বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২০

নৃপেন্দ্রনাথ মহন্তের গল্পের উপনিবেশ

পুরুষোত্তম সিংহ 

নৃপেন্দ্রনাথ মহন্ত। আমাদের নৃপেন ঠাকুর। ‘ঠাকুর’ এই অর্থে তিনি পাকা রাঁধুনী। স্বল্প উপকরণ নিয়েও জীবনের মজ্জায় মজ্জায় যে গল্প তা তিনি আবিষ্কার করেন।নিজে দেখেন, পাঠককে দেখান। জীবনে বহু গল্প লিখেছেন, বেশকিছু গল্পগ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে। এ বড় আনন্দের কথা এবার প্রকাশিত হতে যাচ্ছে নির্বাচিত গল্প সংকলন। আর এ সংকলনের জন্য একটি ভূমিকার প্রয়োজন হয়েছে। গল্পপাঠই কি কোনো গল্পের শ্রেষ্ঠ ভূমিকা নয় ? গল্পপাঠে উপলব্ধিজাত সত্যই কি শেষ সত্য নয় ? তবে কেন এই ঘটা করে ভূমিকা লেখা। আসলে একটি অনাবশ্যক ভূমিকার প্রয়োজন। গল্প ও গল্পকার ভিন্ন ভূগোলের কারণে ভূমিকা প্রয়োজন।

আজ বাংলা সাহিত্যে বহু গল্প ও গল্পকার। সেই ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভবনা বড় প্রবল। আর লেখক যদি প্রান্তিক হন সে বিপদ আরও ভয়ংকর। প্রান্তিক অঞ্চলের লেখককে শুধু গল্প লিখলেই হবে না, তা পৌঁছে দিতে হবে কেন্দ্রের পাঠকের কাছে। আর এখানেই হেরে গেলেন নৃপেন্দ্রনাথ মহন্তের মতো গ্রাম বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অজস্র গল্পকার। অথচ গল্পরচনার সহজাত কবচকুন্ডল তাঁর আয়ত্তে। কোনো তত্ত্বদর্শনের দ্বারা গল্পে প্রবেশ করেননি। উত্তর দিনাজপুরে তাঁর নিবাস। এইসব তথ্য বা লেখকের গল্পজীবনের ইতিহাস না জেনেই আমরা গল্পে প্রবেশ করব। 

বুদ্বদেব বসু লিখেছিলেন –“বাসনার বক্ষ মাঝে কেঁদে মরে ক্ষুধিত যৌবন”। কিন্তু এই যৌবন কার –নারী না পুরুষের ? পুরুষ ধাবিত হয় নারীর প্রতি না নারী ধাবিত হয় পুরুষের প্রতি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষই নিজের লালসার জালে, সৌন্দর্যের জালে নারীকে বিদ্ধ করে কিন্তু আজকের একবিংশ শতাব্দীর উত্তর আধুনিক যুগে নারীও পুরুষকে ফাঁদে টেনে আনে – একথা অস্বীকারের কোনো জায়গা নেই। পতঙ্গ নিজের চাহিদা পূরণে আলোর কাছে যায় ঠিকই কিন্তু পতঙ্গের পতনের জন্য আলোর কি কোনো দোষ নেই ? নারী-পুরুষের এই সমস্যাকে সামনে রেখেই নৃপেন্দ্রনাথ বাবু গড়ে তুলেছেন ‘পতঙ্গ বাসনা’ গল্পটি। তরুণ প্রজন্মের যুবক-যুবতীদের নিয়ে গড়ে উঠেছে এ গল্প। গল্পের মূল সমস্যা অতনুর রিক্তাকে প্রতারণা। বড়লোক অতনু আবার ফাঁদে ফেলতে চেয়েছে শিপ্রাকে। তবে শিপ্রা সে ফাঁদে পা দেয়নি। গল্পের মূল সমস্যা এটুকুই। কিন্তু এই সমস্যাকে কাহিনিরূপ দিতে গিয়ে লেখককে একটি গল্পের আশ্রয় নিতে হয়েছে। নৃপেনবাবুর গল্প মানেই উপমার খেলা, রঙের খেলা। তিনি নায়ক- নায়িকাকে কখনও প্রকৃতির অনাবিল পরিবেশে নিয়ে যান, কখনও কাহিনির প্রয়োজনে প্রকৃতি নিয়ে আসেন। আজকের এই ধ্বংসের পৃথিবীতে নারী বড়ই অসহায়। সেই রহস্য ফাঁদ থেকে নারীকে নিজেকেই রক্ষা পেতে হবে। কেননা –“মাকড়সার জাল পাতা সারা ভুবনময়।“ সেই ভুবনে শিপ্রা পতঙ্গ হতে চায়নি। এমনকি নিজেকে রক্ষা করে সে রিক্তার ভবিষ্যতও বাঁচাতে চেয়েছে। নারী হয়ে নারীর ভবিষ্যৎ চিন্তা বড় হয়ে উঠেছে। শিপ্রার এই নারীবাদের ভাষ্য গল্পকে সাধারণ স্তর থেকে তৃতীয় বিশ্বের দরবারে উপস্থিত করে দিয়েছে। পতঙ্গ যেমন আলোয় ঝলসে যায়, ঋতু পরিবর্তনে প্রকৃতির রূপবদল হয়, ভালোবাসা রঙ পাল্টায়, পুরুষ নিজের গোত্রে ফিরে যায়। সবাই ফিরে যায় কিন্তু পিছুটান তো থাকে, ফেলে যাওয়া সময়ের জন্য এক আত্মহনন তো থাকে, সেই জাগ্রত বিবেকের গল্প ‘পতঙ্গ বাসনা’। 

‘আমি নজরুল’ গল্পের সমাপ্তি নাসিমের বাক্য দিয়ে হলেই বোধহয় ভালো হত ! নাসিমের অভিমান প্রকাশের কোনো অবকশ লেখক রাখেননি। তবে সে জন্য আমাদের অনুযোগ নেই। যা পেয়েছি তাইবা কম কি। আসলে একটি গল্প সম্পর্কে লেখক সার্বাধিক যে সত্য ভাবেন তাই পরিণতি ঘটান। এই ‘সত্য’ বা ‘ভাবা’ বিভিন্ন লেখকের বিভিন্ন রকম। এ গল্পের মূলে আছে একটি মুসলিম পরিবারের দাম্পত্য জীবনের সমস্যা। নায়কের নাম ‘নজরুল’ হলেও সে ধর্মীয় চেতনায় বশবর্তী হয়েছে। সেই চেতনা থেকে মানবিক চেতনায় উত্তরণেই গল্পের সমাপ্তি ঘটেছে। আর সেই চেতনার জাগরণে বলি হতে হয়েছে নাসিম নামে এক বধূকে। এই দাম্পত্য সমস্যার সঙ্গে লেখক মিলিয়ে দিয়েছেন বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনাকে। দাঙ্গা বা ধ্বংসের কার্যকলাপ হিন্দু বা মুসলিম লাগায় না তা সংগঠিত করে কিছু দাঙ্গাবাজ মানুষ। যাঁর নাম ‘নজরুল’ সে এই ধ্বংসলীলায় মেতে উঠতে পারেনা তা মনে করিয়ে দিয়েছে নাসিম। এ গল্পকেও নারীচেতনার পাঠ থেকে বিচার করা যায়। নাসিম নিজে যেমন স্বাধীন জীবনচেতনায় বিশ্বাসী তেমনি স্বামীকেও সেই চেতনায় ফিরিয়ে আনতে চেয়েছে। প্রতিটি লেখকই গল্পকে কেন্দ্র করে এক মানবিক সম্পর্ক স্থাপন করতে চান। কেউ সফল কেউ বিফল হয়। আবার সেই উত্তরণের পথ ও কৌশল ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু উদ্দেশ্য এক। আজকের এই সংকটের পৃথিবীতে, যেখানে জাতি চেতনা বড় হয়ে উঠেছে, সেই বিপন্ন সময়ে আরও একবার নতুন পাঠের দাবি করে এ গল্প। 

‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ রিপুময় পুরুষের বহুবিধ লালসার গল্প। কবি লিখেছিলেন –“নিভাও বাসনাবহ্নি নয়নের নীড়ে”। কিন্তু আত্মসুখী রিপুময়ী পুরুষ নিজের কামনা চরিতার্থ করতে ভ্রমরের মতো এক ফুল থেকে অপর ফুলে ধাবিত হয়। কিন্তু মরশুমী ফুলের সৌন্দর্য বেশি কিন্তু স্থায়ীত্ব ক্ষণিক। তেমনি নারীর যৌবনও যেন। সেই সৌন্দর্যের খোঁজে অধ্যাপক নৃপতিবল্লভ। কিন্তু কোথাও চিরকালীন ভালোবাসা পাননি। আসলে ভালোবাসা পেতে হলে এক মনেরও যে প্রয়োজন। সে মন ছিল না নৃপতিবল্লভের, ফলে ভালোবাসাও স্থায়ী হয়নি। মধ্যবিত্তের আত্মসংকট, আত্মযন্ত্রণা নিয়ে গড়ে উঠেছে’সোনালী ডানার চিল’ গল্পটি। সব মধ্যবিত্ত তো আর আকাশে উড়তে পারেনা, তবে স্বপ্ন দেখে। সেই স্বপ্ন –স্বপ্নহীনতার গল্প এটি। মধ্যবিত্তের আত্মপ্রত্যয়ী বিবেক নিজ স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হলে যে আক্রমণের পথে এগিয়ে যায় তা লেখক এ গল্পে দেখান। সমাজসেবী অমিত সেন নিজ কন্যার প্রতি অত্যাচারের জন্য আহত করেছেন ঝিমলিকে। সে নিজে সমাজসেবা মূলক নানা বক্তব্য দিয়ে যায় অথচ শিশুশ্রম নিয়ে খেলা করেছে। এ গল্পের দুটি দিক – দুটি পরিবার, দুটি দাম্পত্য জীবন। একদিকে নীতা ও বাদল গুপ্ত, অন্যদিকে অমিত ও সুমিতা। নারী হয়ে নীতার মধ্যবিত্ত মনন একটি মেয়ের ভবিষ্যৎ চিন্তা করেছিল, সুমিতা চেয়েছিল আত্মসুখে প্রবিষ্ট হয়ে একটি মেয়েকে অন্ধকারে রেখে দিতে। অমিত সেন বাইরে বক্তব্য দিলেও ঘরে স্ত্রীর বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। আবার বাদল গুপ্ত বন্ধুত্বের সম্পর্ক বজায় রাখতেই মেয়েটির শিক্ষার কথা ভাবেনি। সে চেষ্টা করলেই একটি মেয়ে নীল আকাশে বিচরণের স্বাধীনতা পেত, কিন্তু মনে হয়েছে –“মানুষের পদপিষ্ট হয়ে প্রতিদিন অসংখ্য পিঁপড়ে মাছি মারা পড়ে। তাদের প্রত্যেকর জন্য কি চোখের জল ফেলা সম্ভব ?” চোখের জল ফেলা হয়নি, বাঁচেনি একটি মধ্যবিত্ত নারীর জীবনস্বপ্নের আকাঙ্ক্ষা। এ গল্পের একটি নারীবাদী পাঠ আবিষ্কারও অসম্ভব নয়। আসলে পাঠকের বহুবিধ সত্তা বিভিন্ন পথে গিয়ে বিভিন্ন তত্ত্ব জিজ্ঞাসা খুঁজে বের করতেই পারে, তেমন রসদ এ গল্পগুলিতে পাওয়া যাবে। 

আজকের এই বিচ্ছিন্ন সময়ে আরও একবার জরুরি পাঠের দাবি রাখে নৃপেন্দ্রনাথ মহন্তের ‘শিবমঙ্গল’ গল্পটি। আজকের লেখককে ভারতীয়ত্ববোধ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি জাগরণের প্রেরণা ছাড়া অন্য উপায় নেই। এক ভয়ংকর সময় যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে আজকের ভারতবাসীকে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। ‘শিবমঙ্গল’ আপাত দৃষ্টিতে একটি পশুকেন্দ্রিক গল্প। কিন্তু পশুকেন্দ্রিক গল্পকে লেখক মানবতার মেলবন্ধনের সীমায় বেঁধেছেন। বাংলা সাহিত্যে অজস্র পশুকেন্দ্রিক গল্প লেখা হয়েছে। তারপরও নৃপেন্দ্রনাথ মহন্ত একটি গল্প লিখলেন। কিন্তু লেখক সচেতনভাবেই পূর্বের গল্পগুলিকে এড়িয়ে গেলেন। আসলে হাতের সামনেই গল্পের শত শত উপদান। ফলে প্রভাবিত হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসেনা। জাহ্নবীবাবুর ষাঁড়ের নাম ‘শিবমঙ্গল’। কৃষিভিত্তিক গ্রাম। মুসলিম নিয়ামত কাজীর জমিতে ফসল নষ্ট করেছিল শিবমঙ্গল। নিয়ামতের সন্তান হালিমের আঘাতে শিবমঙ্গল আহত হয়। উত্তপ্ত হয়ে যায় পরিবেশ, দাঙ্গা সৃষ্টি হতে যায়। পুলিশের সাহায্য নিতে যায় দুইপক্ষই। কিন্তু ভারতবর্ষের গ্রাম বাংলা তো হিন্দু মুসলমানের মিলিত সহচার্যে সৃষ্টি। তা মিলিত সংস্কৃতির বার্তাবাহক। শিবমঙ্গল ফসল নষ্ট করেছে সত্য, কৃষকের ক্ষতি করেছে এও সত্য। এখানে কোনো ধর্মীয় গোঁড়ামি নয়, দুই জাতির উত্তপ্ত পরিস্তিতিকে থামিয়েছে জাহ্নবী ও নিয়ামত কাজী। ‘শিবমঙ্গল’ এখানে ধর্মের বার্তাবাহক, কিন্তু যেখানে হিন্দু মুসলমানের মিলিত অবস্থান সেখানে ধর্ম ও ধর্মীয় গোঁড়ামি পিছু হাঁটতে বাধ্য। দূর বহুদূরে চলে গেছে শিবমঙ্গল, পিছুপানে তাকিয়ে দেখেছে ভারতবর্ষের প্রকৃত স্বরূপ –“ক্রমে ক্রমে হিন্দু মুসলমানের একটি মিলিত দল ধবমান মিছিলের মত ছুটতে লাগল অনন্তকোঠা, মহাদেবপুর, মালোন, ধামসার পথ ধরে।“ 

বিজন ভট্টাচার্যের ‘গোত্রান্তর’ নাটকে আমরা দেখেছিলাম মধ্যবিত্তের জাতি রূপান্তরের কাহিনি। মধ্যবিত্ত হরেণ মাস্টার যুগের প্রয়োজনে কন্যাকে ভিন্ন গোত্রের পাত্রের সঙ্গে বিবাহ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। এ যুগ সত্য। নৃপেন্দ্রনাথ মহন্তের ‘অশাস্ত্রীয়’ গল্পের কাহিনি গড়ে উঠেছে ভিন্ন গোত্রের কন্যার সঙ্গে বিবাহ নিয়ে। লেখক বাজিমাত করেছেন গল্পের শেষে। গল্পের শেষ বিন্দুতে যেতে যেতে মনে হয়েছে লেখক কেন পিছিয়ে গেলেন তখনই লেখকের যাবতীয় মুন্সিয়ানার প্রকাশ দেখি, তেমনি ‘অশাস্ত্রীয়’ শব্দটির দ্বৈত ব্যঞ্জনা ফুটে উঠতে ওঠে। গল্পকথক দিদির কন্যার বিবাহের সম্পর্ক নিয়ে পাত্রপক্ষ মধুবাবুর কাছে উপস্থিত হয়েছেন। পাত্রপক্ষ ব্রাহ্মণ, কন্যাপক্ষ কৈবর্ত। ফলে মধুবাবু এ বিবাহ দিতে অস্বীকার করেছে। সোমা ও চিন্ময় যেহেতু প্রেমে মত্ত তাই কথক ভেবেছিল বিবাহ দেবেই। মধুবাবুর ‘না’এর মধ্যে লুকিয়ে ছিল এক ভয়ংকর সত্য। সোমার পিতা-মাতা আত্মহত্যা করেছিল। এই সোমা ছিল মধুবাবুর অবৈধ সম্পর্কের সন্তান। আজ তিনি তা স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছেন –“সোমা আমার আত্মজ।“ এই অশাস্ত্রীয় বিবাহের প্রসঙ্গ উত্থাপন করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে আরেক অশাস্ত্রীয় সম্পর্ক। বাঙালি বা ভারতীয় জনজীবনে ভাই-বোনের বিবাহ অসম্ভব, ফলে মধুবাবুকে পিছিয়ে যেতে হয়েছে। টিটমেন্টের বিচারে গল্পটি অসামান্য। নৃপেন্দ্রনাথ বাবুর সব গল্পের মতো এ গল্পের প্লটও সামান্য। গল্পের বিপুল আয়োজন বা বিপুল সমারোহ নিয়ে কখনও গল্পে প্রবেশ করেন না। অতি সাধারণ ভাবেই তাঁর গল্প শুরু হয়। কিন্তু সেই সাধারণের মধ্যেই অসাধারণ লুকিয়ে থাকে। তাঁর গল্প কেন্দ্রাভিমুখী। কাহিনির প্রয়োজে শাখা-প্রশাখার সমারোহ সেখানে নেই। তিনি যেন গল্পের পরিণতি ভেবেই গল্প শুরু করেন। এখানে লেখক বনফুলের সঙ্গে তাঁর অধিক মিল। অযথা বাক্যব্যয় বা শব্দ প্রয়োগ নয়, স্বল্প পরিসরে তিনি নিটোল আখ্যান গড়ে তুলতে ভালোবাসেন। আর সে গদ্যে মিশে থাকে উপমার বর্ণচ্ছটা ও কাব্যগন্ধী ভাষা। শুধুমাত্র গল্পপাঠেই পাঠক অনুমান করে নিতে পারেন নৃপেন্দ্রনাথ মহন্ত একজন সার্থক কবিও। 

‘জীবনের মাল্য হতে খসা’ ব্যর্থ প্রেমের গল্প। স্মৃতি সত্তার গল্প। আসলে মানুষ স্মৃতি ধরেই তো বেঁচে থাকে। তেমনি জীবনে বাঁচতে স্মৃতিকে কখনও উদ্বাস্তু করতে হয়। শিল্পীর জীবনচেতনা নিয়ে আমরা তারাশঙ্করের ‘পঞ্চপুত্তলী’ উপন্যাস পেয়েছি, তেমনি পেয়েছি বহু ছোটোগল্প। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শিল্পী’ গল্প থেকে আনসারউদ্দিনের ‘শিল্পী’ বা অনিল ঘোড়াই এর বহু গল্পের প্রসঙ্গ। আজ চিত্র প্রদর্শনে গিয়ে শ্রীপর্ণার মনে পড়েছে শিল্পীর কথা, যেখানে লুকিয়েছিল বাল্য প্রণয়ের ইতিহাস। প্রত্যেক গল্পলেখকেরই একটি করে নিজস্ব জীবনচেতনা যেমন থাকে তেমনি প্রত্যেকের উত্তরণের পথ ভিন্ন। নৃপেন্দ্রনাথ বাবু নিজস্ব শক্তিতেই গল্প উড়ান দেন। প্রতিটি গল্পের প্রেক্ষাপট উত্তরবঙ্গের প্রান্ত অঞ্চল। বর্ণনায় চিত্রধর্মীতা তাঁর এক অনায়াস গুণ। তবে গল্পগুলি বৃহত্তর পরিসরে যেতেই পারতো। ‘ভেতরের মানুষ’ গল্পেও অতীত প্রেমের প্রাধান্য। স্মৃতির রেখা ধরে আবার অতীতে ফিরে যাওয়া সম্ভবও নয়। তেমনি প্রতিটি মানুষের ভিতরেও কিছু ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া আছে, যাকে আমরা চলতি ভাষায় বলি মনস্তত্ত্ব। সেই মনের গহন প্রক্রিয়া ভিন্ন কথা বলে। শহরে বসবাসকারী কমলেশ আজ ফিরেছে গ্রামে। আসলে তাঁর সত্তায় সত্তায় জড়িয়ে আছে গ্রাম, কেননা সে গ্রামেরই সন্তান। তেমনি বৃদ্ধ জীবনে সেও বিচ্ছিন্ন, তাই ফিরে যেতে চেয়েছে নিজের শিকড়ে। অবলম্বন হিসাবে ফিরে পেতে চেয়েছে প্রমীলাকে। সেও বিচ্ছিন্ন সন্তান থেকে। আসলে এ গল্প শুধু অতীত প্রেমের গল্প নয় সময়ের গল্প। 

‘ঊনপাঁজুরে’ অপর্ণার জীবনযন্ত্রণার গল্প। স্বামী অত্যাচার থেকে সে বাঁচতে চেয়েছিল। সেখানে স্বামীর মৃত্যুই ছিল কাঙ্ক্ষিত। স্বামীর মৃত্যুশয্যাতেই সে গেছে প্রধান শিক্ষিকার কাছে সার্টিফিকেট আনতে, যেন স্বামী মৃত হলে চাকুরি পায়। বিবাহিত জীবনে অপর্ণার কোন সাধই পূর্ণ হয়নি, ভেবেছিল স্বামীর মৃত্যু হলে স্বাধীন জীবন উপভোগ করতে পারবে। লেখক শুধু গল্পই বলেন না সমাজের নঞর্থক দিকগুলিও ফুটিয়ে তোলেন। প্রধান শিক্ষিকা প্রথমে সার্টিফিকেট দিতে না চাইলেও টাকার অংক শুনে রাজি হয়েছে। এমনকি চাকুরির জন্য অপর্ণা মিথ্যার আশ্রয়ও নেয়। ইতিমধ্যেই খবর এসেছে স্বামী ভালো আছে –মৃত্যুর আশঙ্কা নেই। অপর্ণার জীবনস্বপ্ন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। স্বামীর প্রতি তাঁর যে ভালোবাসা নেই তা নয় কিন্তু যা প্রাপ্য ছিল তা সে পায়নি, তাই মনে হয়েছে –“কী হবে আগুনকে ফুল উপহার দিয়ে?” সন্তানের জন্ম দিতে পারেনি বলে আজও ব্যঙ্গ শুনতে হয় –“ আজও মেয়েদের শুধু সন্তানবতী হলে চলে না, পুত্রবতী হতে হয়। হতে না পারলে পরিবারের সকলের চোখে সে অপরাধী।“ সে সমস্ত দায়িত্ব পালন করেছে কিন্তু নারী স্বাধীনতা পেতে চেয়েছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর আর মূল্য কতটুকু ? স্বাধীন জীবনের স্বপ্ন দেখলেও সামাজিক নানা গণ্ডি যে টেনে ধরে। কেননা নারীর জন্মই তো পুরুষের বুকের পাঁজর থেকে। সেখানে শোষণ, অবহেলা ছাড়া আর কিছুই প্রাপ্য নেই নারীর। তবুও একটা প্রতিবাদ করেছে অপর্ণা। ‘ভাড়াটে জননী’ গল্প পড়তে গিয়ে মনে পড়ে সুবোধ ঘোষের ‘পরশুরামের কুঠার’ গল্পের কথা। তবে সময়ের ব্যবধানে গল্পের বক্তব্যও পাল্টে গেছে। আজ আর কোল দেওয়া নয়, প্রযুক্তির জগতে এসেছে টেস্টটিউব। উপসীর কাজ টেস্টটিউবে অপরের সন্তান ধারণ করা। সে চার সন্তানের জননী। অন্যের সন্তান গর্ভে ধারণ করার জন্য টাকা পেয়েছে ঠিকই কিন্তু মাতৃসত্তা বড় হয়ে উঠেছে। উপসীর মাতৃসত্তার কথাই এ বড় হয়ে উঠেছে। তবে তা অমূল্য বোঝেনি, তাঁর কাছে অর্থই বড় হয়ে উঠেছে। যা আজ উপসীর মাতৃসত্তায় আঘাত এনেছে –“কোকিল জননীর সন্তান কাকের আশ্রয়ে জন্ম নিলেও কোকিল হয়েই ফিরে যায়। উপসীর গর্ভের সন্তান কখনোই নিজের ছেলে বা মেয়ে হয়ে ফিরে আসে না। সে কোকিল মাতা নয় সে কাকমাতা।“ উপসী জানে অর্থ হলেই সব ইতিহাস চাপা পড়ে যায়, যেমন প্রজাপতি হলে শুঁয়োপোকার খবর কেউ রাখেনা। তবে অর্থ, কীর্তি, স্বচ্ছলতাকে অতিক্রম করে তাঁর মাতৃসত্তা বড় হয়ে উঠেছে। নৃপেন বাবুর গল্পের বক্তব্য স্বচ্ছ, নিটোল গঠন। ছোটো ছোটো হৃদয়গ্রাহী বাক্যে তিনি গভীর ব্যঞ্জনার কথা বলেন। কখনও উপভাষা ও লোকভাষার প্রয়োগে গল্পে আঞ্চলিকতার প্রসঙ্গ ভেসে আসে। তবে তা ভিন্ন মাত্রা পায়। 

‘স্বর্ণতন্তু’ গল্পটি আরও বৃহৎ রূপ পেতে পারতো, উপন্যাসের বীজ খুঁজে নেওয়া এর মধ্যে অসম্ভব নয়। এ গল্পেরও দুটি দিক। একদিকে স্মৃতি জাগানো বাল্য প্রণয়, অন্যদিকে কৃষির ধ্বংস। পাটশিল্পের জায়গা আজ দখল করেছে প্লাস্টিক। ফলে পাটের আঁশ দিয়ে যারা জীবন অতিবাহিত করতো তাদের সংসারে অজ অভাব। আসলে গ্রাম জীবন কীভাবে পাল্টে যাচ্ছে তারই আভাস দিয়ে যান লেখক। এ গল্পের একটা নিজস্ব দিক আছে, পোহাতুরা এ অঞ্চলের জল মাটি আবহাওয়া থেকেই উঠে এসেছে। কেউ কেউ হয়ত আঞ্চলিক জীবন চিত্র খুঁজে বের করতে পারেন, নিজস্ব ভূগোলের জীবনচিত্র অঙ্কনেই এইসব লেখকরা নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছেন, আসলে হাতের সামনে এত উপদান, ফলে পৃথক ভূগোলে এঁদের যেতে হয়নি। 

নৃপেন্দ্রনাথ মহন্তের গল্প থেকে বিবিধ পাঠ আবিষ্কার করা সচেতন পাঠকের অসম্ভব নয়। আঞ্চলিক জীবন থেকে ভাষাগত বৈচিত্র্য, নারীবাদী পাঠ থেকে জীবনের বহুকৌনিক বিস্তারে পাঠক পৌঁছে যেতে পারেন। তবে গল্প হিসাবেও এগুলি সুখপাঠ্য, বলা ভালো গল্পগুলি জীবনবীণায় উত্তীর্ণ হয়েছে। তবে সবগুলিই যে সার্থক ছোটোগল্প এমন দাবি অনেকে নাও করতে পারেন। উপরের এসব কথা মনে না রেখেই গল্পে প্রবেশ করা উচিত, ভিন্নপাঠে দাবি নিয়ে পাঠক এ ভূমিকাকে বাতিল করে দেবে – সে অপেক্ষায় বসে থাকে। 



১৮/১২/ ২০১৯ পুরুষোত্তম সিংহ 

রায়গঞ্জ

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন