বৃহস্পতিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১৮

কথামালা’ বাংলা সাহিত্য সম্মেলন - সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম

শব্দ কি বস্তুর চূড়ান্ত অনুভবের কাছে সত্যি পৌঁছে দেয়? নাকি বাকি পথটার দায় ব্যক্তির চেতনার ? মাইলিটসের তিনদিনের আয়োজন নিয়ে লিখতে বসে এ প্রশ্নটাই প্রথম ভাবতে হলো। এই আয়োজন থেকে আসলে বাংলা সাহিত্যে নতুন কী কী সংযোজন হলো? তবে একটা সম্মেলন থেকে সাহিত্যে উত্তরণের প্রত্যাশাটা আসলে কতখানি হওয়া উচিৎ তাই আগে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। এ যাত্রা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার। সেখানে পৃথিবীর নানা প্রান্তে নানা উদ্যোগের ভেতর Michigan Literary and Theatrical Society - MILITS এর পক্ষ থেকে কথামালার তিনদিনের বাংলা সাহিত্য সম্মেলন ছিল একটি যাত্রার শুরু। তাতেই অনেক অনেক ঘটনা ঘটলো। আয়োজনের ছকটা শুনে একটু ভাবনাও ছিল স্বীকার করে নিচ্ছি।
বাদ্য যন্ত্রের দ্যোতনা, গান বা চিত্তাকর্ষক চিত্রনাট্য ছাড়া নিরস এক আয়োজনে কারও আগ্রহ থাকার কথা না। তত্ত্বীয় কথা, নানান অসঙ্গতির আলাপ বা কবিতার পেছনে গল্প শুনতে অতোটা সময় কোথায় আর বাংলা গদ্যের ধারা সদর-মফঃস্বল করেই ঝিমিয়ে পড়ছে কিনা জানতেই বা কার মাথাব্যথা! এসব সীমাবদ্ধতা নিয়েই শুরু হয়েছিল মাইলিটস-এর আসর।

২৩ মার্চ বিকেলে মিশিগানের হিউরন রিভার সাইড আর্ট সেন্টারে 'The Third Breast’ তথ্য চিত্র শুরু হলে প্রথমে সামান্য অস্বস্তি এরপর নিরবতা। পর্দায় তখন ভারতের মধ্যপ্রদেশের খাজুরাহ মন্দিরের গায়ের বাস্তু, পুরষা, মান্দালা ভাস্কর্যের নানা দৃশ্য। চন্দেল রাজত্বকালে নির্মিত এই মন্দিরের ভাস্কর্যের ভাষার যোগসূত্রেই এলো কামাখ্যার মন্দিরে দেবির যোনি পূজা। যার ইতিহাস রয়েছে বাৎস্যায়নের বর্ণনায়। এলো শিব লিঙ্গ পূজা, ফাল্লুজ, মন্দিরে মন্দিরে নারী পুরুষের মিলনের ইতিহাসের গল্প। ভারতবর্ষের মাটিতে প্রতিদিনের যাপনে, বিশ্বাসে, চর্চায় এর উপস্থিতি হাজার বছর ধরে। কামসূত্রের সূচনাও এই ভূমিতে অথচ সেখানেই অহরহ ঘটছে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা। ভালোবাসা ও নিবেদনের প্রতীক হিসেবে নিয়ত চারপাশে যার চর্চা হচ্ছে আসলে তা কতটা ইতিবাচক প্রভাব রাখছে মানুষের ভেতর? অন্ধকার এই প্রবৃত্তির ক্রমশ উন্মত্ত উন্মোচনের পেছনে অনেকটাই কি দায়ি নয় এইসব বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে না পারার ট্যাবু? লেখক, মানবাধিকার কর্মী ও তথ্যচিত্র নির্মাতা অনামিকা বন্দোপাধ্যায়ের 'The Third Breast’তথ্যচিত্রের শেষ সংলাপ ছিল ‘আসুন কথা বলি’।

কথা বলতেই সকলের এই ছুটে আসা। তার রেশটা ভালো বোঝা গেল দ্বিতীয় দিন অনুষ্ঠানের শুরুতেই। প্রথম পর্ব ছিল বাংলা গল্পের ভূত-ভবিষ্যত। সঞ্চালক ভারত ও বাংলাদেশ থেকে অংশ নেওয়া আমন্ত্রিত দুই সাহিত্যিককে আলোচনার জন্য মঞ্চে ডেকে পরিচয় পর্ব শেষ করে শ্রোতাদের হাতে মাইক্রোফোন তুলে দিয়েছিলেন প্রশ্ন করতে। সেই পর্ব মুক্ত আলোচনার রূপ পেল। উপস্থিত প্রত্যেকেই নিজের পরিচয় দিতে দিতে জানিয়ে দিলেন ছোট গদ্য নিয়ে তাঁর ভাবনা। কেও বললেন নিজের লেখার অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যত লেখার পরিকল্পনা। কবিতার মানুষের জিজ্ঞাসায় উঠে এলো গল্পের নান্দকিতার প্রশ্ন। অনুবাদক জানতে চাইলেন ছোট গল্পের কাঠামো নিয়ে। আর ততক্ষণে এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার দায় আমন্ত্রিত লেখকের কাঁধ থেকে অনেকটাই নেমে গেছে। সরব হলেন বেশি শ্রোতারাই। স্পষ্ট টের পাওয়া গেল ঠিক ওই মুহূর্ত থেকেই আয়োজনটা হয়ে উঠলো সকলের। এই সকলের হয়ে ওঠাই ছিল কথামালার এবারে বড় সাফল্য। মাই লিটসের অন্যতম আয়োজক আনন্দ সেন বললেন, কয়েকটা দিন মানুষ শুধু মিলে মিশে রইবে এই আমাদের প্রাপ্তি। তবে সেদিন সন্ধ্যায় আরও একটা প্রাপ্তি হয়েছে বাংলাদেশের।

‘কবিতার সংজ্ঞা’ ও ‘গল্পের অন্তরমহল’ পর্ব শেষে বাংলাদেশের আশির দশকের সফল নাট্যশিল্পী লুতফুন নাহার লতার মনোলোগ ‘বীরাঙ্গনা কহে’। এরপর ছিল সাহিত্যিক অমর মিত্রের লেখা ‘মেঘ পাহাড়ের দেশে’ নাটকের মঞ্চায়ন। বিশেষ মঞ্চ সজ্জা ছাড়া শুধু বাংলাদেশের পতাকাটা পেছনে রেখে মঞ্চের সিঁড়িতে বসেছিলেন লতা। আমি বীরাঙ্গনা বলছি থেকে নির্দিষ্ট কয়েকটি জায়গা পড়লেন। তখন একাত্তরে ক্যাম্পের নারীদের অভিজ্ঞতার শব্দগুলো যেন হাত দিয়ে স্পর্শ করা যায়। উপস্থিত সব দর্শক শ্রোতা মুহূর্তে পৌঁছে গেলেন মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিতা সেই নারীদের সামনে। বীরাঙ্গনা কহের ভেতর সেই নারীদের গল্প যাদের অনেকেরই দেখার সৌভাগ্য হয়নি স্বাধীন বাংলাদেশ। বীরাঙ্গনা কহে শেষ হতেই দীর্ঘ সময়ের নীরবতা নেমে এলো রিভার সাইড আর্ট সেন্টারের অডিটোরিয়ামে। ‘মেঘ পাহাড়ের দেশে’ নাটকের কলাকুশলীরা ঘোষণা দিলেন, তাঁরা মুক্তিযুদ্ধকে যেন অনুভব করছেন। মানসিক এই স্তরে তাদের পক্ষে এখনই আরেকটি নাটক মঞ্চস্থ করা স্বস্তির হচ্ছে না। উপস্থিত সকলে উঠে দাঁড়িয়ে নীরবতার ভেতর শ্রদ্ধা জানানো হলো বীরাঙ্গনাদের। সদ্য প্রয়াত ফেরদৌসি প্রিয় ভাষিণীর নাম উচ্চারণ হলো।


এর আগের একটা গুরুত্বপূর্ণ পর্ব ছিল ‘অনুবাদের ভিতর-বাহির’। হিউস্টন থেকে মিশিগান এসেছিলেন ইন্ডিক হাউজ প্রকাশনার সুমিতা বসু। তাঁর প্রকাশনা থেকে সম্প্রতি দুই বাংলার গল্পকারদের ২৪ টি গল্পের ইংরেজি অনুবাদে প্রকাশিত হয়েছে Treausures From Bengal সঙ্কলন। রবীন্দ্রনাথ থেকে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, রিজিয়া রহমান থেকে তরুণ লেখক আশা নাজনীনের গল্প ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে জায়গা করে নিয়েছে এ বইয়ে। গল্পগুলোর ভাষান্তর করেছেন রঞ্জন মুখার্জী ও গ্রায়ত্রী স্পিভাকের মতো অনুবাদকেরা। সুমিতা বসু জানালেন, দুই বাংলাতেই বিদেশি সাহিত্য যেমন অনুবাদ হচ্ছে এর সাথে তাল মিলিয়ে বাংলা সাহিত্য ইংরেজিতে ভাষান্তরেও দৃষ্টি দেওয়ার সময় এসেছে।

হলের ভেতর যখন এসব আলোচনা চলছে বাইরে তখন দফায় দফায় নানা রকম মিষ্টান্ন আর উষ্ণ জলের অভ্যর্থনা। আর টেবিলে সারি সারি বই। বঙ্কিম, মানিক, বিভূতি থাকবে জানা কথা তবে চমকে গেলাম সুধীর চক্রবর্তীর বইয়ের উপস্থিতিতে। লেখকেরা নিয়ে এসেছেন নিজেদের বই। দেয়ালে তখন হলুদ আলোর ভেতর হিরন সরকার আর তাপস রায়ের প্যাস্টেল, অয়েল মাধ্যমে আঁকা চিত্রের প্রদর্শনী। আয়োজনের এক পর্বে নিজেদের ছবি নিয়ে আলোচনা করলেন দুই শিল্পী।

ভালোবাসা ও আকর্ষণের কোন সীমানা থাকেনা জানালেন হিরন সরকার। তাঁর ছবিতে ফিরে আসে সৃষ্টির গভীর নীল, জীবনের উল্লাস ও অন্ধকার। তাপস আঁকেন ভারতীয় মিথলজিকে বিষয় করে। গাঢ়ো ক্যানভাসে তাপসের আঁকা তৃতীয় নয়ন ছবিটা মনে থাকবে বহুকাল। যেমন চাইলেই বিস্মৃত হওয়া যাবে না অমর্ত্য সেনের মায়ের সাদা-মাটা স্নিগ্ধ মুখাবয়ব। এই দৃশ্যটি তুলে এনেছেন ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জয়ী সিনেমার কারিগর সুমন ঘোষ। প্রথম দিনেই দ্বিতীয় তথ্যচিত্র ছিল নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেনকে নিয়ে। সুমন ঘোষ তুলে এনেছেন নোবেল বিজয়ীর গবেষক মনোবৃত্তির দিকটি। অমর্ত্য সেনের তরুণ বয়সে ক্যান্সার হয়েছিল। চিকিৎসক বলেছিলেন আয়ু মোটে মাস কয়েক। এই প্রসঙ্গে কথা বলেছেন অর্থনীতিবিদ। ১৫ বছর সময় নিয়ে কয়েকটি ধাপে চিত্রায়ণ হয়েছে এই তথ্যচিত্রটি। কিছু স্পর্শকাতর বিষয়ের উল্লেখ থাকায় পেহলাজ নিহালনির আমলে সেন্সর বিতর্কে উঠে এসেছিল অমর্ত্য সেন'কে নিয়ে এই  সিনেমার নাম "The Argumentative Indian" । মামলা করে সেন্সরবোর্ডের অুনমোদন নিয়েছেন সুমন। শর্ত মতে এখানে ‘গুজরাট’ শব্দটি ব্যবহার করেননি অমর্ত্য সেন। শর্ত দিয়ে যে শিল্পকর্মকে বাঁধা যায় না কে না জানে!

মাইলিটসের তিনদিনের আয়োজনের আনন্দের দিক হচ্ছে, হলঘরে কফি নিয়ে প্রবেশ নিষেধ ছাড়া কোথাও কোন শর্ত ছিল না। আমরা বাঙ্গাল কিনা, ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে সে শর্তও আনন্দ নিয়ে ভেঙেছিলাম আমি আর ভারত থেকে আমন্ত্রিত কথা সাহিত্যিক অমর মিত্র। আমরা যুক্তি করে অবাধ্য ছাত্রের মতো কফি হাতে প্রবেশের কিছুক্ষণ আগেই নিজেরাই বেশ একটা তর্কে জড়িয়েছিলাম। বাংলা গদ্যের ধারা প্রসঙ্গে হয়ত আমার আবেগ বেশি প্রকাশ ঘটছিল। তাইত স্বভাবতই বাংলাদেশের মানুষের বাংলা ছাড়াত আর কোন ভাষা নেই, আবার সে ভাষার ইতিহাসই একে অমূল্য করেছে আমাদের জন্য। কিন্তু পশ্চিম বাঙলার সাহিত্যিকদের বহু ভাষার মানুষের ভেতরই ভাব আদান-প্রদান করতে হয়। এমনকি আমার জানা মতে, কলকাতায় বাংলা বইয়ের পাঠকও এখন আর তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। একটা সময় তরুণ প্রজন্ম সুনীল, সমরেশ, শীর্ষেন্দুর পাঠক ছিল সেই ঢেউটা বদলাতে শুরু করেছে। বাংলাদেশে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, শওকত ওসমান, শওকত আলী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক, রিজিয়া রহমান, হুমায়ুন আজাদ, জ্যোতি প্রকাশ দত্ত, পূরবী বসু, হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, নাসরিন জাহানদের মতো লেখকের পরও গুণী লেখক তৈরি হয়েছে। জাকির তালুকদার, আহমদ মোস্তফা কামাল, প্রশান্ত মৃধা, শাহীন আখতার, শাহনাজ মুন্নী, অদিতি ফাল্গুনির মতো লেখকরা নিয়মিত লিখছেন। আমাদের প্রজন্মের কথা না হয় আরও পরে আসুক।

আমি স্পষ্টই বলেছি, বাংলাদেশেই পাঠক তৈরি করা লেখক প্রজন্ম শুরু হয়েছে তবে বাংলা গদ্যের একটা সঙ্কট হচ্ছে এটি এখনও বহুমাত্রিক হয়ে উঠতে পারেনি। বিশ্বের অন্যান্য দেশের জনপ্রিয় সাহিত্য পাঠে যে বোধ পাওয়া যায় সে তুলনায় বাংলা গদ্য এখনও এক রৈখিক। ল্যাটিন আমেরিকা আর ইউরোপিয় আদলের দিকেই আকৃষ্ট। এখানে অমর মিত্র বললেন, বাংলা গল্পে বহুমাত্রা আছে। আর অন্যান্য দেশের যে সাহিত্য আমরা পড়ি সেগুলো অধিকাংশ বেষ্ট সেলারই হাতে আসে। ওটাই সে দেশের সমস্ত সাহিত্য নয়। এ তর্কের মাঝখানে রেফারির ভূমিকা নিলেন ক্যালিফোর্নিয়া থেকে আসা সাহিত্যিক বৈজ্ঞানিক দীপেন ভট্টাচার্য। তিনি ধরিয়ে দিলেন, সাদিয়া বলছে গল্প- উপন্যাসে দর্শনগত দিকগুলোর বহুমাত্রার কথা। অমর মিত্র বলছেন বিষয়গত দিকটি। দীপেন ভট্টাচার্য বিশ্ব সাহিত্য নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে আনলেন বিশ্বের তাবড় লেখকদের সাথে হারুকি মুরাকামির লেখার ধরণের বর্ণনা। তবে সব কি আর শব্দ দিয়ে স্পর্শ করা যায়! 

সুরের অনুরণন শব্দেরও বেশি। হল ঘরটা অন্ধকার করে দিয়ে প্রজেক্টরে একটা ছবি ভেসে উঠলো। ভিন্ন ভিন্ন জাতীয়তার একশ দশজন স্কুল শিক্ষার্থী অর্কেস্টা আর ভায়োলিনে তুলছেন একটা পরিচিত সুর। এই ভালোলাগার বর্ণনা হয় না, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের সুর তুলছেন বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা। অসাধ্য কাজটি করেছেন মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োস্ট্যাটিকসের শিক্ষক মৌসুমি ব্যানার্জী। Tagore on Soul Strings নামে এ আয়োজন এখন অন্য ভাষার মানুষদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে আমাদের রবীন্দ্রনাথকে। 

মৌসুমি চমৎকার আবৃত্তি করেন। ওর পড়া কবিতার কথাগুলো এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না তবে জিষ্ণু সেন জয় গোস্বামীর কবিতা পড়ে থমকে দিয়েছিলেন শ্রোতাদের। বিদেশের মাটিতে বসে অতো ভালো বাংলা আবৃত্তি ! শ্রাবণী রায়ের কবিতা পাঠের শেষে সকলে জানতে চেয়েছিল এমন একটা ভাবনা তাঁর মাথায় কাজ করলো কেমন করে? হিউস্টন থেকে অ্যান আরবারে উপস্থিত শ্রাবণীর কবিতাটা নিজের লেখা। একই বয়সি দুজন মানুষ একই সময় তৈরি হচ্ছে ঘরের ভেতর। একজন চলেছে ভালোবাসতে মানুষ, অন্যজন হত্যায়। একই সময়! দুজন মানুষ সবকিছু ঠিকঠাক এক, শুধু কোথাও থেকে সরে দাঁড়িয়েছে এক বিন্দু। শ্রাবণীর কবিতায় ছিল হত্যাকারিকেও ভালোবেসে দেখতে চাওয়ার আহ্বান। কেন মানুষটা এমন হলো। অন্য মানুষের দেশে থাকা মানুষেরা নিজের মাটিকে আরও বেশি আকড়ে ধরতে চায় তাই ভালোবাসাটা হয়ত আরও অনেকটা নিরপেক্ষ হয়ে উঠার সুযোগ পায়। 

অন্য মানুষের দেশ কতটা ক্ষত তৈরি করে, কতখানি একা করে তোলে সে গল্প আরও স্পষ্ট হয়েছে কানাডা থেকে আসা গল্পপাঠ ওয়েবজিনের অন্যতম সম্পাদক মৌসুমী কাদেরের ‘বাদামী জুতোর গল্প’ পাঠে। আবার দীর্ঘ প্রবাস জীবনে থেকেও নিজের দেশকে কতটা বহন করা যায় সে গল্প নিয়ে এসেছিলেন গল্পপাঠের প্রধান কুলদা রায়। কুলদা’র গল্প থেকে উঠে আসছিল বরিশাল- গোপালগঞ্জের মাটির ঘ্রাণ। আয়োজনের একজন আয়োজক হয়েও তিনি সব সময় আড়ালে থাকতে চান। কুলদাকে দিয়ে গল্প পড়ানো হয়েছিল রীতিমত টেনে এনে। এমনকি গদ্য নিয়ে আলোচনার সময়ও তিনি প্রায় নীরব। অথচ গল্পপাঠের ছয় বছর পূর্তি হলো এর বড় কৃতিত্বটা তাঁর প্রাপ্য। এসব পাঠ ও আলোচনার ভেতর একটা গুরুত্বপূর্ণ পর্ব সফলভাবে শেষ করেছেন ভারত থেকে আমন্ত্রিত কবি, সাহিত্যিক যশোধরা রায় চৌধুরী। শঙ্খ ঘোষের ছন্দের বারান্দা বইটা ছন্দ বুঝতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। যশোধরা ঘণ্টা দুই সময় নিয়ে কবিতাকে টুকরো টুকরো করে হাতে কলমে বোঝালেন পয়ার, মুক্ত, মাত্রাবৃত্ত ও অক্ষরবৃত্ত ছন্দের ব্যবহার। তবে কবিতা বা গল্প সত্যি কি শুধু মঞ্চে আলোচনার আর শ্রোতার আসনে বসে শুনবার বিষয়? সাহিত্য সৃষ্টির কাজটা নিয়ম করে টেবিল চেয়ারে বসে করতে হলেও এর ঝড়টা আড্ডাতেই সাবলীল। সেখানে আমার ব্যাগের ভেতর থাকা তারাপদ রায়ের কবিতার বইটা বাইবেলের কাজ করলো। নাস্তার লুচি, সব্জি ডালের প্লেট রইলো সামনে অবহেলায়। অনুপ্রিয়া, বিষ্ণু প্রিয়ার হাত ঘুরে শ্রাবণীর হাতে যেতেই তারাপদ সত্যি সত্যি যেন উপস্থিত সেখানে। সকলের কণ্ঠে বেদনার রেশ। তারাপদর মতো অমন ছবি আঁকা গল্প কে এনেছেন কবিতায়! ‘জবানবন্দী’ শেষে শ্রাবণী শুরু করেছে ‘ঘর সাজানোর আগে’। ওদিকে একটা পর্ব শুরু হয়ে গেছে অডিটোরিয়ামে। আমাদের তাড়া দিতেই নিচতলায় এসেছিলেন আনন্দ সেন।

তারাপদ নাম দেখে বকবেন না পড়বেন দ্বিধাগ্রস্থ হয়েই হাতে নিলেন। শুরু হলো ‘ভারতবর্ষের মানচিত্র’ পাঠ এরপর সেই বিখ্যাত কবিতা মাথার কাছে জানালা খোলা...পরমহংস। তারাপদ কোন দেশের কবি ছিলেন? বাংলাদেশে জন্মেছিলেন আর থেকেছিলেন ভারতে। তারাপদ সকলের।এই যে আমরা ভালোবেসে তাকে পড়ি তখন কে ভারতের কে বাংলাদেশের সে বিভেদটা আর রাখা যায় না। সাহিত্যের সফলতা এখানেই। দুই বাংলা মিলে ভালোবাসলাম তারাপদ রায়ের মতো নিভৃত কবিকে। 

রম্য রচনার জন্য পরিচিত তারাপদ কী কোনদিন জানতেন ভাগ হয়ে নয় বরং ভালোবাসা পেয়ে তিনি দ্বিগুন হয়ে উঠবেন ? মৃত্যুরও এক দশক বাদে মিশিগানে কয়েকটা দিন মিলেমিশে থাকা ভারত-বাংলাদেশের পাঠকের কাছে তারাপদ কোন দেশের নাগরিক নয়, শুধু বাংলা ভাষার কবি। আমাদের তারাপদ প্রীতিতে রীতিমত বিস্ময় উপহার দিলেন নিউইয়র্ক থেকে আসা সাংবাদিক, সাহিত্যিক, সিনেমার কারিগর আনোয়ার শাহাদাত। তারাপদ রায় বেঁচে থাকতে বেশ কয়েকবার নিউইয়র্ক শহরে আনোয়ার শাহাদাতের সাথে দেখা হয়েছে। তারাপদ রায়কে তিনি রান্না করে খাইয়েছেন মাছের ঝোল। আমরা কেমন হিংসে নিয়ে তাকিয়ে রইলাম আনোয়ার ভাইয়ের দিকে। সে আসলে হিংসে করার মতোই কাজকর্ম করেন। অত দূরে বসেও বাংলাদেশ নিয়ে ‘কারিগর’ ছবি বানিয়েছেন। কারিগর দেখানো হয়েছিল আয়োজনের শেষদিনের শেষবেলায়। কারিগরের কারিগরী দিকটি নিয়ে কথা বলার মতো অতটা দক্ষ আমি নই তবে বিষয়বস্তু মুক্তিযুদ্ধের সময়কার স্থানীয় রাজনীতি।

এই সিনেমার মতো একটা সত্যি গল্প বলতে সুইডেন থেকে উড়ে এসেছিলেন শেখ তাসলীমা মুন। তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়ে খাবারের টেবিলে মুক্তিযুদ্ধকাল, নিজের ভাই ও বাবাকে হারানোর অভিজ্ঞতা জানাতে একই রকম স্তব্ধ হয়ে উঠেছিলেন বীরাঙ্গনা কহের শ্রোতারা। টরেন্টো থেকে উপস্থিত হওয়া উম্মে হাবিবা সুমি একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ নিয়ে এলেন। শওকত আলী ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গদ্যরীতি কেন গুরুত্বপূর্ণ এখকার লেখকদের জন্য, পাঠকের কাছে কেন সব সময় থাকবে সেসব লেখার আবেদন। বাংলা সাহিত্য সম্মেলন মাইলিটস এবারই প্রথম এই আয়োজন করেছে। নিশ্চয়ই বাংলাদেশের প্রবাসী  আরও উল্লেখযোগ্য লেখকদের উপস্থিতি থাকবে আগামিতে। 

প্রবাস জীবনের বিচ্ছিন্নতা কতটা অসহায় করে তোলে তা তাদের লেখায় উঠে আসে। কথামালার অন্যতম প্রধান বিশ্বদীপ চক্রবর্তীর একটা গল্প পেলাম স্যুভেনিরে, ‘শিকড় আর ডানার আখ্যান’। দেবাশীষ ব্যানার্জির ‘আজ সারাদিন নির্জলা’ কবিতা। এ দুটো লেখাই তাদের ভেতরের যন্ত্রণাকে পাঠকের কাছে তুলে ধরে। সেই সাথে টের পেলাম, পকেটের পয়সা খরচ করে কেন এত বড় আয়োজনের উদ্যোগ নেবার সাহসটা তাঁরা করেন। অডিটোরিয়ামের ভেতর সবচেয়ে কম সময় উপস্থিত থাকা বিশ্বদীপ চক্রবর্তীকে রাত নয়টায় দেখলাম হলঘরের সামনেটা ভ্যাকুয়াম করছেন নিজ হাতে। তখন দেবাশীষ ব্যানার্জী যে সবার যাওয়া আসার টিকিটের ব্যবস্থাপনায় ছিলেন সে লিস্ট করছে কাকে কোন হোটেলে পৌঁছে দিতে হবে। নাট্যকার মালা চক্রবর্তী গুছিয়ে নিচ্ছেন সকলের ভুলে যাওয়া বই কাগজ ব্যাগ। আনন্দ সেন তখনও আনন্দমুখে শেষবেলার হিসেব করছেন জয়ন্ত হাজরার পাশে দাঁড়িয়ে। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেছিলেন শ্রদ্ধেয় জয়ন্ত হাজরা। সদা হাস্যমুখের এই প্রবীণ মানুষটিকেও আমরা আলোচনার ভেতর বিশেষ আনতে পারিনি। ব্যস্ত ছিলেন আয়োজনের তৎপরতায়। নিজেদের উপস্থিতিকে আড়াল করে এত মানুষকে এক মঞ্চে উপস্থিত করার যজ্ঞটা তাদেরই সাজে যারা বহুদূরে থেকেও ভালোবাসতে জানে বাংলাকে।

সে অনুভব সেদিনই হয়েছিল বুকুদি’র বাড়ি ভোরে। আমার থাকার ব্যবস্থা ছিল হুইসপারিং উডস নামে একটা ছোট্ট শহরে প্রাসাদের মতো বাড়িতে। যে বাড়ির জানালার কাছে হরিণ এসে উঁকি দিয়ে যায় আর মাঝরাতে চাঁদটা ঝুলতে থাকে জানালার এক হাত দূরে। এ বাড়ির পেছন দিয়ে বয়ে গেছে হিউরন নদী। সে বাড়ির দোতলায় বিশাল ঝাড় নিয়ে বেড়ে উঠছে একটা জবা গাছ। মাঝরাতে কলি এলো, ভোর রাতে দেখি ফুল ফুটেছে। একটু পরই সে ফুল নেই। বাড়িতে আমি, বুকুদি আর অভিজিৎদা ছাড়া কেও নেই। বুকুদি চুলে ফুল দেন বলে মনে হয় না। চার দশক ধরে আমেরিকায় থাকা নারী যে কিনা নিজের ছেলেদেরও গাড়ি চালাতে শেখান তাঁর ফুল চুলে দেবার শখটা হারিয়ে যেতে পারে ভেবেছিলাম। তবুও আমার মাথার ভেতর ওই একটা লাল জবা ঘুরছে। কয়েক মিনিটের ব্যাবধানে কোথায় যাবে ফুলটা? অভিজিৎ দা আমাকে রাত একটায় ডেট্রয়েট এয়ারপোর্টে নিতে এসেছিলেন। কখনো দ্যাখেননি এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও অপরিচিত। সেল ফোনের স্ক্রিনে ছবি দেখে যাত্রীদের মুখে তাকাচ্ছিলেন একদিন আগেও। ভোরের আলো তখন গাঢ়ো হয়ে রোদ উঠেছে। বুকুদি বেরিয়ে গেছেন আগেই। আমি আর অভিজিৎদা রোদে বসে চা খাচ্ছি। একটু দ্বিধা ছিল তবু জিজ্ঞেস করেই বসলাম একটা ফুল দেখেছিলাম, কোথায় গেল? বললেন, ও জবাটা? তোমার দিদি পুজো করতে তুলে নিয়েছেন। চার দশক ধরে অমন যান্ত্রিক জীবন যাপন করেও যাদের প্রতিদিন ভোরে প্রার্থণার বিশ্বাস থাকে তারা মানুষ ভালোবাসার চেতনা বহন করে। সে বোধের কাছে শব্দ দিয়ে আর কতটা পৌঁছানো সম্ভব? মানুষের চেয়ে বড় সাহিত্য কিছুত নয়। অনেক কিছুর অনুপস্থিতি বা সীমাবদ্ধতা হয়ত ছিল এ আয়োজনে। প্রথমবার বলে অনেক গুণীজনকে তাঁরা হয়ত সংযুক্তও করে উঠতে পারেননি কিন্তু যতটা পারলেন সে অমূল্য। এই চেতনাটুকু বহন করলেই অনেকটা পথ এগিয়ে যাওয়া যায়। কথামালার সাথে এ আয়োজনে সংযুক্ত ছিল গল্পপাঠ, ইন্ডিক হাউজ, বাতায়ন ও গুরুচন্ডালী। আরও অনেককে সাথে নিয়ে সফল হোক এ আয়োজন। চেতনাই তাদের সংযুক্ত করে রাখুক বাংলাভাষার ভালোবাসার সাথে।


লেখক পরিচিতি
সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম
গল্পকার। প্রবন্ধকার। সাংবাদিক।


৩টি মন্তব্য:

  1. খুব ভালো লাগলো। গল্পপাঠের জন্য অনন্ত শুভকামনা। আর সাদিয়া আপার জন্য ভালোবাসা।

    উত্তর দিনমুছুন
  2. মানুষের চেয়ে বড় সাহিত্য কিছুত নয়-এটাই চরম সত্য কথা। অসাধারণ হয়েছে। অনেক অনেক শুভকামনা।

    উত্তর দিনমুছুন
  3. মানুষের চেয়ে বড় সাহিত্য কিছুত নয়-এটাই চরম সত্য কথা। অসাধারণ হয়েছে। অনেক অনেক শুভকামনা।

    উত্তর দিনমুছুন