বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

সাদিক হোসেন উত্তর আধুনিক কালের এক শিল্পীঃ পুরুষোত্তম সিংহ

দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার মহেশতলা থেকে উঠেছেন সাদিক হোসেন (১৯৮১)। আর্থিক কারণে পরাশুনায় বিচ্ছেদ ঘটে, বর্তমানে একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত। কবিতা দিয়েই সাহিত্য জীবন শুরু হয়েছিল। প্রথম কাব্য ‘দেবতা ও পশুপাখি’ (২০০৭)। এরপরে কথাসাহিত্যে প্রবেশ করেছেন।

ইতিমধ্যেই বেশকিছু গল্প সংকলন প্রকাশিত হয়েছে –‘সম্মোহন’ (২০০৯), ‘গিয়াস আলির প্রেম ও
তার নিজস্ব সময়’ (২০১৪), ‘রিফিউজি ক্যাম্প’ (২০১৭) ও ‘হারুর মহাভারত’ (২০১৯ )। ‘কী লিখতে চাই’ শীর্ষক অংশ থেকে সাদিক হোসেনের লিখনবিশ্বের যাবতীয় ভাবনা গুলিকে প্রথমেই তুলে ধরি –
“কী লিখব আমি ? কী লিখতে চাই ? এখানে নির্জন দুপুরবেলা ঢ়োঁড়া সাপ গুটিয়ে শুয়ে থাকে
খাটের পায়ায়। যথেষ্ট কার্বালিক অ্যাসিডেও তাঁর কোনো নড়নচড়ন নেই। যেন এই তার বাড়ি,
এই তার কুঁড়েমির সংসার। আমি কেন তাকে অযথা অপ্রস্তুতে ফেলছি !
.... ..... ...... ....... ...... .......
কী লিখব আমি ? আমি কী লিখতে চাই ? হে আমার শব্দ, হে আমার ব্যাকরণ, হে আমার আ-
কার, ই-কার, উ-কার তোমরা আমার পাসে এসে দাঁড়াও। আমাকে গাছের ভেঙে পড়ার শব্দ
শোনাও। আমাকে দেখাও লক- আউট কারখানার সংগীত। আমাকে দেখাও আদিবাসী মুদ্রা।
আমি এই অচেনা ঘরে দাঁড়িয়ে রয়েছি। আমি এই বিদেশে, এই অস্থানে, এই অসময়ে তোমাদের
অপেক্ষায় কান পেতে রয়েছি।
তোমরা বজ্রপাতের মতো নেমে এসো, অতর্কিতে আঘাত করো, মশাল জ্বালিয়ে, লন্ঠন দুলিয়ে
সোচ্চার হয়ে নেমে এসো আমার সাদা পৃষ্ঠায়।“ (কথাসোপান, শারদীয় ১৪২৪, পৃ. ১২৮, ১৩০)
বাংলা গল্পে ভিন্ন ভুবন নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন সাদিক হোসেন। একবিংশ শতাব্দীর বাংলা
কথাসাহিত্যে অন্যতম শক্তিশালী তরুণ লেখক সাদিক হোসেন। আত্মপ্রকাশের কোন বাসনা নেই।
তিনি গল্প নির্মাণ করেই সুখ পান। বাজারি পত্রিকায় সাদিকের লেখা তেমন স্থান পায়না। কেননা
সাদিক বাজারি লেখক নন। শিল্পকে তিনি এলোমেলো ভাবে ছেড়ে দিতে চাননা। প্রবল ভাবে সময় সচেতন ও গল্পের রন্ধে রন্ধে এক প্রতিবাদের সুর বপন করে যান, যা রাষ্ট্রকে আঘাত করে মাঝে মাঝে।
তিনি সস্তা প্রেমের গল্প লিখতে চাননি। বিনোদনের কাহিনি ফাঁদতে চাননা। অথচ এঁরাই আজকের
শক্তিশালী লেখক। বাঙালি পাঠকের রুচি কোনদিকে যাচ্ছে তা সহজেই অনুমেয়। অবশ্য চিরকালই তা ছিল। স্রোতের বিরুদ্ধে একদল লেখক শক্তভাবে নিজের আখ্যানভুবন নিয়ে বিচারণ করেছেন।
নব্যকালের সেই লেখকদের মধ্যে অন্যতম সাদিক হোসেন।

 ‘অভিসারিকা’ ভিন্ন স্বাদের গল্প। মধ্যম পুরুষের মধ্য দিয়ে তিনি গল্পের কাহিনি এগিয়ে নিয়ে গেছেন। তবে গদ্য নির্মাণে সাদিক অত্যন্ত শক্তিশালী। দাদি ও নাতির ভাঙাগড়া জীবনচিত্রের মাধ্যমে গল্প শুরু হলেও তা এগিয়ে গেছে অন্য মাত্রায়। এয়াকুব পছন্দ করত রাহেলাকে। কিন্তু সে রাহেলাকে পায়নি। অথচ বিনা অর্থে দীর্ঘদিন পরিশ্রম করে যেতে হয়েছে। গল্পের নায়িকার আজ দৃষ্টি পড়েছে এয়াকুবের প্রতি। নায়িকা আজ যৌবনে পা দিয়েছে। কিন্তু এয়াকুবের চেতন, অবচেতন মনে রাহিলা। এয়াকুব ও নায়িকার কথোপকথনে প্রচ্ছন্ন যৌনতার ইঙ্গিত আছে বটে কিন্তু লেখক যেন সচেতন ভাবেই তা এড়িয়ে যান। সাদিকের গল্পে যৌনতা প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতেই ব্যক্ত হয়, কখনও বা পশু পাখির রূপকেই মানুষের অবদমিত কামনাকে তিনি প্রকাশ করেন। এয়াকুব ও নায়িকা আজ বেরিয়েছে অভিসারে। সেখানে শুধুই রহস্য ও রোমান্স। তেমনি নায়িকা যৌনতার উষ্ণ স্পর্শ পেতে চেয়েছে ভিন্ন ভাবে। এয়াকুব দুধের জোগান দেয় নায়িকার বাড়িতে। এয়াকুবকে সে শিস দিয়ে ডেকে সাড়া দিয়েছে। আবার কখনও আঙুল টিপে ধরে-
“তুমি এয়াকুবের আঙুলগুলোকে মুঠোতে নিয়ে বলো, ‘আর তুমি দুধ দোও বলে তোমার আঙুলগুলো
এমন লকলক করতেছে।‘
এয়াকুব হাসে।
তুমি এয়াকুবের আঙুলগুলোকে টিপে টিপে দ্যাখো। আঙুলগুলোকে গাছে ঝোলা ডাঁটার মতো লাগে।
মনে হয় দাঁতে চাপ দিলেই সাদা সাদা শাঁসালো আঁশ বেরিয়ে পড়বে। তুমি তাতে নখ দিয়ে চাপ
দাও।“ (গিয়াস আলির প্রেম ও তার নিজস্ব সময়, সোপান, প্রথম প্রকাশ-২০১৪, পৃ. ৫৮)
এরপর এয়াকুবকে ঘরে আহ্বান জানালেও কিছু হয় নি। বরং এয়াকুবকে দিয়ে দাদির পিঠে মলম মালিশ করা হয়েছে। গল্প শেষে তারা অভিসারে গেলেও দৈহিক মিলন হয় নি। দুজনই দুজনকে সাড়া দিয়েছে, আকারে ইঙ্গিতে উষ্ণতার ডাক দিয়েছে কিন্তু কোন মিলন হয় নি। লেখক এক আবহের সৃষ্টি করেছেন যেখানে মিলনের আকুতি আছে কিন্তু কেউ আর এগিয়ে যাবার সাহস পায় নি। প্রচলিত ছক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ফর্মে সাদিক গল্প লেখেন, যেখানে খুঁজে পাওয়া যায় নিজস্ব এক কথনভঙ্গি ও
আঙ্গিক- এখানেই সে স্বতন্ত্র।
সাদিক হোসেনের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সম্মোহন’ (২০০৯ )।
গ্রন্থটি ‘সাহিত্য অকাদেমি যুব পুরস্কার’ পায় ২০১২ খ্রিস্টাব্দে। পাঁচটি গল্পের সংকলন, প্রথম
গল্প ‘সম্মোহন’। প্রথম গল্পেই লেখক ব্যক্তি অপেক্ষা সমষ্টিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কোন ব্যক্তি
নয় লেখকই কথক। জোহরবাদ, হাফিজ, ইব্রাহিম খাঁ, আলতাফ ও লেয়াকত চরিত্রের মধ্যে দিয়ে
গল্পের বৃত্তটি গঠন করেছেন। এঁদের পারস্পরিক বক্তব্যের মধ্য দিয়েই গল্প এগিয়ে গেছে। সেই
সঙ্গে মুসলিম সমাজের রীতিনীতি, সমাজ-সংস্কার, লোকায়ত ,ধর্মীয় জীবন সমস্তই মিলে মিশে
একাকার হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে লেখক সৃষ্ট ছড়াগুলি গল্পের কাব্যিকমূল্য বৃদ্ধিতে অনেকটাই সহায়ক
হয়েছে। ‘আবদুল কাদেরের প্রতিশোধ’ গল্পেও শ্রেণি চরিত্রের কথা উঠে আসে। আর এই শ্রেণি হল
মুসলিম জনমানসের প্রতিছবি। ব্যক্তিকে অতিক্রম করে সাদিক যেন গোটা সমাজ মানসের কথাই
বলতে চান, তাই তিনি বহু চরিত্রের অবতারণা করেন। জোলেখা বিবি, আব্দুল কাদের, ছাত্তার সাহেব,
জৈগুন বিবি, ইয়াসিন, বদরুদ্দিন প্রভৃতি চরিত্রের বক্তব্যের মধ্য দিয়েই গল্প এগিয়ে গেছে। একটিসমাজের যেন ইতিবৃত্ত যেন লিখতে চান সাদিক –সেই সমাজের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ না থাকলে এই বর্ণনা সম্ভব নয় – যেটা পারেন নি হিন্দু কথাকাররা। তাই হিন্দু কথাকারদের লেখাতে মুসলিম সমাজ এলেও রক্তমাংস সহ মুসলিম জীবনের অন্দরমহল ও বহিঃমহলের স্পষ্ট ছবি ফুটে ওঠে নি – যা পেরেছেন সাদিকের মত অন্যান্য মুসলিম কথাকাররা। আব্দুল কাদেরের স্ত্রী জোলেখা বিবি। গল্পের শেষটা গড়ে উঠেছে মুসলিম উৎসব উপলক্ষে কোরবানীর দৃশ্যকে কেন্দ্র করে। তেমনি কে মসজিদের দায়িত্ব পাবে, কেন এই গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, চায়ের দোকানকে কেন্দ্র করে জটলা, ছাত্তার সাহেবের হজ যাত্রাকে কেন্দ্র করে নানা মন্তব্য ও আলোচনা স্থান পেয়েছে। শুধু তাই নয় ফকির মোল্লার দ্বিতীয় পক্ষের জেগুন নিঃসন্তান। নিঃসন্তান নারীকে কেন্দ্র করে মুসলিম নিয়ম লোকাচার নানা ফাঁদ ফন্দি, নারী বলেই জোলেখাকে সবসময় পদদলিত হতে হয়েছে তা যেমন উঠে এসেছে তেমনি ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে সমাজ মানসিকতার ছবিও ফুটে উঠতে দেখি। সামান্য অংশ তুলে ধরি-
“ইলিয়াস মৌলনা এই অঞ্চলের কেউ না। সবে বছর দুই হলো তিনি এখানে এসে বাসা গেড়েছেন।
তবে কী না মসজিদ কমিটি তাকেই এই মসজিদের ইমাম বানালো ? আর আব্দুল কাদের হয়ে
গেল মোয়াজ্জিন! নিজের উপরই থুতু দিতে ইচ্ছে হয় আব্দুল কাদেরের। ছাত্তার সাহেবের সাথে
ইলিয়াস মৌলনার কীসের এ্যাতো ভাব ! আব্দুল কাদের নিজের মনেই ছক কষে। ছক কষতে
কষতেই সে নিয়েত বেঁধে নামাজে দাঁড়ায়।“ (তদেব, পৃ. ৫৩ )
সাদিক কখনোই কাহিনিমালা গড়ে তোলেন না। গল্প তাঁর কাছে কাহিনির উৎসব নয়। কখনও তিনি গল্প বলেন ,কখনও গল্পের সঙ্গে গপ্প জুড়ে দেন। আপাত দৃষ্টিতে তা অবাস্তব মনে হলেও গল্পের মধ্যে
জড়িয়ে থাকে গভীর সত্য ও সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা। ‘করিম আলির রোশেনারা’ গল্পটিতে নানা
প্রসঙ্গ জুড়ে দিয়ে স্বপ্ন ও বাস্তবতার মেলবন্ধনে এক অন্যরাজ্যে পাঠককে তিনি নিয়ে যান।
একবিংশ শতাব্দীর জটিল তত্ত্ববিশ্বের মতোই তিনি গল্পে নানা রূপক, ধর্মীয় মিথ ও ইমেজের
মাধ্যমে পাঠককে এমন এক রহস্যজালে দাঁড় করান যেখানে থেকে পরিত্রাণ হতে বহু সময় লাগে। বলা ভালো সাদিকের গল্প উপন্যাস সাধারণ পাঠকের জন্য নয়। এ গল্পের প্রথমেই দেখা যায় রাতের
বিছানায় করিম আলি ও রোশেনারার কথোপকথনের মধ্য দিয়ে গল্প এক অবিশ্বাস্য পথে এগিয়ে
যাচ্ছে। পাঠক যখনই ভেবছেন এক ফ্যান্টাসির দিকে গল্প বোধহয় এগিয়ে যাচ্ছে তখনই তিনি
পাঠককে বাস্তবের মাটিতে নিয়ে আসেন। করিম আলির রোশেনারা ছাড়াও জমিলা বিবির প্রতি টান ছিল, তবে সমস্ত ত্যাগ করে সে এখন রোশেনারাকে নিয়েই বেঁচে আছে। গ্রামে ভোটের যে কোলাহল, ভোট নিয়ে গ্রাম্য পার্টির মধ্যে বিবাদ কোন্দল যেমন এসেছে তেমনি গ্রাম্য বাস্তবতার অনুপুঙ্খ চিত্র
পাই। তবে সমস্তকে অতিক্রম করে প্রধান হয়ে উঠেছে করিম ও রোশেনারার দাম্পত্য জীবন।
রোশেনারা আজ গল্প শুরু করেছে পীর দরবেশের। ফলে তাঁরা ভেসে যায় এক রূপকথার জগতে। যৌন জীবনে মিলিত হতে গিয়ে নানা বাধা, তা অতিক্রম করেও মিলিত হয়, রোশেনারা শারীরিক টান অনুভব করে। কিন্তু যৌনসুখ বলতে আমরা যা বুঝি তা নেই, সেখানেও তিনি পাঠকের মতিভ্রম ভেঙে দেন-
“করিম আলি আঁতকে ওঠে। পরক্ষণে ভীষণ রাগে রোশেনারাকে ঠেলা মেরে সরিয়ে দেয়। ঠেলা
খেয়ে রোশেনারা মেঝেতে গড়িয়ে পড়ে। সেখানেই চিৎ হয়ে শুয়ে করিম আলিকে পেটি দেখায়।

করিম আলি চেঁচায়, ’হারামজাদী মাগি’। রোশেনারা বলে ‘এসো’। করিম আলি একখণ্ড ভাঙা কাচ
নিয়ে রোশেনারার দিকে তেড়ে গেলে রোশেনারা কেমন কায়দায় করিম আলির থেকে কাঁচখন্ডটা
ছিনিয়ে করিম আলির মুন্ডুটা নিজের পেটের উপর চেপে ধরে বলে, ‘শোনো।‘
করিম আলি রোশেনারার পেটের ভেতর মাছের সাঁতার কাটা অনুভব করে।“ (সম্মোহন,দ্বিতীয়
মুদ্রণ, কলিকাতা লেটারপ্রেস, পৃ. ১০২)
আজকের আখ্যানবিশ্বের সবচেয়ে বড় শিল্প ছোটোগল্প। বাংলা ছোটোগল্পের যে রীতিবদল,
নতুনত্বের খোঁজ দশকে দশকে শুরু হয়েছিল তা আজ প্রবাহমান। রাজনীতির সংস্কৃতি বা সংস্কৃতির
রাজনীতি কীভাবে পাল্টে যাচ্ছে সেই প্রাককথন উঠে এসেছে আজকের গল্পে। কুহকের বাস্তবতা ও
জাদুবাস্তবের মাধ্যমে আজকের গল্পকাররা গল্পে প্রবেশ করেছেন। আধুনিক ছোটোগল্পে যেসব
নবীন লেখকরা এগিয়ে এসেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম সাদিক হোসেন। তিনি নির্দিষ্টি কোন কাহিনি
নিয়ে গল্প ফাঁদেন না। তিনি এলোমেলো জীবনস্রোতের মত গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যেতে ভালোবাসেন।
তেমনি সাদিকের গল্পে থাকে বহু উপকাহিনির সমাবেশ। এই উপকাহিনি গুলি নিয়েই তিনি গল্পের চর 
সত্যে উপনীত হন। বাংলা ছোটোগল্পের যে আবহমান পাঠক তারা যেন সাদিকের গল্প পড়তে গিয়ে
চমকে যান। বাস্তবের মধ্যে যে প্রচ্ছন্ন বাস্তবতা, স্বপ্ন- স্বপ্নভঙ্গের মধ্যে যে বাস্তবতা,
ইতিহাস, মিথ, লোককাহিনি নিয়েই তিনি গল্পে অবতীর্ণ হন।
‘ছুন্নতের দিনে মানুষজন ও অন্যান্য’ গল্প এক মুসলিম লোকাচারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ‘ছুন্নত’ হল মুসলিম বালকদের নুনুর অগ্রভাগ ছিন্ন করা , এতে সে সন্তান তখন থেকে প্রকৃত মুসলিম হয়, এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি অবশ্যই আছে, আঞ্চলিক ভাষায় একে বলে ‘খতনা’। এই ছুন্নত উপলক্ষে এক আনন্দ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। নজি মোল্লার ছেলের ছুন্নতকে কেন্দ্র করে এ গল্প পড়ে উঠেছে। এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে মুসলিম জীবনের রীতিনীতি, লোকাচারের বর্ণনা এনেছেন লেখক। নজি মোল্লার বাড়িতে ছিল শফি নামে এক যুবক। সে সুন্দর কোরান পড়তে পারত, প্রতিনিয়ত নামাজ পড়ত। শফির চমৎকার নামাজ পাঠেই মুগ্ধ হয়েছিল নজি মোল্লা। তাই নজি নিজের কন্যার সঙ্গে শফির বিবাহ দিতে চেয়েছিল। সে জন্য শফিকে সে মার্দাসায় ভর্তিও করে। কন্যা আমিনা জানতে পারে পিতার অভিপ্রায়। ফলে আমিনা ও শফি দুজনেই মেলামেশা করে। শফি ছিল দরিদ্র, ফলে নজি তাঁকে ঘর জামাই করতে চেয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম ধর্মজীবন ও লোকাচারে নানা পরিবর্তন এসে গেছে। সেই পরিবর্তনের স্রোত অন্যান্য গল্পকারদের সঙ্গে সাদিকও ফুটিয়ে তোলেন। আমিনা নামাজ পড়ত না, নামাজ না পড়ার জন্য পিতা মাতার কোন বাধ্যবাধকতা দেখা যায় না, তবে শফি আমিনার মধ্যে জাগিয়ে তুলেছিল ধর্মবিশ্বাস।
তেমনি মুসলিম জীবনে আদি যুগে মুসলিম নারীর ছবি তোলা নিষেধ হলেও সময়ের বিবর্তনে তা
অতিক্রান্ত হয়েছে। নজি মোল্লা জৈগুন বিবির ছবি তুললে সে প্রতিবাদ করে , কিন্তু নজির সে বোধ
ছিল না –“আমিনা আর কিছু জিগেস করতে যাবে আমনি নজি মোল্লা কোথা থেকে এসে জৈগুন বিবির ছবি তুলে ফেলে। এতে জৈগুন বিবি রাগ দেখিয়ে বলে, ‘তোমাকে মুই ন্যাংটো পোঁদে খেলতে দেকিচি নজি। এখন তুমি বড় হইচো। তোমার ছেলেয়েরাও লায়েক হইচে। কদিন পর মেয়ের বে দিতি হবে। আর মোসলমানদের যে ফটো তুলতি নেই, তা জানো না।“ (তদেব, পৃ. ৭১ ) আমিনা ও শফির বালক জীবনের প্রেমের চিত্রও রয়েছে। তাদের প্রেমের মাধ্যম হয়ে উঠেছে বাবুলাল।

‘প্রত্যাবর্তন’ গল্প সাজিদের মাতার মৃত্যুমুখ থেকে প্রত্যাবর্তন। সাজিদ যখন ভেবেছে মাতা বোধহয় মারা গেছে তখন ইসিজি রুম থেকে বেরিয়ে আসে নার্স সহ মাতা। এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে গল্প। গল্পের শুরুতে দেখা যায় কিছুদিন আগে একবালপুরে কাকার মৃত্যুতে কবর দিতে গিয়েছিল সাজিদ। সেখানেই পরিচয় হয় এলার সঙ্গে। এ গল্পে হসপিটালে চিকিৎসা ব্যবস্থার যে করুণ চিত্র তা যেমন আমরা পাই তেমনি রুগির সঙ্গে ডাক্তার / নার্সদের ব্যবহারের চিত্রও পাই। সরকারি হসপিটালগুলিতে দেখা যায় বেশি ভিড় মুসলিম শ্রেণির মানুষের। গ্রাম গঞ্জের মুসলিম মানুষকে নানাভাবে অপদস্ত হতে হয় এখানে, অর্থ থেকে শুরু করে শিক্ষার অভাবের জন্য। তেমনি চিকিৎসা ব্যবস্থায় প্রতি পদে কীভাবে শোষিত হতে হয় মানুষকে সে চিত্রও পাই। এই নঞর্থক বোধের মধ্যে আছে সাজিদ ও এলার প্রেমের চিত্র। এলাও গরিব, সাজিদ নানা সময়ে নানা উপহার তাঁকে দিয়েছে। তবে এলা মুখ ফুটে কিছু চাইতে পারে নি। মধ্যবিত্তের যে গ্লানি তা এলার মধ্যে যেমন আছে তেমনি আছে সাজিদের মধ্যে। আজ মাতা কলকাতার হসপিটালে ভর্তি। অনিস ছাড়া সাজিদ এ খবর কাউকে জানায় নি। বন্ধু প্রণবের কাছ থেকে ফ্ল্যাটের চাবি নিয়েছে, সেখানে এলার সঙ্গে যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হয়েছে অথচ মাতার অসুস্থতার কথা এলা বা প্রবণকে জানায় নি। আধুনিক প্রজন্মের এক মূল্যবোধহীনতা আমরা এখানে দেখতে পাই। তেমনি যৌনচেতনার কাছে সমস্ত বোধ ও সম্পর্ক যে ক্ষণিক সে দর্শনেও লেখক আমাদের নিয়ে যান। পরের দিন সাজিদ হসপিটালে এসে মাতাকে দেখতে না পেয়ে ক্ষণিক বিস্মিত হলেও পরে মাতাকে দেখতে পেয়ে আনন্দিত হয়। তবে এলা ফোন করলে মিথ্যা
কথা বলে। পুরুষের যৌন ধর্মের কাছে কোন ভালোবাসা বা বোধই যে স্থায়ী নয় তা যেমন দেখি তেমনি
সামান্য অর্থ বা ভালোবাসার জন্য নারীদের প্রতারিত হওয়ার চিত্রও দেখি –
“সাজিদ বাইরে বেরিয়ে আর দাঁড়ায় না। মা তবে বেঁচে আছে – এটা জানার পরও সে অসম্ভব
রকম শান্ত থাকতে পারে। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে একা একা হাঁটে। রাস্তাঘাট, গাড়িঘোড়া সব
কেমন স্বপ্নের মত মনে হয় তার। যেন তার আশপাশের পৃথিবীটার বাস্তবের কোন উপস্থিতি
নেই। এখুনি খোয়াব ভাঙলে তার আশপাশ সিনেমার পর্দার মত সরে যাবে। সে খালি নিজেকেই
অনুভব করতে পারে। এলা ফোন করলে ফোন কেটে দেয়। খানিকপর এলাকে এস এম এস লিখে
পাঠায়, আমি এখন পোল্যান্ডে। একটা কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের ভেতর। শুনেছিলাম এখানে
প্রচুর ইহুদী মারা হত। মারবার পর তাদের চর্বি গলিয়ে সাবান বানানো হতো, হাড় দিয়ে চিরুণি।
আমি নিশ্চিত যদি তাদের চামড়া দিয়ে কখনও ব্যাগ বানানো হয়ে থাকে, তবে আমি তোমার
জন্য সেই ব্যাগ নিয়েই ফিরব। তার আগে নয়।“ (তদেব, পৃ.-৪৭)
তাঁর ‘লিয়াকত আলির ঘুমের ভেতর’ গল্প একাধিক কাহিনির সমাবেশে গড়ে উঠেছে। গ্রামীণ রাজনীতি, গ্রামীণ মানুষ, শোষণ, লাঞ্ছনা ও প্রতিবাদের এক অন্তবয়নের জটিল সংবেদনশীল আখ্যান গড়ে উঠেছে। গ্রামে আজ এসেছে জুলুবাবু। গ্রামীণ মানুষের রাজনীতি সম্পর্কিত প্রথাগত ধারণাকে ভেঙে তিনি যেমন নতুন পথ দেখিয়েছেন তেমনি শোষণের নব কৌশল দেখিয়েছেন। মুসলিম জীবনের কাহিনি সাদিকের গল্পে প্রাধান্য পেলেও তা যেন ভিন্ন। সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ, আবুল বাশার, আফসার আমেদ, নীহারুল ইসলাম মুসলিম জনজীবনকেন্দ্রিক কাহিনি থেকে সাদিকের গল্পের তারতম্য খুব সহজেই চোখে পড়ে। এদিক থেকে সাদিক যেন সোহারব হোসেনের গোত্রজ গল্পকার। গ্রাম্য নেতা ছাত্তারকে আজ অপদস্ত করেছে জুলুবাবু। তেমনি ভেলুরার স্বামীকেও হত্যা করেছে। সাদিক সমাজ বিবর্তনের ছবি আঁকেন, মুসলিম জীবনের সমগ্র জীবন সহ প্রথাগত বিশ্বাস ভেঙে এগিয়ে আসার যে প্রচেষ্টা তা তুলে ধরেন। আর এই সব বিবর্তনের ছবি আঁকতে জাদুবাস্তবের আশ্রয় নেন। নৌকায় জুলুবাবুর সঙ্গে ভেলুয়ার সাক্ষাতের দৃশ্যে ঈশ্বর পাটনীর কথা মনে পড়লেও সাদিক সে কাহিনি লিখতে চাননি। সাদিক সমাজ বাস্তবতা ও পরিবির্তিত সময়ের দিকে নজর দিয়েছেন। তাই ভেলুয়া কৌশলে বলে-

“ধীরে ধীরে বলে কৈন্যা –শুন সদাইগর।
আমার কাছে না আসিবা ছ’মাসের ভেতর।।
এহার অন্যথা হৈলে বিষ করি পান।
নিশ্চয় নিশ্চয় আমি তেজিব পরাণ।।“ ( গিয়াস আলির প্রেম ও তার নিজস্ব
সময়, পৃ. ৮৮ )
তেমনি এ গল্পে রয়েছে রমজান- আসমার কাহিনি। রমজান যৌন মিলনে ব্যর্থ পুরুষ। আসমা আজ
জুলুবাবুর জন্য নিয়ে এসেছে জাপানি তেল। সেই তেলেই রমজান ফিরে পেয়েছে উদ্দীপ্ত যৌবন। একদিকে  শোষিত সমাজ, অন্যদিকে শোষক। একদিকে বুর্জোয়া সমাজ, অন্যদিকে শ্রেণির প্রাধান্য। জুলুবাবুরা শোষক, ভেলুয়া, বাদল, ছাত্তার ও আসমারা শোষিত সমাজের প্রতিনিধি। আজ জেগে উঠেছে ভেলুয়ারা, গ্রেফতার হয়েছে জুলুবাবু। আধুনিক গল্পকারদের আজ শধু গল্প বলে চলাই কাজ নয়। মনে পড়ে যায় হাসান আজিজুল হকের কথা- “.. গল্প লিখবো বলে এবং গল্পের কোনো একটা সংজ্ঞা মনে ঠিক করে নিয়ে আমি কখনোই গল্প লিখিনি। কিছু কাজ করতে চেয়েছি। নানা ভাবে নানা জনকে এই কথাটা আমি বলেছি যে, দেশকে নিয়ে, সমাজকে নিয়ে, সমাজের মানুষকে নিয়ে কিছু কথা আমার জমেছে, সেই কথাগুলো বলতে চাওয়াই আমার লেখা।“ (ছোটগল্পের বিনির্মাণ, তপোধীয় ভট্টাচার্য, অঞ্জলি পাবলিশার্স, পৃ. ১১৮ ) সেই বাস্তবের প্রতিবেদন উঠে আসে যেন গল্পে। তবে সেই প্রতিবদেন কৌশলে ব্যবহার করতে হয়। কখনও জাদুবাস্তবের আশ্রয় নিতে হয়। আজকের লেখকের কোথাও যেন একটা দায়িত্ব থেকে গেছে মানবসভ্যতার কাছে। তাই লেখককে কখনও গল্পেই লিখতে হয়-
“কালু উত্তর দিতে যাচ্ছিল। ছাত্তার তাকে থামিয়ে চেয়ার থেকেই জবাব দেয়, ‘ইডিওলজির কতা
বলছেন তো ! ইডিওলজি সবসময়ই বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া একটা চেতনা। দেখুন না, একজন
খালি গায়ে, লাঠি নিয়ে, হাঁটু অব্দি ধুতি তুলে বুর্জোয়াদের কথাই তো বলল। আবার আর একজন
স্যুট-বুট পড়ে গরিবদের কথাই বলছে।“ (তদেব, পৃ. ৯৪ )
মহাকাব্যের স্থান দখল করেছিল বাংলা উপন্যাস। মহাকাব্যের রস মানুষ পেতে চেয়েছিল উপন্যাসে।
আর সময়ের ব্যবধানে উপন্যাসের কাহিনিকে বিক্ষিপ্ত ভাবে পেয়ে চলেছি ছোটোগল্পে। তবে সাদিক
হোসেন কাহিনি নিয়ে ছোটোগল্প লেখেন না। লিখতে লিখতেই তা কাহিনি হয়ে ওঠে। সরস গল্পরস
সাদিকের গল্পে পাওয়া সম্ভব নয়। জীবনবোধে উৎসমূলে অগ্রসর হন সাদিক। এ জীবনবোধ একবিংশ
শতাব্দীর অবক্ষয়িত ভাঙাচোরা মূল্যবোধ। ভার্চ্যুয়াল ওয়ার্ল্ড, বিশ্বের বিকেন্দ্রীকতণ, আগ্রাসী
মানুষের অসহিষ্ণুতা , ছোটবিশ্বের মননজাত অভিজ্ঞতা সাদিকের গল্পে প্রাধান্য পায়। ছোট ছোট
মুহূর্ত, টুকরো টুকরো একাধিক ঘটনা দিয়ে সাদিক গল্পবলয় তৈরি করেন। এমনই একটি গল্প ‘আবু
বকরের চারপাশ’। মিথ, লোকায়ত জীবন, মুসলিম ধর্মজীবন সব মিলে যায় এ গল্পে। সাদিক এ শতকের গল্পকার, ফলে তাঁর গল্পভাবনায় পরিবর্তিত মূল্যবোধ প্রাধান্য পায়। তেমনি মুসলিম সমাজ যে
এখনও ধর্মবিশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসতে পারে নি তা প্রাধান্য পেয়েছে। তাই পুত্রবধূর ফোন আবু
বকর ধরলে বেজে ওঠে –“উুর, উরি বাবা, কী দারুণ”। তেমনি আসমা এসেছে আবু বকরের কাছে স্বামীর যৌনতা ফিরিয়ে আনতে। আসমার যৌন জীবনের ব্যর্থতা বড় হয়ে উঠেছে। আবু বকর নিজে নানা ওষুধ দিলেও সে যৌন সংসর্গ করেনি। নানা কৌশলে সে এড়িয়ে গেছে। তৃতীয় প্রহরে সহবাস করলে সন্তান গরিব, চতুর্থ প্রহরে সহবাস করলে সন্তান মূর্খ ও বোকা হবে বলে সে নিজেকে রক্ষা করেছে। বৃদ্ধ আবু বকরের দেহ যে সাড়া দেয় না তা নয়। আবুর নজর আসমার কমড়ের তাবিজের দিকে। কিন্তু সার্বিক যৌনতা তাঁর নেই – এই দোলাচলচিত্ততা বড় হয়ে উঠেছে। তেমনি আবু বকরের অনন্ত স্নেহ নাতি ফিরজের প্রতি। ফিরোজকে সে পুত্রবধূর সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখতে চেয়েছে নাতি খারাপ হয়ে যাবে বলে। আবু বকর আজ নাতিকে নিয়ে এসেছে পুকুর ধারে নিজের স্ত্রীর কাছে। সেখানে ছিল আবু বকরের স্ত্রীর কবর। প্রথমে আবু বকরের কথায় জসীমউদ্দিনের ‘কবর’ কবিতার কথা মনে এলেও সাদিক সে প্রসঙ্গ যেন কৌশলে এড়িয়ে যান, এখানেই তাঁর স্বতন্ত্রতা। গল্পের নাম ‘আবু বকরের চারপাশ’। অর্থাৎ আবু বকরের চারপাশের পারিপার্শ্বিক জীবন কীভাবে বদলে যাচ্ছে সেটাই লেখকের লক্ষ। পুত্রবধূ ফোনে ব্যস্ত, আসমা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে আবার আবু বকর নাতিকে নিজস্ব ঐতিহ্যে বড় করে তুলতে চাইছে। এই একবিংশ শতাব্দীর ভার্চ্যুয়াল ওয়ার্ল্ডে জটিল তত্ত্ববিশ্ব কীভাবে পাল্টে যাচ্ছে, মানুষ কীভাবে সমাজকে অতিক্রম করে বেরিয়ে আসতে চাইছে তা যেমন উঠে আসে তেমনি ধর্মীয় প্রথা আবার টেনে ধরছে সেই দ্বন্দ্বগুলিই বড় হয়ে উঠেছে।
‘কেবল রাধার পরে খাওয়া আর খাওয়ার পরে রাধা...”। মুসলিম সমাজ অর্থনৈতিক দিক থেকে স্বাবলম্বী হলেও গ্রামীণ জীবনের মুসলিম সমাজের একটা বিরাট অংশ এখনও অর্থনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে। শিক্ষার আলো, আধুনিকতার ছোঁয়া সেখানে পৌঁছায় নি। ঘর সংসার, স্বামী সেবা ও সন্তান পালনের মধ্য দিয়েই যেন কেটে যায় নারীর সমস্ত জীবন। আফসার আমেদের ব‘অন্তঃপুর’ উপন্যাসে আমরা দেখেছিলাম নারীরা কীভাবে অন্দরমহল থেকে বঞ্চিত, লাঞ্ছিত হচ্ছে।
পুরুষশাষিত সমাজের কাছে কীভাবে আসমাদের ইচ্ছাকে বলি দিতে হচ্ছে। সাদিক হোসেন ‘জন্ম’ গল্পে গ্রামীণ জীবনে নারী যন্ত্রণার ইতিবৃত্ত তুলে ধরেন। অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারগুলিতে
বিশেষ করে মুসলিম পরিবারগুলিতে সন্তান জন্ম যেন ছেলেখেলা। এদের যে দায়িত্ব, কর্তব্যবোধ নেই
তা নয় দারিদ্রতাই তাদেরকে টেনে ধরে। সন্তান জন্ম যেন নিছকই এক পালাকীর্তন। প্রফুল্ল রায়ের
‘সাতঘরিয়া’ গল্পে একটি নারীকে বেঁচে থাকতে বারবার বিবাহ করতে হচ্ছে, দারিদ্রতার কারণে বিবাহ
ভেঙে যাচ্ছে। আবার অমর মিত্রের ‘হস্তান্তর’ গল্পে নারীটি চারবার স্বামী পরিবর্তন করেছে

শুধুমাত্র বেঁচে থাকতে। সাদিকের গল্পে ফুটে উঠেছে রহিমা নামে এক নারীর যন্ত্রণাকাতর দগ্ধ
জীবনের মর্মবেদনা। স্বামী ইউনুস পেশায় দর্জি, নিম্নবিত্তের সংসার। তবে পরস্পরের প্রতিই
ভালোবাসা আছে। রহিমা আজ সন্তান সম্ভবা। নিম্নবিত্ত মুসলিম জীবনে সন্তান জন্ম যেন এক
সাধারণ ব্যাপার। তাই রহিমা সন্তান প্রসব করেও মনে হয়েছে-
“কিন্তু অপত্যটিকে দেখে রহিমার মনে হয়, শিশুটির জন্মানো বুঝি এখনও শেষ হয়নি।
জন্মানোর প্রক্রিয়াটি বুঝি চলছেই। সে ইউনুসের দিকে তাকায়। ইউনুসকেও দেখে তার মনে
হয়, এই মানুষটিরও জন্মানো বুঝি চলছেই। নিজেকেও তার আংশিক লাগে। রহমজান শিশুটিকে
রহিমার কাছে এনে দুধ খাওয়াতে বলে। দুধ খাওয়াতে খাওয়াতে রহিমার আচমকা খেয়াল হয়,
সারা জিন্দেগি ধরে তবে কি খালি জন্মাতেই হবে ? তবে কি পুরোপুরি জন্মানো শেষ হওয়ার
আগেই ইন্তেকাল আসে ?” (তদেব, পৃ. ৫২ )
সাদিক হোসেন এই সময়ের অন্যতম গল্পকার। হ্যাঁ তাঁর গল্প সংকলনগুলি পড়েই বলছি। গল্পের ভাষা
বিবর্তন, নিজস্ব গদ্যরীতি, আঙ্গিকের অভিনবত্ব ও শিল্পরীতিতে সাদিক যথেষ্ট শক্তিশালী।
‘বুলবুল ও একটি হাঁসের গল্প’ পড়তে গিয়ে প্রথমেই মনে পড়বে গল্পের আঙ্গিকের কথা। এই রকম
প্লটকে এমন আঙ্গিকে সাজিয়ে তোলা সত্যি অভিনবত্বের দাবিদার। সাদিক প্রয়োজনে
জাদুবাস্তবতার আশ্রয় নেন। আঁকড়া বাস্তবতাকে সে কল্পনার মোহিনীজালে এমন করে পরিবেশন
করেন, যাতে স্বতন্ত্রতা সহজেই লক্ষ করা যায়। এ গল্প গড়ে উঠেছে বুলবুলের পিতার মৃত্যুকে
কেন্দ্র করে। ‘গল্প’, ‘প্রতিবাদ’ , ‘গোপনীয়তা’ , ‘রাজা’ ও ‘স্বপ্ন’ এই পরিচ্ছেদ গুলির মধ্যে দিয়ে
সাদিক পাঠককে ধূসর অস্তিত্বের জগতে নিয়ে যান। গোপন পাঠের নীরব ভাষ্য বলে এমন তো আগে
পড়িনি। দারিদ্রের সন্তান বুলবুল, পিতার মৃত্যুতে সে দিশেহারা, মাত্র আট পৃষ্টার গল্পের মধ্যেই
লেখক যেন এক বিরাট সময় অঙ্কন করেন। মাতার অবৈধতা, নিজের যৌবনে প্রবেশ, বিবাহের
আকাঙ্ক্ষা, বেঁচে থাকার জন্য লড়াই সংগ্রাম ও অর্থ কিছুই যেন বাদ যায় নি। পিতার কবরে আজ
আত্মমগ্ন বুলবুল। জাগতিক বোধ থেকে লেখক যেন বুলবুলকে অন্য জগতে নিয়ে যান – এটিই সাদিকের কৌশল। গল্পের শেষে ‘লেখকের মন্তব্য’ পাঠকের বাড়তি পাওয়া। এতগুলি পরিচ্ছেদকে তিনি যেন মন্তব্য দ্বারা একটি সুতোয় বেঁধে দিতে চান। আর সে মর্মভাষ্য উঠে আসে আরও জটিল মনস্তত্ব –
“ তার হাতে কাদামাটি, শুকনো মাটি লেগে রয়েছে। সেই সময় হয়তো বা হাঁসটাও ওসমান চাচার
পুকুর থেকে ডাঙায় উঠে পাখনা ঝাপটালো। পাখনা থেকে টপটপ করে নেমে আসা পানিতে ভিজে
গিয়ে পোয়াতি পিঁপড়েরা উপরে উঠে এল। বুলবুল তবু প্রকৃত পিতার লাশ বলে দু’হাত উঁচু করে
সাংঘাতিক পুরুষের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে।“ (তদেব, পৃ. ৮০ )

( ২ )

সাদিক হোসেন কখনও নিজেই গল্পকথক, গল্পের ব্যাখ্যাকার এবং চরিত্রের বিশ্লেষণে গভীর
মনোযোগী। তাঁর গল্প নদীর স্রোতের মত এগিয়ে যায় না, জল যেমন ঢালু প্রদেশে গড়িয়ে যায় তাঁর
চরিত্র তেমন নয়, তিনি চরিত্রকে আগাড়োরা জানেন, সেই কথনই তিনি পাঠককে শোনাতে চান। ফলে গল্পের বাঁধন নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে বদ্ধ। তিনি যেন গল্পের শেষটা জেনেই গল্পে নেমেছেন।
‘’রিফিউজি ক্যাম্প ‘ (২০১৭ ) গল্পগ্রন্থটি উৎসর্গ করেন কথাকার অমর মিত্রকে। প্রথম গল্প
‘মোকান্মেলের অমিতাভ’। লেখক প্রথমেই জানিয়ে দিয়েছেন এই মোকান্মেলকে তিনি চেনেন বলেই
গল্পে প্রবেশ করেছেন। এমনকি পাঠকের থেকে বেশি চেনেন বলেই সে গল্প পাঠককে শোনাতে চান।
তবে তিনি সবটা জানেন না। আর তা জন্যেই গল্প শোনাতে চান –“আর জানি না বলেই তার কান্নার
হদিস করতে গিয়ে, যখনই ধন্দে পড়েছি, আমি গল্পের ফাঁদ পেতে ফেলেছি। এতে অবশ্য আপনাদের কিছু যায় –আসে না, কেন –না আপনারা তো জেনে বুঝে একটা গল্পই পড়তে চলেছেন।“ (রিফিউজি ক্যাম্প, অভিযান, পৃ. ৯ ) সেই মোকান্মেলের জীবনবৃত্তান্তের কথা তিনি শোনাতে চেয়েছেন। সে বৃত্তান্ত
এখানে শোনানোর অবকাশ আমাদের নেই। আগ্রহী পাঠক পড়ে নেবেন। এ গল্প একবিংশ শতকের
যুবসমাজের ধ্বংস হওয়ার গল্প। মোকান্মেল কলেজে প্রবেশ করেই ছাত্র রাজনীতিতে প্রবেশ
করেছিল। সেখানে থেকে বেরিয়ে বাবার পেশায় প্রবেশও করেছিল কিন্তু সময়ের রহস্য জাল কীভাবে
তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংস করে দিচ্ছে সেই কথা লেখক শোনাতে চান। সেই সঙ্গে লেখক জুড়ে দিয়েছেন
সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের আন্দোলনের প্রসঙ্গ। একটি রাজনৈতিক দলের পতনে কীভাবে অন্য একটি
রাজনৈতিক দলের উত্থান ঘটছে। এমনকি সে পরাজিত দলের প্রতিনিধি হওয়ায় কীভাবে অত্যাচারিত
হচ্ছে। তবে গল্পের নাম ‘মোকান্মেলের অমিতাভ’ কেন ? একদিন আশিস বাবু বলেছিল আর্নেস্ট ব্লখ
ই ভারতবর্ষ ও চিনের মার্কসবাদীদের আদর্শ নেতা হওয়া উচিত। কেননা রাজনীতির ক্ষেত্রে একটি
ভিশন বা ইউটোপিয়া প্রয়োজন। কিন্তু মোকান্মেলের ইউটোপিয়া ছিল অমিতাভ বচ্চন। সে বাথরুমে
গিয়ে স্নানের সময় অমিতাভের ডায়লগ আওরায়। লেখক মোকান্মেলের জীবনবৃত্তান্ত আমাদের
শুনিয়েছেন।

 বলা ভালো মোকান্মেল চরিত্রে পিছন থেকে আলো ফেলেছেন। আলোকশিল্পী যেমন আলোর রেখা ফেলে মঞ্চের কুশিলবদের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে নিয়ে যান লেখকও তেমনি নিজস্ব
বিন্যাসে মোকান্মেলকে এক প্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছেন। পার্টি পরাজিত হয়েছে, তাঁর চাকরিও হয়
নি, পিতার পেশাও ঠিক সে আয়ত্ত করতে পারে নি, এখন হয়ত তাঁকে অন্য পথ খুঁজে নিতে হবে, সে
পথের সন্ধান বোধহয় গল্পকারই জানেন !

‘ললিপপ লাগিলু’ এক রাজনৈতিক মতাদর্শের গল্প, তবে তা লেখকের রাজনৈতিক
মতাদর্শ নয়। বর্তমান পরিস্তিতি, সময়, রাজনৈতিক বিশ্বাস, অধঃপতন সব মিলেমিশে রয়েছে এ
গল্পে। আলতাফ মোল্লা এই মন্দা বাজারেও সিপিএম থেকে ভোটে জিতেছে। তাঁর চেতন অবচেতন সত্তা নিয়েই এ গল্প। আসলে চরিত্র তো লেখকের মানস সন্তান। তাই লেখক তাঁর যাবতীয় ধ্যান ধারণা
ব্যক্ত করতে চান চরিত্রের মধ্য দিয়ে। সাদিক হোসেন এক বুদ্ধিদ্বীপ্ত গল্পকার। তাঁর কাছে গল্প
মানে কাহিনির উৎসব নয়। ছকের বাইরে যে জীবন অথবা যে জীবনের নানা অলিগলি সম্পর্কে
আমাদের ধারণা নেই সেখানেই তিনি আলো ফেলতে চান। আর সে আলো ফেলাটা একান্ত ভাবেই সাদিক হোসেনের নিজস্ব। ফলে তাঁর গল্পের সঙ্গে অন্য গল্পকারকে মিলিয়ে পড়া যায় না। এ গল্পে
আলতাফের সমস্ত পরিচয় দিয়ে তিনি পাঠককে জানালেন –“যা হোক, এইসব আলবাল কথা তেমন
কোনো ইমপর্টেন্ট নয়। গল্পটাকে কোথাও থেকে একটা শুরু করতে হবে, তাই বলা। বুদ্ধিমান পাঠক
উপরেরটুকু স্কিপও করে যেতে পারেন। তবে নীচেরটুকু খাঁটি। ওখানে টুইস্ট আইল রাত্তিরবেলা।

এক্কেবারে চুপকে চুপকে।“ ( তদেব,পৃ. ২০ ) এরপর আলতাফের চেতন –অবচেতন জগতে পাঠককে তিনি নিয়ে গেছেন। আলতাফের যৌনসত্তা, নিজের সম্পর্কে ধোঁয়াসা মনোভাব, নিজের মধ্যেই দ্বন্দ্ব,
জীবন সম্পর্কে এই নিগূঢ় উপলব্ধি, এইসব ফুটে উঠতে দেখি গল্পটিতে। আজ পার্টি অফিসে আলতাফ
মোল্লা কার্ল মার্কসের বই নিয়ে বসেছে। জীবনের প্রকৃত সত্য কী অথবা জীবনের নিরপ্রেক্ষ সত্য
কোনটি সেই দর্শনে লেখক চরিত্রকে পৌঁছে দেন। আজ রাজনৈতিক জীবনে পরিবর্তনের দিন, সে
সিপিএম এর কাউন্সিলার হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দেখতে চেয়েছিল চলন্ত বাস তাঁকে ভিজিয়ে দেয় কি না ।
কিন্তু বাস আসার আগেই সে ফুটপাতে উঠে এসেছে। দর্শন অপেক্ষা জীবনের নিগূঢ় সত্য তাঁর কাছে
প্রধান হয়ে উঠেছে। দর্শন জীবনের জন্ম দেয় না, জীবনই দর্শনের যাত্রাপথ নির্মাণ করে দেয়, সেই
সত্যে লেখক নায়ককে পৌঁছে দিয়েছেন।

সাদিকের গল্পপাঠে অন্য এক জীবন সত্যের মুখোমুখি
পাঠক দাঁড়ান। তাঁর গল্পপাঠের জন্য এক মননশীল পাঠকের প্রয়োজন। তিনি পাঠককে সবসময় এক
আবিষ্কারে মগ্ন রাখেন। প্রচলিত গল্প ছক কোথায় যেন হারিয়ে যায় সাদিকের গল্প পাঠে। আসলে
আখ্যান ভুবনে তিনি এমন এক কৌশল অবলম্বন করেন যেখানে গল্পসত্য থেকে এক নিজস্ব আখ্যান
গড়ে ওঠে। পাঠকের বহুমুখী প্রবণতাকে তিনি এক পরিসর থেকে অন্য পরিসরে নিয়ে যান। আজ উত্তর আধুনিক বিশ্বে লেখকের তৈরি আখ্যানকে সম্পূর্ণ মেনে নিতে হবে এমন কোন নির্দিষ্ট নিয়ম নেই, পাঠক গল্পপাঠেই এক নিজস্ব বিনির্মাণের জগৎ গড়ে নেবেন। তাই ‘হান্টারের হিরোনি এবং
উলটোটাও’ গল্পে কিছু তথ্য পরিবেশনের পর, গল্পের সূচিমুখ গড়ে দেবার পর পাঠককে এক গভীর
সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেন –
“এই গল্পটা লেখার আগে অবধি আমি মনে করতাম, গল্পকারের অবস্থান পাঠকের
অবস্থানের থেকে কিছুটা উপরে। কিন্তু গল্পকার প্রায় সবসময় ছলেবলে এই Hierarchy –
টাকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে যাতে পাঠক হীনমন্যতায় না ভোগে। কৌশল হিসেবে সে পাঠকের
সঙ্গে বিভিন্ন চালাকির খেলা খেলে। কখনো –সখনো সে পাঠকের সেইসব খেলায় জিততেও দেয়।
পাঠক ভাবে, আম্মো, কী দিলুম। কিন্তু মজা হল, পুরো ছকটাই তো আসলে লেখকের তৈরি।
নিয়মগুলো তারই বানানো !” (তদেব, পৃ. ২৪ )
হ্যাঁ লেখক নিজেই ছক তৈরি করেন। যা তাঁর নিজস্ব ও শৈলীগত দিক থেকে স্বতন্ত্র। এ গল্প গড়ে
উঠেছে হান্টার ও হান্টারের পিতা আসগার আলিকে নিয়ে। সেই কিসসাকে লেখক চারটি পরিচ্ছেদে
সাজিয়েছেন। সেগুলি হল – বুলবুলিদের কাছে বলা হান্টারের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় গল্প। প্রতিটি
পরিচ্ছেদের সূচনাই এক বাক্য দিয়ে –“আসগার আলির বারোটা বেজে গেছে।“সেই বারোটা বাজার
কাহিনিই লেখক শোনাতে চেয়েছেন। হান্টারের ব্যান্ডপার্টি, সে দলের হিরোনিকে নিয়ে গল্প শুরু হলেও
গল্পের আসল সত্য হান্টারের পিতা আসগার আলির অসুস্থতা। জীবন শয্যায় সে আজ অন্তিম লগ্নে
পৌঁছে গেছে। ফলে জাগতিক জীবনের সব বোধ লুপ্ত হয়েছে। হান্টারের কোন যুক্তি আজ আর টেকে না।
কেননা জীবনের কাছে অন্ধ স্নেহের কোন মূল্য নেই। সাদিক গল্পে বারবার পশু পাখি এনে এক নতুন
ক্যানভাস গড়ে তোলেন। গল্পেও এনেছেন খরগোশকে। এ খরগোশও যেন মৃত্যুচেতনার বার্তাবাহী।
হিরোনি আজ আসগার আলিকে দেখতে এসে সেই খরগোশের মাংস রান্না করে খেতে চেয়েছে। এই
খরগোশের বিদায়ই যেন জানিয়ে দিচ্ছে আসগারের দিন শেষ, এবার সে বিদায় নেবে।

‘হুল্লা লিব্রা’ সময়ের গল্প। সময়ের সাথে ধর্মীয় বিশ্বাস,
সরাকারি কাজের অপদার্থতা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। আবদুর রহমানের ছিল ঘড়ির দোকান।
নিলুফার সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয় নাটকীয় ভাবে। গল্পের নাটকীয়তা আরও বৃদ্ধি পায় যখন ভোটের লিস্টে
নিলুফার বাবার নাম হিসাবে থেকে যায় আবদুর রহমানের বাবার নাম। এই নিয়ে শুরু হয় হাসাহাসি।
মইনুদ্দিন হাজি ধর্মীয় লোক। কিন্তু ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিনি যৌনরস পিপাসা চরিতার্থ করতে
চেয়েছেন। মইনুদ্দিন হাজির যৌবন চলে গেলেও এই ঘটনাকে সামনে রেখে তাঁর গোপন ইচ্ছা অনেকটাই ধরা পড়ে। তেমনি তিনি জানান মানুষের মৃত্যু হলে কবরে সবাই উপস্থিত হয়, সেই নিয়মে মানুষের জন্ম দেখাটাও অন্যায় নয়। তেমনি আছে সময়ের বিবর্তনের চিহ্ন। মোবাইল এসে যাওয়ায় ঘড়ির মূল্য অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। তেমনি প্রথমে মোবাইলে বিভিন্ন ক্যাফ থেকে গান নিতে হোত সে চিত্রও দেখি। গল্পের পরিণাম একটু নাটকীয়। আবদুর রহমানের বাড়িতে গোপনে ছবি তুলতে গেছে
ক্যামেরাম্যান। গোপনে নিলুফার ছবি তুলতে গিয়ে ধরা পড়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত সেই ছবি দেখেছে
আবদুর রহমান। আবদুরের প্রেমে নিলুফার পড়েছিল অপ্রত্যাশিত ভাবে। একদিন পাখির বাচ্চা গাছে
উঠিয়ে দিতে উঠেছিল আবদুর রহমান, তখন তা নিচ থেকে দেখেছিল নিলুফার, আর আজ নিলুফার
সন্তানকে সেই গাছে উঠেই দেখেছে আবদুর রহমান। কেননা ক্যামেরাম্যান মেকিয়াভেল্লিকে ক্যামেরা
দিয়ে দিলে তা নিয়ে সে গাছের ওপর উঠে গিয়েছিল। এ পৃথিবীতে একটি সন্তানের জন্মকে কেন্দ্র করে
যে কত ঘটনা ঘটে, তবুও সন্তানের জন্ম হয় – সেই সত্যে লেখক উপনীত হয়েছেন। আর তখনই
আমাদের মনে আসে জীবনানন্দের সেই পংক্তি –“সন্তানের জন্ম দিতে দিতে / যাহাদের কেটে গেছে
অনেক সময় / কিংবা আজ সন্তানের জন্ম দিতে হয় / যাহাদের ; কিংবা যারা পৃথিবীর বীজক্ষেত্রে
আসিতেছে চলে / জন্ম দেব – জন্ম দেবে বলে ; /তাদের হৃদয় আর মাথার মতন / আমার হৃদয় না কি ?”
সাদিকের গল্পে অ্যাবসাডিটি যেমন থাকে তেমনি সংবাদ পরিবেশনের ঢঙে কতগুলি ঘটনাকে
একসঙ্গে জুড়ে দেন। এই ঘটনার কোলাজ থেকেই তিনি গল্পের অন্তর্গত সত্যে পৌঁছে যান। আসলে
কাহিনির সমান্তরাল বিন্যাস বলতে আমরা যা বুঝি তা সাদিকের গল্পে অনুপুস্থিত। এলোমেলো
বিন্যাসে আখ্যান এগিয়ে গেলেও গল্পকে তিনি অযথা জটিল করে তোলেন না। আসলে তিনি পাঠককে
একটি সত্যে পৌঁছে দিতে চান। যেখান থেকে পাঠক নিজেই একটি সত্য আবিষ্কার করে নিতে পারেন।
‘এই, এখানে’ গল্পে সেই অ্যাবসাডিটি, এলোমেলো ঘটনার বিন্যাসে গল্প এগিয়ে গেছে। রুকসনা ও এক
স্টোরিটেলারকে সামনে রেখে তিনি গল্পের আখ্যান গড়ে তোলেন। গল্পের তত্ত্ব বা সাহিত্যের তত্ত্ব
সাদিকের গল্প থেকে আবিষ্কার করা খুব বেশি কঠিন নয়। স্টোরিটেলার যতবার তলস্তয়ের ‘Crime
and punishment’ পড়েন ততবারই দেখেন রাসকলনিকভ সেই সুদখোর বুড়িকে হত্যা করছে। এই হত্যার
বিরোধী ছিলেন স্টোরিটেলার –“এই রিপিটেশন একধরনের পলিটিক্যাল স্টান্ট। আর আমি এর
বিরোধী।“ ( তদেব, পৃ. ৫৩ ) ফলে তিনি তাঁর গল্পকেই পাল্টে ফেলেন। কেননা তিনি শিল্পী। আর শিল্পী
সর্বদাই এক সত্য থেকে অন্য সত্যে যাত্রা করে। রুকসনার এক জীবন এ গল্পে আমরা পাব। তাঁর
জীবনের গল্প সে স্টোরিটেলারকে লিখতে বলেছিল। সে টউশনি করে, ফিরতে রাত হয়, এক ছেলে তাঁকে ইভটিজিং করে। বাড়ি ফিরে চেতন ভগত পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে যায়। তাঁর পিতা অসুস্থ, এখন আর হকারি করতে পারে না। মধ্যবিত্ত জীবনের সংসার, ফলে রুকসনার সব ইচ্ছা পূরণ হয় না।

আপাত অর্থে মুসলিম জীবন বলতে আমরা যা বুঝি তা সাদিকের
গল্পে অনুপুস্থিত। আসলে গল্প গল্পই। তাঁর আবার হিন্দু মুসলিম ভাগ কী ! তবুও লেখক একসময়
নিজ সমাজের প্রতিনিধিত্ব করেন। আর কেনইবা করবেন না, যে জীবন পাঠকের কাছে অজানা। আবার কিছু লেখক জীবনটাকে অতিক্রম করে গল্পই লিখতে চান। যেখানে গল্পই শেষ কথা, নিজ সমাজ, স্বজাতি বড় কথা নয়। এই দ্বিতীয় ভুবনের আখ্যানকার সাদিক হোসেন। সাদিক গল্পকে অনেক সময় পাঠকের হাতে ছেড়ে দেন আবার গল্পের বন্ধনকে নিজের হাতে নিয়ে আসেন। আসলে তিনি পাঠককে একটি পরিসর দেন। ক্ষণিক অবসরের পরে সেখানে থেকেই আবার নিজের সত্তায় চলে আসেন। কেননা তাঁর কাছে লেখক পাঠকের বোঝাপড়ার মাত্রার ওপরে গল্পের সার্থকতা নির্মিত হয়। তাই ‘তুঘলক’ গল্পে ভারসাম্যহীন তুঘলকের সামান্য পরিচয় দিয়েই পাঠককে এক তত্ত্বকথায় নিয়ে যান –
“তবুও আমাদের খেয়াল রাখা জরুরি, গল্প এমন এক আর্টফর্ম, যেখানে সাদা কাগজের উপর
কালো অক্ষর ছাড়া আর কোনো কিছুরই বাস্তবিক উপস্থিতি নেই। সবটাই কল্পনা। ফলে
পাঠক প্রথম থেকেই লেখকের দাবিগুলোকে সন্দেহ করতে থাকে। অন্যদিকে লেখক তার
দাবিগুলোকে জোরদার করতে এমন ছকে গল্পকে বাঁধেন যাতে মনে হয় তার সৃষ্ট চরিত্রগুলো
কোনো না কোনো ভাবে তার ব্যক্তিঅভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছে। যেন লেখকের কল্পনা
অতটা কাল্পনিক নয়, এটাই লেখক প্রমাণ করতে চান।“ (তদেব, পৃ. ৫৭ )
এক আত্মভোলা মানুষ এই তুঘলক। তাঁর পিতার নাম খালিদ, তবে সে বিল্লু খালিদ নামেই পরিচিত। এ
গল্পেও লেখক নানা ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। আসলে তিনি পারিপার্শ্বিককে সামনে রেখেই আসলে
জগতে চলে যান। আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে সেসব বিবরণের প্রয়োজন কী ? কিন্তু সময় ও
পরিসর নিয়েই তো গল্প। ফলে চরিত্রকে সেই পরিসরের মধ্যে ডুবিয়ে দিতে চান। তুঘলক এবার পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। কিন্তু সে পুলিশের প্রশ্নের উত্তরে যা বলেছে তা লেখকের ভাষা অনুসারে প্রায় ম্যাজিক রিয়্যালিজমের মত। সাধারণ মানুষের ওপর পুলিশের অত্যাচারের এক মর্মকাহিনি তিনি
লিখতে চান। আর তা ফুটে ওঠে তুঘলককে কেন্দ্র করে। পুলিশের নিপীড়ন দেখিয়ে দিয়ে লেখক আরও স্পষ্ট করে ঘোষণা করেন –“এতক্ষণে তুঘলককে আমরা প্রায় তার ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে
একজন তুঘলক অর্থাৎ পাগলগোছের কিছু এবং অফিসারকে ধান্দাবাজ মায় শিক্ষিত বলে ধরে নিয়েছি।
এবার ফাঁকফোকরের দিকে নজর দেওয়া যাক।“ (তদেব, পৃ. ৬৩ ) শ্রেণিশত্রুকে পরাজিত করতে গিয়ে আজ নিজেকেই পরাজিত হতে হয়েছে। আসলে এটাই আজ সত্য। পুলিশের দৃষ্টি পোকেটমারের দিকে কিন্তু যারা হাজার টাকা তছনছ করে দিচ্ছে ব্যাঙ্ক বা অন্য সংস্থা থেকে, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব
প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে শোষণ করছে, সেখানে পুলিশ উদাসীন। লেখকের ব্যঙ্গ এখানেই।

( ৩ )

একজন লেখক সবসময় বিপন্ন সময়, বিপন্ন মানুষের আত্মকথা নিয়ে কলম ধরবেন। আজ গোটা
ভারতবর্ষই এক বিভীষিকার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। সরকারের নানা নীতিতে সাধারণ মানুষ আজ
বিপর্যস্ত। এই অন্তঃসার সময়ে দাঁড়িয়ে একজন লেখক মহাভারত লিখতে বসলে হত্যালীলাই যে
প্রধান বিষয় হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বলা হয় ‘যা নাই ভারতে তা নাই ভারতে’। অর্থাৎ
যা মহাভারতে নেই তা ভারতবর্ষে নেই। সেই ভারতবর্ষ আজ কোন পথে চলেছে ? ক্ষুধা, অন্নের
হাহাকার, যন্ত্রণাদীর্ণ ভারতবর্ষে আজ কোন নতুন মহাভারত লেখা হবে ? যেখানে লেখকের বাক্‌
স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছে, লেখক নিজেই রাজনীতির দলদাসে পরিণত হয়েছে , লেখক নিজেই
অর্থাভাবে বিপন্ন সেখানে জাতিকে তিনি কোন পথ দেখাবেন। বর্তমান সময়ের ওপর এক চাবুক
হেনেছেন লেখক ‘হারুর মহাভারত’ গল্পে। এ নামেই ‘আজকাল’ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর
একটি গল্পসংকলন। সাদিক হোসেন নিজের আখ্যান পরিকল্পনা করেছেন সচেতন ভাবেই। নিজের
চারপাশ কীভাবে বদলে যাচ্ছে তা দেখেছেন। তেমনি আবহমান কালের শিল্পের সঙ্গে পরিচিত হয়েই
নতুন আখ্যানে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেছেন। ‘কি লিখতে চাই’ শীর্ষক জবানবন্দি থেকে তাঁর ভাষ্য
শুনে নেওয়া যেতে পারে –
‘’আমি আমার চারপাশের সময়কালকে কতটুকু বুঝতে পারি ? আমরা চারপাশের মানুষজনকে
কতটুকু জানি ? কোন কোন অক্ষর, শব্দ, প্যারাগ্রাফের মাধ্যমে আমি তাদের ব্যক্ত করতে
পারব ?
কিংবা আমি কি সত্যিই আমার চারপাশের মানুষজনকে ব্যক্ত করতে চাই ? নাকি এতদিনে
আমি গল্প-উপন্যাস পড়ে যতটুকু বুঝতে পেরেছি, যতটুকু এই মাধ্যমটির শিল্পকলা সম্পর্কে
জেনেছি, সেই অনুয়ায়ী আমি আমার লেখা লিখতে চাই ?
তবে কি আমি ‘আমার লেখা’ বলতে বোঝাতে চাইছি এই মুহূর্তে সাহিত্যের শিল্পকলা সম্পর্কে
আমি কীরকম ধারণা পোষণ করছি এবং কোন কোন চরিত্রের মাধ্যমে কীভাবে তাকে ব্যক্ত
করতে পারছি – তার একটা মিথোস্ক্রিয়া ?’’ ( শারদীয় কথাসোপান, ১৪২৪, পৃ. ১২৯ )
এই ‘মিথোস্ক্রিয়া’কে লেখক নান্দনিকতার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন। হারু এক মহাভারত লেখার
পরিকল্পনা করে। সে শুধু টেবিলে বসেছে। কিন্তু কেমন করে সে মহাভারত লিখবে ? লেখার ভঙ্গিমা
ব্যতিত তো তাঁর কিছুই নেই। সংসারে নিত্য অভাব বিদ্যমান। ইতিমধ্যেই সে সঞ্চিত কিছু অর্থ
পেয়েছে। তা দিয়ে ক্ষুধা নিবারণ করে গ্রন্থ লিখতে চেয়েছে। কেননা পেটে ক্ষুধা নিয়ে মানুষের
আনন্দের কাব্য লেখা সম্ভব নয়। অথচ ক্ষুধার সত্যই যেন তাঁকে আঁকড়ে ধরে আছে –
“ক্ষুধা কি রূপ, না রস ? ক্ষুধা কি শুধুমাত্র শারীরিক ? সর্বদা বিদ্যমান ? যা সর্বদা
বিদ্যমান, সবখানে উপস্থিত, তাকে অক্ষরের বন্ধনে বাঁধবে কীভাবে হারু ?

শব্দের বিমূর্ততা বড় সীমিত যেন। দুঃখ লেখা যেতে পারে, রাগ, অনুরাগ ও আকাঙ্ক্ষা
অক্ষরের গায়ে আঠালো প্রলেপের মত লেপে দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু শূন্য পাকস্থলীকে সে
লিখবে কোনো উপায়ে ?
ক্ষুধা তো ক্ষুধার অনুভূতি নয়, খাদ্যাভাবে মাথার ঝিমঝিমও নয় ; ক্ষুধা এমন এক অবস্থা যা
স্থির ও গতিময়, পতনশীল তথা উড্ডীয়মান ; ক্ষুধা একই সঙ্গে কারণ ও তাহার ফলাফল
–ক্ষুধার প্রেক্ষিতে বাংলাভাষার প্রতিটি অক্ষর নিছকই ফেরেব্বাজ।“ ( হারুর মহাভারত,
আজকাল , প্রথম প্রকাশ ২০১৯ ,পৃ. ১৫ )
আজ সে বাজার করেছে। কিন্তু অনাভাসে অনেক কিছুই আনতে ভুলে গেছে। বাড়ি ফিরে দেখে প্রিয়
রাজহাস ন্যাপলার হাতে ক্ষতবিক্ষত। আজ গোটা ভারতবর্ষই তো ক্ষতবিক্ষত। এই ক্ষতবিক্ষত
ভারতবর্ষকে একজন শিল্পী কীভাবে চিত্রিত করবেন ? অথচ এই সংকটময় পরিস্তিতিকে অঙ্কন
করা ছাড়া শিল্পীর ভবিষ্যৎ নির্মিত হতে পারেনা। কিন্তু একজন শিল্পী কি পারবেন এই রক্তাক্ত
সময়কে নবযুগের কাছে শিল্পের ব্যঞ্জনায় তুলে ধরতে ? পারবেন কিনা তা আমাদের জানা নেই, তবে
প্রকৃত শিল্পীর সেটাই হবে একমাত্র আদর্শ পথ। নাম গল্পেই সাদিক বর্তমান সময়ের বাঙালি
পাঠককে জানিয়ে দিয়ে যান আমরা কোন সময়ে দাঁড়িয়ে আছি।
‘বলার গল্প। করার গল্প। লেখার গল্প ।’ এ সাদিক বাংলা গল্পের রীতি, আখ্যান, শ্রেণি যেন
সমস্তই ভেঙে দিলেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার ‘সাধনা’ পত্রিকায় লিখেছিলেন ‘ছোটগল্প কি
করে লেখা হয় ‘ প্রবন্ধ। আসলে ছোটোগল্পের নির্দিষ্ট রীতি বলে কোন পরিকাঠামো নেই। সে চলবে
লেখক উদ্ভাসিত নিজস্ব পথে। সাদিক হোসেন এ গল্পে তেমনই এক পথ আবিষ্কার করেছেন। বাংলা
সনাতন গল্পের চিরকালীন পাঠক আজ উত্তর আধুনিক তত্ত্ববিশ্বে এসে কোথায় যেন নিজের
মেধাকে হারিয়ে ফেলছে ! ফলে মেলাতে পারছেন না পূর্বের গল্পের সঙ্গে আজকের গল্পকে। এ গল্প
নির্দিষ্ট কোন আখ্যানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি। গল্পের কীভাবে জন্ম হয়, গল্পের তত্ত্ব
কোথায়, একটি গল্প যে অতিসাধারণ বিষয় নিয়েই গড়ে উঠতে পারে, দৈনন্দিন পথে ঘাটে, প্রান্তরে
কত গল্প ছিটিয়ে পড়ছে , একজন অক্ষরকর্মী কীভাবে তা সংগ্রহ করছে তা তিনি দেখিয়ে দেন। গোটা
গল্প জুড়ে এক অনবদ্য গদ্য ও কথনভঙ্গিতে তিনি গল্প লেখার ক্যানভাস এঁকে যান। শুধু এ গল্প
নয় পূর্বের গল্প সংকলনের বহু গল্পে এই গল্পের তত্ত্বের আভাস দিয়েছেন। শুধু তত্ত্ব নয় পাঠক
কোথা থেকে গল্প শুরু করবে, গল্পের সূচনায় লেখক কীভাবে পাঠককে আকর্ষণ করে, সেই মোহ থেকে বেরিয়ে পাঠক কোথা থেকে প্রকৃত গল্পে প্রবেশ করবে সে পথ নির্দেশ করে দেন। সাদিকের মতে গল্প কী এ গল্প থেকে সামান্য তুলে ধরি –
“আমি কি ডুগডুগি ? বাঁদর ? ঈশ্বর ? আত্মা ? বৌদ্ধ ভিখিরি ? আমি কি ফিকশন ? এপিক ?
আমি চদু ? আমি দু’হাজার শব্দ ? তিন হাজার শব্দ ? দশ মিনিটে পড়ে ফেলা যায় এমন গল্প ?
আমি কি কমার্শিয়াল ? সাপ্তাহিক ? রবিবাসরীয় ? রাজপুত ? লিটিল ম্যাগাজিন ? আমি কি
চশমা , শসা, নাকি তাত্ত্বিক, নাকি শল্যচিকিৎসক ? আমি কি কাঁচা হাত ? পুরনোপন্থী ? দুই
বছর তিন বছর ধরে লিখে যাওয়া প্রেমের ধারাবাহিক ? আহা প্রেম, এসো প্রেম, এসো
ধারাবাহিক ?” ( তদেব, পৃ. ১১৫ )
‘হায়দার আলি যা কিছু হতে পারত’ গল্পে এক পরাজিত হায়দারের গল্প লেখক আমাদের শুনিয়েছেন।
হায়দার আলি যে কিছুই হতে পারেনি সে ইতিবৃত্ত শুনিয়েছেন। কিন্তু হওয়ার সম্ভবনা ছিল। আসলে
এসবের মধ্য দিয়েই প্রকৃত নেতা উঠে আসে। কিন্তু সে পথ সহজ নয়। আসলে সময় পরিস্তিতি এমন
এক জটিল মুহূর্তে দাঁড়িয়ে যেখান থেকে মানুষকে আজ নিজেই নিজের পথ খুঁজে নিতে হবে। আর ব্যর্থ হলে সারাজীবন সেই ব্যর্থতার গ্লানি বহন করে যেতে হবে। হায়দার আলি এক স্কুলের সাধারণ কর্মী। তাঁর কাছ থেকে সমীরণ মাস্টার সব ইতিবৃত্ত শুনেছেন। যা ছিল হায়দারের জীবনসংগ্রামের ইতিবৃত্ত
–“এই লোকটা বন্যা দেখেছে, উদ্বাস্তু চাষিদের না –হয়ে যাওয়া দেখেছে, কারখানায় ডান হাতের আঙুল
খুইয়েছে, আবার ফ্যাক্টরিতে স্ট্রাইকও করেছে এরাই।“ ( তদেব, পৃ. ৫৬ ) তাঁর স্ত্রী অসুস্থ। সেজন্য
নানা পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে অনেক চেষ্টা করেও বেশি টাকা সংগ্রহ করা যায়নি। শেষে সমীরণ
মাস্টার ও শিক্ষকদের চেষ্টায় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কথক আজ ভেবেছে হায়দারের
অনেক কিছু হওয়ার পথ ছিল, উৎস ছিল কিন্তু কিছু কিছু মধ্যবিত্ত তো এভাবেও বেঁচে থাকে, সেই
বেঁচে থাকার গল্প শুনিয়েছেন সাদিক হোসেন।

‘ইয়ান আব্রাহামের একান্ত সুসমাচার’ গল্পে এসে সাদিক এক জায়গায়
উচ্চারণ করলেন –“যে-কোনো গল্পে এমন কতকগুলি সূত্র থাকে যা-দিয়ে আমরা গল্পটির ভেতর
ছানবিন চালাতে পারি। সূত্রগুলিকে আয়ত্তে আনতে পারলে পাঠক তখন ইস্ত্রিওয়ালার মতন গল্প মায়
চরিত্রগুলিকে টেবিলে ফেলে প্রয়োজনীয় ভাঁজ তুলতে পারে। এখানে ‘নখরাবাজি’ শব্দটিও তেমনি। এই শব্দটির পেছনে রয়েছে কিছু মানুষের লড়াই ও বলিদানের ইতিবৃত্ত।“ (তদেব, পৃ. ১০১ ) কতগুলি সূত্র জুড়ে দিয়ে লেখক এ গল্পের আখ্যানভূমি গড়ে তুলেছেন। খ্রিস্টান মিথের সঙ্গে লেখক মুসলিম
জীবনকে মিলিয়ে দিয়েছেন। মাতা মেরীর প্রসব বেদনাকে ঘুচিয়ে দিয়েছিল ইয়ান আব্রাহাম। আর
ছলিমুল্লা ১৯৬৬ সালে ইয়ান আব্রাহাম নামে এক চার বছরের যুবককে প্রাণ হারাতে দেখেছিল।
ছলিমুল্লার কাছে ইয়ান আব্রাহাম সুসমাচারের দেবতা। এ গল্পে দুঃখ ও আনন্দকে লেখক পাশাপাশি
রেখেছেন। ছলিমুল্লার কারখানার জীবনের ইতিবৃত্ত, সেখানকার ব্যর্থতা, সংগ্রাম ও কন্যা নাসিফার
বিবাহের আনন্দ। সমস্ত ভুলে সে আজ কন্যার বিবাহের আনন্দে মেতে উঠেছে। কিন্তু বর আসবে কি
না তা আমরা জানি না। আমাদের জানার অবকাশও লেখক রাখেননি। ইয়ান আব্রাহামের সুসমাচার শেষে দুঃখের বার্তার পরিণত হবে কিনা তা জানা নেই। ছোটোগল্প তা জানার অবকাশ রাখে না। আর সেটাই ছোটোগল্পের কৌশল। এখানেই সাদিকদের জয়। বিবাহের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে নাসিফার যৌনতা, বিবাহের উপকরণ, শিক্ষা সব এনে লেখক এমন এক আখ্যানভুবন গড়ে তোলেন যা অনন্য। ছলিমুল্লারা জীবনের কঠোরভূমি দাঁড়িয়ে হয়ে গেছে বাস্তববাদী। তবুও তাঁরা সুসমাচারে বিশ্বাস করে। জীবনের প্রত্যন্ত প্রদেশে দাঁড়িয়ে তাঁরা জয়ী হলে সুসমাচার মনে নেয় আর পরাজিত হলে হয়ে যায় বাস্তববাদী।

‘তিনমহলা’ গল্প গড়ে উঠেছে জালালুদ্দিন শেখ ও রাজিয়াকে কেন্দ্র
করে। নরুদ্দিন শেখের পুত্র জালালউদ্দিন। এক উদাসীন মানুষ এই জালালউদ্দিন। জাগতিক বোধ
সম্পর্কে সে বিশেষ সচেতন নয়। এই পুত্রের বিবাহ দিয়ে নিয়ে এসেছেন পিতা নরুদ্দিন। বস্তি থেকে
রাজিয়া আজ প্রবেশ করেছে তিনমহলা বাড়িতে। নরুদ্দিন পুত্রকে নিজের মত করে গড়ে তুলতে
চেয়েছিলেন। কিন্তু জালালউদ্দিন স্বভাবে ছিল আত্মভোলা। পিতা পুত্রের জন্য মৌলবি ডেকে শিক্ষার
আয়োজন করেছিলেন। শেষ উপায় হিসাবে পুত্রকে বিবাহ দেন। ফলে বস্তির মেয়েকে পুত্রবধূ করে ঘরে আনেন। এতেও জালালউদ্দিনের চেতনা ফেরেনি। বাসরঘরেও সে স্ত্রীর সঙ্গে অস্বাভাবিক আচারণ করেছে। রাজিয়া আজ ভেবেছে শুধু অধিকারের দাবি নিয়ে এখানে বেঁচে থাকতে হবে। সেই অধিকার নিয়েই সে বেঁচে থাকতে চেয়েছে। এছাড়া নিম্নবিত্ত নারীর যে অন্য পথ নেই।

প্রযুক্তির জগতে আমরা যেমন এগিয়ে গেছি তেমনি সমাজের একটি শ্রেণি
এখন অর্থনৈতিক দিক থেকে পিছিয়েই আছে। সার্বিক উন্নয়নের বদলে ঘটেছে শ্রেণির উন্নয়ন।
‘বৃষ্টিবিঘ্নিত ২০৩০’ গল্পে দুটি সমান্তরাল ঘটনাকে সামনে রেখে লেখক অর্থনৈতিক বৈষম্যের ফলে
জনজীবনের যে বিপর্যস্ততা তা দেখিয়ে দেন। সময়ের পরিবর্তনে প্রযুক্তির করলাগ্রাসে আজ মানুষ
খুব কাছ থেকে সমস্ত কিছু পেয়ে যাচ্ছে। আর সে জন্যই সৌমেনের বন্ধু চন্দন আজ চাইনিজ ভাষা
শিখতে চেয়েছে। সৌমেনের স্ত্রী মিতুর পিতার বাড়ি বৃষ্টিতে ভেসে গেছে। ফলে বাড়ি ছেড়ে তারা অন্যত্র
উঠে গেছে। আর মিতু বাড়ি থেকেই গুগল অ্যাপে দেখতে পাচ্ছে সে এলাকায় জল কতটা, কলকাতায় আরবৃষ্টির সম্ভবনা আছে কিনা, নিম্নচাপের গতি কোনদিকে ধাবিত হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। আজ বৃষ্টিতে
সৌমেন অফিস যেতে পারেনি , সে বাড়ি বসে ওয়েবসাইটে পিৎজার অর্ডার দিয়েছিল। সে সংস্থার শর্ত
তিরিশ মিনিটে হোম ডেলিভারি দিতে না পারলে ডবল টাকা ফেরত দেবে। সৌমেন ভেবেছিল এই বৃষ্টির দিনে কোনভাবেই ডেলিভারি সম্ভব নয় ফলে সে ডবল টাকা পাবে। কিন্তু নির্দষ্ট সময়েই পিৎজা চলে  আসে বৃষ্টিকে উপেক্ষা করেই। অথচ সৌমেন বৃষ্টিতে রাস্তাঘাটের করুণ পরিস্তিতি বলেই অফিসযেতে পারেনি। দুটি বিপরীত বিষয়কে সামনে রেখে লেখক উন্নয়ন কোনপথে চলেছে তা দেখিয়ে দেন।
হয়ত এমন দিন আসবে যেদিন মানুষের কাজ সব যন্ত্র দখল করবে, গরিব মানুষকে এ পৃথিবী থেকে
খাদ্য –বাসস্থানের অভাবে হারিয়ে যেতে হবে। পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে শুধু বিত্তশালী মানুষ।
অর্থনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা মানুষকে বোধহয় এ সভ্যতা বিদায় জানিয়ে দেবে। সে সমস্ত
মানুষের দিকে সরকার কোন নজর দেবে না, সে প্রযুক্তির জগতে গা ভাসিয়ে দেবে। এভাবেই সময়ের
বুকে ব্যাঙ্গাঘাত আনেন সাদিক হোসেন।

সংশয়ের বিশ্বে মানুষ ক্রমেই জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠছে।
হানাহানির জগতে মানুষ ক্রমেই বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে। সংকেত কখন সংশয়ে পরিণত হবে তা আমরা নিজরাও জানি না, আর সেই সংকেত থেকেই ঘটে যাবে প্রকৃত ঘটনা, তখন মানুষের কিছুই করার থাকবে না। ‘সংকেত’ গল্প গড়ে উঠেছে সংশয়ের জগত ক্রমশ ঘনীভূত হতে হতে কীভাবে বিস্ফোরণ ঘটে যায় তা নিয়ে। জীবন যে বড় সহজ নয় , সেখানে বিশ্বাস যে দুর্লভ বস্তু আজকের সংশয়ের বিশ্বে তা বুঝতে পেরেছিল রতন বারুই –“এই যে গল্প-উপন্যাসে জীবনের সঙ্গে নদীর তুলনা টানা হয়, তা শুধু মিথ্যে নয়, একেবারে ভাঁওতাবাজি। জীবন নদীর মতো অত সরল নয় যে এর বাঁকে বাঁকে সভ্যতা গড়ে উঠবে। বরঞ্চ এত প্রস্তুতি নেওয়া স্বত্ত্বেও কখন যে বড়ো বড়ো ঘটনাগুলো চোরা বাঁকে ঢুকে গিয়ে হাপিস হয়ে যায়, তা কেউ বলতে পারে না।“ (পৃ. ৮৯ ) রতন বারুইের মধ্যবিত্ত সংসার। তাঁর নীচের ঘর ভাড়া দিয়েছিল একজনকে। এই লোককে কিছুদিন পর মনে হয়েছিল সন্দেহজনক। ইতিমধ্যে রতন পরে গিয়ে পা ভেঙেছে, সেই ভাড়াটে উকিল সেজে থাকা লোকের ঘরে তল্লাশি করে তেমন কিছুই খুঁজে পায়নি অথচ কিছুদিনের মধ্যেই বিস্ফোরণ ঘটে গেছে। আসলে এক সংশয়ের সময়ে আজ আমরা দাঁড়িয়ে আছি। সেখানে রবি ঠাকুরের ‘বিশ্বাস হারানো পাপ’ মূল্যবোধ নিছকই ভ্রান্ত। আজ যেন বিশ্বাস করাই পাপ। সেই মূল্যবোধহীন জগতে আমাদের নিয়ে যান সাদিক এ গল্পে।

আসলে সময়ের কথা নিয়েই তো কথাসাহিত্যের যাত্রা।
সে পরিসর ভিন্ন ভিন্ন লেখকে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ধরা দেয়। সাদিক হোসেন মিথ, জাদুবাস্তবতা,
কখনও আপাত অলৌকিকতা, প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তর, সেখান থেকে আবার কেন্দ্রবিন্দুতে
প্রবেশ - এমনভাবে সময়ের চিত্র উপস্থাপন করেছেন এ সংকলনটিতে। পরিশেষে এটুকুই বলার
সাদিকের একটি নির্দষ্ট গদ্যশৈলী আছে। তা উপলব্ধির জন্য পাঠকের সাদিকের সমস্ত গল্পগ্রন্থ
গুলি পাঠ জরুরি। গদ্যেরও যে একটি নিজস্ব গতি আছে তা সাদিক দেখান। ছোটো ছোটো বাক্যে এক
আপাত বিরামহীন ছন্দে সাদিক পাঠককে গল্প পড়িয়ে নেন, এখানেই তিনি অনন্য। গল্পের আখ্যান
হিসেবে মুসলিম জীবন এসেছে, মুসলিম লোকাচার, বিশ্বাস এসেছে কিন্তু তিনি এক স্বতন্ত্র গল্পবলয়
গড়ে তুলেছেন। এক উত্তর আধুনিক মন নিয়ে তিনি আখ্যানভুবনে প্রবেশ করেছেন। পাঠপ্রতিক্রিয়া
থেকে নন্দনতত্ত্ব, শিল্পীর দায়বদ্ধতা, সময়ের রহস্যলিপি সবই সাদিকের গল্পে পাওয়া যাবে।
লেখক পাঠকের যৌথ সম্পর্কেই যেন সাহিত্যের উপবিবেশ। তাই তিনি পাঠককে সঙ্গে নিয়েই গল্প
পরিক্রমায় অবতীর্ণ হন। পাঠকেও অনেকটা যেন বলার সুযোগ করে দেন। তিনি সবই জানেন তবে
পাঠক কী ভাবছে সেই শূন্য বলয়ও যেন সীমিত পরিসরে রেখে যান। গল্পের মধ্যে তিনি নানা ইমেজ
ব্যবহার করেন। এক পরিসর থেকে অন্য পরিসরে যেতে ইমেজগুলি পাঠকের সহায়ক হয়ে ওঠে। তেমনি গল্পবলয়কে তিনি ভাঙতে চাননা। গল্পবলয়ে থেকেই নতুন গল্পবলয় যেন নির্মাণ করে নেন। সময়ের রহস্যকে যেমন ছেদ করেন তেমনি মুসলিম জীবনের জটিলতার মধ্যে প্রবেশ করে ধর্মীয় মিথের অনুসঙ্গ ব্যবহার করে মানুষের মুক্তি ঘটান। নরকের পঙ্কসজ্জা থেকে তিনি নায়ককে বার করে আনেন, কিন্তু সেই নরকের জটিলতা কত ভয়ংকর তা পাঠককে দেখিয়ে দেন। এখানেই তিনি হয়ে ওঠেন ভিন্ন ভুবনের আখ্যানকার।

1 টি মন্তব্য:

  1. অসাধারণ লিখলেন পুরুষোত্তম।সাদিকের গল্প তো গল্প নয়।যাপনের বিবরণ।সাদিক সত্যি ভিন্ন আখ্যানের অসাধারণ রূপকার।জীবনের ক্ষত ও ক্ষত-নির্গত পুঁজ-রক্ত, বদ-রক্ত সাদিক চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

    উত্তর দিনমুছুন