বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

হুমায়ূন কবীর'এর গল্প : বানর ও মানুষের গল্প

মুকন্দপুর গ্রামের ছেলেরা বড় হয়ে আর গ্রামে থাকে না। গত কয়েক বছর যাবৎ, বিশেষ করে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, এটা যেন রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুগ যুগ ধরে এই গ্রামের মূল আকর্ষণ হচ্ছে এর রমরমা বাজার। রোজ ভোরে, সূর্য উঠার আগেই, দুধের বাজার বসে এখানে। ব্যাপারিরা দুধ কিনে শহরে নিয়ে যায় ভোরের ট্রেনে। সারাদিন চায়ের স্টলগুলোতে ভিড় লেগে থাকে, মুদি দোকানেও বিকিকিনি চলে প্রচুর। তবে লোকে লোকারণ্য হয় শনিবার হাটের দিন। দূর-দূরান্তর থেকে হাটুরেরা আসে ওই দিন। স্বাধীনতার পরে এই মুকন্দপুর বাজার ধীরে ধীরে মফস্বলের রূপ নিচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের পসারের সাথে সাথে লোকজনের আনাগোনা বাড়ছে। নতুন নতুন কাঁচা ঘর উঠছে এখানে সেখানে। নতুন চালের কল বসেছে। এই এলাকায় কোনো পাকা রাস্তা নেই। তবে বাজারের ভেতরে আছে তিনটি পাকা দালান -- একটি পোস্ট অফিস, একটি হাইস্কুল আর একটি রেল স্টেশন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় এই দালানগুলো ছিল পাকসেনাদের ঘাঁটি। এ অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধটি হয় এই বাজার ঘিরে। গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া দেয়ালগুলো এখনও দাঁড়িয়ে আছে সেই ভয়াবহ যুদ্ধের সাক্ষী হিসেবে। বাজারের লাগোয়া পশ্চিম পাশেই একটা বড় খেলার মাঠ। মাঠ ছাড়িয়ে একটু হাঁটলেই শুরু হয় মুকন্দপুরের আসল গ্রাম। আঁকাবাঁকা মেঠো পথ, দোচালা শণের ঘর, গোবর লেপা ঝকঝকে উঠান, গরুর গোয়াল, খড়ের মাচা, এঁদোডোবা, বাঁশঝাড়। একশ বছরেও ওই দৃশ্যপটের তেমন পরিবর্তন হয় নি। 

আটপৌরে মফস্বল সমাজে পুরুষদের প্রধান বিনোদন হচ্ছে আড্ডা। মুকন্দপুর বাজারের গতানুগতিক জীবনেও এর স্পষ্ট প্রভাব। বাজারের চায়ের স্টলে আড্ডা হয় কাস্টমারদের। সিগারেটের ধোঁয়া, কাপ-পিরিচের টুং-টাং আওয়াজ আর শশব্যস্ত কর্মচারীদের হাঁকডাকের মাঝে উঁচু গলায় আড্ডা চলে হরেক বিষয়ে। তবে ঘুরেফিরে মুক্তিযুদ্ধের কথা আসবেই। মাথামোটা পাইক্যাদের ঘিলু মাথার চেয়ে ভুঁড়িতেই বেশি -- এই তথ্যটা নিয়ে হাসাহাসি হবে। কিছুক্ষণ হাসাহাসির পর অখিল পোদ্দারের বাড়িতে রাজাকারদের লুটতরাজে কথা আসবে। নিরু মাতব্বরের আটচালায় নারীনির্যাতন সম্পর্কিত কুকীর্তির কথা আসবে। আর শেষমেশ মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের হাতে পশ্চিম মাঠের হাঁটুজলে নতুন আসা পাইক্যা দলটির নাস্তানাবুদ হওয়ার কাহিনি। এই সব গল্প সবারই জানা। তবুও এই আড্ডায় জানা কথাও বার বার বলায় কারও আপত্তি নেই। 

ধলা মিয়ার আড়তের পিছনে নিয়মিত বসে ব্যাপারিদের তাসের আড্ডা। তাস মানে আসলে জুয়া, টাকা দিয়ে তাস খেলা, কিন্তু এখানে কেউ জুয়া বলে না একে, বলে খেলা। ওই আসরে হৈহুল্লোড় কম। আড্ডার চেয়ে খেলায় মনোযোগী সবাই। ঘরের দরজা ভেজানো থাকে। পুরো ঘরজুড়ে মেঝেতে সতরঞ্জি বিছানো। মাঝখানে রাখা বড় একটা কাঁসার থালায় পান-সিগারেটের আয়োজন। অংশগ্রহণকারী সবাই চারপাশে গোল হয়ে বসে। সামনে রাখা আধখোলা তাসের বান্ডিল, যত্ন করে আগলে রাখা কিছু উলটানো তাস, সিগারেটের ছাই ফেলার পিরিচ। দরজার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে থাকে ফাই-ফরমাশ খাটা জনা কয়েক পিচ্চি, আদেশ পাওয়া মাত্রই যারা বাইরে দৌড়াবে চা-সিগারেট আনতে। খেলোয়াড়দের মনোযোগ নিবিষ্ট থাকে মুখের কাছে উঁচু করে তুলে ধরা তাসের দিকে। ময়ূরপুচ্ছের মতো কায়দা করে মেলে ধরা তাসের সারিতে সঙ্গোপনে উঁকি দেয় ইশকাপন আর রুইতনের মাথা। 

হেড মাস্টার নিখিল বাবুর আড্ডাটা হয় স্কুলের টিচারস রুমে। স্কুল ছুটি হওয়ার পর খাওয়াদাওয়া সেরে আড্ডাবাজেরা ফিরে আসে বিকেলে। আড্ডা চলে সন্ধ্যা নাগাদ। এই আড্ডায় নিয়মিত থাকেন পোস্ট মাস্টার বাবু, স্টেশন মাস্টার সাহেব, অঙ্কের শিক্ষক চক্রবর্তী বাবু, ইসলামিয়াতের শিক্ষক মৌলবি ওসমান। টেবিলের উপর থাকে সদর থেকে ডাকে আসা নতুন-পুরোনো কয়েকটি দৈনিক। এদের সবাই বাড়িতে রেডিওর খবর শোনেন নিয়মিত। তবু খবরের কাগজের জন্য মুখিয়ে থাকেন। ওই খবরগুলো ঘিরেই উত্তেজক আলোচনা চলে, তর্কাতর্কি হয়। প্রসঙ্গের শেষ নেই, যেমন ভারতীয় সেনারা ভাঙ্গা ব্রিজগুলো মেরামত করে দিয়ে কাজের কাজ করেছে, মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ কমেছে। কিন্তু সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেয়ায় আমাদের পাট চলে যাচ্ছে ওপারে। বিনিময়ে ভারতীয় শাড়িতে সয়লাব হয়ে গেছে এলাকা। এটা কি ঠিক হলো? কিংবা বুর্জোয়া খতমের নামে হানিফ মেম্বারকে কুপিয়ে মেরে ফেলল তার নাবালক ছেলের সামনে। এতে করে কোন বিপ্লব সাধন করল সর্বহারা পার্টির দল? দেশীয় রাজনীতি ছাড়াও বহির্বিশ্বের কথা উঠে আসে। প্রেসিডেন্ট নিক্সনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। ভিয়েতনামের যুদ্ধ কি শেষ হবে তাহলে? একটা দেশে বিশ হাজার টন বোমা ফেললে দেশটার কিছু কি আর অবশিষ্ট থাকে? চিলির নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আলেন্দেকে হত্যা করা হলো সিআইএর কারসাজিতে। মার্কিন স্বার্থের বিরোধিতাই এর কারণ। আমাদেরও কি হুঁশিয়ার হওয়া উচিত নয়? এই সব কথাবার্তা চলতে থাকে চা আর সিঙ্গাড়ার সাথে। খরচ একেকদিন একেকজন ভাগ করে দেন। 

ওদিকে ছেলেদের আড্ডা বসে নদীর পাড়ে, বিকেল থেকে সন্ধ্যা অবধি। নরম ঘাসের উপর শুয়ে-বসে কথা বলে তারা। কারও একজনের আনা বুটভাজা-ঝালমুড়ি-চানাচুর কাগজের ঠোঙ্গা থেকে মুঠি মুঠি ভাগ করে খায় সবাই। উঁচু ক্লাসের ছেলেরাই কথা বলে বেশি। হাসাহাসি, ঠাট্টা-মশকরা চলতে থাকে। অতি প্রসন্ন কেউ হয়তো বেসুরো গলায় সিনেমার গান ধরে। আবার কখনো কোরাসে জারিগান গায় হাততালি দিয়ে। নিচু ক্লাসের ছেলেরা সমীহ সহকারে পেছনের দিকে থাকে। এদের বেশি কথা বলার নিয়ম নেই। মাঝে মাঝে ফাইফরমাশ খাটে এরা। এই আড্ডার নিয়মিত একটা বিষয় হচ্ছে কিভাবে শহরে যাওয়া যায় সেই নিয়ে আলোচনা। শহরে পাড়ি জমানোর নানান ফন্দিফিকির নিয়ে শলাপরামর্শ হয় তখন। পাড়ি দেয়ার কসরত আসলে পড়াশুনার জন্য নয়, বরং রুজি-রোজগারের ধান্ধায়। মাঝে মাঝে আলোচনায় এসে যোগ দেয় শহর থেকে গ্রামে বেড়াতে আসা কেউ। কিছুদিন আগেই যে ছিল এই আড্ডার সাধারণ সদস্য, শহরে যাওয়ার কারণে রাতারাতি সে এখন সবার মধ্যমণি। তার কথা বিশ্বাস করে সবাই বিনা প্রতিবাদে। শত হলেও শহুরে যুবক এখন। গ্রামের স্কুলগামী ছেলেদের কাছে, যারা কখনো শহরে যায় নি, শহরে বাস করা যুবকদের আলাদা আকর্ষণ। এদের কাছে মনে হয় গ্রামের আলো হাওয়ায় বড় হওয়ার যেন একটাই উদ্দেশ্য, কিভাবে শহরে পাড়ি দেয়া যায়। আর এই গ্রামের কিশোরীরা, যারা বইখাতা বুকে চেপে ধরে, মাথা নিচু করে, দলবেঁধে স্কুলে আসে-যায়; যারা সকালে-বিকেলে বাড়ির উনুনে-উঠানে মা-চাচিদের কাজে যোগাল দেয়; গ্রামের বিয়ে-পার্বণে গোল হয়ে বসে একে অপরের হাতে মেহদির আলপনা আঁকে -- তাদের কাছে শহুরে যুবক মানে রাজপুত্তুর। এই রাজপুত্তুরেরা দেখতে সুন্দর। কথা বলে সুন্দর করে। সব বিষয়েই প্রচুর জ্ঞান রাখে। গ্রামের বাড়ন্ত মেয়েদের কাছে এদের সবকিছুই ভালো। 

মোশারফ হোসেন, ওরফে শিশু মিয়া, তেমনি একজন যুবক। পর পর কয়েক বছর ফেল করার পর ম্যাট্রিকের আশা স্থায়ীভাবেই বাদ দেয় একসময়। গত বছর স্কুলে হেড মাস্টারের অফিসের দফতরি হিসেবে কাজ পাওয়ার পর থেকেই কুর্তা পায়জামা পরা শুরু করেছে। এই গ্রামের সব ছেলেই লুঙ্গি পরে। এর ভেতরে পায়জামা পরা মানে সাহেবি লেবাসের একটু কাছাকাছি যাওয়া। এই শিশু মিয়া হঠাৎ করেই গুপ্তধনের সন্ধান পেয়ে গেল। হেড মাস্টার নিখিল পোদ্দারের ভাই ব্যবসায়ী-কনট্রাক্টর অখিল পোদ্দার স্থায়ীভাবেই ঢাকায় থাকেন। ঢাকার কাওরান বাজারে তার একটি বড় সবজির আড়ত। ওখানেই দারোয়ানের কাজ নিয়ে একদিন হঠাৎ উধাও হয়ে গেল শিশু মিয়া। মাস কয়েক পরে যখন ঢাকা থেকে ফেরত এল তখন তাকে আর চেনা যায় না। প্যান্ট-শার্ট পরে গ্রামের নতুন মাটি ফেলা সদর রাস্তা ধরে হেঁটে এল শিশু মিয়া। পায়ে বাটার স্যান্ডেল। হাতে লেদারের স্যুটকেস। গাঁয়ের সীমানার ভেতরে ঢুকতেই পেছন পেছন এক দঙ্গল খালি গায়ের বাচ্চার দল মিছিল করে হাঁটছে তার সাথে। রাস্তার পাশের বাড়িগুলো থেকে মেয়েরা উঁকি দিয়ে দেখছে আর ফিসফাস করে একে অপরকে জিজ্ঞেস করছে, পোলাডা কে গো? 

কিন্তু শিশু মিয়ার লটারির ভাগ্য বেশি দিন টিকে থাকে নি। কাজটা ছিল রাতের। অখিল পোদ্দার নিজে ব্যবসা দেখেন না। তার ম্যানেজার কাসেম ব্যাপারি আড়ত দেখাশুনা করেন। শিশু মিয়াকে প্রথম থেকেই হুঁশিয়ার করে দিয়েছিলেন সাবধানে থাকতে। অনেকটা আবেগহীনভাবেই তথ্যটা জানিয়েছিলেন কাসেম ব্যাপারি। আগের দারোয়ানদের একজন খুন হয়েছে মাস কয়েক আগে। এ কারণেই শিশু মিয়ার চাকরিটা হয়েছে এখানে। এই পদে দরকার ছিল একজন পোড় খাওয়া কর্মচারীর। স্কুলের দারোয়ান আর আড়তের দারোয়ান এক কথা নয়। শুধুমাত্র অখিল পোদ্দারের গ্রামের ছেলে বলেই কাজটা পেয়েছে সে। আসলে এটা বাবুর বদান্যতা। এখন চোখ-কান খোলা রেখে সাবধানে চলে চাকরিটা টিকিয়ে রাখা তার নিজের দায়িত্ব। 

খুনের কথা শুনে শিশু মিয়ার পেটটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠেছিল। তবে চেহারায় এর কোনো ছাপ পড়তে দেয় নি। ব্যাপারির কথা সবই মনোযোগ দিয়ে শুনেছে। কিন্তু কিভাবে সাবধান হতে হবে এর কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা পায় নি। বিষয়টার প্রকৃত গুরুত্ব আরও ভালো করে বোঝার জন্য অবশ্য খুব একটা বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয় নি তাকে। এক রাতে আড়তের পাশের নর্দমার কিনারে প্রস্রাব করতে দাঁড়িয়েছিল শিশু মিয়া। প্যান্টের বোতাম খুলে প্রস্রাবের একনালি স্রোতধারা নর্দমার দিকে তাক করে সামনের চিকা মারা দেয়ালের লেখাগুলো পড়ছিল সে আয়েশ করে। হরেক রকমের ক্যালিগ্রাফি, কিছু পুরোনো লেখা, আবার কিছু সাম্প্রতিক লেখা। ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন’, ‘সংগ্রামের অপর নাম ভিয়েতনাম ভিয়েতনাম’, ‘রাজবন্দীদের মুক্তি চাই’, ‘এক মুজিবের রক্ত থেকে লক্ষ মুজিব জন্ম নেবে’। শিশু মিয়া ছন্দ মিলিয়ে সুর করে পড়ছিল আর মাঝে মাঝে কোথ দিয়ে মূত্রথলিটা খালি করছিল। এমন সময়ই ঘটল ঘটনাটা। 

পেছন থেকে আচমকা কলার টেনে ধরল কেউ। কিছু বোঝার আগেই গলায় মাফলার পেঁচিয়ে হেঁচকা টান দিতে লাগল দুই দিকে দুই জন। মাথার পেছনে একটা আঘাত টের পেল আর মুহূর্তেই ঘুমিয়ে পড়ল শিশু মিয়া। হুঁশ আসার পর দেখে মুখের উপর ঝুঁকে বসন্তের দাগওয়ালা চেহারার একজন শাসাচ্ছে চোখ বড় করে: আর যদি আড়তে দেহি, ত হুমুন্দির পুত, তর আণ্ডাটা ছেইচ্ছা ফালামু। 

--বস, চেইনডা খোলাই আছে, দিমু নাকি একটা ছেঁচা? 

--হ, দে ছেঁচা। হালার পুতের বাপের নাম ভুলাইয়া দে। 

আদেশ পেয়ে পাশের টাকমাথা ছেলেটা সত্যি সত্যি শিশু মিয়ার জিপার খোলা প্যান্টে একহাত ঢুকিয়ে অণ্ডকোষ মুচড়ে ধরল। অন্য হাতে শূন্যে তোলা বোল্ডারটা নামাতেই ‘মা গো মা’ বলে গগন বিদারি চিৎকার করে শিশু মিয়া আবার জ্ঞান হারাল। 

এই ঘটনার পর শিশু মিয়া আর আড়তে ফেরত যায় নি। কাসেম ব্যাপারি অবশ্য বলেছিলেন বিষয়টার রফা করে ফেলেছেন। প্রতিপক্ষের সাথে একটা চুক্তি হয়েছে। আর এ রকম অঘটন হওয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু এই সব দফারফার নিশ্চয়তায় আশ্বস্ত হয় নি শিশু মিয়া। টাকমাথা ছেলেটার চেহারা ভেসে ওঠে মনে যখন-তখন। ফুলে উঠা অণ্ডকোষ আর মূত্রনালির চিনচিনে ব্যথা সারতে মাস কয়েক লেগেছিল। ওই সময়টা অখিল পোদ্দারের ধানমন্ডির বাড়িতে ফাইফরমাশ খেটেছে আর কাজের ধান্দায় পইপই করে ঘুরেছে এখানে-সেখানে। অখিল পোদ্দার ভয়ানক বিরক্ত হয়েছিলেন। বলেছিলেন এক মাসের বেশি থাকা যাবে না এই বাড়িতে। এটা কি লঙ্গরখানা? তবে ধমকা-ধমকি করলেও শেষমেশ অখিল বাবুই আবার ব্যবস্থা করে দিলেন। বাবুর নির্দেশ পেয়ে করিৎকর্মা কাসেম ব্যাপারি এবার টেলিফোন-সুপারিশ করে পাঠাল হিম্মত খানের দোকানে। এক সুপারিশেই চাকরি হয়ে গেল। 

নতুন এই কাজের জায়গাটা কসাই পট্টিতে। কাজটা নোংরা, তবে একটা ভালো দিক আছে এর। এই কাজটা দিনের কাজ। রাতের ঢাকা শহর তার কাছে এখন যমাতঙ্কের মতো। শিশু মিয়া যারপরনাই খুশি হয়ে যোগ দিল নতুন কাজে। কিন্তু প্রথম কয়েক দিনেই বুঝে গেল এখানে টিকে থাকা যাবে না বেশি দিন। আধো অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে ঘরে সার দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা চামড়া ছোলানো গরু। কাঁচা মাংস আর পচা রক্তের গন্ধ। মাছির ভনভন আর সিলিং ফ্যানের ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ। সেই সাথে থেকে থেকে হিম্মত খাঁর হাঁক। শিশু মিয়ার মনে হলো এ এক অন্য জগৎ। বড়ই অপরিচিত, বড়ই অচেনা। যে জগতে সূর্য নেই। আছে টিমটিমে বিদ্যুৎ বাতির আলো। মুক্ত হাওয়া নেই। আছে কৃত্রিম পাখাতাড়িত দুর্গন্ধযুক্ত বাতাস। যে জগতে কোমল মনের স্থান নেই। মানুষের দক্ষতার পরিচয় তার হৃদয়হীন কঠোরতায়। একদিন দেখে রক্তমাখা রাম দা হাতে নিয়ে সহকর্মী রফিকের দিকে তেড়ে গেল হিম্মত খাঁ। 

--আবে অই হালার পুত! তর মায়েরে...। কইলাম না সিনার মাংসগুলা কমিশনার ছারের লাইগ্যা আলাদা কইরা তুলবি? 

কথাগুলো বলা হয়েছে সহকর্মী রফিককে উদ্দেশ্য করে, শিশু মিয়াকে নয়। কিন্তু অকারণেই হঠাৎ নিজের মায়ের মুখটা ভেসে ওঠে শিশু মিয়ার মনে। 

এরপর ছিল ফেরিওয়ালার কাজ। শিশু মিয়ার খুব পছন্দ হয়েছিল। পুরোনো কাপড়গুলো কাঁধে আর হাতে ঝুলিয়ে গুলিস্তান থেকে পল্টনের ফুটপাতে ঘুরে ঘুরে ফেরি করতে হতো। দিনের শেষে মোটামুটি ভালোই আয়। রোজকার বেতনটা হাতে রেখে বাকিটা মালিককে বুঝিয়ে দিতে হয়। বিক্রি ভালো হলে মাঝেমধ্যে বখশিস আসে। সমস্যা শুধু পুলিশের। মাসের প্রথমেই মালিক পক্ষ নিয়ম করে চাঁদা তুলে পুলিশের কাছে পৌঁছে দেয় বখরা। তার পরেও মাঝে মাঝে পুলিশ তাড়া করে এদের। অনেকটা লোক দেখানোর জন্যই। নিয়ম হলো, তাড়া শুরু হলে দৌড়ে আড়ালে চলে যাবে। সরাসরি সামনে পড়লে পিঠে দু-এক ঘা সহ্য করো। কিন্তু কাপড়ের গাঁট হাতছাড়া করবে না। অণ্ডকোষের ব্যথাটার জন্য শিশু মিয়ার জোরে দৌড়াতে অসুবিধা। তাই প্রায় প্রতিবারই পুলিশের সামনে পড়তে হয়েছে। তৃতীয়বার তাড়া খাওয়ার সময় লাঠির বাড়িটা সরাসরি মাথায় এসে লেগেছিল। মাথা ঘুরে ওঠার পরের ঘটনা আর মনে নেই। তবে কিছুক্ষণ পরে টের পায় পুলিশ ভ্যানের ভেতরে বসে আছে গাদাগাদি করা আরও অনেকের সাথে। হাজতের ভেতরে ঢুকার পরেই বমি শুরু হলো তার। হাজতিদের চেঁচামেচিতে অনেকক্ষণ পর একজন অফিসার এসে দেখলেন তাকে। দেখেই সচকিত হয়ে উঠলেন ভদ্রলোক। ডিউটি অফিসারকে ডেকে আনলেন। খানিক পরামর্শের পর রিলিজ করার আদেশ দেয়া হলে সেপাইরা ধরাধরি করে রাস্তায় বের করে দিল তাকে। খোঁড়াতে খোঁড়াতে আর থেকে থেকে বমি করতে করতে ছয় নম্বর রোডের ধানমন্ডি থানা থেকে সরাসরি অখিল পোদ্দারের আট নম্বর রোডের বাড়িতে এসে হাজির হলো শিশু মিয়া। মাথা নত করে আবারও বাবুর দ্বারস্থ হতে হলো তাকে। 

সকালের নাস্তা সেরে বারান্দায় বসে পত্রিকা পড়েন অখিল পোদ্দার। এটা তার নিয়মিত অভ্যাস। পরদিন ওখানে ডাক পড়ল শিশু মিয়ার। সকালের রোদ এসে পড়েছে বারান্দায়। সাদা পাজামার উপর হাতাকাটা গেঞ্জি পরে ইজি চেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়ছেন অখিল পোদ্দার। মুখ ঢেকে আছে তার পত্রিকার পাতায়। পাশের মোড়ার উপর বসে ঘটনার আদ্যোপান্ত বর্ণনা দিলেন কাসেম ব্যাপারি। জানা গেল শিশু মিয়াকে ছেড়ে দিয়েছে বটে, কিন্তু পুলিশ মামলাটা ওঠায় নি। টাকা দিতে হবে। সব শুনে অখিল পোদ্দার রায় দিলেন: টাকাটা দিয়ে আসো, কাসেম। আর এই গর্দভটাকে বাড়ি পাঠাবার ব্যবস্থা করো। আজ দুপুরের ট্রেনেই পাঠাও। 

ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক হয়ে গেল শিশু মিয়া। বুঝে গেল, এই একটি আদেশের মাধ্যমে তার শহরবাসের সমাপ্তি ঘটল আজ। মুকন্দপুর থেকে যে স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিল সুরম্য শহরে তা হয়তো দুঃস্বপ্নের মতোই বয়ে বেড়াতে হবে বাকি জীবন। কিছুতেই মানতে পারছে না এই পরিণতি। কিন্তু বাবুর নির্দেশের বাইরে যাওয়ার সাহস নেই তার। মাথা নিচু করে বসে থাকল। 

আদেশ পাওয়ার পরপরই রায় কার্যকর করার প্রক্রিয়া শুরু করে দিল কাসেম ব্যাপারি। শিশু মিয়াকে নিয়ে বসানো হলো পেছনের বারান্দায়, যেখানে গ্রাম থেকে আসা লোকদের বসার ব্যবস্থা। নাস্তার জন্য বলা হলো বুয়াকে। 

--ভালো কইরা খাইয়া লও মিয়া ভাই। লম্বা জারনি। ট্রেনে খাওয়ার সুযোগ না-ও পাইতে পারো। 

--আমার জিনিসপত্র? 

--জিনিসের লাইগা এত চিন্তা ক্যান, মিয়া ভাই? কী এমন ধন-সম্পত্তি তোমার? 

মুখ তুলে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে শিশু মিয়া। এই দৃষ্টিতে অভিযোগের চেয়ে বেদনাই বেশি। সে জানে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের কাছ থেকে জোর করে আদায় করা যায় না কিছু। কাসেম ব্যাপারিও তাকাল এক ঝলক শিশু মিয়ার বেদনার্ত চেহারার দিকে। হঠাৎ কী মনে হলো, গলাটা নরম করেই বললেন এবার, আইচ্ছা ঠিক আছে। যাওয়ার সময় লইয়া যামু নে বস্তিতে। 

কসাইপট্টিতে কাজ পাইয়ে দেয়ার সাথে শিশু মিয়ার থাকারও একটা ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন কাসেম ব্যাপারি। ব্যবস্থাটা হয়েছিল জমির চাচার ছাপড়ায়। মহাখালীর যক্ষ্মা হাসপাতালের পেছনে একটা বস্তি আছে অখিল বাবুর লোকদের দখলে। খাস জমিতে ঝিলের উপরে সারি সারি মাচা তুলে গড়া হয়েছে এই বস্তি। শ-খানেকের মতো ছাপড়া ঘর। জমির আলি বলে একজন বুড়োমতো লোক সেটা দেখাশুনা করে। বস্তির সবাই তাকে চাচা বলে ডাকে। এই জমির আলির সাথেই এক খুপড়িতে থাকার ব্যবস্থা হলো শিশু মিয়ার। চাচার কাজ হলো মাসে মাসে ভাড়ার টাকা আদায় করে কাসেম ব্যাপারির হাতে দেয়া। বিনিময়ে হাতখরচ ছাড়াও বিনা ভাড়ায় থাকার জন্য বস্তির ভিতরেই অপেক্ষাকৃত বড় আকারের একটা ছাপড়া ঘর তার জন্য বরাদ্দ। 

কাসেম ব্যাপারি রিক্সা থেকে নামলেন না। বসে থেকেই নির্দেশ দিলেন, যাও, ঘরে ঢোকো মিয়া ভাই। নিজের পরিচয় দেও। চাচা জানে সব। আমি কইয়া রাখছি। 

পানির উপরে বাঁশের খুঁটি গেড়ে বাঁশের পাটাতন। তার উপরে চাটাই দিয়ে ঘের দেয়া ছাপড়া ঘর। উপরে টিন। নড়বড়ে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকেই শিশু মিয়া অবাক হয়ে দেখেছিল জমির চাচা নামের মানুষটি ছাড়াও আরও দুইটা প্রাণী ওই ঘরে। এক কোনায় ঝোলানো লোহার খাঁচায় একটা টিয়া পাখি। খাঁচার নিচে মেঝেতে একগাদা বিষ্ঠা জমে আছে। আরেক কোনায় গলায় শেকল বাঁধা একটি বানর। ঘরের ভিতরে বিষ্ঠা, সিগারেট আর কেরোসিনের ভ্যাপসা গন্ধ। শিশু মিয়া অপ্রস্তুত হয়ে থমকে দাঁড়াল দরজায়। তাকে দেখে দুটো প্রাণীই তারস্বরে চিৎকার করতে লাগল যতক্ষণ পর্যন্ত না জমির চাচা ধমকে থামালেন। ভগ্নস্বাস্থ্যের ছোটখাটো বুড়োমতো এই মানুষটি খাটের উপর বসে ক্রমাগত সিগারেট ফুঁকছেন আর থেকে থেকে কেশে চলেছেন। পাশের কেরোসিনের স্টোভে আগুন জ্বলছে, উপরে রাখা অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে পানি ফুটছে। কথা শুনে মনে হলো শিশু মিয়ার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন জমির চাচা। পরিচয় পর্ব শেষ হওয়ার পরেই জানালেন, তার হাঁপানির সমাস্যাটা এখন একদম শেষ পর্যায়ে। মনে হয় বেশি দিন আর বাঁচবেন না। পরিবেশের বিহ্বলতায় শিশু মিয়ার মাথায় ঢুকল না এর মর্মার্থ। 

প্রথম রাতেই অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা হয়েছিল শিশু মিয়ার। জমির চাচা প্রচণ্ড হাঁপানির টান নিয়ে বসে আছেন বিছানায়। তার বুকের চিঁ চিঁ আওয়াজে শিশু মিয়ার হালকা ঘুম ভেঙ্গে গেল সহজেই। সিগারেট ধরাতে গিয়ে হঠাৎ জমির চাচার কাশি শুরু হলো। এই অবস্থায় কী করতে হবে বুঝতে না পেরে শিশু মিয়াও উঠে বসল। পাখা ঝাড়া দিয়ে উঠে টিয়া পাখিটিও এবার কাশি দেয়া শুরু করল। শিশু মিয়া অবাক হলো খুব। স্পষ্ট মানুষের গলার মতো কাশি। জবাবে বানরটি কিচিরমিচির করে লাফিয়ে ওঠে। একসময় পাখির কাশি থামলেও বানরটি লাফাতেই থাকল চিৎকার করতে করতে। অসহ্য হয়ে উঠলেন চাচা। শ্বাসকষ্ট নিয়েই অকথ্য ভাষায় ধমকাতে লাগলেন বানরটাকে। ধমকে কাজ হলো না। আরও উচ্চস্বরে চিৎকার করতে লাগল বানর। চাচা এবার বিছানার পাশে রাখা একটা লম্বা বেত শিশু মিয়ার হাতে দিয়ে বললেন, একটু কষ্ট করেন ভাতিজা। ওই হালার বান্দরটারে কয়েকটা বাড়ি দেওন লাগব। নাইলে থামব না। 

এই আদেশে হতভম্ব হয়ে গেল শিশু মিয়া। খানিক ইতস্তত করে বেত হাতে বানরটির দিকে এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ল তার ক্রুদ্ধ মুখ। পাকানো চোখ দুটো হারিকেনের মৃদু আলোয় জ্বলজ্বল করতে করতে যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। বানরের মাথাটা বাঁচিয়ে পায়ের দিকে একটা জুতসই জায়গায় আঘাত করার সুযোগ খুঁজতে লাগল শিশু মিয়া। কিন্তু বানরটি কিছুতেই সেই সুযোগ দেবে না। তারস্বরে চিৎকার করতে করতে এদিক-ওদিক লাফাতে লাগল। মহা বিরক্ত হয়ে চাচা নিজেই উঠে আসলেন শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে। বেতটা ছিনিয়ে নিয়ে কষে এলোপাতাড়ি মারতে লাগলেন। আর আশ্চর্য, কয়েক ঘা পড়তেই বানরটিও চুপ মেরে গেল। পেছনের দরজা ঠেলে চাচা এবার ছাপড়ার বাইরে বাঁশের বেলকনির মতো জায়গাটায় গিয়ে লুঙ্গি উঁচু করে দাঁড়ালেন। খোলা দরজা দিয়ে এক ঝটকা দমকা হাওয়া এসে ঢুকল ঘরে। চাচার হাঁপানির শব্দের সাথে অনেক নিচে ঝিরঝিরে পানি পড়ার শব্দ কানে এল। বড় বড় কয়েকটা কাশি দিয়ে উঁচু গলায় ডাকতে থাকলেন চাচা, জয়নবের মা! জয়নবের মা! 

ঘরে এসে হারিকেনের সলতে বাড়িয়ে দিলেন চাচা। খাটে বসে হাঁপাতে লাগলেন অনবরত। হারিকেনের হলুদ আলোয় দেখা যাচ্ছে চাচার যন্ত্রণাকাতর চেহারা। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে নেয়া এক একটা শ্বাসপ্রক্রিয়া হাঁপরের শব্দ ছড়ায়। শ্বাসের তালে তালে গলা আর বুকের সকল মাংসপেশি শক্ত হয়ে ওঠে আর নামে। 

মেঝের বিছানা থেকে উঠে এসে জমির চাচার পাশে বসল শিশু মিয়া। 

--চাচা, কিছু করন লাগব? ওষুধ-টষুধ নাই? আপনের ত দেহি খারাপ অবস্থা! 

--না, জয়নবের মা আইতাছে। সব ঠিক অইয়া যাইব। 

কিছুক্ষণের ভেতরেই জয়নবের মা নামের মহিলাটি হন্তদন্ত হয়ে এসে হাজির। মনে হলো পাশের ছাপড়ায়ই থাকে। সাথে চোখ কচলাতে কচলাতে আসা ফ্রক পরা একটা বাচ্চা মেয়ে। এসেই কাজে লেগে গেল জয়নবের মা। চাচার গায়ের গেঞ্জি খুলে বুকে আর গলায় মালিশ করে দিতে লাগল। ভিক্সের তীব্র গন্ধ এসে লাগল শিশু মিয়ার নাকে। পরিচিত গন্ধ। মুকন্দপুরের হেড মাস্টার বাবুরও হাঁপানির শ্বাসকষ্ট ছিল। শিশু মিয়াকে দিয়ে ভিক্স কিনিয়ে আনতেন প্রায়ই। 

কিছুক্ষণের ভিতরেই চাচার শ্বাসকষ্ট কমে এল। বারকয়েক গলা খাকারি দিয়ে কফ নির্গত করার পর হাঁপানির আওয়াজও কমে গেল। চোখ বন্ধ করে খাটে লম্বা হয়ে শুয়ে আছেন চাচা। হারিকেনের উপর তেনা গরম করে তার বুকে সেঁক দিয়ে চলেছে জয়নবের মা। মৃদু আলোয় অস্পষ্ট তার মুখ। চাচার বুকের উপর ঝুঁকে আছে তার শরীর। অযত্নে জড়ানো শাড়ির ফাঁক গলে আধা-উদোম স্তন চাচার বুকে এসে লাগছে থেকে থেকে। মেঝের এক কোনায় বসে নিদ্রালু চোখে শিশু মিয়া অবাক হয়ে খেয়াল করল, ঘরে আরো একজন পুরুষের অস্তিত্ব মোটেও ধর্তব্যে আনছে না জয়নবের মা। আপন মনে মালিশ আর সেঁক চালিয়ে যাচ্ছে অতীব যত্নসহকারে। একসময় নাক ডাকা শুরু করলেন চাচা। জয়নবের মা উঠে দাঁড়াল। ঘুমন্ত মেয়েটিকে কোলে তুলে দরজা খুলে বের হয়ে গেল কোনো কথা না বলেই। 

বস্তিজীবনের মাসখানেকের মধ্যেই চাচার খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল শিশু মিয়া। পিতার মতো সম্মান করা শুরু করল তাকে। সকালে কাজে যাওয়ার আগে রান্না করে দিত। ফাইফরমাশ খাটত। রাস্তার কোনার দোকান থেকে ওষুধ এনে দিত। বিনিময়ে নিজেরও থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে গেল। নিজের কাজ শেষে চাচার কাজেও সঙ্গ দেয়া শুরু করল মাঝে মাঝে। গুলশানের বড় ফুটপাতে বসে টিয়া পাখি আর বানরের খেলা দেখান চাচা। ‘মন্টু বাবু নাচো, ধিনিক ধিনিক নাচো’ বলে বেত দিয়ে ইশারা করার সাথে সাথেই বানরটি নাচতে শুরু করে। সেই সাথে ডুগডুগি বাজিয়ে গান ধরেন চাচা। টিয়া পাখির কাজ হলো ভাগ্য গোনা। সামনে সার দিয়ে রাখা থাকে খাম। পাখিটিকে ইঙ্গিত দিলে বেছে বেছে একটা খাম তুলে আনবে ঠোঁটে। খাম খুললেই ভেতরের চিরকূট, ‘আপনি ভাগ্যবান, নতুন সংবাদের জন্য প্রস্তুত হউন’, কিংবা ‘ভালবাসায় নতুন মোড়, সিদ্ধান্তে অটল থাকুন’ -- এই সব বাক্যের নিগূঢ় কোনো অর্থ আছে কি না কে জানে। কিন্তু কাজের প্রথম দিনই শিশু মিয়া অবাক হয়ে দেখল, সামনের দামি শাড়ি পরা, কপালে লাল টিপ দেয়া মেয়েটি খুব খুশি হয়ে বিশ টাকা বখশিস দিয়ে গেল শিশু মিয়ার হাতে। হতবিহ্বল শিশু মিয়া কিছু বুঝার আগেই মেয়েটি উঠে গেল গাড়িতে। 

কিছুদিনের ভেতরেই শিশু মিয়া টিয়া পাখির বিষয়টি রপ্ত করে ফেলেছিল। কিন্তু বানরটিকে বাগে আনতে পারল না। মন্টু মিয়া নামের বানরটি মোটেও ভয় পায় না তাকে। আদেশেরও তোয়াক্কা করে না। জমির চাচা জানালেন, আরও সময় লাগবে। কিন্তু বেশি দিন সময় পাওয়া গেল না। তার আগেই বুকের ব্যথা আর রক্ত-কাশি নিয়ে মহাখালী হাসপাতালে ভর্তি হলেন চাচা। যাওয়ার সময় সবাইকে, যাকেই কাছে পেয়েছেন, বলে গেলেন, মারা গেলে টিয়া পাখিটি জয়নবের মার আর বানরটি শিশু মিয়ার। এরপর আর দুই দিন একা একা বেঁচে ছিলেন হাসপাতালে। শিশু মিয়া একবার গিয়েছিল তাকে দেখতে। চাচা তখন বেহুঁশ। আর কোনো আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ জানত না শিশু মিয়া। মরার পর কেউ লাশ আনতে যায় নি। শুনেছে বেওয়ারিশদের উঠিয়ে নিয়ে যায় আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের লোকেরা। 

দুপুরের ট্রেন ধরা যায় নি। স্টেশনে এসে দেখে ঠিক সময়মতো ছেড়ে গেছে ট্রেন। কাসেম ব্যাপারি মহা বিরক্ত। চিরদিন লেইট কইরা ছাড়ে ট্রেন। আইজই অনটাইম ছাড়তে হইল? 

এরপর শিশু মিয়ার কাঁধে বসে থাকা বানরটির দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, শালার বান্দইরা কপাল! 

বাবুর লোকজন শিশু মিয়াকে পুলিশের কর্ডনের মতোই ঘিরে রাখে বাকিটা সময়। স্টেশন থেকে বের হতে দেয় নি এক পা। কাসেম ব্যাপারির ব্যবহারেও আগের আন্তরিকতা নেই। বস্তিতে নিয়ে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু রিক্সা থেকে নামার আগে থেকেই তাড়া দেওয়া শুরু। অনুনয়-বিনয় করে সামান্য সময় কাটিয়েছে বস্তিতে। তাও শুধু বানরটিকে সাথে নেয়ার জন্য। কাসেম বানর দেখেই হুঙ্কার দিয়ে উঠেছিল, আরে আরে, এইডা কী? বান্দর দিয়া তুমি কী করবা মিয়া? 

--জমির চাচা আমারে দিয়া গেছে এইডা। 

--তা তো বুজলাম। জমির মিয়া বান্দরের খেলা দেখাইত ঢাকা শহরে। কিন্তু গাঁও-গেরামে পয়সা দিয়া কেডা দেখব তোমার বান্দরের খেইল? 

শিশু মিয়া কোনো উত্তর দেয় না। বানরটিকে ঠিকঠাক আয়ত্তে আনতে পারে নি এখনো। তাই খেলা দেখানোর আশা নেই আপাতত। নিজের সম্পত্তি হিসেবেই দেখছে সেটা। চাচার কাছ থেকে পাওয়া অর্পিত সম্পত্তি। শিশু মিয়ার মনে হলো, এই মুহূর্তে বানরটির বাণিজ্যমূল্য না থাকলেও পণ্যমূল্য আছে ঠিকই। সময়-সুযোগ বুঝে হয়তো কোনো না কোনো ক্রেতার কাছে বিক্রি করে দিতে পারবে। কাসেম ব্যাপারি না বোঝার ভান করলেও শিশু মিয়া বুঝেছে বাজার আর বাণিজ্য অর্থনীতির এই বিষয়টা। এই কয়দিন রাজধানীতে বসবাস করে, কসাই পট্টি আর ফুটপাতে কাজ করে এইটুকু লাভ হয়েছে, বাজার-বাণিজ্যের প্রাথমিক জ্ঞানটুকু ধরতে পেরেছে। 

শেষমেশ রাতের ট্রেনেই উঠিয়ে দেয়া হলো শিশু মিয়াকে। সিট না পেয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসেছিল শিশু মিয়া। নিজের তেমন ঘুম না হলেও কোলে বসে আরাম করে ঘুমিয়েছে মন্টু মিয়া। সারা রাস্তা ট্রেনের ঝাঁকুনিতে আধা-ঘুম আধা-জাগা অবস্থায় মুকন্দপুর স্টেশনে এসে যখন পৌঁছাল তারা, তখন ফজরের আজান পড়ছে। প্লাটফর্মে নেমেই দেখে আকাশ ফর্সা হয়ে এসেছে। কয়েকটি তারাসহ আধ ফালি চাঁদ ঝুলে আছে পশ্চিমের মাঠের উপর। পেচ্ছাবে ভরে আছে শিশু মিয়ার তলপেট। এক্ষুণি খালাস করতে হবে। দ্রুত একটা জুতসই জায়গা খুঁজতে লাগল। শেষ রাতের ট্রেনে মুকন্দপুর স্টেশনে তেমন যাত্রীর আসা-যাওয়া নেই। পুরোটা প্লাটফর্মই ফাঁকা। সবুজ বাতি দেখিয়ে লাইন ম্যান দাঁড়িয়ে আছে শেষ মাথায়, ইঞ্জিনের কাছে। উলটো দিকে হাঁটা দিল শিশু মিয়া, যাতে লাইন ম্যানের সামনে পড়তে না হয়। হুইসেল বাজল। শেষ বগির জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে সবুজ বাতি দেখালেন গার্ড। ছোট্ট একটা সিটি দিয়ে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে ঘড়ঘড় শব্দ করে চলা শুরু করল ট্রেন। 

প্লাটফর্ম ধরে একটু হেঁটে স্টেশন ঘর পার হয়ে একটা দেয়ালের আড়ালে প্রস্রাব করতে দাঁড়াল শিশু মিয়া। প্যান্টের বোতাম খুলতেই টের পেল অণ্ডকোষের চিনচিনে ব্যথাটা চাড়া দিয়ে উঠেছে। শিশু মিয়ার ভয় হলো শেষ পর্যন্ত প্রস্রাব করতে পারবে কিনা। আড়তের ঘটনাটার পর খোলা জায়গায় আর প্রস্রাব করতে পারে না সে। প্রচণ্ড চাপ থাকলেও বের হতে চায় না। মাঝে মাঝে নিজের উপরেই রাগ হয়। দীর্ঘ কসরতের পরই কেবল কাজটা সারতে পারে। কিন্তু আজ কোনো অসুবিধা হলো না। অন্ধকারে প্রস্রবের একনালি স্রোতধারা চোখে পড়ছে না, কিন্তু স্পষ্ট টের পাচ্ছে অনেক দূর পৌঁছে গেছে। ছোটবেলা পশ্চিমের মাঠে ডাঙ্গুলি খেলে বাড়ি ফেরার আগে লাইন ধরে এই প্রতিযোগিতা চলত। শিশু মিয়ার মনে হলো শৈশবের সেই কসরতটাই যেন করছে সে। এই দেয়ালটির অপর পারেই মুকন্দপুরের পশ্চিমের মাঠ, তার শৈশবের খেলার মাঠ, বার্ষিক ওয়াজ মাহফিলের মাঠ, মাঘি পূর্ণিমার মেলার মাঠ, রাজনৈতিক নেতাদের বক্তৃতার মাঠ। যুদ্ধের আগে এই মাঠেই বিশাল জনসভায় বক্তৃতা দিয়েছেন শেখ মুজিব। আবার যুদ্ধের সময় এই মাঠেই ট্রেনিং নিয়েছে রাজাকারের দল। 

রাজনীতির কথায় হঠাৎ মনে হলো সেদিন পল্টনের এক পথসভায় তাদের হকার শ্রমিক নেতা লাল মিয়া ভাইর বক্তৃতার কথা। লুঙ্গি প্রায় কোমর পর্যন্ত তুলে শাসাচ্ছেন লাল ভাই, আমাকে জেলে নিবা? জেলে নিবা? প্রস্রাব কইরা ভাসাইয়া দিমু তোমার জেল। 

কথাটা বলার সময় কোমর সামনে উঁচিয়ে এমন একটা ভঙ্গি করলেন যেন সবার সামনে এক্ষুণি কর্মটি সারবেন। রাস্তার পাশে সার বেঁধে বসা একসারি মহিলা শ্রমিকসহ গোটা পঞ্চাশেক শ্রোতার দল হো হো করে হেসে উঠেছিল। অনেকক্ষণ চলল হাততালি। 

কথাটা মনে হতেই খেয়াল করল, শিশু মিয়ার প্রস্রাব আজ থামছেই না। হালকা শিরশিরে সুখানুভূতির সাথে দীর্ঘকাল জমে থাকা ক্লেদাক্ত নিঃসরণ যেন অন্তঃসলীলা ফল্গুধারার মতো বেরিয়ে আসছে তো আসছেই। শিশু মিয়ার মনে হলো লাল ভাইয়ের মতোই সে প্রস্রাবে ভাসিয়ে দিতে পারে পৃথিবী। খানিক উপরে তাক করে চোখ বন্ধ করে কল্পনা করতে লাগল, মুকন্দপুর রেলস্টেশন থেকে উদ্গিরীত স্রোতধারা মিছিল ভাঙ্গা জলকামানের মতো আছড়ে পড়ছে গিয়ে ঢাকা শহরে। ঢল নামছে মতিঝিল থেকে বনানী, গুলশান থেকে ধানমন্ডি। প্রস্রাবের দুর্গন্ধে নাকে রুমাল চেপে ‘সাফ কাপুরিয়া’ জনপ্রতিনিধির দল সংসদ ভবনের ছাদে উঠে মুখ হাঁ করে শ্বাস নিচ্ছেন। মনে হলো শিশু মিয়ার নিজের নাকেও দুর্গন্ধ এসে ঠেকল। চোখ খুলেই দেখে মন্টু মিয়া দাঁড়িয়ে আছে সামনের দেয়ালের উপর। শিশু মিয়ার মতো সেও শিশ্ন উঁচিয়ে মূত্র ত্যাগ করছে। বানরের জলকামান তাক করা শিশু মিয়ার দিকে। সরাসরি মুখে এসে ছিটকে লাগা তরলের গন্ধযুক্ত উষ্ণ আর্দ্রতায় লাফিয়ে সরতে গেল শিশু মিয়া। দড়াম করে পা ফসকে পড়ল নিচে। মাথাটা লাগল সরাসরি কংক্রিটের দেয়ালে। ঝুনা নারকেলে হাতুড়ি চালানোর মতো একটা শব্দ কানে এল আর হাতের শেকল ফসকে গেল হেঁচকা টানে। ছাড়া পেয়েই একলাফে সরে গেল বানর। তীক্ষ্ণ চিৎকারে শিশু মিয়াকে একটা ভেংচি দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে উধাও হয়ে গেল দেয়ালের ওপারে। মাটিতে শুয়ে থাকল শিশু মিয়া, ডাকল, মন্টু মিয়া, মন্টু মিয়া। কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না গলা থেকে। প্রচণ্ড মাথাব্যথাসহ ভোরের আকাশের দিকে চোখ মেলে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় ধীরে ধীরে চোখ বুজল সে। আগের অভিজ্ঞতা থেকে জানে সে, জ্ঞান হারাচ্ছে এক্ষুণি। কিন্তু জানে না এবার এই জ্ঞান ফিরবে কি না আর। ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার পর নির্জন স্টেশনকে আরও ভীষণ নির্জন মনে হয়। কিন্তু চোখ বোজার আগে শিশু মিয়ার মনে হলো আজকের এই নির্জনতা সত্যি নয়, মুকন্দপুর গ্রামে সে মোটেও বেওয়ারিশ কেউ নয়। নিজের মাটিতে পরম শান্তিতে শুয়ে আছে শিশু মিয়া। মৃত হলেও একটু পরেই তাকে দেখতে দলবেঁধে ছুটে আসবে পুরো গ্রাম। 


লেখক পরিচিতি
হুমায়ূন কবীর
আমেরিকার টেনাসীতে থাকেন।
পেশায় চিকিৎসক। কবি। কথাসাহিত্যিক।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন