বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

মোজাফফর হোসেনের জার্নাল : কয়েকটি কথা



কাফকায়াস্ক
-------------------------
কাফকার সাহিত্য আধুনিক আমলাতান্ত্রিক জীবনযাত্রার প্রতীকী উপস্থাপন। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন যে, একজন ব্যক্তির ফাইল বা নথিপত্র ওই ব্যক্তির জায়গা জুড়ে নিয়েছে—ফাইলটাই হলো আসল, ব্যক্তি তার ছায়াবিশেষ। কাফকার সাহিত্যের অন্য একটা অপরিহার্য দিক হলো, অপরাধীর অপরাধ খুঁজে নেওয়া। আপনাকে জেলে বন্দি রেখে অত্যাচার করা হচ্ছে, কাজেই আপনাকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, আপনি অপরাধী। সমস্যাটা শুধুমাত্র সামাজিক বা রাজনৈতিক নয়, মনস্তাত্ত্বিকও বটে।
অভিযুক্ত একসময় সত্যি সত্যি মেনে নেয় যে সে অপরাধী। সে নিজেই তার শাস্তির যথার্থতা আবিষ্কার করে। কাফকায় এই সমস্ত পরিস্থিতিটা মনে হবে যেন উপহাস, শুধুমাত্র পরিস্থিতির শিকার ওই চরিত্রগুলোর কাছে মনে হবে এটা একটা দুঃস্বপ্নের মতো। (এই উপহাসকে কুন্দেরা দেখছেন এইভাবে, ‘আমাদেরকে মানুষের মহত্ত্বের সুন্দর ইলিউশন দেখিয়ে দুঃখবোধ সান্ত্বনা জানায়। কমিক বড়ই নিষ্ঠুর, এটা নির্মমভাবে আমাদের বেঁচে থাকার অর্থহীনতার ওপরই অর্থারোপ করে।’)। কাফকা যে জগৎটা চিহ্নিত করছেন সেই জগৎটা অফিস-আদালত ও আমলা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

কুন্দেরার সেই ইঞ্জিনিয়ারের গল্পটি আমাদের কনটেক্সট থেকে বলছি। ঢাকার এক অ্যাক্টিভিস্ট আমন্ত্রিত হয়ে দিল্লিতে এক সভায় অংশ নিলেন। ধরা যাক তার নাম পিকে দাশ। তিনি সেইখান থেকে ফিরে আসার পর খবরের কাগজ হাতে নিয়ে দেখলেন লেখা হয়েছে: “দিল্লির একটি আলোচনা সভায় পিকে দাশ স্বদেশ সম্পর্কে কুরুচিকর মন্তব্য করেছেন। ভারতের কাছে অনেক গোপন তথ্য পাচার করে তিনি অচিরেই দেশ ছেড়ে পশ্চিমে আশ্রয় নেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছেন।”

ঐ অ্যাক্টিভিস্ট নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তিনি ছুটে গেলেন পত্রিকার অফিসে। সম্পাদক ক্ষমা চাইলেন। বিষয়টা সত্যিই অস্বস্তিকর, কিন্তু তার কিছু করার নেই, লেখাটা তিনি পেয়েছিলেন অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয় থেকে। অতঃপর তিনি পৌঁছালেন মন্ত্রণালয়ে। সেখানে তাকে বলা হল যে, হ্যাঁ এটা একটা ভুল, কিন্তু তাদেরও কিছু করার নেই কারণ এইরকমই রিপোর্ট পাঠিয়েছেন দিল্লি দূতাবাসের গোয়েন্দা বিভাগ। জনাব দাশ অনুরোধ করলেন খবরটা প্রত্যাহার করার জন্য। তারা জানালেন প্রত্যাহার করার নিয়ম নেই, তবে এতে কোনো সমস্যা হবে না বলে তারা জানিয়ে দিল।

কিন্তু জনাব দাশ বুঝতে পারলেন যে তাকে নজরে রাখা হচ্ছে, তার টেলিফোনে আড়ি পাতা হচ্ছে, এবং তাকে রাস্তায় অনুসরণ করা হচ্ছে। তার ঘুম বন্ধ হয়ে গেল। তিনি দুঃস্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন। অবশেষে আর চাপ না নিতে পেরে, অনেক ঝুঁকি নিয়ে বেআইনিভাবে দেশত্যাগ করলেন। সত্যি সত্যিই রাজনৈতিক কারণে অবৈধ অভিবাসী হতে বাধ্য হলেন।

এই পলাতক ভদ্রলোক কোনোদিনই জানতে পারবেন না তার সম্পর্কে কে এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা দিয়েছিলেন। তাঁর পরিস্থিতি যেন আদালতের সামনে জোসেফ কে কিংবা ক্যাসেল-এর সামনে জমির জরিপকারী কে-এর মতই। এদের তিনজনেই একটা গোলকধাঁধার মত প্রতিষ্ঠানের কাছে বন্দি। অন্যান্য ঔপন্যাসিকেরা প্রতিষ্ঠানের মুখোস খুলেছেন এমনভাবে যেন এইগুলো আসলে বিভিন্ন ব্যক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কাফকা দেখালেন প্রতিষ্ঠান একটা স্বতন্ত্র নিয়মে চলে, কেউ জানে না কে এই নিয়মগুলির চালক বা কবে চালু হয়েছিল, কিন্তু নিয়মগুলো আর কেউ পরিবর্তন করতে আসে না।

কাফকা হয়ত ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভেবে এভাবে লেখেননি। তাঁর কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল বলে আমরা জানি না। প্রকৃতির নিয়মেই যেন কাফকার গল্পগুলো আজও সত্য হয়ে দেখা দিচ্ছে। কাফকা এভাবেই খুব সাধারণ একজন মানুষের অতি সাধারণ একটা গল্পকে মিথে রূপান্তরিত করেছেন। মিথটা তৈরি, চরিত্র সেখানে পা দিচ্ছে সিস্টেমের অংশ হিসেবে।


ইউটিউবে টেড-এড বক্তব্য শুনুন নিজের লিঙ্কে ক্লিক করে--


তিনটি উপন্যাস নিয়ে কথা
------------------------------------------------------
আজ আমার ভীষণ প্রিয় ৩টি উপন্যাসের কথা বলতে চাই। তিনটি উপন্যাসই কথাসাহিত্যের ইতিহাসে অত্যন্ত প্রভাবশালী। এর মধ্যে একটি উপন্যাস বিশ্বে সমগ্র উপন্যাস সাহিত্যের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। অন্যটিকে জাদুবাস্তব উপন্যাসের অন্যতম আইকন হিসেবে মানা হয়। মার্কেসের ‘শতবছরের নিঃসঙ্গতা’ উপন্যাসটির মতো অনেক বিখ্যাত জাদুবাস্তব উপন্যাসের প্রেরণা এই উপন্যাস। অপরটি পরাবাস্তব উপন্যাসের প্রতিভূ।

প্রথম:
উপন্যাসের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাসটি লেখা হয় ১৬১৫ সালে। দন কিহোতে। এটা আমার ব্যক্তিগত মত। মেটাফিকশন আধুনিক এবং উত্তর-আধুনিককালের সাহিত্যে আলোচিত বিষয় হলেও সেরভান্তেসের দন কিহোতে উপন্যাসে এই কলাকৌশলের প্রয়োগ ঘটেছে। ছোট্ট একটা নমুনা দিচ্ছি: উপন্যাসের ভেতর লেখক সেরভান্তেস এক জায়গায় বলছেন, মূল কাহিনিটি তাঁর নিজস্ব নয়। আরব লেখক সিদি হামিদ বেনেনগালি প্রথম দন কিহোতের জীবনী-উপন্যাস রচনা করেন। সেটির অনুবাদ হয় স্প্যানিশ ভাষায়। সেই অনুবাদ পড়েই সেরভান্তেস এই গ্রন্থ রচনায় হাত দেন। অথচ মজার বিষয় হল, এর পুরোটাই সেরভান্তেসের বানানো গল্প। সিদি হামিদ বেনেনগালি নামে কোনো আরবি লেখকই নেই। তাই এই উপন্যাসের মূল কাহিনিটি অনুবাদ হওয়ারও প্রশ্ন আসে না। ৬০৫ সালে প্রকাশিত হয় ‘দন কিহোতে’-র প্রথম খণ্ড। একজন অসৎ লেখক এর দ্বিতীয় খণ্ড নিজ নামে লিখে বাজারে ছেড়ে দেন। ক্রোধে, ক্ষোভে সেরভান্তেস নিজেই আবার লিখতে লাগলেন দ্বিতীয় খণ্ড। এখানেও মজার ব্যাপার হল, বর্ণনায় মধ্যে মধ্যে দেখা যাচ্ছে যে, দন কিহোতে তার জীবনকাহিনি নিয়ে সেরভান্তেসের লেখা বইটি পড়েছেন, প্রথম খণ্ডটি নকল হওয়ার গল্পও তাঁর জানা আছে। এভাবেই এখানে ফিকশনের মধ্যে বাস্তব ঢুকে গেছে। আবার উল্টো বাস্তবের মধ্যে ফিকশন ঢুকে গেছে; যেমন, লেখক বলছেন বইটি তিনি পুনলেখন করেছেন। তার একটি বাস্তবসম্মত গল্প তিনি ফেঁদেছেন, যেটি অনেকে বিশ্বাসও করেছেন। গল্পে লেখক নিজে ঢুকে পড়েছেন কোথাও কোথাও। যে কারণে, ‘দন কিহোতে’ উপন্যাসটিকে মেটাফিকশনধর্মী উপন্যাস বলা চলে। বিশ্বসাহিত্য এবং চলচ্চিত্রে আমার প্রিয় চরিত্র দন কিহোতে।
যারা চলচ্চিত্র দেখতে পছন্দ করেন তারা Arthur Hiller পরিচালিত Man of La Mancha দেখতে পারেন। তবে আমার ভালো লেগেছে Orson Welles-এর ভার্সন, ১৯৯২ সালে মুক্তি পায়। কয়েক বছর আগে The Man Who Killed Don Quixote নামে একটা সিনেমা মুক্তি পেয়েছে মূল গল্পের ছায়া অবলম্বনে। আমাকে ততটা টানেনি। তবে জনি ডেপ অভিনীত ডকুফিল্ম Lost in La Mancha-টি দেখার মতো।

কুখ্যাত হিটলার এই উপন্যাস পড়ে বলেন: “All of Spain is contained in DON QUIXOTE—-a decrepit society unaware the world has passed it by.”

**********

দ্বিতীয়
লাতিন আমেরিকার শক্তিশালী কথাশিল্পী হুয়ান রুলফোর এক-বসাতেই পড়ে ফেলার মতো উপন্যাস ‘পেদ্রো পারামো’; কিন্তু এর প্রভাব কয়েক হাজার পৃষ্ঠার উপন্যাসের সমান। ম্যাজিক রিয়েলিজম দীক্ষার জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত কাজ আর হয় না। যে কারণে মার্কেস বলেছেন, ‘পেদ্রো পারামো’ পড়ার কারণেই তিনি ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউড’ লিখতে পেরেছেন। এই শতকের শুরুর দিকে উরুগুয়ের নামকরা দৈনিক El País ভোটিং পল খুলে দেশটির লেখক ও সমালোচকদের কাছে জানতে চায়, লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস কোনটি? দৃশ্যত ব্যবধানে প্রধান উপন্যাস হিসেবে উঠে আসে মেক্সিকোর হুয়ান রুলফো(১৯-১৭-১৯৮৬)-এর ‘পেদ্রো পারামো’র নাম। এই ক্ষীণকায় উপন্যাসটিকে হোর্হে লুই বোর্হেস বলেছিলেন এটি লাতিন আমেরিকা তো বটেই গোটা বিশ্বেরই উল্লেখযোগ্য গুটিকতক ভালো কাজের একটি। এই উপন্যাসে অলীক এবং বাস্তবতা এমনভাবে মিশে গেল যে তা আর আলাদা করে চিহ্নিত করার অবস্থায় রইল না। রুলফো কোমালা নামের যে গ্রামের কথা বললেন সেটি মৃতদের গ্রাম। মৃতমানুষের কণ্ঠস্বর বাসাতে ভেসে বেড়াচ্ছে। হুয়ান প্রিসিয়াদো মা মারা যাওয়ার পর মায়ের কথাগুলো বাবার সন্ধানে কোমালা গ্রামে এসেছে। লোকজন সেখানে আছে বটে কিন্তু তারা কেউ স্বাভাবিক মানুষ না। সবকিছু এমনভাবে বলা হচ্ছে যেন সেটা ভিন্ন একটা জগত—স্মৃতির অন্য একটা স্তর। গ্রামটি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘sits on the coals of the earth, at the very mouth of hell।’ হুয়ান গ্রামে এসে জানতে পারে তার বাবা পেদ্রো পারামো অনেক আগেই মারা গেছে। হুয়ান মানুষের কণ্ঠস্বর ও বাতাসে শব্দ শুনতে পেয়ে গ্রামটি এখনো জীবিত আছে বলে মনে করে। সে মনে করে তার মা তাকে কথা দিয়েছিল, এই গ্রামে আসলে সে তার মায়ের কণ্ঠস্বর শুনতে পাবে। হুয়ান এক বৃদ্ধার বাড়িতে আশ্রয় নেয়। বৃদ্ধা দেখা মাত্রই হুয়ানকে চিনতে পারে। তারা ভ্রমণের উপলক্ষ সম্পর্কেও সে পূর্বাগত। বৃদ্ধা জানায় মারা যাওয়ায় সময় হুয়ানের মা সব বলে গেছে। অথচ তার মা মারা গেছে দূরবর্তী কোনো স্থানে। এভাবে উপন্যাসের গল্প যতই এগোয় তত রহস্য তৈরি হয়। উপন্যাসটি ১৯৫৫ সালে লেখা হলেও দন কিহোতের মতো এখানেও উত্তরাধুনিক উপন্যাসের নানা উপকরণ বিদ্যমান। উপন্যাসের প্রথম দিকে ন্যারেটর থাকে হুয়ান প্রিসিয়াদো নিজেই। দ্রুতই গল্পকথকের ভূমিকায় অন্য একজন চলে আসে। মাঝে মাঝেই হুয়ানের মৃত-মা বর্ণনাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। উপন্যাসের সময়টা ঠিকমতো ধরা যায় না। এটি অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের নানা মুহূর্ত চষে বেড়ায়।
১৯৬৭ এবং ১৯৮১ সালে এর কাহিনি থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়। ১৯৬৭ সালেরটা বিশেষভাবে উল্লেখ করব, কারণ এই সিনেমার চিত্রনাট্য রচনা করেন বিশ্বখ্যাত লেখক কার্লোস ফুয়েন্তেস।

"They say that when people from there die and go to hell, they come back for a blanket." ―pedro paramo

**********

তৃতীয়
ফরাসি পরাবাস্তববাদী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান (সাহিত্যিক) দৃষ্টান্ত ‘নাদজা’ (১৯২৮)। আদ্রেঁ ব্রে‌তোঁর আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস। অনেকে অবশ্য একে উপন্যাস হিসেবে মানেন না। আমি উপন্যাস হিসেবে দেখতে চাই। নাদজা নামের রহস্যময় কিশোরীর মুখোমুখি হন লেখক। ব্রে‌তোঁ সাহিত্যের নান্দনিকতা ও একাকীত্বের সৌন্দয তুলে ধরেছেন তাঁর পরাবাস্তব পরিভ্রমণের ভেতর দিয়ে। সুরিয়ালিজমকে ব্রে‌তোঁ একিসঙ্গে ‘artistic movement’ এবং ‘political activity’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। নাদজা তার সেই ধারণারই যেন জীবন্ত প্রতিরূপ। সে একি সঙ্গে পরাবাস্তবতার নান্দনিক এবং রাজনৈতিক অনুশীলন। তাৎক্ষণিক বাস্তবতার বাইরের বায়বীয় বাস্তবতা দেখা এবং নিজেকে অলীক চরিত্র হিসেবে পুনসৃজন করার ক্ষমতা নাদজাকে পরাবাস্তবতার শৈল্পিক সিদ্ধি হিসেবে দেখা যায়। পুরো আখ্যানজুড়ে নাদজা লেখক এবং পাঠকের কাছে স্বপ্নে দেখা চরিত্রের মতো রহস্যময় থেকে যায়। উপন্যাসটি শুরু হয় ‘Who am I?’ প্রশ্ন দিয়ে এবং শেষ দিকে কথক প্রশ্ন করেন ‘Who is the real Nadja?’

“Perhaps my life is nothing but an image of this kind; perhaps I am doomed to retrace my steps under the illusion that I am exploring, doomed to try and learn what I simply should recognize, learning a mere fraction of what I have forgotten.”― André Breton

Attached photos
1. Don Quixote, c.1955 Art Poster Print by Pablo Picasso
2. Photo from Hannah's Blog
3. Book cover

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন