ফুকোর শৃঙ্খলা ও শাস্তির দর্শন : আদালত ও কয়েকটি মেয়ে

 সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রথম পর্ব
( ফুকো এবং দেরিদা আমাদের দেশে একটু দেরী করে এসেছেন। ফুকোর শৃঙ্খল ও শাস্তি ততদিনে দর্শনের জগতে আলোড়ণ তুলেছে। এরপর ফুকোকে নিয়ে যে সব অনুবাদ প্রকাশ হয়েছে সেগুলো সহজবোধ্য হয়ে ওঠেনি।
সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে গল্পকার। উপন্যাসিক। মেধাবী লেখক। তার লেখার হিউমার পাঠককে সন্তুষ্ট করে। তিনি লিখেছেন ফুকোর শৃঙ্খলা ও শাস্তি বিষয়টি নিয়ে। গল্প হিসেবেও পড়তে পারেন। আবার তত্ত্ব হিসেবেই নিতে পারেন। যেভাবেই পড়েন না কেনো সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফুকো জটিল নয়--আমাদের বাড়ির পাশের লোক। তাকে সহজে বোঝা যায়। দীর্ঘ এই লেখাটি গুরুচণ্ডালী ওয়েব ম্যাগাজিনে বের হয়েছিল। পরে লেখক এই লেখাটিকে আরো পরিমার্জনা করেন। গুরুচণ্ডালী প্রকাশনী থেকে বই আকারে বের হয়। গল্পপাঠে বইটির একটি সংক্ষিপ্তরূপ সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন। সেই লেখাটি পুনঃপ্রকাশ করা হল
।)
      



১। 

১৭৮৯ সালের কথা, অর্থাৎ, যে বছর ফ্রান্সে বিপ্লব হল। জানুয়ারি মাসের ১৪ তারিখে লন্ডনের ওল্ড বেইলি কোর্টে তোলা হল এক গরীব লন্ডনবালিকাকে। তার নাম মেরি ওয়েড। কোর্টে তোলার সময় তার বয়স ছিল দশের কিছু বেশি। মেয়েটি রাস্তায় ভিক্ষে করত। যদিও তার মা আদালতে জানান, যে, মেয়েকে ভিক্ষে করতে তিনি শেখাননি। অন্য বড়ো মেয়েদের পাল্লায় পড়ে মেয়ে নিজেই বখে গিয়েছিল, আর মা পিছন ফিরলেই সে তাদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ত ভিক্ষের কাজে। ভিক্ষা করার জন্য অবশ্য তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। হয়েছিল, অন্য এক অপরাধে, ওল্ড বেইলি কোর্টের আইনী দস্তাবেজ অনুযায়ী তার নাম, "থেফট উইথ ভায়োলেন্স : হাইওয়ে রবারি' ।

মেয়েটি যা করেছিল, তার বিবরণ শুনলে অবশ্য ঠিক "রাজপথে ডাকাতি' জাতীয় কঠিন একটা ব্যাপার বলে মনে হয়না। অন্তত: আজকের দুনিয়ায় বসে। বস্তুত: দশ বছরের মেয়ের পক্ষে এমনিতেই "ডাকাতি' করা ব্যাপারটা অসম্ভব মনে হয়। মেরি, তার মায়ের বর্ণনায়, যাদের পাল্লায় পড়ে বখে গিয়েছিল, সেইরকম আরেকটি মেয়ে হল জেন। জেন, মেরির চেয়ে বছর চারেকের বড়ো। আদালতের বিবরণ থেকে যা জানা যায়, যে, এরা দুজনে মিলে, প্রকাশ্য রাজপথে, আরেকটি ছোটো মেয়ের গা থেকে জোর করে পোশাক আশাক খুলে নিয়েছিল। সেই মেয়েটির বয়স ছিল আট। এবং তার নাম মেরি ফিলিপস। মেরি ওয়েড আর জেন, যাযা নিয়েছিল, আদালতের বিবরণে তারও একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ পাওয়া যায়। সেই তালিকায় আছে, এক) একটি সুতির ফ্রক (যা মেয়েটি পরেছিল), দুই) একটি টিপেট ( tippet ),তিন) লিনেনের একটি টুপি।

বয়সে বড়ো দুটি মেয়ের হাতে সমস্ত পোশাক আশাক খুইয়ে মেরি ফিলিপস তারপর বাড়ি চলে যায়। কোনো বাধাদান ছাড়াই। সে চেঁচামেচি করেছিল, বা প্রতিবাদ করেছিল, আদালতের নথী অন্তত: সেরকম কোনো সাক্ষ্য দিচ্ছেনা। মেয়েটি কেন চেঁচামেচি করেনি বা ছিনিয়ে নেবার চেষ্টা করেনি, বলা খুব শক্ত। আদালতে তার দেওয়া সাক্ষ্য থেকেও সেটা খুব স্পষ্ট করে বোঝা যাচ্ছেনা, যদিও এই প্রশ্নটি বিচারককেও ভাবিয়েছিল, জেরার ধরণ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। আদালতে বিচারকের সাথে "ডাকাতি'র স্বীকার এই মেয়েটির দুদফায় কথা হয়। প্রথম দফাটি এরকম:

তোমার বয়স কতো? 

-- আট বছর।
তুমি কি জানো তুমি কেন এখানে এসেছ?

 -- হ্যাঁ।
কেন?

 -- আমার ফ্রকের জন্য।
তুমি কি সত্য আর মিথ্যার তফাত জানো?

 -- না।

আট বছরের মেয়ে, ভয়ের কারণেই হোক, বা ঘাবড়ে গিয়েই হোক, আদালতে খুব স্বচ্ছন্দ বোধ করছে না সেটা বোঝাই যায়। দ্বিতীয় দফায় অবশ্য সে তুলনায় একটু বেশি স্বাভাবিক:

তুমি কিকরে ওদেরকে তোমার জামাকাপড় খুলে নিতে দিলে?

 -- আমি জানিনা ওরা আমাকে আরেকটা বোতল দেবে বলেছিল (আগের বোতলটা ভেঙে গিয়েছিল --লেখক); ওরা আমাকে কাঁদতে বারণ করল; ছোটো মেয়েটা (মেরি ওয়েড -- লেখক) করল।
কিন্তু তুমি খুব ভালো করেই জানতে তোমার জামাকাপড়ের সঙ্গে ওদের কোনো কারবার নেই?

 -- হ্যাঁ।
তাহলে কিকরে? তুমি কিকরে ওদেরকে তোমার জামাকাপড় খুলে নিতে দিলে? 

-- আমি ভেবেছিলাম ওরা আবার পরিয়ে দেবে। কিন্তু পরিয়ে না দিয়ে ওরা দৌড়ে পালিয়ে গেল।
তুমি খুলে নিতে দিলে কেন? 

-- আমি জানতামনা ওরা জামাকাপড় খুলে নেবে।
কিন্তু তোমার ফ্রক খুলে নিল, সেটা তো জানতে? 

-- হ্যাঁ; ওরা তারপর আমার দুটো পেটিকোট খুলে নিল, আমার পকেট খুলে নিল, আবার পরিয়ে দেবে।
তোমাকে ওরা শুধু এইটুকুই করেছে তো?

 -- হ্যাঁ।
কেউ মেরেছিল? 

-- না।
কেউ আঘাত করেছিল? 

--না।

"ডাকাতি'র স্বীকার মেরি ফিলিপসের সঙ্গে আদালতের আদানপ্রদান এখানেই শেষ। এরপর, নথি থেকে দেখা যাচ্ছে, বিচারক অভিযুক্ত মেরি ওয়েডকে ঠিক তিনটি প্রশ্ন করেন:
তোমার বয়স কতো? 

-- এগারোয় পড়েছি।
তোমার কোনো বন্ধু আছে? 

-- হ্যাঁ।
এখানে তারা আছে? 

-- না। ওরা ওয়েস্টমিনিস্টারে থাকে। ওরা আজ এখানেই ছিল, কিন্তু আমার সঙ্গে ভিতরে আসতে পারেনি।

বিচারক মেরি ওয়েডকে আর কোনো প্রশ্ন করেননি। প্রশ্ন করার কিছু ছিলওনা। দুটি বাচ্চা মেয়ে আরেকটি ছোটো মেয়ের জামাকাপড় খুলে নিয়েছিল লন্ডনের রাস্তায়, ঘটনা বলতে এইটুকুই। কেন খুলেছিল স্পষ্ট নয়, কারণ তারা জামাকাপড় বেচে দেবার কোনো চেষ্টা করেছিল বলে দেখা যাচ্ছেনা। কোনো প্রচ্ছন্ন যৌন ইঙ্গিতও, অন্তত: আদালতের নথিতে নেই। স্পষ্টত:ই, আজকের নৈতিকতার বিচারে, এই বিচার এবং জেরা এবং গোটা অপরাধটিকেই আপাত:দৃষ্টিতে প্রহসন মনে হয়। বাচ্চাদের খেলাধুলা, মারামারিকে যেন হঠাৎই আদালতের গম্ভীর বিচারের বিষয় করে তোলা হয়েছে।

দুই।

কিন্তু আদালতের বিচারে এই বিষয়টি এতো সরল ছিলনা। বিচারক এই পর্যন্ত শুনে, কেস ডিসমিস করে দিয়ে চলে গেলে, এই লেখা ফাঁদারই কোনো দরকার হতনা। ফলে, বোঝাই যাচ্ছে, আদালত, এবং আইনব্যবস্থা অপরাধটিকে লঘু ভাবে দেখেনি। আজকের নৈতিকতার আলোতেও বিচার করেনি। বরং তাদের কাছে, এই আপাত:তুচ্ছ বিষয়টিও আইনের শৃঙ্খলা, বা ঐ জাতীয় কোনো বড়োসড়ো ব্যাপারের দ্যোতক ছিল।

অতএব, এরপর, আদালত মেরির মাকে ভর্ৎসনা করে :"আপনার সন্তান কেমন আচরণ করেছে, আপনাকে এ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার কোনো অর্থ নেই;আপনিও তার সঙ্গে সমান দোষে দোষি। তার যথাযোগ্য প্রতিপালন না করে, ঘরে বসিয়ে এইসব ব্যাপারে দক্ষ করে তুলে; ওকে রাস্তায় অবাধে ঘুরে বেড়াতে দিয়ে আপনিই এই জায়গায় নিয়ে এসেছেন; তাই বরং আপনাকে এইটুকু জিজ্ঞাসা করা উচিত, আপনার নিজের হয়ে কি বলার আছে, তারপরে ওর কথা?'

উত্তরে মা বলছেন -- "অন্য মেয়েদের পাল্লায় পড়ে ও বাইরে বেরোতো, যখনই আমি পিছন ঘুরতাম, তখনই ওদের সঙ্গে ভিক্ষে করতে বেরোতো। আমি কখনই ওকে ভিক্ষে করতে নিয়ে আসিনি; ওখানকার সব কসাইরাই আমাকে খুব ভালো করে চেনে। আমার ওদের সঙ্গে খুব ভালো মেলামেশা।
আমি আশা করব, বাকিটা আপনি দেখবেন, নইলে ওরা সবাই ফাঁসিকাঠে ঝুলবে।'

এরপর আদালত জুরিদের বলে, যে, যদিও তেমন হিংসাত্মক ব্যাপার স্যাপার এই ঘটনায় লক্ষ্য করা যাচ্ছেনা, তবুও, "একজন শিশু যে পরিপ্রেক্ষিতে দুজন অপরিচিতের কবলে পড়ে, যদিও সেই অপরিচিতরা কমবয়সীই, তাকে দাঁড় করিয়ে জামাকাপড় খুলে নেওয়া হয়, সেটা একজন পূর্ণবয়স্কর বুকে পিস্তল ঠেকানোর সমতূল্য; তাই, এটা যে ডাকাতির চেয়ে কম কিছু, সে কথা আমি বলতে পারছিনা; এই কাজের ফল হল, তাদের জীবন দিয়ে এর উত্তর দিতে হবে।' ... " I 
think you must say they are guilty of the crime for which they stand indicted, robbery, and not larceny. '

অত:পর, মেরি ওয়েডের মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। শুনে যদি কেউ আঁতকে ওঠেন (আমি নিজেই উঠেছিলাম), তাঁকে শুধু এইটুকু স্মরণ করিয়ে দেওয়া যাক, যে, সালটা ১৭৮৯। মাসটা জানুয়ারি। বাস্তিলের পতন হতে তখনও মাস ছয়েক বাকি, অতএব মুক্ত দুনিয়া, সাম্য, ইত্যাদি আজকের ক্যাটেগরিগুলি এই বিচারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তখনও প্রতিশোধমূলক শাস্তির যুগ। ওল্ড বেইলির রেকর্ডে দেখছি, ঠিক তার আগের বছরই রাজার বিরুদ্ধে অপরাধের কারণে দুজনকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার আদেশ দেওয়া হয়েছে। শুধু একটাই খটকা, যে, সাহেবরা ভারতীয় সতীদাহ দেখে তাকে বর্বর বলতেন কেন?

ফাঁসির আগে মেরিকে নিয়ে যাওয়া হয় নিউগেট জেলে। এটি তৎকালীন লন্ডনের সবচেয়ে কুখ্যাত কারাগার। সাধারণভাবে দ্বীপান্তরে যাবার অপেক্ষায় থাকা অপরাধীদের আর ফাঁসির আসামীদের সেখানে রাখা হত। সাড়ে সাতশোর মতো অপরাধীর সঙ্গে আরও একজন হিসাবে মেরির ঠাঁই হয়ে যায় সেখানে। অপেক্ষা করতে থাকে শেষ দিনটির। 

৩। 

এবার একটু ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি খতিয়ে দেখা যাক। বছরটা বাস্তিল পতনের, আগেই বলা হয়েছে। ইংল্যান্ডে তখন "পাগলা' রাজা তৃতীয় জর্জের রাজত্ব। ব্রিটেন আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে হার স্বীকার করেছে কয়েক বছর আগে। বছর পনেরো আগে, ১৭৭৫ সালে এসে গেছে জেমস ওয়াটের স্টিম ইঞ্জিন। গ্রেট ব্রিটেনে শুরু হয়ে গেছে বহু আলোচিত শিল্পবিপ্লব। লন্ডন, লোকসংখ্যার বিচারে, বিশ্বের বৃহত্তম শহরে পরিণত হতে চলেছে। অষ্টাদশ শতকের শুরুতে, লন্ডনের জনসংখ্যা ছিল ছয় লক্ষ, আর ১৭৫০ সালে সাত লক্ষ। এই সংখ্যা ১৮০০ সালে যা পরিণত হয় দশ লক্ষে, এবং ১৮৫০ সালের মধ্যে কুড়ি লক্ষ ছাড়িয়ে যায়। অথচ, অষ্টাদশ শতক ইংল্যান্ডের ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছে, অতি ধীর জনসংখ্যা বৃদ্ধির শতক হিসাবে। শিশুদের কম জন্মহার, বিয়ের বেশি বয়স, এবং উচ্চ শিশুমৃত্যুর হার দিয়ে শতকটি চিহ্নিত। ফলে, অষ্টাদশ শতকের শেষ তিন বা চারটি দশকের বিপুল জনসংখ্যা বৃদ্ধি, মূলত: লন্ডন শহরের বাইরে থেকে আসা মানুষদের অবদান। এর একটা অংশ এসেছিল হয় গৃহভৃত্য হিসাবে, অথবা কোনো না কোনো কাজের শিক্ষানবিশী নিয়ে। একটা অংশ ছিল আইরিশদের। 

এর বছর পঞ্চাশ পরে, ১৮৪৫ সালে প্রকাশিত হবে এঙ্গেলসের বিখ্যাত বই "ইংল্যান্ডে শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থা', যাতে এই পুরো প্রেক্ষাপটটার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ১৭৬৪ সালে আবিষ্কৃত হয় সুতো কাটার (স্পিনিং) যন্ত্র "জেনি'। এই যন্ত্রটির বৈশিষ্ট হল, এটাতে একজন লোকই ষোল থেকে আঠারো খানা মাকু (স্পিন্ডল) একই সঙ্গে চালাতে পারত, যেখানে সাধারণ চরকাতে (স্পিনিং হুইল) থাকতো একটি মাত্র মাকু। অচিরেই সুতো কাটার জগতে পুরোনো চরকাকে হটিয়ে দিয়ে এই যন্ত্রটি একাধিপত্য বিস্তার করে। আগে যারা চরকায় সুতো কাটত, তারা এই যন্ত্রটি কিনতে বাধ্য হয়। যাদের সেই সামর্থ্য ছিলনা, তারা পরিণত হয় মজুরি শ্রমিকে। এঙ্গেলস দেখাচ্ছেন, যে, এই বিশেষ যন্ত্রটিই ইংল্যান্ডে প্রথম প্রজন্মের মজুরি নির্ভর শ্রমিকের জন্ম দেয়, যারা জীবনধারণের জন্য কেবলমাত্র মজুরির উপরেই নির্ভরশীল। 

ক্রমশ: শিল্প বিপ্লবের চাকা ঘুরতে শুরু করে আরও দ্রুতগতিতে, এবং আরও আরও অধিক ক্ষমতাশালী, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র আবিষ্কৃত হতে থাকে, এবং আরও বেশি বেশি করে দীর্ঘ হতে থাকে মজুরদের লম্বা লাইন। এরা মূলত: পূর্বেকার কৃষক পরিবার। শিল্প বিপ্লব যাদের জমি এবং পুরোনো জীবিকা থেকে উচ্ছেদ করেছিল। এই একই প্রক্রিয়া, এঙ্গেলস দেখাচ্ছেন, গ্রামাঞ্চলে জমির কেন্দ্রীভবনেরও সূচনা করে, আরও বেশি বেশি লোক ভূমিচ্যুত হন, এবং তৈরি হয় "কৃষি সর্বহারা'র দল। 

মূলত: জমি ও জীবিকাহারা এইসব মজুরি শ্রমিকরা ভিড় জমায় শহরগুলিতে। লন্ডন এবং অন্যান্য শহরগুলির বিপুল জনসংখ্যাবৃদ্ধির পিছনে আছে জমি ও কর্মচ্যুত এইসব "সর্বহারা'দের শহরে এসে কাজ খোঁজার উপাখ্যান। এঙ্গেলসের দেওয়া তালিকা থেকে বিভিন্ন শহরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির একটা তালিকাও পাই আমরা: 

Bradford 29,000(year:1801) 77,000(year: 1831)
Halifax 63,000(year:1801) 130,000(year: 1831)
Huddersfield 15,000(year:1801) 34,000(year: 1831)
Leeds 53,000(year:1801) 125,000(year: 1831)

অবশ্য এই জনসংখ্যা বৃদ্ধি শুধু ইংলন্ডের গ্রামাঞ্চলের ভূমিহীনদের অবদান নয়। এর একটা বড়ো অংশ ছিল আইরিশও। আইরিশ অভিবাসন সম্পর্কে গোটা একটা পরিচ্ছেদ আছে এঙ্গেলসের বইটিতে। তার অংশবিশেষ উদ্ধৃত করার লোভ সামলানো যাচ্ছেনা। (মূল লেখার হিউমারটা নষ্ট হয়ে যাবার ভয়ে অনুবাদ করছিনা এই অংশটার, যদিও মূল বইটি অবশ্য ইংরিজি নয়।) 
It has been calculated that more than a million have already immigrated, and not far from fifty thousand still come every year, nearly all of whom enter the industrial districts, especially the great cities, and there form the lowest class of the population. Thus there are in London, 120,000; in Manchester, 40,000; in Liverpool, 34,000; Bristol, 24,000; Glasgow, 40,000; Edinburgh, 29,000, poor Irish people. These people having grown up almost. without civilisation, accustomed from youth to every sort of privation, rough, intemperate, and improvident, bring all their brutal habits with them among a class of the English population which has, in truth, little inducement to cultivate education and morality.
.....
The Irishman loves his pig as the Arab his horse, with the difference that he sells it when it is fat enough to kill. Otherwise, he eats and sleeps with it, his children play with it, ride upon it, roll in the dirt with it, as any one may see a thousand times repeated in all the great towns of England. The filth and comfortlessness that prevail in the houses themselves it is impossible to describe. The Irishman is unaccustomed to the presence of furniture; a heap of straw, a few rags, utterly beyond use as clothing, suffice for his nightly couch. A piece of wood, a broken chair, an old chest for a table, more he needs not; a tea-kettle, a few pots and dishes, equip his kitchen, which is also his sleeping and living room. When he is in want of fuel, everything combustible within his reach, chairs, door-posts, mouldings, flooring, finds its way up the chimney. Moreover, why should he need much room? At home in his mud-cabin there was only one room for all domestic purposes; more than one room his family does not need in England. So the custom of crowding many persons into a single room, now so universal, has been chiefly implanted by the Irish immigration. And since the poor devil must have one enjoyment, and society has shut him out of all others, he betakes himself to the drinking of spirits.
....
With such a competitor the English working-man has to struggle, with a competitor upon the lowest plane possible in a civilised country, who for this very reason requires less wages than any other. Nothing else is therefore possible than that, as Carlyle says, the wages of English working-man should be forced down further and further in every branch in which the Irish compete with him. And these branches are many.


যদিও অপ্রাসঙ্গিক, কিন্তু এখানে একটা জিনিস লক্ষ্য না করে পারা যাচ্ছেনা। সেটা হল এঙ্গেলসের ভাষা। আইরিশ অভিবাসন নিয়ে কার্লাইলের লেখা পড়লে মনে হয় যেন মুম্বইতে বাংলাদেশী অভিবাসন নিয়ে শিবসেনার বক্তব্য পড়ছি, অথবা মেক্সিকান অভিবাসন নিয়ে আমেরিকান নিও কনজার্ভেটিভদের। ততটা না গেলেও, এঙ্গেলসের বক্তব্যের শ্লেষ লক্ষ্যণীয়, যাতে বিন্দুমাত্র সহানুভূতির ছোঁয়া নেই। উচ্ছেদ হওয়া কৃষকদের সম্পর্কেও এই একই বইয়ে এঙ্গেলস বিন্দুমাত্র সহানুভূতিশীল নন। সেটা আজকের দুনিয়ার আমাদের চোখে লাগে, যদিও চোখে লাগার কোনো কারণ নেই, কারণ "ভূমিপুত্রের অধিকার' জাতীয় ধারণাগুলি তখনও দিনের আলো দেখেনি। আর কৃষক উচ্ছেদ হয়ে শহরে আসছে, এবং পরিণত হচ্ছে "সর্বহারা'য়, এটা এঙ্গেলসের কাছে বেশ "স্বাভাবিক' ব্যাপার।তো, এই ব্যাপারটা বাদ দিলে, মোদ্দা কথাটা হল, গাদাগাদা অশিক্ষিত, অসভ্য, গরীব আইরিশে ভরে যাচ্ছে ইংল্যান্ডের শহরাঞ্চলগুলি। এবং খাস ইংল্যান্ডের শ্রমিকদের মজুরির প্রতিযোগিতায় নামতে হচ্ছে এমন একদল লোকেদের সঙ্গে যারা মজুরির মূল্যের প্রশ্নে সভ্যজগতে যতটা নিচে নামা যায়, তার চেয়েও বেশি নিচে নামতে রাজি। 

ফলে লন্ডনের অবস্থাটা ঠিক কি ছিল সেইসময়, সেটা এই বিবরণ থেকে পরিষ্কার হয়ে যায়। ভিটেমাটিছাড়া এক বিরাট সংখ্যক শিল্পমজুররা একে অপরের সঙ্গে কামড়াকামড়ি করছে চাকরির জন্য, মজুরির জন্য। সঙ্গে আছে প্রবল এক জনবিস্ফোরণ। অপরাধের সংখ্যাও ক্রমবর্ধমান। এখানে একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, এঙ্গেলসের বইটি ১৮৪৫ সালে প্রকাশিত, আমাদের আলোচ্য ১৭৮৯ সাল থেকে পঞ্চান্ন বছর পরে। ততদিনে শিল্পায়নের চাকা দ্রুত ঘুরতে শুরু করেছে। তবে, বোঝাই যায়, ১৭৮৯ সালে অবস্থা ঠিক এতটা খারাপ না হলেও, এই দিকেই এগোচ্ছিল। অন্তত: অপরাধের পরিসংখ্যান সেরকমই সাক্ষ্য দেয়। আমাদের চিরপুরাতন ওলড বেইলি কোর্টের নথীপত্র ঘেঁটে যে তথ্য পাচ্ছি, তা এইরকম : 

১৭০০ -- ১৭৫০ : নথীভুক্ত অপরাধের সংখ্যা ১৮১৫৪। 
১৭৫০ -- ১৮০০ : নথীভুক্ত অপরাধের সংখ্যা ২৮৯৫৩। 
১৮০০ -- ১৮৫০ : নথীভুক্ত অপরাধের সংখ্যা ৪৭৭৪৪। 

এই ডাটাকে হরেকরকম ভাবে পড়া যেতে পারে। কিন্তু আপাতত: ১৭৬৪ তে "জেনি' আবিষ্কার, ১৭৭৫ এ প্রথম স্টিম ইঞ্জিন থেকে শুরু করে ১৮৪১ সালে বাহান্ন কোটি পাউন্ড তুলো আমদানির যে সিঁড়িভাঙা অঙ্ক, তার সঙ্গে এই সংখ্যারাশি একদম খাপেখাপ মিলে যায়। যে, লোকসংখ্যা বাড়ছে, অপরাধ বাড়ছে, ক্রমশ:ভর্তি হয়ে যাচ্ছে কারাগার। ১৭৮৯ সালে, আমাদের আলোচনার অভাগা মেয়েটি, অর্থাৎ ফাঁসির আসামী মেরি ওয়েডকে নিউগেট নামক যে জেলখানাটিতে নিয়ে যাওয়া হয়, তাতে তখন সাড়ে সাতশোর মতো আসামী ছিল, যদিও, জানা যাচ্ছে, জেলটির ধারণক্ষমতা ছিল এর অর্ধেকেরও কম। ফলে কারাগারের ভিতরে, এবং কারাগারের বাইরের লন্ডন ও তৎসহ ইংল্যান্ডের শিল্পাঞ্চল সমূহ, একই সঙ্গে মোটামুটি "ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই' নামক একই পরিণতির দিকে এগিয়ে চলছিল ১৭৮৯ সালে। লোক বেশি, কাজ কম। অপরাধী বেশি জেলখানা কম। 

এর সঙ্গে আরও একটা অত্যন্ত আকর্ষণীয় তথ্য আমরা দেখতে পাই, যে, অপরাধের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, এই সময়কালে বেড়ে চলেছে, একটি বিশেষ সাজা, যার নাম "দ্বীপান্তর'। ঐ ওল্ড বেইলি কোর্টের নথি থেকেই এ সংক্রান্ত যা তথ্য পাচ্ছি, তা এইরকম : 

১৭০০ -- ১৭৫০ : দ্বীপান্তরের সংখ্যা ৬৭২৭। 
১৭৫০ -- ১৮০০ : দ্বীপান্তরের সংখ্যা ৯০৭০। 
১৮০০ -- ১৮৫০ : দ্বীপান্তরের সংখ্যা ১৪৫৬৬। 

একই সঙ্গে দেখছি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে "স্বেচ্ছায়' অভিবাসীদের সংখ্যাও। ১৮২০ সাল পর্যন্ত আমেরিকায় বাৎসরিক ইউরোপিয়ান অভিবাসীদের সংখ্যা দশ হাজারের নিচে ছিল। ১৮২০ থেকে সংখ্যাটা নাটকীয়ভাবে বাড়তে শুরু করে। আর ১৮৪৫ থেকে ১৮৬০ এর মধ্যে ৩৫ লক্ষেরও বেশি মানুষ ইউরোপ আর গ্রেট ব্রিটেন থেকে পাড়ি জমান আমেরিকায়। এই পরিসংখ্যানটাও আগেরটা, অর্থাৎ দ্বীপান্তরের সংখ্যারাশি আর শিল্পবিপ্লবের টাইমটেবিলের সঙ্গে একদম খাপেখাপ মিলে যায়। ফলে একটা ব্যাপার স্পষ্ট, যে, শিল্পবিপ্লবের স্বর্ণযুগে, দুনিয়াজোড়া লুণ্ঠনোপোযোগী খোলা বাজারের যুগেও, ব্রিটিশ সিংহ সমস্ত উচ্ছেদ হওয়া মানুষকে বিকল্প কাজ দিতে সক্ষম হয়নি। সেই বিপুল সংখ্যক মানুষকে, যারা মূলত: সমাজের ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া আবর্জনা, তাদেরকে পাড়ি দিতে হয়েছিল সাগরপারের নতুন দুনিয়ায়, নতুন কাজের খোঁজে। 

সে যুগের দুই ধুরন্ধর ক্ষমতার তাত্বিক, যথাক্রমে মার্কস এবং এঙ্গেলস, শিল্পবিপ্লবের বিশ্লেষণে, এই ব্যাপারটাকে তেমন গুরুত্ব দেবার প্রয়োজন মনে করেননি। 


৪। 

তো, কথা হচ্ছিল মেরি ওয়েডের। এই সেই সময়ের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, যখন মেরি ওয়েডের মৃত্যুদন্ড হল। তখন তার বয়স দশ বছর দুমাস। এবং তাকে নিয়ে যাওয়া হল কুখ্যাত নিউগেট প্রিজনে। আগেই বলা হয়েছে, তখন সেখানে ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ মানুষের বাস, যারা মূলত: মৃত্যুদন্ডের মতো কোনো কঠিন শাস্তির প্রতীক্ষায়। 

ঠিক এই সময়েই, মেরির জীবনে একটি অলৌকিক ঘটনা ঘটে। ১১ই মার্চ ১৭৮৯, "পাগলা' রাজা তৃতীয় জর্জ, এক অজানা মানসিক রোগের কবল থেকে হঠাৎই "সুস্থ' হয়ে ওঠেন। এই রাজকীয় আনন্দে, এর পাঁচ দিন পরে, সমস্ত মৃত্যুদন্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত অপরাধিনীদের মৃত্যুদন্ড মকুব করে দেওয়া হয়। মৃত্যুদন্ডের পরিবর্তে সাজা দেওয়া হয় দ্বীপান্তর। ঠিক হয়, এদেরকে পাঠানো হবে অস্ট্রেলিয়ায়। এই অপরাধিনীদের তালিকায় মেরি ওয়েডও ছিল। 

ব্যাপারটা কতটা আকস্মিক, এ নিয়ে অবশ্য সন্দেহ আছে। যুদ্ধের কারণে এর বছর পনেরো কুড়ি আগে থেকেই আমেরিকায় কয়েদিদের পাঠানো বন্ধ হয়ে গেছে (স্মর্তব্য : আমেরিকা যুক্তরাষ্টের স্বাধীনতা দিবস ৪ জুলাই, ১৭৭৬)। এদিকে কয়েদিদের ভিড়ে উপচে পড়ছে সমস্ত কারাগার। যুদ্ধে হারার ফলে ব্রিটেন আরও বহুকিছুর সঙ্গে হারিয়েছে কয়েদিদের নির্বাসনে পাঠানোর একটি চমৎকার জায়গা। এরই মধ্যে ১৭৬৮ সালে জেমস কুক পৌঁছেছেন অস্ট্রেলিয়ায়। ফলে কয়েদিদের ভারে ভারাক্রান্ত ব্রিটেন, বাধ্য হয়েই স্থির করে, যে দ্বীপান্তরে দন্ডিত অপরাধীদের পাঠানো হবে অস্ট্রেলিয়ায়। সেই মতো, ১৭৮৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার বোটানি বে (বর্তমান সিডনি) র উদ্দেশ্যে রওনা হয় একটি নৌবহর, যাতে ছিল ৭৫৯ জন অপরাধী এবং ১৩ জন বাচ্চাকাচ্চা। এছাড়াও ছিল, গোরু, শস্যদানা, এবং সরকারি কর্তাব্যক্তিরা। এই বহরটি অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে "ফার্স্ট ফ্লিট' নামে পরিচিত, এবং এরাই পত্তন করে একটি পেনাল কলোনির, যা কালে কালে পরিণত হবে সিডনি শহরে। 

এই পেনাল কলোনিটি শুরু থেকেই সমস্যায় ভুগছিল, নতুন নগরের পত্তনে সবসময়েই যা হয় আর কি। স্কার্ভির প্রকোপ ছিল। আর ছিল আমাশা। ঐ পরিবেশে চাষাবাদ করায় অভ্যস্ত যথেষ্ট সংখ্যায় শ্রমিক/চাষী ছিলনা। দক্ষতাতেও ঘাটতি ছিল। জাহাজে করে আনা খাবার দাবার কমতির দিকে, ওদিকে শস্য উৎপাদনও ঠিকঠাক হয়নি, ফলে কলোনিতে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। লোকজন স্থানীয় আদিবাসীদের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় মেয়েদের ধর্ষণ করার অভিযোগও শোনা যায়। এই চরম বিশৃঙ্খলার খবর ইংল্যান্ডে পৌঁছলে হোম আন্ডার সেক্রেটারি ইভান নেপান আসরে নামেন। তাঁর ধারণা হয়, যে, শুধু পুরুষমানুষদের নিয়ে কলোনি বানানো সম্ভব নয়। একটি স্থিতিশীল কলোনি বানানোর জন্য চাই মহিলাদের। চাই পারিবারিক বন্ধন। নেপান তাই ঠিক করেন, যে, একটি মহিলা ভর্তি জাহাজ ওখানে পাঠানো দরকার। এবং জাহাজের মেয়েরা অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছে বিয়েশাদিতে জড়িয়ে পড়লেই মঙ্গল। এই মর্মে তিনি লিখিত নোটও পাঠান : " 
upon landing, promote a matrimonial connection to improve morals and secure settlement. '

এতকিছু আগেভাগে ঠিক হয়ে যাবার পর তৃতীয় জর্জ হঠাৎই "সুস্থ' হয়ে ওঠেন, এবং সমস্ত মৃত্যুদন্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত অপরাধিনীদের মৃত্যুদন্ড মকুব করে পরিবর্তে সাজা দেওয়া হয় দ্বীপান্তর। ফলে মেরি ওয়েডের জায়গা থেকে দেখলে, যদিও পুরো ঘটনাটাই আকস্মিক এবং প্রায় অলৌকিক বলে মনে হয়, কিন্তু একটু বৃহত্তর প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে সেই একই জিনিসকে মনে হয় নেহাৎই পূর্বনির্ধারিত। শিল্পায়নের উদ্বৃত্ত মানবজঞ্জালকে পুনর্বাসন দেবার জন্য অস্ট্রেলিয়াকে দরকার ছিল গ্রেট ব্রিটেনের। আর সেখানে কলোনি বা জনবসতি গড়ে তোলার জন্য পুরুষের পাশাপাশি দরকার ছিল নারীর। মূলত: পুরুষের যৌন ক্ষিধে মেটানোর জন্য, পারিবারিক বন্ধন তৈরির জন্য, এবং সন্তান প্রজননের জন্য। এই কাজের জন্য নিবেদিতপ্রাণা স্বেচ্ছাসেবিকা আর কোথায় পাওয়া যাবে, একমাত্র জেলখানা ছাড়া? 


৫। 

অতএব, ১৭৮৯ সালের জুলাই মাসে, ২২৫ (মতান্তরে ২২৬) জন মেয়ে কয়েদিকে নিয়ে "লেডি জুলিয়ানা' নামক জাহাজটি ব্রিটেন থেকে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তাদের মধ্যে মেরি ওয়েড একজন। জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন থমাস এডগার, যিনি নাকি একদা জেমস কুকের সঙ্গী ছিলেন। মেয়েদের বেশিরভাগ অংশটাই ছিল চোর, ছিঁচকে চোর এবং যৌনকর্মী। জাহাজটি দীর্ঘ দশমাস নেয় ইংল্যান্ড থেকে অস্ট্রেলিয়ায় পোঁছতে, যা সেই সময়ের নিরিখে একটি রেকর্ড (সবচেয়ে বেশি সময় নেবার জন্য) । তার যথেষ্ট কারণও ছিল। এবং গোটা এই সুদীর্ঘ যাত্রাটিই অত্যন্ত কৌতুহলোদ্দীপক। পরবর্তীকালে অত্যন্ত বিচিত্র এই জাহাজযাত্রার একটি বিবরণ লেখেন স্টুয়ার্ড জন নিকোল। বইখানা হাতের কাছে নেই। তবে নেট থেকে যা পাওয়া যাচ্ছে, তা এইরকম: 

আগেই বলা হয়েছে, জাহাজটি দশ মাস সময় নেয় ইংল্যান্ড থেকে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছতে। এর মধ্যে দেড় মাস খানেক থেমেছিল রিও-ডি-জেনিরো তো। উত্তমাশা অন্তরীপে থেমেছিল উনিশ দিন। স্রেফ শ দুয়েক "সিঙ্গল' মেয়েকে নিয়ে সমুদ্রে ভাসা, সে যুগের ইতিহাসে একটি বিরলতম ঘটনা, ফলে জাহাজটি মূলত: পরিণত হয় একটি প্রমোদ তরণীতে। শোনা যায়, একটি "ভাসমান পতিতাপল্লী' হিসাবে জাহাজটি নাম কিনেছিল। সমুদ্রে বেশ কিছুদূর যাবার পর, নিকোলের বিবরণ থেকে জানা যাচ্ছে, জাহাজের প্রতিটি পুরুষ (ক্রু এবং অন্যান্য কর্মীরা), মেয়েদের মধ্যে থেকে একটি করে "স্ত্রী' বেছে নিয়েছিলেন। মেয়েরাও নাকি আপত্তি করেনি। (অবশ্য আপত্তি করলেই বা শুনতো কে --লেখক)। এছাড়াও প্রতিটি বন্দরে অন্যান্য জাহাজের নাবিকরা ফুর্তির জন্য অবাধে আসতো এই "ভাসমান পতিতাপল্লী'তে। বোঝাই যাচ্ছে, ক্যাপ্টেন এবং জাহাজ কর্তৃপক্ষ ব্যাপারটাতে বাধা তো দেনইনি বরং উৎসাহ দিয়েছিলেন। 

এখানে একটা কথা আবার বলে নেওয়া ভালো, যে, সালটা ১৭৮৯। যৌন নৈতিকতা এবং আনন্দের ধারণা সে যুগে আজকের মতো ছিলনা। মেয়েদের অধিকার সংক্রান্ত ধারণাগুলি তখনও আসতে কয়েক শতাব্দী বাকি। উপরন্তু যে সমস্ত মেয়েরা এই জাহাজে ছিল, নিকোলের বিবরণ অনুযায়ী তারা ছিল বিশৃঙ্খল এবং অ্যালকোহলপ্রিয়, নিজেদের মধ্যে মারপিটও ছিল রোজকার ব্যাপার। এরা সমাজের ঝড়তি-পড়তি তলানি,একটা বড়ো অংশ ছিল পেশাদার যৌনকর্মী, সবাই এসেছে জেলখানা নামক একটি নরক এবং মৃত্যুভয় থেকে ছাড়া পেয়ে। জাহাজে তারা পেয়েছে অবাধে বিচরণের "স্বাধীনতা' -- ডেক সহ গোটা জাহাজেই অবাধে বিচরণের অধিকার দেওয়া হয়েছিল তাদের। ফলে "মেয়েরা আপত্তি করেনি' ব্যাপারটা একটা অন্য কোণ থেকেও দেখা যেতে পারে, যদিও এ কথা অনস্বীকার্য, যে, এই মেয়েদের এ ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প ছিলনা। 

এই মেয়েদের তালিকায় বেশ কয়েকটি কৌতুহলোদ্দীপক চরিত্র ছিল। জাহাজে ছিলেন এলিজাবেথ বার্নসলি নামক এক ধনী মহিলা। শপলিফটিং করতে গিয়ে তিনি ধরা পড়েন। তাঁর অর্থ এবং প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি মেয়েদের জন্য ভালো জায়গায় থাকা, শোয়া, জাতীয় বেশ কয়েকটি অধিকার আদায় করেন। এমনকি জাহাজে এবং বন্দরে বন্দরে ব্যবসাবাণিজ্যও শুরু হয়েছিল তাঁর উদ্যোগে। সবচেয়ে বড়ো ব্যবসা অবশ্য ছিল নারীমাংসের। জাহাজে ছিল র‌্যাচেল হুডির মতো যৌনকর্মী, যে নিউগেট কারাগার থেকেই মেরি ওয়েডের সঙ্গী। একথা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে, যে, জেল থেকে জাহাজে এসে এরা "মুক্তি'র আনন্দ পেয়েছিল। এবং স্বেচ্ছায় শরীর সহ অন্য পণ্যের কারবার ফেঁদে বসে। এবং দু-পয়সা উপার্জনও করে, যা ভবিষ্যতে নির্বাসন জীবনে কাজে লাগবে। (পুঁজি সঞ্চয়ের এই অভিনব কায়দাটি জানতে পারলে মার্কস যে আঁতকে উঠতেন, সে নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।) একথাও, মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে, যে, এইসব কাজের সুবিধের জন্য এদের একটা অংশ "স্বেচ্ছা'য় জাহাজের যে কোনো এক পুরুষের সাময়িক "স্ত্রী' হতে রাজি ছিল। তবে, এ কথাও অনস্বীকার্য, যে এছাড়া তাদের সামনে আর কোনো উপায়ও ছিলনা। 

"স্বেচ্ছা'য় বা "অনিচ্ছা'য়, যাই হোক, শারীরিক ভাবে এই মেয়েরা যে বহাল তবিয়তে ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। খাবার-দাবার অঢেল ছিল, খোলা হাওয়া-বাতাস এবং অবাধ যাতায়াতের স্বাধীনতা ছিল। গোটা যাত্রায় মারা গিয়েছিল মাত্র পাঁচ জন। এই পরিসংখ্যানটি অবশ্য তুলনামূলক বিচারে বুঝতে হবে। ১৭৯০ সালেই, আরও তিনটি জাহাজ, মূলত: পুরুষবন্দীদের নিয়ে ইংল্যান্ড থেকে অস্ট্রেলিয়া যায় । যাত্রার শুরুতে সেই তিনটি জাহাজে সব মিলিয়ে ১০২৬ জন বন্দী ছিল। একটি জাহাজে বন্দীদের ডেকে ওঠার অনুমতি দেওয়া হতনা, আরেকটিতে যথেষ্ট পরিমানে রসদ থাকা সত্ত্বেও খাবার-দাবারের জোগান ঠিক হতনা। এবং যাত্রাপথে মোট ২৬৭ জন মারা যায়। 

এই তিনটি জাহাজের বহর, যা সেকেন্ড ফ্লিট নামে পরিচিত, তারা অস্ট্রেলিয়া পৌঁছয় লেডি জুলিয়ানার তিন সপ্তাহ পরে। মাঝখানে তারা শুধু একটি ছোট্টো বিরতি নিয়েছিল। উত্তমাশা অন্তরীপে। আর বহু ঘাটে বহু জল খেয়ে "ভাসমান পতিতাপল্লী' লেডি জুলিয়ানা পৌঁছয় ১৭৯০ এর জুন মাসে। তখন পেনাল কলোনির অবস্থা আরও সঙ্গীন। রসদ ফুরিয়ে এসেছে, লোকজনের "মরাল' কমতে কমতে যার নিচে আর নামা যায়না এমন এক জায়গায়। বলাবাহুল্য, শারীরিক ভাবে সুস্থ অবস্থায় পৌঁছলেও, কলোনি তাদেরকে সাদরে অভ্যর্থনা জানায়নি। খাবারদাবারের নামগন্ধ নেই,এক কর্তাব্যক্তির ভাষায় "
a cargo so unnecessary and so unprofitable as 222 females, instead of a cargo of provisions ' এসে উপস্থিত। আর এক কর্তাব্যক্তি, লেফটেনান্ট ক্লার্ক, তো প্রচন্ড রেগে গিয়েছিলেন, একপাল damned whores এসে উপস্থিত হওয়ায়। 

তো, সে যাই হোক, এইভাবেই মেরি ওয়েড মৃত্যুদন্ডের হাত থেকে রেহাই পেয়ে পৌঁছল নতুন দেশে। সুস্থ শরীরে। তার বয়স তখন এগারো পেরিয়েছে। 


৬। 

এরপর মেরি ওয়েডের খবর আর দীর্ঘদিন পাওয়া যাচ্ছেনা। কিন্তু সেই প্রসঙ্গে যাবার আগে, কিঞ্চিৎ তত্ত্বালোচনা করে নেওয়া যাক। 

আগেই লিখেছি, যে, এক বিপুল সংখ্যক অভিবাসী, শিল্পবিপ্লবের ঠেলা সামলাতে না পেরে বিভিন্ন কলোনিতে চলে যেতে বাধ্য হয়। সেটা উনবিংশ শতাব্দীর ঘটনা, অষ্টাদশ শতকের মেরি ওয়েড এবং লেডি জুলিয়ানা, যার সূচনাবিন্দু মাত্র। সংখ্যার বিচারে দেখলে এই স্বেচ্ছা বা অনিচ্ছাকৃত অভিবাসন, শিল্পবিপ্লবকালীন ইউরোপের এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। যদিও শিল্পবিপ্লবের কালের দুই ধুরন্ধর তাত্ত্বিক, মার্কস এবং এঙ্গেলস, এই ব্যাপারটিকে আদৌ গুরুত্ব দেননি। এঙ্গেলস উল্টে আইরিশ অভিবাসীদের নিয়ে লঘু চালে ঠাট্টা করেছেন। আর উচ্ছেদ হতে বসা কৃষকদের সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য হল :
But intellectually, they were dead; lived only for their petty, private interest, for their looms and gardens, and knew nothing of the mighty movement which, beyond their horizon, was sweeping through mankind. সহানুভূতির ছিটেফোঁটাও নেই। 

ব্যাপারটা কৌতুহলোদ্দীপক, যদিও বুদ্ধির অগম্য নয়। মার্কসীয় তাত্ত্বিক কাঠামোয় ইউরোপের শিল্পবিপ্লব হল এক ঐতিহাসিক অনিবার্যতা। আর পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা হল সামন্ততন্ত্রের চেয়ে উন্নততর একটি ব্যবস্থা। শিল্পবিপ্লব স্থবির সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। উৎপাদন ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক অগ্রগতির সূচনা করে। উৎপাদনের প্রক্রিয়াকে করে তোলে সামাজিক। অর্থাৎ একজন কারিগর আর একটি জিনিস বানাচ্ছেনা, বরং বহু শ্রমিক অ্যাসেম্বলি লাইনে দাঁড়িয়ে অংশগ্রহণ করছে উৎপাদনে। এইভাবে তৈরি হয় শ্রমিক শ্রেণী। স্থবির, মৃতপ্রায়, জড়বৎ কৃষককে জমি থেকে উচ্ছেদ করে পুঁজিবাদ রাজনীতি ও সমাজ সচেতন মজুরি শ্রমিক বানিয়ে তোলে। একটি উন্নততর সামাজিক ব্যবস্থায়, উন্নততর সামাজিক উৎপাদনে অংশগ্রহণ করে এক নতুন উন্নততর শ্রেণী, যার নাম শ্রমিক শ্রেণী। এদের হাতেই শেষমেষ পুঁজিবাদের পতন ও মৃত্যু হবে। 

এই তাত্ত্বিক কাঠামোয় অভিবাসনকে ঢোকানোর কোনো জায়গা নেই। যদি দেখা যায়, যে এমনকি পুঁজিবাদের স্বর্ণযুগে, যখন দুনিয়াজোড়া বিরাট বাজার ইউরোপীয় পুঁজির করায়ত্ত্ব, তখনও পুঁজি উচ্ছেদ হওয়া কৃষককুলের একটা বিরাট অংশকে উৎপাদনপ্রক্রিয়ার অংশ করে তুলতে পারছেনা, তাহলে পুঁজিবাদ যে সামন্ততন্ত্রের চেয়ে "উন্নত' একটি ব্যবস্থা, সেই ধারণাটাই প্রশ্নচিহ্নের সামনে পড়ে যায়। তাহলে সামন্ততন্ত্র থেকে পুঁজিবাদে উত্তরণকে একটি সার্বজনীন প্রক্রিয়া বলে ঘোষণা করা যাবেনা, বরং এই উত্তরণের পূর্বশর্ত হিসাবে নিয়ে আসতে হবে কলোনির ধারণাকে। অর্থাৎ, সামন্ততন্ত্র থেকে পুঁজিবাদে উত্তরণ তখনই হবে, যদি থাকে এক) এক বা একাধিক বিরাট উপনিবেশ, যেখানে মাল বিক্রি করা যাবে, দুই) আরও কিছু উপনিবেশ, যেখানে চালান করা যাবে উদ্বৃত্ত শ্রমিকদেরকে। এতো খানি পূর্বশর্ত স্বীকার করে নিলে মার্কসবাদী সার্বজনীন নিয়মগুলি ভেঙে পড়বে। 

ফলে মার্কসবাদী আলোচনায় অভিবাসন প্রসঙ্গ নেই, সেটা আশ্‌চর্যজনক কিছু না। ইংল্যান্ডে শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থা ১৮৪৫ সালে প্রকাশিত হয়। তখনও মার্কসবাদী বিপ্লবের ডিসকোর্সে কলোনির কোনো জায়গা নেই। মার্কস ভারতবর্ষ নিয়ে গোটা কতক লেখা লিখেছেন, সে শুধু সাংবাদিকের কৌতুহলে, কিন্তু মূল গল্পটা তখনও খাঁটি ইউরোপীয়। ইউরোপের পুঁজিবাদী দেশগুলো প্রায় প্রাকৃতিক কোনো এক নিয়মে সমাজতন্ত্রে উত্তরিত হবে। এই ধারণায় প্রথম ছেদ দেখব রুশ বিপ্লবের আগে। লেনিন লিখবেন সাম্রাজ্যবাদই পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর, এবং পুঁজিবাদের দুনিয়াজোড়া শৃঙ্খলের সবচেয়ে দুর্বল জায়গাটাতেই আঘাত করতে হবে। এই প্রথম আমরা জানতে পারব, যে, তুলনায় অনুন্নত দেশগুলিতেও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্ভব। মার্কসীয় ডিসকোর্সে কলোনিরা বা পূর্বতন কলোনিরা যথেষ্ট গুরুত্ব পাবে আরও পরে, এবং অবশেষে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি এসে মাও সে তুং কলোনিদের জাতে তুলবেন। ফলে কলোনিরা যে প্রথম যুগের মার্কসীয় প্রতিবেদনে অনুপস্থিত, সেটা বিস্ময়কর কিছু না। 

তুলনায় কৌতুহলজনক এই ব্যাপারটা, যে, গত শতাব্দীর আর এক ধুরন্ধর ক্ষমতার তাত্ত্বিক, মিশেল ফুকোর লেখালিখিতেও বিষয়টির উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছেনা। ফুকো অভিবাসন নিয়ে লেখেননি, কিন্তু শাস্তি ও শৃঙ্খলার প্রকরণ নিয়ে তাঁর বিস্তর লেখালিখি আছে। কিন্তু সেখানে দ্বীপান্তর নামক শাস্তির প্রসঙ্গটি নেই। যদিও, আর কিছু না হলেও, অন্তত: সংখ্যার বিচারে বিষয়টা কিঞ্চিৎ গুরুত্ব দাবী করে। স্রেফ ওল্ড বেইলি কোর্টের নথি থেকেই দেখতে পাচ্ছি, সেই সতেরোশো সাল থেকে উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত মোট অপরাধের এক তৃতীয়াংশের ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান হত দ্বীপান্তর। পুরো দেড় শতাব্দী সময়সীমা ধরেই এই অনুপাতটা মোটামুটি অপরিবর্তনীয়। 

"ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ' এ ফুকো দেখাচ্ছেন, যে মধ্যযুগের ইউরোপে কুষ্ঠরোগীদের যেভাবে সমাজ থেকে আলাদা করে দেওয়া হত, সেই পদ্ধতিটিই পরবর্তীকালের সমাজ থেকে আলাদা করে বন্দী করে রাখার মডেলের পূর্বসুরী। একই ভাবে, প্লেগ মোকাবিলার পদ্ধতি, জন্ম দিয়েছিল সমাজকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করার টেকনিকের। এই দুটি পদ্ধতিই পরবর্তীকালে বেন্থামের প্যানপটিকনের ডিজাইনে জায়গা পায়। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই দুটি পদ্ধতির কোনোটায় কি ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে গণদ্বীপান্তরের দীর্ঘ পরম্পরাকে? মেরি ওয়েডকে সমাজচ্যুত করে একাকীত্বে আলাদা করা হয়নি। বরং তাকে অন্য একটি সমাজে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই সমাজ, কুষ্ঠরোগিদের মতো সমাজচ্যুতদের দঙ্গল নয়, বরং সুসভ্য পশ্‌চিমেরই এক বর্ধিত অংশ। আবার উল্টো দিকে, ডিসিপ্লিনারি ট্যাকটিক্সের সফল প্রয়োগের শেষে, তাদেরকে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে নেওয়াও হয়নি। বস্তুত: উনবিংশ শতাব্দীর আগে "কারাগারে বন্দী রাখা' যে শাস্তির একটি প্রকরণ হতে পারে, ইংল্যান্ডে সেই ধারণাই গড়ে ওঠেনি। 

ফলে, প্রশ্ন এইটাই, যে, ইংল্যান্ড থেকে লেডি জুলিয়ানায় চড়ে অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে নামল যে এগারো বছর বয়সের মেয়েটি, ক্ষমতার ডিসকোর্সে, তাকে কোথায় জায়গা দেব? উত্তর খোঁজার আগে, মেরি ওয়েডের কি হল, জেনে নেওয়াটা জরুরী। 


৭। 

মেরি ওয়েড নতুন দেশে পৌঁছয় ১৭৯০ সালে। তার বয়স তখন এগারো। এর পর দীর্ঘদিন তার কোনো খবরাখবর আর পাওয়া যাচ্ছেনা। তার সঙ্গী র‌্যাচেল হুডি সম্পর্কে জানা যাচ্ছে, যে, সেই মহিলা বিয়ে করে সংসার পাতেন, এবং তাঁর নতুন নাম হয় র‌্যাচেল উইলিয়ামস। কিন্তু মেরির সম্পর্কে কোনো সূত্র পাওয়া যাবেনা দীর্ঘদিন। তার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে দুশো বছরেরও বেশি। অপেক্ষা করতে হবে তিনজন একবিংশ শতাব্দীর অস্ট্রেলিয় মহিলার জন্য, যাঁরা নিজেদের আদিপরিচয় জানার জন্য খুঁড়ে বার করবেন কলোনির ইতিহাস। খুঁড়ে বার করবেন লেডি জুলিয়ানার ইতিবৃত্ত। সেই সুবাদে বেরিয়ে আসবে মেরি ওয়েডের শেষ দিনগুলি সম্পর্কিত সামান্য কিছু তথ্য। 

এই তিন মহিলার নাম, মিগেন বেনসন, হেলেন ফিলিপস এবং ডেলিয়া ড্রে। পুরোনো সংবাদপত্রের সংগ্রহ, আদালতের দলিল, আরও নানা টুকরোটাকরা জিনিস তন্নতন্ন করে খুঁজে এঁরা অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এঁদের প্রথম পূর্বসুরীদেরকে খুঁজে বার করতে সক্ষম হন। তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছিল, খুঁড়ে বার করতে সক্ষম হন সেই ইতিহাসও। এবং সেই ইতিহাস মূলত: সাফল্যের। পূর্বতন পতিতা, চুরির দায়ে অভিযুক্ত, দেশান্তরী র‌্যাচেল উইলিয়ামস পরিণত হন এক সফল ব্যবসায়ীতে। ঐ এলাকার প্রাচীনতম বার এবং মদের দোকানগুলির একটি ছিল র‌্যাচেলের প্রতিষ্ঠিত। এবং অস্ট্রেলিয়া উপমহাদেশের প্রথম সফল বিজনেস উওম্যানদের মধ্যে তিনি একজন। হোবার্ট টাউন গেজেটের ১৮২৩ সালের একটি সংখ্যা থেকে জানা যাচ্ছে, যে, হোবার্ট টাউনে মদ, ওয়াইন এবং বিয়ার বিক্রির বৈধ লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল র‌্যাচেল উইলিয়ামসকে। 

তবে লেডি জুলিয়ানার মহিলাদের মধ্যে সবচেয়ে সফল বিজনেস ওম্যান খুব সম্ভবত: অ্যান মার্শ। শোনা যায় ইনি খোদ গভর্নরের পার্টিতেও আমন্ত্রিত হতেন। এই সফল ব্যবসায়ী মহিলাটি একটি ফেরি সার্ভিসটি চালু করেন, তাতে পুরুষ কর্মচারি নিয়োগ করার জন্য গভর্নরের কাছ থেকে লোক চান। এই ফেরি সার্ভিসটি আজও চালু আছে। 

মেরি ওয়েড অবশ্য ব্যবসা করেছিল বলে জানা নেই। স্থানীয় সংবাদপত্র থেকে জানা যাচ্ছে, ৮৭ বছর বয়সে নিজের ছেলের বাড়িতে তিনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। অস্ট্রেলিয়া উপমহাদেশে সন্তান সন্ততি নাতি পুতি মিলিয়ে তাঁর তখন ৩০০র বেশি বংশধর সমেত ভরভরন্ত সংসার। গোটা কলোনিতেই তিনি অত্যন্ত সুপরিচিত এবং সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত ছিলেন। তাঁকে এক বিরাট পরিবারের গোষ্ঠীমাতার সম্মান দেওয়া হত। 

এইভাবেই শেষ হয় মেরি ওয়েডের জীবনকাহিনী। দশ বছর বয়সে লন্ডনের রাস্তায় ভিক্ষে করা যে মেয়েটিকে ডাকাতির অভিযোগে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছিল, সভ্য সমাজের এক সম্ভ্রান্ত মহিলা হিসাবে সে জীবন শেষ করে অস্ট্রেলিয়ায়। 


৮। 

কিন্তু এতো শুধু মেরি ওয়েডের উপাখ্যান নয়। অস্ট্রেলিয়া বা আমেরিকা নামক কলোনিগুলির গোটা গল্পটাই একই। শিল্পবিপ্লবের ঝড়তিপড়তি বাতিল মানবাবশেষকে জাহাজ বোঝাই করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে কলোনিতে। কিন্তু সেই বাতিল মানবশরীর গুলি বর্জ্য পদার্থে পরিণত হয়নি। বরং তাদের আখ্যান মূলত: সাফল্যের আখ্যান। সেই বাতিল মানুষগুলি গড়ে তুলেছে শহর, সভ্যতা, হয়ে উঠেছে পশ্‌চিমী নাগরিক জীবনের এক অংশবিশেষ। এবং ক্ষেত্রবিশেষে এই উদ্বৃত্ত পশ্‌চিম, ছাড়িয়ে গেছে "আসল' ইউরোপীয় পশ্‌চিমকে। মেরি ওয়েডের কাহিনী এই বিরাট গল্পের সূচনাবিন্দু মাত্র। সেই কারণেই এই মেটামরফোসিসের পদ্ধতিটি তার সমস্ত চিহ্নগুলি নিয়ে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান মেরি ওয়েডের গল্পে, যা পড়তে পড়তে আমাদের অনেক সময়েই "ভয়াবহ' লাগে। দিন গেলে কালেকালে পদ্ধতিটি মসৃণ ও আধুনিক হয়ে উঠবে, বাহ্যিক ভয়াবহতার চিহ্নগুলিকে সযত্নে মুছে ফেলা হবে। কিন্তু জেলখানার বাইরে ও ভিতরে এই অভিবাসনের মূল গল্পটি একই থেকে যাবে। সেই জন্যই মেরির গল্পটি আমাদের খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করা দরকার। এই গল্পে মেটামরফোসিসের সমস্ত চিহ্নগুলিই দগদগে হয়ে প্রতীয়মান, পরবর্তীকালে এই চিহ্নগুলি খুঁজে পেতে আমাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হতে পারে। 

তো, আমরা আমাদের পুরোনো প্রশ্নে ফিরে আসব এইখানে। যে, ক্ষমতার ধারাবিবরণীতে মেরি ওয়েডের জায়গা ঠিক কোথায়? দ্বীপান্তরকেই বা ঠিক জায়গায় বসাব? 

ফুকো দেখাচ্ছেন, যে মধ্যযুগের ইউরোপে কুষ্ঠরোগীদের যেভাবে সমাজ থেকে আলাদা করে দেওয়া হত, সেই পদ্ধতিটিই পরবর্তীকালের সমাজ থেকে আলাদা করে বন্দী করে রাখার মডেলের পূর্বসুরী। কুষ্ঠ ছিল সমাজের পক্ষে উপদ্রব বিশেষ। কুষ্ঠরোগীদের সমাজের বাকি অংশ থেকে আলাদা করে রাখা হত, বাংলা ভাষায় যাকে বলা যায় সমাজচ্যুত। এই পদ্ধতির সঙ্গে দ্বীপান্তরে পাঠানোর একটা বড়ো মিল হল এই, যে, এক্ষেত্রেও বন্দীদের মূলত: সমাজ থেকে তাড়িয়েই দেওয়া হত। কিন্তু একটা বড়ো অমিল হল, যে, বন্দীদের সমাজচ্যুত করা হতনা। বরং উল্টোদিকে তাদের নিয়ে তৈরি করা হত নতুন এক সমাজ, যার নাম উপনিবেশ। কুষ্ঠরোগীদেরও গোষ্ঠী ছিল নি:সন্দেহে, কিন্তু তার সঙ্গে এর তফাতটা হল, সেই গোষ্ঠী একটি প্রান্তিক গোষ্ঠী, আর উল্টোদিকে উপনিবেশগুলি মূলধারার সভ্যতার প্রোমোট করা প্রতিনিধি। প্রতিটি উপনিবেশ ছিল "বৈধ' জনগোষ্ঠী। থাকতেন গভর্নর এবং সুগঠিত প্রশাসনিক ব্যবস্থা। লেডি জুলিয়ানার ক্ষেত্রে, স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে, সদ্য স্থাপিত পেনাল কলোনিটিকে একটি সুগঠিত শৃঙ্খলাবদ্ধ আকার দেবার জন্য ব্রিটিশ সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও চিন্তা ভাবনা করছেন। লেডি জুলিয়ানাকে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানোর পিছনে হোম আন্ডার সেক্রেটারি ইভান নেপানের ভূমিকা বিরাট। পারিবারিক এবং নৈতিক বন্ধনের শৃঙ্খলায় স্থিতিশীল একটি কলোনি গড়ে তোলার জন্যই তিনি এক জাহাজ মহিলাকে পাঠানোর উদ্যোগ নেন। তাঁর লিখিত নোট পরিষ্কারভাবেই এই সাক্ষ্য দিচ্ছে : " 
upon landing, promote a matrimonial connection to improve morals and secure settlement. ' 

ফলে, পেনাল কলোনি হলেও, আসলে তা সভ্যতারই এক্সটেনশন। দ্বীপান্তরের আসামীদের মোটেই জলে ফেলে দেওয়া হয়নি। তারা সভ্যতা থেকে বহিষ্কৃত, কিন্তু ক্ষমতার নজরদারীর বাইরে নয়। একই ভাবে অভিবাসীরাও কোনো রবিনসন ক্রুশো নন, যে, অজানা দ্বীপে সহায়সম্বলহীন হয়ে উপস্থিত হয়ে স্রেফ বুদ্ধি আর বাহুবল সম্বল করে গড়ে তুললেন নতুন সভ্যতা। বরং উল্টোটাই। একটি "সুসভ্য' পেনাল কলোনিতে এঁদেরকে পাঠানো হয়েছিল, কোনো গহন অরণ্যে নয়। 

এই পদ্ধতিটি, অনেকাংশেই আধুনিক কারাগার, বা সংশোধনাগারে বা মানসিক চিকিৎসালয়ে অনুসৃত ফুকো বর্ণিত পদ্ধতি। প্রথমে "অপরাধী' বা "রোগী'কে আলাদা করে নেওয়া হয়, "বহিষ্কার' করা হয় সমাজ থেকে। তারপর তার উপর প্রয়োগ করা হয় হরেকরকম ডিসিপ্লিনারি মেকানিজম। কিন্তু একটা বিরাট বড়ো তফাত আছে। তফাত এই, যে, চিকিৎসা বা সংশোধনের প্রক্রিয়া শেষ হলে অধিকতর কার্যকরী, উৎপাদনক্ষম, পরিবর্তিত মানুষটিকে ফিরিয়ে নেওয়া হয় সমাজে। তাকে কারাগারে বা হাসপাতালে নতুন "সমাজ' গড়তে পাঠানো হয়না। লেডি জুলিয়ানার অপরাধীদের ক্ষেত্রে কিন্তু সংশোধনপ্রক্রিয়া শেষ হলে পুরোনো সমাজে অধিকতর উৎপাদনক্ষম হয়ে ফিরে আসার কোনো সুযোগ ছিলনা। 

ফলে, পৃথকীকরণ এবং শৃঙ্খলাশিক্ষার প্রচলিত ফুকোকথিত মেকানিজমের বাইরে অন্য একটি পদ্ধতির সন্ধান এখানে পাচ্ছি আমরা। যেখানে সমাজ থেকে "অস্বাভাবিক' বা "অক্ষম'কে পৃথক করা হয়, নিয়ে যাওয়া হয় নজরদারির এক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে। কিন্তু পাঠাভ্যাস শেষ হলে আর ফিরিয়ে নেওয়া হয়না। ফুকোর ক্ষমতার রূপকথা, এখানে ভেঙে পড়ে। 

তাহলে, মেরি ওয়েডকে, যদিও তাড়িয়ে দেওয়া হল তার দেশ থেকে, তাকে সমাজের বাইরে গলায় পাথর বেঁধে জলে ফেলে দেওয়া হলনা কিন্তু। বরং সে রয়ে গেল সেই একই ক্ষমতার নজরদারির মধ্যেই। একটি বিশেষ ডিসিপ্লিনারি মেকানিজমের মধ্যে নিয়ে ফেলা হল তাকে। যা তাকে আরও দক্ষ করে তুলবে, কিন্তু পুরোনো সমাজে ফিরিয়ে নেবেনা। তার এক্সক্লুশন চিরস্থায়ী। তার দক্ষতাকে এবার কাজে লাগানো হবে, নতুন এক দুনিয়া গড়ে তোলার কাজে। পুরোনো দুনিয়ায় তার আর কোনো ঠাঁই নেই, অতএব এই কাজে অংশগ্রহণ করতে সে বাধ্য। 

এই ডিসিপ্লিনারি মেকানিজম তাকে এক নতুন নৈতিকতার ধারণা দেয়। মেরি ওয়েডের লন্ডনের অতীত তাকে শুষ্ক কঠিন অনড় এক নৈতিক জীবনের ছবি চিনিয়েছিল। যেখানে চুরির শাস্তি মৃত্যু। যৌনকর্মীদের পাঠানো হয় দ্বীপান্তরে। লেডি জুলিয়ানা তাকে এক নতুন নৈতিকতার সন্ধান দেয়। যেখানে কোনো কিছুই অনড় নয়। যেখানে শরীর বেচে আদায় করা যায় সুবিধা এবং সম্মান। যেখানে ব্যবসার সাফল্যই সম্মানের মাপকাঠি। আবার একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, লেডি জুলিয়ানাকে পাঠানো হয়েছিল মূলত: পারিবারিক বন্ধন প্রোমোট করার জন্য। অতএব, তাকে শিখতে হয়, বুঝতে হয়, যে, পরিবারই একটি স্থিতিশীল জনগোষ্ঠীর মূল উপাদান। অতএব পারিবারিক মূল্যবোধ গুলি সম্মানীয়। ব্যক্তির সাফল্যের সঙ্গে আসে পারিবারিক/সামাজিক দায়বদ্ধতা। এই ফ্লেক্সিবল নৈতিকতার ধারণা, যা পরবর্তীতে ফুলে ফলে পল্লবিত হয়ে উঠবে, তা মূলত: এই ধরণের উপনিবেশগুলিরই দান। 

এই একই মেকানিজম তাকে আত্মচেতনাও দেয়। নতুন দুনিয়া তাকে একটি নতুন সুযোগ দেয়। নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ। অতীতকে ফেলে আসার সুযোগ তার নেই, কারণ, সে তখনও পুরোনো ব্যবস্থার প্রশাসনিক নজরদারির মধ্যেই। অতীত কীর্তির কারণেই সে এই জায়গায়, অতএব অতীতকে ভোলার কোনো সুযোগ তার নেই। নতুন দুনিয়া তাই তাকে শুরু করতে বলে অতীতকে স্বীকার করেই। ফলে এই দুনিয়া তাকে একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়, যে, নতুন ভাবে জীবন শুরু করা বলতে ঠিক কি বোঝায়। এবং সেটা ঠিক কিভাবে করা উচিত। অতীতের ভুলগুলি ঠিক কি ছিল, এবং সেটা কিভাবে সংশোধন করা যায়। এটা মূলত: আত্মজিজ্ঞাসার একটা ফর্ম, প্রতিটি অভিবাসীকে যার মধ্যে দিয়ে আসতে হয়, হয়েছে। বস্তুত: এটি এক ধরণের কনফেশন। যেখানে কোনো শ্রোতা না থাকলেও নিজের কাছে নিজেকেই বর্ণনা করতে হয়। আমি আসলে এই ছিলাম। এই করেছি। এবং তার পরে আসবে আমি আসলে এই হতে চাই। "আমি আসলে এই হতে চাই', যেহেতু এটা ভাষায় প্রকাশ করা দরকার, অতএব "আমি এই ছিলাম' টাও ডিসকার্সিভ, অর্থাৎ ভাষায় প্রকাশযোগ্য।এই ডিসকার্সিভ "নিজেকে জানা' একটি অত্যন্ত কার্যকরী ডিসিপ্লিনারি পদ্ধতি, ফুকো দেখিয়েছেন। এই "নিজেকে জানা'র এবং দক্ষ করে তোলার যে হাতুড়ে পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে আসতে হয় অভিবাসীকে, সেই সুযোগ মূল ভুখন্ডের মানুষ পাবে অনেক পরে। সাইকোঅ্যানালিসিস জাতীয় সফিস্টিকেটেড টেকনিকের মধ্যে দিয়ে।

এই নতুন নৈতিকতা এবং আত্মচেতনা, অভিবাসীকে দক্ষ করে তোলে নতুন নতুন সৃষ্টিশীল কাজে। কলোনি হয়ে ক্রমশ: হয়ে ওঠে কল্লোলিনী তিলোত্তমা। 

এই পুরো গল্পটি যে আমরা ফুকোর ক্ষমতার আখ্যানে উপেক্ষিত, তাতে বিস্ময়কর কিছু নেই। উপনিবেশকে ফুকোর কাঠামোয় ঢোকাতে গেলে তা বিপর্যয় ঘটিয়ে দেবে। ফুকো বর্ণিত ক্ষমতার উপাখ্যান, পুরোটাই ডিসিপ্লিনারি পাওয়ারের বেড়ে ওঠার গল্প। সেখানে ক্ষমতা দমনমূলক নয়, বরং তা শক্তিদাতা। উপনিবেশের কাহিনী এই প্রাথমিক জায়গাটিকেই অস্বীকার করে। 

প্রথমত: ইউরোপের ঝড়তি যে মানববাহিনীকে সরিয়ে আনা হল আমেরিকা অথবা অস্ট্রেলিয়ায়, তার মূলে কাজ করে এমন একটি ক্ষমতা, যা "ডিসিপ্লিনারি' নয়, বরং দমনমূলক। লেডি জুলিয়ানার মেয়েদেরকে গায়ের জোরে পাঠানো হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ায়। রাষ্টের দমনযন্ত্র তাদের ফিরে যাবার পথ বন্ধ করে রেফেছিল। একই কথা প্রযোজ্য, পরবর্তীকালের অজস্র অভিবাদীদের ক্ষেত্রে। শিল্পবিপ্লব তাদের গায়ের জোরে উৎখাত করে জমি থেকে, উৎপাদনের উপকরণ থেকে, এবং চালান করে দেয় উপনিবেশে। ফিরে আসার কোনো উপায় ছিলনা। ফরাসী বিপ্লব যে "লিবারেশন' এর ধারণা দিয়েছিল, এটা ঠিক তার উল্টোদিকে। ফলে, যদিও উপনিবেশে একটি ডিসিপ্লিনারি পাওয়ারের অস্তিত্ব টের পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু তার প্রাথমিক পূর্বশর্ত হল দমন। 

দ্বিতীয়ত: আরও একটি বড়ো জিনিস এখানে নজর এড়িয়ে যাচ্ছে। কলোনি মানে শুধু ইউরোপীয় অভিবাসীরা নন। কলোনি মানে তার অদিবাসীরা। অতএব কলোনিকে এই মডেলে ঢোকাতে গেলে অনিবার্যভাবে চলে আসবে আদিবাসীরাও। কলোনির আদিবাসীদের এই মডেলে ঢোকাতে গেলে ফুকোর কাঠামোয় অধিকতর বিপর্যয় দেখা দেবে। শিল্পবিপ্লবের উদ্বৃত্ত মানবগোষ্ঠীকে উপনিবেশে জায়গা দেবার অন্যতম পূর্বশর্ত ছিল এই আদিবাসীদের উপর বাহ্যিক বলপ্রয়োগ করে তাদের নিজের জায়গা থেকে হটিয়ে দেওয়া। খুঁটিয়ে দেখলে আমরা দেখব, যখন ডিসিপ্লিনারি পাওয়ারের প্রয়োগে অস্ট্রেলিয়া এবং আমেরিকায় নির্মিত হচ্ছে উদ্বৃত্ত পশ্‌চিম, সেই একই সময়ে দমনমূলক ক্ষমতার প্রয়োগে খুন করা হচ্ছে, হটিয়ে দেওয়া হচ্ছে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে। অতএব উদ্বৃত্ত বৃহত্তর পশ্‌চিমের একটি অপরিহার্য পূর্বশর্ত হল দমনমূলক ক্ষমতার প্রয়োগ। 

তাই, ফুকোর মডেলে উপনিবেশকে ঢোকালে, ডিসিপ্লিনারী পাওয়ারের সার্বভৌম মনোপলি খর্ব হয়ে যাচ্ছে। ডিসিপ্লিনারী পাওয়ারের সঙ্গে আসছে তার মার্জিন। সেই মার্জিনে প্রযুক্ত হয় দমনমূলক ক্ষমতা। এবং পশ্‌চিমে বা বৃহত্তর পশ্‌চিমে ডিসিপ্লিনারী পাওয়ারের পূর্বশর্তই এই দমনমূলক ক্ষমতা। বলে নেওয়া ভালো, পূর্বশর্ত কথাটা এখানে "একটি আরেকটির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত' অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে, এর কোনো কালগত বা কার্যকারণগত মাত্রা নেই। 

অতএব, বৃহত্তর অর্থে কলোনি হল সভ্যতার সিম্পটম। পশ্‌চিমী ডিসকোর্সগুলি, মার্কস হোক বা ফুকো, কলোনির সীমান্তে এসে ভেঙে পড়ে। তাদের ধারাবিবরণীতে কলোনির কোনো জায়গা নেই। তাই, মার্কস বা ফুকো-টুকো বাদ দিয়ে একটু বাংলা ভাষায় মোদ্দা জিনিসটা বললে এরকম দাঁড়ায়: পশ্‌চিমী শিল্পায়ন একটি আদ্যন্ত স্পেসিফিক ঘটনা, যার সে অর্থে জেনারাইলেশন করা যায়না। সেই শিল্পায়ন বহু মানুষকে উচ্ছেদ করেছিল, কিন্তু বিকল্প জোগাতে পারেনি। বরং ক্ষমতা তাদের আবর্জনাস্তূপে নিক্ষেপ করেছিল। সেই আবর্জনাস্তূপ থেকে তাদের উদ্ধার করে সভ্যতার কক্ষপথে পুন:স্থাপিত করার জন্য দরকার হয়েছিল বিরাট বিরাট সব কলোনির। সেই বিরাটাকায় ল্যাবোরেটারিতে তাদের দেওয়া হয়েছিল নতুন করে বাঁচার প্রশিক্ষণ। ক্ষমতার এক বিরাট নেটওয়ার্ক এই পদ্ধতিতেই তৈরি করে বৃহত্তর উদ্বৃত্ত পশ্‌চিমকে। কিন্তু সেই কাজের জন্য আবার সেই ক্ষমতাই উৎখাত করে আদি কলোনিবাসীদের। তাদের উপর বলপ্রয়োগ করা হয়, মেরে ফেলা হয়, ক্ষমতার যাবতীয় দমনমূলক পদ্ধতির সবকটাই তাদের উপর প্রয়োগ করা হয়। এছাড়া পশ্‌চিমের শিল্পবিপ্লব সফল হতনা। 

শিল্পবিপ্লব, এনলাইটেনমেন্ট, এক কথায় পশ্‌চিমী সভ্যতার ইতিহাস তাই মসৃণ, নিরবিচ্ছিন্ন উন্নতির বা ডিসিপ্লিনারি পাওয়ারের যুগ নয়। বরং বলপ্রয়োগ, উচ্ছেদ, মানুষ খুন, আর বিতাড়নের ইতিহাস। শুধু ডিসিপ্লিনারি পাওয়ার বা শ্রেণী সংঘাতের ইতিহাস দিয়ে এই ইতিহাসের বর্ণনা দেওয়া যাবেনা। 

-------------------------------------------------------------------------------------------------- 

লেখাটি সর্বক্ষেত্রে অ্যাকাডেমিক্যালি কারেক্ট নয়। কিছু কিছু তাত্ত্বিক ক্যাটিগরিকে, কিঞ্চিৎ তরলাকারে উপস্থিত করা হয়েছে। মূল বক্তব্যের সঙ্গে কোনো রকম কমপ্রোমাইজ অবশ্যই করা হয়নি। 

জুন ১০, ২০০৭ 

1 টি মন্তব্য: