রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২০

ভাগীরথ মিশ্রে'র গল্প: অগ্নিরমণী




 



মোরগটা পথের কিনারে পড়েই রয়েছে। রক্তে ভেসে গেছে মউলতলায় রুখা কাঁকুরে জমিন।

এমনিতে নিথর হয়ে রয়েছে শরীরটা, তবে খুঁটিয়ে নিরীখ করে মদন মুর্মু বুঝতে পারে, বুকের কাছটায় সামান্য ধুকপুক করছে। দেখেশুনে চন্দন মাহাতোর বাড়ির দিকে দৌড় দেয় মদন মুর্মু।
 
কাঁকন বসে ছিল উঠোনের মধ্যিখানে। একদৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। তাকিয়ে ছিল, কিন্তু মদনের মনে হল, কিছুই দেখছে না সে। কেবলই শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। বাস্তবিক, মদন বুঝতেই পারে না, দিনের বেলায় আকাশে অত দেখবার মতো কীই-বা আছে! চাঁদ নেই, তারা নেই...। মদনের মুখে খবরটা শুনে খুব একটা যে আঁতকে-চমকে উঠল কাঁকন, তা নয়। কেবল,তার শরীরটা পলকের তরে কেঁপে উঠল।
 
ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল কাঁকন।
 
বারো বছরের সুফল, একমাত্র ছেলে ওদের, এখনও কুঠরির মধ্যে পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছে। তাকে আর জাগায় না কাঁকন। মদনের পিছু পিছু একবারে পুতুলের মতো হেঁটে চলে। যেন মদন ওকে কী এক আশ্চর্য জিনিস দেখাতে নিয়ে চলেছে নির্জন কোনও থানে, যেমনটা সেই ছেলেবেলায় ওকে নিয়ে রোজদিনই যেত চন্দন, কালীবাঁধের পাড়ে! ওখানেই তো ওই আশ্চর্য অনুভুতির ফাঁদে পড়ে গেল একদিন। চন্দন মাহাতোর ঘরে চলে এল সে। সেখানে বাৎসরাধিক কাল চাষবাস করল কাঁকনরা দুটিতে। জমি চষল, বীজ পুঁতল, জল ঢালল...তারই ফসল আজকের সুফল।
 
কাঁকন দূর থেকে দেখতে পায়, মউল গাছের তলায় একটা গোলাকার জমায়েত। সাধারণত শীতের মরসুমে মুরগি-লড়াইয়ের থানেই এমন গোলাকার ভিড়টা হয়। একদল উত্তেজিত মানুষকে দিয়ে তৈরি একটি বৃত্ত। বৃত্তের মধ্যে চারটি মাত্র প্রাণী। একজোড়া যন্ত্র, একজোড়া যন্ত্রী। একজোড়া মরণান্তিক লড়াইয়ে মেতেছে মধ্যবৃত্তে, অপর জোড়াটি পরিচালনা করছে সেই লড়াই। আর, বৃত্ত-মানবেরা দুটি অবোধ প্রাণীকে যে-যার মতো সমর্থন দিয়ে চলেছে । কেবল সমর্থনই নয়, অবোধ প্রাণীদুটিকে নানা প্রকারে মরবার কিংবা মারবার জন্য উত্তেজিত করে চলেছে। অবোধ প্রাণীদুটিও তেমনি! কেন যে একে-অপরের ওপর ছোরাশুদ্ধু পা’ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে বারংবার! কীসের যে অত আক্রোশ! আক্রোশ কিছুই নেই। কাঁকন জানে। তবে তাকে আশৈশব শেখানো হয়েছে, পায়ে শানিত ছোরাটি বেঁধে দেওয়ামাত্র তাকে অপরপক্ষটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। যেকোনও গতিকে ওকে বধ করতেই হবে। নচেৎ ও তাকেই মেরে ফেলবে। কিনা, মনে রাখিস, উয়ার পায়েও অনুরূপ শানিত ছোরা। বাস্তবিক, কেমন করে অবোধ প্রাণীদুটোর কলিজার মধ্যে ওর মনিব-মানুষদুটো ঢুকিয়ে দিতে পেরেছে এমনতরো বিশ্বাস, কিনা, তুই যদি ওকে না বিঁধিস, তবে ও-ই তোর কলিজাটা এফোঁড় ওফোঁড় করে দেবে, এটা কাঁকনের কাছে চিরকালই এক দুর্জ্ঞেয় রহস্য!
 
শনের মতো সাদা চুল দেখে কাঁকন বুঝে ফেলে, দশরথদাদুও ওই জমায়েতে হাজির। দশরথ মাহাতো। গাঁয়ের সবচেয়ে প্রবীণ মানুষটি, চিরটাকাল সবাইয়ের ভালোর জন্য হামলে পড়ে। পায়ের গোছে কোনওরূপ অস্থিরতা প্রকাশ করে না কাঁকন। চোখেমুখেও ফোটায় না তিলমাত্র ভেঙে পড়বার অভিব্যক্তি। সে ধীরপায়ে এগিয়ে চলে অকুস্থলের দিকে, যেন এমন একটা কিছু ঘটেছে, যার সঙ্গে কাঁকনের সামান্যই সম্পর্ক। অথবা কোনও সম্পর্কই নেই। যেন কেশব মাহাতোদের গিরিবাঁধে জাল পড়েছে। মাছ যা উঠবে, বেবাক নিয়ে যাবে কেশবই, তাও উৎসুক পথচারীরা নিজেদের কাজ কামাই করেও দাঁড়িয়ে পড়ে, স্রেফ কৌতুহলবশত দেখেছে, কিনা, কী কী মাছ জালে ওঠে, দেখি!
 
বৃত্তের মধ্যস্থ নিথর মোরগটিকে বড় নিমগ্ন হয়ে পর্যবেক্ষণ করছিল জমায়েত। তৎসহ মৃদু মন্তব্য, মোরগটা যে মরবেই, সেটা নাকি জানা ছিল ওদের অধিকাংশেরই। কেবল স্থান-কাল-তিথি-নক্ষত্রটাই জানা ছিল না। অর্থাৎ কিনা,ঠিক কবে, কোন্ গাঁয়ের কোন্ মউল গাছটার তলায় লুটিয়ে থাকবে ওর দশাসই শরীরটা, সেটাই অজানা ছিল, মুঢ়াবনি গাঁয়ের মানুষের।
 
কোন্ একজন বিলাতি সাধু নাকি সাগরের কিনারে গিয়ে দাঁড়ানোমাত্তর সাগরের জল দু’দিকে সরে গিয়ে সাধুর জন্য পথ বানিয়ে দিত। কাঁকন ইস্কুলে পড়বার সময় কোনও এক মাস্টারের মুখেই শুনেছিল কথাটা। এতদিন বাদে ওটা সত্য হয়ে উঠল কাঁকনের ক্ষেত্রেই। ও কাছটিতে পৌঁছানোমাত্র কুতুহলী জমায়েত ঠিক সাগরের জলের মতোই দু’দিকে সরে গিয়ে পথ করে দেবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠল। কারণ, নিথর মোরগটার ওপর তার মনিবের অধিকার, আর, এই মুহুর্তে কাঁকনই সর্বার্থে ওটার মনিব।
 
খুব স্থলিত চরণে বৃত্তের মধ্যে সেঁধাল কাঁকন। আর, চারপাশের জমায়েত, যারা দুরুদুরু বক্ষে একটা বিস্ফোরণের অপেক্ষায় ক্ষণ গুণছিল এতক্ষণ, আশঙ্কায় কাঁটা হয়ে যাচ্ছিল, কিনা, মোরগটিকে এমন সহায়-সম্বলহীন হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় ভূমিশয্যায় লুটিয়ে থাকতে দেখে, কাঁকন না-জানি কী-না করে বসে! লাশটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে চিল-চিচকার জুড়বে, নাকি নিজের বুকটাকে ধামসা বানিয়ে নিজেই বাজাতে থাকবে ওটা, নাকি গভীর আক্ষেপে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়বে বৃত্তের মধ্যস্থ কাঁকুরে জমিনে, খোদায় মালুম! বস্তুত,তখন থেকে এটাই ভেবে ভেবে কাঁটা হয়ে ছিল জমায়েত, কিনা, কাঁকনকে শান্ত করতে, তাকে সমে ফেরাতে, কতই-না কাঠখড় পোহাতে হয় ওদের! কিন্তু কাঁকন খুব অবসন্ন চরণে যখন ঢুকল বৃত্তের মধ্যে, লাশের পাশটিতে গিয়ে ধীরেসুস্থে বসল, যখন ওর চোখদুটি খুব অলসভাবে খুঁজে বেড়াতে লাগল শরীরের ঠিক কোথায় গহ্বরটা তৈরি হওয়ার কারণেই একটা জলজ্যান্ত প্রাণী লাশ হয়ে গেল, উপস্থিত জমায়েত তাই দেখে বড়ই হতাশ হয়েছিল। তাদের এতক্ষণের এত প্রস্তুতি, সবই বৃথায় গিয়েছিল। হতাশার পাশাপাশি খুব অবাক মেনেছিল ভুক্তভোগীর দল, কিনা, এমন ক্ষেত্রে তো কাঁকনের কাটা পাঁঠার মতো আছাড়ি পিছাড়ি খাওয়ার কথা। সেটাই তো সবদিক থেকে সঙ্গত। মেয়েটা অতখানি নিরাসক্ত থাকতে পারছে কী করে!
 
অবশেষে বৃদ্ধ দশরথ মাহাতোই জমায়েতের যাবতীয় বিস্ময়কে মান্যতা দিয়েও সর্বোচ্চ আদালতের ঢংয়ে রায় দেয়, অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর।
 
কুঠরি-ঘরে ঘুমিয়ে থাকা সুফলকে ইচ্ছে করেই ডাকেনি কাঁকন। এই কুরচি ফুলের মতো স্নিগ্ধ পবিত্র সকালে অবোধ বাচ্চাটার মনে দুষণ ঘটিয়ে লাভ কি! তাতে করে মানুষটা তো আর ফিরে আসবে না! কিন্তু সহসা সামনে তাকিয়ে নজর করে দেখে কাঁকন, ছেইলাটার কখন জানি লিদ ভেঙেছে, কখন জানি উঠে বসেছে, কখন জানি হাওয়ায় পেয়ে গিয়েছে সর্বনাশের গন্ধ, কারোর অনুমতির তোয়াক্কা না করে চলে এসেছে অকুস্থালে। আর, ইস্কুলে পড়া ওই বিলাতি সাধুর মতোই, ওর আগমনের সঙ্গে সঙ্গেও জমায়েত দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পথ করে দিয়েছে ভেতরে ঢোকার। ফলত, সুফল দাঁড়িয়েছে বৃত্তের এক্কেবারে সামনের সারিতে, কাঁকনের থেকে দু’চার বিঘৎ তফাতে। এবং কাঁকন বিস্ময় রাখবার জায়গা পায় না, যখন দেখে, বাচ্চাটার চোখে, মুখে, ভুরুতে, ললাটে কোথাও নেই ওথলানো দুধের মতো পিতৃবিয়োগের বেদনা। কেমন যেন সব অনুভুতি বিবশ হয়ে গিয়েছে ওর। কিংবা মায়ের মতো হয়তো-বা সেও জানত, কোনও একদিন এই তল্লাটের কোনও এক মউলতলায় পড়ে থাকবে অসহায় কেন্নোর মতো তার বাপ। সে হয়তো কাঁকনেরও ঢের আগে থেকেই মানসিকভাবে প্রস্তত হচ্ছিল সেইমতো। বাস্তবিক, ছেলেটা এই বয়েসে যে পরিমাণ বুদ্ধি ও বিবেচনা দেখায় পদে পদে, কাঁকন তো বিস্ময় রাখবার জায়গা পায় না।
 
একসময় কাঁকন মানুষটির ঠিক বুকের ওপর আলতোভাবে ডান হাতটিকে থাপনা করে। অভিজ্ঞ কবিরাজের মতো চোখ বুঁজে পরখ করে, ওর শরীরস্থ প্রাণের অস্তিত্বটুকুকে খুঁজে বেড়ায়। সম্ভবত পেয়েও যায়। বৃদ্ধ দশরথ মাহাতো অবশ্য তার ঢের আগেই সাদাচোখে বুঝে ফেলেছে, শরীরে তখনও অবধি ধুকপুক করছে প্রাণবায়ু।
 
বেলা বেড়ে যাচ্ছে ঝাঁ-ঝাঁ করে। ব্যয় করবার মতো অধিক সময় নেই গ্রামবাসির হাতে। এখনও যদি খাতড়ার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া যায়, ওখানে থেকে এম্বুলেন্সে বাঁকুড়া, বেঁচে গেলেও যেতে পারে। গ্রাম অবধি পাঁজাকোলা করেই নিয়ে যাওয়া চলে। ওখান থেকে দশরথ মাহাতোর গরুর গাড়িতে চড়িয়ে খাতড়া। সেখান থেকে বাঁকুড়া হাসপাতাল। কিন্তু জনাকয় ছোকরা ওই উদ্দেশ্যে দু’পা মতো এগোতেই হাত তুলে সবাইকে থামায় কাঁকন। চিলতে কাগজটা খুব বিবশ হাতে এগিয়ে দেয় দশরথ-দাদুর দিকে।

জমায়েত আগেই দেখেছে কাগজখানা। কিন্তু ওই নিয়ে বড় একটা উৎসাহ দেখায়নি। কারণ, তারা তো বিলক্ষণ জানে, কী লেখা রয়েছে ওই একচিলতে কাগজে! ‘বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি’ গোছের কিছু লেখা থাকবে, এক্ষেত্রেঙ্গ অধিকাংশ লাশের পাশটিতে যেমনটা পড়ে থাকে ইদানিং।
 
কাঁপা কাঁপা হাতে কাগজটা নেয় দশরথ মাহাতো। পড়ে। সবাইয়ের দিকে ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে তাকায়। তারপর দ্বিতীয় কিস্তি রায় ঘোষণা করে, উয়্যার শরীরটাকে ছুঁআ যাব্যেক নাই। যেজন ছুঁব্যেক—

দশরথ মাহাতো বাকিটুকু উচ্চারণ করবার প্রয়োজনই বোধ করে না। কারণ, ততক্ষণে ছোঁয়ার পরিণতিটা কী হতে পারে, সেটা ষোলআনা মুর্ত হয়ে উঠেছে উপস্থিত জনতার চোখেমুখে। ফলত, জমায়েতে উপস্থিত জনা-পঞ্চাশেক মানুষ নিমিষের মধ্যে স্থাবির হয়ে যায়। যেন এক-একটি কাঠপুতুলি। অথচ তখনো অবধি খুব নিচু লয়ে শ্বাস পড়ছে চন্দন মাহাতোর বুকের কাছাকাছি এলাকায়।
 
দশরথ মাহাতোর রায়টাকে মগজের মধ্যে থিতু করতে খানিক বেগ পেতে হয় জনতাকে। ছুঁআ যাব্যেক নাই, কথাটার মানে কি? লাশটা এখানেই পড়ে থাকবে? চিরকাল? এই মউল গাছের তলায়? তিলতিল পচতে থাকবে, কিংবা তার আগেই মুঢ়াবনির জঙ্গলের কিনারে অবস্থিত শিমুল গাছের চুড়ো থেকে শকুনের দল এবং জঙ্গলের ভেতর থেকে গন্ধে গন্ধে ধেয়ে আসা শেয়াল-হুঁড়ারদের ভক্ষ্য হবে সে! এটাই হুকুমদাতার মনোগত বাসনা?
 
দুপুরের খানিক আগেই পৌঁছে গেল সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী। ততক্ষণে এতগুলো মানুষের চোখের সুমুখে চন্দন মাহাতো ষোলআনা লাশ হয়ে গিয়েছে। বুকের ধুকপুকানিটা একসময় থেমে গিয়েছে কাঁকনসহ এক-গাঁ মানুষের চোখের সামনে। কাঁকুরে জমিনের ওপর জমে থাকা রক্তস্রোত এতক্ষণে কালচে বর্ণ ধারণ করেছে। আর, চারপাশ থেকে গুটিপায়ে হাজির হয়েছে একরাশ ডেঁয়ো পিঁপড়ে। রক্তের মধ্যে হাঁটাহাঁটি জুড়েছে ওরা। সহসা তারা বুঝি অতি মহার্ঘ কোনও ভোজের খবর পেয়ে গিয়েছে।
 
একসময় লাশটাকে নিজেদের গাড়িতে তুলে নেয় পুলিশ বাহিনী। ধীরগতিতে এগোতে থাকে খাতড়ার দিকে। গোটা বৃত্তটি ততক্ষণে ভেঙে খান খান হয়ে একদল চলমান মানুষের রূপ নিয়েছে। সূর্য’র হুকুমে যেমন শোভাযাত্রা করে তাদের মাঝে মাঝেই হাঁটতে হয় এক-একটা অজানা-কারণের মিছিলে।
 
একসময় পুলিশের অফিসার গাড়িতে তুলে নেয় কাঁকন, সুফল আর দশরথ মাহাতোকে। বাকি মানুষগুলো গাড়ির পিছু পিছু হাটতে থাকে। ততক্ষণে যাদের বুকে আশঙ্কা জমেছে, কিনা, শবযাত্রায় যারা শামিল হয়েছিল, তাদের নামধাম হয়তো-বা বিকেলের আগেই পোঁছে যাবে সূর্য’র কাছে। সহমর্মিতার পরিণামটা কী হতে পারে, সেটা আন্দাজ করেই কিছু মানুষ একটু একটু করে পিছলি কাটে নিজ-নিজ বাড়ির উদ্দেশে।


২.


অন্য অনেক রাতের মতো আজও রাতের বেলায় মুঢ়াবনি গাঁয়ের পুবপাড়ার তাবৎ মানুষ মাথার ওপর দু’হাত তুলে বনপথে সারবন্দি হেঁটে চলেছে এক অনির্দিষ্ট নিশানায়। প্রায়-রাতেই ওই বনবাসী লোকগুলোর মর্জিমতো বনপথে হেঁটে যেতে হয় মুঢ়াবনিসহ চারপাশের গাঁ’গুলোর চাষীবাসী মানুষজনকে। যেমনটা চলেছে আজ মধ্যরাতে।
 
দু’পাশে ভারী ভারী পা ফেলে সশস্ত্র হেঁটে চলে ওদের হুকুমদাররা। দিনরাত হাড়ভাঙা খাটাখাটনির পর ঘুমের কোলে সঁপে দেওয়া প্রায়-অবসন্ন শরীরগুলোকে ওদের হুকুমেই মানুষগুলো মাঝরাতে ধাক্কা মেরে জাগিয়ে তুলে টানতে টানতে নিয়ে চলে কোন্ অনির্দিষ্ট লক্ষ্যে। হপ্তাদুই আগেও এমনতরো হাঁটতে হয়েছিল মুঢ়াবনির মানুষকে। হুকুমদাররা ছিল জনা-দশ। হন্টনরত মানুষ ছিল একশোরও বেশি। তাও হাঁটতে হাঁটতে মুঢ়াবনি
 
পুবপাড়ার মানুষগুলো ছিল সারাক্ষণ তটস্থ। একেবারে থরহরি কম্পমান। ডাইনে-বাঁয়ে তাকানোর উপায় নেই, ফিসফিসিয়ে কথা বলবার উপায় নেই, একটা পাড়ায় এতগুলি মানুষ, - মেয়ে-পুরুষ, খোঁড়া-ল্যাংড়া, থুরথুরে বুড়ো, কারোরই রেহাই নেই এই নৈশ-ভ্রমণের হাত থেকে। নিশুত রাতের অন্ধকারকে সর্বাঙ্গে মেখে নিয়ে, জঙ্গলের হুড়ুম্-দুড়ুম্ পথ ভাঙছিল সব্বাই। স্রেফ দৃষ্টির পিদিম দিয়ে পথ চিনে চিনে প্রায় একই গতিতে হেঁটে চলেছিল মানুষগুলো কোন্ এক অনির্দিষ্ট নিশানায়। অনির্দিষ্ট, কারণ, যাদের হুকুমে হাঁটছে, তারা তখনও অবধি বলেনি, কতদুর যেতে হবে, কোথায় গিয়ে আচমকা থেমে যেতে হবে! তারা কেবল মাথার ওপরে হাতদুটিকে থাপনা করে পরিণামহীন হাটতেই বলেছে। তার বেশি আর একটি কথাও শুধোবার হুকুম নেই।
 
তবে, মধ্যরাতে রবাহুত হয়ে কীজন্যে তাদের হাঁটতে হচ্ছে, সেটা বিলক্ষণ জানত পুবপাড়ার মানুষ। এই আমন্ত্রণের উদ্দেশ্য দ্বিবিধ। প্রথম পর্বে ওদের বক্তৃতা শোনানো হবে। জঙ্গলের মধ্যে সবাইকে একঠাই বসিয়ে দিয়ে একটা বেজায় ভারীগলা মানুষ অনেক্ষণ ধরে ঢের ঢের ভারী ভারী কথা বলতে থাকবে। মাথার ওপর হাতদুটিকে তুলে রেখে পুবপাড়ার মানুষকে অখন্ড মনোযোগ সহকারে শুনতে হবে সেই ভাষণ। ওই সময়টা ইতিউতি তাকানো, অযথা হাই তোলা, এমনকি, নৈশ পোকামাকড় কামড়াচ্ছে, শরীরের এমন জায়গায় হাত নিয়ে গিয়ে পোকাটাকে তাড়িয়ে দেওয়া, কিংবা জায়গাটাকে সামান্য চুলকে নেওয়াও, - নিষিদ্ধ।
 
প্রথমপর্ব শেষ হলে তখন দ্বিতীয় পর্ব। সে এক বাস্তবিক রোমহর্ষক পর্ব। কারণ, ওই পর্বের নাম ‘গণ-আদালত’। অর্থাৎ কিনা, ওই আদালতে শক্র ও শক্রজাতীয়দের বিচার হবে। বিচার মানে, বাবুভায়াদের প্রতিষ্ঠিত শহুরে কোর্টকাচারির মতো লয় যে, শুনানি চলছে তো চলছেই, দিন পড়ছে তো পড়ছেই। নিষ্পত্তি হওয়ার নামটি নেই। এ হল একেবারে ‘ধর্ তক্তা মার্ পেরেক’ পদ্ধতিতে বিচার। বাপ বলতে সময় দেয় না।
 
গত বুধবার রানীবাঁধ থানাসংলগ্ন সাপ্তাহিক হাটটা ছিল না, তাও কেন রাসু মাহাতো ওইদিন গিয়েছিল ওদিকটায়, এই প্রশ্নের সুরাহা করতে ‘বনপার্টির বাবুদের এক লহমার অধিক সময় লাগে না। জোরালো টর্চের আলোয় রাসু মাহাতোকে সনাক্ত করে নিয়ে চক্ষের পলকে ওকে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলে হুকুমদার দলের জনাদুই ছোকরা। রাসু মাহাত প্রাণপণে বোঝাতে চাইছিল, হাট না বসলেও, ওই হাটের কাছাকাছি ওর ছোটমেয়ের শ্বশুরঘর যে। সেই সুবাদে যেতে তো হয়ই। না, অত কথা রাসুকে বলবার সুযোগ দেননি গণ-আদালতের হাকিমরা। তার আগেই ওকে মাটিতে শুইয়ে দিয়ে শুরু হয়ে যায় বাঁশ-ডলাই। একটা মানুষের উপর দিয়ে একট মোটা বাঁশকে দুদিকে দু-চার জনায় মিলে ঠিক রুটি বেলবার কায়দায় টেনে নিয়ে চলে। এবং তার ফলে আর্তনাদে খানিকক্ষণ নৈশ-প্রকৃতিকে ছিন্নভিন্ন করে একসময় জ্ঞান হারায় রাসু মাহাতো। ব্যস, বিচার শেষ।

এরপর আসে সুবল পড়্ধানের পালা। সাত-সকালে হুকুম হয়েছিল, পঞ্চাশটি রুটি বানিয়ে রাখতে হবে, দিনান্তে বনপার্টির ছোকরারা এসে নিয়ে যাবে। আজ জঙ্গলের মধ্যে পার্টির বিশেষ মিটিন্ রয়েছে। দু-দুরান্ত থেকে আসবে আনেকানেক নেতাতুল্য মনিষ্যি। মিটিং শেষে উয়ারা ওই রুটি খাবেক। কিন্তু সইন্ধা-প্রহরে পার্টির ছোকরারা গিয়ে দ্যাখে, মাত্র তিরিশটি রুটি তৈরি রয়েছে। এর বেশি আটা নাকি জোগাড় করতে পারেনি সুবল। কাজেই, বেচারাকে পিছমোড়া করে ঝুলিয়ে দেওয়া হল পার্শ্ববর্তী মউল গাছের উচুঁ ডালে। সে-রাতের মতো মিটিন ও গণ-আদালতের ইতি ঘটল। পুনরায় সশস্ত্র পাহারায় এক-গাঁ মানুষ ফিরে চলল নিজেদের গাঁয়ে, সুবল পড়্ধান গভীর অন্ধকারে ঝুলতেই থাকল।

হপ্তাদুই আগে, তেমনিই এক নিশুত রাতে মাঝে-জঙ্গলে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল পুবপাড়ায় মানুষগুলোকে। কাঁকন আর চন্দনও ছিল ওই দলে। কানাঘুসোয় শুনেছিল, ওই রাতে নাকি মিটিনে বক্তৃতা করতে আসছে খোদ সূর্য। সে-ই হল এই এলাকায় বনপার্টির মাথা। তাকে সারাক্ষণ অনেক কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। সব রাতের মিটিনে আসতে পারে না তাই। ওই রাতগুলোতে কাজ সামলায় ওর চ্যালা-চামুন্ডারা। কিন্তু ওই রাতে কীভাবে যেন রটে গিয়েছিল, আজকের মিটিনে বক্তৃতা দেবে খোদ সূর্য। গন-আদালতটাও নাকি সে-ই পরিচালনা করবে।
 
নির্দিষ্ট সমুয়ে মাঝ-জঙ্গলে পৌঁছে একসময় সারবন্দি মানুষগুলোর প্রতি থামবার হুকুম হল। ঠাসবুনোট জঙ্গলের মধ্যে একচিলতে ফাঁকা ডাঙা, ওখানেই মানুষগুলোকে বসিয়ে বসিয়ে দেওয়া হল, ঠিক মিটিন শোনার ভঙ্গিমায়। মানুষগুলো যন্ত্রের মতো আসনপিঁড়ি বসে পড়ে। পর মুহুর্তে টর্চের আলো ফেলে ফেলে যে-লোকটি সবাইকে দেখতে লাগল, ও-ই নাকি সূর্য। শোনা যায়, আসল নাম নাকি এটা নয়। আসল নাম অন্যকিছু। এটা পার্টির দেওয়া নাম। ওই নামেই তাকে চেনে পার্টির তাবৎ ছগরা, এলাকার মানুষ এবং পুলিশ।
 
তো, ওই রাতে প্রত্যেকের মুখের ওপর পড়তে পড়তে একসময় টর্চের গোলাকার আলোটুকু থেমে গিয়েছিল কাঁকনের মুখের ওপর। ক্ষণকাল মুখের ওপর থিতু হয়ে ওই আলোক বৃত্তটি ধীরগতিতে জরীপ করেছিল ওর গোটা অবয়বটিকে। আলোটা বেশ খানিকক্ষণ কাঁকনের যুবতী শরীরটাকে মনের আশ মিটিয়ে চেটে চেটে একসময় সরে গিয়েছিল কাঁকনের মুখের ওপর। এবং তার খানিকবাদে একটি রাশভারী গলা থেকে উচ্চারিত হয়েছিল গুটিকয় বাক্য, কিনা, ওই মেয়েটাকে ছেড়ে দে’ । বেজায় লিদ লেগেছে উয়ার । জেগে থাকতে লারছে । তৎক্ষ্ণাৎ হুকুম-বরদাররা এসে কষে ধামক দিয়েছিল, কিনা, কথাটা কানে যাছে নাই? বাড়ি যা ।

 কিন্তু ওই অন্ধকার নিশুত রাতে একলাটি কেমন করে ঘরে ফিরবে কাঁকন ! ব্যাপারটা বুঝতে পেরে ওই রাতে চন্দনও ছাড়া পেয়েছিল। দুটিতে নিশুত রাতের অন্ধকারে শরীর লুকিয়ে ফিরে এসেছিল নিজের বাড়িতে। আর, পরের রাতেই চন্দনের ঘরের আগড়ে মৃদু টোকা। আগড় খোলামাত্র নিঃশব্দে যে-মানুষ্টি ঢুকে পড়েছিল চন্দনদের ঝোপড়িতে, তাকে দেখে দুজনেই একযোগে চমকে উঠেছিল । নাগেশ্বর !
 
কুপি লম্ফের আলোয় ঠোঁটের ফাঁকে হাসছিল নাগেশ্বর । একসময় মৃদু গলায় বলে ওঠে, নাগেশ্বর লয়, আমি সূর্য । তবে এই কথাটা যেদিন ফাঁস হব্যেক, ধইরে লে, সেদিনই তুয়াদ্যার শেষদিন। শুনেই চন্দনের সারা মুখে ছোপ ছোপ কালি জমে । বাপ রে, এই সূর্যের তেজেই তবে গোটা এলাকাটা জ্বলছে আজ দু’বছর ! ওরই অঙ্গুলি হেলনেই গোটা এলাকার মানুষ ওঠে-বসে ! যদিও ওকে এতকাল চর্মচক্ষে দেখেনি কেউ । তবে সে সবাইকে দেখেছে গোলাকার আলোর সাহায্যে ।

কাঁকনের শরীরটা জুড়ে তখন থেকেই বাঁশপাতার কাঁপন।

সহসা উজিয়ে আসে কৈশোরের দিনগুলি । ওইসব দিনে, কাঁকনকে নিশানায় রেখে একজনের চোখের জোড়া-তীরকাঁড় সারাক্ষণ সক্রিয় থাকত । কাঁকন ক্ষেতেবিলে খাটতে যাচ্ছে,.. বাঁধে নাইতে যাচ্ছে, ঘুঁটেগোবর কুড়াতে যাচ্ছে, সারাক্ষণ ওকে অনুসরণ করছে ওই জোড়া তীরকাঁড় । কোথাও গিয়ে স্বস্তি নেই কাঁকনের । প্রায় আধখানা কৈশোর জুড়ে ওই জোড়া তীড়কাঁড় কাঁকনকে নিশানা করে পিছু পিছু ঘুরেছে।

শেষ অবধি ষোলআনায় বিচার দিল কাঁকনের বাপ গগন মাহাতো । বিচারে যৎপরোনাস্তি পিটুনি খেয়েছিল নাগেশ্বর । তারপরেই তো পুলিশ ওকে খুঁজতে এল মুঢ়াবনি গাঁয়ে । বেগতিক বুঝে সেই যে পালাল, বিগত অন্তত পাঁচটি বছর কোনও সাড়াশব্দটি ছিল না। এতদিন বাদে রাতের অন্ধকারে কাঁকনের সুখের সংসারে সিঁধেল চোরের মতো ঢুকে পড়ে, সে দিন কিনা ঘোষণা করল, সে-ই সূর্য!

ওই রাতে সূর্য অবশ্য কোনও ধমক-চমক দেয়নি । কেবল বলেছিল, মাঝে মাঝে আসবে সে রাতের বেলায় । রাতটুকু থাকবে চন্দনদের ঝোপড়িতে। আর, ওই সময়টুকু চন্দনকে ঝোপড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে রাত বিতাতে হবে অন্যত্র । পাহারায় থাকতে হবে, পুলিশ কিংবা চরেদের কেউ সূর্যর খোঁজে শুঁকে শঁকে চলে এল কিনা ।

কাঁকন একেবারে বেঁকে বসেছিল। বলেছিল, চল, আমরা অন্যত্র চইল্যে যাই ।

--ঘর-দুয়ার, সরকার থেকে পাওয়া সামান্য ক্ষেতি-জমিন, গোটাকয় ছাগল-মুরগি....এসব ছেইড়্যে কুথায় যাবি?

কাঁকনই বুদ্ধি জুগিয়েছিল, চল নাবালে পালাই । উখ্যেনে গিরস্থের ঘরে সম্বচ্ছর খাটব । পড়ে থাক ঘরদোর, ক্ষেতিজমিন।



চন্দন ভাবছিল ।



৩.

একেবারে যন্ত্রের মতো হেঁটে চলেছে মানুষগুলো । চোখদুটো সামনেরদিকে স্থির । সামনে বলতে তো বিঘৎটাক । তারপরেই তো দৃষ্টিটা আচমকা ধাক্কা খাচ্ছে সামনের মানুষটির পিঠে । সারবন্দি হাঁটলে তো এমনটাই হয়, পেছনের মানুষটির সামনে সর্বক্ষণ বিঘৎটাক দৃষ্টিগ্রাহ্য জায়গাই থাকে । ডাইনে-বাঁয়ে অবশ্য দু’ধারের গাছ-গাছালি অবধি বিস্তৃত এলাকা চোখ ছোটানোর জন্য বারাদ্দ থাকে, কিন্তু ওই দু’দিকে তাকানো সম্ভব ন্য । কারণ, হুকুম নেই । এমনকি, স্রেফ দৃষ্টিটাকে কিঞ্চিৎ বৈচিত্র দেবার অভিপ্রায়ে, ডাইনে কিংবা বামে, অথবা মাথার ওপর তারাভরা আকাশটার দিকে ক্ষণিকের তরে তাকানোমাত্র পড়ে যেতে হবে সারির দুদিকে হন্টনরত হুকুমদার লোকগুলির উদ্যত লাঠির তলায় । নিশুত রাতে নিঃশব্দে জ্বলতে থাকবে পিঠখানা, কতক্ষন কে বলতে পারে!

চন্দনের চোখের সামনে ফি-বারই থাকে কাঁকন । ওই থাকে আগে আগে । পিছু পিছু হাঁটতে হাঁটতে চন্দন দেখতে পায় কাঁকনের পিঠটাকে। আপৎকালে নিজের মানুষটিকে সারাক্ষণ দেখতে পাওয়া, কপালগুণে মানুষ পায় তেমন সুযোগ । চন্দন প্রায় সব সফরেই পেয়ে গেছে তেমন সুযোগ ।

কিন্তু আজ ঘটেছে বিপরীত ঘটনা । আজ রাতে সারবন্দি দলটিতে রয়েছে কেবল চন্দন । কাঁকনকে ওরা ছাড় দিয়েছে । বলেছে, উয়ার যাবার দরকার নাই । সূর্যদার তেমনি হুকুম । কাজেই, আজ চন্দনের সামনে কাঁকন নাই । সে থেকে গিয়েছে নিজের ঝোপড়িতে । আজ চন্দনকে ওর সামনের জটু কামারের পিঠে চোখ বিঁধিয়ে হাঁটতে হচ্ছে সারাটা পথ ।
 
গভীর রাতে চ্যালাদের মুখে সূর্য’র নির্দেশটা শোনামাত্র কাঁকন দেখে ফেলেছিল ঈশেন কোণে কালিবর্ন মেঘ । ফলত, হুকুমদার দলটি চন্দনকে নিয়ে চলে যাবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সে সুফলকে নিয়ে ঘর ছেডেছিল। রাতভর বসে ছিল সাঁপুই-বাঁধের পাড়ে, ঝোপঝাড়ে শরীর লুকিয়ে। নিশাচর প্রাণীরা যে দিনের আলো ফোটার আগেই জঙ্গলে সেঁধায়, এটা ধরে নিয়েই আবার ব্রাহ্ম মুহুর্তে ফিরে এসেছিল নিজের ঝোপড়িতে। কিন্তু ঘরে পৌঁছেই দেখেছিল, পাড়ার সবাই ‘মিটিন’ সেরে ফিরে এলেও কেবলমাত্র চন্দনই ফেরেনি ।


৪.

ময়না তদন্ত শেষ হতে হতে বিকেল গড়িয়ে গেল ।

লাশটাকে কাঁকনের হাতে সঁপে দিতেই চেয়েছিল পুলিশ । কিন্তু দশরথ-দাদু হাঁ হাঁ করে বাধা দেন, তোর নিজের কথাটা যদি নাও ভাবিস, একটা দুধের বাচ্চা রয়েছে তুয়াদ্যার । তার কথাটা একটিবার ভাব্ কাঁকন । মনে রাখিস, ‘এই লাশটাকে যেজন ছোঁবে-।‘

সুফল ভুলভুল চোখে বাপের লাশটাকে দেখছিল। মর্গের সুমুখে ভূমিশয্যায় শয়ান মানুষটিকে এতক্ষণে নিজের বাপ বলে সংশয় জাগে সুফলের । জ্ঞান হওয়া অবধি যাকে বাপ বলে জানত, সেটা ছিল এক্কেবারে অন্য মানুষ । যেমনি খাটিয়ে, তেমনি প্রাণশক্তিতে ভরপুর, আর তেমনই মজাদার। সারা সকাল খেটেখুটে ফিরে সেই বাপটা-তার সুফলকে কাঁধে বসিয়ে প্রায় দৌড়তে দৌড়তে পৌঁছে যেত সাঁপুই-বাঁধের পাড়ে। সুফলসহ নেমে পড়ত একবুক জলে । ততক্ষণে ভয়ে –তরাসে সুফলের আত্মারাম খাঁচাছাড়া। অতঃপর সুফলকে কাঁধ থেকে নামিয়ে চন্দন পাঁজাকোলা অবস্থায় ঝটপট বারদুই ওকে চুবিয়েই নাবিয়ে দিত পাড়ে । তারপর ঝম্প দিয়ে পড়ত বাঁধের কালো জলে ।

সুফলকে কতবার নিয়ে গেছে কুরচিবনির মেলা দেখাতে । চন্দন, কাঁকন আর সুফল । জঙ্গলের হালকা কিনার-এলাকা দিয়ে পায়েচলা পথ ধরে সুফলকে কাঁধে নিয়ে চন্দন হেঁটে যেত অবলীলায় । পাশে পাশে ফুরফুরেটি হয়ে হাঁটত কাঁকন। সারাটা পথ কাঁকনের সঙ্গে হাজারো কিসিমের মজা-মশকরা করতে করতে হাঁটত সুফলের মজাদার বাপ। আর, কেবল সুফলকে কাঁধে নিয়েই হাঁটা তো লয়, সারাটা পথ কাঁধজোড়াকে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে ওকে ঘোড়ায় চড়বার মজাটাও দিত । আর, হাঁটার তালে তালে গলা ছেড়ে গান ধরত,’ ‘একদিনকার হলুদবাটা-তিনদিনকার বাসি/ চৈত-পরত ফুরাই আইল্যাক্ হে-/ ও মোর গঙ্গাজল-।‘

বৈকালিক হাওয়ায় সেই গানের কলি ছড়িয়ে পড়ত দিকে-দিগন্তে । তাছাড়া বাড়িতে থাকলে রঙ্গরসিকতার পাশাপাশি কথায় কাঁকনকে কতবার যে মাথার ওপর তুলে বনবন করে ঘুরিয়ে দিয়েছে ! সুফল কতবার যে দেখে ফেলেছে সেই দৃশ্য !

খেটেখুটে ঘরে ফিরলেই সুফল অগ্রপশ্চাৎ না ভেবেই ঝাঁপিয়ে পড়ত বাপের কোলে। তখন সবে ঘরের দাওয়ায় বাঁশের খুটিতে ঠেস দিয়ে বসেছে চন্দন । সারা শরীর ঘামে ভিজে সপসপে হয়ে রয়েছে । কাঁকনকে একঘটি জলের জন্য ফরমায়েশ করে গামছা দিয়ে গায়ের ঘামটুকু মুছে ফেলবার উদ্যোগ করছে, হেনকালে অকস্মাৎ সুফল এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাপের বুকে । ফলত শরীরের ঘাম মোছা আর হল না । শরীরের অর্ধেক ঘাম লেপটে গেল আত্মজ’র গায়ে । কাঁকন এনামেলের ঘটিভর্তি জল এনে নামিয়ে দিয়েছে চন্দনের সুমুখে ।

মাথার ওপর ঘটিটাকে তুলে ঢকঢকিয়ে জল খায় চন্দন, তলানি অবশিষ্টটুকু ঢেলে দিতে চায় সুফলের মুখে। সুফল-বলে একটু আগেই ভরপেট জল খেয়েছে । কিন্তু কে শোনে কার কথা ! ঘটির বাকি জলটুকু ওকে জবরদস্তি খাইয়েই ছাড়বে চন্দন। ওতেই তার শান্তি ।

আজ সারাটা সকাল এসবই ভেবে চলেছে সুফল কিস্তিতে কিস্তিতে । দিনভর যে-যার মতো কাজ করে চলেছে । যার ওপর যা ন্যস্ত। পুলিশ তাদের কাজ করেছে নিয়মমাফিক। দশরথ-দাদু , কাঁকন, মদন মুর্মু, যে যার মতো কাজ করে গিয়েছে। সুফলের সেই অর্থে কোনও কাজ ছিল না। কিংবা ছিল, অতিশয় গুরুতর এক কাজ, বাপের সঙ্গে তার শৈশবের কৈশোরের যষ্টিমধুকে অবিরাম চুষে চলা। সেটাও কিছু কম গুরুত্বপূর্ণ কাজ নয়।
 
এতক্ষণে সুফলের মনে হয়, বাপ বলে যাকে আশৈশব চেনে, এই মুহুর্তে সেই মানুষটার শরীরের সঙ্গে, শরীরের প্রত্যেক প্রত্যঙ্গের সঙ্গে, প্রতিটি শিরা-উপশিরা, রোমকূপের সঙ্গে সারাক্ষণ লেপটে থাকবার উপায়ই নেই ওর। এই মানুষটা ওর বাপ নয়। কারণ, উপস্থিত সে একটি লাশ। তার ওপর, ওকে তো ছোঁয়ারই উপায় নেই সকাল থেকে সব্বাই কিস্তিতে কিস্তিতে বারণ করে চলেছে দিনভর।

দশরথ মাহাতোর প্রবল আপত্তির কারণে, কাঁকন আর সুফলের নিরাপত্তার কথা ভেবে, শেষ অবধি পুলিশই দাহ করবার দায়িত্ব নেয়। তবে ওই দাহকর্মের সঙ্গে, অকস্মাৎ বিগত হওয়া প্রিয় জনটির জন্য, ওদের মনে মর্মবেদনা নেই তিলমাত্র । রয়েছে কেবল আইনমাফিক কর্তব্যপালনের দায় ।

খাতড়ায় পাশটি দিয়ে বয়ে চলেছে কংসাবতী। তারই পাড়ে শ্মশান। লাশটাকে একটা ভ্যানে চড়িয়ে পুলিশবাহিনী রওনা দেয় শ্মশানের দিকে। পিছু পিছু কাঁকন, সুফল, দশরথ মাহাতোসহ গাঁয়ের হাতেগোনা গুটিকয় শুভাকাঙ্খী মানুষ। দশরথ মাহাতো সারাক্ষণ নজর করেছে, দিনভর কাঠ মেরে রয়েছে কাঁকন। দু’একটির বেশি কথা বলেনি। একবারের তরেও কাঁদেনি মেয়েটা। এমনকি তিলকের তরেও তার চোখদুটি ছলছলায়নি অবধি। দেখেশুনে মনে মনে প্রমাদ গুনেছে দশরথ। এটা যে মোটেই ভালো কথা নয়, সেটা এই প্রবীণ বয়েসে তার অজানা নেই । কাজেই, দিনভর কাঁকনকে কথা বলাবার জন্য যারপনাই প্রয়াস চালিয়ে গেছে সে বৃথাই ।

শ্মশানে পৌঁছে চন্দনের লাশটাকে যখন নামানো হল, ততক্ষণে চাকি ডুবুডুবু। আর একটা ভ্যানে কাঠ এসেছে। পুলিশবাহিনী চটপট সাজিয়ে ফেলে কাঠগুলো। তার ওপর লাশটাকে চড়ায়। এক জারিকেন কেরোসিন ঢেলে দেয় কাঠের স্তূপে লাঠিতে ন্যাকড়া জড়িয়ে কেরোসিন ডুবিয়ে একটা মশাল বানিয়ে নেয় চটপট। তারপর লাইটার জ্বালিয়ে মশালটায় অগ্নিসংযোগ করে।

মশালটা সুফলের হাতে ধরিয়ে দিতে যাচ্ছিল, দশরথ মাহাতো হাঁ হাঁ করে ওঠে, কিনা, উ চিতায় আগুন দিবেক নাই উয়ার সব্বোলাশ হঁইয়ে যাবেক তাতে। পুলিশগুলো হিন্দু। তারা বুঝে পায় না, একমাত্র আত্মজটি উপস্থিত থাকা সত্বেও যদি ওর বাপটা একচিলতে আগুন না পায় ওর হাতে, তবে তো বিদেহী আত্মার মুক্তি ঘটবে না। কিন্তু দশরথ মাহাতো নিজ সিদ্ধান্তে অটল । দশরথ মাহাতো হাঁ-হাঁ করে ওঠে, অমন ভুলটি করিসনি কাঁকন। চন্দনের অবর্তমানে তুয়াদ্যার তো বেঁইচ্যে থাকতে হব্যেক ।
 
কাঁকন দশরথ-দাদুর কথায় কর্ণপাত করে না। চিতাকে গুনে গুনে তিনবার প্রদক্ষিণ করে। একসময় অগ্নিসংযোগ করে। দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে চিতা। ঠিক সেই মুহুর্তে কাঁকন করে কি, মশালটা হাতে নিয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় সুফলের কাছে। ওর ললাটে ভরপুর একটি চুমু খায়। পরমুহুর্তে মশালের আগুন ছুঁইয়ে দেয় নিজ অঙ্গে । সন্ধ্যার হু-হু বাতাসে কাঁকনের কাপড়েচোপড়ে আগুন লেগে যায়।এমন আচমকা ঘটে যায় ঘটনাটা, পুলিশ বাহিনী ওকে নিরস্ত করবার সময়টুকুও পায় না বুঝি ।
 
দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে কাঁকনের সারা শরীর ।
 
পুলিশবাহিনী দৌড়ে আসে ওর কাছটিতে। কাঁকনকে ধরে ফেলে নেভাতে চায় আগুন। কিন্তু ততক্ষণে সুফলের হাতে মশালটি ধরিয়ে দিয়ে ঝটিতে দৌড়তে শুরু করেছে কাঁকন । দু’পায়ে হরিণীর ক্ষিপ্রতা নিয়ে ছুটে চলেছে নদী সংলগ্ন জঙ্গলের দিকে

পিছু পিছু দৌড়তে দৌড়তে পুলিশ বাহিনী দেখতে পায়, পাতলা জঙ্গলের মধ্য দিয়ে স্বরচিত পথে তিরের বেগে ছুটে চলেছে একটি আগুনের পিন্ড। কোথায় যে চলেছে, কোথায় যে তার গন্তব্য, কিছুই বুঝতে পারে না ওরা। আসন্ন সন্ধ্যার আলো আঁধারিতে একটি আগুন-রমণী একটু একটু করে ছোট হতে হতে ক্রমশ বিন্দু হয়ে যায় ।
 
সেই মুহুর্তে জ্বলন্ত শরীর জাত যাবতীয় যন্ত্রণাকে উপেক্ষা করে কাঁকনের গলা চিরে ঝলকে ঝলকে বেরিয়ে আসছিল, একটিমাত্র বাক্য, লে-লে, এবার আমার শরীলটাকে যত খুশি ভোগ কর্। উপস্থিত হতচকিত সবাই লক্ষ করে, আসন্ন সন্ধ্যার আলো-আঁধারির মধ্য দিয়ে একটি জ্বলন্ত উল্কাপিন্ড যেন তীর বেগে বেরিয়ে যেতে চাইছে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের বাইরে ।

-----------


'অগ্নিরমণী' গল্পটি ২০১৮ সালে লেখা হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন