বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২০

হিশাম বুস্তানি'র গল্প : ভারসাম্যের খেলা-- এক অসম্ভব সময়ের অসম্ভব এক আখ্যান।

অনুবাদ : অমর মিত্র 


কাছিই- মোটা এক দড়ি দুই বহুতলকে জুড়ে বাঁধা ছিল। এক ছাদের সঙ্গে অন্য ছাদ সংযুক্ত করেছিল দড়িটি। 

যুবকটি ছিল একটি বাড়ির ছাদে। যুবতি ছিল অন্যটিতে। তারা পরস্পরকে দেখছিল। পরস্পরের প্রতি লক্ষ্য রাখছিল। 

এই দুজনের ভিতরের দূরত্ব বেশি নয়। যদি তারা মাটিতে থাকত, এই ব্যবধান কুড়ি পদক্ষেপেই মুছে দিতে পারত। কিন্তু এখন দুই বাড়ির মধ্যবর্তী শূন্যতা জুড়ে থাকা সেই দূরত্বকে বহুগুন বাড়িয়ে দিয়েছিল। 

এই দুই বহুতলেরই কোনো সিঁড়ি ছিল না। দুই বহুতলের কোনোটিতেই লিফট ছিল না। কোনোটিতেই অগ্নিকাণ্ডের সময় বাসিন্দাদের জরুরি নিষ্ক্রমণের জন্য অথবা দমকল কর্মীর প্রবেশের জন্য বিশেষ কোনো পথ- সিঁড়িও ছিল না। ঐ দুই বহুতলে কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। কেউ বহুতল ত্যাগ করে বেরিয়ে আসতেও পারবে না। তবুও তারা ঐভাবে দুই ছাদে রয়েছে। তারা কীভাবে বেরিয়ে আসবে, বেরিয়ে আসার কোনো পথই ছিল না। তারা দুজনে শক্ত করে বাঁধা দড়ির দুই প্রান্তে দুই ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল। 

যুবক চেষ্টা করছিল তার পা সেই দড়ির উপর রাখতে। ভারসাম্য রেখে রেখে পার হবে। 

সে তার একটি পা সামান্য তুলে বাড়িয়ে দিল দড়ির উপর। কিন্তু তার ভিতরে দ্বিধা এসেছিল। ইতস্তত ভাব এসেছিল। অন্য চিন্তা এসেছিল। দোলাচল ভাব তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সে ভাবছিল দড়ি থেকে যদি নিচে পড়ে যায় সে অভিজ্ঞতা খুব আনন্দদায়ক হবে না। সে যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল, সে পড়ে আছে ফুটপাথে। চারদিকে তার রক্ত ছড়িয়ে পড়েছে। সে যেন শুনতে পাচ্ছিল অ্যাম্বুলেন্স এবং পুলিশের গাড়ির সাইরেন।সেই ভবিষ্যতের সবটাই কয়েক মুহূর্তের ভিতরে সে দেখতে পায়। সেই মুহূর্ত তাকে স্থবির করে দিল। সে বুঝতে পারছিল তার দ্বিধা-দ্বন্দ্বের ভিতরে কতটা মৃত্যুর ছায়া পড়ে আছে। 

সে পিছিয়ে এল আগের জায়গাটিতে। বুঝতে পারছিল দড়ির উপর হাঁটার চেষ্টার অর্থ নিশ্চিত মৃত্যু। 

মেয়েটি বিমর্ষ হলো যখন দেখল দড়ির উপরে ভারসাম্য রেখে রেখে হেঁটে পার হয়ে আসা, অথবা ভারসাম্য হারিয়ে অবধারিত মৃত্যুর কাছে পৌঁছে যাওয়া-- কোনো সিদ্ধান্তই নিল না যুবক। সেই মেয়ে কিন্তু পার হয়ে আসার কথা ভাবল না। সে অপেক্ষা করতে থাকে যুবক পার হয়ে আসবে, এই ভেবে। 

যুবক দড়িটির দিকে তাকিয়ে ছিল। একবার ভাবল সে নিচু হয়ে দুহাতে দড়ি চেপে ধরে, দড়ির উপর পা ফেলে ফেলে পার হয়ে যেতে পারে। মাটিতে থাকলে মাত্র কুড়িটি পদক্ষেপ। কতটা আর ব্যবধান! 

অথচ... 

সে জানত না, মেয়েটির কাছে যাওয়া খুব প্রয়োজনীয় কি না। সে দেখছিল মেয়েটি তার জন্য অথবা তার মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে। 

যুবক ভাবছিল, মেয়েটি বিশ্বাস করে যে তার পার হওয়ার সিদ্ধান্ত যেন অপরিবর্তনীয় সত্য। দড়ির উপরে ভারসাম্য রেখে রেখে পার হয়ে সে তার কাছে পৌঁছে যাবেই। এ ছাড়া আর কোনো কিছুই ভাবতে পারে না মেয়েটি। সে পার হতে চেষ্টা করবে, পার হয়ে যাবে, তাইই সত্য। 

যুবক তার ট্রাউজারের পকেটে হাত দিল। একটি কাঁচি বের করে আনল। কাঁচিটি সে তার পকেটে লুকিয়ে রেখেছিল তখন থেকে যখন সে জানতে পেরেছিল সে এমন এক বাড়ির ছাদে আটকা পড়তে পারে যে বাড়ির কোনো সিঁড়ি নেই, লিফট নেই, আছে শুধু অন্য বাড়ির ছাদের সঙ্গে শক্ত করে বাঁধা এক দড়ি। 

চিন্তা না করে এক মুহূর্তেই কাঁচি দিয়ে দড়িটি সে কেটে দিল। কেটে দিয়ে উল্লসিত হলো। উচ্ছ্বাসে ভরে গেল। 

অতঃপর সেই যুবক সূর্যের দিকে তাকিয়ে নিরাবরণ হয়। সূর্যের আলোর নিচে একা শুয়ে পড়ে। 

আর সেই তরুণী ? সে দড়ি ধরল শক্ত করে। দড়িটি এখন মাটির দিকে নেমে গিয়েছিল। সে দড়ি ধরে নেমে গেল বহুতল থেকে। 

  

( লেখক পরিচিতি :
হিশাম বুস্তানি জর্ডনের কবি এবং ছোটগল্পের শিল্পী। আরবীয় ভাষায় লেখেন। ওই দেশের শ্রেষ্ঠ পুরস্কারে ভূষিত। এই গল্পটি ইংরেজি থেকে অনূদিত। গল্পটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে তাইওয়ানের Asymptote পত্রিকায়। তাঁর কবিতা এবং গল্প বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। বাংলায় প্রথম। তাঁর সঙ্গে পরিচয় ও বন্ধুতা হয়েছিল কাজাখস্থানে এশীয় লেখক সম্মেলনে। তাঁর এই ক্ষুদ্র গল্পটিতে সভ্যতার এই ভয়ানক সংকটকাল প্রতিভাত হয়েছে। ) 





অনুবাদক পরিচিতি
অমর মিত্র
কথাসাহিত্যিক। কোলকাতায় থাকেন।












কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন