বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

চিনুয়া আচেবের সাক্ষাৎকার

অনুবাদ: এলহাম হোসেন 

(২০০৮ সালের ১৪ অক্টোবর তারিখে লন্ডনের নিউ ক্যাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যাক মাপাঞ্জে ও লরা ফিসের সঙ্গে আলাপচারিতায় নাইজেরীয় সাহিত্যিক চিনুয়া আচেবে)। 


জ্যাক মাপাঞ্জে : 
সাক্ষাতকারটি শুরু করব আপনার কাছে একটা বিষয় জানতে চেয়ে। এ ব্যাপারে আগে অনেকেই আপনাকে জিজ্ঞেস করেনি। এটি আপনার Things Fall Apart উপন্যাসটি লেখার পেছনের প্রনোদনা নিয়ে।
সুস্পষ্ট করেই জানতে চাই, আপনি সাহিত্য পত্রিকার মাধ্যমে আমাদেও কিছু শেখাতে চান কি-না। উদাহরণস্বরূপ, ব্ল্যাক অরফিউজ এবং প্রেজেন্স আফ্রিকেইন। এছাড়া অকিকি-ও ছিল যা আপনি সম্পাদনা করেছেন। এখন বলুন, এগুলো স্বাভাবিকভাবেই আপনার লেখার ওপর কতটা প্রভাব ফেলেছে? আমাদের ওগুলোর ব্যাপারে কিছু বলুন। ওগুলোর উৎস এবং ওই সময় যাঁরা লিখতেন তাদের কাছে ঐ পত্রিকাগুলো কী বার্তা পৌঁছে দিত? 

আচেবে : 
হ্যাঁ, একই সময় ভিন্ন ভিন্ন স্থানে সেই পত্রিকাগুলো বের হতো, আর এর অর্থ হলো কিছু একটা তখন আমাদের মন ও মননে ঘুরপাক খাচ্ছিল। এটা বেরিয়ে আসার জন্য আঁকুপাকু করছিল। এটাই আমাদের ইতিহাসের স্বরূপ। এটা আমাদের ইতিহাসের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছিল। উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লোকজনের দিকে তাকান, তবে দেখবেন ওরা আর কেউ নয়, ওরা নিজেদের ইতিহাসের দ্বারা তাড়িত মানুষ। আসলেই ওরা ইতিহাস তাড়িত মানুষই। শিক্ষা না পেলে কেউ জানে না যে, আসলে সে কে? একটা শিশুও তার আত্মপরিচয়ের ব্যাপারে কিছুই জানে না। কাজেই যে প্রকাশনাগুলোর প্রতি আপনি ইঙ্গিত করছেন, সেগুলো এই প্রক্রিয়াকেই নির্দেশ করছে। আমি একে কষ্ট বলব না বরং একই সঙ্গে আনন্দ ও দায়িত্ববোধই বলব। এর মধ্যে দক্ষতার ব্যাপারও আছে। 


মাপাঞ্জে : 
ব্ল্যাক অরফিউজ-এর যে বিষয়টা আমার ভালো লাগতো তা হলো, সেখানে দক্ষিণ আফ্রিকার অ্যালেক্স লা গামা, আমেরিকার ল্যাংস্টন হিউয়েজ, জর্জ লেমিং এবং নাইজেরীয় লেখকরা ছিলেন। আপনার এই লেখকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ছিল। আমরা দূরে দক্ষিণ আফ্রিকায় বসে এর সর্বশেষ সংখ্যাটা হাতে পাওয়ার অপেক্ষায় থাকতাম। 

আচেবে : 
তখন যা ঘটতে যাচ্ছিল এটা ছিল তার একটা শুভ লক্ষণ। এটা পরিতাপের বিষয় যে, যদি আপনি এখন যেখানে আছেন সেখান থেকে পেছন ফিরে তাকান, তবে দেখবেন যা আশা করা হয়েছিল, তা আসলে অর্জিত হয়নি। অনেক খামতি ছিল। সেসব প্রচেষ্টার যা লক্ষ্য ছিল, তাও অর্জিত হয়নি। তাৎক্ষণিকভাবেই তাঁর শত্রুরা কওমি নক্রুমার অবস্থানের অবমূল্যায়ন করে। আর স্বাধীনতার ব্যাপারে যে জ্বলজ্বলে আশা-আকাক্সক্ষা ছিল, স্নায়ুযুদ্ধের মধ্য দিয়ে তারও অপমৃত্যু ঘটলো। এই স্নায়ুযুদ্ধ আফ্রিকার না হলেও আফ্রিকাতেই তা ঘটলো। আমাদের এর সঙ্গে কোনো সংশ্লিষ্টতাই ছিল না। কিন্তু যেভাবেই হোক ক্ষমতাসীনরা ভাবলো যে, আফ্রিকাই এই যুদ্ধের উপযুক্ত জায়গা। এতে আমাদের বিপ্লবের মৃত্যু ঘটলো। 


মাপাঞ্জে : 
আমরা সৃজনশীল লেখা শেখাই। এর একটা দিক হলো যে, আমরা ছাত্র-ছাত্রীদের কোনো লেখকের কোনো লেখা থেকে যেকোনো একটা লাইন নির্বাচন করে তা নিজেদের মতো করে বিশ্লেষণ করতে বলি। আপনি ডব্লিউ. বি. ইয়েট্সের ‘The Second Coming’’ কবিতা থেকে ‘Things fall apart; the centre cannot hold’’ এই লাইনটা নিয়েছেন। তারপর টি.এস. এলিয়টের আরেকটা উদ্ধৃতি ‘ ‘No longer at ease’ নিয়েছেন। যে বিষয়টা আমার কাছে মনোমুগ্ধকর তা হলো, আপনি একটা ছত্র নিয়ে পুরো একটা উপন্যাস লিখে ফেলেছেন। এ ব্যাপারটা নিয়ে আপনার ভাবনা কী? 

আচেবে :
আমি মনে করি, কবিতা ও ভাষার তাৎক্ষণিক শাব্দিক অর্থ দ্যোতনার বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা আছে। যদি আপনি একটা শক্তিধর কবিতার খোঁজ পান তবে সেখানে দেখবেন এর যেকোনো ছত্রই একটা জগত আপনার সামনে খুলে দিতে পারে। সেই ছত্রটির ক্ষমতা বোঝার জন্য আপনার কল্পনা-ক্ষমতা থাকতে হবে। আমার মনে হয়েছিল, আমি ইয়েট্সকে খুব পছন্দ করি। যেভাবেই হোক, সে আমার তানে টোকা দিয়েছিল। আমি ভাবলাম, ‘বেশ, ইয়েট্স একজন ভালো কবি। আমি তাঁকে ঝালিয়ে দেখবো।’ সে পর্যায়ে আমি উপন্যাস নিয়ে ভাবিনি। এটাই শিল্পের স্বরূপ। আপনি সর্বত্রই মৈত্রী আর তাৎপর্য খুঁজে পাবেন। ‘Things Fall Apart’’ শিরোনামটি নির্বাচন করার সময়ও আমার মধ্যে এ ব্যাপারটাই ঘটেছিল। প্রথমে শিরোনাম নিয়ে এতটা ভাবিনি। তবে বেশ পরে হঠাৎ করে এক নতুন উপলব্ধি তৈরি হলো। এই শব্দগুলো আমার মধ্যকার ভিন্ন ধরনের গল্পকে মানিয়ে গেল। আর দ্বিতীয়ত: যে বিষয়টা আমাকে আকর্ষণ করলো তা হলো, ইয়েট্স ভিন্ন এক সভ্যতার গল্প বলেছিলেন। আর আমার মধ্যে ঘটে যাওয়া বিপ্লব ছিল আলাদা। এটি ছিল কালো মানুষদের বিপ্লব যারা খ্রিস্টধর্মের আগমনের পর থেকে দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছিল। এভাবেই কবিতা আমাদের বিভিন্ন বাঁকে বাঁকে নিয়ে যায়। আপনি এটি নিয়ে যতই ভাববেন এটি আপনাকে ততই ভাবাবে। 


লরা ফিস : 
আমি বিষয়টা লক্ষ করেছি যে, কিছু নারীবাদী নারীর প্রেক্ষিতে উপস্থাপনা না করার কারণে আপনার ‘Things Fall Apart’ -এর সমালোচনা করেছেন। তবে আমি এ ব্যাপারেও সচেতন যে, আফ্রিকী সাহিত্যের নতুন ধারা তৈরির জন্য একে ভিন্নভাবেও দেখা যায়। আফ্রিকী সাহিত্যের নতুন ধারার শুরুতেই এই বইটি নারীদের জন্য একটা ক্ষেত্রও প্রস্তুত করে। সেখানে তাঁরা লেখালেখি চালাতে পারেন। আমার প্রশ্নটা হলো উপন্যাসের পাঠককে বা অন্য লেখকদের ভাবানোর জন্য নিরবতা সৃষ্টি করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ? 

আচেবে : 
যে জিনিসটার অনেক বেশি দরকার, তা হলো স্পেস বা স্থান। স্থানটাই খুব গুরুত্বপূর্ণ। যেমন ধরুন, একটা ঘরে ঠাসাঠাসি করে অনেক লোক থাকলে যেমন খুব দ্রুতই তা অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে, পরিস্থিতি খারাপ থেকে আরও খারাপের দিকে যায় বা লোকগুলো দম বন্ধ হয়ে মারা যেতে পারে। কাজেই চারপাশে তাকানোর জন্যও স্থান থাকতে হবে। আপনি যে আমার ‘Things Fall Apart’ উপন্যাসের একটা বিশেষ দিকের সমালোচনার কথা উল্লেখ করলেন, তা এক বিশেষ শ্রেণির মানুষের যান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। তবে তাদের প্রতি আমার পরামর্শ হলো, তাঁরা যেন ‘Things Fall Apart’ নিয়ে আরো বেশি করে ভাবেন। তাহলে তাঁরা দেখবেন যে, আমি তাদের শত্রু নই, বন্ধু। উদাহরণস্বরূপ, তাঁরা দেখবেন যে, ওকোনকোর করুণ পরিণতির কারণ হলো নারীদের প্রতি তার অবজ্ঞা। এই বড় দুর্বলতা দেখানোর পরও কীভাবে সে বা আমি নারী বিদ্বেষী হতে পারি? শুধু যে সে নারীদের অবজ্ঞা করেছে তা নয়, যা কিছু নারীসুলভ যেমন- সঙ্গীত, যুদ্ধ নয় বরং শান্তির গল্প, সহানুভূতি-- এই সবই, যাকে আমি নারীর স্বভাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করে দেখিয়েছি,তার প্রতি সে অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছে। 


ফিস: 
আপনার মতে কোন জিনিসটা ভালো উপন্যাস সৃষ্টির জন্য দরকার? এটি নির্ধারণ করার কি কোনো পন্থা আছে? 

আচেবে: 
নাহ! আমি মনে করি সব কিছুই ভালো উপন্যাস সৃষ্টি করতে পারে। আমি এটি বলছি, কারণ কিছু লোক অজুহাত দিতে শুরু করেছে যে, এখন আর ভালো কোনো ঘটনা ঘটছে না, ভালো কোনো গল্প তৈরি হচ্ছে না যা নাকি আমার সময়ে ছিল। এগুলো নাকি শেষ হয়ে গেছে। যেসব তরুণ এখন লিখতে চায় বা চাচ্ছে, দেখবেন তারা এখন এ রকম অজুহাত তৈরি করছে। হয়তো খুব নগ্নভাবে নয়। তারা বলছে, আমাদের চারপাশের আজে-বাজে বিষয় নিয়ে কীভাবে লিখব? তবে চারপাশের প্রত্যেকটা আজে-বাজে বিষয়ই উপন্যাসের বিষয়বস্তু হতে পারে। আপনি সেটাকে ঠিকঠাক করতে না পারলে তা আপনার গল্প হয়ে উঠবে না। কিন্তু অন্য কেউ তা পারতে পারে। কাজেই আপনার ছাত্রছাত্রীদের এই অজুহাত দিতে দেবেন না- ‘বিষয়গুলো আর তেমন নেই যেমনটা আগে ছিল।’ 


ফিস : 
আমার পরের প্রশ্ন ধর্ম নিয়ে। আপনি বলেছেন, আপনার দ্বিতীয় উপন্যাস তাদেরকে নিয়ে যারা নিজেদের ধর্ম বিসর্জন দিয়ে অন্যের ধর্ম গ্রহণ করে। এ রকম কিছু একটার সঙ্গে আপনিও যুদ্ধ করেছেন। ধর্মের ব্যাপারে আপনার মতামত জানতে আমি আগ্রহী, কারণ এ বিষয়টা বর্তমানে নাইজেরিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী নাইজেরিয়ার উত্তর থেকে দক্ষিণকে, খ্রীস্টধর্ম থেকে ইসলামকে আলাদা করেছে। ধর্ম সম্বন্ধে আপনার মতামত কী? নাইজেরিয়ায় এর ভূমিকা নিয়েও আপনার মতামত কী? 

আচেবে : 
এটা একটা বড় প্রশ্ন এবং এর উত্তর খুঁজতে গেলে বাকি জীবনটাই লেগে যাবে। আমার অবস্থান এ ব্যাপারে সোজাসাপ্টা। ধর্ম এমন একটা বিষয় যার জন্য মানুষের যুদ্ধ করা উচিত নয়। এর জন্য মারামারি করা বা নিজেদের খুন করা আসলেই অর্থহীন ও বোকামি। যেভাবেই হোক, ধর্মের যেকোনো কিছুর মধ্যে ঢুকে পরে দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার ক্ষমতা আছে। একে ঠেকানো যায় না। শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে দেয়ালের সঙ্গে আছাড় দিয়ে। কারণ হলো ধর্মযুদ্ধ। সীমিত পরিসরে আমার মন্তব্য হলো, ধর্মের নামে কোনো দ্বন্দ্বকে আমাদের বরদাস্ত করা উচিত নয়। কিছু লোক এ বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়। তবে শিল্পীরা এমনটা করবে না। শিল্পী থাকেন শান্তি, একতা ও বৈচিত্রের পক্ষে। যদি কোনো গ্রামে পাঁচটা ধর্ম থাকে, তবে এটা ভাবার কোনো কারণ নেই যে, সেখানে শুধু একটা ধর্ম থাকবে, আর বাকি চারটা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। 


ফিস : 
এই প্রশ্নের সঙ্গে কল্পনার যোগ আছে। অন্যের প্রতি লেখকের দায়বদ্ধতা আছে কি-না তারও যোগ আছে। আমি যা বুঝাতে চাচ্ছি তা হলো, ‘Things Fall Apart’ উপন্যাসের শেষে পরিপ্রেক্ষিত বদলে যায়, বিশেষ করে সাদা কমিশনারের প্রেক্ষিত। এটা প্রেক্ষিতের স্থানান্তরিকরণ। আমি ডরিস লেসিং-এর বেশ কিছু লেখা পড়েছি। তাঁর Grass is Singing উপন্যাসের শেষে যখন তিনি ছেলেটার হাতে মেরি কীভাবে খুন হচ্ছে তার বর্ণনা দিচ্ছেন, তখন তিনি বলছেন, এটা বলা অসম্ভব যে, একজন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের মনস্তত্বে কী চলছে। আমি লিঙ্গ ও সাম্প্রদায়িক সীমার বাইরে যেতে চাই। আমি জানতে চাচ্ছি যে, একজন লেখকের অন্যের প্রতি কী দায়বদ্ধতা আছে। 

আচেবে : 
কেন, এটা দায়বদ্ধতা কিনা তা আমি জানি না। আমি শুধু বলব যে, যেকোনো লেখকের প্রথমে ‘অপর’ এর সম্বন্ধে গ্রহণযোগ্য ধারণা থাকতে হবে। মানুষ কিভাবে বেড়ে উঠবে এবং সে কিসের মূল্যায়ন করবে সে ব্যাপারে আমার কোনো পরামর্শ নেই। যা কিছু সমাজের জন্য কল্যাণকর, নৈতিকতার জন্য অনুকূল, আমি শুধু তারই পরামর্শ দেব। আমার কাছে এই উত্তরটুকুই শুধু আছে। একাত্ম হওয়ার ক্ষমতা নিঃসন্দেহে যেকারো জন্যই গ্রহণযোগ্য। তবে বিশেষ করে শিল্পীদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টা বেশি প্রযোজ্য কারণ, লেখার ব্যাপারটা হলো অন্যের ভেতরে বসবাস করার মতো। সাহিত্য এটারই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়-- অন্যকে দেখার সামর্থ্য এবং সেখানে নিজেকে স্থাপন করা। এটা একটা খুব জটিল প্রকল্প, কারণ আপনি জানেন, আমরা প্রত্যেকেই নিজের খোলসে বন্দী। ওর মধ্যেই জন্মেছি, আবার ওখানেই মরতে চাই। অপরকে পর্যালোচনা করে যদি নিজেকে সেখানে স্থাপন করতে পারা যায়, তবে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। আমরা নিজেরা যা ভাবি বা বলি বা অন্যরা যা ভাবে বা বলে, তাতে তিন বছর ধরে আটকে থাকার কোনো মানে হয় না। 


মাপাঞ্জে : 
অধ্যাপক সাহেব, এই সুযোগে আর একটা প্রশ্ন আপনাকে করতে চাই। এটি আপনার প্রজন্মের লেখকদের নিয়ে যাঁরা জাতীয়তাবাদীর ভূমিকায় অবতীর্ণ। আপনি যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন, শুধু শিল্পী হিসেবে নয়, রাজনীতিবিদ হিসেবেও। আপনার ‘Things Fall Apart’ প্রকাশের পঞ্চাশ বছর পর এবং এর মধ্যে আপনার অন্যান্য প্রকাশনার এতদিন পরে এই ভূমিকাটার ব্যাপারে এখন আপনি কী ভাবেন? আমার মনে হয়, তরুণ প্রজন্মের অনেকেই নতুন সরকারের প্রতি আপনার সমর্থন আছে কি-না, সে ব্যাপারে আপনাকে প্রশ্ন করে। আপনি এখন সেই পর্যায়ে পৌঁছেছেন যেখানে দাঁড়িয়ে আপনি বলতে পারেন, ‘আর কতদিন এই যুদ্ধ আমি চালিয়ে যাব?’ অথবা আপনি কি সেই পর্যায়ে পৌঁছেছেন যেখানে দাঁড়িয়ে বলতে পারেন, ‘আমার যা বলার দরকার তা বলে দিয়েছি? কেউ শুনুক বা না শুনুক- এটা তার ব্যাপার?’ 

আচেবে : 
বেশ, আমার মাঝে মাঝে তাই মনে হয়, তবে আমি সে পথ মারাতে চাই না। আমার মনে হয়, যদি কেউ বেঁচে থাকে, তবে তাকে কিছু না কিছু করে যেতেই হবে। এখন আপনি যদি প্রকৃতপক্ষেই ভেবে থাকেন যে, যে সমস্যা নিয়ে আপনি বলতে চেয়েছিলেন তা বলা হয়ে গেছে, তবে একই বিষয় নিয়ে বার বার না লিখে এবং সময় নষ্ট না করে আপনি সিদ্ধান্ত নিতেই পারেন। এটি লেখকের ব্যাপার যে, তিনি তাঁর জীবনের দিকে তাকাবেন এবং সিদ্ধান্ত বলবেন, ‘ঠিক আছে, আমি চেষ্টা করেছি। এতে কোনো কাজ হয়নি। আমি অন্য কিছুর বরং চেষ্টা করি। কিন্তু আমার তো অন্যকে উপদেশ দেয়ার ব্যাপারে ভয় হয়, সংশয়ও হয়।’ আমার মনে হয়, আপনি অনেক কথা বলে ফেলেছেন, এবার থামুন। আমি মনে করি, এটি ধৃষ্টতা। একজন লেখক বা শিল্পীকেই এই সিদ্ধান্তই নিতে হবে। 


মাপাঞ্জে : 
সেদিন ফেমি ওসুফিসানের Resume of African Literature in Nigeria পড়ছিলাম। হতাশা সম্বন্ধে তাঁর অনেক গল্প আছে। নিজের ও তাঁর প্রজন্মের। তবে আসলে তাঁর মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু ছিল আফ্রিকী সাহিত্যের ভবিষ্যত। এখন লরার প্রশ্নের উত্তরের শুরুতে আপনি নৈতিকতার ব্যাপারটা তুলতে পারেন। এখন যা ঘটছে বলে মনে হয় তা হলো, আফ্রিকী লেখকরা এখন যৌনতা ও সস্তা অশ্লীলতা নিয়ে লিখছে যা নিয়ে লেখার আমাদের প্রথম প্রজন্মের লেখকরা যথেষ্ট সময় পেতাম না বা বিষয়টা আমাদের কাছে যথেষ্ট মজারও ছিল না। আফ্রিকার সাহিত্য ভবিষ্যতে কোথায় গিয়ে ঠেকবে বলে আপনার মনে হয়? 

আচেবে : 
যে বিষয়গুলো নিয়ে লেখকরা লিখছে, আমি তার কথাই বলছি। আপনার প্রশ্নের পশ্চাতের বিষয়টা হলো--
লেখক যদি তাঁর লেখার বিষয় সতর্কতার সঙ্গে নির্বাচন না করেন, তবে তিনি তাঁর সমাজের প্রতি সবচেয়ে মূল্যবান কাজ থেকে সরে যাবেন। 
আরো অনেক বিপদ আছে। গল্পে কিছু মানুষ দেখা যায় যারা সাত্যিকার অর্থে সেখানে বেমানান। কিভাবে আমরা চলবো এবং শিল্প আমাদের কিভাবে তাড়িত করবে, তার ব্যবস্থাপত্র দেয়। আমার প্রজন্মের যে অভিজ্ঞতা ছিল তরুণ প্রজন্মের সেই অভিজ্ঞতা না-ও থাকতে পারে। কাজেই তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, এই মাত্রাতিরিক্ত ঐকান্তিকতা ভালো নয়। বরং একে সহজভাবে নেয়া যেতে পারে। মোদ্দা কথা হলো, বেশ, একে সহজভাবে নিন। তারপর দেখুন কী ঘটে। কিন্তু আমি কিছু বিপদের গন্ধ পাচ্ছি। এ ব্যাপারে সর্বশেষ কথা হলো, একবার আমার মনে হয়েছিল যে, আমার একজন বন্ধু আমার কাজের প্রশংসা করছে। কিন্তু পরে বুঝলাম আসলে ব্যাপারটা তা নয়। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছিলেন, আমি নাকি আফ্রিকা নিয়ে যেসব ইউরোপীয় লেখক লিখেছেন, তাঁদের পর্যাপ্ত স্বীকৃতি দেইনি। তাঁর মতে, তাঁরা আরো ইতিবাচক মূল্যায়ন পাওয়ার দাবিদার। আমি হতাশ হলাম, কারণ বছরের পর বছর ধরে আমরা জাতীয়তাবাদ ও উপনিবেশবাদের ব্যাপারে মতামত দিয়েছি। এটি আমাদের ইতিহাস, আমার ইতিহাস। হঠাৎ করেই এটি হয়ে উঠেছে আমার গল্প, তাঁর নয়। কাজেই গল্প চয়নের মধ্যে আমি বিপদের গন্ধ পাই। এটা এমন এক ক্ষেত্র যেখানে আপনি যদি বেশ অভিজ্ঞ না হন, ইতিহাসের ব্যাপারে সচেতন না হন, তবে আপনি ভুল পথে যেতে পারেন। 


শ্রোতা: 
কেউ কেউ মত দিয়েছেন, আমিও ঠিক তাই মনে করি যে, নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষিতে ‘Things Fall Apart’ একটা ভবিষ্যতদর্শী উপন্যাস। আফ্রিকার উপর বিদেশিদের প্রভাবের প্রেক্ষিতেও। আপনি কি নিজেকে ভবিষ্যতদ্রষ্টা মনে করেন? কখন একজন লেখককে ভবিষ্যতদ্রষ্টা হিসেবে বিবেচনা করা যায় বা দেখা যায়? 

আচেবে : 
আমরা কিভাবে এর সংজ্ঞা দেই- তার ওপর এটা নির্ভর করে। আমার মনে হয়, আমাদের সবারই ভবিষ্যত দেখার সামর্থ্য আছে। অন্যদের থেকে একজন শিল্পীর এ-সামর্থ বেশি। এটা পাঠকদের উপরেও নির্ভর করে। তাঁদের কেউ কেউ বলতে পারেন যে, আপনি একজন ভবিষ্যতদ্রষ্টা আবার কেউ কেউ বলতে পারেন যে, আপনি সেনা অভ্যুত্থানের পেছনের একজন ষড়যন্ত্রকারী। এই দৃষ্টান্ত সত্য। A Man of the People উপন্যাস নিয়ে এ ব্যাপারটাই আমার সঙ্গে ঘটেছিল। জে.পি ক্ল্যার্ক বলেছিলেন, ‘চিনুয়া, তুমি ভবিষ্যতদ্রষ্টা!’ তিনি এ কথা বলেছিলেন শুক্রবারে। আর সেনা অভ্যুত্থান ঘটেছিল শনিবারে। যেহেতু লোকজন এই সেনা অভ্যুত্থানের ব্যাপারে খুশি ছিল না, তাই তারা আমাকে তাদের একজন ভেবেছিল। এজন্যই আমি বলছি যে, আমাদের সতর্ক হতে হবে। আপনি যদি সতর্কতার সঙ্গে আপনার সমাজকে দেখেন, তবে কী ঘটবে তা আপনিও অনুমান করতে পারবেন। 


মাপাঞ্জে : 
লেখকের যে দায়িত্ববোধের কথা শুরুতে আপনি উল্লেখ করলেন-- আমাদের মনে হয় আমরা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছি যেখানে দায়িত্বহীনতার ধারণাই গৃহীত হচ্ছে। আমাদের লেখালেখি কোথায় যাচ্ছে এবং লেখকের ভূমিকা কী, সে-ব্যাপারটা ভেবে মাঝে মাঝে উদ্বিগ্ন হই। যেখানে লেখক ভাবেন যে, যেকোনো কিছুই ঘটতে পারে, সেখানে আপনার কি কিছু বলার আছে? কোনটা যে ভালো তা আমি জানি না; আপনার ভাবনা কী? এর ভবিষ্যতই বা কী? 

আচেবে : 
আপনি যা লিখছেন, তার সঙ্গে আপনার সংযোগ কতটুকু বা আপনার লেখা আপনার বা সমাজের কতটা কাজে লাগবে, তার ওপর এটা নির্ভর করে। আপনি যদি মনে করেন যে, আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কোনো ব্যাপার নয়, তবে ভিন্ন কথা। আমার মতামত আলাদা। একটা সমাজ, বিশেষ করে আফ্রিকী সমাজ কিভাবে উন্নতি করে, সে ব্যাপারে আমি ঐকান্তিক। সাধারণ মানুষের জন্য সঠিক কিছু করার বিষয়টা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এই উন্নতিটুকুই আমরা করতে পারি। কেন আমাদেরকে বিশ্বের দ্বিতীয় দরিদ্রতম দেশ বলা হবে, তার কোনো কারণ তো আমি দেখি না। এই বিষয়গুলো আমার কাছে অনেক বড় ব্যাপার। আমি এমন কোনো সাহিত্য দেখি না যা এই ইস্যুগুলোকে অবজ্ঞা করে। এই ইস্যুগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে বা গল্পগুলোর উৎসের সঙ্গে শুধু লেগে থাকলেই চলবে না। আমার মনে হয়, আপনি দেখবেন যে, আমাদের গল্পে নৈতিকতার ব্যাপারটাকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে জুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এটা সোজাসাপটা ‘ভালো হয়ে যাও’-- বলার চেয়ে অধিকতর বেশি মজার। 


মাপাঞ্জে : 
আপনার কি মনে হয় যে, আজকাল সব কিছু লেখকদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে? 

আচেবে : 
কিছু কিছু দিক থেকে তো অবশ্যই, কারণ লেখকরা তো একটা দলেরই অংশ। তারা তো এক সঙ্গেই কাজ করেন। লেখকরা উপকরণ সংগ্রহ করে লেখেন, আর প্রকাশক তা ছাপিয়ে দেন। তাঁরা ছাপাখানাকে এর সাথে যুক্ত করেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পুস্তক বিক্রেতারা। পুরো প্রক্রিয়ার শুরুতে থাকেন লেখক। স্বাস্থ্যসম্মত সাহিত্য সৃষ্টির জন্য এসব উপকরণের সমানতালে কাজ করতে হয়। আজকের দিনে আফ্রিকার চিত্র আর এমন নয়। আমি অর্থনীতিবিদ বা সরকারের ব্যাপারে কথা বলছি না। আপনি তাকালেই দেখতে পাবেন যে, নাইজেরিয়াতে বইয়ের ব্যবসা এখন সমস্যায় জর্জরিত। এ-পরিস্থিতিতে লেখকের অবস্থা এখন সংকটাপন্ন। এটাই আসল চিত্র। 


মাপাঞ্জে : 
অন্তর্জাল ব্যবহারের ব্যাপারে আপনার ভাবনা কী? এটা কি আফ্রিকায় ব্যাপকভাবে এসেছে? আপনি প্রকাশনার কথা বলছেন। আজকাল তো লোকজন নিজেদের লেখা নিজেরাই ছাপাতে পারে। 

আচেবে : 
হ্যাঁ, সবকিছুই এখন নতুন আগামীর অংশ। আমরা শুধু এর ব্যাপারে সচেতন হয়ে উঠছি। তবে এটি আমাদের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, সেই ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। আমার মনে হয়, যেসব লেখক অন্তর্জাল বোঝেন, এর সুবিধা-অসুবিধা জানেন, তাঁদের এটা কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাওয়া উচিত। তবে যতদিন কাগজ-কলম থাকবে, ততদিন আমাদের কেউ কেউ এগুলো নিয়ে কাজ করে যাবেন। কোনোকিছু না করার চেয়ে পুরাতন জিনিসপত্র নিয়েই কাজ চালিয়ে যাওয়া অধিকতর ভালো। কারণ, অন্তর্জাল এসে গেল আর কেউ বলে ফেললো যে, লেখালেখির দিন শেষ--এটি ঠিক নয়। আমার মতে, যে কারো এ ব্যাপারে রক্ষণশীল হওয়া উচিত এবং চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত নয় যে, লেখালেখির দিন শেষ। 


মাপাঞ্জে : 
এই সাক্ষাৎকারের জন্য অধ্যাপক চিনুয়া আচেবে আপনাকে ধন্যবাদ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন