বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২০

রতন ভট্টাচার্যের গল্প : মহাভারত





তিনতলার ওপর এই ঘরখানা তিনজন বৃদ্ধার। তাঁদের নাম উষা, ডলি আর নিভা। উষা নামের বৃদ্ধাটির বয়েস চুয়াত্তর। নিভার হল আটষট্টি এবং ডলির সত্তর। ঘর বেশ বড়। যেদিকে দরজা তার উলটোদিকে প্রকাণ্ড দুটো জানলা। জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালে দেখা যাবে অন্ধকারে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। প্রায় চবিবশ ঘন্টা হল বৃষ্টি হচ্ছে। গতকাল সন্ধেবেলা শুরু হয়েছিল, আজ সন্ধে পার হয়ে গেছে। চব্বিশ ঘণ্টায় বৃষ্টির বেগ একরকম নেই। কখনও জোরে হচ্ছে, কখনও আস্তে কিন্তু থামছে না। এখন তো একেবারে মুষলধারে।

ক্রমাগত উঁচনিচু হয়ে ছড়িয়ে পড়া এই বাড়িটায় ঘর আছে আশিখানা। এটা একটা ওল্ড হোম। অর্থের বিনিময়ে স্বজনহীন বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা এখানে থাকতে পারে। এই মুহূর্তে এখানে একটাও সিট ফাঁকা নেই। সিট দুশো। একশোজন বৃদ্ধ এবং একশোজন বৃদ্ধা। সব ভর্তি।


বাড়িটার সামনের দিকে হাইরোড, পেছন দিকে খাল। হাইরোড বলতে সাধারণত আন্তঃরাজ্য রাস্তা বোঝায়। সে অর্থে এটা হাইরোড নয়। কিন্তু যুদ্ধের সময় মিলিটারির তৈরি বলে হাইরোডের মতই চওড়া। সেইরকম মসৃণ, ঝকঝকে। প্রায় বিঘে কুড়ি জমির ওপর বাড়ি। শুধু বাড়ি কেন, বাড়ি, বাগান, ঝিল, কী নেই? ঝিলের দিকে খানিকটা আবার জঙ্গলও আছে। অবশ্য বাড়ি থেকে বেশ দূরে। যেমন ঘাসবন। বাঘ ডুব দিয়ে থাকতে পারে এমন ঘাসবন আছে এখানে। যেদিকে ঝিল ঠিক তার উলটোদিকে। কিন্তু কাছাকাছি নয়। বাড়ি থেকে. অনেকখানি দূরে। বাড়ির কাছে সব কিছু একেবারে সাজানো। তকতকে। সারি দিয়ে বসানো ইউক্যালিপ্টাস গাছের মাঝখান দিয়ে রাস্তা। এসে থেমেছে গাড়ি বারান্দার নিচে। রাস্তা দুটো। একটা ঢোকার, একটা বেরোবার। কিংবা বলা যায় একটাই রাস্তা, ইংরেজি ইউ অক্ষরের মত একদিকে দিয়ে ঢুকে আর একদিক দিয়ে বেরিয়ে গেছে। এবং আগাগোড়া রাস্তাটা ইউক্যালিপ্টাসের সুগন্ধ ছায়ায় আবৃত। 

আজ রোববার। সাধারণত রোববারে বিকেলবেলা বাড়ির সামনেটা গাড়িতে গাড়িতে একেরারে ভর্তি হয়ে যায়। নানা রঙের প্রাইভেট আর ট্যাক্সি। কিন্তু আজ একখানা গাড়িও আসেনি। এই ওল্ড হোম একটা দ্বীপের মত। মূল ভূখণ্ড থেকে বেশ কিছু মাইল দূরে। রোববার রোববার মূল ভূখণ্ডের সজীব হাওয়া ও টাটকা খবর নিয়ে ছুটে আসে মানুষজন। যে বুকচাপা বিষণ্ণতা দ্বীপের স্থায়ীভাব, তাকে কয়েক ঘন্টার জন্যে কথায়-বার্তায়, হাসি, কোলাহলে উড়িয়ে নিয়ে চলে যায়। আজ তারা আসেনি। চব্বিশ ঘন্টার অবিরাম বৃষ্টি মূল ভূখণ্ড থেকে আজ নতুন করে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে এই দ্বীপকে।

আজ দ্বীপবাসীরাও তাদের ঘর থেকে বেরুতে পারেনি। প্রতিদিন বিকেলে তারা ঘর থেকে বেরিয়ে বাগানে, জঙ্গলে, ঘাসের বনে ঘুরে বেড়ায়। তাদের জন্যে ঝিলের ধারে অনেকগুলি বসবার জায়গা। বেড়িয়ে ক্লান্ত হলে তারা সেখানে বসে বিশ্রাম নেয়। কিন্তু আজ সেসব শূন্য পড়ে আছে। উঁচু উঁচু বাতিদানে মৃতের চোখের মত আলো। সেই চোখের কোল বেয়ে গড়িয়ে বৃষ্টির জল নামছে। 

চুয়াত্তর বছরের বৃদ্ধা উষা নিজের খাটটিতে বসে একটা ছেঁড়া সায়া সেলাই করছিলেন। চোখে সুরু ফ্রেমের গোল চশমা। তার চেহারাটি বেশ বড়সড়। মোটা হাড়। রং এখনও টকটকে ফর্সা। তিনজনের মধ্যে উনি সবচেয়ে লম্বা। যদিও গলার চামড়া ঝুলে পড়েছে, মাথার চুল পাকা, গোটা সাতেক দাঁত নেই, তা সত্ত্বেও হঠাৎ ঘরে ঢুকে তার দিকে তাকালে মনে হবে বুড়ো মানুষটি আমাদের চেনা জগতের কেউ না। মহাভারত থেকে উঠে এসেছেন। গান্ধারীকে আমরা কেউ দেখিনি। তবুও তাকে দেখলে সর্বপ্রথম গান্ধারীর কথাই মনে হবে। যেন গান্ধারী কোনও কাজ না পেয়ে হঠাৎ একটা সায়া সেলাই করতে বসে গেছেন। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। ঘরের মধ্যে টিউবলাইটের ঝকঝকে সাদা আলোয় রাজমহিষী গান্ধারী খাটের গায়ে হেলান দিয়ে বসে সায়া সেলাই করছেন।

নিজের বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে নিভা একটা উপন্যাস পড়ছেন। ঘরের তিন বাসিন্দার মধ্যে তিনি সবচেয়ে ছোট। আটষট্টি। নিভার রং ফর্সা নয়। কালো। কিন্তু চামড়া এই বয়সেও অসম্ভব মসৃণ। তাঁর দাঁত পড়েনি এবং একমাথা কোঁকড়ানো চুলের সবটাই কালো। এই আটষট্টি বছর বয়সেও তাঁর মুখ থেকে যৌবন যাই যাই করেও চলে যায়নি। তারও চোখে চশমা আছে। কিন্তু সে-চশমা শৌখিন এবং দামি। তাঁর গলার ভাঁজ সবসময় চোখে পড়ে না। হঠাৎ হঠাৎ দেখা যায়। তখন মুহূর্তের জন্যে তাঁকে বুড়ি মনে হয়। না হলে তিনি দ্রৌপদী। হোমের সকলেই তাকে দ্রৌপদী বলে চেনে। আড়ালে এই নামেই তাঁকে ডাকে। কেন যে তিনি সকলের কাছে দ্রৌপদী হয়ে গেলেন তা কিন্তু কেউ জানে না। হয়তো মহাভারতের দ্রোপদীর সঙ্গে তাঁর চেহারার কোনও সাদৃশ্য আছে। কিংবা উষা গান্ধারী হয়ে গেছেন বলেই একঘরের বাসিন্দা হিসেবে তাঁকেও দ্রৌপদী করে দিয়েছে।
 

বোধ হয় এই অনুমানই ঠিক। কেননা ঘরের তিন নম্বর মানুষটারও আছে একটা মহাভারতীয় নাম। সত্তর বছরর ডলিকে এ বাড়ির সবাই কুন্তী বলে জানে। পাণ্ডব- জননী কুন্তী। অথচ মজা এই, পাঁচ সন্তান দূরের কথা তাঁর মোটে একটা ছেলে । আর সেই ছেলেটি বোবা-কালা। কথা বলতে পারে না, শুনতেও পায় না কিছু। কোথায় মহাবীর পঞ্চপাণ্ডব আর কোথায় বোবা-কালা পঞ্চানন। ডলির সঙ্গে উষার চেহারার কিছু মিল আছে। ভুল হল। চেহারায় না। রঙে মিল আছে। তাঁরও রঙ ফর্সা। কিন্ত শরীর অনেক ছোটখাটো বলেই তাঁর গলায় সব সময় কতগুলো ফুলে ওঠা শিরা দেখা যায়। ঝুলে পড়বার মত তাঁর শরীরে কোনও অতিরিক্ত চামড়া নেই। মুখে, গলায়, শরীরে, কোথাও না। আপাদমস্তক পাকানো। শুকনো বাঁশের মত অনেকটা।


বাইরে মুলধারে বৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এ ঘরের জানলা দরজা হাট করে খোলা। জানলা দিয়ে মাঝে মাঝে ঝাপ্টা এসে জানলার নিচটা ভিজিয়ে দিয়েছে। বাইরে যে মাঝে মাঝে হাওয়া চলছে তা একটু উলটোপালটা। কেননা জানলার বিপরীত দিকের দরজা দিয়েও ঝাপ্টা আসছিল। অবশ্য সেই ঝাপটায় ঘরে জল ঢুকছিল না। ঘরের বাইরে গ্রিল লাগানো টানা বারান্দা আছে। সেই বারান্দা ভিজে যাচ্ছিল। বারান্দাটা আগাগোড়া ভিজে গেছে।


খোলা দরজা দিয়ে গাছপালার মধ্যে দূরের রাস্তাটা দেখা যাচ্ছিল। রাস্তা এবং রাস্তা দিয়ে ছুটে যাওয়া গাড়ি। না। গাড়ি নয়। বৃষ্টি ভেদ করে হেডলাইটের আলো ছুটে যাচ্ছিল রাস্তা দিয়ে। ডলি দরজায় হেলান দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ডলি মানে কুন্তী, যিনি এ সংসারে শুধু একটি ছেলের মা। ছেলেটি বোবা কালা এবং তার নাম পঞ্চানন। আর দুজন যখন ঘরের মধ্যে নিজের বিছানায় শুয়ে বসে আছেন তখন উনি ওভাবে হাওয়া ও বৃষ্টির পাশে খোলা দরজায় দাঁড়িরে আছেন কেন? এই হোমে এমন একজন স্ত্রী পুরুষও নেই যে নিজের শরীর স্বাস্থ্যকে হেলা করে। চবিবশ ঘন্টা একটানা বৃষ্টির ফলে বেশ ঠাণ্ডা পড়ে গেছে। রাত্তিরে গায়ে চাদর চাপাতে হবে। ঠাণ্ডার জন্যে আজ সারাদিন এ ঘরের পাখা খোলেনি কেউ। তাহলে উনি অমনভাবে ওখানে দাঁড়িয়ে কেন?


হ্যাঁ। ওঁর দাঁড়িয়ে থাকার একটা গুরুতর কারণ আছে। উনি বুদ্ধিহীন নন। সত্তর বছর বয়সে এইভাবে ভেজা হাওয়ার কাছাকাছি থাকলে নিমোনিয়া না হক, জবর যে হতে পারে তা উনি জানেন। শুধু দাঁড়িয়ে আছেন এই জন্যে যে বাইরের মতই ওঁর মনের ভেতরে একটা ভীষণ দুর্যোগ চলছে। সেখানে বৃষ্টির সঙ্গে হালকা হাওয়া নয়, সেখানে অন্ধকারে তুফান চলছে।


আজ ডলির চল্লিশ বছর বয়সের বোবা-কালা ছেলে পঞ্চাননের বিয়ে। মেয়েটিও বোবা-কালা। বয়েস আটত্রিশ। গত রোববারে ঝিলের ধারে বেঞ্চিতে বসে তাকে সব বলে গেছে ছেলে। বলে গেছে মানে তার সামনে বসে ক্রমাগত দু'হাতের দশটা আঙুল নেড়েছে আর ঠোঁট। সেই আঙুল এবং ঠোঁট থেকে এই খবরটুকু পেয়েছেন তিনি। তিনি বোবা নন। বোবা-কালা স্কুলে পড়েনওনি কোনওদিন কিন্তু ছেলের আঙুল নাড়া আর ঠোঁট নাড়ার অর্থ ঠিক বুঝতে পারেন। ছেলে বলে গিয়েছিল রেজিস্ট্রি হয়ে যাবার পর সে সোজা বউকে নিয়ে মায়ের কাছে চলে আসবে। তারপর এখান থেকে ফিরে বন্ধুদের নিয়ে ফুর্তি ও খাওয়া-দাওয়া করবে। তার আসার কথা তিনটে নাগাদ। এখন প্রায় সাতটা বাজতে চলল। মনে মনে তিনি বুঝে গেছেন ছেলে আজ আর আসবে না। আর তাইতেই অবুঝ মন হাজার দুশ্চিন্তার তুফান ছুটিয়ে দিয়েছে। শক্ত কাঠ হয়ে দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে তাই তিনি ভাবছিলেন কেন এল না পঞ্চানন।


ছেলের বিয়ের ব্যাপারটা ডলির নিজস্ব ব্যক্তিগত উদ্বেগ। এই খবর তিনি তাঁর ঘরের অন্য সদস্যদের দেননি। দু-একবার বলতে গেছেন, কিন্তু লজ্জায় পারেননি। ছেলে বিয়ে করবে, এতে মায়ের লজ্জার কি আছে? তবু তাঁর লজ্জা করেছে। হতে পারে, যাকে তিনি লজ্জা ভাবছেন সেটা তাঁর অভিমান। বিয়ে উপলক্ষে ছেলে তাঁকে দিন কয়েকের জন্যে একবারও বাড়ি যাবার কথা বলেনি বলে অভিমান। মেয়েটিকে তিনি চেনেন। বোবা-কালা স্কুলে পঞ্চাননের সঙ্গে পড়েছে। প্রায় বছর পনেরো-কুড়ির প্রেম। রেজিস্ট্রির কি দরকার ছিল? তাঁকে বললে দিন দশকের জন্যে বাড়ি গিয়ে তিনি তো সামাজিকভাবেই বিয়ে দিতে পারতেন ছেলের। হতে পারে, এই অভিমান থেকেই তিনি বলেননি কাউকে। কিংবা কে জানে হয়তো লজ্জাই হবে। দীর্ঘকাল বিধবার জীবনযাপন করছেন তিনি। প্রায় আটত্রিশ বছর। তাই হয়তো হঠাৎ ছেলের বিয়ের কথা শুনে ভীষণ লজ্জা পেয়ে গেছেন।
 

হঠাৎ ভয়ানক শব্দ করে কাছাকাছি বাজ পড়ল কোথাও। রং-মশালের আলোর মত তীব্র কিন্ত ক্ষণস্থায়ী আলোয় বৃষ্টিভেজা পৃথিবী মুহূর্তের জন্যে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। শঙ্কিতভাবে দরজা থেকে নিঃশব্দে সরে এলেন ডলি। উষা সেলাই থেকে মুখ তুলে ভয়ার্ত চোখে তাঁর দিকে তাকালেন একবার। কোনও কথা বললেন না। শুধু তাকালেন। কথা বললেন নিভা। ডলি পা ঝুলিয়ে নিঃশব্দে নিজের বিছানায় এসে বসলে শুয়ে শুয়ে বই পড়তে পড়তে নিভা বলে উঠলেন, ‘আজ মহাপ্রলয়।'


তখন উষা বললেন, 'হ্যাঁ। প্রলয়। মমতাময়ীর জন্যে শোকে আকাশ ভেঙে পড়েছে।’ 'উহু। মমতময়ীর জন্যে নয়। নিভা বললেন, “বৃষ্টি শুরু হয়েছে কাল। আর মমতাময়ী মরেছে আজ দুপুরে। তার জন্যে নয়। প্রলয়ের অন্য কোনও কারণ আছে যা আমরা জানি না।’


“কি কারণ?’


‘বললুম তো জানি না। একটা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ হবে হয়তো।’


এটা যে তাকে নিয়ে মজা করতে বলা তা উষা বুঝতে পারলেন। তিনি গান্ধারী। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ হলে তিনি সর্বস্বান্ত হবেন তাই বলা হয় কথাটা। তিনি একটু হাসলেন। হেসে চুপ-করে গেলেন। শুধু জেগে থাকল বাইরে বৃষ্টির শব্দ আর ঘরের মধ্যে মমতাময়ীর নাম। কে এই মমতাময়ী?
 

ভুল আমারই। মমতাময়ীর কথা অনেক আগেই আমার বলা উচিত ছিল। কিন্ত খেয়াল হল না। এই খেয়াল ন! থাকার জন্যে দায়ী মমতাময়ী নিজে। তিনি এই হোমের প্রাচীনতম বাসিন্দা। তিরিশ বছর আগে যে দশজন পুরুষ এবং দশজন স্ত্রীলোক নিয়ে হোম চালু হয়েছিল তিনি তাদের একজন। সেই কুড়িজনের তিনি ছিলেন শেৰ প্রতিনিধি। বাকিরা অনেক আগেই হোম ছেড়ে চলে গেছেন। চিরকালের জন্যে চলে গেছেন।
 

যদিও একানব্বই বছর বয়সে আজ দুপুরে মারা গেলেন মমতাময়ী কিন্ত প্রকৃতপক্ষে তার মৃত্যু হয়েছিল আরও বছর দশেক আগে। এই দশ বছর তিনি শুধু বেঁচে ছিলেন, জীবিত ছিলেন না। ডেলা হয়ে গিয়েছিলেন। হাঁটবার ক্ষমতা ছিল না। কাউকে চিনতেন না। প্রতিদিন বিকেলে প্যারামবুলেটরের মত একটা গাড়িতে তাকে চাপিয়ে যখন ঘোরানো হতো তখন খোলা চোখে অন্য গ্রহের মানুষের মত এই পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে থাকতেন।

গত দশ বছরে যারা হোমে এসেছে তাদের কারও সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল না। প্রতি সপ্তাহে তাঁকে দেখবার জন্যে কেউ আসত না। অনিয়মিত কখনও-সখনও কেউ এসে পড়ত। তারও কারণ ছিল। তাঁর চার ছেলের একজনও আর বেঁচে নেই। ছেলের বউদের মধ্যে শুধু একজনই বেঁচে আছে। ছোটছেলের বউটাই। এই বউটিই কখনও-সখনও এক আধটা নাতিকে সঙ্গে নিয়ে আসত। গাড়ি থেকে নেমে শুধু পাঁচ মিনিট

দাঁড়িয়ে থাকা। ব্যস। সাক্ষাৎকার শেষ। বুড়ি তাকেও চিনতে পারতেন না। তাই বলছিলাম মমতাময়ীকে খেয়াল না থাকার জন্যে তিনি নিজেই দায়ী। পৃথিবীটা দশ বছর আগেই মরে গিয়েছিল তাঁর কাছে।

 মতাময়ী এ বাড়ির একতলার একটা ছোট ঘরে একলা থাকতেন। আজ দুপুরে মারা গেছেন তিনি। কিন্তু এখনও একটা সাদা চাদর ঢেকে তাঁর দেহটা সেই ঘরেই রেখে দেওয়া হয়েছে। থানা থেকে রেডিওগ্রাম করে খবর দেওয়া হয়েছে তাঁর বাড়িতে। সেখান থেকে কেউ এলে অন্ত্যেষ্টি হবে। ততক্ষণ তিনি ওইভাবে শুয়ে থাকবেন। চাদর ঢাকা তাঁর দেহটাকে দেখলে মনে হয় কোনও বাচ্চা শুয়ে আছে। বয়সের বোঝা এবং এফাঁকিত্ব তাঁকে খর্ব করে দিয়েছিল। একসময় যিনি বিশালাকায়, বলশালী চারজন ছেলেকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন, তিনি কি করে অত ছোট হয়ে যান কে জানে। অবশ্য সেই ছেলেরা আগেই চলে গেছে। মৃত্যুর পূর্বে মায়ের এই খর্বাকৃতি দেখবার জন্যে তারা কেউ বেঁচে নেই।
 

তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াল এই, যখন পৃথিবী জুড়ে প্রলয়ঙ্কর বৃষ্টি চলছে তখন দুশো অধিবাসীর এই বাড়িটার একটা ছোট ঘরে চাঁদর ঢাকা একটি মৃতদেহ শায়িত আছে। মমতাময়ীর মৃত্যুর জন্যে এ বাড়ির জীবনযাপনে কোনও ছন্দপাত হয়নি। সমস্তই চালু আছে ঠিকমত। রান্নাবান্না, খাওয়া-দাওয়া, সব। শুধু অধিবাসীরা যে, বাগানে, ঝিলের ধারে, ঝাউবনে বেড়াতে পারেনি তার কারণ প্রবল বৃষ্টি। মমতাময়ী নয়। তবু একটা কাঁটা কোথাও বিঁধে আছে। বোঝা যাচ্ছে না কোথায়, কিন্তু বিঁধে আছে। আসলে চাদর ঢাকা মমতাময়ীকে সবাই দেখে গেছেন একবার করে। আর তারই ফলে কেউ ভুলতে পারছে না তাঁকে। জীবিত অবস্থায় গত দশ বছর তাঁকে কেউ মনে রাখেনি আজ তাঁকে মন থেকে সরাতে পারছে না কেউ। গান্ধারী সায়া সেলাই করছেন, কিন্তু চোখের ওপর ভাসছেন মমতাময়ী। দ্রৌপদীর বুকের ওপর ধরে রাখা উপন্যাসটির প্রতিটি লাইন প্রতিমুহূর্তে মমতাময়ী হয়ে যাচ্ছেন। এই উদ্বেগ থেকে মুক্ত শুধু কুন্তী। আজ সন্ধের তাঁর যাবতীয় উদ্বেগ কেড়ে নিয়েছে তাঁর বোবা ছেলে পঞ্চানন। পঞ্চানন আর তাঁর বোবা বউ। মমতামরীর মৃতদেহ সেখানে ঢুকতে পারছে না। এ বাড়ির সকলকে কাবু করে দিলেও কুন্তীকে কাবু করতে পারেননি মমতাময়ী।


গান্ধারী মানে উষার সায়া সেলাই হয়ে গেল। তাঁর সেলাইয়ের বাক্স থেকে ছোট কাঁচি বার করে তিনি সুতো কাটলেন। সাধারণত মেয়েরা সেলাই শেষে সুতো দাঁত দিয়ে কাটে। দশ-বিশ বছর আগে উষাও হয়তো তাই করতেন। কিন্ত চুয়াত্তর বছর বয়সে সামনের দাঁতগুলো শুধু সাজানোই আছে। জোর নেই। তার ওপর আবার লাইন ভেঙে ছ-সাতটা গত হয়েছে। এ দাঁতে আর সুতো কাটা যায় না।


সায়াটা ভাজ করা পায়ের ওপর থেকে নামিয়ে দু পা টান করে দিলেন উষা। সেলাইয়ের সরঞ্জাম বাক্সে ঢুকিয়ে রাখলেন। টান হয়ে বসে দু হাতে কোমর চেপে ধরে জিজ্ঞেস করলেন, 'অমবস্যা কবে?’


কেউ উত্তর দিল না। ডলি যেমন বসেছিলেন বিছানায় পা ঝুলিয়ে, বসে থাকলেন। নিভা উপন্যাসে চোখ রেখে শুয়ে থাকলেন। বৃষ্টি পড়ে যেতে থাকল। অগত্যা আড়মোড়া ভেঙে একটা হাই তুলে উাষাই আবার কথা বললেন। নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই দিয়ে বললেন, “মনে হচ্ছে দু'একদিনের মধ্যে হবে। গা-গতর বড্ড ভারী হয়েছে। আর অমাবস্যা না গেলে এই বৃষ্টি ধরবে না।'


‘যদি চারদিন বাদে অমাবস্যা হয়?’ হাতের বই বুকের ওপর নামিয়ে চোখ বুজে নিভা জিজ্ঞেস করলেন, ‘তাহলে বড়মা, চারদিন ধরে এই প্রলয়ঙ্কর ব্যাপারটা চলবে?’


নিভা হল দ্রৌপদী। তাই গান্ধারীকে সে বড়মা বলে ডাকে। কুন্তীকে মা। আসলে তারা তিনজনে তিন বুড়ি ছাড়া আর কিছুই না। সংসারে এই তুচ্ছ ডাকাডাকি হল বেঁচে থাকার মশলা। অথচ কম বয়সে এসব একদম বোঝা যায় না। এসব মানে ডাকাডাকির এই তুচ্ছতা। তখন মনে হয় মানুষে মানুষে সম্পর্কের মত খাঁটি ও অকৃত্রিম আর কিছু নেই। কিন্তু যেই বয়স বাড়ে বোঝা যায় কি অসার এই ডাকাডাকি। সারাজীবন ধরে যে ফানুসটাকে ফোলাই আমরা, বয়স বাড়লে সেটা ফুটো হয়ে যায়। তখন সেটা শুধু একখণ্ড ন্যাতপেতে রবার। এই তিন বুড়ি সেই রবারটাকে নিয়ে খেলা করতে ভীষণ ভালবাসে।


গান্ধারী বললেন, 'আমি বলছি না যে এরকম প্রলয়ঙ্কর বৃষ্টিই সর্বক্ষণ হবে। বৃষ্টি কমবে বাড়বে। হয়তো দু-এক ঘন্টার জন্যে বন্ধও হয়ে যেতে পারে। কিন্তু অমাবস্যা না কাটলে এই দুর্যোগ কাটবে না। সে কাল হোক কি চারদিন বাদে হোকা’


‘তাহলে?’ চোখ বড় বড় করে উঠে বসলেন দ্রৌপদী। ‘চারদিন ধরে এরকম দুর্যোগ চললে মমতামরীর বাড়ির লোকেরা আসবে কি করে?’



‘এর মধ্যেই আসতে হবে। কথায় বলে না, পিতৃমাতৃদায় বড় দায়। রাস্তা ডুবে গেলে ভেলায় করে আসতে হবে।’


‘তা নয় এল। কিন্তু পোড়াবে কি করে?’


'পোড়াবে পোড়াবে। ঠিক পোড়াবে। মড়া তো ফেলে রাখা যাবে না। দরকার হলে চিতার ওপর টিনের চালা তুলেও পোড়াতে হবে।’


‘নাঃ বড়মা। আজ মনে হচ্ছে আমাদের এই মৃতদেহ দাহ করার সিস্টেমটা ভাল না।’


‘কেন?’


'এই তো, বৃষ্টি নামলে কী অসুবিধে।’


‘সে তো সবাইয়ের।' গান্ধারী হাসলেন। 'এরকম বৃষ্টি হলে কবরস্থানেও এক হাঁটু জল দাঁড়িয়ে যাবে।’

আবার চোখ বড় বড় হয়ে উঠল দ্রৌপদীর। “আপনি কবরস্থান দেখেছেন বড়মা?”

উত্তর দিলেন না গান্ধারী। গম্ভীর মুখে বললেন, 'আমার শীত করছে বউমা। উঠে জানলা দরজাগুলো বন্ধ করে দাও। তোমার শাশুড়ি কেন ওগুলো হাট করে খুলে রেখেছেন কে জানে?


দ্রৌপদী জানলা দরজা বন্ধ করবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন না। একবার শুধু ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন সেদিকে। তারপর পুরনো কথার খেই ধরে একই ভঙ্গিতে বললেন,’আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে।'


‘কি জানতে ইচ্ছে করে?’


সকলের কথা। এ বাড়িতে যাঁবা আছে তাঁদের সকলের। এই যেমন মমতাময়ী। একানব্বই বছরে মারা গেলেন, এ বাড়িতেই ছিলেন তিরিশ বছর অথচ তাঁর সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না।'


‘আমিও জানি না।’


‘না বড়মা। আপনি জানেন। আপনি আমায় একদিন বলেছিলেন, যে বিধবা বউটি ওঁর সঙ্গে দেখা করতে আসে ওঁর ছোটছেলের বউ। ওঁর নাকি চার ছেলে আর তারা সকলেই মারা গেছে


‘হ্যাঁ। সে কথা ওই বিধবা বউটিকে জিজ্ঞেস করে জেনেছিলুম।’


‘মমতাময়ীর জীবনের আর কোনও ঘটনা জানেন না আপনি?’


‘না মা। আর কি করে জানব? বউটি ওইটুকুই বলেছিল।


দ্রৌপদী গালে হাত দিয়ে অবাক হবার ভঙ্গি করলেন। “তাই যদি হবে বড়মা, বুড়ির যদি ছেলেপুলে কেউ নাই-ই থাকবে তাহলে ওর মৃতদেহ নিতে কে আসবে?


‘কেন? সেই বউটা। ওর ছোটছেলের বউ।’


সজোরে মাথা নেড়ে দ্রৌপদী বললেন, 'অসম্ভব। বউটা গাড়ি ড্রাইভ করতে জানে আমি দেখেছি। কিন্তু তাই বলে মেয়েছেলের এত সাহস হবে? ডেডবডি নিয়ে যাবে?’


মুহূর্তের জন্যে থেমে দম নিলেন দ্রৌপদী। ‘উঃ! ভাবা যায় না বড়মা। পেছনের সিটে চাদর ঢাকা মমতাময়ীর মৃতদেহ শুয়ে আছে আর বউটা গভীর অন্ধকারে এই বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি চালাচ্ছে।'


গান্ধারী আপন মনে বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁ। এই একটা কাজ মেয়েরা পারে না। অস্তত এখনও পর্যস্ত দেখা যায়নি মেয়েদের। মৃতদেহের সৎকার করার কর্মটা পুরুষদেরই একচেটিয়া থেকে গেল। সে তুমি শ্মশানে নিয়ে গিয়ে পোড়াও আর কবরস্থানে নিয়ে গিয়ে কবর দাও, কোথাও মেয়েমানুষ নেই। শুধু পুরুষ।


‘অথচ বড়মা, আমরা মেয়েমানুষেরা আগুন জ্বালতেও জানি, গর্ত খুঁড়তেও পারি।’


‘তার মানে?’


‘বাঃ! আমরা আগুন জ্বেলে রান্না করি না। মাটিতে গর্ত খুঁড়ে উনুন তৈরি করি না! অর্থাৎ ইচ্ছে করলে আমরা মৃতদেহ দাহ করতেও পারি আবার গর্ত খুঁড়ে কবরও দিতে পারি।'


দ্রৌপদী হয়ত চেয়েছিলেনতাঁর কথা শুনে গান্ধারী একটু হাসুন। হয়তো তাই অমন লঘু সুরে তিনি কথাটা বলেছিলেন। কিন্তু গান্ধারী হাসলেন না। গম্ভীর মুখে বললেন, ‘সংসারের সব জিনিসের উলটোটাও আছে। হাজার হাজার মাইল যেমন সমুদ্র আছে তেমনি আছে হাজার হাজার মাইল মরুভূমি। মৃত্যুর পর দাহকর্মটি পুরুষদের একচেটিয়া ঠিক কথা, কিন্তু জন্মের বেলায় যে আমাদের। আঁতুড় ঘরে কোনও পুরুষ ঢুকতে পারে? সেখানে শুধু মেয়ে। শ্মশান হল পুরুষের কিন্তু আঁতুড় ঘর প্রমীলার।’


অবাক দৃষ্টিতে গান্ধারীকে দেখতে দেখতে আলতো করে দুবার হাততালি দিলেন দ্রৌপদী। নিজের বিছানা থেকে নেমে গান্ধারীর সামনে গিয়ে তাঁর বিছানায় বসে বললেন, ‘আপনি একটা জিনিয়াস বড়মা। এই সাংঘাতিক কথাটা কোনওদিন ভাবিনি। কখনও মনে হয়নি আমার। শ্মশান এবং আঁতুড় ঘর। দা-রুণ। জীবনের এমাথা ওমাথায় দুটো দরজা। তার একটাতে পাহারা দিচ্ছে পুরুষ অন্যটায় স্ত্রীলোক। ভাবা যায় না।’


‘খুব ভাবা যায়।’ ডলির গলা। তিনি এতক্ষণ একটাও কথা বলেননি। নিজের বিছানায় পা ঝুলিয়ে চুপচাপ

বসেছিলেন। এখন খিঁচিয়ে উঠে বললেন, ‘আচ্ছা, ওই দিদির না হয় বাহাত্তর পার হয়ে গেছে, ভীমরতি হলেও হতে পারে, আপনার তো সত্তরও হয়নি, আটষট্টি, আপনি কেন তখন থেকে বকবক করে যাচ্ছেন? বেশ তো শুয়ে শুয়ে বই পড়ছিলেন। হঠাৎ কি হল বলুন তো?’


নিভা উঠে ডলির সামনে চলে গেলেন। গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘ মা, আপনি বোধহয বড়মার কথাটা ঠিকমত বুঝতে পারেননি। উনি কিন্তু খুব জ্ঞানের কথা বলেছেন।’ ডলি আগের মতই খিঁচিয়ে বললেন, 'রাখুন আপনার জ্ঞানের কথা। মেয়েছেলে আঁতুড় ঘরে শুয়ে বাচ্চা বিয়োবে এতে আবার জ্ঞানের কি আছে। চিরকাল পুরুষেরাই মড়া পুড়োবে। যার যা কাজ। উনি আমাকে জ্ঞান শিখাতে এলেন।’ এক মুহূর্তের জন্যে থামলেন ডলি। থেমে বললেন, ‘আচ্ছা, আপনাদের কি একটু দয়ামায়া নেই। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তাও হারিয়েছেন। নিচে একজন মানুষ দুপুর থেকে মরে পড়ে আছে। এ অবস্থায় আপনারা কিভাবে আজেবাজে কথায় মেতে থাকতে পারেন।’


নিভা বললেন, ‘এই দেখুন। সেই মমতাময়ীর কথা দিয়ে শুরু করেই তো আমরা এখানে চলে এসেছি। কিন্তু কই, তেমন কোনও আজেবাজে কথা বলেছি বলে তো মনে পড়ছে না।’



ডলি গম্ভীর মুখে বললেন, ‘ছেড়ে দিন। গতস্য শোচনা নাস্তি। নিজের বিছানায় গিয়ে শুয়ে শুয়ে আবার বই পড়ুন।'


উষা বললেন, 'উনি বই পড়বেন কিন্তু আমি কি করব?’


‘আপনি সায়া সেলাই করুন।'


উষা হাসলেন। আমার সায়া সেলাই হয়ে গেছে। দিদি, আজ সারাদিন দেখছি আপনার মেজাজ খারাপ। কারও সঙ্গে কথা বলছেন না। বললেও... কি হয়েছে আপনার? শরীর-টরীর খারাপ করেনি তো?’


'ইয়েস। আমি এসে গেছি। কার শরীর খারাপ এ ঘরে?’ ডাক্তার। এই হোমের যুবক ডাক্তারটি দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। প্রত্যেকদিন সন্ধেবেলা প্রতিটি ঘরে তার রাউণ্ড দেবার ডিউটি। সেই ডিউটি করতেই হঠাৎ নিঃশব্দে ঢুকে পড়েছে সে। চমৎকার স্বাস্থ্য । দারুণ সুপুরুষ চেহারা। তার দিকে তাকালে এ বাড়ির সব বুড়োবুড়ির বয়সের বোঝা যেন বুকের ওপর চেপে বসতে চায়। গলায় স্টেথো ঝুলছে। জামাকাপড় ভিজে জবজবে। উষা কথা বলছিলেন। কাজেই তিনিই বললেন, ‘আসুন আসুন ডাক্তারবাবু। একদম ভিজে গেছেন দেখছি।


ইয়েস। কোয়ার্টার থেকে আপনাদের এই বিল্ডিং-এ আসতেই ভিজে গেলাম। তারপর তো ক্রমাগত বারান্দায় ঝাপ্টা খাচ্ছি। ভিজুক। মুষলধারে বৃষ্টি হবে আর আমি ভিজব না? তা দিদিমারা আপনারা এখন কোথায় আছেন? মহাভারতে? না এই হোমে?


ডাক্তারকে দেখেই নিভা তার বিছানায় গিয়ে বসেছিলেন। উত্তরটা দিলেন তিনি। বললেন, 'হ্যাঁ, একটু আগে আমরা মহাভারতে ছিলাম। কিন্তু আপনাদের ওই মেজ 'দিদিমাটির জ্বালায় থাকতে পারলুম না। হোমে ফিরে আসতে হল।' বলে ইশারায় ডলিকে দেখালেন।


উষা বললেন, 'আমি আপনার ওই মেজ দিদিমার শরীর, খারাপের কথাই বলছিলাম।’


ডাক্তার গট্গট্‌ করে ডলির দিকে এগিয়ে গেল। 'উঁহু। ভাল কথা নয়।' গলা থেকে স্টেথো খুলে হাতে ঝুলিয়ে নিয়ে বলল, 'ইয়েস। দেখি দিদিমা, জিভ বার করুন।’

ডলি হেসে ফেললেন। ডাক্তার দু পা পিছিয়ে গিয়ে বলল, ‘হাসা ভাল। ইয়েস। হাসলে অসুখ-বিসুখ থাকে না।' বলে সিধে হয়ে দাঁড়াতেই ঘরের খোলা দরজা জানলার দিকে চোখ গেল তার। আঁতকে উঠে বলল, ‘কী সাংঘাতিক! এ কি করেছেন আপনারা?’


তিন বুড়ি প্রায় একসঙ্গে বলে উঠলেন, ‘কি করেছি?


‘সব খুলে রেখেছেন। আপনাদের কি মাথাফাতা খারাপ হয়ে গেছে? অ্যাঁ! কনকনে ঠাণ্ডা ভিজে হাওয়া। তার মধ্যে জানলা দরজা সব খোলা। যান। শিগগির বন্ধ করুন ওগুলো। ইয়েস। এই বয়সে একবার ঠাণ্ডা লাগলে কেউ বাঁচাতে পারবে না আপনাদের।


নিভা ঝঙ্কার দিয়ে বলে উঠলেন, ‘ইয়েস এত কথায় কথায় ইয়েস কিসের? খোলা ছিল বন্ধ করে দিচ্ছি’ বলে উঠে গিয়ে দুটো জানলা বন্ধ করে ভেজিয়ে দিলেন। মুহূর্তে বৃষ্টির তাণ্ডবটা যেন তিন হাত পিছিয়ে গেল। তিনজনেরই মনে হল এতক্ষণ তাঁরা ফাঁকা মাঠে চার দেওয়াল খোলা কোনও চালার নিচে বসে ছিলেন। ডাক্তার এসে যেন তাদের ঘরে ঢোকাল। ফিরে এসে নিজের বিছানায় বসে নিভা বললেন, 'ডাক্তারবাবু, আপনার যখন সবই ইয়েস তখন ঠাণ্ডা লাগলে আমাদের বাঁচাতে পারবেন না কেন?’


সকলে হেসে উঠলেন। ডাক্তারও। হাসতে হাসতে উষা বললেন, ‘ঠাণ্ডা লাগলে “ইয়েস” “নো” হয়ে যায়। মমতাময়ীর যেমন হল।’


ডাক্তার নস্যি নিয়ে ভিজে রুমাল বার করে নাক থেকে নস্যির গুঁড়ো মুছছিল। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, 'এই যা! আপনাদের আসল খবরটাই দেওয়া হয়নি, ডাক্তার জিভ কাটলেন। 'মমতাময়ীর নাম করতে মনে পড়ল। যে ঘরে আপনারা ভিডিও-শো দেখেন সেই ঘরে আজ রাত নটায় মিটিং। প্রধান বক্তা মমতাময়ী।'


ঘরের ছাদ ফুটো করে হঠাৎ বজ্রপাত হলেও বোধহয় তিন বুড়ি এতখানি চমকে উঠতেন না। চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘কে প্রধান বক্তা?’


‘মমতাময়ী।’


‘সে তো আজ দুপুরবেলা মারা গেছে।’


ইয়েস। মারা গিয়েছিল। কিন্তু আবার বেঁচে উঠেছে। তার ঘর থেকেই আমি সোজা ওপরে আসছি। বুড়ি বেঁচে উঠেছে। সারাদিন চাদর ঢেকে শুয়ে থেকে এখন সেই চাদরটা গায় দিয়েই উঠে বসে আছে। হঠাৎ ঘরে ঢুকে দেখলে মনে হবে লক্ষ্মীপেঁচা। বুড়ি নিজের সম্পর্কে বক্তৃতা করবে। মিটিং-এ তার জীবনের ঘটনাবলি বলবে সকলকে।'


নিভা বললেন, ‘আপনি একটা নাম্বার ওয়ান লায়ার। আপনার কথা আমরা বিশ্বাস করি না। মরা মানুষ আজ পর্যন্ত কখনও বেঁচে ওঠেনি।'


ডলি বললেন, 'ডাক্তারবাবু, আপনি নিজের চেখে দেখলেন বুড়ি লক্ষ্মীপেঁচার মত বিছানায় উঠে বসে আছে?’


‘ইয়েস। নিজের চোখে।’


উষা বললেন, 'হতে পারে এই মুষলধারায় বৃষ্টির সঙ্গে তার বেঁচে ওঠার কোন সম্পর্ক আছে। কিংবা, আমার মাথায় আর একটা চিন্তা আছে। মৃতদেহ ছুঁয়ে থাকা নিয়ম। মমতাময়ীকে একটা ঘরে একলা ফেলে রাখা হয়েছিল। হয়তো কোনও দুষ্টু আত্মা ফাঁকা পেয়ে তার দেহের মধ্যে ঢুকে পড়েছে?’


ডাক্তার বলল, 'ইয়েস। হতে পারে। কোনও দুষ্টু আত্মা ঢুকে বাঁচিয়ে তুলেছে তাকে?’


বিছানা ছেড়ে নিভা লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর বয়সের পক্ষে ব্যাপারটা খুবই বেমানান হল। কিন্ত গ্রাহ্য করলেন না। উত্তেজনায় জোরে জোরে শ্বাস পড়ছিল। বললেন, ‘ঠিক আছে। আমি নিচে গিয়ে দেখে আসছি। নিজে না দেখে আমি কিছু বিশ্বাস করি না।’


ডাক্তার পকেট থেকে চিরুনি বার করে তার ভিজে চুলগুলো আঁচড়াচ্ছিল। কথা না বলে শুধু হাত বাড়িয়ে বাধা দিল নিভাকে। তারপর পরিপাটি করে চুল আঁচড়ে পকেটে চিরুনি ঢুকিয়ে বলল, ‘গিয়ে লাভ নেই দিদিমা। সন্ধে থেকে ভীষণ ভিড় হচ্ছিল। মমতাময়ী বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন। তাই সব দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’


‘দেখতে পাব না।’


ইয়েস। পাবেন। নটার সময়। মিটিং-এর ঘন্টা পড়বে। তখন গেলেই দেখতে পাবেন।' পকেট থেকে রুমাল বার করে নাক ঝাড়ল ডাক্তার। বন্তটা রুমালে জড়িয়েদিন। আপনারা মমতাময়ী সম্পর্কে কে কি জানেন?


তিন বুড়ি একসঙ্গে বলে উঠলেন, “কিচ্ছু জানি না।'


‘আপনাদের পরস্পরের সম্পর্কে?’


'নিভা বললেন, ‘সব জানি। আমি পাঞ্চাল রাজকন্যা দ্রৌপদী এবং পঞ্চপাণ্ডবের স্ত্রী।' উষার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, ‘উনি মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের স্ত্রী গান্ধারী আর আপনার সামনে বসে আছে পাণ্ডব জননী কুন্তী।'


ডাক্তারের মুখ দেখে মনে হল সে খুব ঘাবড়ে গেছে। ঘাবড়ে গিয়ে হেঁচে ফেলল ডাক্তার। হাঁচির পর পকেট থেকে সেই রুমালখানাই বার করল। সাবধানে নাক মুছে নিভার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দিদিমা, এখানে আসার আগে আপনি কি যাত্রা করতেন?’


নিভা ঝাঁঝের সঙ্গে বললেন, ‘আজ্ঞে না। ডাক্তারি করতাম।’


ডাক্তার বলল, 'তাহলে ঠিক আছে।’ প্রায় আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে বলল সে কথাটা। পর্যায়ক্রমে তিন বুড়ির দিকে তাকাল একবার। তারপর খুব কেতাদুরস্ত কায়দায় বলল, ‘ইয়েস। আমি এবার যাব। এখনও অনেক ঘর বাকি। আপনাদের শরীর স্বাস্থ্য বেশ মজবুতই মনে হচ্ছে। তাহলে ওই কথাই রইল। ঠিক নটার সময় ঘন্টা পড়লে যে ঘরে ভিডিও-শো হয়... বাক্য শেষ করল না ডাক্তার। শেষ করতে পারল না। বিস্ফোরণের শব্দে আবার হাঁচি বেরিয়ে এল তার এবং আবার সেই রুমাল। নাকটাক মুছে ডাক্তার বলল, 'নাঃ কাল নির্ঘাত নিমুনিয়া। শুনুন দিদিমাগণ, যাবার আগে একটা কথা বলে যাই। ওই মহাভারত-টহাভারত হবে না। আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি আপনারা কেউই কারও বিষয়ে কিছু জানেন না। আপনারা বলে নয়। এ বাড়ির সব ঘরেই এক অবস্থা। কেউ কাউকে... ।'


তাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে উষা বলে উঠলেম, ‘তুমি ঠিকই বলেছ? পরক্ষণেই লজ্জা পেয়ে জিভ কেটে বললেন, ‘এমা! আপনাকে তুমি বলে ফেললুম। কিছু মনে করবেন না ডাক্তারবাবু।’


'আরে না না। আমি কিচ্ছু মনে করিনি। আপনারা আমাকে তুমি বলেন না বলেই বরং মাঝে মাঝে আমার ভ্রম হয় আপনাদের আচরণ-টাচরণগুলো স্বাভাবিক না। যেতে দিন। ইয়েস, কি বলছিলেন। বলুন।'


'আমরা কারও সম্পর্কেই কিছু জানি না। এই দেখুন আজ সারাদিন আপনার মেজ দিদিমা মন খারাপ করে বসে আছেন। কারও সঙ্গে কথা বলছেন না। আপনি ঘরে ঢোকার আগেও বৃষ্টির মধ্যে দরজা খুলে বাইরের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ওনার 'কিসের দুশ্চিন্তা উনি বলেননি। আমরাও জিজ্ঞেস করতে পারিনি। চেয়ে চেয়ে দেখেছি খালি। এইরকম হয়। আমাদের প্রত্যেকের বেলায় এই জিনিস ঘটে। কেন এরকম হল বলুন তো। এত বছর একসঙ্গে আছি। কিন্তু কেউ কারও অতীত জানি না।'


ইয়েস। আমি বড্ড ছেলেমানুষ। মানে আপনাদের বয়সের তুলনায় বলছি, খুবই ছেলেমানুষ। এখনও বিয়ে করিনি। তবে আপনাদের বলতে আপত্তি নেই বিয়ে আমি করব না। যদি এরা আমাকে ছাড়িয়ে না দেয়, সারাজীবন আপনাদের সেবা করে যাব। বিয়ে কেন করব না সেই গোপন তথাটুকু বলতেও আমার কোনও আপত্তি নেই। কলেজে পড়বার সময় একটি মেয়েকে ভালবেসেছিলুম। সেও ভালবেসেছিল। কিন্ত আমি গরিব বলে সেই ভালবাসার বন্ধন ছিড়ে ফেলতে সে দেরি করেনি। সে এখন তার স্বামীর সঙ্গে আমেরিকায় আছে। তার স্বামীও আমাদের বন্ধু। তুমুল বড়লোক। কাজেই বুঝতে পারছেন। ব্যাপারটা এমন কিছু না। আকছারই ঘটে। আমার অল্পবয়সে বাবা মারা যান। খুব ভাগ্য আমার যে বাবার চাকরিটা মা পেয়ে গিয়েছিল। না হলে মার এটুকু হতো না। মা এখনও চাকরি করে যাচ্ছেন। আমি মাকে প্রত্যেক চিঠিতে লিখি যে চাকরি ছেড়ে দাও, আমার কাছে এসে থাক। মা শোনে না। মা উলটে প্রত্যেক চিঠিতে লেখে তুই বিয়ে কর। বিরে করে সংসারী, হয়ে যা।' হাহা করে হেসে উঠল ডাক্তার। আমি একেবারেই ছেলেমানুষ। এসব কথা আপনাদের বলার কোনই দরকার ছিল না। তবু দেখুন কেমন গড়গড় করে বলে গেলুম।’


'ইয়েস। আমি বড্ড ছেলেমানুষ। তা সত্ত্বেও আপনারা যদি আমার পরামর্শ নেন আমি বলব এভাবেই গড়গড় করে আপনারাও পরস্পরের কাছে আপনাদের অতীত বলে দিন। এখনও নটা বাজতে ঘণ্টা দেড়েক বাকি আছে। দেড় ঘণ্টা যথেষ্ট সময়। আরম্ভ করে দিলেই জলের মত সোজা হয়ে যায় সব। সব বলা হয়ে গেলে বুঝতে পারবেন অতীত হল আমাদের মনের ওপর একটা অকারণ বাড়তি বোঝা। সেই বোঝা ঝেড়ে ফেলে দিন। দেখবেন মনের ওপর দিয়ে কেমন ফুরফুর করে হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। আসুন, সবাই মিলে আজ আমরা অতীত দিবস পালন করি।' একসঙ্গে এত কথা বলায় ডাক্তার হাঁপাচ্ছিল। এক মুহূর্ত থেমে দম নিয়ে বলল, "ইয়েস, আর একটা কথা। মমতাময়ী যে ঘরে বক্তৃতা দেবেন সেই ঘরে টোকবার সময় আপনাদের জিজ্ঞেস করা হতে পারে আপনারা তিনজন তিনজনের সবকিছু জানেন কিনা। তখন কিন্তু বোকার মত না বলবেন না। না বললে ঢুকতে দেবে না। বলবেন হা জানি। না জানলেও বলবেন, জানি। আর যদি এই দেড় ঘণ্টায় সকলের সব জানা হয়ে যায় তবে তো কথাই নেই। বুক ফুলিয়ে বলে দেবেন, জানি। ডাক্তার কথা বলতে বলতে দরজার দিকে পেছোচ্ছিল। কথা শেষ করে দরজা খুলে ঘুরে দাঁড়িয়ে তিন বুড়িকে কুর্নিশ করল সে। ‘আপনারা আমার নামটাই জানেন না। আমাকে জানেন ডাক্তার ঘোষ বলে। আমার নাম হরনাথ ঘোষ। সেই ডাক্তার মেয়েটি আমার এই সেকেলে নামটাকেও পছন্দ করত না। ইয়েস। চলি। গুডবাই।' দরজা টেনে দিয়ে ডাক্তার বেরিয়ে গেল। সে যে কমুহূর্ত দরজা খুলে রেখেছিল তাতে দেখা গেল বাইরের তাণ্ডব একটুও কমেনি। সমানে বৃষ্টি পড়ে যাচ্ছে।


প্রথম কথা বললেন নিভা। দু ঠ্যাং একসঙ্গে বিছানার ওপর তুলে খাটে হেলান দিয়ে বসে বললেন, ‘এই ছোকরা ডাক্তারের একটা কথাও আমি বিশ্বাস করি না। সব বানানো। নিজের সম্পর্কে যা বলল, তাও মিথ্যে। ডাক্তার বিবাহিত।’


ডলি বললেন, 'আমার তা মনে হয় না। আমি কানাঘুযোয় ওই রকমই শুনেছি। বিয়ে করেননি।’


উষা বললেন, 'আমাদের কিন্তু এই নিয়ে বিবাদ করা উচিত নয়। সময় মোটে দেড় ঘণ্টা। আসুন আমরা আমাদের অতীত নিয়ে বসি।'


'তার মানে দিদি আপনি বিশ্বাস করেন মমতাময়ী বেঁচে উঠেছেন? খুব অবাক হয়ে নিভা বললেন, 'সাত ঘণ্টা আগে মরে গেছে। সে হঠাৎ বেঁচে উঠল!’


উষা বললেন, ‘হামেশাই না হক মাঝে মাঝে এরকম ঘটনা সংসারে ঘটে। এই নিয়ে আমাদের উদ্বেগের কোনও মানে হয়ু না। একটু বাদেই তো নিজের চোখে দেখতে পাব সব।'


'না। আমি এখুনি দেখব। দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করার ধৈর্য নেই আমার।' বলতে বলতে খাট থেকে নেমে এলেন নিভা। দরজা খলে বললেন, 'আসছি।' তারপর বেরিয়ে গেলেন। দরজাটা খোলাই পড়ে থাকল। ফিরলেন প্রায় দশ মিনিট বাদে। ঝাপটায় শাড়ি ভিজে গেছে। চুলও। হাঁপাচ্ছিলেন তিনি। দরজা বন্ধ করে শাড়ি পালটে মাথা মুছে শুকনো মুখে বললেন, “অদ্ভুত কাণ্ড। সারা বাড়িতে বাইরে কোথাও একটা মানুষ নেই। মাঝরাতের মত খাঁ খাঁ করছে সব। আমার গা ছমছম করছিল।'


ডলি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মমতাময়ী?’


‘তার ঘরে তালা ঝুলছে। দরজা ফাঁক করে দেখবার চেষ্টা করলুম কিন্তু কিচ্ছু দেখা গেল না!


‘আলো ছিল না ঘরে?’


‘হ্যাঁ, আলো জুলছে। তবে দরজার ফাঁক দিয়ে আর কতটুকু দেখা যাবে। তার ওপর চশমা নিয়ে যাইনি।"


উষা বললেন, ‘বাগানের দিকে চলে গেলেন না কেন? ওদিকে একটা জানলা আছে। ওটা দিয়ে ঘরের ভেতরের সব দেখা যেত।’


'তা যেত। কিন্তু তাহলে বৃষ্টির জলে নেয়ে উঠতুম। এমনিতেই, শুধু ঝাপ্টায় কি অবস্থা হয়েছে দেখলেন না?”


‘বাইরে একটাও লোক নেই?’


‘না।’


‘লাইব্রেরির দিকে গিয়েছিলেন?’


‘ভয় করছিল খুব। তবু গেছিলাম। লাইব্রেরি বন্ধ। বিরাট তালা ঝুলছে দরজায়।’


‘কি জানি কি ব্যাপার। যা শুরু হয়েছে। সত্যি সত্যি হয়তো প্রলয় হয়ে যাবে।' বলতে বলতে উষা একটা নিঃশ্বাস ফেললেন। “ও দিদি! আপনি দাঁড়িয়ে আছেন, একটা জানলা একটু ফাঁক করে দিন। সব বন্ধ থাকলে দমটা যেন কিরকম আটকে যেতে চায়।'


'নিভা নিঃশব্দে গিয়ে একাট জানলার পাল্লা টেনে ফাঁক করে দিলেন। ফিরে এসে নিজের বিছানায় বসে বললেন, ‘যদি সত্যি তাই হয়ে থাকে, মমতাময়ী যদি বেঁচে উঠে থাকে, তাহলে ওর বাড়ির লোকেরা ভীষণ অবাক হয়ে যাবে একটু থেমে পরক্ষণে নিজেই বললেন, “তা কি করে হয়? একবার মরে গিয়ে কি কেউ আবার বেঁচে ওঠে?’


ডলির হঠাৎ রাগ হয়ে গেল, রাগের চোটে উনি বিছানা ছেড়ে উঠে নিভা ও উষার সামনে এসে দাঁড়ালেন, বললেন, ‘মমতাময়ীকে নিয়ে এই কচ্লানো আমার ভাল লাগছে না। অনেকক্ষণ হয়ে গেল, আমরা কি আজ আমাদের অতীত পরস্পরকে বলব? তাহলে এক্ষুনি শুরু করতে হবে। সময় নেই।’


এক মুহূর্ত ডলির মুখের দিকে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন নিভা। তারপর তিনিও হঠাৎ রেগে গেলেন। বললেন, 'না। আমি আমার অতীত বলব না। কেন বলব?’


উষা বয়সে অন্য দুজনের চেয়ে বড়। তাই প্রায় সব ব্যাপারে তার ভূমিকা হল মধ্যস্হের। কিন্তু আজ তিনিও রেগে গেলেন। নিভার দিকে তাকালেন না। ডলির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কারও অতীত বলবার জন্য কেউ মাথার দিব্যি দেয়নি। যার ইছে হবে সে বলবে। আমি বলব। আপনি বলবেন। দিদি, আপনি শুরু করুন। বেশি ফেনাতে হবে না। দুচার কথায় বলুন। ডাক্তার যেভাবে বলল ওইভাবে।’


উষাকে সঙ্গে পাবার জন্যে ডলি ও নিভার মধ্যে একটা সূক্ষ্ম রেষারেষির ভাব আছে। আজ একেবারে অনায়াসে সেই উযাকে দলে পেয়ে স্ফুর্তিতে ডলির মনটা ভরে গেল। সারাদিন মনের ওপর যে বিষন্নতা বোঝার মত চেপে বসেছিল হঠাৎ এই স্ফুর্তির হা‌ওয়ায় তা দূর হয়ে গেল। বড্ড হালকা লাগল। শুরু করতে গিয়ে দেখলেন তার অতীত বুকের মধ্যে হালকা ডালে বসে একটা রঙিন পাখির মত ক্রমাগত দুলছে। তার মনে হল বলাটা উলটোপালটা হয়ে যাবে। তবু তিনি শুরু করে দিলেন। 'হ্যাঁ আমার বিয়ে হয় আঠারো বছর বয়সে। যাঁর সঙ্গে বিয়ে হল তার ছিল সুদের ব্যবসা। ছোটবেলায় বাবার কাছে বড্ড সুখে মানুষ হয়েছিলুম। আলালের ঘরের দুলালি। তাই এই সুদের কারবারির ঘরে এসে দুঃখে একেবারে ডুবে গেলুম। খাওয়া পরার দুঃখ না, সেসব অঢেল ছিল। সবকিছু ছিল ঝাঁকা ভর্তি। গলার হার এক ঝাঁকা। কানের দুল এককঝাঁকা, বালা একঝাঁকা, বাউটি একঝাঁকা। এছাড়া ঘড়ি, সাইকেল, রেডিও, সবই ঝাঁকা ঝাঁকা। ফলে শ্বশুরবাড়ি হয়ে উঠেছিল একটা দুর্গ। যখন তখন যেখানে খুশি যেতে পারতুম না। কাউকে হঠাৎ ঢুকতেও দেওয়া হতো না বাড়ির মধ্যে। আমার দুঃখের কারণ এই বন্দিদশা। আরও একটা কারণ ছিল। সে আমার স্বামীর চরিত্র। একনম্বর ঠক ছিলেন তিনি, জোচ্চোর। আত্মীয়স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী কাউকে ঠকাতে বাকি রাখেননি। কারও জমি ঠকিয়ে নিয়েছেন। কারও বাড়ি। অবশ্য আমার তাতে কিছু এসে যেত না। পুরুষ মানুষ রোজগারের ধান্দায় কোথায় কি করে মেয়েদের দেখার দরকার নেই। কিন্ত তিনি আমাকেও ঠকাচ্ছিলেন। বিয়ের বছর খানেকের মধ্যে আমি ওনার চরিত্রদোষের কথা টের পেলুম। জানেনই তো মেয়েরা সব কিছুর ভাগ দিতে পারে, কিন্ত স্বামীর ভাগ কাউকে দিতে পারে না। দিতে হলে কষ্টের সীমা থাকে না। আমারও ছিল না। বাধা দিয়েছি। প্রতিবাদ করেছি। প্রতিবাদ করতে গিয়ে কত যে মারধর খেয়েছি সে আর কি বলব। শেষ পর্যন্ত মেয়েমানুষে অরুচি হল তার। কিন্তু নেশা গেল না। তখন একটা নতুন বুদ্ধি ঠাওরালেন। আমার ওপর হুকুম হল যখন কাউকে সম্ভোগ করবেন তখন পাশে দাঁড়িয়ে তা দেখতে হবে। দেখতেই হবে। দেখতেই হবে। সে যে কি শাসন আপনাদের বোঝাতে পারব না।’


‘আমাকে বাঁচালেন ঈশ্বর। চল্লিশ বছর বয়সে সাপের কামড় খেয়ে উনি মারা গেলেন। আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললুম। আমার ছেলে তখন কলকাতার ডেফ অ্যাণ্ড ডাম্ব স্কুলে পড়ে। বয়েস পনেরো। ঈশ্বরের দয়ায় টাকার তো অভাব ছিল না। তাই তাকে পড়া শেষ করতে বললুম। এদিকে নোংরা ব্যবসাটা বন্ধ করে দিলুম। আমি আর ধার দিতুম না। কাগজপত্র দেখালে সুদ না নিয়ে লোকের জিনিসপত্র ফেরত দিয়ে দিতুম। তবুও ঝাঁকার জিনিস ঝাঁকাতেই পড়ে থাকল। শুধু আসল টুকু দিয়ে নেবার ক্ষমতাও দেখলুম লোকের নেই। কিন্তু সব গোলমাল হয়ে গেল ছেলে ফিরে আসতেই। একদম বাপের মত হয়ে ফিরে এল ছেলে। আবার সুদের কারবার চালু হয়ে গেল বাড়িতে। আবার নতুন নতুন জিনিসে ঝাঁকা ভর্তি হতে লাগল। আমার যেন দম বন্ধ হয়ে আসত। ছেলেকে বলতুম আমাকে কোথাও তীর্থস্থানে পাঠিয়ে দে। সে বলত,’না, তোমাকে আরও ভাল জায়গায় পাঠাব। খোঁজ করছি। শেষে এই হোম। দশ বছর হয়ে গেল। খারাপ আছি বলতে পারব না। কিন্তু আজ আমার ছেলের বিয়ে। সে বলে গিয়েছিল রেজিস্ট্রি পর গাড়ি নিয়ে সে সোজা এখানে আসবে, তাই আজ সারাদিন আপনারা আমাকে উদ্বিগ্ন দেখেছেন। বলে গিয়েও সে এল না কেন, সন্ধে থেকে এই চিন্তায় বুকটা তোলপাড় করছে আমার।’


যে জানলার পাল্লা একটু ফাঁক করা ছিল জানলাটা হঠাৎ হাওয়া লেগে পুরো খুলে গেল। জানলা খোলার শব্দে তিনজনেই ফিরে তাকালেন সেদিকে। কেউ দ্রুত উঠে গিয়ে জানলাটা বন্ধ করার চেষ্টা করলেন না। হাওয়ার সঙ্গে কিছু উড়ো জলকণা ভেসে এল ঘরের মধ্যে। জানলার নিচে মেঝের খানিকটা অংশ আগে থেকেই ভিজে ছিল। এখন আবার ভিজতে লাগল সেই জায়গাটা। ডলির দিকে তাকিয়ে উষা বললেন,

‘আপনার চিন্তা ও উদ্বেগের কোনও কারণ নেই। এতদূর এই বৃষ্টির মধ্যে আসা আজ কারও পক্ষে সম্ভব নয়। তখন থেকে দাঁড়িয়ে আছেন কেন দিদি? বসুন না এখানে।' বলে খানিকটা সরে বসে নিজের বিছানায় তাকে জায়গা করে দিলেন।


খুব অবসন্নের মত সেখানে বসে পড়লেন ডলি। বসে পড়ে বললেন, 'নিন। এবার আপনারটা শুরু করুন।

উষা বলেলন, 'হ্যা। করি। তার আগে একটা কথা বলে নিই। হঠাৎ মনে এল। একটু আগে যে বাইরে কাউকে দেখা যায়নি আমার মনে হয় তার কারণ সবাই দরজা বন্ধ করে তাদের অতীত নিয়ে বসেছে।

ছেলেটি তো রাউন্ডে বেরিয়ে সব ঘরেই যায়, তাই না?’ ডলি অবাক হয়ে বললেন, 'হ্যা। সব ঘরেই যায়।'


‘তাহলে তাই। সব ঘরে গিয়ে আজ সে সকলের অতীত জাগিয়ে দিয়ে এসেছে। ওইজন্যেই তিনি সমস্ত বাড়ি ঘুরেও কাউকে দেখতে পাননি। ঠিক আছে। আমারটা শুরু করছি। আমি অত্যন্ত রক্ষণশীল গোঁড়া পরিবারে জন্মেছিলাম। আমাদের পরিবারে মেয়েদের বাইরে বেরুবার স্বাধীনতা ছিল না। আমি ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়েছিলাম। তারপরই স্কুল ছাড়িয়ে আমাকে ঘরে বসিয়ে রাখা হয়। বাবা ছিলেন ভীষণ রাগী মানুষ। মেরেদের কোনওরকম বেচাল বরদাস্ত করতেন না। আমি স্কুলে গিয়ে আরও পড়বার জন্যে কত কান্নাকাটি করেছি, বাবা গ্রাহ্য করেননি। তাই বলে যেন মনে করবেন না তিনি আমাদের ভালবাসতেন না। আমরা চার বোন ছিলাম তার বুকের পাঁজর। একদিন আমি তীর সেই পাঁজর ভেঙে দিয়েছিলাম। সে কথায় পরে আসছি। তার আগে আমাদের পরিবারের আর একটু বিবরণ দিই। আমরা ভাইবোন ছিলাম দশজন। চার বোন ছ'ভাই।

আমি বড়। আমার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেল কিন্তু আমার পরের ভাইয়ের জন্যে বাবা বাড়িতে মাস্টার রেখে দিলেন। মা একবার এই সময়ে আমায় একটু গান-টান শেখাবার কথা বলায় বাবা রাগ করে বলেছিলেন, মেয়েকে নটী বানাতে চাও। এত রাগ করেছিলেন যে তিনদিন মায়ের সঙ্গে কথা বলেননি ভাল করে।”


“বাবার বুকের পাঁজর আমি ভেঙে দিলাম। যে ছেলেটি আমার ভাইকে পড়াত, সে আমাদের বাড়িতেই থাকত আর মেডিকেল স্কুলে পড়ত। অত কড়াকড়ির মধোও তার সঙ্গে আমার কি করে ভালবাসা হল এখন আর সেসব আমার মনে নেই। একদিন

তার সঙ্গে আমি পালিয়ে গেলাম। এত সাহস কোথায় পেয়েছিলাম কে জানে। কালীঘাটে গিয়ে বিয়ে করলাম আমরা আর বাড়ি থেকে অল্প দূরে ঘর ভাড়া নিয়ে বাস করতে লাগলাম। বাবার পক্ষে এটা যে কী সাংঘাতিক তখন বুঝিনি কিন্তু এখন চোখ বুজলেই বাবা কষ্ট যেন স্পষ্ট দেখতে পাই। বাবা কিন্তু কিচ্ছু করেননি। তার যে উষা নামে একটি মেয়ে ছিল এটা নিজেও ভুলেছিলেন, বাড়ির সবাইকেও ভুলে যেতে বাধ্য করেছিলেন। আমার স্বামী চেম্বার খুলে ব্যবসা শুরু করলেন। গ্রাম থেকে একমাত্র মাকে নিয়ে এলেন। আমার একটি ছেলে জন্মাল। আর এই সময় মাত্র একদিনের জ্বরে হঠাৎ মারা গেলেন তিনি।"


'একটা দৃশ্য আমার ভীষণ মনে আছে। আমার বাপের বাড়ি ছিল একটা লম্বা গলির মধ্যে। রকঅলা দোতলা বাড়ি। গলিটা আমাদের বাড়ির কাছে ভানদিকে সামান্য বাক নেওয়ায় অনেকদূর থেকে দেখা যেত বাড়িটাকে। একদিন সন্ধ্যেবেলা ছেলে কোলে নিয়ে একবস্ত্রে আমি গলিটার মধ্যে ঢুকে দেখলুম বাইরের রকে বসে বাবা আমার দিকেই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। আমার চুল কাটা। গায়ে বিধবার থান। গলা ও হাত খালি। ভাল করে দেখবার জন্যে চোখ থেকে চশমা খুলে বাবা চশমা মুছলেন। তিনি বসেছিলেন, আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াচ্ছেন।' একটা নিঃশ্বাস ফেললেন উষা। নিজেও চোখ থেকে চশমা খুলে খোলা জানলা দিয়ে বাইরের অন্ধকার ও বৃষ্টিপাতের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'এই দৃশাটাকে আমি কিছুতেই ভুলতে পারি না।'


“পরবর্তী ইতিহাস খুবই সাধারণ। বৈচিত্র্যহীন। আমার ছেলে বড় হল। লেখাপড়া শিখল এবং চাকরি পেয়ে গেল একটা। চাকরি পেয়েই সে আমাকে নিয়ে মামাবাড়ি ছেড়ে ভাড়াবাড়িতে উঠে এল। ততদিনে আমার বাবা মারা গেছেন। ছেলের বিয়ে দিলাম আমি। চাকরি করা মেয়ে। ফলে অল্পদিনেই ভাড়াবাড়ি ছেড়ে নিজের বাড়িতে উঠে গেলাম আমরা। আমার সুখের আর অস্ত থাকল না। কিন্তু আবার সঙ্কটও দেখা দিল ঠিক এই সময়ে। এখন নাতি-নাতনিরা বড় হয়েছে। স্কুল ছেড়ে তাই কলেজে ঢুকেছে। নিজেদের মধ্যে গটগট করে সমসময় ইংরেজি বলছে। রেকর্ডে ইংরেজি গান চালিয়ে দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে হাত ধরে, কোমর ধরে নাচছে। এই আমার সঙ্কট। ওদের দেখি আর আমার নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। এই জীবনধারা আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। একদিন দেখলাম আমার বড় নাতনি তার কলেজের এক বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাচ্ছে। আর থাকতে পারলুম না। ছেলেকে গিয়ে বললাম সব।



সে বিরক্ত হয়ে বলল, “মা, তোমাকে এসব দেখতে কে বলেছে? ওদেরকে ওদের মত থাকতে দাও।' আমি" অবাক। আমার বাবা বলতেন, আমার মত থাক। আর আমার নাতি-নাতনির বাবা বলছে, ওরা ওদের মত থাকুক। তখুনি আমার মনে হল আমার শেকড় আলগা হয়ে গেছে। এখানে আর নয়। ছেলেকে বললুম, তবে দে বাবা, আমাকে কোনও তীর্থহথানে পাঠিয়ে দে। সে নির্বিকার গলায় বলল, “চলে যাবে? ঠিক আছে, যেতে চাও যাবে। তবে তীর্থেটির্থে নয়। সে বড় নোংরা জায়গা। আমি তোমাকে ভাল জায়গায় রাখব।” সেই থেকে আজ দশবছর এখানে আছি। আপনাদের সঙ্গে। তীর্থ নোংরা কিনা জানি না, তবে এ জায়াগাটা ভাল। এখানে নিজের জীবন নিয়ে বেশ নিরিবিলিতে থাকা যায়। দশ বছর ছিলামও। শুধু কাল থেকে শুরু হওয়া এই প্রলয়ঙ্কর বৃষ্টি আর আজ একুট আগে আসা ছোকরা ডাক্তার হরনাথ ঘোষের কথাবার্তা কেমন যেন এলোমেলো করে দিল সবকিছু। হঠাৎ মমতাময়ীর বেঁচে ওঠাটাও যেন কিরকম। ভাবলেই বুকের ভেতরটা ফাকা হয়ে যায়। দিদি, ভেতরটা যদি দেখাতে পারতাম, বুঝতেন দিনরাত হু হু করছে সেখানে। আলগা হয়েই তো ছিলাম। সেই কতকাল থেকে আলগা হয়ে আছি। এবার বোধ হয় বোঁটা থেকে খসে যাবারও সময় হল।” উষার চোখ দুটি অকারণ কান্নার জলে ছলছল করে উঠল। তিনি কীদলেন, কিন্তু তার মুখের একটি রেখাও কুঞ্চিত হল না। শুধু তার উঁচু হনু এবং ভাঙা গাল বেয়ে টসটস করে ক' ফৌটা জল গড়িয়ে পড়ল।


উষা থামতেই নিভা হঠাৎ বলে উঠলেন, 'আমিও আমার অতীত বলব। যদিও জানি না কেন বলছি। সময় বেশি নেই। তাই সংক্ষেপ করব আমি। আপনি বোধ হয় ঠিক বলেছেন দিদি এই বৃষ্টি আর ডাক্তার আজ সব ওলটপালট করে দিয়েছে। আমি বিধবা নই। আমার স্বামী আছে। সে অন্য কোথাও অন্য কোনও মেয়েমানুষ নিয়ে থাকে। থাকে মানে ছিল। বেঁচে থাকলে এখন তার বয়েস সন্তর। আমি জানি না সে বেচে আছে কি মরে গেছে। তার সঙ্গে আমার কোনও ডিভোর্সের মামলা হয়নি। সে জাস্ট একদিন আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল।’


‘সারাজীবন মেয়েদের যারা নিয়ন্ত্রণ করে আপনাদের গল্পে তাদের তিনজনের কথা আছে। বাবা, ছেলে ও স্বামী। একজনের কথা নেই। সে হল প্রেমিক। আমার জীবনের গল্পে আমি সেই প্রেমিক পুরুষের কথা বলব।’


‘আমি বাবার এক মেয়ে। ছোটবেলায় অপরিমিত স্বাধীনতা আর আদর পেয়েছি আমি। কিন্তু নষ্ট হয়ে যাইনি। এক চালে বি এ পাস করেছিলুম। বাবা আমাকে এম এ পড়াতেও এ্য়েছিলেন। কিন্তু আমার আর পড়তে ভাল লাগেনি। বাবা এই সময় কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে আমার বিয়ে দিলেন। বাবা লিখেছিলেন, আমার এক মেয়ে। ঘরজামাই থাকতে ইচ্ছুক এমন শিক্ষিত সুদর্শন পাত্র যোগাযোগ করুন।'


‘বিয়ে হয়ে গেল আমার। ভাল ছেলে। এম এ পাস। কলেজে অধ্যাপনা করে। বছর খানেকের মধ্যে আমার একটা মেয়েও হয়ে গেল। খুবই সুখের সংসার। আর তখনই দেখা দিল আকাশে কালো মেঘ। বাবা মা একসঙ্গে মোটর অ্যাকসিডেন্টে মারা গেলেন। হাজারিবাগ থেকে ফিরছিলেন। একটা ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সঙ্ঘর্ষে ইনস্ট্যান্ট ডেথ্‌ মানে সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু। বাবা মরে যাবার বছর খানেকের মধ্যে আমাদের সম্পর্কে ভাঙন ধরল। দেখলুম লোকটা আমাকে আর সহ্য করতে পারছে না। ঠিক এই সময় আমার মেয়েকে কার্শিয়াং-এর এক মিশনারি আবাসিক স্কুলে ভর্তি করে দিই। আমার বাবা আমার জন্যে অগাধ সম্পত্তি রেখে গিয়েছিলেন। সারাজীবন দুজনে বসে খেলেও তা ফুরোত না। আমার স্বামী বিয়ের আগে থেকেই চাকরি করে। মেয়েকে স্কুলে পাঠিয়ে এবার আমিও একটা চাকরি নিয়ে নিলাম। সারাদিন ঘরে বসে কি করব? তাই চাকরি। আর সেখানেই দেখা হল আমার প্রেমিকের সঙ্গে। আমার চেয়ে বছর দুয়েকের ছোট। খুব হ্যান্ডসাম দেখতে। দিন দুয়েকের মধ্যে সে আমার পুরো দখল নিয়ে নিল। আমরা ছুটির পর প্রতিদিনই অল্পস্বল্প আড্ডা দিতে লাগলাম। কোনওদিন সিনেমা দেখি, কোনওদিন থিয়েটার, কোনওদিন শুধুই ঘুরে বেড়াই। বুঝতেই পারছেন ব্যাপারটা আমার স্বামীর দৃষ্টি এড়াল না। তার সঙ্গে ভাঙন আমার আগেই ধরেছিল। এখন ব্যাপারটা চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছল। কিন্তু যেহেতু সমস্ত সম্পত্তির মালিক আমি সে আমাকে মাথা নিচু করে মেনে নিতে বাধ্য হল।’


'আমার প্রেমিক অবিবাহিত। সে দাদা-বউদির সঙ্গে এক ফ্ল্যাটে থাকত। তাই কোনওদিন আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে যেতে পারেনি। আমিও তাকে কোনওদিন বাড়িতে আনিনি। এখন একদিন হল কি তার দাদা-বউদি কোথায় যেন একদিনের জন্য বেড়াতে গেল। সেদিন ছিল শনিবার। অফিস থেকে বেরিয়ে সে জেদ ধরল তার ফ্ল্যাটে যেতে হবে। অন্যদিন হলে কি হত বলা যায় না কিন্তু সেই শনিবার ছিল আমাদের বিবাহবার্ষিকী। আমি রাজি হলুম না। স্বামীর সঙ্গে গোলমালের শুরুতেই আমরা কিছু আচরণবিধি তৈরি করেছিলাম। যেমন রোববার আমরা বাইরে কোনও কাজ রাখব না। সেদিন আমরা সারাদিন একসঙ্গে কাটাব। রোববার ছাড়া একসঙ্গে ‘কাটাবার আর দিনগুলো হল আমাদের দুজনের জন্মদিন, মেয়ের জন্মদিন, বাবা-মায়ের মৃত্যুদিন আর আমাদের বিবাহবার্ষিকী। ফলে আমি কিছুতেই গেলুম না। আমার প্রেমিক অসম্ভব রেগে গিয়ে বলল, এই আমাদের সম্পর্কের শেষ। কাল থেকে সে আমার মুখ দেখবে না।


ইতিমধ্যে আমার স্বামী তলায় তলায় গোপনে একটি মেয়েমানুষ সংগ্রহ করে নিয়েছে। আমি আমার নিজের প্রেমে এত মত্ত ছিলুম যে একটুও টের পাইনি। সেই রাত্রে টের পেলুম। বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে আমাদের চার পাঁচজন বিশিষ্ট পারিবারিক বন্ধুকে নেমন্তন্ন করেছিলুম। সকলেই এল। কিন্তু আমার স্বামী এল না। সবাই অপেক্ষা করল। তারপর খাওয়া-দাওয়া করে চলে গেল। সেই নিমন্ত্রিতদের মধ্যে একজন, একটি বউ যাবার আগে আমাকে একপাশে ডেকে নিয়ে, বলে গেল, পুরুষমানুষকে বেশি বিশ্বাস করতে নেই। ঠকতে হয়।'


‘তাঁর সঙ্গে আমার পুরুষ মানুষটি নিয়ে আমি কোনও আলোচনা করলুম না। কিন্ত আমার বুঝতে বাকি থাকল না সে কি বলতে চাইছে। ভয়ঙ্কর রাগ হয়ে গেল আমার। মনের মধ্যে প্রেমিককে ফিরিয়ে দেবার জন্যে একটু দুঃখবোধ ছিলই। সবাই চলে যেতে নতুন করে আবার তার কথা মনে পড়ল। রাত বেশি হয়নি। সাড়ে দশটা। আমি ঠিক করলাম একটা ট্যাক্সি নিয়ে আমি আমার প্রেমিকের ফ্লাটে যাব। এতক্ষণে নিশ্চয় আড্ডা-ফাড্ডা মেরে সে ফ্ল্যাটে ফিরে এসেছে।’


‘নিচে নেমেই ট্যাক্সি পেয়ে গেলাম। আমি তখন দুটি সত্তায় ভাগ হয়ে গেছি। একটি সত্তা স্বামীর প্রতি আক্রোশে দিশেহারা, অন্যটি প্রেমিকের সঙ্গে মিলিত হবার জন্যে আকুল। হাঁফাতে হাঁফাতে ওপরে উঠে তার ফ্ল্যাটে কড়া নাড়তে সে দরজা খুলে আমাকে দেখে ভীষণ অপ্রস্তত। বলল, ‘তুমি!’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ এলুম। যা ভয় দেখালে তখন। তৎক্ষণাৎ ভেতর থেকে একটি মেয়ের গলা ভেসে এল, এই, কে? কার সঙ্গে কথা বলছ? প্রেমিকটি ঢোক গিলে বলল, আমার কোলিগ্‌। একসঙ্গে চাকরি করি। ভদ্রমহিলার স্বামী এখনও ফেরেনি। তাই খোঁজ নিতে এসেছে। ভেতর থেকে ব্যস্ত গলা বলল, কাল সকালে আসতে বল। এখন তুমি কোথায় যাবে, চলে এস।’


ব্যাপারটা কি হল নিশ্চয়ই আপনারা ধরতে পেরেছেন। তবু আমি বলে দিই। আমার প্রেমিক আমাকে না পেয়ে আর একটি মেয়ে সংগ্রহ করে নিয়েছিল। সে একসঙ্গে দু তিনটে মেয়ের সঙ্গে প্রেম করত। কাজেই কোনও অসুবিধে হয়নি। শুধু হঠাৎ আমাকে দেখে ভীষণ বেকায়দায় পড়ে গিয়েছিল। একটা জিনিস আমি কোনওদিন ভুলতে পারব না। সে যে চট করে মেয়েটিকে বানিয়ে একটা মিথ্যে কথা বলেছিল সেটা কিন্তু আদপেই মিথ্যে ছিল না। সত্যিই তো আমার স্বামী বাড়ি ফেরেনি। কি করে এমন একটা অদ্ভুত মিথ্যে সে বলল কে জানে।’
 

'আমি বোধ হয় সংক্ষেপে বলব বলে সবচেয়ে বেশি সময় নিলাম। এখুনি ঘণ্টা পড়বে। আর দু’ চার কথায় শেষ করে দিই। এখানে কিন্তু আমাকে কেউ পাঠায়নি। আমি নিজে এসেছি। আমার স্বামী আর ফেরেনি। আমার মেয়ে বড় হয়ে যেতে তার বিয়ে দিলাম। তারা ভালোই আছে। আমার চাকরি শেষ হতে আমি যোগাযোগ করে এখানে চলে এলাম। কারও দয়ার ওপর আমি থাকি না। আমার চাকরির টাকাই এত যে আরও কুড়ি বছর বাচলেও তা ফুরোবে না। তার বেশি যদি বাঁচি তাতেও…’ 

বাক্য শেষ করতে পারলেন না নিভা। তার আগেই বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে ভীষণ জোরে ঘণ্টা বেজে উঠল। বাজতেই থাকল। গোটা বাড়ি জেগে উঠল সেই শব্দে। তিনতলা এই বিশাল বাড়ির সব ঘরের দরজা খুলে যেতে লাগল। বৃষ্টির ছাঁট অগ্রাহ্য করে সবাই বেরিয়ে এল বারান্দায়। আর তখন হঠাৎ গাঁক গাঁক করে বেজে উঠল মাইক। 'একটি জরুরি ঘোষণা। মনযোগ দিয়ে শুনুন। জরুরি ঘোষণা। মমতাময়ী বেঁচে উঠেছিলেন কিন্তু একটু আগে তিনি আবার মারা গেছেন। এইমাত্র তার বাড়ির লোকেরা এসে ডেডবডি নিয়ে চলে গেল। অতএব ভিডিও রুমে আজ যে মিটিং হবার কথা ছিল তা হবে না। ইয়েস, একটা প্রশ্ন উঠতে পারে মিটিং যখন হবে না তখন ঘণ্টা কেন বাজানো হল। শুনুন, নটার সময় এ বাড়িতে এই ঘণ্টা রোজ বাজে। আপনাদের মনে করিয়ে দিই এটাই হল খাবার ঘণ্টা। ডিনার। ভিডিওরুমে নয়, আপনারা সকলে ডাইনিং হলে চলে যান। একসঙ্গে যাবেন না। দু ভাগে। প্রথমে পুরুষ, তারপর মহিলারা। ধন্যবাদ। যারা ডাইনিং হলে যাচ্ছেন না, তারা ঘরে চলে যান। বাইরে থাকবেন না। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় এক মুহূর্তের জন্যে বাইরে থাকাও বিপজ্জনক। ইয়েস বিপজ্জনক ।’ 

সমস্ত বাড়িতে একটা গুঞ্জন উঠল। গুঞ্জন না, প্রায় কোলাহল। কিন্তু বৃষ্টির শব্দে সেই কোলাহলের কিছুই শোনা গেল না। বিরক্ত হয়ে তিন বুড়ি যখন ঘরে ঢুকতে যাবেন, দেখতে পেলেন একটু দূরে ফুলের টবের পাশে দাঁড়িয়ে ডাক্তার হরনাথ ঘোষ ভিজছে। তিনজনেই ভারি অবাক হয়ে গেলেন। বার দুয়েক ইয়েস শুনে বোঝা গিয়েছিল মাইকে যিনি বলছেন তিনি হরনাথ ডাক্তার। কিন্তু তাহলে এত দ্রুত লোকটা তিনতলায় উঠে আসে কি করে? 'এই যে, ডাক্তারবাবু!' বলে চেঁচিয়ে নিভা ডাকলেন তাকে। আগাপাশতলা ভেজা জামাকাপড় নিয়ে ডাক্তার কাছে আসতে নিভা বললেন, ‘মাইকে কে অ্যানাউন্স করছিল মশাই? আপনি না?’


‘ইয়েস। আমি’


‘তাহলে এর মধ্যেই এখানে চলে এলেন কি করে?’
 

'এখন আসিনি তো। অনেকক্ষণ এসেছি। ওটা টেপ বাজল। সন্ধেবেলা টেপ করে দিয়ে তবে তো রাউন্ডে বেরুলুম।' হাসল ডাক্তার। ‘এখানে দাঁড়িয়ে ছিলুম ওপর থেকে নিজের গলাটা শুনব বলে।'


নিভা অবাক। ‘টেপ আপনি সন্ধেবেলা করেছেন? রাউন্ডে বেরুবার আগে?’


‘ইয়েস।'


'তাহলে যে আমাদের বললেন মমতাময়ী বেঁচে উঠেছেন, তার মানে…’
 

ডাক্তার হো হো করে হেসে উঠে বলল, 'ইয়েস। সব মিথ্যে। মমতাময়ীকে বাঁচিয়ে না তুললে কি আর এভাবে আপনারা আপনাদের আমূল জানতে পারতেন দিদিমা। মিথ্যে বলেছিলুম। দিনরাত অবিরাম বৃষ্টির সম্মোহন সেই মিথ্যেকে সত্যি করে তুলেছিল। আর তারই ফলে আজ এত বছর বাদে আপনারা মহাভারত থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেন।' এক টিপ নস্যি নাকে গুজে দিয়ে ডাক্তার বলল, 'ইয়েস, মহাভারত থেকে।'

 
 



                                                                              





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন