রবিবার, ১৬ মে, ২০২১

গল্পপাঠ।। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ।। ১৪২৮ বঙ্গাব্দ।। মে-জুন।। ২০২১ খ্রিস্টাব্দ।। সংখ্যা ৭৭

 আশা নিরাশার নাগরদোলা

খেয়াল আছে জীবনানন্দ লিখেছিলেন -

আলো-অন্ধকারে যাই—মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়, কোন এক বোধ কাজ করে;
স্বপ্ন নয়—শান্তি নয়—ভালোবাসা নয়,
হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়;
আমি তারে পারি না এড়াতে,
সে আমার হাত রাখে হাতে,
সব কাজ তুচ্ছ হয়—পণ্ড মনে হয়,
সব চিন্তা—প্রার্থনার সকল সময়
শূন্য মনে হয়,
শূন্য মনে হয়।

জীবনানন্দ প্রকৃতির উদাসীনতার মধ্যে মানুষের অস্তিত্বের অর্থ খুঁজতে চেয়েছিলেন। প্রকৃতির গাছের রঙে, পাহাড়ের বক্ররেখায়, সমুদ্রের তরলে, আকাশের নীলে আমরা বিমোহিত হই, সেই বিমোহন হয়তো কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের ফসল, কিন্তু একই সাথে প্রকৃতি যেন বলে তোমার ভাগ্য নিতান্তই এক পরিসংখ্যান, এই পরিসংখ্যানে তোমার জন্ম, মৃত্যু, ভালবাসা একটি সংখ্যা মাত্র। কোভিডের এক বছর পূর্ণ হতে না হতে ভারতে তীব্রভাবে সেই প্রকৃতি কোনো এক জিঘাংসায় আবির্ভূত হয়েছে। এই লেখাটির সময় বিশ্বের মানুষ অসংখ্য চিতার আগুন কি কবরের মাটি দেখে শিউরে উঠছে, বাংলাদেশে সেই ঢেউ কতখানি এসেছে আপাতত বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু এই মারণ ভাইরাসটিকে আমরা যতবার ভেবেছি চিনতে পেরেছি ততবার সে আমাদের বোধগম্যতা এড়িয়ে নতুন রূপে এসেছে।

১৯৪৪ সনের ফেব্রুয়ারি মাসের এক শনিবারে ১৪ বছরের কিশোরী আনা ফ্রাঙ্ক, জার্মান বাহিনি থেকে পালিয়ে থেকে, আমস্টারডামের এক গুপ্তঘরে বসে, তার ডায়রিতে লিখছে -

“আদরের কিটি, ঝকঝক করছে রোদ, আকাশ গাঢ় নীল, সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে আর আমি কী আকুল হয়ে অপেক্ষা করছি–মনে মনে চাইছি–সব কিছু। কথা বলে মনের ভার হালকা করতে, খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে, বন্ধুদের সঙ্গ পেতে, নিরিবিলিতে একা থাকতে। সেই সঙ্গে কী যে ইচ্ছে করছে…চিৎকার করে কাঁদতে…”

কিটি যে কে সেটা আমরা জানতে পারিনি, আনা হয়তো তার ডায়রিকে কিটি বলত। শত বিপদের মধ্যেও কিশোরী ফ্রাঙ্ক জীবনের জয়গান গাইছে, আকাশের নীল রঙের কথা বলছে। এর এক বছরের মধ্যে জার্মান সৈন্যরা আনা ফ্রাঙ্কদের লুকিয়ে থাকবার জায়গা আবিষ্কার করে, সবাইকে ধরে নিয়ে যায়, আনা জার্মান বন্দীশালায় ১৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করে। আনার ডায়রিটি পৃথিবীর প্রায় ৭০টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে, বাংলায় এটি করেছেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়।

কোভিডের মারণাঘাতের সময় আনার ডায়রিকে স্মরণ করি কারণ আনার কিশোরী হাতের লেখা শুধু যুদ্ধ ও অজ্ঞাতবাসের ছোট গণ্ডীতে সীমাবদ্ধ ছিল না, তাতে সেই গোপন নিরাপদ ঘরে অন্যান্য পলাতকদের কাহিনি, প্রথম প্রেমের উন্মেষ, ভবিষ্যতের স্বপ্ন সবই ছিল। জীবনানন্দের মত সব চিন্তা তার কাছে শূন্য মনে হয়নি। কিন্তু আমরা এত বছর পরে যখন আনার আশাবাদী লেখার সাথে আনার করুণ মৃত্যুর কথা ভাবি তখন আবার জীবনানন্দকে স্মরণ না করে পারি না।

তাই আমাদের জীবনকে বেঁধে রাখার সব সুতো শিথিল হয়ে যায়, সেই সুতোকে কি আবার ফিরিয়ে আনা যায় তার জায়গায়? সেই সুতোর জটকে কি ছাড়ানো যায়, সাহিত্য কি সেই কাজটা করতে পারে? তাহলে তো গল্পকারকে, কবিকে, নাট্যকারকে ঈশ্বর হতে হবে। কিন্তু গল্পকার তো সামান্য মানুষ, তার গল্পের যে পাঠক তার চাইতে কি সে জীবন সম্পর্কে বেশি জানে? এই প্রশ্নটির যে সঠিক অর্থ নেই তা পাঠক জানেন, অথচ পাঠক গল্পকারকে সর্বজ্ঞ ভাবেন, ভাবেন লেখকের হাতে আছে জীবনকে বোঝার চাবিকাঠি। সেজন্যই হয়তো রোলাঁ বার্থ সৃষ্টি ও সৃষ্টিকর্তার মধ্যে দেয়াল তুলে দিতে চেয়েছিলেন, লেখকের মৃত্যু চেয়েছিলেন, পাঠককে পাঠের সময় লেখকের জীবন, অনুভব, মতবাদ খুঁজতে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। গল্পকার শেষ পর্যন্ত একটি মানুষ মাত্র, তাঁর ব্যক্তিগত ন্যায়বোধ, নৈতিকতা, জীবনের স্বচ্ছতার সঙ্গে তাঁর সৃজনে তৈরি গল্পটির অনুভব পুরোপুরি সাংঘর্ষিক হতে পারে।

তাহলে কি আমরা পাঠের মধ্যে মহত্ত্বের খোঁজ করব না? এর উত্তর অনিশ্চিত, দ্ব্যর্থক। জীবনানন্দের বোধ পাঠককে এক শূন্যতায় নিক্ষেপ করবে, আনা ফ্রাঙ্কের ডায়রি পাঠককে সেই শূন্যতা থেকে বের করে নিয়ে আসবে, আবার যে মুহূর্তে পাঠক কিশোরী ফ্রাঙ্কের মৃত্যুর কথা জানবেন, অথবা কয়েকদিন আগে চরমপন্থীদের বোমা হামলায় কাবুলে আনা ফ্রাঙ্কের মতই পঞ্চাশজন স্কুল পড়ুয়া কিশোরীর নিহত হবার কথা ভাববেন, সেই মুহূর্তে আর এক শূন্যতায় পতিত হবেন। এ এক নাগরদোলা, দার্শনিক বারুক স্পিনোজার ভাষায় এই হল মানুষের দাসত্ব বা বন্ধনী (human bondage), কিন্তু এটিই হয়তো জীবনের নির্যাস।

রমাপদ চৌধুরী লিখেছেন ঔপন্যাসিক ও গল্পকারের মধ্যে পার্থক্য কথা। ঔপন্যাসিক যুদ্ধের পটভূমি, কৌশল, ক্রিয়া, জয় পরাজয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বর্ণনা করবেন, লিখবেন বিজয়ের শোভাযাত্রা, হাজারো পাতা ভরাবেন, তারপর দেখবেন পথের ধারে ছোট-গল্পলেখককে, তাঁকে করুণা করবেন কারণ সেই গল্পকার যুদ্ধের বিশাল চিত্র দেখে নি। ছোট-গল্পকার তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঔপন্যাসিককে বলবেন, “না বন্ধু, এসব কিছুই আমি দেখিনি, কিছুই আমার দেখার নেই। শুধু একটি দৃশ্যই আমি দেখেছি। পথের ওপারের কোনও গবাক্ষের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করবেন তিনি, সেখানে একটি নারীর শঙ্কাকাতর চোখ সমগ্র শোভাযাত্রা তন্নতন্ন করে খুঁজে ব্যর্থ হয়েছে, চোখের কোণে যার হতাশার অশ্রুবিন্দু ফুটে উঠেছে – কে যেন ফেরেনি, কে একজন ফেরেনি। ছোটগল্পের লেখক সেই ব্যথা-বিন্দুর, চোখের টলমলো অশ্রুর ভেতর সমগ্র যুদ্ধের ছবি দেখতে পাবেন, বলবেন হয়তো, বন্ধু হে, ওই অশ্রুবিন্দুর মধ্যেই আমার অনন্ত সিন্ধু।”

তাহলে রমাপদ চৌধুরী কি গল্পকারকে সর্বজ্ঞ হতে বলছেন, যা হওয়া সম্ভব নয়? না, তিনি মনে হয় বলছেন লেখকের দৃষ্টি থাকতে হবে, যেন সেই গবাক্ষের পেছনে বেদনাবিধুর চরিত্রকে সে দূর থেকেও আবিষ্কার করতে পারে। আর এটা যে একটা বিশেষ ক্রিয়া – এই যে আবিষ্কার – পাঠককেও সেটা বুঝতে হবে। গল্পপাঠের এই সংখ্যার ডালিতে যে সমস্ত গল্প ঠাঁই পেয়েছে তার মধ্যে পাঠক কি খুঁজে পাবেন সেই ‘অনন্ত সিন্ধু’, ব্যথা বা আনন্দ-বিন্দুর সারি? আমরা তা জানিনা, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই, শেষ পর্যন্ত সব গল্পই উন্মুক্ত, সব পথই অনন্ত, সব চিন্তাই অবাধ। আমাদের আশা গল্প পাঠের মাধ্যমে পাঠক তাঁর পথকে ধীরে ধীরে চিনবেন, অন্যদিকে গল্পপাঠের গল্পকাররাও রমাপদ চৌধুরীর দৃষ্টি নিয়ে লিখবেন। আশা-নিরাশার এই বিষম নাগরদোলায় জীবনের নির্যাস নিয়ে দুজনেই বাঁচবেন।

সম্পাদকীয়: দীপেন ভট্টাচার্য

চিরায়ত গল্প

ভাষান্তর : চৈতালী চট্টোপাধ্যায়
উর্দু ভাষা এবং ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে পঠিত এবং বিতর্কিত লেখক হিসেবে সাদাত হাসান মান্টোর নাম বহুল চর্চিত। সাদা কে সাদা, আর কালো কে সপাটে কালো বলার কারণে বহুবার তাঁকে আদালতের চৌহদ্দিতে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু আইন-আদালতের চোখ রাঙানি একবগ্গা মান্টো কে দমাতে পারেনি। মতপার্থক্য আর বিতর্কের কারণে মান্টো নিজভূমে ছিলেন পরবাসী। ‘৪৭এর দেশ ভাগ তিনি মেনে নিতে পারেননি। আঘাতটা তাঁকে যেন দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছিল। দেশকে কেন ভাগ হতে হবে, ধর্মের ধুয়ো তুলে কেন খুনখারাপি চলবে- এই নিয়ে আজীবন তাঁর কলম সোচ্চার ছিল। মান্টোর দেশভাগের গল্পগুলো রক্ত আর অশ্রু দিয়ে যেন লেখা। সাদাত হাসান মান্টোর মতো করে ইতিহাসের দগদগে ক্ষতের গল্প অর্থাৎ দেশভাগ, দাঙ্গা, মানুষের ভেতরের দাঁতালো পশুটা কে জীবন্তভাবে খুব কম সাহিত্যিকই উপস্হাপন করতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর রচিত অনন্য সাধারণ একটি গল্প “দশ টাকা”।

যতদূর চোখ যায় শুধু বেনাবন। ঢালু জমিটা পশ্চিম দিকে উঁচু হয়ে উঠে গেছে টিলার মতো। রুক্ষ্ম কর্কশ মাটি অন্যদিকে মিশেছে একটা নালার সঙ্গে। এদেশে বলে খাড়ি। নালাটা এখন প্রায় জলশূন্যই বলা যায়। বর্ষার সময় প্লাবন হয়, সমস্ত এলাকাটা তখন জলে ডুবে যায়। জমিটার নাম তাই ডুবো। বেনাবন সার্বভৌমত্ব মানেনি, এদেশ পেরিয়ে সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া অগ্রাহ্য করে ওপারে চলে গেছে মাইলের পর। মাইল। ওপার অর্থাৎ বাংলাদেশ। বিস্তারিত পড়ুন>>
........................................................................................................
লেখক নিখিল দত্তর পরিবারের কারো খোঁজ জানেন স্যার, আমি ত্রিদিব বলছি ?
ত্রিদিবের মুখে নিখিল দত্তর কথা শুনে একটু অবাক হল সমীর। ত্রিদিব থিয়েটার লাভারস গ্রুপের ছোটখাট এক অভিনেতা। থিয়েটার দলের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকে। সাহিত্যপাঠ নিয়ে ওর আগ্রহের কথা সমীরণ শোনেনি কোনোদিন। সমীরণের একটি গল্প নাট্যরূপ দিয়ে ওদের থিয়েটারের দল অভিনয় করেছিল, তখন থেকে যোগাযোগ। সমীরণ গল্প ও উপন্যাস লেখে। বিস্তারিত পড়ুন>>

দীর্ঘদিন ধরে লিখছেন দেবর্ষি সারগী। কিন্তু তাঁর বেশির ভাগ পাঠকের কাছে তিনি অচেনা। পরিশীলিত পাঠকের কাছে তিনি প্রাসঙ্গিক। পূর্ব, অভূতপূর্ব তাঁর লেখার জার্নি। পাঠক তার গল্পে একটি গোলোক ধাঁধাঁর মধ্যে আটকে যাবেন। তাকে তিনি যাবেন এক পরাবাস্তব জগতে। সেখান ঘুরতে ঘুতে বুঝতে পারবেন আখ্যানের জগৎটি ক্রমশ পরিচিত জগৎ হয়ে দেখা দিচ্ছে। সে জগতের কথাটি সরাসরি বলার অনেক ঝুঁকি আছে। এই ঝুঁকিটা আসলে ক্ষমতার নিপীড়ণের একটা ফাঁদ। ফলে পাঠশেষ পাঠক হয়ে পড়েন স্তব্ধ। নির্বাক। একা।
দেবর্ষি সারগী কিউবান লেখক পিনিয়েরা এবং উর্দু লেখক নাইয়ার মাসুদেরই সহযাত্রী।

প্রয়াত মার্কিন ঔপন্যাসিক ও গল্পকার ফিলিপ রথ, মিলান কুন্দেরার লেখা “বুক অফ লাফটার এন্ড ফরগেটিং” এর পাণ্ডুলিপি পড়ার পরে মিলানের দুটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন। একটি তাঁর লন্ডনে প্রথম সফরকালীন সময়ে, অপরটি প্রথম আমেরিকা ভ্রমণের সময়; বর্তমান সাক্ষাৎকারটি সেই দুই সাক্ষাৎকারের ঘণীকৃত রূপ। 

আলী নূর পেশায় আইনজীবি। বই পড়া, গান শোনা, ফুল ফোটানো, নাটক কিংবা ওড়িশি নৃত্য অথবা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, যন্ত্রসঙ্গীত এইসব নিয়েই তাঁর আনন্দযাপন। তাঁর নানা শখের মধ্যে দেশভ্রমণ, ছবি আঁকা, ফটোগ্রাফি এবং সিনেমাটোগ্রাফি অন্যতম। তিনি জীবনযাপন নয় জীবন উদযাপনে বিশ্বাসী।

ব্রিটিশ-ভারত, পাকিস্তান এবং স্বাধীন বাংলাদেশ এই তিন কাল তিনি দেখেছেন, দেখছেন। ‘তুচ্ছদিনের গানের পালা’ কেবল তাঁর জীবনের গল্প নয় বরং গল্পচ্ছলে ইতিহাসের পরিভ্রমণ।


 

ফেরদৌস নাহার পুরদস্তুর একজন কবি। তিনি গদ্যও লিখেন। গুটি কয়েক গল্প লিখেছেন। তাঁর গদ্যের ভাষায় কাব্যিক মাধুর্যের উপস্হিতি যেমন চোখে পড়ে; একই সঙ্গে দেখা যায় স্বকীয় ঋজুতা। ফেরদৌস নাহার গল্পপাঠে প্রথমবারের মতো গল্প লিখলেন।
মার্কেজ-উত্তর স্প্যানিশ গল্প
লক্ষ করা যায় যে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ পরবর্তী যুগে স্প্যানিশ ভাষায় যেসব গল্প, উপন্যাস, প্রকাশিত হয়েছে সঙ্গত কারণে তার অধিকাংশ মার্কেজ প্রভাবিত। অর্থাৎ তাতে মার্কেজের অতি জনপ্রিয় জাদুবাস্তবতার উপস্হিতি লক্ষণীয়। শুধু তাই নয়, মার্কেজীয় সমাজ- জীবন ঘনিষ্ট উপাদানগুলোও পাশাপাশি সক্রিয়, যেখানে মানুষের জীবন জীবিকার পাশাপাশি সামাজিক অবক্ষয় এবং নৈতিকতার অধঃপতন ইত্যাদি বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে। বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি বিপ্লবের মধ্যে মানুষের জীবনের চিন্তাধারার কাঠামোগত পরিবর্তন খুব লক্ষণীয় মাত্রায় প্রস্ফুটিত হয়েছে গল্প উপন্যাসের পাতা জুড়ে। 
স্প্যানিশ সাহিত্যের মধ্যেও ইংরেজির মতো বহুজাতির সমন্বয় ঘটেছে। ইউরোপে জন্ম নিলেও স্প্যানিশ ভাষা সেখানে সংখ্যালঘু, অথচ আটলান্টিকের পশ্চিমে আস্ত একটা মহাদেশের অধিকাংশ দেশে স্প্যানিশ ভাষা ও সাহিত্যের জয়জয়কার। ষাটের দশকের পর থেকে স্প্যানিশ সাহিত্য যে ধারায় বিবর্তিত হয়েছে সেটা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আধুনিক ধারার পূর্বসুরী। এই আয়োজনের গল্পগুলোতে মার্কেজের সিগনেচার জাদুবাস্তবতার ঘনঘটা তেমন নেই। গল্পগুলো জীবনঘনিষ্ঠ নানা বিষয় ভিত্তিক। মার্কেজের উত্তরসুরী কয়েকজন সাহিত্যিকের গল্প নিয়ে গল্পপাঠের এবারের আয়োজন।
..................................................
অনুবাদ: জয়া চৌধুরী
উত্তম পুরুষের বয়ানে দুই বন্ধুর গল্প। এক বন্ধু দর্শনের ছাত্র অন্যজন ডেন্টিস্ট্রিতে, পড়াশোনা শেষে যে যার মতো জীবিকায় নিযুক্ত। ডেন্টিস্ট বন্ধু দৈবপাকে এক বয়ষ্ক রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় জড়িয়ে যায়। সেই সূত্রে গল্পে আসে গতি। নানা ঘটনার বয়ানের মধ্যে দিয়ে চলে দুজনের আত্ম উন্মোচন। চমকের মধ্যে দিয়ে শেষ হয় গল্প।

অনুবাদ: মোস্তাক শরীফ
এটি দাম্পত্য সম্পর্কের টানাপোড়েনের গল্প। পারস্পারিক বোঝাবুঝিহীনতা যেখানে তুলে দেয় গণ্ডীরেখা। সম্পর্কে থাকা দুজন তখন আর 'আমরা' থাকে না। তুমি আর আমি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মাঝখানের বিভেদ রেখার দুপাশে।

অনুবাদ: হারুন রশীদ
৪৪ বছর বয়স্ক এলেনা এক পাবলিক বাসের ভিড়ের মধ্যে খুব গোপনে ফিরে গিয়েছিলেন তাঁর ১৪ বছর বয়সের কৈশোরকালের এক রোমান্টিক স্মৃতিতে। যে গল্প তিনি কখনো কাউকে বলেননি। বুকের ভেতরে সযত্নে পুষে রাখা সেই স্মৃতির মতো আজকের বিশেষ ঘটনাটিও তিনি খুব সন্তর্পণে আড়ালে রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন এক গোপন আনন্দের প্রতিক্রিয়ায়। সময় একটা বড় ফ্যাক্টর। অস্বীকার করে বাজি জিতে যাওয়ার মিথ্যে আবেগে ভাসতে গিয়ে মাশুল দেবার গল্প এটি। বিটুইন দ্য লাইনে চমৎকার ভাবে ঘটেছে গল্পের উপস্হাপন।
অনুবাদ: দোলা সেন
শিল্প সাধনায় চরমতম উৎকর্ষতায় পৌঁছাতে হলে আত্মনিবেদনে হতে হয় নিমগ্ন। এক সঙ্গীত শিল্পী সেই গন্তব্যে পৌঁছানোর ইচ্ছেতে সব ভুলে নিজেকে নিবেদন করছেন সাধনার পায়ে।

অনুবাদ: বেগম জাহান আরা
আত্মকথন ধাঁচের গল্প। স্মৃতি রোমন্থনের হাত ধরে দারুণ চমকের দেখা পাবেন পাঠক এই গল্পটিতে। লিখেছেন হুয়ান গ্যাব্রিয়েল ভাস্কেজ। হুয়ান গ্যাব্রিয়েল ভাস্কেজ(Juan Gabriel Vasquez): কলম্বিয়ান স্প্যানিশ লেখক। জন্মঃ ১ জানুয়ারি, ১৯৭৩। ল্যাটিন আমেরিকার খুব গুরুত্বপূর্ণ এই লেখক সাংবাদিক এবং অনুবাদক হিসেবেও খ্যাত। তাঁর উপন্যাসের সংখ্যা ৭। পুরস্কারঃ আলফাগুয়ারা পুরস্কার, ইন্টারন্যাশনাল ডাব্লিন লিটারারি পুরস্কার, অর্ডার অব ইসাবেলা দ্য ক্যাথলিক ইন্টারন্যাশনাল বুকার পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন প্রাপ্ত।

আরো কয়েকটি স্প্যানিশ গল্প:
ভাষান্তর: নাহার তৃণা
আত্মস্মৃতি ধাঁচের গল্প 'আজ ভোরে।' গল্পের শুরুটা ভর ভরন্ত একটা পরিবারের ভ্রমণ দিয়ে। চলমান ভ্রমণের এই গল্পের সামাজিক-পারিবারিক এবং সম্পর্কের দৃশ্যপট সময়ের হাত ধরে বদলে যেতে থাকে। কথকসহ তার অন্য ভাই -বোন কৈশোরকে পেছনে ফেলে তারুণ্যে পৌঁছায়। একে একে পরিবারের সদস্যেরা মৃত্যু কিংবা জীবনের অমোঘ টানে ছিটকে পড়ে নানা দিকে। গল্পের কাহিনি শেষমেশ একা হয়ে যাওয়ার গল্পে এসে দাঁড়ায়।

অনুবাদ: সুমু হক
চলন্ত বাসকে ধাওয়া করা এক কুকুর নিয়ে কথকের নানা ভাবনা- অতীতে কুকুরটির প্রতি নিষ্ঠুর ব্যবহারের সুলুক সন্ধান এবং আত্মানুশোচনার আখ্যানে গল্প গড়িয়েছে। সেসার আইরা তাঁর পরিচিত ভঙ্গির সাক্ষর হিসেবে গল্পের ঘটনা এবং পরিণতির স্পষ্ট কোনো সাক্ষ্য গল্পে দেননি। পাঠককে নিজের মতো ভেবে নেবার স্বাধীনতা দিয়েছেন। সাদামাটা বিষয় নিয়ে টান টান একটি গল্প সেজার আইরার 'কুকুর'।

অনুবাদ: ফারহানা রহমান
বাড়ি,গাড়ি, শিল্পকর্ম ইত্যাদি প্রকাশ্যে নিলামে ওঠে। পৃথিবীর কোনো অন্ধকার কোণে সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্র মানুষকেও নিলামের পণ্য হিসেবে বেচা-কেনায় লিপ্ত। অপরাধীচক্র নানাভাবে মানুষগুলোকে সংগ্রহ করে বিক্রি করে দেয়। ঘটনাচক্রে এক অপরাধীদলের কবলে পড়ে নিলামের বলি হতে হতে কৌশলে বেঁচে যাওয়ার গল্প এটি।

 
 

ভাষান্তর: উৎপল দাশগুপ্ত 
ডোনাল্ড বার্থেলমি (১৯৩১ – ১৯৮৯) – আমেরিকান ছোটগল্প লেখক এবং ঔপন্যাসিক। পোস্ট-মডার্ন শৈলীর। ওঁর রচনাগুলি গতানুগতিক ধারার থেকে যথেষ্টই আলাদা। অসংলগ্ন বাক্য, বাক্যাংশ এবং বাক্যবন্ধ ব্যবহারের ফলে লেখাগুলি বিভ্রান্তিকর বলে মনে হয় পাঠকের। বর্তমান গল্পটি লেখকের ‘কাম ব্যাক ডঃ ক্যালিগরি’ গল্পসংগ্রহের প্রথম ছোটগল্প – ফ্লোরেন্স গ্রীন ইজ ৮১।

অনুবাদ : শুভ চক্রবর্তী
বৃটিশ গল্প:
অনুবাদ: মনিজা রহমান
মানসিক শঙ্কাগ্রস্ত এক স্ত্রী এবং স্ত্রীর উদ্বেগ উস্কে দিয়ে আনন্দ লুটে নেওয়া স্বভাবের এক স্বামীর গল্প। গল্পের শেষ মোচড়ে যথারীতি রোয়াল্ড ডালের সিগনেচার চমক পাঠককে একটি পরিপূর্ণ ক্রাইম থ্রিলার পাঠের আনন্দ দেবে।

আফগান গল্প:
অনুবাদ: মাজহার জীবন
সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। মুজাহেদিনেরা তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক আক্রমণ শুরু করে। যখন তখন বোমা, রকেট হামলায় জেরবার তখন আফগানিস্তান। সেই সময় আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষের জীবন ছিল অনিশ্চিত। পায়ে পায়ে মৃত্যুর হাতছানি সঙ্গী করে কীভাবে প্রতিদিন জীবন হাতে নিয়ে বের  হতো, কর্মস্হলে যাওয়া আসা করতো তারই প্রামান্য দলিল এই ছোটগল্পটি।

অনুবাদ: রোখসানা চৌধুরী
কিছু ক্ষেত্রে মানুষ বড় নিষ্ঠুর। বড্ড অবিবেচক। অন্যকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে তৃপ্তি খুঁজে পায়। হোক সে মৃত কেউ। হোক সেটা সেই মৃতের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠান। সেখানেও মৃতের নামে কুৎসা গাইতে কিংবা তার দুর্বলতা নিয়ে মুখর হতে বাধে না। মৃত প্রেসকট সাহেবের চর্মরোগ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় উপস্হিত কথক, এবং আরো অনেকের বিরক্তি বা ঘৃণার কারণ; সেটা নিয়ে মৃতের বাড়িতে চর্চা করাটা যে তারচে বেশি ঘৃণ্য এবং অসুস্হতা, এই বিষয়টা তাদের বোধে আসে না। শোকের ভানভনিতা ছেড়ে একসময় তাই কুটকাচালির আড্ডায় মগ্ন হতে কারো খুব একটা রুচিতে বাধে না। মানুষ আসলেই বড় বিচিত্র প্রাণী।

অনুবাদ: মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ
ইসাবেল আয়েন্দে চিলিতে জন্ম গ্রহণকারী একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিপ্রাপ্ত সাহিত্যিক। তাঁর তেইশটিরও বেশি বেস্টসেলার বই এবং জীবিত লেখকদের মধ্যে সবচে' প্রশংসিত, পঠিতদের একজন। তাঁর বই পঁয়ত্রিশের অধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং সত্তর লক্ষের বেশি বিক্রি হয়েছে। ইসাবেল আয়েন্দের গল্প 'উয়ালিমাই' পাঠকদের আনন্দপাঠ হোক সেটাই চাওয়া।
অনুবাদ: অর্ক চট্টোপাধ্যায়
'F--' গল্পটি ১৯৪৯ সালের ১৫ই জানুয়ারী Transition পত্রিকায় প্রকাশিত হয় স্যামুয়েল বেকেটের স্ত্রী সুজ্যানের নামে, যিনি তখনো তাঁর স্ত্রী ছিলেন না। অবশ্য তারা তখনও একসাথেই থাকতেন। এই গল্পটি লেখার সময় বেকেট ফরাসিতে En attendant Godot নাটকটি লিখছিলেন। গল্পটি ফরাসী থেকে ইংরেজিতে কে অনুবাদ করেছিলেন জানা যায় না কারণ পত্রিকায় অনুবাদকের নাম ছিলো না। বেকেট তাঁর জীবনীকার জেমস নোলসনকে বলেছিলেন হয়ত তিনিই এই গল্পটি অনুবাদ করে দিয়েছিলেন কিন্তু তিনি নিশ্চিত ছিলেন না। সুজ্যান পরে কখনই কোনরকম লেখালিখি করেননি এবং এই গল্পটি বিষয় এবং শৈলীর দিক থেকে বেশ বেকেটীয় হওয়ায় অনেক বেকেট-গবেষক এটিকে স্যামুয়েল বেকেটেরই লেখা বলে সন্দেহ করেছেন। লেখাটি নিজগুণেই থেকে যাক বরং, লেখকহীনভাবে। অথবা পদবির ছলনাকে আশ্রয় করে বলা যাক 'বেকেট' এই গল্পের লেখক বা লেখিকা!

মার্গারেট মিচেল'এর ধারাবাহিক উপন্যাস :
তেইশ পর্ব
অনুবাদক : উৎপল দাশগুপ্ত

ধারাবাহিক উপন্যাস :
১৬-২০ পর্ব
শাহাব আহমেদ

বই নিয়ে আলাপ


গল্পপাঠ ওয়েবজিন
বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ।। ১৪২৮ বঙ্গাব্দ।। মে-জুন।। ২০২১ খ্রিস্টাব্দ।। সংখ্যা ৭৭
সম্পাদক মণ্ডলীর সভাপতি : দীপেন ভট্টাচার্য