বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে পাঠের অনুভূতি: মোহছেনা ঝর্ণা

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় এর "নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে" বইটার কথা এতবার শুনেছি যে পড়ার আগ থেকেই বইটার সাথে একধরনের হৃদ্যতা অনুভব করছিলাম। দেশভাগের বিষবৃক্ষ কিভাবে রোপিত হয়েছে এবং তার ফলশ্রুতিতে কিভাবে জীবন থেকে হারিয়ে গেছে জীবন, অবর্ণনীয় সেই ক্ষরণ এর বেশ কিছু চিত্র কিংবদন্তীর মতো নির্মিত হয়েছে এই বইতে। জীবনের নির্যাসমিশ্রিত ৩৯৮ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসের পাতায় পাতায় বর্ণিত আমাদের দেশের মাটির কথা, প্রকৃতির কথা, সাদা জ্যোৎস্না, অজস্র নক্ষত্র, কাশ ফুল, শিমুল ফুল, পলাশ ডাল, বিল, ঝিল, মাঠ- ঘাঠ, গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্তের বর্ণনা দেশটার প্রতি মায়াটা কী অদ্ভুতভাবে বাড়িয়ে দেয় কিংবদন্তীর গল্পের মতো।

বই পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল চরিত্রগুলোকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। তাদের সুখ-দুঃখের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছি। কখনো মণীন্দ্রনাথের দুঃখে দুঃখী হয়ে উঠেছি, কখনো সোনা, ফতিমাকে নতুন প্রাণের সঞ্জীবনী করে নিয়েছি। যদিও উপন্যাসের দ্বিতীয় খন্ডে এসে সোনার জন্য হাহাকার করে চলে আসা কান্নাকে জোর করে পাথর চাপা দেয়ার মতো দমিয়েছি। কখনো বড়বৌ'র জন্য মায়ার উদ্রেক হয়েছে, কখনো ঠাকুর বাড়ির বিশ্বস্তজন ঈশম শেখের বিশ্বস্ততায় মুগ্ধ হয়েছি, নরেন দাসের বোন মালতীর দুঃসহ জীবনের জন্য আবেদালির ছেলে জব্বরকে খুন করতে চেয়েছি। ফতিমার বা'জি সামুর প্রতিও খুব রাগ হয়েছে। গাছে গাছে ইস্তেহার ঝুলানো সামুর প্রতি মনের দুঃখে মালতীর মতো আমারও বলতে ইচ্ছে করছিল, "সামুরে, তুই দেশটার কপালে দুঃখ ডাইকা আনিস না।"

আবার কখনো মুশকিল আসানের লম্ফ নিয়ে আসা ফকির সাবের প্রতি জোটনের আকর্ষণে নড়েচড়ে বসেছি। জালালির মৃত্যুতে বিষণ্ণ হয়েছি।

ধনবৌ,সোনার অমলা পিসি, কমলা পিসি, পলটুর মামা রঞ্জিত, পলটু, লালটু, সোনার মাষ্টার মশাই শশীভূষণ এবং আঞ্জুর ভাই সফিকুর, যার প্রতি ফতিমা অনুরক্ত ছিল এই প্রতিটা চরিত্রই যেন স্বতন্ত্র অবস্থানে উজ্জ্বল।

ঠাকুর বাড়ির বড় ছেলে মণীন্দ্রনাথ। বড় কর্তা কিংবা পাগল ঠাকুর নামেই সবাই চেনে যাকে। যার জন্য তল্লাটের প্রতিটা মানুষের মনে কষ্ট, কথিত আছে তিনি দরগার পীরের মতো এক মহৎ পুরুষ। পলিন নামের এক নীল কন্ঠ পাখির খোঁজে পাগল হয়ে যাওয়া সেই বড় কর্তা শারীরিক ভাবে এই জগতসংসারে থাকলেও মানসিক ভাবে তিনি আদৌ এখানে থাকেন না। একা একা যেদিকে খুশি চলে যান। কখনো মুড়োপাড়ার হাতি নিয়ে চলে যায় দ্বিকবিদিক। কখনো কোষা নৌকা নিয়ে চলে যায় জলা-জঙ্গলের গভীরে। আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কীটসের কবিতা আওড়ায়। তার চোখের সামনে ভাসে পলিন নামের এক নীল কন্ঠ পাখি, ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ, দুর্গের পাশে মেমোরিয়াল হল, কার্জন পার্ক, সবুজ মাঠ, গম্বুজের মাথায় জালালি কবুতর, ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের র‍্যামপাট.....। নীল কন্ঠ পাখিকে খুঁজে না পেয়ে যেন অক্ষম ক্রোধে পাগল ঠাকুর কথায় কথায় বলে ওঠেন, "গ্যাৎচোরেৎশালা"। সাধু-সন্ত টাইপের মানুষটার জন্য গ্রামের সবাই শোক করে, কী মানুষ কী হয়ে গেলো!

পাগল ঠাকুরের স্ত্রী বড়বৌ দিনমান উদগ্রীব থাকেন। মানুষটা কোথাও গেলে, দুঃশ্চিন্তায় ডুবে থাকেন। নির্ঘুম রাত কাটায়, একা একা পুকুর ঘাটে বসে থাকে তার ফেরার অপেক্ষায়। লেখকের বর্ণনায়,"শুধু ঝোপ জঙ্গলে কিছু অপরিচিত পাখ-পাখালি, কীট-পতঙ্গ রাতের প্রহর ঘোষণায় মত্ত। আলকুশি লতার ঝোপে ঢুব-ঢুব আওয়াজ। গন্ধপাদাল ঝোপে ঝিঁঝিঁ-পোকা ডাকছে। রাত গভীর হলে নিশীথের প্রাণীরা কত হাজার হবে লক্ষ হবে এবং লক্ষ কোটি প্রাণের সাড়া এই ভুবনময়। গভীর রাতে জেগে থেকে টের পায় বড়বৌ, যেন মানুষটা এখন নিশীথের জীব হয়ে জলে-জঙ্গলে ঘোরাফেরা করছে।" পাগল মানুষটাকে ভালোবাসে বড়বৌ। বোঝে জীবন থেকে সোনার হরিণ হারিয়ে ফেলে মানুষটা আজ বড় অশান্ত। তাই তো নিজের গোপন ব্যথা আড়াল করে গ্রীক পুরাণের নায়কের মতো মনে হওয়া পাগল মানুষটাকে ধ্যান করেই কাটিয়ে দিচ্ছে জীবন। ধরে নিচ্ছে যেন, এটাই নিয়তি।

পাগল জ্যাঠামশাইয়ের বেশ অনুরাগী ভ্রাতৃষ্পুত্র সোনা। জ্যাঠামশাইকে তার বনবাসী রাজপুত্রের মতো মনে হয়। সোনাকে জ্যাঠামশাই বলেন,"নক্ষত্র দ্যাখো - ঘাস-ফড়িং- ফুল-পাখি দ্যাখো, জন্মভূমি দেখো।" জন্মভূমির গভীর মায়ার বীজ সোনার মধ্যে বপন করে দেয় তার পাগল জ্যাঠামশাই। গভীর চোখের দৃষ্টিতে পাগল মানুষটার কষ্ট যেন ঝরে ঝরে পড়ে।

হাসান দরগার হাসান পীর একদিন মণীন্দনাথকে বলেছিলেন, "তোর যা চক্ষু মণি, চক্ষুতে কয় তুই পাগল বইনা যাবি। .... পীর -পয়গম্বর হইতে হইলে তর মত চক্ষু লাগে, তর মত চক্ষু না থাকলে পাগল হওন যায় না, পাগল করন যায় না।"

ফোর্ট উইলিয়ামের র‍্যামপাটে বসে পলিনও বলতো, "তোমার চোখ বড় গভীর বিষণ্ণ মণি। ইওর আইজ আর গ্লুমি।"

পাগল মানুষটার সাথে পাঠক আমরাও খুঁজে বেড়াই নীল কন্ঠ পাখি। খুঁজে বেরাই তার প্রিয় হেমলক গাছ, যেই হেমলক গাছের নিচে তার সোনার হরিণটি বাঁধা আছে। আবার এও ভাবি, খুঁজলেই কি আর পাওয়া যায় সেই সোনার হরিণ!

সোনালী বালির চর, তরমুজ খেত, রাইনাদি, মুড়াপাড়া, নমশূদ্র পাড়া, বিশ্বাস পাড়া,ট্যাবার পুকুর, কবিরাজ বাড়ির পুকুর,অর্জুন গাছের তলায়, ফাওসার বিল, টোডরবাগ, হাসান পীরের দরগা... প্রতিটি নাম কি আশ্চর্য ক্ষমতায় পাঠকের বিচরণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

সুখে-দুঃখে হিন্দু-মুসলমানের একই সঙ্গে বসবাস হলেও জাতের উঁচু-নিচু মান রক্ষায় তাদের কারো প্রকাশ্যে কোনো উষ্মা ছিল না। যেমন ছোট্ট ফতিমাও জানতো সোনাবাবু তাকে ছূঁয়ে দিলে সোনাবাবুর জাত চলে যাবে। ফতিমার বা'জি সামুও মেয়েকে সতর্ক করে দেয়, "-যাও, কিন্তু বড় কর্তারে ছুঁইয়ো না। সোনা বাবুরে ছুঁইয়ো না।" আবার মালতীকে নিয়ে রঞ্জিত যখন পীরানী জোটনের কাছে গিয়ে উপস্থিত হয়েছে জোটন ওদের খাবার দাবারের সামগ্রী জুগিয়ে দিলেও রান্না করেনি, ওদের পরনের কাপড়ে হাত দেয়নি। কারণ জোটন জানে, "হিন্দুদের ধর্মাধর্ম এই। অন্য জাতি ছুঁলে জাত বাঁচে না।" আবার ঠাকুর বাড়ির প্রবীণ মানুষটি, মহেন্দ্রনাথ যখন ইহলোকের মায়া ত্যাগ করলেন তার দাহ কার্যের সময় বাড়ির সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষ ঈশম শেখ কাছে আসতে পারেনি ধর্মীয় বিধিনিষেধের কারণে।

কিন্তু ভেতরে ভেতরে সামুর মতো অনেকেই এই উঁচুনিচু ব্যবধানের জন্য ঠিকই ক্ষোভ লালন করতো মনের মধ্যে। যেমন সামু মালতীকে বলছিল, "একবার চোখ তুইল্যা দ্যাখ, চাকরি তগ, জমি তগ, জমিদারী তগ। শিক্ষা দীক্ষা সব হিন্দুদের।" লীগে নাম লেখানো আবেদালির ছেলে জব্বার তার বাপের মুখের উপর বলে, "হিন্দুরা আমাগ দ্যাখলে ছ্যাপ ফালায়,আমরা-অ ছ্যাপ ফালামু।"

এই ক্রোধ, এই ক্ষোভের আস্ফালন দেখে বুকটা ছ্যাৎ করে ওঠে। যেকোনো সময় ক্ষোভের বিস্ফোরণ হয়ে সবকিছু ভস্মীভূত হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিতটা অনেক আগে থেকেই টের পাওয়া যায়।

ঠাকুর বাড়ির প্রবীণ মানুষটির জন্যও মনটা কেমন যেন করে। তার একটি মিথ্যা তারে আলোক দ্যুতি ছড়ানো জ্ঞানী ছেলে পাগল হয়ে পথে পথে ঘোরে, একটি ভুল এত বেশি গভীর ক্ষত হয়ে চোখের সামনে হেঁটে বেড়ায় এই বেদনায় প্রতি মুহূর্তের দংশনের ক্ষরণ চিহ্নটুকুও প্রকাশ করতে পারেন না বৃদ্ধ মহেন্দ্রনাথ। তার মৃত্যুকালীন সময়টুকুতে মনে হচ্ছিল সমাপ্তি হতে যাচ্ছে আরব্য রজনীর মতো এক দীর্ঘ রজনী। তবে শেষকৃত্যের আয়োজনে বড় ছেলেকে দায়িত্বভার না দিয়ে মেজোছেলের কাছে সব দায়িত্ব অর্পণটুকুতে আরেকবার পাগল ঠাকুর মণীন্দ্রনাথের জন্য আর্দ্র হচ্ছিলাম। পাগল ঠাকুরের প্রতি এতটুকু নিষ্ঠুরতা না দেখালেও হয়তো পারতেন বৃদ্ধ বাবা।

হাজীসাবের ছোট ছেলে আকালুকে কিছু করতে পারে না ফেলু। আবার নিজের বউ আন্নুকেও বাগে রাখতে পারে না। হালার কাওয়া ফেলু নামের নচ্ছারটাও সামুর লীগের পান্ডা। পাগলা ঠাকুরের জীবননাশের জন্য ফেলুর প্রতি ক্রোধে অন্ধ হয়ে যাই। এত নির্মমতা দেখাতে পারে কেউ! তাই তো ষন্ড যখন ফেলুকে এফোঁড়ওফোঁড় করে দিল কেন জানি খুব বেশি মায়া কাজ করছিল না। মনে হচ্ছিল এটাই দুষ্ট প্রকৃতির ফেলুর প্রাপ্য ছিল।

উপন্যাসের উজ্জ্বল একটি চরিত্র ঠাকুর বাড়ির বাঁধা মানুষ ঈশম শেখ। এক সময় গয়না নৌকার মাঝি ছিল। পরে বয়স হয়ে যাওয়ায় মাঝির কাজ ছেড়ে ঠাকুর বাড়িতে কাজ নেয়। কলকাতা থেকে পাগল ঠাকুরের আনা এক তরমুজ লতা নিয়ে মানুষের মুখে ছাই দিয়ে সোনালি নদীর বালির চর (যা উড়াট জমি হিসেবে বিবেচিত ছিল) আবাদ করে তরমুজ খেত বানিয়ে ফেলে। তরমুজের ভেতরটা কী লাল! মিসরির শরবতের মতো মিষ্টি সে তরমুজ!

ঈশম শেখের সন্তান ছিল না। তরমুজ খেতের এই জমিটাই ছিল সন্তানতুল্য। মন প্রাণ উজাড় করা ঠাকুর বাড়ির সকল কাজের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বান্দা ঈশমও যেন নির্বাক হয়ে যায় ঠাকুরদের দেশান্তরি হওয়ার খবরে। এই ঈশমই ছুটে যেতো ঠাকুদের যে কোনো যে কোনো জায়গায় জল,জঙ্গল, খাল,বিল,মাঠ-ঘাট পেরিয়ে। কত বার যে পাগল ঠাকুরকে কত জায়গা থেকে খুঁজে এনেছে আবার উপন্যাসের শুরুতেই দেখতে পাই ধনকর্তার ছেলে হওয়ার খবর নিয়ে মুড়াপাড়ায় যাচ্ছে সে কী আয়োজন করা যাত্রা তার। পথে পথে ঈশমের সাথে অন্যদের সেই কথোপকথনের অংশটুকু খুব ভালো লাগে। মন থেকে আপন অনুভব করতে না পারলে কেউ এমন করে বলতে পারে না। ভাবতে পারে না।

"কে জাগে?

অন্ধকার থেকে জবাব এলো, তুমি ক্যাডা?

আমি ঈশম শেখ। সাকিম টোডারবাগ। ঈশম যেন বলতে চাইল, আমি গয়না নৌকার মাঝি ছিলাম। এখন ঠাকুরবাড়ির খেয়ে মানুষ। অন্ধকার মানি না। বাবু ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার বাস।"

এই উপন্যাসের আরেক উজ্জ্বল চরিত্র ফকির সাব। মুশকিল আসানের লম্ফ নিয়ে ঘোরা, শতচ্ছিন্ন জোব্বা গায়ে দেয়া, গলায় নানা রকমের তাবিজ-কবচের মালা পরে থাকা ফকির সাবের প্রতি জোটনের আকর্ষণ এবং খোদার মাশুল তুলতে চতুর্থ বারের মতো বিয়ে করে ফকির সাবের হাত ধরে নতুন যাত্রা সব ছাপিয়ে ফকির সাব উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন তার মুশকিল আসানের লম্ফ নিয়ে মালতীকে রাতের অন্ধকারে তার দাদা নরেন দাসের বাড়ি পৌঁছে দেয়ার ঘটনায়।

সোনা আর ফতিমার শৈশব পেরিয়ে কৈশোরের সময়টাতে তাদের মনোজগতের চিত্রগুলোও চোখ থেকে সরে না। লীগের নেতা ফতিমার বাপ তাদের ঢাকায় নিয়ে গেলেও ফতিমার মনটা থাকে এই সোনালি নদীর বালুর চরে, অর্জুন গাছের নিচে, সোনা বাবুর কাছে। তাই তো পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়ে বা'জির দেয়া পুরষ্কারস্বরূপ শাড়ি পায়। সেই শাড়ি পরে সোনা বাবুকে দেখাতে আসে। "যেন সে বাবুকে খুশি করার জন্য শাড়ি পরে এসেছে। খুশি করার জন্য ক্লাসে ফার্স্ট হয়েছে।"- এই দুটি বাক্যে আমি ফতিমাকে অনুভব করি। ফতিমার ভালোবাসাটুকু অনুভব করি।

ইতিহাসের ক্ষত- বিক্ষত, ধ্বংসযজ্ঞের যে বয়ান তা পড়ে ভাবি ভাগ্যিস এমন দুঃসহ দিন আমাদের প্রজন্মকে দেখতে হয়নি। হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা, বর্শা, গুলি, রক্তের স্রোত, লাশের মিছিল, অস্থির এক জনপদে তখন মানুষের বেঁচে থাকা দায়। মানুষের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে ধর্মীয় অনুভব। ক্ষণে ক্ষনে রক্তপাত,আগুনে ঝলসানো বাড়িঘর, মানুষের চিৎকার, আহাজারি, সবার মনেই একই কথা কী যে হয়ে গেলো দেশটার!

আর র‍্যাডক্লিফ লাইন দিয়ে একদিন সত্যি সত্যি যখন ধর্মের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেলো এবং সেই দ্বিখণ্ডিত জনভূমিতে বেড়ে ওঠা মানুষগুলো যখন মুহূর্তেই নিজ ভূমিতেই বহিরাগত হয়ে গেলো, শিকড় উপড়ানোর এই মর্মান্তিক শব্দ বুকের ভেতর অসহ্য অসহনীয় যন্ত্রণার সূচনা করে তা থেকে এই মানুষগুলোর মুক্তির শেষ অবলম্বনটুকুও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

একই শহরের এক এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় বাসা বদলের সময়ই কেমন বুকের ভেতরেটা গুমরে গুমরে কেঁদে ওঠে, আর সেখানে কি না জন্ম জন্মান্তরের মতো জন্মভিটা, পৈতৃক ভিটা, জন্মভূমির মায়া ছেড়ে চলে যেতে হবে! ভীনদেশটাকে নিজের দেশ বলতে হবে! এর চেয়ে নির্মমতা আর কি হতে পারে!

এই উপন্যাসের যে বাক্যটি দেশভাগের চূড়ান্ত নিষ্ঠুরতার প্রতীক হয়ে থাকে তা হলো, বাড়ির সামনের অর্জুন গাছের কান্ডে সোনার সেই কথাটি "জ্যাঠামশাই, আমরা হিন্দুস্থানে চলিয়া গিয়াছি, ইতি সোনা। নিরুদ্দিষ্ট জ্যাঠামশাইর জন্য সে অর্জুন গাছের কান্ডে তাদের ঠিকানা রেখে গেলো।" এই বাক্যটাতে এসে নিজেকে ধরে রাখতে ব্যর্থ হই আমি। সোনার লিখে রাখা কথাগুলো যেন প্রতিধ্বনি হয়ে কানে বাজতে থাকে বারবার। পানির দরে ভিটেমাটি সহায় সম্পত্তি বিক্রি করে যখন সোনারা হিন্দুস্থান চলে যাচ্ছে, নিরুদ্দেশ পাগল জ্যাঠামশাই এর উদ্দেশ্য তাদের বর্তমান ঠিকানা রেখে যাওয়ার এই প্রয়াস কেমন অসহায় করে তোলে পাঠককে।

দেশ ছেড়ে সোনাবাবুরা যখন হিন্দুস্থানে চলে যায় এবং কয়েক বছর পরে তাদের চরম আর্থিক কষ্ট, দুর্বিষহ জীবন, ভয়ংকর বাস্তবতা কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না। কী দরকার ছিল দেশভাগের! কী দরকার ছিল এমন বিপর্যয়ের! জীবন বিপন্ন হয়ে যায় যে বিভাজন রেখায়, কী দরকার ছিল সে বিভাজন রেখার! সোনা বাবুর জন্য কেন এত হাহাকার জাগছে মনে! আহ! নিজের দেশের মাটি ছেড়ে শিকড় ছেড়ে পরদেশকে নিজের করে নেয়াটা কী ভয়াবহ যাতনার তার চিত্র বইয়ের পাতায় পাতায় এমন নিরেট ভাবে উঠে এসেছে, তাতে গোপনে বুকের পাঁজর ভাঙার মর্মর ধ্বনি হয়।

র‍্যাডক্লিফ লাইনে বিভক্ত জনপদে আবার যখন ভাষার জন্য বাংলাদেশের মানুষের রক্ত ঝরাতে হয়, ১৪৪ ধারা অমান্য করে মায়ের ভাষা রক্ষা করার জন্য তাজা প্রাণ বিলিয়ে দিয়ে আসতে হয় তখনি একদিন দেশটা ভাগ করার জন্যই "নারায়ে তাকবির", "পাকিস্তান জিন্দাবাদ" লিখে গাছে গাছে ইস্তেহার ঝোলানো সামসুদ্দিনেরও উপলব্ধি হয়, "দেশভাগের পর পরই সে ভেবেছিল, তবে বুঝি এবারে সব মিলে গেল- কিন্তু হায়, যত দিন যায়- সে দেখতে পায় সংসারে সবাই পাখিটাকে ছেড়ে দিয়ে বসে থাকে- আবার খুঁজে বেড়ায়। পেলে মনে হয় পাখি মিলে গেছে, দুদিন যেতে না যেতেই মনে হয় পাখিটা আর নীল রঙের নয়, কেমন অন্য রঙ হয়ে গেছে।"

"নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে" নামের মতোই অদ্ভুত সুন্দর, মোহাচ্ছন্ন এক উপন্যাস। যে উপন্যাস পাঠে ইতিহাসের অনেক কঠিন বাস্তব দিক সচিত্র প্রতিবেদনের মতো চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়। সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকে বলেই এসব লেখা কালজয়ী হয়ে আমাদের মানসপটে আসন গেড়ে থাকে। এই উপন্যাস পাঠে বেশ সময়ের দরকার। ধীরে ধীরে সময়ের হাত ধরে সেই প্রাচীন সময়ের মুখোমুখি হওয়ার সময়টায় অন্য কিছু ভালো লাগে না, অন্য কোথাও মন বসে না, অন্য কোনো ভাবনায় আচ্ছন্ন হওয়া যায় না। এ উপন্যাস তেমনি এক ঘোরগ্রস্ত উপন্যাস। লেখক তার কলমের যাদুতে পাঠককে ধীরলয়ে নিয়ে যান সেই ঘোরগ্রস্ত জগতে। যেখান থেকে পাঠক চাইলেও সহজে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না নিজেকে।

দেশভাগ নিয়ে অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় এর চার পর্বের সিরিজের প্রথম পর্ব হলো দুই খন্ডের "নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে"। এর দ্বিতীয় পর্ব - মানুষের ঘরবাড়ি, তৃতীয় পর্ব - অলৌকিক জলযান এবং চতুর্থ পর্ব ঈশ্বরের বাগান।

পরিশেষে দুঃখ-বেদনার সহাবস্থান মাথায় রেখেও মাষ্টার মশাই শশীভূষণের মতো আমারও বলতে ইচ্ছে করে, "দেশ মানেই হচ্ছে দেশের মানুষ। তাদের প্রকাশই হচ্ছে দেশের প্রকাশ।"

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন