বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

হুয়ান সোতোর একটি গল্প নিয়ে আলোচনাঃ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

ছোটগল্পের জগৎটাই আলাদা – সেখানে উপন্যাসের বিস্তৃতি নেই, সময়ের প্রবাহটা উপন্যাসের ভাদ্রের নদীর মতো নয়, চরিত্ররাও ভিড় করে থাকে না এর ভুবন। ছোটগল্পে কেমন একধরনের তাড়া থাকে; শুরু করেই শেষ করে ফেলতে হবে এরকম একটা জরুরি ভাব থাকে।
মিনিয়েচার চিত্রের মতো বিন্দুতে সিন্ধু দেখাবার প্রবণতা থাকে। ছােটগল্প লেখা কঠিন বিষয়; শিল্পের দাবিতে, উপন্যাস থেকে এ মাধ্যমটি অনেক বেশি দুরূহ। একসময় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ লেখকরা ছোটগল্প লিখতেন - রবীন্দ্রনাথ, জেমস জয়েস, ডি. এইচ. লরেন্স, আন্তন চেখভ, মপাসা। এখন ছোট্টগল্প অবহেলিত। বাংলাদেশে ছোটগল্প মার খাচ্ছে উপন্যাসের কাছে। অথচ উপন্যাস আর ছোটগল্প দুটো আলাদা মাধ্যম – নিজ নিজ পরিমণ্ডলে বিচরণ করা উচিত ছিল তাদের। তবে মাধ্যমের কথাই যদি বলা হয়, তাহলে উপন্যাসও মার খাচ্ছে - সিনেমার কাছে, টিভি নাটকের কাছে। মানুষের শিল্প অথবা রসবোধের কোনো আগামাথা নেই।
বাংলা সাহিত্যে এখন ছোটগল্পকে টিকিয়ে রেখেছে লিটল ম্যাগাজিনগুলি, দু-একটা জার্নাল/ম্যাগাজিন এবং কিছু খ্যাপা প্রকাশক - বই বিক্রি হবে না জেনেও যারা ছোটগল্পের বই ছাপান। পশ্চিমবঙ্গে পূজার বাজারে কিছু ছোটগল্প বিকোয় । কিন্তু বাংলাদেশের বাইরেও যে এ অবস্থার তেমন হেরফের হয়, তা নয়, শুধু লাতিন আমেরিকা ছাড়া।

লাতিন আমেরিকাতে ছোটগল্পের ভালো একটা চাহিদা আছে, যাকে প্রকাশকের দৃষ্টিকোণ থেকে ভালো বাজার বলা যেতে পারে। সেখানে পাঠকরা ছোটগল্পের বই বেরোলে মোটামুটি কিনে ফেলে। কাজেই লেখকদের অবিক্রীত বই চৌকির নিচে স্থপ করে রেখে মনস্তাপে পুড়তে হয় না। কোনো কোনো লেখক তো ছোটগল্প লিখে বেশ অর্থবিত্তও করে নিয়েছেন - কার্লোস ফুয়েন্তেস বা ভার্গাস ইয়োসা যেমন।।

যাক সে কথা।

লাতিন আমেরিকার প্রধান ভাষাটি স্প্যানিশ। কিছুদিন এ ভাষাটি শেখার চেষ্টা করেছিলাম। তাতে এই ভাষায় কথা বলা শেখা যায়নি, তবে পড়ে বোঝার মতো জ্ঞানটা হয়েছে। স্প্যানিশ ভাষার একটা সহজিয়া ভাব আছে, আর উচ্চারণের বেলা এটি বক্তা-বান্ধব। বাংলার মতো হালকা 'ত' ইত্যাদি আছে। 'তুই' সম্বোধনটি আছে। আমার মনে হয়েছে স্প্যানিশ ভাষাটা ছোটগল্পের জন্য খুব মানানসই, কারণ এর নির্মাণগুলি জীবনের খণ্ড খণ্ড চিত্রের বর্ণনা দেওয়ার জন্য খুবই উপযোগী। অবশ্য আমার এ বক্তব্যটি অনেকে হয়তো ঘুরিয়ে অন্য কোনো ভাষার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারেন। স্প্যানিশ কোর্সের জন্য পাঠ্যবইয়ের বাইরে সহায়ক' বই কিনতে গিয়ে দেখতে পেলাম, হঠাৎ পেয়ে যাওয়া পুরনো দু-একটা ছাড়া আর প্রায় কোনো বই-ই ঢাকায় পাওয়া যায় না। এরকম একটি সহায়ক বইতে ছিল চারটি স্প্যানিশ গল্প এবং এগুলি নিয়ে প্রশ্নোত্তরে আলোচনা। এতে একটা গল্প ছিল পুয়ের্তো রিকোর ছোটগল্পকার পেদ্রো হুয়ান সোতোর (১৯২৮-২০০২), ‘ নিষ্পাপ মানুষ' নামে যার বাংলা করা যায়। পড়ে বুঝতে পারা গেল গল্পটা, মোটামুটি। কিন্তু একশ ভাগ তো পাঠোদ্ধার করতে পারিনি। ভেবেছিলাম, ভাষাটা আরেকটু রপ্ত হলে দেখা যাবে; কিন্তু এরই মধ্যে ওই গল্পের একটি ইংরেজি অনুবাদ হাতে এলো ভিক্টোরিয়া ওর্টিসের, এবার গল্পটা পুরো বুঝতে পারলাম, কিন্তু মূলের স্বাদটি পেলাম না। কেন জানি, আমার এরকম মনে হলো, হুয়ান সোতোর স্প্যানিশ ভাষায় মা আর তার দুর্ঘটনায় বুদ্ধি লোপ পাওয়া ছেলেটির ভেতর যে হৃদয়। মোচড়ানো একটা অকথিত সম্পর্ক ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন, তার সবটা ইংরেজি অনুবাদে পাওয়া যায় না। ওটিসের ইংরেজিটাও অনেক বেশি মার্কিনি, কারণ হয়তো এই যে, গল্পটির প্রেক্ষাপট নিউইয়র্ক। মূল গল্পে শুধু স্থানটাই নিউইয়র্ক, ঘরের ভেতরটা - অন্তত মা ও ছেলের জন্য কোনোক্রমেই মার্কিনি নয় ।

আমার এরকমও মনে হলো আসলে অনুবাদকর্মটিই এধরনের বিপদ মাথায় নিয়ে এগোয়। আমার নিতান্ত অকিঞ্চিৎকর (স্প্যানিশ) ভাষাজ্ঞানে যদি ওই দূরত্বটি ধরা পড়ে মূল আর অনুবাদের মধ্যে, তাহলে দুটি ভাষায় যারা পণ্ডিত, তাদের চোখে না জানি আরাে কত ত্রুটি ধরা পড়ে।

হুয়ান সোতোর কুলীন এবং কুশলী স্প্যানিশের সঙ্গে আরেকবার যুদ্ধ করতে হলো। তাতে নেহাত পণ্ডশ্রম হলো না এই কারণে যে, মার চরিত্রটাকে, বিশেষ করে পুত্রের স্যানাটোরিয়ামে চলে যাওয়ার পর কান্নার আক্রমণে বিপর্যস্ত অবস্থায়, আমার কাছে একেবারে অসাধারণ মনে হলো। বাঙালিরা মাতৃভক্ত জাতি, বাঙালির কাছে মা চরিত্ররা সহজেই আবেদন রাখে। কিন্তু হুয়ান সোতোর মা একেবারে গভীরে ঢুকে পড়েন। বহু বোদ্ধা মানুষকে বলতে শুনেছি, সবচেয়ে ভালো ছোটগল্প সেটি, যেটি সহজ অথচ গভীর, ভাবায় এবং তাড়িয়ে বেড়ায় অথচ এক কাপ চা খেতে খেতে পড়ে ফেলা যায়। এবং একবার পড়লে অসংখ্যবার পড়তে হয়। হুয়ান সোতোর ছোটগল্পটি দুবার পড়ার অভিজ্ঞতাটা এক হয় না। অসংখ্যবারেও এক হয় না। যেমন রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প পড়ার অভিজ্ঞতা।

নিষ্পপজনেরা' সহজ একটি গল্প । পুয়ের্তো রিকো থেকে নিউইয়র্কে জীবিকার সন্ধানে এসেছে একটি পরিবার - তিনজন মাত্র মানুষ সে-পরিবারে : মা, একটি মেয়ে এবং একটি ছেলে। মা বৃদ্ধা হয়েছেন, মেয়েটি জীবনের সংগ্রামে বিপর্যস্ত, বিয়ে করার অবসর হয়নি। ছেলেটি দশ বছর বয়সে ঘােড়া থেকে পড়ে আঘাত পেয়েছিল। সেই আঘাতে মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছে, অর্থাৎ মানসিক প্রতিবন্ধকতা। তার বয়স এখন ত্রিশ। বৃদ্ধা মা দেখাশােনা করেন ছেলের। কিন্তু তার স্বাস্থ্য তেমন ভালো না। আর ছেলেটির বোন ওর্তেনসিয়া নিজেই জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভাইকে একটা স্যানাটোরিয়ামে ভর্তি করে দেবে। মা অবশ্যই মেনে নিতে পারছেন না এই সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, তাঁর ছেলের সেবাযত্ন হবে না। তাকে সেখানে পাগল বলে মারধর করবে। তার কিছুতেই সায় নেই ছেলেকে চোখের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার। কিন্তু ওর্তেনসিয়া নিজ সিদ্ধান্তে অটল। ওর্তেনসিয়া যে নিষ্ঠুর একজন
মানুষ, ক্ষমাহীন অথবা অমনোযোগী ভাইটির প্রতি, তা নয়। তার ভয়, ভাইটি একদিন তাদেরকে মেরে ফেলতে পারে। একদিন মায়ের গলা চেপে ধরেছিল সে, আরেকদিন বোনকে আঘাত দিয়েছে। মানসিক প্রতিবন্ধী, ইচ্ছে করে এসব করে না, কিন্তু নিজের ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই আসলে। এই ভয়টিই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। ওর্তেনসিয়ার কাছে। ওকে সামাল দেওয়ার মতো কোনো পুরুষ মানুষ এ বাড়িতে নেই, মা' বলে ওর্তেনসিয়া। মা জানে যুক্তিটি অকাট্য, কিন্তু মায়ের মনে সন্তান নিয়ে যুক্তির পাল্লা কখনো ভারী হয় না। ভালোবাসাটাই পাল্লাটা মাটির দিকে টেনে রাখে ।

দিনটা শনিবার। জানালার বাইরে অলস ছুটির দিন। পুরুষেরা ডমিনো খেলে। মেয়েরা বাজারে যায় । যত ব্যস্ততা সব মেয়েদেরই, ছেলেটি, যার নাম পিপে, জানালার পাশে দাড়িয়ে থাকে। অর্থহীন অথচ একটি প্রতীকী স্তরে অত্যন্ত অর্থবহ কিছু কথা দিয়ে শুরু হয় গল্পটা, কবিতার কিছু পঙক্তি যেন, যার সঙ্গে মিলে যায় পিপের মানসিক অবস্থা। 'ওই সূর্যে ওই মেঘ বেয়ে উঠে যাও, ঘোড়া অথবা নারী ছাড়া পায়রাদের সঙ্গে' ইত্যাদি। উড়ে যাওয়ার গল্প, পেছনে সবকিছু ফেলে যাওয়ার গল্প । মা তাকে ডাকেন, 'খোকা' 'খোকা' বলে। ওই ডাকটিই ইংরেজিতে আসেনি। স্প্যানিশ নিনইইয়ো'কে ‘বেবি' বললে এর ব্যঞ্জনাটা পুরোটা ধরা যায় না। যাহোক, মার ডাক শুনে সে পায়রাদের মতো ডানা ঝাপটায় । মার হাত থেকে রুটি নিয়ে পায়রাদের খেতে দেয়। আমরা বুঝি, এই কাজটি আনন্দের সঙ্গে করে। সে এবং তার মনে হয়তো এরকম একটা বিচ্ছিন্ন চিন্তা আসে পায়রাদের নিয়ে যে, উড়ে যাবে ওদের সঙ্গে সে ওই সূর্যটার দিকে । যাতে মানুষ আমাকে নিয়ে আর হাসি-তামাশা না করতে পারে।' তাছাড়া সূর্যের ঘরে ‘দরোজা জানালা হা করে খোলা থাকে, যেন উড়ে যাওয়ার জন্য পাখা বিস্তার করেই রয়েছে।' | এ পর্যন্ত পড়ার পর আমরা অবশ্য জানি না যে, পিপে আজ দুপুরেই চলে যাচ্ছে, চিরদিনের মতো; কিন্তু এমন একটি ঘরে যেখানে দরোজা জানালা হা করে কেউ খোলা রাখবে না। বরং বন্ধ করে রাখবে তালা দিয়ে। পিপে অন্তরীণ হতে যাচ্ছে, সূর্যে আরোহণ করতে নয় । আর পায়রাদের সঙ্গে আজই তার শেষ সাক্ষাৎ।

তার মায়ের পায়রাটি, তার খোকাটিও, আজ উড়ে যাবে, কোন জটিল সূর্যের দিকে - মা হয়তো ধারণা করতে পারেন না।

আমরা আসন্ন বিচ্ছেদ বিষয়ে কিছু ভাবতে পারি না, কিন্তু টেবিলের নিচে দড়ি দিয়ে বাঁধা একটি সুটকেসের উল্লেখ আসে প্রথম কয়েক ছত্রের মধ্যে। ওই সুটকেসটি হয়ে দাঁড়ায় বিচ্ছেদের প্রতীক। তার দড়িটাই একমাত্র তালা। আমরা পরে বুঝতে পারি এরকম একটি তালা আবদ্ধ করে রাখবে পিপেকেও।

মায়ের আদেশে পিপে প্রার্থনা করে। তারপর হুয়ান সোতো আমাদের নিয়ে যান ওর্তেনসিয়ার ঘরে। সেখানে সে চুল বাঁধে। মা-মেয়ের কথা কাটাকাটি হয়। ওর্তেনসিয়া বলে, তুমি বুড়ো হয়েছ মা।' মা বলেন, কিন্তু মরে তো যাইনি, পিপের দেখাশোনা করার। মতো শক্তি এখনো আছে। এমন নিস্পাপ একটি ছেলে আমার, এইটুকুন মাত্র ছেলে।'

অথচ পিপের বয়স ত্রিশ।

যতবারই অকাট্য একটা যুক্তি তুলে ধরে ওর্তেনসিয়া, যেমন পিপের শারীরিক আক্রমণ সংক্রান্ত, মা বলেন 'ও একটা বাচ্চা মাত্র। আর কোনো যুক্তি নেই মার কাছে। আর যা আছে তা দিয়ে ওর্তেনসিয়া অথবা জীবন অথবা বাস্তবতাকে চুপ রাখা যায় না। | ওঠেনসিয়ার বক্তব্য : পিপের সঙ্গে কুড়িটা বছর প্রতিবন্ধীর মতাে, অচেতন একটা জীবন তারাও যাপন করে গেছে। এর কোনো অর্থ হয় না। আর তো পারা যায় ।

কাজেই যেতে হয়।

হুয়ান সোতো ঘরের জীবনের সঙ্গে বাইরের জীবনের একটা প্রতিতুলনা করেন মাঝে মাঝে। পিপে বাইরে তাকায়। ছেলেরা রাবারের বলের পেছনে দৌড়ায়। স্বেচ্ছাধীন জীবন, গতি, অথবা অলস পুরুষদের স্ব-আরোপিত আলস্য। পিপে কী দেখে সেই জানে : কিন্তু মা আবার তাকে ডাকেন, খোকাকে প্রার্থনা শেষ করতে বলেন। খােকা বলে, ‘আমেন।' এরপর মা তার হাতে হ্যাটটা তুলে দেন। ওর্তেনসিয়া আসে, এবার চল পিপে । মাকে একবার চুমু খেয়ে নে।' এবং এরপর হুয়ান সোতোর বর্ণনাটি কোনো অনুবাদেই দেওয়া সম্ভব। নয়। একটা বিবরণ হয়তো দেওয়া যায় এভাবে : পিপের গলা ধরে তার ওপর ঝাপিয়ে পড়লেন মা। সাঁড়াশির মতো শক্ত হাতে বেঁধে নিলেন খোকাকে – আর তার পোড়া বাদামি (হ্যাজেল বাদামের মতো) মুখে চুমু খেতে লাগলেন। তাঁর আঙুলগুলি দিয়ে আস্তে আস্তে খোকার গাল ঘষে দিতে থাকলেন : আজ সকালেই সে গালের খোচা খোচা দাড়ি তিনি কেটে দিয়েছিলেন। শেষ দৃশ্যটি কিছুটা পুনরাবৃত্তিমূলক । কিন্তু এই পুনরাবৃত্তি আসলে ভারসাম্যহীন ছেলেটির একই কাজ দুবার করা, অথবা মার একই প্রার্থনা দুবার করার মতো গল্পটারই একটা অপরিহার্য শর্ত হয়তো। পিপে যেতে থাকে। মা বলেন, 'হ্যাটটা হাতে নিয়ে নে।' অথবা ওর্তেনসিয়াকে বলেন, “খোকাকে বলিস, যেন শব্দ না করে, আর যা খেতে দেয় সব যেন খায়।' না হলে যে খোকাকে ওরা মারতে পারে!

পিপে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলে মা দাঁড়িয়ে থাকেন। দুটি হাত সামনে এনে শক্ত করে ধরে রাখেন, যেন নিজেকে স্থির করছেন। কিন্তু কাঁধ কাঁপতে থাকে, হাত কাঁপতে থাকে, মার কান্না শুরু হয়। খুব সূক্ষ্ম কিন্তু তীব্র সেই কান্না, ভেতর থেকে যা গুমরে ওঠে।

আর দরোজা বন্ধ করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমেই ওর্তেনসিয়া ‘জুনের মধ্যদিনের এক বিশাল স্বচ্ছতার মুখোমুখি দাঁড়াল আর এই স্বচ্ছতার সামনে দাঁড়িয়ে সে কামনা করতে থাকল তুফান এবং সূর্যগ্রহণ এবং তুষারপাতের।'

পাঠকরা অতঃপর ভাবতে থাকবেন ওর্তেনসিয়ার মনে কেন ওই তুফান আর তুষারপাতের চিন্তা আসে এবং নিদাঘের মধ্য দিনের স্বচ্ছতা বলতে হুয়ান সোতোই বা কী বলতে চান সে বিষয় নিয়ে। তবে বেগ পেতে হয় না ওর্তেনসিয়ার মনোভাবটা বুঝতে, তার কষ্ট, তার দ্বন্দ্বটা বুঝতে। একে তো সে হারিয়ে যেতে চায় তুষারপাতের আড়ালে, ভাইটার মতোই; তার ওপর তুফানের কামনা হয়তো এ-ও বোঝায়। পিপে যখন ঘরে ছিল, তখন যে তুফান ছিল, তাকেও সে আরেকবার ফিরে পেতে চায়। কিন্তু মধ্যদিনের স্বচ্ছতা তার যুক্তিরই প্রতিফলন। এর সামনে ওইসব কামনা মুহূর্তে উদয় হয়ে মিলিয়েও যাবে। আমরা জানি, নিউইয়র্ক কোনো পুয়ের্তো রিকো নয়। এখানে বাস্তবতা নিদাঘ দিনের মতো। আমরা ওর্তেনসিয়ার কষ্টটা বুঝি; তার মনের অবস্থাটা বুঝতে পারি। এজন্য তার সঙ্গে একটা সমবেদনার সম্পর্কও তৈরি হয় আমাদের। কিন্তু ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখলে ওর্তেনসিয়া দায়ী পিপের সঙ্গে মায়ের বিচ্ছেদের । যে বিচ্ছেদ ছেলের হাতে দম বন্ধ হয়ে মারা যাবার চাইতেও বেশি কষ্টকর। | ওর্তেনসিয়ার চরিত্রের মধ্য দিয়ে হুয়ান সোতো আমেরিকার, বিশেষ করে নিউইয়র্কের, বাস্তবতাকেই মূর্ত করেন। এ হচ্ছে মার্কিনি জীবনযাপন, ছেলেকে পাগলা গারদে পাঠিয়ে দেওয়া, কিছু হলেই; এবং গারদটাকে প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন কেন্দ্র' ধরনের স্বস্তিকর একটা নাম দিয়ে নিজের গ্লানি থেকে মুক্তি পাওয়া। অথচ এ না করে তো উপায় নেই নিউইয়র্কবাসীর। ওই দ্বন্দ্বেই ভেঙে পড়ে অনেক পরিবার, অথবা মানুষ।

কিন্তু মার চোখে দেখলে এক বিশাল ট্র্যাজেডি ছাড়া আর কী হতে পারে পুরো বিষয়টা। মা যেন বাঙালি কোনো মা, খোকা চলে যাবার পর অর্থহীন হয়ে পড়ে সবকিছু। শেষ কান্নাটি মা ছেলের জন্য কাঁদেন, কাঁদেন নিজের জন্যও।

পেদ্রো হুয়ান সোতোর জন্ম হয়েছিল ১৯২৮ সালে পুয়ের্তো রিকোতে। ১৮ বছর বয়সে চলে যান নিউইয়র্ক – নানা কাজকর্ম করে টিকে থাকেন। আর লিখতে থাকেন গল্প । তাঁর গল্পের প্রতিপাদ্য পরবাসে পুয়ের্তো রিকানদের জীবন, তার নানা জটিলতা আর অসংগতির চিত্র; পরবাসে খাপ না খাওয়াতে পারার কষ্ট আর নিঃসঙ্গতা। হুয়ান সোতোর আরেকটা বিষয় হচ্ছে মার্কিনিদের আগ্রাসন, আর নিউইয়র্কে মার্কিনিদের নিপীড়ন, পুয়ের্তো রিকোর অভিবাসীদের ওপর। এসবই সমালোচকরা জানান আমাদের এবং আরো জানান যে, এই দ্বৈত বিষয়ের ভেতরে অথবা বাইরে হুয়ান সোতোর জীবনের খণ্ড খণ্ড মুহূর্তকেই আসলে দেখেন, পূর্বাপর সম্পর্কিত কোনো ইতিহাসকে নয়। এ গল্পটি এরকম একটি অবলোকন ।

তবে একটি মাত্র গল্প পড়ে আর অধিক কোনো মন্তব্য করা সমীচীন নয়।





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন