ব্যবসা চলতে পারে এখানে ভাবতে ভাবতে তরুলতা ঘরের টুকিটাকি একটা দুটো কাজ সেরে এবং কোলের বাচ্চা দুটোর হাতে আরো দু’টুকরো মিছরি দিয়ে যখন দোকানে এসে দাঁড়াল বাইরে আশ্বিনের পড়ন্ত বিকেল সোনার পাতের মত ঝিকমিক করছিলা।

যত্ন করে তরুলতা পাঁচ পেয়ালা চা তৈরি করে পাঁচজন অতিথির সামনে তুলে ধরলা এবং ভাঙা টিমটিমে রেস্টুরেন্টের দরজায় হঠাৎ পাঁচটা গাড়ি ভিড় করতে দেখে সেদিন ডিমওলা নিজে থেকে আরো দু’কুড়ি ডিম ধার দিয়ে গেল ভূতির মাকে।

মুদি মহোল্লাসে বয়ে নিয়ে এল আলু নুন পেঁয়াজ লঙ্কা। ‘দাম এখন থাক।’

তারা দু’দিন সবুর সইতে জানে।

‘যদি দোকান চলে, দামের জন্যে আটকাবে না।’ কয়লাওয়ালা ফিসফিসিয়ে বলে গেল তরুলতাকে।

এদিকে, উপস্থিত পাঁচজন, দোকান কেনার প্রস্তাব করতে নিরামিষ চা না খেয়ে চায়ের সঙ্গে কিছু খাওয়া-দাওয়া করার ভদ্রতা ও সৌজন্যতা মর্মান্তিকভাবে অনুভব করে এটা ওটার অর্ডার দেন।

তৈরি হয় ডেভিল কাটলেট কারি চপ।

আমকাঠের টেবিলের দর অনেক পিছনে পড়ে থাকে। কাটা-চামচের আওয়াজের কাছে এমন যে মনোরম পাপোশ সেটার পর্যন্ত দর করা সয় না আর সেই বিকেলে।

শুধু চা-এর সুখ্যাতি।

‘সত্যি বড় বড় হোটেল রেস্টুরেন্টে আমরা এমনটি খাইনি।’

মুগ্ধ অবাক চোখে ও হর্ষোৎফুল্ল চিত্তে কারবারিরা তরুলতার চা-এর প্রশংসা ও তার চপ কাটলেট তৈরির পদ্ধতির গুণগান করল।

মন্দ কি!’ মৃদু গলায় তরুলতা বলল, এখন থেকে নয় রোজই এসে এখানে একটু চা খাবেন!’

না, না’, বিনয়নম্র গলায় তাঁরা তরুলতাকে আশ্বাস দেন, তিনি যদি ইচ্ছা করেন, প্রকৃতই যদি দোকানখানা বিক্রি করতে চান, ভাল দাম এর পাবেন বৈকি। কেননা জায়গাটা শিগগিরই ডেভেলপড হচ্ছে। এই গলি আর গলি থাকছে না—বড় রাস্তা হবে। ইমপ্রাভমেন্ট ট্রাস্টের নজর পড়েছে এই অঞ্চলে।’

‘তদ্দিন কি আপনারা অপেক্ষা করবেন,কবে দোকানের ন্যায্য মূল্য স্থির হবে, তারপর দোকান কিনবেনা’ ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে তরুলতা সুন্দর হেসে উত্তর করলা।

‘নিশ্চয় নিশ্চয়।’ বিলাতি রেস্টুরেন্টের ফাউল ডেভিল কাটলেট ও চা এ শানানো পাঁচটি জিহ্বা একসঙ্গে কলকলিয়ে উঠল। ‘আগে তো আপনার সুশ্রী হাতের চা-এর প্রকৃত মূল্য নিরূপণ করা হোক, তারপর দোকানের দর ঠিক হবে, এখন কি। সত্যি, ভারি সুইট হোমলি অ্যাটমোসফিয়ারা’

তরুলতা আর কথা কইল না।

রেশমি চুল দুলিয়ে দুলিয়ে টেবিল থেকে টেবিলে ঘুরপাক খেয়ে খেয়ে ভূতি প্রত্যেকের প্লেটে চিংড়ি কাটলেট, ভেটকি ফ্রাই, মাংসের চপ ও ডবল ডবল ডিমের বড়া তুলে দিয়ে হি-হি করে হাসতে লাগল।

অর্থাৎ এতক্ষণ যে সবাই ওর গালে একরাশ চুমো খেয়ে চুলে অনেকক্ষণ হাত বুলিয়ে তারপর শুধু এক বাটি চা গিলে বেরিয়ে যাবার মতলবে ছিল সেটি আর হতে পারল না দেখে ভূতির আহ্বাদের সীমা ছিল না।

যেন প্রতিশোধ নিতে পারার আনন্দে ও কারবারিদের পাকা চুলে হাত বুলোচ্ছিল আর প্রত্যেকের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলছিল, এখানে একজোড়া চপের দাম ন সিকে, কাটলেট-জোড়া পুরো তিনটাকা, শেষটায় ভুলে যাবেন না মশাই।’

বলেই অ্যালার্ম দেওয়া ঘড়ির মত দূর ছিটকে গিয়ে হাসছিল।

দেখে, মেয়ের এটা বাড়াবাড়ি ভেবে ভূতির মা যে দু’একটা ভুরুর শাসন না করছিল খুকিকে এমন নয়।

কিন্তু সম্রান্ত খদ্দেরগণ তৎক্ষণাৎ দুঃখিত হয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন তরুলতার ব্যবহারের ‘নিশ্চয়ই ওরই তো এই রেস্টুরেন্ট, ওই তো আমাদের বলে দেবে কোনটার কত দাম।’ বলে চা সমাপনান্তে রুমাল দিয়ে মুখ মুছে সিগারেট ধরিয়ে তরুলতার চোখের দিকে তাকিয়ে সবাই মিটিমিটি হাসছিলেন। অপরাহ্নের নরম আলোয় সুন্দর একটা পার্টির আবহাওয়া ঘনিয়ে উঠেছিল

ছোট্ট রেস্টুরেন্টে।

এটা অবশ্য শত্রুপক্ষের বানানো কথা। সন্ধ্যার আড়লে গা-ঢাকা দিয়ে কালীনাথ বাড়ি ফিরে দোকানের ক্যাশ দেখে খুশির চোটে লাফিয়ে উঠে নাকি দরজায় টাঙানো ‘রেস্টুরেন্ট বিক্রয়’-টা ছিড়তে গিয়েছিল, তরুলতা বাধা দিয়ে বলেছিল, ‘আজই দরকার কি, বরং আরো ক’দিন ওটা দরজায় ঝুলুক। আর তুমি দিনকতক এমনি গা-ঢাকা দিয়ে বাইরে থাকা। আমি এসব জানি না আমি সেদিন শীতের দুপুরে ‘ভূতির মার রেস্টুরেন্টে বসে পরম তৃপ্তি সহকারে একটা ওমলেট ও চা খেয়ে এসেছি ও এক বন্ধুর মুখে সেখানে বসেই গল্পটা শুনেছি।

1 টি মন্তব্য: