পাপিয়া ভট্টাচার্য

১। গল্প লিখতে শুরু করলেন কেন? 

পাপিয়া ভট্টাচার্য : সে ছিল শুরুরও শুরুর সময় , আমার সামান্য লেখালেখির প্রসঙ্গ এলেই যে সময়টাকে খুব মনে পড়ে। বাবা তার ডায়েরীতে ছোট গল্প , কবিতা লিখত । দেখাদেখি আমারও বোধহয় ইচ্ছে হত । ফাঁক পেলেই হাবিজাবি ছড়া , আবোল তাবোল লেখা লিখে প্রায়ই ভরিয়ে ফেলতাম বাবার সাধের লেখার খাতা । যেখানে সেখানে লেখার এই বদভ্যাস ছাড়ানোর জন্য বাবা আস্ত একখানা ছোট্ট নীল ডায়েরী দিল আমাকে ।
আমি তখন আট । তো ওটা পেয়ে মনের আনন্দে গাছপালা , ফুল , পাখি …..হাতের সামনে যা পাই সব নিয়ে ছড়া লিখে ফেলি । ওতেই প্রথম দীর্ঘ একটা গদ্য লিখি , খেঁজুর গাছের আত্মকথা । যার মোদ্দা কথাটি ছিল, আমার …মানে ওই খেঁজুর গাছের ….কি কষ্ট ! কত খেঁজুর ফলাই , কেমন লাল টুকটুকে পাকা পাকা খেঁজুর , অথচ নিজে একটাও খেতে পাই না ইত্যাদি দীর্ঘ বিলাপ ! গাছটি আমাদের বাগানেরই । সে নিয়ে বিস্তর হাসাহাসি , বাবা কিন্তু এবার আরো একটি বড় ডায়েরী দিল ওই আবোল তাবোল লেখার জন্যই । অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও এই সময়টাকে ফিরে দেখতে ইচ্ছে করল সম্ভবত এই কারণেই যে অনেক কিছুর অভাব নিয়েও আমার ভীষণ সমৃদ্ধ একটা ছোটবেলা ছিল , যা মানসিকভাবে আমাকে সাহায্য করে এখনও ।

তারপর তো বেশ অল্প বয়সে দুম করে বিয়ে হয়ে গেল আমার, অত্যন্ত রক্ষণশীল এক পরিবারে । যেখানে আমার এক এবং একমাত্র বন্ধু ছিল বই আর নিয়মিত ডায়েরী লেখার অভ্যাস । বিয়ে বা জন্মদিনে পদ্য লিখে দেওয়া ছাড়া এই দ্বিতীয় জীবনে প্রথম গদ্য লেখার শুরু আমাদেরই এক পারিবারিক পত্রিকায়, সেটি একটি গল্প। দেখলাম এই নিভৃত জগতটা বেশ লাগছে আমার । চারপাশে ছড়িয়ে কত ঘটনা , কতরকম চরিত্র , শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে তাদের গেঁথে ফেলতে অদ্ভূত একটা আনন্দ পাচ্ছি ।


২. শুরুর লেখাগুলো কেমন ছিল? 

পাপিয়া ভট্টাচার্য : শুরুর লেখা বলতে স্কুল কলেজ ম্যাগাজিনের টুকিটাকি ছাড়া ওই যে বললাম পারিবারিক পত্রিকায় আদুরী নামের গল্প । ওটা দেশের বাড়ির এক ভীষণ শুচিবাইগ্রস্ত দাপুটে বালবিধবা বৃদ্ধাকে নিয়ে , যাঁকে আমরা আদুরী পিসীমা বলতাম । লেখাটি পড়ে সবাই বলেছিলেন , পূজোবাড়িতে গিয়ে এবার তুমি ওঁর কাছে বিশাল ঝাড় খাবে । খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার , পূজোর সময় উনি আমাকে ডেকে চুমু খেয়ে ভারি বিষণ্ণ গলায় বললেন , লিখেছিস ভালই রে মা! সত্যিই তো , সেই তেরোতে বিয়ে আর চোদ্দতে বিধবা হয়ে আসা অবধি এত আচার বিচার করে কাটালুম যার কারণে, তার মুখটাই তো মনে পড়ে না আমার ! তাহলে সারাজীবন নিজেকে এত কষ্ট দিলুম, সবাইকে দিলুম, কার জন্যে রে মা, কার জন্যে !

তারপর যদিও অভ্যেসবশতঃ আমাকে ছোঁয়ার কারণে উনি কাপড় ছেড়েছিলেন , কিন্তু ওঁর মুখের সেই বিস্ময়মাখা গাঢ় বিষাদ আমার মনে রয়ে গেল ।
স্কুলে পড়ানোর সময় বার্ষিক অনুষ্ঠানে ছোটদের জন্যে নাটক লিখতে হত । ভাল লাগল লিখতে । শুরুর লেখাগুলো সব এইভাবেই এসেছিল । এখনও আসে । এইসব সাধারণ চেনা চরিত্রগুলো টানে আমাকে ।


৩. গল্প লেখার জন্য কি প্রস্তুতি নিয়েছেন? নিলে সেগুলো কেমন?

পাপিয়া ভট্টাচার্য : প্রস্তুতি নিয়ে কি লেখা যায় ! আমি ঠিক জানি না । তবে ছোট থেকে বই পড়ার নেশা ছিল খুব , সে সময় পড়ার ক্ষেত্রে বাছবিচারও ছিল না তেমন । বাবা মা দুজনেই সাহিত্যের ভক্ত হওয়ায় বাড়িতে প্রচুর বই আসত । তাছাড়া জন্মদিন , পরীক্ষায় ভাল ফল , পূজোয় শারদসংখ্যা…..সব উপহারই ছিল বই । সবই গোগ্রাসে পড়ে ফেলতাম। এখন সেগুলোও অবচেতনে এক প্রস্তুতি কিনা, বলতে পারব না ।

৪. আপনার গল্পলেখার কৌশল বা ক্রাফট কি?

পাপিয়া ভট্টাচার্য : বলা কঠিন । লেখার কি নির্দিষ্ট ছক হয় কোন ! যা দেখি , ভাবি , যে জীবনের মধ্যে হেঁটে যাই , তার অনেক কিছুর ভেতরই কি যেন একটা ঘটনা লুকিয়ে থাকে ! হঠাৎ কোন অবসরে বা কাজের মধ্যেও , তারই একটা লাইন ঝলসে উঠল চোখের সামনে , একদিন হয়তো বসে পড়লাম সেটা ভেবে, একটা গল্প হয়ে গেল । তবে খুব বেশি কল্পনার আশ্রয় নিয়ে বা বানিয়ে কিছু লেখা আমার আসে না । তাই আমার লেখার মধ্যে প্রচুর সীমাবদ্ধতা ।

৫. আপনার নিজের গল্প বিষয়ে আপনার নিজের বিবেচনা কি কি?

পাপিয়া ভট্টাচার্য : নিজের লেখা বিষয়ে ? এত সামান্য লিখেছি যে বলার মত অবস্থাতেই পৌঁছইনি মনে হয় । তবে কোন লেখা লিখেই যেমন মনে হয় নি এটা না লিখলেই হত , তেমনি সম্পূর্ণ তৃপ্তিও আসে নি কোন লেখা ঘিরে । আবার এও ঠিক , নিজের পছন্দের কোন লেখাও যদি কিছু অদলবদল করতে বলা হয় , তাহলে হয়তো পুরো লেখাটিই পালটে যাবে ।

৬. আপনার আদর্শ গল্পকার কে কে? কেন তাঁদেরকে আদর্শ মনে করেন? 

পাপিয়া ভট্টাচার্য : প্রিয় গল্পকার তো অনেক । গল্পগুচ্ছের রবীন্দ্রনাথ , শরতচন্দ্রের কিছু গল্প থেকে আশাপূর্ণা , সমরেশ বসু, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী , শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় , নরেন্দ্রনাথ মিত্র , জগদীশ গুপ্ত , শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় , মহাশ্বেতা দেবী , সমরেশ মজুমদার , বিমল কর কিংবা রতন ভট্টাচার্য থেকে স্বপ্নময় চক্রবর্তী , অমর মিত্র , বসন্ত লস্কর পর্যন্ত দীর্ঘ সে তালিকা , এই মুহূর্তে মনেও পড়ছে না সব নাম, বাংলা ছোটগল্পের ভান্ডার অতি সমৃদ্ধ ।

৭. কার জন্য গল্প লেখেন? আপনি কি পাঠকের কথা মাথায় রেখে লেখেন? লিখলে কেন লেখেন? আর যদি পাঠকের কথা মনে না রেখে লেখেন তাহলে কেন পাঠককে মনে রাখেন না লেখার সময়ে? 

পাপিয়া ভট্টাচার্য : নিজের জন্যে , স্রেফ নিজের জন্যে ! পাঠকের ভাল লাগলে আনন্দ তো হবেই , না লাগলে একটুখানি দুঃখও হয় ! কিন্তু শেষ পর্যন্ত লেখাটা আমার নিজেরই ।


৮. এখন কি লিখছেন? 

পাপিয়া ভট্টাচার্য : গত চারবছর ধরে প্রচুর শারীরিক বাধার মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে । খুব বড়সড় একটা ধাক্কা গেল জীবনে, যার জের চলছেই। আবার শুরু করেছি টুকটাক। ধারাবাহিক উপন্যাস একটা , অল্পস্বল্প ছোটগল্প । আপাতত এই।

৯. আগামী কি লিখবেন? 
পাপিয়া ভট্টাচার্য : জানি না , সত্যিই জানি না । জীবনটাই এত অনিশ্চিত হয়ে আছে !