রবিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৭

কথাসাহিত্যিক অমর মিত্রের সঙ্গে অকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত ধ্রুবপুত্র উপন্যাসের নির্মাণ নিয়ে আলাপ

রিমি মুৎসুদ্দি :
 ২০১৭-এ ‘ধ্রুবপুত্র’ উপন্যাস কতটা সমসাময়িক? না কি সময়কে এড়িয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক আখ্যান?

মর মিত্র :
ধ্রুবপুত্র কোনো ঐতিহাসিক আখ্যান নয়। আসলে একটি উপলব্ধি এই উপন্যাসের জন্ম দিয়েছে। এর কাহিনি আমার কল্পনা। আমি উজ্জয়িনী বেশ কয়েকবার গিয়েছি। আত্মীয়তা সূত্রেই সেই যাওয়া। তখন আমি বছর ৩২ । আমি কালিদাসের কাব্য মেঘদূতম পড়েছি। কিন্তু উজ্জয়িনী নামের সেই নগর যে বেঁচে আছে এই ভারতবর্ষে, তা ছিল আমার কল্পনার বাইরে।
অতীতের নগর কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে তাই-ই ছিল আমার ধারণা। কিন্তু দেখলাম সেই নগর। সেই শিপ্রা ( ক্ষিপ্রা ) নদী এবং মহাকাল মন্দির। যদিও সেই কালিদাস বর্ণিত মন্দির নেই, কিন্তু পরে যে মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল, তাও কম গরিমাময় নয়। সেই অভ্রভেদী চূড়া, মহাকাল বিগ্রহ, মানুষের বিশ্বাস আমার ভিতরে পরম বিস্ময়ের জন্ম দেয়। হ্যাঁ, মেঘদূতমের গম্ভীরা নদী ( অথবা হ্রদ ) ও আছে নগর থেকে অদূরে। সাঁচির অদূরে আছে বিদিশা নগর এবং বেত্রবতী ( বেতোয়া ) নদী। সেখান থেকে উদয়গিরি যাওয়া যায় ট্রেকারে করে। এই উদয়গিরিই মেঘদূতম কাব্যে নীচৈ পাহাড়। কাব্যের বর্ণনা মিলে যেতে থাকে। আমি যেন প্রাচীন ভারতে পরিভ্রমণ করেছি তখন।

উজ্জয়িনী প্রথম গিয়েছিলাম ঘোর শ্রাবণে। কিন্তু তেমন মেঘ কোথায় ? শুনেছিলাম ঐ অঞ্চলে সমস্ত বছরে ১৪ ইঞ্চি বৃষ্টিপাত হয়। ভয়ানক খরায় পোড়ে নগর। জলের খুবই অভাব। মিউনিসিপ্যালিটি সপ্তাহে তিন দিন জল সরবরাহ করতে পারে গ্রীষ্ম আরম্ভ হলে। তখন আমার মনে হয়েছিল উজ্জয়িনী অনাবৃষ্টির নগর। আমি মহাকবির কাব্যের বিপরীত ভাবনায় একটি আখ্যান রচনা করতে পারি। মেঘদূতম কাব্যে আষাঢ়ের প্রথম দিন মেঘ আসে নগরে। মহাকাল শীর্ষে দাঁড়িয়ে সেই মেঘ গর্জন করে। মধুর বর্ষা নামে নগরে। আমি সেই উজ্জয়িনীকে বিপরীতে কল্পনা করলাম। বর্ষা নেই। অনাবৃষ্টিতে পুড়ছে নগর। এই উপন্যাস অনন্ত এক খরার কাহিনি। অনাবৃষ্টির কাহিনি। আর আমি সেই অনাবৃষ্টি দেখেছিলাম বাঁকুড়ায়। মেদিনীপুরের পশ্চিম সীমান্তে। জলহীনতা আর অনাবৃষ্টির ভয়ঙ্কর রূপ আমাকে চিনিয়েছিল বাঁকুড়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল। আমি সেই অভিজ্ঞতা উজ্জয়িনীতে নিয়ে গেছি। জ্ঞানের নির্বাসন হলে প্রাকৃতিক সেই বিপর্যয় নেমে এসেছিল সুবর্ণ নগরী উজ্জয়িনীতে। জ্ঞানের নির্বাসন আমরা অবিরত দেখে থাকি। জ্ঞানীর অসম্মানও। তার ফলে নানা বিপরযয়ও। এই আখ্যানের কাহিনি আমার রচনা। ইতিহাসে এর এক বিন্দুও নেই। ভাষা শৈলী না পেলে এই উপন্যাস লেখাই হতো না। এই উপন্যাসের সময়কালে আরব দেশীয় বণিক, যবন বণিক ( গ্রিক ) ভারতবর্ষে প্রবেশ করছে সবে। ভারতীয় ভাষায় ঐ সব দেশের ভাষার শব্দ প্রবেশ করেনি তখনো। তাই আমার রচনায় আরবি বা ফার্সি শব্দ, কোনো বিদেশী শব্দ ব্যবহার করিনি সচেতন ভাবে। লেখার জন্য সংস্কৃত সাহিত্য পড়েছি। তাতে সাজ-সজ্জা, পরিবেশ জেনেছি, সময়কে আন্দাজ করেছি। উজ্জয়িনীর উপর একটি মহাগ্রন্থ পেয়েছিলাম উজ্জয়িনীর বিক্রমাদিত্য বিশ্ববিদ্যালয়ে। দেশ-বিদেশের শ্রেষ্ঠ ইতিহাসবিদদের উজ্জয়িনী চর্চা নিয়ে সেই বই। সাহায্য করেছিল আমাকে সময়কে কল্পনা করে নিতে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের পৌত্র ইতিহাসবিদ হিমাদ্রি বন্দ্যোপাধ্যায় আমাকে সাহায্য করেছিলেন প্রাচীন নাম সম্বলিত প্রাচীন ভারতের মানচিত্র দিয়ে। একটা কথা বলতে হয়, মেঘদূতম কাব্যে বিন্ধ্য থেকে অলকাপুরী, হিমালয়ের দিকে যে যাত্রাপথ মেঘের, তা কিন্তু মৌসুমী বায়ুর যাত্রাপথ নয়। উজ্জয়িনীতে মৌসুমী বায়ু প্রবেশ করে প্রাচীন সৌরাষ্ট্র, এখনকার গুজরাতের দিক থেকে। মেঘদূতমে মেঘের যাত্রাপথ ছিল বণিকের পথ। যে পথে বণিকরা আসত এই নগরে তাদের পশরা নিয়ে, সেই পথের কথাই লিখেছেন মহাকবি। এই তথ্যসূত্রও আমাকে বিস্মিত করেছিল। প্রণত হয়েছিলাম ওই কাব্যের সামনে। তিনি যা শুনেছেন বণিকের কাছে, যে যে দেশের কথা, যে রাম গিরি আর বিদিশার কথা, কী মনোরম ভাষায় লিখে গেছেন। কম বয়স আমাকে সাহসী করেছিল মেঘদূতমের বিপরীতে সেই নগরকে ভেবে নিতে।

রিমি মুৎসুদ্দি :
ধ্রুবপুত্রের প্রত্যাবর্তন ও কালিদাসের বিখ্যত রচনা মেঘদূতের সূত্রপাতের মধ্যে দিয়ে উপন্যাসে বর্ণিত উজ্জয়নীতে অনাবৃষ্টি, প্রকৃতির অভিশাপ, মানুষের লোভ, হিংসা- প্রেমহীন সময়ের যেভাবে অবসান ঘটতে চলেছে, তার চিরকালীন আপীল বা তাৎপর্য সম্বন্ধে যদি কিছু বলেন।

অমর মিত্র :
শাহজাদা দারাশুকো লিখতে গিয়ে শ্যামলদা তো নমাজ পড়াও শিখেছিলেন জানি। মহৎ লেখক। এবং তিনিও ছিলেন কল্পনা প্রবণ লেখক। ওই উপন্যাসে কল্পনা দর্শন সব মিলে মিশে আছে। এমন উপন্যাস আমাদের ভাষায় হয়নি। আর বানী বসুর উপন্যাসটিও ইতিহাস নির্ভর। এই দুটি উপন্যাস আমাদের ভাষার সম্পদ নিশ্চয়। আমি ইতিহাসের কথা লিখিনি। আমি লিখেছি নিজের কল্পনাকে বিস্তৃত করে। এতে আমি আনন্দ পাই। উপন্যাস লিখব আমি। টিম কী করে তৈরি হবে আমাকে সাহায্য করতে? আমি গ্রাম-মফস্বলে ঘোরা মানুষ। খরা দেখেছি। মানুষের অসহায়তা দেখেছি। পীড়ন দেখেছি। সবই নানা ভাবে সাহায্য করেছে আমাকে। সেই-ই আমার টিম। সাহায্য কেউ যদি করে থাকেন, তা এই প্রকৃতি। আর প্রকৃতি সংশ্লিষ্ট মানুষ। সেই কুয়োপাড়, ভোর থেকে যেখানে মানুষ হাজির হয়ে যেত জলের জন্য। বালতিতে উঠতে লাগল বালি। মনে পড়ে সেই সব দিন এখনো। হ্যাঁ একটি কথা বলতে হয়, আমাকে কোনো পত্রিকা লিখতে বলেনি। কেউ এই উপন্যাস ধারাবাহিক ছাপেনি। কোনো সম্পাদক এগিয়ে আসেননি। লিখেছিলাম নিজের তাগিদে। সুতরাং টিম তৈরি এক অলীক ধারণা ছিল আমার কাছে। আমি তা ভাবিনি। তখন প্রতিক্ষণ বন্ধ হয়ে গেছে। লিখি বারোমাস, সত্যযুগ ইত্যাদি পত্রিকায়। আজকাল এবং প্রতিদিন পত্রিকা গল্প লিখতে বলে, উপন্যাস নয়। সুতরাং নিজের মতো করে নিজ তাগিদেই লেখা। ১৯৯৪ নাগাদ লেখা আরম্ভ হয়। ২০০০ হাজার নাগাদ শেষ হয়। এই সময়ে, ১৯৯৭-৯৮ নাগাদ একটা ঘটনা ঘটেছিল, শ্রদ্ধেয় লেখক রমাপদ চৌধুরী ধ্রুবপুত্র লিখনের কথা শুনে অবাক হয়ে বলেছিলেন, কেউ ছাপবে বলেনি, লিখে যাচ্ছেন ?

হ্যাঁ। আমি বিন্ম্র স্বরে জবাব দিয়েছিলাম।

তিনি বলেছিলেন, লিখুন, এই উপন্যাস সত্যিকারের উপন্যাস হয়ে উঠবে, আপনার সাহস আর পরিশ্রমের দাম পাবেন।

তাঁর কথাটি মনে আছে। এই সুযোগে তাঁকে প্রণাম করি। তাঁর কথা হয়তো সত্য হয়েছে।

রিমি মুৎসুদ্দি :
ধ্রুবপুত্র উপন্যাসে একটি গুরুগম্ভীর ও সৌকর্য্যময় ভাষাভঙ্গীতে লিখেছেন। এই ভাষাটিকে কালীদাসের আমলের আখ্যানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই কি নির্মাণ করেছেন? 

অমর মিত্র :
ভাষা এবং আঙ্গিক না পেলে তো লেখাই হবে না। আর এক উপন্যাস ধনপতির চরের ভাষা আর একভাবে বয়ে গেছে। ভাষা পেয়েই লেখা আরম্ভ। আলাদা প্রস্তুতি নিতে হয়নি। শুধু পটভূমি অনুযায়ী আঞ্চলিক উপভাষাকে ভালো ভাবে বুঝে নিতে হয়েছে। কুমারী মেঘের দেশ চাইয়ে উত্তরবঙ্গের উপভাষাকে বুঝতে হয়েছে। ধনপতির চর এবং অশ্বচরিত উপন্যাসে বুঝতে হয়েছে সমুদ্র উপকূলের ভাষা। ধ্রুবপুত্র তো প্রাচীন ভারত। তার ভাষা না পেলে লেখাই হতো না। সেই ভাষা আমি পেয়েছি নির্মাণে ডুবে যেতে যেতে। তা ছিল বিদেশী শব্দ মুক্ত তৎসম এবং চলিত বাংলার মিশ্রণ, যা আমি জীবনানন্দের কবিতায় পেয়েছি। ভাষাকে সৌন্দর্যময় করে তুলতে চেয়েছিলাম। হয়তো হয়েছে।


 রিমি মুৎসুদ্দি :
উপন্যাসের জাদুবাস্তবতা মার্কেজ বা কুন্দেরাকে মনে করিয়ে দিলেও কোথাও কি উপন্যাসে বর্ণিত জাদু বাস্তবতা স্বাতন্ত্র্যের দাবী রাখে বলে মনে হয়?

অমর মিত্র :
আমি রুশ উপন্যাসের অনুরাগী। এই প্রবল লাতিন আমেরিকান সাহিত্য-প্লাবনের যুগেও রুশ উপন্যাস গল্প আমাকে স্তম্ভিত করে। সেখানে কি ওই জাদু বাস্তবতা আছে ? নেই। আমার প্রিয় গল্পকার আন্তন চেখব। ঔপন্যাসিক তলস্তয়, ফিয়োদর দস্তয়েভস্কি। আমি যেভাবে লিখেছি তা আমার লেখার ধরণ। এইভাবেই আমি পারি। এইভাবে লিখেই আনন্দ পাই। অশ্বচরিত পড়ে ঐ যাদুর কথা বলেছিলেন প্রথম শ্রদ্ধেয় পবিত্র সরকার। কিন্তু যে জন্য বলা, সেই বিভ্রমের কথা আমি লিখেছিলাম ১৯৮০-তে। ১৯৮১-র ফেব্রুয়ারিতে তা প্রকাশিত হয়েছিল সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘ শিলাদিত্য’ পত্রিকায়। অশ্বচরিত উপন্যাসের বীজ ছিল সেই নভেলেট। তখন লাতিন আমেরিকার সাহিত্য আমাদের কাছে অজানা ছিল। অশ্বচরিত লিখি সেই বিভ্রম নভেলেট থেকেই। ১৯৯৮-এ পোখরানে পরমানু বোমা বিস্ফোরণের পর দিন আরম্ভ হয় সেই উপন্যাস রচনা। বৈশাখী পূর্ণিমা। ঘোড়াটি পালালো।

আমি আমার মতো করে লিখি। এইটা আমার ফর্ম। এইভাবে কাহিনি আসে আমার কাছে। প্রবল বাস্তবতা থেকে কখন বেরিয়ে যাই ধরতে পারি না। সচেতন ভাবে কি এইসব করা যায় ? সৃজনে কী হয়, হতে পারে তা অজানাই থেকে যায় লেখকের কাছে। সমকালীন বাংলা সাহিত্য অনেক ভাল উপন্যাস পেয়েছে। লেখকরা তাঁদের মতো করে লিখে সিদ্ধি লাভ করেছেন। আসলে সাহিত্য শিল্প আমার দেশ, এই উপমহাদেশের অন্তরকে ধরতে পারল কি না সেইটাই বড় কথা। আর আমি আঁকাড়া বাস্তবতা লেখায় বিশ্বাস করি না।





রিমি মুৎসুদ্দি
গল্পকার। প্রাবন্ধিক। অর্থনীতিবিদ। অধ্যাপক।
দিল্লীতে থাকেন। 


1 টি মন্তব্য:

  1. অনেক কিছু জানলাম। আর অনেক কিছু জানার আগ্রহ তৈরি হলো।
    বাণী বসুর লেখা ইতিহাসনির্ভর বইটি কি 'মৈত্রেয়ী জাতক'?

    উত্তরমুছুন