গল্পের নাম-- ‘দেহাবশেষ’, গল্পকার-- জ্যোতিপ্রকাশ দত্তঃ একটি ময়নাতদন্ত

নীহারুল  ইসলাম

গল্পপাঠ যখন বললেন জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের গল্প নিয়ে লিখতে, আমি তখন আমাদের মহান গণতন্ত্র রক্ষায় কর্তব্যরত, ভারত--বাংলাদেশ সীমান্তের একটি অজ গাঁয়ে ভোট নিতে ব্যস্ত। সে অন্য গল্প, অন্য অভিজ্ঞতা।

সত্যি বলতে জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের একটিও গল্প পড়িনি আমিপড়লেও মনে নেই। কী করি তাহলে? ই--ম্যাগ ‘গল্পপাঠ’--এ পেয়ে গেলাম তাঁর এই গল্পটি। দেহাবশেষ। কার দেহাবশেষ?
আসুন গল্পটি পড়ে দেখি।

গল্পটি শুরু হচ্ছে ঠিক এভাবেঃ
“ প্লাবন সব ভাসিয়ে নিয়ে যায় – রেখেও যায় কিছু, ফিরিয়েও দেয় কিছু কখনো। ” আমরা আশা করতেই পারি আমরা কিছু ফিরে পেতে চলেছি। কী ফিরে পেতে চলেছি, জানি না। তবে কিছু ফিরে পাওয়ার আশায় আমরা গল্পটি পড়ে চলি। কিছুটা পড়তেই আমরা দেখি শুকনো বিলের বুকে কর্দমাক্ত বৃক্ষশাখা আর জঞ্জালের নিচে ‘দেহহীন কায়া’কে। আমরা ভয় পায়। ভয় পেয়ে উঠে আসি বিলের পাড়ে। আমাদের চিৎকার, কোলাহলে আশপাশের গ্রামের লোকজন ছুটে আসে। কিন্তু সেই দেহহীন কায়াকে আমরা কেউ চিনতে পারি না। শুধুমাত্র একজন চিনতে পারেতৎক্ষণাৎ সে পলিমাটি, বালি সরিয়ে কায়াটিকে স্পষ্ট করেআর দেখে সেই দেহহীন কায়ার হাতে ধাতব গোলাকার মণিবন্ধনীযা তারই কিনে দেওয়া। সে আর অপেক্ষা করতে পারে না -- জল, মাটি, কাদা, বালির ভেতর হাত ঢুকিয়ে দেহহীন কায়াকে জড়িয়ে ধরে

এরপর দম বন্ধ করা অবস্থা হয় আমাদের। তবু আমাদের গল্পটি পড়ে যেতে হয়না পড়ে উপায় থাকে না। নিজের অজান্তেই ‘সে’ নামক এক অনন্ত যাত্রার যাত্রীর সঙ্গী হয়ে উঠি আমরা। শুধু ‘সে’ নয়, আমরাও যেন সব কোলাহল – সব যুক্তি – সব ব্যখ্যার ওপরে উঠে সেই দেহহীন কায়াকে বুকে জড়িয়ে নিজের নিজের ঘরের দিকে ছুটে আসি। কারো কথায় কান করি না। বাড়ির পাশের পুকুরে দেহহীন কায়াকে ভালো করে ধুয়ে তার সবচেয়ে পছন্দের ডোরাকাটা শাড়িতে তাকে আশ্রয় দিই। একে একে গ্রামের লোকেরা আসে। গ্রামপ্রধান আসে। চেয়ারম্যান আসে। নানা রকম কথা বলে। নানা পরামর্শ দেয়। আমরা কিছুই শুনি না। কেউ পাশে জ্বালিয়ে দেয় একটি কূপি। সেই কূপির আলোর দিকে স্থির তাকিয়ে থাকি। কিছু ভাবি কিংবা কিছুই ভাবি না।

মণিবন্ধনী দেখে দেহহীন কায়াকে চিনতে পারলেও গ্রামপ্রধান কিংবা চেয়ারম্যানের কথায় কোথাও আমাদের সংশয় জন্মায়। শহরে পড়া ছেলেটির কথায় দেহহীন কায়ার পরিচয় নির্ণয় করতে তাকে তার পছন্দের ডুরে শাড়িতে জড়িয়ে আমরা শেষপর্যন্ত শহরে গিয়ে উপস্থিত হই। কেননা, পরিচয় নির্ণয় না হলে যে তার শেষকৃত্য করা যাবে না! কিন্তু শহরে গিয়েও আমরা দেখা পাই নদীরযে নদীর স্রোতে সভ্যতার বিকাশ ঘটলেও সেই স্রোতে মানুষ তলিয়েও যায়যে নদী শুধু হারানোর গল্প বলে। রেখে যাওয়া কিংবা ফিরিয়ে দেওয়ার গল্প বলে না। যে নদীর কাছে আমরা বার বার হেরে যাই। কিন্তু আমাদের ‘সে’, যার পরিচয় একজন গ্রাম্য কৃষক, শহরের এখানে ওখানে ঘুরতে ঘুরতে সে হাল ছাড়ে না, দেহহীনার পরিচয় নির্ণয় করতে নানা অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ হতে হতে, সব ভয়কে দূরে সরিয়ে সে একটা সময়ে গিয়ে হাজির হয় আদালত পাড়াতে। তখন নিশি কাল। অন্ধকারে আমরা ‘সে’ হতে পারি না, তার সঙ্গী হই মাত্রএখানেই ‘সে’ অর্থাৎ গ্রাম্য কৃষকের সঙ্গে আমাদের তফাৎ তৈরি হয়। আমরা আলোর স্তম্ভ হয়ে দূর থেকে তাকে দেখি,--
“ দেহহীনাকে পাশে রাখে সে। সকালের অপেক্ষায় নিজেও সিঁড়ির ধাপে হেলান দেয়। চোখ বুঁজবে না সে কিছুতেই কিন্তু বুঁজলেই দেখতে পেত পাশেই ডোরাকাটা শাড়ি পরে বসে আছে যে হাতে তার ঝকঝকে বালা দুটি। তেমনি মসৃণ ত্বক – হাত বোলালেই বুঝতো সে। দেখতো খোলা চূল উড়ছে বাতাসে। ”
কিন্তু আমাদের ‘সে’ দেহহীনাকে অনুভূতিতে পেতে চায় না। দেহহীনার দেহকে ফিরে পেতে চায় বাস্তবে
নাকি নিজেকেই ফিরে পেতে চায়? সেজন্য সকালের অপেক্ষা করে। সকাল হলে সে বিচারকের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। বলবে ...


কী বলবে, সেটা বলার আগে আমার অনুরোধ, গল্পটি আপনারও পড়ুন। এ--গল্প আত্ম--উপলব্ধির গল্প। এ--গল্প নিজেকে খোঁজার গল্প। এ--গল্প পড়ে নিজেকে খুঁজে না পেলেও নিজের দেহাবশেষকে খুঁজে পাবেন বলেই আমার বিশ্বাস। 




লেখক পরিচিতি
নীহারুল ইসলাম

‘সাগরভিলা’ লালগোলা, মুর্শিদাবাদ, ৭৪২১৪৮ পঃ বঃ, ভারতবর্ষ।
 জন্ম- ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৭, মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদিঘী থানার হরহরি গ্রামে।
শিক্ষা- স্নাতক (কলা বিভাগ), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা- শিক্ষা সম্প্রসারক। 
সখ- ভ্রমণ। বিনোদন- উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শ্রবণ। 
রৌরব, দেশ সহ বিভিন্ন লিটিল ম্যাগাজিনে লেখেন নববই দশক থেকে। 
প্রকাশিত গল্পগ্রন্থঃ 

পঞ্চব্যাধের শিকার পর্ব (১৯৯৬),  জেনা (২০০০),  আগুনদৃষ্টি ও কালোবিড়াল (২০০৪), ট্যাকের মাঠে, মাধবী অপেরা (২০০৮), মজনু হবার রূপকথা (২০১২)। 
দু’টি নভেলা--,  জনম দৌড় (২০১২), উপন্যাস।
 ২০০০ থেকে ‘খোঁজ’ নামে একটি অনিয়মিত সাহিত্য সাময়িকী’র সম্পাদনা। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ