বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২০

কার্ল রুথভেন ওফোরড'এর গল্প : শান্ত একটি গ্রাম



(লেখক পরিচিতি : 
কার্ল রুথভেন ওফোরড একজন কৃষ্ণ-আমেরিকান কথাসাহিত্যিক। জন্মেছেন ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে, ত্রিনিদাদে। লিখেছেন উপন্যাস, ছোটো গল্প। পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে মারা যান। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাসের নাম-হোয়াইট ফেস।)
অনুবাদ- ফারহানা রহমান 


কার্ল রুথভেন ওফোরড'এর গল্প : 
শান্ত একটি গ্রাম 

খুব ভোরে সূর্য ওঠার আগেই ভায়োলার ঘুম ভেঙে যায়। রান্না ঘরের জানালা দিয়ে সে পাহাড়ি কুয়াশাকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে দেখে। এখন সে আগের চেয়ে অনেক ভালো বোধ করছে। জিমের কথা এখনো মনে পড়ছে কিন্তু সেটা কাল রাতের মতো এতটা তীব্র কষ্টের নয়।

কাল রাতটা জঘন্য ছিল। গত দুই বছরের মধ্যে কাল রাতেই সে প্রথম জিমকে ছাড়া একা ঘুমিয়েছে। তার গ্রামের চাকরিটা মেনে নেওয়ার পর তারা আগের চেয়েও অনেক বেশি গভীরভাবে ঘুমিয়েছিল। গ্রীষ্মকাল আলাদা থাকার ব্যাপারটা তাদের কোনো একটি বিশেষ কারণে আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। তাই মনে হয়েছিল। এরপর কালরাতে জিমের কাছ থেকে অন্তত একশ মাইল দূরে ছিল সে। 

একা একা ঘুমানো ছিল ভয়ানক ব্যাপার। মিস্টার ও মিসেস ক্রিস্টিয়ান গ্রামে গেছেন। ফলে এই আশ্চর্য জায়গাটি আরও বেশি নিস্তব্ধ হয়ে গেছে, রুমটি খুব বেশি বড় আর খাটটাও একদম অন্যরকম। এটি হারলেমের মতো নয়। আলো নেভানোর পর এটি আর কোনো বিছানার মতো দেখতে লাগেনি। সে অনেক ভোরে একেবারে অন্ধকার থাকতেই উঠে গিয়েছিল। লাইট জ্বালিয়ে দিয়ে জিমকে লিখতে বসেছিল। জিমকে নিয়ে লেখা এটি অনেক আবেগপূর্ণ একটি চিঠি ছিল। অথচ এখন খুব তাড়াতাড়ি দিনের আলো ফুটে উঠতেই বেশ ভালো বোধ হতে লাগলো। 

ভোরের ধূসর দূরত্ব থেকে মনে হয় ঘূর্ণায়মান কুয়াশা বাষ্পের স্তম্ভের মতো সুউচ্চ পার্বত থেকে খসে পড়ছে। বাইরের দিকে তাকিয়ে ভায়োলা অনুভূতির গভীর নিস্তব্ধতায় ডুবে গেলো, তার মন জিমের কাছে ফিরে গেলো। সে ভাবলো, জিম নিশ্চয়ই এখনো ওঠেনি। মনে হয়, ও বেশি ঘুমাচ্ছে। এটি খুব খারাপ। হঠাৎই সে হেসে ফেললো। জিম যদি ক্লাসে যাওয়ার আগে দেরি করে ওঠে, তাহলে সে বোকার মতো ঘরের চারদিকে অস্থিরভাবে তাকাতে থাকে। হাসিটি তার সারামুখে ছড়িয়ে পড়ে, যেন সে জিমকে চোখের সামনে দেরি হতে এবং একা একা ঘরের ভেতর অস্থিরভাবে পাগলের মতো পায়চারী করতে দেখতে পাচ্ছে। 

ডাইনিং রুম থেকে ভারী পায়ের আওয়াজ পেতেই সে বিস্ময়ে ঘুরে দাঁড়ায়। তারা কি এত ভোরেই উঠে গেলো? রান্না ঘরের দেয়ালে ঝোলানো ইলেকট্রিক ঘড়ি বললো, সাতটা বাজতে ১০ মিনিট বাকি। সে জানালা থেকে সরে গেলো আর কফি তৈরি করতে শুরু করলো, ওই সময় সে রান্নাঘরের দিকে ভারী পায়ের আওয়াজ আসছে শুনতে পেলো। ওপরে না তাকিয়েই সে লোকটির পায়জামার নিচের অংশ ও মেঝের ওপর তার খালি পাগুলো দেখতে পেলো। 

জর্জ ক্রিস্টিয়ান জুনিয়র সাহেবকে রান্না ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে ও হাতপা ছড়িয়ে হাই তুলতে দেখলো। 

—শুভ সকাল, সুহ। সে উত্তর দিলো। ও ওপরের দিকে তাকায়নি। তার চোখ লোকটির খোলা পায়ের দিকে ফিরে গেলো এবং সে ভাবলো ওগুলো খুব বেশি শাদা। সে লম্বা শাদা পায়ের পাতার দিকে তাকিয়ে খেয়াল করলো এবং নিজে নিজে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছালো যে আসলে কালো পায়ের পাতা, শাদাগুলোর চেয়ে অনেক ভালো। এটি এমনই একটা ব্যাপার যে কেউ এটা নিয়ে তর্ক করবে না। 

ক্রিস্টিয়ান সাহেব সাচ্ছন্দ্যে রান্না ঘরে প্রবেশ করলেন এবং জানালাটি দখল করে দাঁড়ালেন। সূর্যটি পাহাড়ের ওপর ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। পুরো আকাশজুড়ে পাখার মতো করে উজ্জ্বল কমলা রঙের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছিল। শরীর টান টান করে হাই তুলতে তুলে তিনি বললেন, কফির ঘ্রাণ খুব মিষ্টি। হাস্যকরভাবে তিনি তার মাথাটি ধরে ঘুরে দাঁড়ালেন এবং শুঁকতে শুঁকতে বললেন, নিশ্চয়ই খুব সুঘ্রাণ।  

—এটি এক মিনিটের মধ্যেই তৈরি হয়ে যাবে, সুহ। 

—খুব ভালো। তিনি বিড়বিড় করেন, ‘খুব ভালো’। 

ভায়োলা ভাবলো, সে লোকটির নিঃশ্বাস থেকে মদের গন্ধ পেয়েছে। সে এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল। 

ক্রিস্টিয়ান সাহেব তার মাথাটি আবারও জানালার ওপর তার মাথাটা ঠেকিয়ে রাখলেন। এরপর রান্না ঘর থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেলেন। যাওয়ার সময় তিনি গুনগুন করছিলেন, সে যখন আসবে পাহাড় ঘুরেই আসবে। ওহ! সে যখন আসবে সে পাহাড় ঘুরেই আসবে। 

ভায়োলা মনে মনে ভাবলো—তিনি খুব দুশ্চিন্তায় আছেন। হ্যাঁ, গ্রামের মধ্যেই গতরাত থেকে তার মাথাটা ধরে ছিল। সে বিস্মিত হয় এটা ভেবে যে কীভাবে সপ্তাহের মাঝখানে মানুষ পুরো মাতাল হতে পারে? 

কফি পরিবেশনের সময় সে খেয়াল করলো যে তার চোখের নিচটা ফুলে আছে। 

—আমি কি কিছু টোস্ট করে দেবো আপনাকে, সুহ? 

—না না, ধন্যবাদ। আর কিছু লাগবে না। 

সে রান্নাঘরে ফিরে গিয়েছিল, সে বিস্ময়ের সঙ্গে তাদের কথা ভাবার চেষ্টা করছিল। সপ্তাহে কতদিন আসলে তারা নেশাগ্রস্ত হয়? গতকালকে তাদের কতই না ন্যায়নিষ্ঠ আর সুশৃঙ্খল মনে হয়েছিল। তার হালকা মেসতাওয়ালা মুখের স্ত্রী তাকে উত্তেজিত করে তুলেছিল, কিন্তু সে ভাবতেও পারেনি। 

—ভায়োলা! 

সে তার কফির কাপ নিচে রেখে তাড়াতাড়ি ভেতরে গেলো। 

—বলেন, সুহ। 

সে তার দিকে তার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তাকে বেশি ভালো দেখতে লাগছিলো না, সে ভাবল। 

সে বললো, ভালো। দৃশ্যত খুব কষ্ট করে সে তার একটি হাত প্রসারিত করে জানতে চাইলো, এখানে তোমার কেমন লাগছে? 

সে নরম সুরে বললো, মনে তো হচ্ছে খুব ভালো। 

তিনি হাত দিয়ে তার গাল চেপে ধরে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, তারপর গরম কফির কাপে চুমুক দিলেন। ভায়োলা অস্বস্তি নিয়ে একদিকে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো। 

তিনি বললেন, আমার খুব মাথা ধরে আছে। আমার মনে হয় আমি গ্রামের সব শুকনো জিনিস খাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। তুমি কি কখনো মাতাল হয়েছ? 

—না। সে মৃদুস্বরে উত্তর দিলো। 

—জীবনে একবারের জন্যও নয়? 

—না, সুহ। 

—খুব ভালো। খুব ভালো। আমিও নিয়মিত নই, কিন্তু কালকের রাতটা ব্যতিক্রম ছিল। 

—কফিটা গরম গরম খান। সে উপদেশ দিলো। এটা আপনাকে ভালো বোধ করতে সাহায্য করবে। তার মনে পড়ে গেলো যে একবার জিমের খুব মাথা ধরেছিল তখন খুব কড়া কফি খাওয়ায় তার ব্যথা কমে গিয়েছিল। 

ক্রিস্টিয়ান সাহেব চোখ বন্ধ করে এমনভাবে কয়েক চুমুক খেলেন যেন তিনি খুব বিস্বাদের কোন ওষুধ খাচ্ছেন—শহরে তুমি কী করতে? 

—কাজ। 

—কোথায়? 

—যেকোনো কাজ। বাসার কাজ। কারখানার কাজ। যেকোনো কাজ। 

—তোমার স্বামী কি বেকার? 

—সে লেখাপড়া করছে। 

—সে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং। সে গর্বের সঙ্গে শব্দটির ওপর জোর দিলো। 

—ব্যাপারটা মজার তো। তিনি কাপ-পিরিচের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ ঢেঁকুর তুললেন। —আমি দুঃখিত। 

ভায়োলা অস্বস্তি নিয়ে এক পা থেকে অন্য পা বদল করতে লাগলো এবং অস্থিরভাবে রান্না ঘরের দিকে তাকাতে লাগলো। 

—আজকের দিনটা তুমি খুব সহজেই কাটাতে পারবে। কোনও ব্যাপারে নিয়ে ভেবো না। আজ আমি একাই আছি আর আমি কাউকে বিরক্ত করি না। 

—আপনি একা? সে চমকে উঠলো। 

—আমার স্ত্রী কয়েক দিনের মধ্যেই ফিরে আসবে। কালকেও আসতে পারে। এটা কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়। সত্যি বলতে এটা কোন ব্যাপারই নয়। মনে হলো তিনি আবারও ঢেঁকুর তুলবেন, ভাগ্যিস তোলেননি। তার চোখগুলো ধীরে ধীরে বিস্তৃত হলো এবং তিনি তার ফ্যাকাসে ঠোঁট কামড়াতে লাগলেন। হঠাৎ তিনি টেবিল থেকে উঠে গেলেন। বাথরুমে গেলেন। 

ভায়োলা রান্না ঘরে গেলো, তার চোখদুটো চিন্তাচ্ছন্ন হয়ে ছিল। তার স্ত্রীর অনুপস্থিতি মোটেই ভালো ঠেকছিল না। সে এটা মোটেই পছন্দ করেনি। স্পষ্টতই গ্রামে তার সঙ্গে স্ত্রীর ঝগড়া হয়েছিল। সে শুনতে পেলো ক্রিস্টিয়ান সাহেব বাথরুম থেকে বের হয়েছেন, পরে তিনি ভাঙাভাঙা কর্কশ গালায় তাকে ডাকলেন—আমি বিছানায় ফিরে যাচ্ছি! খুব শিগগিরই সুস্থ হয়ে উঠবো। 

হায় খোদা, কেন যে সে এখানে ঢুকতে গেলো? সে কি লোকটির সঙ্গে এই গ্রামে একা থাকতে পারবে? এমন কিছু একটা হবে সে ভাবতেই পারেনি। জিম কী বলবে? সে কী ভাববে? জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে সে বাইরের পর্বতসারি দেখতে লাগলো, সূর্যের আলোতে সবকিছু এখন কী তীব্র সবুজ লাগছে! এখন তাহলে সে কি করবে সেটা নিয়েই বহুক্ষণ ধরে সে ভাবতে লাগলো। 

দুপুর বারোটার ক্রিস্টিয়ান সাহেবের ঘুম ভাঙলো এবং এখন তিনি রীতিমতো ভদ্রলোক। একটি নীল পোশাক হালকাভাবে তার কোমরের সঙ্গে আটকে আছে। তাকে একেবারেই অন্যরকম লাগছে। চোখের নিচের ফোলা ভাবটাও চলে গেছে। তার মুখটি আর শাদা ফ্যাকাসে হয়ে নেই। খুব ভদ্রভাবে নীরবতার সঙ্গে তিনি খাবার খেলেন। বিষাদের নীরবতা। ভায়োলা ভাবলো আর প্রকৃতপক্ষেই লোকটির জন্য দুঃখ বোধ করলো। সে ভেবে দেখলো প্রেম আসলেই একটা ভয়াবহ জগাখিচুড়ির ব্যাপার। খুব অল্পক্ষেত্রেই এটা আসলে দারুণভাবে কাজ করে। যেমন তার আর জিমের মধ্যে হয়েছে। 

খাওয়া শেষ করে তিনি নীরবে বসে একটি সিগারেট টানলেন। ভায়োলা তার দিকে সরাসরি না তাকিয়েই সমস্ত বাসনকোসন এক জায়গায় জড়ো করলো। তবে সে চোখের আড়াল দিয়ে তাকে দেখছিল। তার নীল সৈকতের পোশাকটির কাঁধ থেকে কোমর পর্যন্ত লম্বা ভি আকৃতির মতো খোলা ছিল, তার খোলা বুকের হালকা কোঁকড়ানো লোমগুলোর দিকে না তাকিয়ে সে থাকতে পারছিল না। জিমের বুকে কোনো লোম নেই। জিমের বুকটা প্রশস্ত, পরিষ্কার এবং তামাটে রঙের। জিম কতই না ব্যতিক্রম। শুধু টাকা নিয়ে চিন্তা করা ছাড়া জিম কখনো বিষণ্ন বা হতাশ হয় না। 

ক্রিস্টিয়ান সাহেবের জন্য দুঃখবোধ নিয়ে সে রান্না ঘরে ফিরে গেলো। এত ভাবার জন্য তার নিজের ওপর রাগ হচ্ছিল। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাকে জানিয়ে দেওয়ার যে, সে চলে যাচ্ছে। কিন্তু সে একটি কথাও না বলে সেখান থেকে চলে গেলো আবার পেছন পেছন ফিরে এলো। তার ব্যাপারে দুঃখিত কী দুঃখিত নয়, সেটা ব্যাপার নয়, কিন্তু সে এখানে থাকতে পারবে না। সঠিক উপায়ে কথাটা তার সামনে উপস্থাপন করার জন্য সে নিজেকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল কিন্তু সে ব্যর্থ হয়েছিল। সে বেসিনভরা থালা বাসনের সামনে দাঁড়িয়ে রইলো, নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করছিল, নিজেকে ভর্ৎসনা দিচ্ছিল। ওইসময় সে শুনতে পেলো, তিনি রান্না ঘরের দিকে আসছেন। 

—ভায়োলা। তিনি ডাকলেন। তার নাম ধরে ডাকার জন্য সে তার দিকে তাকালো। 

—সারাদিন রান্না ঘরে কাটানোর কোনো দরকার নেই। বিকেলটা ছুটি নাও। যখন তিনি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তার মুখটা খুব শান্ত ছিল এবং তিনি খুব গম্ভীর হয়ে ছিলেন। তাকে দেখতে দেখতে সে কীভাবে তার সামনে কথাটা পাড়বে, সেটা মনে মনে ঠিক করে নিচ্ছিল। লোকটিকে কথাটা এখনই বলতে হবে। এরপরও তার নিজেকে খুব বোকা বোকা লাগছিল। তিনি দরজার দিকে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াতেই তার সৈকতের কোটটি সোঁ সোঁ উড়তে লাগলো। 

—লাফালাফি করো, ঝাঁপ দাও বা সাঁতার কাটো! যা ইচ্ছে হয় করো! 

এক সেকেন্ড পর সে জানালার কাছে গেলো এবং তাকে দেখতে লাগলো। তিনি মেঠোপথ ধরে বোট হাউজের দিকে হেঁটে গেলেন। সে তার মাথার পেছন দিকটা এবং চওড়া কাঁধের দিকে ততক্ষণ তাকিয়ে ছিল. যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি ঘন বনের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। 

বাইরের বিস্তৃত সবুজ পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে সে জিমের কথা ভাবলো। যদি এখানে জিম থাকতো, তাহলে তারা দুজন কতকিছুই না করতে পারতো। উজ্জ্বল আলোতে নিচের হ্রদটি চকচক করছিল। শুধু যদি জিম থাকতো সে ভাবলো, তারা পার্বত আরোহণ করতে পারতো, উদ্দেশ্যহীনভাবে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াতো, ফুল তুলত, একেবারে অকারণেই। অথবা তারা নিচের হ্রদটির কাছে যেতো। অথবা কোথাও একটি বড় গাছের ছায়ার নিচে এমনিতেই বসে থাকতো। এই জায়গাটি এত সুন্দর আর শান্তিপূর্ণ! সে দীর্ঘশ্বাস ফেললো আর জানালার পাশ থেকে সরে এলো। বিকেলটাতে ছুটি থাকা আর না থাকাতে কী এসে যায়? কতগুলো হাঁড়িপাতিল রয়ে গেছে! 

সে ভাবতে ভাবতে অলসভাবে বাসনকোসনে সাবান মাখালো এবং ধীরেসুস্থে সব ধুয়ে ফেললো। তারপর বেসিনে যখন আর কোনো থালাবাসন রইলো না, তখন সে খুব যত্নের সঙ্গে এনামেলের ওপরে লেগে থাকা ময়লাগুলো পরিষ্কার করতে শুরু করলো। অবশেষে যখন সব দাগ উঠে গেলে সে ক্রিস্টিয়ান সাহেবের পাগুলোর কথা ভাবতে লাগলো। 

জানালার পাশে ফিরে গিয়ে সে ভাবতে লাগলো, কিছু কিছু বিকেলে ছুটি পাওয়া যাবে। তখন সে কী করবে বা কোথায় যাবে? গ্রামগুলো এখান থেকে অনেক দূরে। আর গ্রামে গিয়েই বা সে কী করবে? সে ভাবলো সে বরং হ্রদটির কাছে যেতে পারে। রোদ পড়ে নিচের জল উষ্ণভাবে ঝলমল করছে। আরও ভালো হয় যদি সে সাঁতারের পোশাক পরে হ্রদে নামতে পারে! কেন নয়? 

সে একসেট সাতারের পোশাক পরে ক্রিস্টিয়ান সাহেবের রুমের বড় আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। সে ভাবলো ভালোই লাগছে। গত শীতে তাকে পোশাকটির কোমরের কাছটিতে কোনো অল্টার করতে হয়নি। আর তার স্তনগুলোও খুব সুন্দর সুগঠিত আছে। এভাবে সে তার কমনীয় পা-যুগলের দিকে তাকালো। সে ভাবলো, শুধু সাঁতারের পোশাকই তাদের মধ্যে শালীন দূরত্ব রাখতে পারে। 

সে টাওয়েল ও গোসলের ক্যাপ এক হাতে দোলাতে দোলাতে দরজা দিয়ে বিশাল খালি বাড়িটি থেকে আস্তে আস্তে বেরিয়ে এলো। সে আঁকাবাঁকা মেঠোপথ ধরে বাদামি পায়ের নিচে নরমভাবে ঘাসগুলোকে মাড়িয়ে পাহাড়ের নিচের লেকের দিকে রওনা দিলো। 

লেকের কাছে পৌঁছানোর আগেই সে ক্রিস্টিয়ান সাহেবকে একটি খেয়া নৌকার ওপর বসে থাকতে দেখলো। সে প্রথমে খুব ভালো করে তাকে দেখতে পায়নি। নৌকার ভেতর তিনি শরীর প্রসারিত করছিলেন। সে ভাবলো এতক্ষণ নিশ্চয়ই তিনি ঘুমিয়েই ছিলেন। এখন জেগেই চিৎকার করে ডেকে বলছেন—এই যে আমি এখানে। 

সে ভাবতেই পারছিল না যে, সে এভাবে চিৎকার করে উত্তর দিতে পারবে। সে একটি হাত তাড়াতাড়ি ভয়ে ভয়ে ওঠালো এবং তার দিকে আর ফিরে চাইলো না। লেকের কিনারে সে এক মিনিট বসে রইলো। লেকের পানি কতটুকু ঠাণ্ডা সেটা অনুমান করার চেষ্টা করলো। তারপর সে স্যান্ডেলগুলো লাথি দিয়ে ফেলে লেকের জলে নেমে গেলো। 

সে ধীরে ধীরে সামনের দিকে হেঁটে গেলো এবং সম্ভবত প্রতিটি পদক্ষেপে পায়ের নিচে নরম কাদার স্পর্শ পেলো। পায়ের নিচের জল ঠাণ্ডা দলার মতো পা থেকে ঊরু পর্যন্ত ভিজিয়ে দিয়ে উঠে আসতে লাগলো। যখন বুক পর্যন্ত কাঁদার দলা উঠে আসলো, তখন সে থামলো। এটাই তার জন্য যথেষ্ট। সর্বোপরি সে সাঁতার জানে না। সাঁতারের ক্যাপটা যে মাথায় ঠিকঠাক অবস্থায় আছে সে ব্যাপারে সে নিঃসন্দিহান হলো। অতপর সে সামনের দিকে অগ্রসর হলো। সে হাত দিয়ে জল ছিটিয়ে জলকেলি করতে লাগলো। প্রথমদিকে জলকে ভীষণ ঠাণ্ডা লেগেছিল কিন্তু পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে তা উষ্ণ আরামদায়ক মনে হতে লাগলো। সে খেয়াল করেনি যে ক্রিস্টিয়ান সাহেব খেয়ানৌকা নিয়ে তার কাছাকাছি চলে এসেছে। যখন তিনি কথা বললেন তার গলার স্বরে ভায়োলা চমকে উঠলো। তুমি কাদার মধ্যে সাঁতার কাটছ। কেন তুমি বাইরে এসে সাঁতার কাটছ না? 

সে জলকেলি বন্ধ করে তার দিকে তাকালো। তিনি হাসছিলেন 

—তোমাকে আমার বাধা দেওয়া উচিত নয়। তুমি খুব ভালো করছিলে। 

সে সচেতন হয়ে গেলো এবং বুক পর্যন্ত জলের মধ্যে তখনো দাঁড়িয়ে থাকলো। 

তিনি আরও বললেন, আমার মনে হয় জলে তোমার আঘাতগুলো সত্যি খুব ভালো কিন্তু তোমার পাগুলো ডুবে ছিল। 

জলের ভেতর তার আঘাত করার ব্যাপারটি নিয়ে ক্রিস্টিয়ান সাহেবের মন্তব্য তার ভালো লাগলো। পাবলিক সুইমিং পুলে জিম তাকে দুজন সাঁতারুর সাহায্যে তার এই আঘাত করা শিখিয়েছিল। হঠাত ক্রিস্টিয়ান সাহেব খেয়া নৌকা থেকে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার কেটে তার কাছে এলো। 

এভাবে তোমাকে পা ছুড়তে হবে। তিনি সাঁতার কেটে তাকে দেখালেন, কেঁচির মতো তার মজবুত পাগুলো জলের নিচে, ওপরে কাজ করছিলো। তিনি বললেন, এখন এভাবে চেষ্টা করো। 

সে তখনো সেভাবেই দাঁড়িয়ে ছিল। 

—আসো আমি তোমাকে সাহায্য করছি—বলতে বলতে খুব সহজেই তার কোমরে হাত দিয়ে তাকে তুলে নিলেন। বললেন, এখন সাঁতরাও। শক্ত হয়ে থেকো না। শিথিলভাবে। যাহোক এখানে জল খুব কম। 

সে অনুভব করলো তিনি দৈত্যের মতো পদক্ষেপ দিয়ে তাকে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। 

সে অনুরোধ করলো—দয়া করুন। আমি সাঁতার পারি না। 

—ঠিক আছে আমি তো আছি। আমি তোমাকে ধরে রাখছি। হাসতে হাসতে তিনি বললেন। সে মুখের ওপর তার উষ্ণ নিঃশ্বাস অনুভব করলো। তিনি বললেন, এখন আমি যা বলছি তাই করো। শিথিল হও! 

—এখানে না। সে আকুতি করলো, এখানে খুব গভীর। 

—ভয় পেও না। আমি তো আছি” 

—না সে আবারও আকুতি করলো। সে সময় তিনি তাকে ছেড়ে দিলেন। সে বুঝতে পারলো এক বিশাল জলের দুনিয়ার সে ডুবে যাচ্ছে, সে চিৎকার করার চেষ্টা করলো। সে কোনো রকমে তার ঘাড় জড়িয়ে ধরলো এবং জলে হাবুডুবু খেতে লাগলো। 

তিনি বললেন, তুমি তো চেষ্টাই করলে না। এখন দয়া করে শান্ত হও। 

সে অনুরোধ করলো, না। মাথা ঝাঁকিয়ে, তার ভেজা চোখগুলো পিটপিট করছিল। 

ভায়লার মুখটা হঠাৎ ধাক্কা লাগার মতো করে তার গায়ে লাগলো —আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাও। দয়া করো। 

তিনি ভদ্রভাবে তাকে একটু ঝাঁকি দিলেন, তুমি ভয় পেলে কখনোই সাঁতার শিখতে পারবে না।এখন আমার কথা শোনো। আমার দিকে তাকাও। 

সে ভয়ে ভয়ে তার দিকে ঘুরে তাকালো। তিনি কোনো কথা বললেন না। কোনো কথা বলা ছাড়াই তার চোখ হঠা’ আগুনের মতো জ্বলে উঠলো, যা তাকে ভীত করে তুললো। ঠিক ওই সময়ই তার জিমের কথা মনে হলো, যেন সে দেখতে পাচ্ছে জিম লেকের গভির জলের ভেতর থেকে তার গাঢ় মুখটা উঠিয়েছে। 

—দয়া করুন। তার চোখের দিকে না তাকিয়েই সে অনুরোধ করলো। আমাকে এখনই ফিরিয়ে দিয়ে আসুন। 

কিছুক্ষণ তিনি কোন কথা বললেন না এমনকি সেখান থেকে একটুও নড়লেন না। সে ভয়ে ভয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো। সে তার দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরালো কিন্তু তখনো সে লোকটির তার দিকে তাকিয়ে থাকা অনুভব করলো, অনুভর করলো তার উষ্ণ বাহু ও তার উষ্ণ দেহের স্পর্শ। হঠাৎ তার চোখ ভিজে উঠলো আর তার সারা শরীর কেঁপে কেঁপে উঠলো। 

এবার তিনি কর্কশভাবে জানতে চাইলেন, তুমি কাঁদছ? তিনি সঙ্গে সঙ্গে হাঁটা শুরু করলেন। এসময় সে বুঝলো, তিনি তাকে কিনারে পৌঁছে দিচ্ছেন। তিনি তাকে অল্প জলে নামিয়ে দিলেন এবং যখনই তার পা মাটির স্পর্শ পেলো সে তৎক্ষণাৎ দৌড়াতে শুরু করলো। 

সে আর পেছনে ফিরে তাকালো না এমনকি সে তার দৌড়ও থামালো না। মেঠোপথ ধরে সে আবার ওপরে উঠে গেলো এবং তার রুমে প্রবেশ করলো। অঝোর ধারায় তার কান্না শুরু হলো। সে দ্রুত ড্রেস বদল করে ছোট সুটকেসে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ভরে নিলো। জিমের কথা ভবলো। জিম! জিম! জিম! জিম দেখতে চাওয়া ছাড়া আর কিছুই সে ভাবতে পারছিল না। সে রুমের মধ্যে জিমকে দেখতে পেলো, সুটকেসের মধ্যে জিমকে দেখতে পেলো এমনকি সে যা কিছু করছিল, তাতেই জিমকে দেখতে পাচ্ছিল। সে শুধুই জিমের কাছে ফিরে যেতে চাইলো। 

বাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়ি বারান্দা দিয়ে হেঁটে যেতেই সে ক্রিস্টিয়ান সাহেবকে লেক থেকে উঠে আস্তে দেখলো। 

তিনি ডাকলেন, ভায়োলা। তুমি কী করছ? 

কোনও উত্তর না দিয়েই সে ঘুরে দাঁড়ালো। সে এক মিনিটও দাঁড়ালো না। 

তিনি দৌড়াতে দৌড়াতে রাস্তা থেকে বাসায় পৌঁছালেন। তিনি বললেন, অপেক্ষা করো। এক মিনিট অপেক্ষা করো! 

সে হাঁটা থামলো না। আবারও তার চোখ কান্নায় ভিজে গেলো। তার পাতলা হাইহিল জুতোর নিচে অমসৃণ রাস্তাতি খুব শক্ত মনে হতে লাগলো এবং যখনই সে দ্রুত যেতে শুরু করলো, ক্রিস্টিয়ান সাহেব ধুলোর মেঘের ভেতর থেকে তাকে আবারও ডাকলো। ওই সময় সে ময়লা রাস্তাটির মোড় ঘুরে দৃষ্টির বাইরে চলে গেলো। 

গাড়িটা ভায়োলায় সামনে দাঁড় করিয়ে তিনি বললেন, চলে এসো। আমি তোমাকে স্টেশনে নিয়ে পৌঁছে দেবো। 

রাস্তার পাশের ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে সে পরোক্ষভাবে তার দিকে তাকালো। তিনি এখনো সেই স্নানের পোশাকটি পরেই আছেন এবং রান্না ঘরের সে গম্ভীর চেহারা আবার ফিরে এসেছে। 

তিনি অনুনয় করলেন, অবাস্তববাদী হওয়া ঠিক না। স্টেশনটি এখান থেকে পাঁচ মাইল দূরে। ভেতরে আসো। তিনি গাড়ির দরজা খুলে দিলেন। 

তার চোখের দিকে না তাকিয়েই ভায়োলা গাড়িতে উঠে বসলো এবং জড়সড়ো হয়ে সিটের এক কোণায় বসে রইলো। গাড়িটি গ্রামের ধূলিময় পথ ধরে গাড়িটি চলতে লাগলো এবং পথে তারা দুজনই নির্বাক হয়ে রইলো। একবার যখন স্টিয়ারিং হুইলের ওপরের আয়নায় তার চোখ গেলো। সে ভাবলো এখনই সে তার চোখে ধরা পড়তে পারে। এরপর সে আর আয়নার দিকে তাকালোই না। এমনই এক গভীর নীরবতার ভেতর দিয়ে তিনি ভায়োলাকে স্টেশনে পৌঁছে দিলেন কিন্তু যখনই সে গাড়ি থেকে নামতে যাবে, তিনি তার হাতে একটি খাম ধরিয়ে দিলেন—এমন যেন কখনো বোলো না যে, তুমি কাজ করে কিছুই পেলে না। 

তিনি হাসার চেষ্টা করলেন, কিন্তু গাড়ি চালিয়ে দূরে চলে যাওয়ার সময় তার মুখে ক্লান্তিকর, উদ্ভট একটা কিছু ঝুলে ছিল। 

ভায়োলা খামটি খুললো এবং দেখলো তাতে বিল হিসেবে দুইটি দশ ডলারের নোট দেওয়া হয়েছে। চোখে ধাঁধা নিয়ে সে টাকাটার দিকে তাকিয়ে থাকলো। একদিনের কাজের জন্য এই টাকাটা খুব বেশি হয়ে যায়। সত্যি এটি খুবই বেশি ছিল। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন