বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০

সিলভিয়া প্লাথে'র গল্প : সাফল্যের দিনগুলি



অনুবাদ: রোখসানা চৌধুরী


এলেন একগাদা সদ্য শুকানো ভাঁজ করা ডায়াপার নিয়ে বেডরুমের দিকে যাচ্ছিল তখনই তীক্ষ্ম স্বরে ফোনটা শরতের মিষ্টি সকালের সকল স্তব্ধতাকে চুরমার করে দিয়ে বেজে উঠল। সে মুহূর্তের জন্য দরজার গোড়ায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে স্বপ্নের মত একটা দৃশ্য দেখতে লাগল। গোলাপের ডিজাইন করা পর্দাগুলো, ঘন সুবজ সুতা সে নিজে সেলাই করেছিল বাবু হওয়ার আগে। পুরনো আমলের হাতে বোনা নকশি কাঁথাটা পেয়েছিল এক বুয়া খালার কাছে, তাকে ভালোবাসত অনেক। কোনায় পড়ে আছে হালকা ফ্যাকাশে গোলাপি রঙ গামলাটা সব কিছুর মধ্যমণি হয়ে সেখানে বাবু সোনা জিল ঘুমাচ্ছে।


প্লিজ, গড সবকিছু যেন এভাবেই থাকে, আমরা তিনজন যেন এসব সামান্য কিছু নিয়েই সুখী হতে পারি। এসব ভাবতে ভাবতে এলেন বিপুলায়তন ডায়পার পর্বতের ভেতর থেকে তীক্ষ্ম গগণবিদারী শব্দে বাজতে থাকা ফোনের দিকে এগিয়ে যায়। অবহেলার সাথে কালো রিসিভারটা তুলে ধরে।

“রোজ জ্যাকব বলছেন?”

দৃঢ আত্মবিশ্বাসী একটি নারীকন্ঠ বলে উঠল- ডেনিস কে বলছি। এলেনের মন যেন তারের ওপাশের সুসজ্জিত গাঢ় তামাটে রঙ বিন্যস্ত কেশের অভিজাত নারীটিকে দেখতে পাচ্ছিল।

সে আর জ্যাকব মাত্র মাসখানেক হলো টেলিভিশনের মেধাবী এই সুন্দরী প্রযোজকের সাথে লাঞ্চ করেছিল। জ্যাক সেবারই প্রথম তার নাটকের অগ্রগতি নিয়ে কোন প্রযোজকের সাথে বসেছিলো। এলেন তখন গোপনে আশা করে বসেছিল ডেনিস হয়তো জ্যাকের লেখা নাটক পড়ে এতটাই মুগ্ধ হয়ে যাবে যে অস্ট্রেলিয়ায় নাটকের শো নিয়ে নাট্যকার আর প্রযোজকের মধ্যে নাটকের রিহার্সেল নিয়ে ব্যস্ততম দিন কাটবে আর দুজনের যৌথ সমন্বয়ে দারুণ কিছু ঘটবে।

‘না, জ্যাক তো বাসায় নেই’- বলতে গিয়ে এলেনের খুবই অস্বস্তি আর গ্লানিবোধ হচ্ছিল। অথচ কত সহজেই সে ডেকে দিতে পারে জ্যাকব কে। সে তো জাস্ট ওপরের ফ্ল্যাটেই আছে, মিসেস ফ্র্যাংকফোর্টের ফ্ল্যাটে। এত জরুরি একটা ফোনকল। এলেন জানত, দু’মাস ধরে জ্যাকবের নাটকের স্ক্রিপ্ট পড়ে ছিল ডেনিস কে-র অফিসে। জ্যাক প্রতিদিন অপেক্ষা করেছে, বেল বাজলে দৌড়ে নিচে নেমেছে দরজা খুলতে। তবুও অনুগত ব্যক্তিগত সহকারীর মত সে প্রতিজ্ঞা ভেঙে তাকে ডাকতে গেল না। জ্যাকের নিরিবিলি লেখার কাজে বিঘ্ন ঘটবে বলে। সে ডেনিস কে-র কাছে নিজের পরিচয় দিয়ে মেসেজ রেখে দিতে অনুরোধ জানালো।

ডেনিস উৎফুল্লচিত্তে বলল, সুখবর আছে জ্যাকের জন্য। আমার বস নাটকটার ব্যাপারে ব্যাপক উৎসাহ দেখিয়েছেন। নাটকটা কিঞ্চিৎ অদ্ভুত হলেও একদমই মৌলিক ভাবনা প্রসূত লেখা। তাই আমরা এটা কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সবচেয়ে বড় কথা আমিই হতে যাচ্ছি এর প্রযোজক।

ও আচ্ছা (তাহলে এই হলো ব্যাপার) মনে মনে প্রসাদ গুণল সে। দেখতে না চাইলেও উজ্জ্বল তামাটে চুলের সুসজ্জিত মাথার সাথে জ্যাকবের কালো মাথার একটি ধূসর পাণ্ডুলিপিকে সাক্ষী রেখে যৌথ প্রয়াসে যা যা ঘটতে পারে তা যেন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দেখে ফেলল সে।

‘দারুণ ব্যাপার, মিস কে, আমি....আমি জানি জ্যাক খুব খুশি হবে, সত্যি বলতে ও অপেক্ষাই করছিল।

‘খুব ভালো। তাহলে তাকে বলে দেবেন লাঞ্চের সময় আমি তার জন্য অপেক্ষা করব। সে যেন আমাকে তুলে নেয়। আমরা চরিত্রের অভিনেতা অভিনেত্রী নির্বাচন নিয়ে আলাপটা সেরে ফেলতে পারব।’

‘নিশ্চয়ই জানাবো।’

‘আচ্ছা, তাহলে রাখি এখন গুড বাই।’

ওপাশে খুবই সন্তর্পণে রিসিভার রেখে দেবার শব্দ পাওয়া গেল।

কোন এক অজানা শক্তি কিংবা হৃদয় উপচানো আবেগ এলেনকে যেন থামিয়ে দিল একদম। সে অনড় দাঁড়িয়ে রইল জানালায়। কানের কাছে একটা আত্ম বিশ্বাসী সুরেলা কন্ঠ কাঁচঘরে জন্মানো আঙ্গুরের ঝোপার মত বাজতে লাগল। একটু পরেই তার মনোযোগ চলে গেল বাসার সামনের মলিন সবুজ লনের দিকে। একটু বেলা বাড়তে থাকলেই এই জায়গাটা মোটর বাইক আর বাচ্চাকাচ্চার হট্টগোলে মেলা বসে যাবে। গরমের বিকেলে একবার সে গুনেছিল মোট পঁচিশ জন তরুণ জড়ো হয়েছিল গাছের নিচে সংকীর্ণ পরিসরে। তার আর জ্যাকবের একটা স্বপ্ন ছিল যে (স্বপ্নটা ঐতিহাসিক হয়ে যাবার পথে অবশ্য) শহরের ধুলোবালি আর ধোঁয়া থেকে অনেক দূরে, সমুদ্র তীরে তাদের একটা ছোট্ট বাড়ি থাকবে। সবুজ বাগান থাকবে, পাহাড় থাকবে, জিলের খেলার জন্য অবারিত প্রশস্ত জায়গা থাকবে আর থাকবে অনিঃশেষ শান্তি।

‘শুধু একটা মাত্র নাটক বিক্রি হতে দাও, ডার্লিং, তারপর দেখো। তার আগে তো এত বড় ঝুঁকি হাতে নেয়া যায় না।’

হ্যাঁ, তা অবশ্য ঠিক। ঝুঁকিই বটে। জ্যাকব এর মধ্যে কত রকম চাকরিই না বদলালো, অড জব করল, কখনো পার্ট টাইম। কখনো আত্মীয় স্বজনকে বলে সাময়িক ম্যানেজ করে নিয়েছে। অথচ তখন সে বেঁচে যাওয়া প্রতিটি মিনিট লেখায় ব্যয় করেছে। আর ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছে সেই সব গল্প, নাটক আর কবিতার বদলে উপার্জনের। আহা কবিতাগুলো। এলেন মৃদু হেসে জিলের জন্মের আগের টানাটানির দিনগুলো মনে করলো, এই নতুন ফ্ল্যাটে ওঠার আগের দিনগুলো। সে তখন প্রসবপূর্ব মুহূর্তের নানা যন্ত্রণায় সময় কাটাচ্ছে, পুরোনো স্যাঁৎসেতে সেই বাড়িতে জায়গা কম বলে জ্যাকব বইয়ের শেলফ কেটে ছোট করছিল। এমন সময় ডোর বেল বেজে উঠলে জ্যাক তাকে সিঁড়ি ভাঙতে নিষেধ করল।

যখন থেকে জ্যাকব ম্যাগাজিনের জন্য লেখা পাঠানো শুরু করেছিল নীল ইউনিফর্ম পরা ডাকপিওনকে তখন স্বর্গের দূত মনে হতো, যদিও প্রতিবার মোটা খামে ফেরৎ পাণ্ডুলিপির সাথে প্রত্যাখ্যানের চিঠি কিংবা নিদেনপক্ষে উৎসাহবাচক কোন পত্র থাকত সম্পাদকের পক্ষ থেকে। কিন্তু সেই দিনটা ছিল অন্যরকম। ‘এলেন, এলেন দেখো কি কাণ্ড।’ প্রায় চিল্লাতে চিল্লাতে জ্যাক উপরে ওঠে এসেছিল হালকা নীল হলুদ বর্ডার দেয়া খাম হাতে নিয়ে। সেই খামে ছিল কবিতা বাবদ পাওয়া অবিশ্বাস্য অংকের চেক। তারা সেই টাকায় কিছুদিন ইচ্ছামতো রেস্তোরাঁয় খেয়েছে, সিনেমা দেখেছে, ঘুরে বেড়িয়েছে- তারপর বাকি টাকা দিয়ে কি করা যায় সেই ভাবনা জ্যাকব এলেনের উপর ছেড়ে দিয়েছিল। খুব বেশি বাকি ছিল না অবশ্য। তাই এলেন সিদ্ধান্ত দিয়েছিল ‘একটা বড়সড় প্র্যামের জন্য। জ্যাক অবাক হয়েছিল, কিন্তু এলেন দুটো বাচ্চা বসতে পারে এরকম বড়সড়, মজবুত আকর্ষণীয় দেখতে একটা প্র্যামের সিদ্ধান্তে অনড় ছিল। এলেন মনে মনে আজকের সুখবরটাকে হালকাভাবে দেখার চেষ্টা করছিল, তাই ওপর থেকে নেমে এলেই জ্যাককে খবরটা দেবে বলে ভাবছিল, যাতে যতটা সম্ভব দেরিতে সেই স্মার্ট, সুদর্শনা প্রযোজিকার সাথে তার স্বামীটির দেখা হয়। তারপরই সে নিজের কাছে লজ্জা পেয়ে গেল। অন্য কোন বউ হলে এতক্ষণে ছুটে যেত সুখবরটা দেয়ার জন্য আগ পিছু না ভেবে। দরকার হলে ফোন করত। লেখালেখিতে কিছুটা বিঘ্ন ঘটাতো নিয়ম ভেঙ্গে, এত বড় সুখবরের জন্য।

‘আমি আসলে মধ্যযুগেই পড়ে আছি, সংকীর্ণ চিত্ত, ঈর্ষাকাতর সাধারণ ঘরে থাকা বউদের মতো।’ অথবা ন্যান্সি রিগ্যানের মতো। এসব ভাবতে ভাবতে নিজের জন্য এক কাপ কফির খোঁজে গেল সে। স্টোভে কফির পট বসাতে বসাতে নিজের ওপর বিরক্ত হচ্ছিল সে। কারণ যতক্ষণ পর্যন্ত জ্যাক খবরটা না পাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত নিজেকে নিরাপদ ভাবার মতো আজব অনুভূতির হাত থেকে ছাড়া পাচ্ছিল না সে। একটা কুসংস্কার তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিল তাকে- মনে হচ্ছিল, তার ভাগ্যও ন্যান্সির মতো হয়ে যাবে।

জ্যাকব আর কেইথ রিগ্যান স্কুলের সহপাঠী। তারা দুজনই যুদ্ধের পর লন্ডনে ফিরে এসেছিল ভাগ্য ফেরাতে। দীর্ঘদিন তারা মাথা-নোয়ানো ছোটখাট চাকুরিতে দিনমান বিসর্জন দিয়েছে, কিন্তু এরপর থেকেই চেষ্ট চালিয়ে গেছে অড জব ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি লেখার কাজে নিয়োজিত হতে। কফির পানি ফুটে উঠল বোধ হয়। এলেন কফি মেশালো, ভাবছিল সেইসব কঠিন চ্যালেঞ্জিং দিনগুলোর কথা। সে আর ন্যান্সি রিগ্যান মিলে কম খরচে যত ধরনের রান্না করা যায় আর সংসার চালানো যায় তার গোপন কৌশন গুলো আয়ত্ত করে ফেলেছিল। যেসব স্বামীরা বেকার থাকে, অথবা কম বেতনে নাইটগার্ড বা মালির কাজ করতে বাধ্য হয় তাদের স্ত্রীদের এসব কৌশল আপনা আপনি আয়ত্তে এসে যায় অবশ্য।

কেইথ প্রথম সফলতার মুখ দেখেছিল। তার নাটক ‘ওয়েস্ট এন্ড’ বুদ্ধি করে শহরের বাইরের থিয়েটারে মঞ্চস্থ করেছিল, যেখানে লোকে এমনিতেই বিনোদনের সুযোগ পেলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তাছাড়া সে ব্রডওয়ের কিছু ফ্লপ কিন্তু সুদর্শন তারকাদের জুটিয়েছিল। সব মিলে তার নাটক দাঁড়িয়ে যায়। আর সঙ্গে সঙ্গে স্পাগাটি আর পটেটো সুপ থেকে সে এক লাফে কেনসিংটনের দামি খাবার, ভিনটেজ ওয়াইনে পৌঁছে যায়। ঠান্ডা স্যাঁতসেঁতে কুটির ছেড়ে স্পোর্টস কার, ফার কোট, আলিশান বাড়িও করে ফেলে- আর এত আলোর নিচে অন্ধকারে সজ্জিত ডিভোর্স কোর্টও চলে আসে সাথে। তার নাটকে নবাগত যে মেয়েটি অভিনয় করেছিল তার চেহারা, প্রতিভা, সম্পদ সবকিছুতে যে ছিল সেরা, অতুলনীয় তারই জন্য ঘর ভেঙ্গেছিল ন্যান্সির। কেইথ একসময় ছিল উদার মনের প্রেমময় বউ, ক্রমেই সে শহরের সবচেয়ে অস্থিরচিত্ত, কর্কশকন্ঠী উন্মাদ মহিলায় পরিণত হয়। এমনকি বিবাহ বিচ্ছেদ বাবদ তার পাওনা ক্ষতিপূরণের খুব কম অংশই সে আদায় করতে পেরেছিল।

কেইথ সেসব নিয়েও ক্রুদ্ধ হয়েছে, লড়াই করেছে। আর এলেন সবসময় তাকে সঙ্গ দিয়ে গেছে। ন্যান্সির প্রতি সহানুভূতি থেকে। আর ন্যান্সিও হয়তো জ্যাক- এলেন ও তাদের শিশুসহ সুখী পরিবারের মধ্যে নিজের পুরনো হারানো দিনগুলোর ঘ্রাণ ফিরে পেত।

এলেন বিশাল একটা মগে কফি নিয়ে বসল, একটা শেষ করে আরেকটা ঢেলে নিচ্ছিল, ধীরে বিষন্ন চিত্তে। ‘আমি আসলে যোগ্য সহধর্মিনী হতে পারিনি।’ ভাবতে ভাবতে খুব যত্নে সস্তা টিনের ট্রেতে নাস্তা সাজালো, ন্যাপকিন-চিনির কৌটো-ক্রিমের স্প্রেয়ার, শরতে ফোটা ফুলের ডালসহ একগোছা ফুল পাশে ধূমায়িত কফি নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে থাকলে মিসেস ফ্ল্যাঙ্ককোর্টের উপরের ফ্ল্যাটের দিকে।

ফ্ল্যাটটা জ্যাকের এক মধ্যবয়সী বিধবা বোনের। বোনটি মজা করে বলত, বউ বাচ্চা নিয়ে দুই রুমের ফ্লাটে একজন লেখক লিখবে কীভাবে। তার চেয়ে আমার এখানে আসো, আমি না হয় ভবিষ্যৎ বিশ্বসাহিত্যের একজন কর্ণধারকে কিছুটা সাহায্য করতে পেরে ধন্য হবো। এরপর থেকে সেই ব্যবস্থাই চলছে। এলেন অবশ্য জ্যাকবের কথামতো তার বোনটির কয়লার টিন পরিষ্কার করা, ময়লার ঝুড়ি ফেলে দেয়া, গাছে পানি দেয়ার মতো কাজগুলো শেষ করে বোনটির খোঁজ খবরও নিয়ে আসত। জিল যখন বাসায় দুষ্টুমি করত, এলেন তাকে সামাল দিত, আর জ্যাকব চলে যেত সেই ফ্ল্যাটে।

মিসেস ফ্ল্যাঙ্কফোর্টের দরজা আস্তে করে চাপ দিতেই খুলে গেল আর চোখ পড়ল জ্যাকবের পিঠের দিকটা, কালো চুলে ভরা মাথাটা আর শ্যাগি ফিশারম্যান ব্রান্ডের সোয়েটারটা যার কনুইতে যে সে কতবার সেলাই দিয়েছে তা চাইলেও মনে রাখা সম্ভব না।

দফতার সাথে সেলাই মেশিনের টেবিলটাকে খবরের কাগজে মুড়ে একটা স্ট্রেচারের মতো বানিয়ে নিতে হতো। যাতে শব্দে জ্যাকেবের লেখায় বিঘ্ন না ঘটে। যদি সে তার নিঃশ্বাস বন্ধ করে স্থির দাঁড়িয়ে থাকতে পারত। কিন্তু জ্যাকবও যেন অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে চুলে হাত দিয়ে ঘুরে তাকালো আর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। তাকে দেখে জ্যাকবের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। এলেন তখন হাসিমুখে এগিয়ে গেল খাবারের ট্রে হাতে। অবশেষে সুখবরটা দিতে।

ডেনিস কে-র অফিসে যাত্রাকালে পরিচ্ছন্ন শেভ করা মুখ, পরিপাটি আঁচড়ানো চুল আর সুন্দর ভাবে ব্রাশ করা সুট পরা জ্যাকবকে দেখতে খুব সুদর্শন লাগছিল। (যদিও তার একটাই সুট ছিল।) আর অজানা কারণে এলেনের মনটা নিস্তেজ হয়ে আসছিল। জিল ততক্ষণে সকালের ঘুমটা শেষ করে উঠে উজ্জ্বল চোখমুখ নিয়ে শব্দ করে যাচ্ছিল-চা ডা ডা...। এলেন এস্ত ভঙ্গিতে ক্ষিপ্র হাতে তার ডায়াপার বদলাচ্ছিল দেখে শিশুটির খেলা বাধা পাচ্ছিল, এলেনের মন অন্য কোথাও উধাও হয়ে ছিল, তাই একটা কলম দিয়ে আপাতত তাকে শান্ত করে রাখল। পিঠের কাছে বালিশটা ঠিকঠাক ভাবে বসিয়ে দিয়ে এলেন শিশুটির দুপুরের খাবার খাওয়াতে বসল। হঠাৎই যেন তার চোখ গিয়ে পড়ল তাকের ওপর ছোট্ট কাটিং গ্লাসের একটা ফরাসি পারফিউমের শিশির দিকে। যদিও বেবি পাউডার, কড লিভার আয়েলের জার আর কটন উলের স্তুপের আড়ালে ওটা হারিয়েই গেছে বলতে গেলে। তবুও যেন আড়াল থেকে উঁকি মেরে তার দিকে তাকিয়ে বিদ্রুপের হাসি হেসে চলেছে। জ্যাকবের কোন এক সময়ের কবিতার বিল বাবদ পাওয়া, যেটি আবার প্র্যাম কেনার পর বেঁচে যাওয়া টাকা থেকে কেনা হয়েছিল। তাও কি কখনো সে ওটা ইচ্ছামতো ব্যবহার করতে পেরেছিল নাকি রেশনের বাঁধা বরাদ্দের মতো ফোঁটায় ফোঁটায় মেপে ঢেলেছে, অমরত্ব সুধার মতো? ডেনিস কে-র মতো মহিলারা নিশ্চয়ই তাদের বেতনের একটা অংশ পারফিউমের মতোই ব্যবহার করে হাওয়ায় মিলিয়ে দিতে পারে।

এলেন বড় বড় লোকমায় দ্রুত সেদ্ধ গাজর জিলের মুখে ঢুকিয়ে দিচ্ছিল এমন সময় বেল বাজল। সে কোল থেকে জিলকে বিছানার উপর রেখে সিঁড়ি ভেঙ্গে দ্রুত নিচে নামল অভ্যস্ত ভঙ্গিতে। ফিটফাট পোশাক পরা এক ভদ্রলোক দরোজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন যেখানে একরাশ বাতিল দুধের বোতল স্তূপীকৃত হয়ে পড়ে ছিল। ‘জ্যাকব রোজ আছেন? আমি কার্ল গুডম্যান, ইমপ্যাক্টের এডিটর।’

এলেন সাথে সাথে চিনল, খুব অবাকও হলো, মাত্র কদিন আগেই এই জনপ্রিয় মাসিক পত্রিকাটি জ্যাকবের তিনটি কবিতা গ্রহণ করেছিল। গাজরের ছিটে পড়া জামা আর বিছানার জন্য কুচকে থাকা এ্যাপ্রন নিয়ে জড়োসড়ো হয়ে এলেন করুণ কন্ঠে জানালো জ্যাকব ঘরে নেই। লজ্জিত কন্ঠে এও বলল, আপনি ওর কয়েকটা কবিতা নিয়ে যান, আমরা ধন্য হবো।

কার্ল গুডম্যান হেসে বলল, ‘আমি আপনাকে তাহলে বলি আমি কেন এসেছি, আমি খুব কাছেই থাকি আর অফিস থেকে লাঞ্চে যাওয়ার পথে এখানে এলাম। ডেনিস কে সকালে ফোন করেছিলেন আমাদের অফিসে আমরা যেন জ্যাকবের সব নাটক না হলেও কিছু নাটকের অংশবিশেষ প্রকাশ করি। আমি নিশ্চিত হতে এসেছি যে, আপনার স্বামী যেন অন্য কোন ম্যাগাজিনকে কথা না দিয়ে দেয়।’

‘আরে না, ও ঐটা করবে না।’ এলেন চেষ্টা করছিল তার কণ্ঠস্বরকে যথাসম্ভব শান্ত রাখতে। ‘আমার ধারণা সে এটা করবেনা। মানে আপনি নিশ্চিতই ধরতে পারেন। আমরা খুব খুশি হবো যদি আপনারা ওর নাটক ছাপেন। একটা নাটকের কপি বোধহয় ওপরে আছে। আমি নিয়ে আসিগে।’

‘প্লিজ, তাহলে খুব ভালো হয়।’

যথাসম্ভব দ্রুত সে ওপরে ফিরে এসে দেখল জিল আকাশ বাতাস ফাটিয়ে চিৎকার করছে ‘একটু অপেক্ষা করো, বাবুসোনা আমার।’ বলেই বিশালায়তন নাটকের পান্ডুলিপিটা দুহাতে তুলে নিয়ে সিঁড়িতে নামতে থাকল। এই সেই পান্ডুলিপি, কত যে চায়ের অবসর কেটেছে জ্যাকবের নির্দেশনায় এটার টাইপ করতে করতে।

কার্ল গুডম্যান তাকে ধন্যবাদ জানালো বটে কিন্তু এলেনের যেন মনে হলো, লোকটা তাকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে কিছু একটা মেপে নিল। হয়তো তার মাথার মুকুটের মতো শোভা পাওয়া রুক্ষ চুলের বিনুনি দিয়ে বানানো খোঁপা কিংবা ক্ষয়ে যাওয়া চপ্পলের দিকে লক্ষ্য করে সে বলে উঠল, আমরা নাটকগুলো দেখে গ্রহণযোগ্য হলে সঙ্গে সঙ্গে এ্যাডভান্স পেমেন্ট পাঠিয়ে দেয়ার চেষ্ট করব। এলেন অপ্রতিভ লজ্জায় লাল হয়ে গেল। মনে মনে ভাবলে ‘না না আমরা কি টাকার জন্য এতটা পাগল হয়ে গেছি বলে মনে হলো।’ মুখে বলল, আচ্ছ, ঠিক আছে।

এবারও জিলের কান্নার শব্দ শুনতে শুনতে এলেন সিঁড়ি ভাঙ্গছিল। কিন্তু ধীরে, ভাবনামগ্ন হয়ে। ‘আমি তো ঘরে থাকতে থাকতে একটা ন্যাকড়াই হয়ে গেছি, আমি যদি ন্যান্সি হতাম চেক হাতে পাওয়া মাত্র কোন পারলারে দৌড়াতাম চেহারা পলিশ করতে, আর শপিং মলে যেতাম গাড়ি ভর্তি করে জামা-গহনা কিনতে। কিন্তু আমি তো ন্যান্সি নই।’-

নিজেকে সে শক্তভাবে প্রবোধ দিল। মুখভর্তি মাতৃত্বের অম্লান অমলিন হাসি জড়ো করে জিলের খাওয়ানো শেষ করতে বসল। বিকেলে ডাক্তারের চেম্বারে জিলের নিয়মিত চেকাপের জন্য গিয়ে ওয়েটিং রুমে বসে ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে যেন অন্য জগতে ডুবে যাচ্ছিল কল্পনায়। যেন সে এই সব পত্রিকার পাতায় নির্নীলিত চোখে তাকিয়ে থাকা সুসজ্জিত ঝলমলে পোশাকের মডেল তরুণী কোন।

আচ্ছা, তাদের কি সবার আমাদের মতো করেই দিনটা শুরু হয়? ভুলভাবে?- সে অবাক হয়ে ভাবতে থাকে মাথায় ব্যথা নিয়ে (নাকি হৃদয়ের ব্যথা নিয়ে?)

আর সে ভাবতে থাকে এইসব স্বর্গের পৃথিবীতে বাস করা রূপকথার মেয়েরা ঘুম থেকে ওঠে গোলাপী গাল আর শিশির ভরা চোখ নিয়ে, তারা আলস্য ভরা হাই তোলে নরম তুলতুলে আদুরে বিড়ালের ভঙ্গিতে। এমনকি চূড়ান্ত ব্যস্ত দিনেও তাদের চুল থাকে ঢেউ খেলানো সোনালী বা নীলচে কালো, সকালের নাস্তা আসে সুরভিত রান্নাঘর থেকে, যেখানে পরিচ্ছন্ন ফিটফাট কিচেন টাওয়াল পরা বাবুর্চি নিয়ে আসে মুচমুচে টোস্টের ওপর রসালো কাঁকড়ার মাংস, ক্রিমে ভরা মাশরুম আর ডিমের পদ।

নাহ, এলেন আবার মনের মধ্যে ভেসে ওঠা ছবিগুলোকে পালটিয়ে ফেলে। সবকিছু ঠিকই আছে, বাবুর্চি- খাবারের ট্রে-মুচমুচে টোস্ট, পারিজ আর কমলা সুগন্ধী চা-ও, কেবল এই সবকিছুর মধ্যমণি হয়ে তার মানসপটে একটি মুখই ভেসে ওঠে- সেটা হলো ডেনিস কে’র মুখ। তাকেই ঠিকঠাকভাবে এসব কিছুর মধ্যে মানিয়ে যায়। ঘন তামাটে কালো চুলের জলপ্রপাতের ভেতর ফুটে থাকা গাঢ় বাদামি চোখের মেয়েটি। ইশশ্ যদি সে এমন যোগ্য স্বাবলম্বী সহধর্মিনী হতে পারত, যদি... মিসেস রোজ? রিসিপশনিস্টের আলতো হাতের ছোঁয়ায় তার দিবাস্বপ্ন কেটে গেল। সহজভাবে সে বর্তমানে ফিরে এল। এক জ্যাকবের বাড়িই আছে যেখানে সে ফিরতে পারে, সেই একই চায়ের টেবিল, একইরকম সবকিছু যা হোক, সে জিলকে নিয়ে ধীর পদবিক্ষেপে ডাক্তারের কাছে হেঁটে চলল।

এলেন খুব সাবধানতার সাথে দরোজা খুলল। ঘুমন্ত জিলকে ডানা থেকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে প্রতিবেশির সেলাই মেশিনে মেয়ের জন্য জামা বানাতে লাগল।

সকালটা ছিল রীতিমত বিশ্বাসঘাতক। পরিষ্কার ঝকঝকে উজ্জ্বল গাছের সারির সবুজ রঙ বাড়িঘর সহ চারপাশকে ম্লান করে দিচ্ছিল।

আমি এখানেই থাকব, এখানেই থাকতে চাই।-আপনমনে লাল টুকটুকে ফ্লানেলের কাপড় কাটতে কাটতে সে ভাবছিল। যেরকমভাবে অসংখ্য বিলাসিতার পাড়গুলো ছেঁটে ফেলে সে জীবন নির্বাহ করত। ফোন বাজল।

কাপড়, সুঁই-সুতা, পিন, টিস্যু, কাঁচি সবকিছু এলোপাথাড়ি হয়ে তার পায়ের কাছে পড়ে রইল। এমনিতে জ্যাকব কোথাও আটকে গেলে ফোন করে জানতো, সেটা নিয়ে এলেন খুব বেশি চিন্তিত হতো না। কিন্তু আজকের এই বিশেষ মুহূর্তে জ্যাকবের যে কোন কথা শোনার জন্য, হোক না তা অতি তুচ্ছ, সে যেন মরুভূমিতে তৃষ্ণার্ত পথিকের জন্য এক ফোঁটা জলের মত কাম্য ছিল।

‘হ্যালো ডার্লিং!’ ন্যান্সি রিগ্যানের কর্কশ নাটকীয় কন্ঠস্বর ভেসে এল। ‘কেমন চলছে সবকিছু?’

‘এই তো, চলছে আর কি’-এলেন ভাণ করল ‘হ্যাঁ ভালোই চলছে। ’খবর গোপন করার কোন চেষ্টা করল না অবশ্য। বলল-জ্যাকবের নাটক অবশেষে পত্রিকার সম্পাদক এসে নিয়ে গেছে।

‘হ্যাঁ, জানি জানি।’

‘কিন্তু কীভাবে?...’ (কীভাবে সে সর্বশেষ ব্রেকিং নিউজ পেয়ে গেল? একেবারে পেশাদার ম্যাগপাই, অশুভ আত্মার দূতপাখি!)

‘আহা, বন্ধু এটা তো সোজা হিসাব আমি ডেনিস কে-র সাথে জ্যাকবের মিটিংয়ের সময় ঐ রুমের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। তুমি তো জানোই আমাকে, কৌতুহল দমাতে না পেরে আমি ঐ রুমে ঢুকে যাই দেখার জন্য কিসের সেলিব্রেশন চলছে। আমি জানতাম না জ‍্যাকব মার্টিনির জন্য ওখানে গিয়েছিলাম। বন্ধু লাল চুলোদের একলা ছেড়ে দাও।...

সন্দেহ আর দুর্দশার এক শীতল স্রোত এলেনের রক্তে হামাগুড়ি দিতে দিতে তার শরীরকে একবার ঠান্ডা, আবার গরম করে দিচ্ছিল।

ন্যান্সির পরামর্শ, অশুভ নোংরা ইঙ্গিত সবকিছুই খুব অসহ্য ঠেকছিল। তারপরও সহজ গলায় সে বলল, ‘জ্যাকবের নাটক একটা দৃশ্য পাল্টানোর কথা ছিল, কিন্তু দুনিয়ার মানুষ ছুটি পেলেও এক জ্যাকবেরই কোন ছুটি থাকে না।’

ন্যান্সির খনখানে গলা বেজে উঠল, ‘ও নিয়ে তুমি চিন্তা কোরো না, নাটকের স্ক্রিপ্টের সমাপ্তি লেখা বিষয়ে আমি বিশেষ ভাবে অভিজ্ঞ। ও হ্যাঁ, তুমি পার্টি দিচ্ছ তো?’

‘পার্টি?’

এলেনের মনে পড়ল প্রথমবার যখন জ্যাকবের লেখা বাবদ বড় বিল পেয়েছিল তখন তারা সেই উপলক্ষে জ্যাকঁজমক করে বিশাল পার্টি দিয়েছিল। কি ছিলনা সেই পার্টিতে? সুস্বাদু গরুর মাংস ক্যাভিয়ার, বাইরে থেকে আনা চিজ, সুপ, চিকেন পাই, বোতলে বোতলে শ্যাম্পেন, যেগুলোর অধিকাংশ রিগ্যানই মেরে দিয়েছিল।

আকাশ ভরে উঠেছিল চিমনির ধোঁয়ায়। যদিও ছোট বাসাটা অভ্যাগত অতিথিদের জায়গা দেয়া যাচ্ছিল না, তবুও হাসি- আনন্দ, নাচে-গানে, খাদ্য-পানীয়তে ভরপুর হয়ে ছিল।

সেই স্মৃতি মনে করে এলেন বলে উঠল, আরে নাহ। কোন পার্টি হবে না।

আপাতত আমরা গ্যাস আর ইলেকট্রিক বিলগুলো দিতে পারলে বাঁচি। তাছাড়া জিলের পেছনেও তো এখন খরচ কম না।’

“এলেন!”-ন্যান্সি আশাভঙ্গ স্বরে বলল, কোথায় গেল তোমার সব স্বপ্ন কল্পনা?’

‘আমার ধারণা স্বপ্নের প্রকারটা বদলেছে।’ এলেন স্বীকার করল।

‘বুড়োদের মতো অজুহাত দিলে যদিও, তবুও তোমার কন্ঠের বিষন্নতা টের পাওয়া যাচ্ছে এলেন। তুমি আমাকে চায়ের জন্য হলেও ডাকো তারপর দুজনের আলাপে সমস্যাগুলো মেটানো যাবে।’

এলেন ম্লানভাবে হাসল। ন্যান্সি ছিল চরম দায়িত্বহীন। তার সম্পর্কে কেউ মানসিক অবসাদের অভিযোগ দিতে পারবেনা। কিংবা চরম ভোগ বিলাসের জন্য কোন অনুশোচনা। দাওয়াত সে নিজেই নিয়ে নিতে পারে, কাউকে কষ্ট করে দিতে হতো না।

‘আচ্ছা, আমাকে বিশটা মিনিট সময় দাও।’ ন্যান্সী এল।

‘আচ্ছা, এখন বলো তো তুমি আসলে কি করতে চাইছ?’ সে পরে এসেছিল দামি লোমশ ফারের কোট। ষড়যন্ত্রের ভঙ্গিতে ফিসফিস করে কথা বলছিল সাথে তিন নম্বর কাপকেক খেতে খেতে বলল- ‘উমমম লায়ন বেকারির চাইতেও ভালো। যা হোক,

তুমি আসলে কি করছ কি করতে যাচ্ছ জানি না। খোলাখুলি বলি, তোমার উচিৎ নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া, নিজেকে নিয়ে আরো আত্মবিশ্বাসী হওয়া।’

‘তুমি কি বলতে চাইছ, আমি সত্যি বুঝতে পারছিনা। সে জিলের দিকে মনোযোগ দিল, তার পরিষ্কার চোখের প্রশংসা করতে করতে কমলার জুস খাওয়াতে ব্যস্ত হলো।

‘অধিকার দিয়ে কি করব আমি?

‘তোমার ভেতরকার নারীত্বকে ফিরে পেতে অবশ্যই। তোমার দরকার দীর্ঘ সময়ের পরিচর্যা। লম্বা সময় ধরে তুমি আয়নায় নিজের দিকে তাকাওনি, নিজেকে দেখো একবার বেশি দেরি করে ফেলার আগে।

অস্থিরভাবে বলতে লাগল ন্যান্সী। সঠিক সাজ পোশাক, সুবিন্যস্ত চুল বাঁধা, এসবই এখন দরকার তোমার। এখন তোমার সময় এলেন। ভুল করো না। সে শক্ত গলায় আরো বলল পুরুষেরা স্বীকার করবেনা ঠিকই, কিন্তু তারা আসলে এসবই চায়। মেয়েদের ঠিক মেয়েলিভাবেই।

‘আমি আসলে কখনোই পারলার, হেয়ার স্পা-এসবের জন্য খরচ কুলিয়ে উঠতে পারিনি।’ এলেন খোঁড়া যুক্তি দিয়ে বিষয়টা কাটাতে চাইল।

জ্যাকব আমার লম্বা চুল পছন্দ করে তো। (মনে মনে যদিও নিজেকে জিজ্ঞেস করল, কবে শেষ বার সে লম্বা চুলের প্রশংসা করেছিল, গত সপ্তাহ? গত মাসে?)

ন্যান্সি উত্তেজিত হয়ে বলতে লাগল -তুমি জ্যাকবের ক্যারিয়ার-সাফল্যের জন্য নিজের সবকিছু বিসর্জন দিয়ে ফেলেছ মেয়ে। কিন্তু সে তো তার জায়গায় পৌঁছে গেছে। তুমি কবে ভাববে নিজের কথা। জেগে ওঠো মেয়ে, ভেতরটাকে জাগিয়ে তোল । এর পর এলেনকে দীর্ঘ সময় ধরে ন্যান্সী মনোযোগ দিয়ে শোনালো গহনাগাটির নতুন ট্রেন্ড, যথাযথ ব্যবহার, ক্লিওপেট্রার মত সবুজ আইশ্যাডো, বাজারে আসা নতুন এক ধরনের ন্যাচারাল কালার লিপস্টিক সম্পর্কে । কিন্তু এলেন কিছুতেই এসব কথায় ভুলল না। সে খুব অল্পকথায় তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া জানালো- ‘আমি আসলে ঐ টাইপ হতেই পারবনা।’

ধুর তুমি কোনকাজের না । ন্যান্সি তার মণিমুক্তা খচিত আংটি ভরা জ্বলজ্বলে হাতে নেড়ে বলে উঠল। যেটাকে এলেনের মনে হচ্ছিল হিংস্র লোভী শিকারীর উদ্যত নখের ডগা ।

‘এটা তোমার সমস্যা, এলেন। তোমার আসলে আত্মবিশ্বাসের অভাব আছে।’

তুমি ভুল ভাবছ, ন্যান্সি এলেন দ্বিগুণ উৎসাহে তার কথা ফিরিয়ে দিল।

ন্যান্সি নতুনভাবে চায়ের কাপে চিনি নিচ্ছিল। ‘এটা উচিৎ না, তুমি যা করছ এলেন।’

ন্যান্সি ভর্ৎসনা করল আবার। এলেনের দিক থেকে দৃষ্টি আড়াল করে খনখনে গলায় বলে উঠল, আমি অবাক হবনা, যদি তোমাকে ডেনিস কে বিষয়ে উদ্বিগ্ন হতে হয়, সে তো সুন্দরী স্বাবলম্বী আর ঘর ভাঙার ব্যাপারে বিশেষ পারদর্শী বিশেষত বিবাহিত পুরুষদের আকর্ষণ করার ক্ষেত্রে কিংবদন্তী বলতে পারো।

এলেন অনুভব করেছিল, তার পেটের ভেতর অস্বস্তি নড়াচড়া করতে শুরু করেছে, যেন সে নৌকার গলুইতে দাঁড়িয়ে আছে আর নৌকাসহ সবকিছু দুলছে।

‘সে কি বিবাহিত?’

ন্যান্সি শুকনো হাসল।

‘সে অনামিকার আংটি পরে বটে, কিন্তু সেটা একটা দারুণ চাল তার, চোখে ধুলো দিয়ে রাখার। এটা তার তিন নম্বর চলছে, সেই লোকের বউ আর তিনটা বাচ্চাও আছে। সে সবসময় এরকম পুরুষদেরই বেছে নেয়। যাতে তার কখনোই থালা বাসন ধোয়া আর বাচ্চার নোংরা নাক পরিষ্কাররের কাজ না করতে হয় ।

ন্যান্সির বকবকানি অবিরাম চলতে লাগল ভাঙা রেকর্ডের মতো, শ্মশানের স্তব্ধতার ভেতর। হঠাৎই থেমে সে আর্তনাদ করে উঠল, হায় তোমার মুখ দেখি কাগজের মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। আমি তোমার আঘাত দেওয়ার জন্য কথাগুলা বলিনি এলেন। সত্যিই বলছি আমি কেইথের শেষ পরিণতি দেখার অপেক্ষায় আছি। ন্যান্সির শুকনো হাসি তার কন্ঠকে সজীব করে তোলার জন্য যথেষ্ট ছিলনা।

সান্ত্বনা দেওয়ার মতো আদুরে গলায় এলেন ন্যান্সির বাহুতে হাত রেখে বলল, ওহ ন্যান! আমরা তো ভালই আছি, আছি না? শুধু শুধু চিন্তা করো না তো। যদিও হৃদয় থেকে উঠে এসে কানের কাছে বেজে চলছিল- জ্যাকব কেইথকে পছন্দ করেনা, জ্যাকব কেইথকে পছন্দে করেনা ..।

অথচ ন্যান্সি যাওয়া মাত্রই দরজা বন্ধ করে এলেন অদ্ভুত উৎসাহের সাথে নিজের সাজপোশাক নিয়ে পড়ল। যদিও তার পরনে ছিল রান্নাঘরের ব্যস্ততার চিহ্ন সমেত এ্যাপ্রন। সে জিলকে খেলনা দিয়ে ব্যস্ত করে দিয়ে বেডরুমে ওয়ারড্রোবের ড্রয়ার খুলে ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে কিছু একটা খুঁজতে লাগল, দেখে মনে হচ্ছিল শার্লক হোমস কোন জটিল সমস্যা সমাধানের সূত্র খঁজে ফিরছে। ‘কেন আমি রোজ রাতেই এভাবে নিজের যত্ন করিনা? সে আধাঘন্টা ধরে গোসল করল, ফ্রেশ করল নিজেকে। অনেক আগে কোন বন্ধুর দেয়া উপহার গাঢ় নীল জাপানি সিল্কের কিমোনো পরল যেটা অতি যত্নে অজানা ভবিষ্যতের জন্য তুলে রেখেছিল। মণিমুক্তা খচিত জড়োয়া গয়না পরল, যেগুলো আসলে এতদিনকার জীবন যাপনের সাথে পুরোপুরি বেমানান ছিল। তারপর আঁটোসাটো চুলের বিনুনী খুলে চুলের স্টাইলিশ খোঁপা বেঁধে তাতে রুপোর কাঁটা গুঁজল। ছুটির দিনের জন্য তুলে রাখা হিল জুতো জোড়া পরে কিছুক্ষণ ব্যালে নাচার চেষ্টা করল, তলানিতে পরে থাকে সুগন্ধীটুকু গায়ে লাগাতেও ভুলল না।

সর্তকতার সাথে চাতকের মেঘের মত তার চোখজোড়া এই সময় জুড়ে ঘড়ির দিকেই আটকে ছিল। সময় বয়ে যাচ্ছিল। আর অনুতাপের সঙ্গে এলেন আঁতকে উঠল। ‘আমি কীভাবে ওর কথা ভুলে গেলাম?’ জিল তখন মুখে আঙ্গুল দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ছিল প্রায়। এলেন আলতো করে তুলে নিয়ে তাকে স্নানের জন্য প্রস্তুত করল। জিল যখন পানি নিয়ে খেলছিল তখন তার কালো চুল আর ধূসর চোখের দিকে তাকিয়ে এলেনের জ্যাকবের কথা মনে আসছিল, হুবহু তারই মতো যেন দেখতে বাবুটা। আপেলের স্টু খাওয়ানোর সময় যখন দরোজার লক খোলার শব্দ হলো, তখন দিনব্যাপী চলতে থাকা হতাশা আর ভয় সবকিছু যেন মাথা থেকে একনিমিষে কেটে গেল।

‘একটা ব্যস্ততম ক্লান্ত দিনের পর এজন্যই আমি বাড়ি ফিরতে চাই, আমার বউ আর মেয়ে আমার জন্য পথ চেয়ে বসে আছে সারাটা দিন এটা ভেবে। ’জ্যাকবের মুখে এক ধরনের আভা ফুটে বের হচ্ছিল। হয়তো মার্টিনির প্রভাবে হতে পারে। জিল তো বাবাকে দেখে মহাখুশিতে আপেলের স্টু মুখে মাখাচ্ছিল। এলেন হাসছিল, আর মনে মনে সকাল বেলাকার টেনশন একটু একটু করে সরে যাচ্ছিল।

বিশেষত জ্যাকব যখন খাবারের ডিশ হাতে এলেনকে আটকে মৃদু উষ্ণতায় জড়িয়ে ধরল আর বলল, ‘উমমম ডার্লিং খুব মিষ্টি সুগন্ধ পাচ্ছি যে।’ তখন যেন তার ক্রমাগত প্রার্থনাই সফলতার মুখ দেখল। এলেন যদিও অপেক্ষা করছিল জ্যাকব ফরাসি সুগন্ধীর কথাই বলবে। কিন্তু সে বলল এটা কি ফ্যারেক্স (বাচ্চার সিরিয়াল) আর কড লিভার অয়েল দিয়ে ঘরে বানিয়েছ?’ এলেনের কাঁধে মাথা রেখে আদুরে সুরে বলল, মনে হচ্ছে মাত্রই বাথটাব থেকে বের হলে, এতটাই সতেজ লাগছে।

কপট রাগ দেখিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে নিতে মায়ের মতো শাসনের সুরে বেজে উঠল এলেনের কণ্ঠে। ‘আহ, কি ছেলেমানুষী করছ।’ মনে মনে যদিও খুশি হয়েও পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারছিল না। ‘সত্যি বলছি, আমি তো চমকে গেছি তোমাকে দেখে।’ জ্যাক বলল

(‘আজকের মতো কি যথেষ্ট হয়েছে খেলাটা?) নিজেকে শুধালো সে আপনমনে। জ্যাকবের কাঁধে মাথা রেখে এলেন ডেনিসের সাথে লাঞ্চ আর ভীতিকর একলা বিকেলটার কথা ভাবছিল।

জ্যাকব জানালো সে এস্টেট এজেন্টের সাথে কথায় ব্যস্ত ছিল তাই ফোন ধরতে পারেনি।

‘এস্টেট এজেন্ট?’

‘হ্যাঁ, মনে পড়ে জিল হওয়ার আগে আমরা ঘুরতে গিয়েছিলাম কর্নওয়ালে, ছুটি কাটাতে?

সেখানে আমরা জাস্ট মজা করার জন্য ওদের অফিসে গিয়েছিলাম বাড়িটার দরদাম করতে?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, কিন্তু...’

এলেন বাকিটুকু শুনতে সাহসও পাচ্ছিল না, স্বপ্ন সত্যি হয়ে যাবার ভয়ে।

‘তারা সেই বাড়িটা এখন বিক্রি করতে রাজি। যেটা দেখে মুদ্ধ হয়ে আমরা ভাড়া নিয়েছিলাম। কি, রাজি তো?

‘রাজি মানে?’ প্রায় চিৎকার করে উঠল সে। ‘আশা করছি সামনের বসন্তকালে তুমি সেখানে গৃহপ্রবেশের আয়োজন করতে পারবে।’ মৃদু স্বরে আরো জানালো-আমি অলরেডি বাড়ির ডাউন পেমেন্টের টাকা জোগার করেছি, লাঞ্চের সময় ডেনিস কে চেক দিয়েছে আমাকে।’

হঠাৎ এত আনন্দের ভেতর হালকা একটু সংকটের ঘোর যেন দানা পাকালো তার মনে। যথাসম্ভব নিজেকে শান্ত রেখে জানতে চাইল, তুমি কি ‘নাটকের জন্য লন্ডনেই থেকে যেতে চাও?’ ‘আরে নাহ! ডেনিস কে-র সাথে তাল মিলিয়ে চলা আমার কাজ না। পুরাই ডিজেল চালিত মেশিনের মত। দিনে দুপুরে মার্টিনি নিয়েও পুরোপুরি ফিট, একদম শতভাগ ক্যারিয়ারিস্ট মহিলা। আমাকে ডেকেছিল মার্টিনির জন্য, কিন্তু আমার পক্ষে তো সপ্তাহের মাঝখানে সেটা সম্ভব না।’

ফোন বেজে উঠল। এলেনের কাছে মনে হলো কোথাও থেকে গানের সুর ভেসে আসছে যেন এলেন সেই সুরে ভাসতে ভাসতে জিলকে কাঁধের ওপর ঘুমপাড়ানি গান শোনাতে শোনাতে ফোন ধরতে চলে গেল। ‘এলেন, ডার্লিং, ন্যান্সি রিগ্যানের মাথা ঝিমঝিম করা তীক্ষ্ম কর্কশ আওয়াজ ভেসে এল, আমি অনেক ভেবে বুদ্ধি বের করলাম, আমার হেয়ার ড্রেসার রডরিগোকে তোমার কাছে পাঠাবো, শনিবার বেলা এগারোটায়। সে তোমাকে নতুন ফ্যাশনে চুল বেঁধে দেবে, যেটা তোমার আত্মবিশ্বাসকে অনেকখানি বাড়াতে সাহায্য করবে।’

‘দুঃখিত বন্ধু। তোমার এ্যাপায়েন্টমেন্ট বাদ দিতে হবে। আমার কাছে নতুন খবর আছে।’

‘নতুন খবর?’

‘হ্যাঁ, আমি খবর পেয়েছি বেণীর ফ্যাশনটা নতুনভাবে ফিরে এসেছে, মফস্বলের গৃহবধূদের জন্য!’

---------------




                                       
লেখক পরিচিতি

সিলভিয়া প্লাথ একাধারে কবি, গল্পকার এবং ঔপন্যাসিক। তিনি ১৯৩২ সালে ২৭শে অক্টোবর আমেরিকার মাসাচুসেটসে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা পেশায় ছিলেন অধ্যাপক, মা গৃহিনী।সিলভিয়া খুব অল্প বয়স থেকেই বিষণ্নতায় আক্রান্ত ছিলেন।মাত্র আট বছর বয়সে কবিতা লিখতে শুরু করেন তিনি। বিয়ে করেন ইংরেজ কবি টেড হিউজকে। দুটি সন্তানের জন্ম দেন।স্বামীর একাধিক সম্পর্কের কারণে পৃথক বসবাস করতে শুরু করার এক বছরের মাথায় সিলভিয়া মাত্র ৩১ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন। তাঁর রচনাবলী পাঠকের কাছে তাঁকে অমর করে রেখেছে। তাঁর স্বল্পায়ু জীবনে তিনি যেসব রচনা পাঠকমহলের জন্য রেখে গেছেন, সেগুলো হলো : দ্য কলোসাস এ্যান্ড আদার পোয়েমস (১৯৬০) এরিয়েল (১৯৬৫), থ্রী উইমেন: এ্যা মনোলগ ফর থ্রী ভয়েসেজ (১৯৬৮) ক্রসিং দ্য ওয়াটার (১৯৭১),উইন্টার ট্রিজ (১৯৭১) ,দ্য কালেক্টেড পোয়েমস (১৯৮১), সিলেক্টেড পোয়েমস (১৯৮৫), সংকলিত প্রবন্ধ এবং উপন্যাস সম্পাদনা: দ্য বেল জার: এ্য নভেল (১৯৬৩), লেটারস হোম: করেসপন্ডেন্স ১৯৫০–১৯৬৩ (১৯৭৫) এবং শিশুদের জন্য সম্পাদিত বই দ্য বেড বুক (১৯৭৬), দ্য ইট-ডাজোন্ট-মেটার-সুয়েট (১৯৯৬) ,কালেক্টেড চিল্ড্রেন স্টোরিজ (ইউ কে,২০০১), মিসেস. চেরি'স কিচেন (২০০১)





অনুবাদক পরিচিতি
রোখসানা চৌধুরী
কবি। প্রাবন্ধিক। অনুবাদক। গবেষক।
বাংলাদেশের সুনামগঞ্জে থাকেন।






                              


                                                                            


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন