বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২০

বিশেষ রচনা ঃঃ করোনার মৃত্যুচিহ্নিত সময় এবং আলবেয়ার কাম্যুর দ্য প্লেগ

লীনা দিলরুবা

আধুনিক মানুষ নৈতিক সংকটকে অবহেলা করে সুখ, সমৃদ্ধি, উৎসবকে আলিঙ্গন করে নিজেদের ভাগ্যকে যেন নিষ্পন্ন করে ফেলেছিল। ফাঁপা আর কপটতাপূর্ণ সম্পর্ক, পাপ এবং অপরাধের জন্য নেই কোনো অনুতাপ, নেই কোনো শক্ত আদর্শ। দেশ গৌরব, মেকী বীরত্ব প্রদর্শন, অন্যায়কে অন্যায় বলে চিনতে পেরেও মেনে নেওয়া, মানুষ যেন আকণ্ঠ ডুবে ছিল এক কাল্পনিক সুখে।

মানুষের বিকাশের সমস্ত কিছু জোট বেঁধেছিল দেশ থেকে দেশে, জনপদ থেকে জনপদে। মানুষ উড়ে আর ঘুরে বেড়াতে পারছিল। পাখির মত। প্রকৃতির ওপর নিজেদের অধিকারের ষোলআনা প্রতিষ্ঠিত করে সাবালক প্রাপ্তি নিশ্চিত করছিল প্রকৃতিকে উপেক্ষা করেই। তখনই যেন বাধ সাধল এক ভাইরাস। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহান শহরে নেমে এসেছিল এক কঠিনতা। সেই শুরু। এখনকার বাস্তবতা হল, চীন থেকে পরে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে ভাইরাসটি। ধনী-গরিব কোনো দেশ মানে নি। বিচ্ছেদ, দূরত্ব, শ্রেণী সংগ্রাম, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দৌড়, স্নায়ু যুদ্ধ, দেশ দখল, পালাবদলের রাজনীতি নয়, মানুষ এখন লড়াই করছে 'কোভিড-১৯' এর বিরুদ্ধে। মানুষ ভাবছিল, অমরত্ব কেবল বাকি, চিকিৎসা বিজ্ঞান তো সবই জয় করেছে। কিন্তু বস্তুত, প্রকৃতির বিরূপতাকে চরমে তুলেছিল যে মানুষেরা, তারা এখন অসহায় আত্মসমর্পন করেছে নভেল করোনাভাইরাসের কাছে। সব চেষ্টাকে, মানুষের মেধার চূড়ান্ত ব্যবহারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জীবাণুটি সংহার করছে হাজার হাজার প্রাণ। চিকিৎসরাও মরছে। জীবাণু থেকে রক্ষা পেতে মানুষ তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে, কিন্তু তারা অসহায়, অসহায়ভাবে প্রাণ হারাচ্ছে প্রতিদিন।

যে দূরত্বকে মানুষ আলিঙ্গন করেছে এতদিন, প্রেমিক প্রেমিকার কাছে থাকে নি, সন্তান পিতাকে একা করে দিয়েছে, যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে খান খান হয়ে গিয়েছিল, সেই বিচ্ছেদ, দূরত্ব এখন এই রোগের নিরাময়ের উপায়। বলা হচ্ছে, লকডাউন। ঘরে থাকো। একা থাকো, তবে হয়ত বাঁচবে। কারণ রোগটি খুবই ছোঁয়াচে। হাত ধরা যাবে না। ষ্পর্শ করা যাবে না। হায়! কর্তৃত্বশীল মানুষগুলো কত অসহায়!

পৃথিবীব্যাপী নভেল করোনাভাইরাস ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। কোভিড- ১৯ প্রথমে আক্রান্ত করছিল বয়ষ্কদের, এখন বৃদ্ধরা শুধু নন, মাঝ বয়সী এমনকি ছোট্ট শিশুরাও এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ঠিক এমনভাবেই প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়েছিল একটি জনপদ। কাউকে ছাড়েনি। না ছেলে না বুড়ো। আলবেয়ার কাম্যু তাঁর লেখা পৃথিবী বিখ্যাত উপন্যাস 'লা পেস্ত' বা 'দ্য প্লেগ' এ 'ওরান' নামে মৃত্যুচিহ্নিত একটি অঞ্চলের গল্প বলেছেন, যেখানে প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মানুষ অসহায়ভাবে মৃত্যুর কাছে হার মেনেছিল। অদ্ভুত কাকতাল হল, চীনের যে শহর থেকে গত ডিসেম্বরে করোনাভাইরাস নামের ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছিল তার নাম 'উহান'। আলজেরিয়ার ওরানেও মানুষ কোয়ারেন্টাইনে ছিল। এখনও পৃথিবীব্যাপী কোটি কোটি মানুষ কোয়ারেন্টাইনে। 'দ্য প্লেগে' কাম্যু বলেছিলেন আলজেরিয়ার একটি শহরের গল্প, কিছু মানুষের গল্প। এখন তাবৎ বিশ্বের লোক নভেল করোনাভাইরাসের গল্পের চরিত্র। ১৯৪৭ সালে কাম্যুর লেখা কাল্পনিক গল্পটি যে এই সময়ের বাস্তবতায় সিদ্ধি লাভ করবে কে ভেবেছিল !

আলবেয়ার কাম্যুকে বলা হয় অস্তিত্ববাদী লেখক। অ্যাবসার্ডবাদী দাশনিকেরা জীবনের মধ্যে কোনো দর্শনসূত্র খুঁজতে চান না, জীবনের বাস্তবতা তাঁদের কাছে বহুমূখি। এই দর্শনের মূল মন্ত্র হচ্ছে মানুষ সুখী হতে চায়, কিন্তু সে দেখে তার অস্তিত্বের প্রকৃতির জন্য তার ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষাগুলো নিষ্ফল বা ব্যর্থ হয়ে যায়। কিন্তু ব্যক্তি যদি তার অস্তিত্ব বিষয়ে সচেতন থাকে তবে তাকে শোষণ করা সহজ নয়। কাম্যু তাঁর আরেকটি বিখ্যাত উপন্যাস "ল্য এত্রানজার" বা "দ্য আউটসাইডার"-এ নায়ক মারসোর মাধ্যমে 'অ্যাবসার্ডিটির' তাৎপর্যমণ্ডিত চিত্র এঁকেছেন। তবে সমিল দেখা যায়, আলবেয়ার কাম্যুর সমস্ত রচনার মধ্যে রয়েছে একই স্বর। সেটি মৃত্যু। কাম্যুর মতো উপন্যাসে এত স্পষ্টভাবে মৃত্যুর কথা বলেন নি কোনো লেখক। বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যাপী যখন আমরা করোনাভাইরাসের আঘাতে সমাধানহীন সময়ে বাড়িতে বসে আছি সেই বাস্তবতায় আমাদের সকলের 'লা পেস্ত'কে পুনরায় পড়া উচিত (যদি সম্ভব হয় ফ্রেঞ্চ ভাষায় 'লা পেস্ত' বা স্টুয়ার্ট গিলবার্টের ইংরেজী অনুবাদে 'দ্য প্লেগ', বা বাংলায় 'মারী', মূল ফরাসী থেকে দেবীপদ ভট্টাচার্যের অনুবাদে)।

আলবেয়ার কাম্যুর জন্ম ১৯১৩ সালের ৭ নভেম্বর, আলজেরিয়ায়। পিতা ছিলেন কৃষক, পিতার মৃত্যুর পর তাঁর মা দাসীর কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। জীবনের নির্মমতা খুব কাছ থেকে দেখেছেন বলে শোষণ এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কাম্যুর তীব্র ঘৃণা ছিল। আলজেরিয়ায় মন্দোভিতে জন্মালেও, ওরানের একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার কারণে সেখানে তিনি দু'বছর বসবাস করেছিলেন। সেই ওরানকেই পটভূমিকায় রেখে নোবেল পুরস্কারজয়ী আলবেয়ার কাম্যু 'দ্য প্লেগ' নামের উপন্যাসটি লিখেছিলেন যেটি তাঁকে বিশ্বখ্যাতি এনে দিয়েছিল।

উপন্যাসটি বর্ণিত হয় একজন কথকের মাধ্যমে। কাম্যু উপন্যাসটিকে পাঁচটি পর্বে বিভক্ত করেছেন। প্রতিটি পর্বের অধীনে এক. দুই. তিন. চার...এভাবে বিভক্তি দিয়ে কাহিনীর বিন্যাস করা হয়েছে। তৃতীয় পর্ব একটানা লেখা। এখানে এক. দুই আলাদা করা নেই।

শুরুতেই কাম্যু কথকের মাধ্যমে 'ওরান' শহরটির বর্ণনা করেছেন। কাম্যুর মতে কোনো শহরের বৈশিষ্ট্য অনুধাবন করতে হলে দেখতে হয় সেখানকার মানুষজন কীভাবে কাজ করে, কীভাবে পরষ্পরকে ভালবাসে, এবং কীভাবে তারা মৃত্যুকে বরণ করে। ওরানের মানুষরা খুবই কর্মঠ। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যে আগ্রহ আছে, তারা মূলত বড়লোক হতে চায়, এবং আগ্রহী ছোটোখাট আমোদ-প্রমোদেও। আমোদ-প্রমোদগুলো হল মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশা করা, সিনেমায় যাওয়া কিংবা সমুদ্রে স্নান করা। ওরান অসুস্থ লোকের শহর নয়, ওরানের মানুষদের স্বাস্থ্য ভাল। রুগ্ন মানুষেরা এখানে নিঃসঙ্গ বোধ করে।

হাসিখুশি ওরানের বাসিন্দাদের নিস্তরঙ্গ জীবন এক রকম থাকে নি। সেই বসন্তেই একটি গুরুতর ঘটনা ওরানে ঘটে যায় যা কি না সেখানকার মানুষরা ঘটনাটি যে সেই বসন্তেই ঘটবে সেটি কল্পনাও করেনি।

ড. বার্নার্ড রিও। বয়স পঁয়ত্রিশের আশেপাশে, উচ্চতা মাঝারি, গায়ের রঙ চাপা, মাথায় ছোট করে ছাঁটা চুল। সেদিন ছিল ১৬ এপ্রিল। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র রিও তার চেম্বার থেকে নামবার মুখে সিঁড়ির চাতালে পা দিয়ে একটি ইঁদুর মাড়িয়ে দেন। ইঁদুরটি ছিল মরা। বাড়ির দারোয়ান মিশেলকে জিজ্ঞেস করেও মরা ইঁদুর সম্পর্কে কোনো তথ্য জানতে পারলেন না রিও। সেদিনই আবার সন্ধ্যায় আরেকটি ইঁদুর ডাক্তারের চোখের সামনেই চীৎকার করে মুখ থেকে রক্ত নির্গত করে মরে যায়। বিষয়টি চিন্তার। কিন্তু পরদিনই ডাক্তারের অসুস্থ স্ত্রীর পাহাড়ে চেঞ্জে যাবার বিষয় ছিল বলে তিনি বিষয়টি নিয়ে খুব চিন্তা করলেন না।

১৭ এপ্রিলেই দারোয়ান মিশেলের মাধ্যমে জানা গেল আরো কয়েকটি মরা ইঁদুর সেখানে দেখা গিয়েছে। সেই যে শুরু হল, আস্তে আস্তে শহরের সবাই প্রত্যক্ষ করতে লাগল সর্বত্রই মরা ইঁদুর। ইঁদুরের নাকে মুখে রক্ত। বীভৎস অবস্থা যাকে বলে। এপ্রিলের ২৮ তারিখে অবস্থা ভয়াবহ আকার ধারণ করল। বাড়ির দারোয়ান মিশেলের চোখদুটো অস্বাভাবিক উজ্জ্বল হয়ে গেল। বুক থেকে সজোরে নিঃশ্বাস নেবার শব্দের সঙ্গে কুঁচকিতে ভয়ানক যন্ত্রণা। মিশেল তখন পাদ্রী ফাদার পানালুর হাত ধরে হাঁটছিলেন। ফাদারের কাছেই ডাক্তার শুনলেন, ইঁদুরের মাধ্যমে হয়ত কোনো রোগ মহামারি হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। এরপর কথক আমাদের জানান, দারোয়ান মিশেল ফোলা গ্রন্থি নিয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে শরীরে ১০৫ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে কাতরাতে কাতরাতে মরে গেছে।

ওরানে প্লেগ রোগ জেঁকে বসল। রিও যেন এই জনপদের মানুষের দুর্ভোগ দেখবে বলে ভাগ্যকে বরণ করে নিয়েছে। প্রতিদিন তার কাছে আক্রান্ত রোগী আসছে। প্লেগে আক্রান্ত রোগীদের দেখে রিও শঙ্কিত হয়, বিষণ্ন হয়। রিওর ডাক্তারী বিদ্যা যেন অর্থহীন এই মহামারির কাছে। কুঁচকিতে ব্যথা, বমি, আর প্রচণ্ড জ্বরে ভুগে একে একে ওরানের মানুষগুলো মৃত্যুকে বরণ করতে লাগল। তাদের ফোলা গ্রন্থিগুলো যেন ফেটে পড়তে চায়। রিও সেগুলোকে ছুরি দিয়ে চিরে দেয়, রক্তমেশা পুঁজ ছিটকে পড়ে, কিন্তু আক্রান্ত মানুষগুলো তাতে রক্ষা পায় না। পূঁতিগন্ধময় পরিবেশে মৃত্যু হয় তাদের। খবরের কাগজগুলো অবশ্য মানুষ নয়, ব্যস্ত মরা ইঁদুর নিয়ে। কথক বলেন, "ইঁদুরগুলো মরছিল রাস্তায়, আর মানুষগুলো মরছে তাদের ঘরে। খবরের কাগজগুলোর যত মাথাব্যথা শুধু রাস্তার ঘটনা নিয়ে।"

এত রোগী। ঔষধপত্র মিলছে না। পাইকারী ঔষধের সরবরাহকারীর সহকারীকে ফোন করে রিও। সদুত্তর পায়না কোনো। রিও তার ডায়েরিতে লেখে, "কোন উত্তর পাওয়া গেল না।"

একসময় সাংবাদিকরাও নড়েচড়ে বসে। কাগজের দুষ্প্রাপ্যতাহেতু খবরের কাগজের পৃষ্ঠা সংখ্যা কমতে থাকে। নতুন একটি দৈনিকও প্রকাশিত হয় তখন, নাম, "প্লেগ সমাচার"। 

যারা এখনো আক্রান্ত হয়নি তারা এবং শহর কর্তৃপক্ষও যেন স্বীকার করতে চায় না মহামারি লেগেছে। স্বীকার করলেই যেন তাদের নৈতিক পরাজয় হয়। শুধু শহরের চিকিৎসক সমাজ এই পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারলেন। কিন্তু অস্বীকারের বিষয়টি বেশিদিন স্থায়ী হয় না। একে একে সবাই বুঝতে পারে তারা ভয়ানক এক মহামারির কাছে ধরাশায়ী। পুরো শহর লকডাউন করতে হয়। বাইরের অঞ্চলের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ওরানের যোগাযোগ। কথক বলেন, "বস্তুত মহামারি প্রায়ই ঘটে, তবু যতক্ষণ না তা আমাদের ঘাড়ে এসে পড়ে ততক্ষণ তা এসেছে এ-কথা সহজে বিশ্বাস করা যায় না। পৃথিবীতে এ-পর্যন্ত যতবার যুদ্ধ লেগেছে, প্লেগের মহামারিও বোধহয় ততবারই ঘটেছে। তবুও যুদ্ধ আর মহামারির মুখে মানুষ এখনও প্রতিবারই নতুন করে বিমূঢ় হয় আর নিজেকে অসহায় বোধ করে।"

কাম্যু উপন্যাসে সেই জনপদের দিকে তার দৃষ্টি সীমাবদ্ধ রাখেন নি। তিনি আমাদের পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া নানান মহামারির গল্প শোনান। এথেন্স, চীন, মারসেই, কনস্তান্তিনোপল...কনস্তান্তিনোপলে একদিনে দশহাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। দশহাজার মানুষ মানে বড় সিনেমা হলে দর্শক সংখ্যার পাঁচগুণ। সেখানকার হাসপাতালগুলোর স্যাঁতস্যাঁতে মাটিতে দেওয়ালের ধারে ঘেঁষাঘেঁষি সাজানো বিছানার সারি যেখানে রোগীদের না ছুঁয়ে লোহার আংটা দিয়ে টেনে তোলা হতো। কিন্তু মহামারির মধ্যে কী থেমে ছিল অমানবিকতা? কালো বিষাক্ত মহামারির মধ্যেই মুখোশধারী ডাক্তাররা উন্মত্ত নৃত্য করত, মিলানের কবরখানায় জীবন্ত নরনারীরা রত ছিল পৈশাচিক যৌনসঙ্গমে।

আস্তে আস্তে সমস্ত নির্মমতা নেমে এল ওরানের ওপরও। হাসপাতালে জায়গা নেই। কবরস্থানে গোর দেবার স্থান কমে যেতে লাগল। রোগীদের ইনজেকশান দেবার সেরাম নেই। রিও আশঙ্কা করছিল হয়ত শহরের অর্ধেক লোকই এই রোগে মরে যাবে। আক্রান্ত হলে মোটামুটিভাবে আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যেই রোগীরা মরে যেতে লাগল। বলা হল মানুষকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে। এবং কোয়ারেন্টোইনে চলে যেতে।

এপ্রিলে আঘাত হানার পর প্রায় চারমাস পরে প্লেগ সবদিকে ছড়িয়ে পড়ল। উপন্যাসে লেখা হল, "আগস্ট মাসের মাঝামাঝি প্লেগ প্রায় আর সকলকেই সমানভাবে প্রভাবিত করেছিল। ব্যক্তিগত জীবন বা স্বতন্ত্র ভাগ্য বলে কারুর কিছু রইল না- রইল শুধু প্লেগ, আর প্লেগের চিন্তায় জর্জরিত একটা সর্বজনীন সাধারণ ভাগ্য। সমস্ত চিন্তাকে ছাপিয়ে উঠল বিচ্ছেদ আর নির্বাসনের এই বেদনা- তার সঙ্গে মিশে রইল বিদ্রোহের নিষ্ফল বাসনা, আর একটা সর্বব্যাপী বিভীষিকা।"

একসময় মানুষ মারা গেলে কফিন এবং শবাচ্ছাদনের কাপড়ের ঘাটতি দেখা গেল। মানুষকে সমাহিত করা হত নির্দয়ভাবে। কুকুর আর মানুষ মরত একইসঙ্গে। কুকুরদেরও কবর দেয়া হত। কবর সেই প্রথাগত কবর নয়। গর্ত অনেকটা। মানুষকে কবর দেবার পর মৃতের আত্মীয়কে সই করতে বলা হত, উপন্যাসে লেখা হল, "শেষের এই প্রক্রিয়াটিই এই মৃত মানুষগুলোর সঙ্গে মৃত কুকুরদের পার্থক্য নির্দেশ করত। বুঝিয়ে দিত, মানুষের মৃত্যুর সব সময় হিসেব থাকে।" একসময় আর কবর দেবার জায়গা ছিল না। সিদ্ধান্ত হল প্লেগের আক্রমণে মৃত সকলকে পোড়ানো হবে। প্লেগের চাপে যেন মানুষের সমস্ত মূল্যবোধও নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। 

প্লেগে আক্রান্ত প্রথম রোগীর চিকিৎসা করেছিল রিও, এবং রোগটিকে প্রথম ‘প্লেগ’ আখ্যায়িত করা প্রথম ব্যক্তিও তিনি। রোগটির বিস্তার ঠেকাতে কর্তৃপক্ষকে বারংবার অনুরোধ করেছিল রিও। প্রথমে অন্য সবার মতো তিনিও রোগটির ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারেন নি, যদিও ক্রমান্বয়ে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পারেন। মহামারির প্রাদুর্ভাব বাড়লে একটি হাসপাতাল স্থাপন করে রিও, এবং প্রাণপণে রোগাক্রান্তদের চিকিৎসা চালিয়ে যায়। রিও মনে করে, প্লেগে আক্রান্তদের চিকিৎসা করাটা ডাক্তার হিসেবে তার দায়িত্ব, কোনো ধর্মীয় বা অন্য চেতনা থেকে নয়, চিকিৎসকসুলভ দায়িত্ববোধ থেকেই এটি করে রিও। রিও বলেছিলেন, তার কাছে এই প্লেগের তাৎপর্য এক অন্তহীন পরাজয় যেন। রিও বলেছিলেন, "আমি অনেক সহিষ্ণু আর সংযত হয়ে গেছি। শুধু, মানুষের মৃত্যু দৃশ্যে এখনও আমি অভ্যস্ত হতে পারিনি।"

রিওর সংষ্পর্শে আসেন আরো যারা এদের একজন তারু। পুরো নাম জ্যঁ তারু। প্লেগ ছড়িয়ে পড়ার অল্প ক’দিন আগে ওরানে পদার্পণ করেছিল তারু। হাসিখুশি মানুষ সে, প্লেগের সংক্রমণ ঘটার আগে শহরের স্পেনীয় নতর্কী আর বাজনদারদের সাথে মেলামেলা করে সময় কাটায়। ওরানের জীবনযাত্রা নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ লিখে রাখে ডায়েরিতে। প্লেগের বিরুদ্ধে যুদ্ধে স্বেচ্ছাসেবকদের দল তৈরির পরিকল্পনা প্রথম আসে তারুর মাথায়। কয়েদিদের দিয়ে কাজটা করানোর সরকারি পরিকল্পনা তার পছন্দ হয়নি। তাঁর কথা ছিল, প্লেগ প্রতিরোধ সবারই দায়িত্ব এবং নিজস্ব দায়িত্ববোধ থেকেই সবার করা উচিত এটি। প্লেগ সংক্রমণ যখন প্রায় শেষ তখন তারু এর সর্বশেষ শিকারদের একজনে পরিণত হয় এবং মৃত্যুর আগে এর বিরুদ্ধে অদম্যভাবে লড়ে যায়।

তারুর ডায়েরিটি যেন আয়না। আমরা সেই আয়নায় চোখ রেখে দেখতে পাই এক ভিন্নতর জীবন দর্শনের। তারু একজন বৃদ্ধের কথা লিখেছিল। যে বৃদ্ধের মতে, 'জীবনের প্রথমার্ধ হবে ঊর্ধ্বমুখী, কর্মব্যস্ত, আর দ্বিতীয়ার্ধ্বের গতি হবে নিচের দিকে। জীবনের পড়ন্ত এই দিনগুলো মানুষের নিজের থাকে না, এগুলোর ওপর তার আর কোন দাবী থাকে না। তার কাছ থেকে যে-কোন মুহূর্তে যে-কেউ এই দিনগুলো ছিনিয়ে নিতে পারে। ফলে এই সময়টাতে মানুষের আর কিছু করার থাকে না, আর এই সময়টাতে কিছু না-করাই বোধ হয় সবচেয়ে ভাল"। তারু লেখে, "মহামারী যত ব্যাপক হবে, মানুষের নীতিবোধও তত শিথিল হয়ে যাবে- আমরা আবার মিলানের যৌনবাসনার পুনরাবৃত্তি দেখব- স্ত্রী -পুরুষ আবার কবরখানার আশেপাশে লেলিহান কামতৃষ্ণাকে চরিতার্থ করবে।" 

তারু যখন রোগ মোকাবেলায় নিজেকে সম্পূর্ণ নিয়োজিত করে দিয়েছিল তখন রিও তার কাছে জানতে চায়,

"কি ব্যাপার তারু? কেন এর মধ্যে তুমি নিজেকে জড়াতে চাও?"

তারু জবাব দিয়েছিল, "ঠিক জানি না, হয়ত আমার নীতিবোধ এর জন্য দায়ী।"

রিও বলেন, "তোমার নীতিবোধ? কি ধরনের নীতিবোধ, জিজ্ঞেস করতে পারি কি?

তারু জবাব দিয়েছিল, "উপলব্ধি।"


উপন্যাসে লেখা হয়েছে ফাদার পানালুর কথা। সবার কাছে শ্রদ্ধাভাজন একজন জেস্যুইট পাদ্রি। প্লেগের শুরুতে গির্জায় বক্তৃতায় দাবি করেন, এটি ঈশ্বরের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে মানুষদের জন্য একটা শাস্তি। তবে তা সত্ত্বেও ঈশ্বর মানুষকে সেবা ও সহায়তা দিতে প্রস্তুত বলেও তিনি জানান। প্লেগে আক্রান্ত এক বালকের শয্যাপাশে বালকটির আরোগ্য কামনা করে প্রার্থনা করেন তিনি। কিন্তু বালকটি মারা যায়। ফাদার তখন রিওকে বলেন, এই মৃত্যুকে যুক্তি দিয়ে বিচার করা না গেলেও ঈশ্বরের কাজ হিসেবে এটিকে গ্রহণ করতে হবে। তিনি স্বেচ্ছাসেবকদের দলে যোগ দেন এবং জনতাকে জানান যে, নিষ্পাপ একটি শিশুর মৃত্যুও ঈশ্বরের পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। এর কিছুদিন পর পানালু নিজেও প্লেগে আক্রান্ত হন। চিকিৎসকের সাহায্য নিতে অস্বীকার করেন তিনি, আস্থা রাখেন কেবল ঈশ্বরের ওপর, এবং মৃত্যু হয় তাঁর। যেহেতু প্লেগে আক্রান্ত অন্যদের সাথে তাঁর লক্ষণ মেলেনি সেহেতু রিও তাঁর মৃত্যুর কারণকে ‘সন্দেহজনক’ বলে লিখে রাখে।

রয়েছে স্ত্রীর জন্য প্রেম-কাতর রেমন্ড র‌্যামবার্ট এর কথা। একজন সাংবাদিক, শহরের আরব বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা নিয়ে প্রতিবেদন লেখার জন্য ওরানে আসে। প্লেগের সংক্রমণ শুরু হওয়ায় শহরে আটকা পড়ে সে এবং উপলব্ধি করে, এমন একটি জায়গায় আটকা পড়েছে যার সাথে কোনো সম্পর্ক নেই তার। প্যারিসে ফেলে আসা স্ত্রীর অভাব বোধ করে সে এবং চেষ্টা করে শহর ছাড়ার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষকে রাজি করানোর। ব্যর্থ হয়ে চোরাকারবারিদের মাধ্যমে শহর ছাড়ার চেষ্টা করে সে, কিন্তু তাতেও ব্যর্থ হয়। অবশেষে শহর ছাড়ার একটি উপায় পায় সে, কিন্তু ততদিনে চিন্তাধারা বদলে গেছে তার। কেবল ব্যক্তিস্বার্থে বিপদাপন্ন শহরটি ছাড়ার ব্যাপারে বিবেক বাধা দেয় তাকে। তার মনে হয়, ওরানের অন্য বাসিন্দাদের মতো প্লেগ এখন তারও সমস্যা।

জোসেফ গ্র্যান্ড। নগর সরকারের একজন কেরানি, বছর পঞ্চাশ বয়স। একটি বই লিখছে সে, তবে সে এতটাই খুঁতখুঁতে যে প্রথম বাক্যের বেশি আর এগোতেই পারেনি। অল্প বয়সে বিয়ে করেছিল সে, তার কাজের চাপ আর দারিদ্র্যের কারণে স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেছে। প্লেগের সংক্রমণ বাড়ার পর স্বেচ্ছাসেবীদের দলে যোগ দেয় সে এবং স্বেচ্ছাসেবকদের মহাসচিবের পদ পায়। প্লেগে আক্রান্তদের পরিসংখ্যান রাখার দায়িত্ব অর্পিত হয় তার ওপর। শেষে নিজেও আক্রান্ত হয় এবং রিওকে অনুরোধ করে তার পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে ফেলতে। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবেই রোগমুক্ত হয় সে। উপন্যাসের শেষে একজন সুখী মানুষ হিসেবে পাওয়া যায় তাকে। স্ত্রীকে চিঠি লিখে সে এবং ফের হাত দেয় বই লেখায়।

কতার। আপাতদৃষ্টিতে কাজকর্ম কিছু করে না, রহস্যময় চলাফেরা। একবার আত্মহত্যারও চেষ্টা করে। শহরে প্লেগ ছড়িয়ে পড়ার পর তার ব্যক্তিত্বে পরিবর্তন আসে। অন্তর্ভুখী ভাব ঝেড়ে ফেলে বন্ধত্বপূর্ণ আচরণ করে সবার সাথে। সংকটকালীন সময়টিকে কাজে লাগিয়ে নিষিদ্ধ সিগারেট আর নিম্নমানের মদ বিক্রি শুরু করে সে। প্লেগের সংক্রমণ কমে আসার সাথে সাথে তার আচরণ বদলাতে থাকে। কখনো বন্ধুভাবাপন্ন, আবার কখনো অসামাজিক আচরণ করতে থাকে। এক পর্যায়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে রাস্তায় মানুষজনকে গুলি করতে শুরু করে। আহত হয় কয়েকজন, মারা যায় একটি কুকুর। পুলিশ কতারকে আটক করে।

একদিন প্লেগের উন্মত্ততাও থামল। অনেকেই আনন্দে কেঁপে উঠেছিল সেদিন। যখন শহরের বন্ধ গেটগুলো খুলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সবার জীবনে একইভাবে সেই আনন্দ বয়ে যায় নি। উপন্যাসে লেখা হল, "পুত্রহীন মার জীবনে যুদ্ধবিরতি কোনদিন শান্তি আনে না, বন্ধুহারা বন্ধুর হৃদয়েও তা শান্তির স্নিগ্ধতা সিঞ্চন করতে পারে না।"

রিওকে রেখে বন্ধু তারু চলে গেল জীবনের অন্য পারে। উপন্যাসে লেখা হল, "তারু চলে গেলেন। হয়তো তারু যা বলেছিলেন তাই ঠিক, -হয়তো জীবনের এই শেষ খেলাটায় তারু হেরেই গেলেন। কিন্তু রিও কি জিততে পেরেছেন? লাভের মধ্যে তিনি মহামারির স্বরূপ জেনেছেন। তা'কে স্মৃতিতে বয়ে বেড়াতে বাধ্য হয়েছেন; বন্ধুত্ব কি জিনিস তা বুঝেছেন, আর তারও স্মৃতি রোমন্থনের সুযোগ পেয়েছেন; স্নেহ কী জিনিস তা উপলব্ধি করেছেন এবং হয়তো তাকেও স্মৃতি হিসেবে তাঁকে বয়ে বেড়াতে হবে। মহামারি আর জীবনের দ্বন্দ্বে মানুষ লাভ করে শুধু জ্ঞান আর স্মৃতি। কে জানে, একেই হয়তো তারু প্রতিযোগিতায় জয়লাভ বলতেন।”

মহামারি থামলে মানুষ প্রিয়জনের কাছে ছুটে গেল। রাঁবেয়ার যেমন স্ত্রীকে কাছে পেয়ে আলিঙ্গন করলে উপন্যাসে বলা হল, "প্লেগের আসা যাওয়া মানুষের হৃদয়ের অনুভূতিকে, তার অধীর প্রেমতৃষ্ণাকে একটুও নষ্ট করতে পারে না"!

উপন্যাসের শেষে জানা গেল আখ্যান বর্ণনাকারী ব্যক্তিটি আর কেউ নয়, সে বার্নার রিও আসলে।

উপন্যাসে প্লেগ যেন অনেক কিছুর প্রতীক হিসেবে হাজির হয়েছিল। নির্মমতা, অর্থহীন জীবন, মানুষের অসহায়ত্ব -যন্ত্রণা ও মৃত্যু। প্লেগ সেরে গেলে ওরানে প্রবেশের গেটগুলি আবার খোলার সাথে সাথে বিশ্বকে এই ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল যে, তারা প্লেগের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জিতেছে। উপন্যাসটি একটি করুণ কৌতুক হিশাবেও শেষ হয়েছে। আসলে মানুষ কখনই মৃত্যুকে জয় করতে পারে না, অন্যকে এই রোগকে চিনতে ও লড়াই করতে শেখানোর জন্য যেন কাম্যু প্লেগের গল্পটি বর্ণনা করেছেন। প্লেগে আলবেয়ার কাম্যু দেখিয়েছিলেন দুর্ভোগ কাকে বলে। একটি মহামারি দেখা দেবার পর মানুষ কীভাবে শারীরিক এবং মানসিকভাবে শেষ হয়ে যায়, এটাই এই উপন্যাসের মূল কথা। নাস্তিক কাম্যু বিশ্বাস করতেন না যে ঈশ্বর বা পরকালীন কোনো জীবন আছে। এ উপন্যাসটি সীমাহীন প্রতীকী উপন্যাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নির্মমতা অনুসরণ করে কাম্যু যেন বলতে চেয়েছেন, যখনই মানুষ আত্মতুষ্টিতে নিবেদিত থাকে তখনই প্লেগ আক্রমণ করে। তাই যখন প্লেগ সেরে যায়, যখন দেখা যায় প্লেগের জীবাণু মানুষের ঘরের নানান জায়গা থেকে আবার বেরিয়ে আসছে, তখন আসলে প্রতীকী স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রাম যা শেষ হবার নয়, সেই চিরন্তন সত্যকে আমাদের সামনে উন্মোচন করে। এবং যেন উপন্যাসের শৈল্পিক পরিসমাপ্তিও রচনা করে। আজকের পৃথিবী নভেল কনোভাইরাসের কারণে সৃষ্ট রোগ কোভিড-১৯ নিয়ে যুদ্ধ করছে, বর্তমান নির্মম বাস্তবতা পুরো বিশ্বের অর্থনীতিকে, মানুষে মানুষে সম্পর্ককে কোথায় নিয়ে যায় সেটাই এখন দেখার বিষয়। ইতিমধ্যে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতারেস বলেছেন, করোনা মহামারি এমন মন্দা ডেকে আনবে যার নজির আমাদের সাম্প্রতিক ইতিহাসে নেই। তিনি বলেছেন, করোনার মহামারি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। এসবই তো শুধু নয়। আরো বহু প্রশ্ন জন্ম নেবে। আলবেয়ার কাম্যুর পৃথিবী বিখ্যাত উপন্যাস 'দ্য প্লেগে'র গভীর পাঠ বোধকরি এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের সাহায্য করবে।

৩টি মন্তব্য: