বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

ফ্রানৎস কাফকার জন্মদিনে লুতফুন নাহার লতা'র লেখাঃ প্রাচীণা প্রাহা ও কাফকার দীঘল ছায়া

৩রা জুলাই। বিংশ শতাব্দির বিশ্বসাহিত্যে খ্যাতিমান লেখক ফ্রানৎস কাফকার জন্মদিন। ১৩৭ বছর আগে তিনি জন্মেছিলেন এই আজকের মত এক গ্রীষ্মের দিনে। খুব জানতে ইচ্ছে হয় কেমন ছিল কাফকার বোহেমিয়া আর বোহেমিয়ার রাজধানী প্রাগ! কেমন ছিলেন সেই প্রাগের এক অন্তর্মুখী লেখক,অনন্যসাধারন এক শিল্পী, যার কলমে এঁকেছিলেন মানুষের ভেতরকার স্বৈরাচারী, চাটুকার, ও অত্যাচারী মানসিকতা ও সুবিধাবাদী সমাজের গল্প।
পরাবাস্তব তুলির টানে, মানুষের দৃষ্টি অতীত যাদুর মত, তুলে এনেছিলেন তাঁর গল্পগুলো। সত্যমিথ্যার মাঝামাঝি জ্বলে থাকা জীবন ও জটিলতার এক অসামান্য সাহিত্যে।

২০১৭র গ্রীষ্মে একদিন প্রাচীণা প্রাহা আর আজকের প্রাগের ওল্ড টাউন স্কোয়ার থেকে কাছেই চার্লস ব্রীজের উপরে দাঁড়িয়ে রয়েছি। নতুন শহরের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে দেখছি এক অভিন্ন যৌবনা সুন্দরী ভলতাভা নদী যেন নৃত্তের দেবী টার্পসিকোরে'র Terpsichore মত সে তার জলরং নায়লনের ওড়না হাওয়ায় উড়িয়ে নেচে চলেছে।

মানুষের কত স্বপ্ন থাকে কিছু তার পুরন হয় কিছু হয় না। আমারো তেমনি এক জনমের স্বপ্ন ছিল যাব কাফকা'র দেশে। ছুঁয়ে দেখব কাফকার বাড়ি-ঘর, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীর অফিস। যাব কাফকা মিউজিয়ামে। হেঁটে বেড়াব প্রাচীনা প্রাহার চিকন লম্বা কালো পাথরের ইট বিছানো সেই সব দীর্ঘ রাস্তায় যেখানে একদিন কাফকার সেই বিখ্যাত হ্যাট আর কালো ওভারকোট পরা শরীরের দীঘল ছায়া পড়েছিল। সে ছায়াও কেমন যেন কাফকার গল্পের মত পরাবাস্তব বলেই মনে হয় ।

প্রাগে যাবার আরো একটি স্বপ্ন দেখিয়েছিল অনেক আগে একটি বই। আর সেই বইয়ের প্রধান চরিত্র চেকোস্লোভাকিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির সুদর্শন এক বিপ্লবী তরুন সাংবাদিক। তিনি জুলিয়াস ফুচিক। কোলকাতার কলেজ স্ট্রীটের ফুটপাত থেকে কেনা সেই বই আমার ছাত্র জীবনকে একটি বড় রকমের নাড়া দিয়েছিল। দেশকে ভালোবেসে যারা জীবন উৎসর্গ করতে পারে, ভেবেছিলাম আজীবন তাদের মত স্বদেশী আন্দোলন বুকে বয়ে বয়ে বড় হব। দেশের জন্যে প্রীতিলতার মত উৎসর্গ করব নিজেকে।

বড় হয়ে উঠতে উঠতে আমার ভেতর বাহির এতটাই আন্দোলিত করে তুলেছিল সেই বই। বইটি কার অনুবাদ আজ সেকথা মনে নেই। সেখানে পড়েছিলাম চেকোস্লোভাকিয়ারর স্বাধীনতার স্বপ্ন বুকে নিয়ে এক অসামান্য বিপ্লবী নেতা জুলিয়াস ফুচিক ও তাঁর স্ত্রী অগাস্তিনা ফুচিকোভা কেমন করে তিলে তিলে অত্যাচারিত হয়েছিলেন হিটলারের নাজি বাহিনীর হাতে। ১৯৪৩ এর সেপ্টেম্বর মাসে বার্লিনে তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে এক্সিকিউট করেছিল নাজি সরকার। অকালে প্রাণ দিয়েছিলেন এই অকুতোভয় স্বপ্নদ্রষ্টা বীর। আমার প্রাণে বেজেছিল জুলিয়াস ফুচিক। এক সুদর্শন সংগ্রামী তরুন।

কিন্তু তারো অনেক আগে এই দেশে জন্ম নিয়েছিলেন ধ্রুব তারার মত এক নীরব অথচ জ্বাজ্জল্যমান আলো। পৃথিবী তখন তাঁকে চিনতে পারেনি। তাঁর মৃত্যুর অনেক পরে যখন তাঁকে, তাঁর সৃষ্টিকে জানতে পেরেছে, মানুষের মনের মর্মমূলে তিনি ঝড় তুলে দিয়েছিলেন। ভাবনার সাগরে নাড়া দিয়ে সাড়া জাগিয়ে তুলেছেন । তিনি লেখক ফ্রানৎস কাফকা।

চার্লস ব্রীজের উপরে দাঁড়িয়ে মনে হল আমি যেন সেই ফিনিক্স পাখি উড়ে এসেছি সেই সেমিসল ডাইন্যাস্টি থেকে আজ এখানে। মুগ্ধ বিস্ময়ে তাই পিছনে ফিরে চাই।

এই সেই প্রাগ। সেই প্রাচীণা প্রাহা। চেক রিপাব্লিকের রাজধানী। পৃথিবী নামক প্লানেটের উপর এক অনিন্দ্য সুন্দরের প্রকাশ। শিল্প, সংস্কৃতি, সংগীত, চিত্রকলা, নাট্যকলা, স্থাপত্য কলা, প্রেম, যুদ্ধ আর বানিজ্যের এক অপূর্ব অবস্থান। প্রাচীন ভলতাভা নদীর তীরে গড়ে উঠেছে অভূতপূর্ব এক অপার সভ্যতা। কথিত আছে অস্টম শতকে সেমিসল ডাইন্যাস্টির প্রতিষ্ঠাতা ডিউক সেমিসল ও তার স্ত্রী লিবুশের স্বপ্ন ছিল এ শহরকে অনিন্দ্যসুন্দর করে গড়ে তোলার। ডাচেস লিবুশে ভলতাভা নদীর তীরে উচু পাথরের উপরে দাঁড়িয়ে যত দূর চোখ যায় চেয়ে বলেছিলেন, -'আমি দেখতে পাচ্ছি একটি অসামান্য শহর যার গৌরবময় ঔজ্জ্বল্য একদিন আকাশের সব তারা ছুঁয়ে যাবে।' " I see a great city whose glory will touch the stars" তিনি ভলতাভা নদি তীরে তাঁর শিল্পিত প্রাসাদ এবং সুন্দর একটি শহর নির্মানের জন্যে আদেশ দিয়েছিলেন।

মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায় এই অঞ্চলেও এসেছে নানা গোত্র, নানা আদিবাসী। তেমনি পঞ্চম, ষষ্ঠ শতকেও এসেছে কেল্টস, স্লাভিক ট্রাইবস, জার্মানিক ট্রাইবস, মার্কোমানি, কুয়াদি, লোম্বার্ডস, সুয়েবি গোত্রের মানুষ আর তাদের পায়ের তলায় এই জনপদ পেয়েছে নির্মানাকুল একটি আকৃতি। রোম যেমন একদিনে তৈরি হয়নি তেমনি চেক রিপাবলিককেও যেতে হয়েছে ভাঙন গড়নের দীর্ঘ প্রস্তর পথ পেরিয়ে। নবম শতক থেকে ক্রমাগতভাবে এ শহরের শ্রীবৃদ্ধি শুরু হয় এবং তা বহু শতক ধরেই চলতে থাকে এবং সেই সাথে রোমান এম্পায়ার ও তাঁদের রাষ্ট্রীয় প্রধান ব্যক্তিদেরও প্রিয় বাসস্থান হয়ে ওঠে বোহেমিয়ান কিংডমের রাজধানী প্রাহা।

সুন্দরী নারী যেমন লিও টলস্টয়ের আনাকারেনিনার মত অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যায়, তার প্রতি যেমন লোভী, কামুক, বিত্তশালী পুরুষের লোলুপ দৃষ্টি পড়ে থাকে, তেমনি তিলোত্তমা প্রাহা নিয়েও চলেছে রোমান, অষ্ট্রিয়ান, হাঙ্গেরীয়ান, জার্মান, রাশান লোলুপতা। তাই বরাবরই নানা যুদ্ধ বিগ্রহের নিগড়ে বাঁধা এই দেশ। বিশ শতকে এখানে নেমে আসে এক মহাভয়ংকর দু;সময়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অষ্ট্রো হাংগেরীয়ান এম্পায়ারের পরাজয়ের পর বোহেমিয়া বদলে চেকোস্লোভাকিয়া নামে শুরু হয় তার আর এক যাত্রা।

১৯৩৯ এর ১৫ই মার্চ মৃত্যুর কালো তরবারি হাতে আসে হিটলারের জার্মান নাৎসি বাহিনী। হত্যা করে অগনিত জুইশ ধর্মাবলম্বি সাধারণ মানুষ। সারা দেশে গড়ে তোলে কন্সেন্ট্রেশান ক্যাম্প। প্রাগের রাস্তার দু'ধারে যত ঘর আছে তার প্রতিটি ঘরে হানা দিয়ে গাড়ী ভরে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় মানুষ। তাদেরকে পাঠানো হয় ডেথ ক্যাম্পে। এসময় পৃথিবী বিখ্যাত ঔপন্যাসিক কাফকার বোনদেরকেও ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়। মিলিটারী থেকে তাঁদের স্বামীরা ফিরে আসেননি আর কোনদিন। যদিও তার আরো আগেই দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগে ১৯২৪ সালে কাফকা মৃত্যুবরণ করেন। নাজি বিরোধি আন্দোলনের বিপ্লবী নেতা জার্নালিস্ট জুলিয়াস ফুচিক ধরা পড়েন গেষ্টাপো বাহিনীর হাতে। তাঁকে নির্মম অত্যাচারের পর ১৯৪৩ এ মাত্র ৪০ বছর বয়সে বার্লিনে এনে হত্যা করা হয়। শুধুমাত্র ধর্মের কারণে পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোথাও এত মানুষ হত্যা হয়েছে বলে জানা নেই। কেবল চেকস্লোভাকিয়া থেকেই কোয়ার্টার মিলিয়ন মানুষ হত্যা হয় হিটলারের নাজি বাহিনীর হাতে এসময়।

ঐ যে বলেছিলাম সুন্দরী আনাকারেনিনার কথা! যদিও এদেশকে শেষ সময়ে ট্রটস্কি প্রতিষ্ঠিত সোভিয়েত রেড আর্মি এসে রক্ষা করে জার্মানির হাত থেকে। উড়িয়ে দেয় বিজয় পতাকা। প্রাগ কিন্তু রেহাই পেলনা তবু! এবার এসেছে সোভিয়েত রাশিয়া। শুরু হল কমিউনিজমের নামে নিষ্পেষণ। সে ইতিহাসও কিছু কম মৃত্যু, কম রক্তপাতের নয়! এই যে ভয়াবহ রাজনৈতিক ঝঞ্ঝা, তা পার হয়ে ১৯৯৩'র জানুয়ারিতে চেক ও স্লোভাক দুটি আলাদা দেশ হিশেবে আত্মপ্রকাশ করে। একভাগ চেক রিপাবলিক, অন্যভাগ স্লোভাক রিপাবলিক।

ইষ্টার্ন ইউরোপের প্রাণ জুড়ানো এই শহরকে প্যারিসের সাথে তুলনা করে থাকেন কেউ কেউ। এখানে রয়েছে ওল্ড টাউন স্কোয়ার, নিউ টাউন স্কোয়ার, ঐতিহাসিক চার্লস ব্রিজ, যা পুরানো ও নতুন শহরকে যুক্ত করেছে ভালোবাসায়। দশটির মত মিউজিয়াম, থিয়েটার, চার্লস বিশ্ববিদ্যালয় যা কিনা ইষ্টার্ন ইউরোপের প্রথম বা দ্বিতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। রয়েছে অসাধারণ সব ক্যাথিড্রাল, মনুমেন্ট, জুইশ কোয়ার্টার, জুইশ সেমেটারি,ফ্রানৎস কাফকার মিউজিয়াম, আর কত শত রকমের দর্শনীয় শৈল্পিক কারুকাজ ভরা স্থাপনা।

শহর প্রতিরক্ষা ওয়ালের গায়ে কন্সন্ট্রেশান ক্যাম্প। একদিন যে প্রতিরক্ষা ওয়াল তৈরি হয়েছিল জার্মান আগ্রাসন রুখে দাঁড়াতে, সেই ওয়ালের গায়েই তৈরি হয়েছিল মৃত্যু ফাঁদ। মানুষের মৃত্যুর করুন বিউগল বাজানো স্মৃতিময় জুইশ মিউজিয়াম। স্থাপত্য কলার এক চুড়ান্ত নিদর্শন রাজার প্রাসাদ বা ক্যাসেল। বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গুলোও অনিন্দ্য সুন্দর। এশহর ছিল সারা ইষ্টার্ণ ইউরোপের ব্যাঙ্ক, বীমা, ও অর্থনৈতিক লেনদেনের শহর। বিখ্যাত বোহেমিয়ান ক্রিস্টাল আর নানা ধরনের রিয়েল স্টোন এখানে প্রশংসিত।

হাজার বছরেরও আগে মানুষ কত উন্নত চিন্তার অধিকারী ছিল তা বোঝা যায় এদের নগর পরিকল্পনায়। প্রতিটি একালায় একটি করে বড় খোলা চত্তর বা স্কোয়ার, যেখানে সুখে দুখে প্রয়োজনে মানুষ এক হতে পারে। বসবাসের বিল্ডিং নির্মানের আগেই তারা চলাচলের রাস্তা নির্মান করেছেন। শহরের পানি নিষ্কাসন ব্যবস্থা সহ জনগনের জন্যে পানীয় জলের সুব্যবস্থা। এখানে গরমে গরম, আর শীতে শীতল আবহাওয়া। রয়েছে দিক দিগন্ত জোড়া পাহাড়ের কোল বেয়ে আঙুরের খেত। এদেশের বিয়ার তো সারা ইউরোপের সেরা বিয়ার। রয়েছে দীর্ঘ গভীর ঘন সবুজ জংগল। আর মন মাতাল করা উদার আকাশ!

পৃথিবী বিখ্যাত সব শিল্পীর শহর প্রাগ। এখানে রয়েছে সাতটির মত ন্যাশনাল গ্যালারি। যাতে পৃথিবী সেরা শিল্পীদের শিল্পকর্ম রয়েছে। মাইকেলএঞ্জেলো, বাতিচেল্লি, পিকাসো, কুপকা, ক্লড মনে, রেনোয়া, আলফন্স মুকা, গুস্তাভ ক্লিমট, ভ্যান গহ ছাড়াও চেক শিল্পীদের নিজেস্ব পেইন্টিং ও ভাস্কর্য্য রয়েছে সেখানে। সংগীত এর জগতে উজ্জ্বল নাম মোৎসার্ট, বিটভেন, বিভাল্ডি এবং আরো আরো অসংখ্য শিল্পীর সুরের মূর্ছণায় সাজানো এই শহর। এদেশের আদি সঙ্গীতে রয়েছে দেশপ্রেমের এক করুন রস, নৃত্যে, গীতে সাজে সৌন্দর্য্যে রয়েছে হীরকের দ্যুতি। এমন মন মোহিনী এখানকার সন্ধ্যাগুলো! এমন মায়াভরা আকাশ আমি আর কোথাও দেখিনি।

আমাকে যে বিষয়টি সবচেয়ে মুগ্ধ করেছে তা এর প্রায় দুই হাজার বছরের সংরক্ষিত ঝঞ্ঝা সংকুল ইতিহাস! প্রাচীন রোমান চিকন লম্বা ইটের গাঁথুনি, আর কালো চৌকো পাথরের টুকরো বসানো পথ। এই পথই এখানে টেনে আনে সারা পৃথিবীর মানুষকে। আমার মত মন বোহেমিয়ান মানুষ তো বটেই। সারা বিশ্বের মানুষের এক অসামান্য আনন্দ কোলাহল। হাত ধরে ধরে হাটছে মানব মানবী। তাড়া নেই যেন কারো, হেলে-দুলে হাঁটছে আর মুখে আনন্দ বিস্ময় নিয়ে দেখছে চারিদিক। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে দেখছে যাদু, কিম্বা একটি লোহার দন্ড মাত্র ধরে শূন্যে উড্ডীয়মান বাজীকরের খেলা। স্থানীয় অভিনব সব খাবার খাচ্ছে মানুষ, আর তার দু'ধারে বাজছে নানা রকম বাদ্যযন্ত্র। মানুষ ইচ্ছে হলেই সেই সুরের সাথে জোড়ায় জোড়ায় নেচে চলেছে। এমন দেশ আমি আর দেখিনি কোথাও, এমন আনন্দধ্বনি আমি আর শুনিনি কোথাও, কেবল একবার! কেবল একটি মাত্র নির্ভেজাল আনন্দ বেদনার সময় ছিল আমাদেরও। যখন এক রক্ত ধোয়া পবিত্রতা নিয়ে স্বাধীন হয়েছিল আমার বাংলাদেশ!

এই মুগ্ধ শহরের যে প্রান্তে একদা ছিলেন কাফকা পরিবার সেই বিল্ডিং ও আশপাশ এলাকা জুড়েই এখন বিশাল ক্যাফে রেস্ট্যুরেন্ট। অনুমতি নিয়ে ভেতরের চত্তর দেখে আসা হল। দেখা হল সেই বারান্দা যেখানে খুব ছোটবেলায় মাঝরাতে ঘুম ভেঙে জল খেতে চেয়ে কাঁদলে তাঁর মেজাজী বাবা এই বারান্দায় তাঁকে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন বাকি রাত।

লেখক ফ্রানৎস কাফকা জন্মেছিলেন তৎকালীন অস্ট্রো হাঙ্গেরীয়ান রাজত্বের অংশ বোহেমিয়ার রাজধানী এই প্রাগে একটি উচ্চমধ্যবিত্ত জুইশ পরিবারে ১৮৮৩ সালের জুলাই মাসের ৩ তারিখে। ছয় ভাই বোনের ভেতরে ফ্রানয কাফকা ছিলেন তার বাবা মায়ের প্রথম সন্তান। তার বয়স যখন মাত্র ছয় তখন নিতান্ত শিশু অবস্থাতেই পরপর তাঁর দুটি ভাই, গেওর্গ ও হাইনরিখের মৃত্যু হলে পরিবারে তিনিই একমাত্র পূত্র হিসেবে বড় হন। কাফকার পরে তাঁর আরো তিনটি বোন ছিল। এলি, ভাল্লি, আর ওতলা। এদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট বোন ওতলার সাথে ছিল কাফকার চমৎকার বোঝাপড়া ও মমতার বন্ধন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ১৯১৪-১৯১৮র আগেই এলি ও ভাল্লির বিয়ে হয়ে যায়। তারা স্বামী সহ আলাদা বাসায় থাকতেন। যুদ্ধ শুরু হলে দুই বোনই বাবা-মায়ের বাসায় চলে আসেন কারন তাদের দুজনার স্বামীই প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যেতে বাধ্য হন। ফ্রানৎস কাফকা তখন বোনদের জন্যে জায়গা ছেড়ে দিয়ে ভাল্লির ছেড়ে আসা নীরব এপার্ট্মেন্টে গিয়ে ওঠেন। কাফকার এই বোনেরা তাঁর মৃত্যুর পরে ১৯৪৩ এর দিকে হিটলারের নাজী ক্যাম্পে অথবা পোলিশ গেটোদের হাতে মৃত্যু বরন করেন।

কাফকা খুবই ভাল ছাত্র ছিলেন এবং শিক্ষকদের স্নেহভাজন ছিলেন। হাইস্কুল শেষ করে তিনি ক্যামিষ্ট্রিতে পড়বেন বলে প্রাগের চার্লস ফার্দিনান্ড ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন কিন্তু মাত্র দুই সপ্তাহ পরেই তা তিনি চেঞ্জ করে বাবার পরামর্শে আইন বিভাগে ভর্তি হন।

এই পরিবর্তনের ফলে কাফকা যতটা খুশী ছিলেন তারো চেয়ে তার রাশভাবি বাবা বেশি খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু কাফকার হৃদয় পূর্ণ ছিল সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসায়। তিনি আইন বিভাগে অধ্যায়নের ফলে আর্ট ও লিটারেচারের উপরে কিছু ক্লাস করতে সক্ষম হন। তবে যে কারনেই হোক কাফকা ক্যামিস্ট্রি বা আইন না পড়ে সাহিত্য বিষয়ে পড়াশোনা করতে পারেননি।

১৯০৬ সালে তিনি প্রাগ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রী সহ সুনামের সাথে পড়াশোনা শেষ করলেন এবং একবছর একটি ল ফার্মে বিনা বেতনে কাজও করলেন।পরের বছর চাকুরী করতে শুরু করেন একটি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীতে। চাকুরীর পাশাপাশি লেখালিখির কাজও করতে থাকেন।

দূর্ভাগ্যজনক ভাবে বাবাব-মায়ের সাথে কাফকার কখনই ভাল সম্পর্ক তৈরি হয়নি। কাফকার পিতা হারমেন কাফকা ছিলেন পোষাক শিল্পের সফল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। প্রচন্ড অহংকারী ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির এক স্বৈরাচারী মানুষ। কাফকার শৈশব ছিল তার পিতার অমানবিক অত্যাচারে প্রকম্পিত। মমতাহীন, কঠিন কঠোর পিতা একদিন তার নিতান্ত শিশুকালে,মাঝরাতে জেগে উঠে জল খেতে চাওয়ায় শীতের সারা রাত তাকে বারান্দায় দাঁড় করিয়ে রাখেন। তার প্রতি পিতার প্রতিটি কথায় থাকত তাচ্ছিল্য, বিদ্রুপ, ঠাট্টা, এবং মন ভেঙে দেয়া অপমান। অল্প বয়সের সেই সব আতংকিত অভিজ্ঞতা কাফকাকে তৈরি করে ভিন্ন ভাবে। বাবার এই অনমনীয় নির্দয় আচরন শিশুকাল থেকেই কাফকাকে মানুষ হিসেবে দাঁড়াবার শক্তি দেয়নি। তিনি বেড়ে ওঠেন ভিতু, দূর্বল, সংকুচিত ও কনফিউজড একজন মানুষ হিসেবে। কাফকার সৃষ্টিশীল চিন্তা চেতনা তাঁর পিতাকে মোটেই আনন্দিত করেনি এবং ফ্রানৎস কাফকার ইচ্ছা ও স্বপ্ন এই দুইয়েরই কোন মূল্য তিনি দেন নাই।

কাফকার মা ইউলি বা জুলি লোউই ছিলেন কর্তৃত্বপরায়ন, বদ মেজাজী স্বামীর একান্ত বাধ্যগত স্ত্রী। স্বামীর অধিনস্ততাই ছিল তার জীবন। সন্তানের ভিতরে লুকিয়ে থাকা প্রস্ফুনোন্মুখ প্রতিভার আলো তিনি দেখতে অক্ষম ছিলেন। তিনি কখনোই সন্তানের বুকের গভীর ব্যথা আলাদা করে অনুভব করতে পারেননি ফলে স্বামীর মত তিনিও মনে করতেন আইন পাশ করা ছেলে প্রচুর অর্থ ইনকাম না করে অযথা সাহিত্যের পিছনে সময় নষ্ট করে তার ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে তুলছে।

কাফকার মাতৃকুলের আত্মীয় স্বজনেরা ছিলেন সাধু সন্ত টাইপের লোকজন। তারা ছিলেন বুদ্ধিমত্তায়, শিক্ষায়, সভ্যতায় এবং ধর্ম বিশ্বাসে শান্ত মহিমান্বিত, অবিচল। ধরে নেয়া হয় যে কাফকা নিজে যে সুগভীর চিন্তা ও চেতনার অধিকারী ছিলেন সেই সাথে নাজুক স্বাস্থ্যটিও ছিল ওনার মাতুল পরিবার থেকে পাওয়া।

কাফকার বাবার কর্তৃত্বপরায়ন, মেজাজের কাছে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেননি তিনি কোনদিনই। পিতার পূত্রের এই নিদারুন ভাঙা সম্পর্কের টানাপোড়ন তার ব্যক্তিগত জীবনে ও অন্যান্য সম্পর্ককেও প্রচন্ডভাবে প্রভাবিত করেছে। ব্যক্তিগত ভাবে যা কাফকাকে করে তুলেছে দ্বিধাগ্রস্ত ও অসুখী। তার একান্ত প্রেমের সম্পর্ক গুলিকেও করেছে ভঙ্গুর।

আবার কাফকার লেখাতেও সাংঘাতিক ভাবে এর ছায়াপাত দেখা যায়। তার সৃষ্ট চরিত্র গুলোতেও এক ধরনের নিষ্পেষণ থাকে। চরিত্রের ভেতরে আত্ম বিশ্বাস বিধ্বংসী মানসিক অস্থিরতা লক্ষ্য করা যায়। কাফকার গল্পগুলো সবই প্রায় প্রচন্ড মানসিক নিষ্পেষণের ভিতর দিয়ে যাওয়া দুঃস্বপ্নের মত মনে হয়।

এই বিষয়গুলোকে কাফকা গবেষক লেখক মাশরুর আরেফীনের লেখাতেও এইভাবে দেখতে পাই।

"খ্যাপাটে, যন্ত্রণাপীড়িত, আত্মবিশ্বাসহীন, নিজের প্রতি ঘৃণায় ভরা এক শিক্ষিত চেক যুবক, যার অদ্বিতীয় মেধার পূর্ণ স্বীকৃতি তাঁর নিজের সামান্য একচল্লিশ বছরের জীবদ্দশায় মেলেনি। ---- বিচিত্র, আপাত-অর্থহীন, মানসিক ও শারীরিক নৃশংসতার ঘটনা অবলীলায় ঘটে যেতে থাকে কাফকার গল্পের পরে গল্পে, ডায়েরির পাতায় পাতায়; বারবার মনে হয়, সবটা দুঃস্বপ্নে ঘটছে, সবটাতে গল্পের চরিত্রেরা যেন অন্ধকারের মধ্যে হাতড়ে বেড়াচ্ছে তাদের জীবনের মানে, কিংবা খুঁজে ফিরছে খোদার সাহায্যের হাত, মালিকের অনুগ্রহ বা শাসকের কৃপাদৃষ্টি। নাকি পুরোটাই ঠাট্টা, নাকি পুরোটাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে-পরের ইউরোপিয়ান অনিশ্চিতির এক গদ্যকবিতা, তখনকার সামাজিক-বাস্তবতার এক কমিক উপস্থাপন। --এক রহস্যময় প্রতিভা, নিঃসঙ্গ এক ইউরোপিয়ান নস্ত্রাদামুস্ (ভবিষ্যদ্বক্তা), যার সৃজনী-ক্ষমতাকে তাঁর সমকালীন লেখকেরা উপেক্ষা করেছিলেন আর যিনি ইহুদিদের প্রতি এক বৈরী পরিবেশে বাবার তাচ্ছিল্য ও অফিসের পীড়ন সয়ে নেমে গিয়েছিলেন তাঁর কুহকী সাধু-সন্তসুলভ চিন্তার গভীরতম প্রদেশে আর ওখান থেকেই দেখতে পেয়েছিলেন একদিন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবে, সোভিয়েত গুলাগ আসবে, আমলাতন্ত্র পৃথিবী জুড়ে আরো পোক্ত হবে এবং আধুনিক মানুষের জীবন জটিল থেকে আরো জটিলতর হয়ে উঠবে।"

নানারকম অপমানে, কষ্টে, প্রেমের অসফলতা, লেখালিখি নিয়ে অভিমান, প্রচারের সুবিধে না হওয়া, চাকুরি ও অন্যান্য হতাশার কারনে ১৯২৩ সালে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি লেখার বিষয়ে আরো গভীর মনোনিবেশের ও সম্ভাবনার কথা ভেবে প্রাগ থেকে চলে আসেন বার্লিনে। শিশুকাল থেকেই তৎকালীন এলিট সমাজে সভ্য জার্মান ভাষাকে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে ধরা হত। এবং বাড়িতে কাফকার প্রাথমিক ভাষার পাশাপাশি জার্মান ভাষা শেখেন, এ ভাষায় তিনি ছিলেন স্বাচ্ছন্দ। আসলে তিনি তাঁর জুইশ শেকড়ের অস্তিত্ব এবং চেক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে লালিত হলেও জার্মান ভাষা ও সংস্কৃতিকেই ভালোবেসে লালন করেছিলেন।

কাফকার জীবনে প্রেম এসেছে অনেকবার কিন্তু তিনি কখনোই

মন-স্থির করতে পারেননি তাদের কাউকে নিয়ে ঘর বেঁধে জীবন সাজাবার। জুইশ পরিবারে ছেলে কার সাথে প্রেম করবে বা বিয়ে করবে তার প্রতি কঠিন নিয়ম বেঁধে দেয়া থাকে। গুরুজনদের পছন্দ ও অনুমতি দরকার হয়। পারিবারিক উচ্চ মর্যাদা না থাকায় ইউলি ওরিৎসেক নামের এক মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব করায় কাফকার পিতা তাকে অমর্যাদাকর হীন উক্তি করেছিলেন- তিনি পূত্রকে এর চেয়ে নিষিদ্ধ পল্লীতে যাবারও বাজে ইঙ্গিত করেছিলেন।

বার্লিনের মেয়ে ফেলিস বাউয়ারের সাথে তার দু' দুবার বাগদান হবার পরেও সম্পর্কটি আর পরিনতির দিকে আগায়নি। বার্লিনের এক জুইশ পরিবারের মেয়ে গ্রেটে ব্লখের সাথেও তাঁর সম্পর্ক হয়। ১৯১৭র কাছাকাছি সময় থেকে কাফকার যক্ষা রোগ ধরা পড়ে এবং পরের বছর ১৯১৮তে স্প্যানিশ ফ্লুতে তিনি প্রায় মরতে বসেছিলেন। এরপরে তিনি অসুস্থ অবস্থাতেই প্রেমে পড়েন চেক লেখক ও সাংবাদিক মিলেনা এসেন্সকারের। ১৯২৩ এর দিকে মৃত্যুর মাত্র দশ মাস আগে কাফকার পরিচয় হয় তরুণী ডোরা ডিয়ামন্টের সাথে। তারা দু'জনে জীবনের আগামী দিনগুলো নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। আশা করেন সুস্থ হয়ে প্যালেস্টাইনে গিয়ে ঘর বেঁধে থিতু হবেন। কিন্তু কাফকার মৃত্যু সব স্বপ্নকে ভেঙে গুড়িয়ে দেয়। কাফকার জীবনের শেষ দিনগুলো কাটে ডোরার পরিচর্যায় ও ভালোবাসায়। ভিয়েনার কাছে, কিয়ের্লিং এর একটি স্বাস্থ্য নিবাসে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কাফকা। তাঁকে সমাধিস্থ করা হয় প্রাগের জুইস সেমেটারিতে।

জীবদ্দশায় তিনি তাঁর প্রাপ্য পরিচিতি ও সম্মান পাননি। লেখালিখির উপরে এক ধরনের অভিমানও ছিল। বন্ধু ম্যাক্স ব্রডকে তিনি বলে যান, মৃত্যুর পর তাঁর সকল পান্ঠুলিপি পুড়িয়ে ফেলতে। ম্যাক্স ব্রড সেটি করেননি।

প্রাগের ছোট ছোট চৌকো পাথরের রাস্তায় যখন কাফকা মিউজিয়াম ও চার্লস ব্রীজ দেখে হেঁটে হেঁটে ফিরছি। চারিদিক থেকে তখন সন্ধ্যা নেমেছে। ওলড টাউন স্কোয়ারের গায়ে তখনো ঝিলমিল করছে আলো। পথের উপরে নেচে চলেছে ট্যুরিস্ট ছেলেমেয়েরা। আনন্দ গলে গলে পড়ছে চাঁদ চুইয়ে পড়া জ্যোৎস্নার মত। হোটেলে ফিরে যেতে যেতে মনে হল এই শহরের এই কাফকায়েস্ক আলো আধারীর খেলায় দূরে নীরবে একজন দীর্ঘকায় মানুষ হেঁটে যাচ্ছে যার কোট প্যান্টের ভেতরে মানুষটা নেই।।

লেখক পরিচিতি
লুতফুন নাহার লতা
অভিনেত্রী। গল্পকার। কবি। প্রবন্ধকার

1 টি মন্তব্য:

  1. খুবই সুন্দর তথ্য সমৃদ্ধ লেখা। মনোযোগ দিয়ে পড়লাম, সময়টা ভালো কাটলো।

    উত্তর দিনমুছুন