মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

সাদিক হোসেন'এর গল্প : পাখিপড়া




কথা ছিল সক্কালবেলা উঠে অন্নপূর্ণা থেকে লুচি তরকারি কিনে আনব। আজ রোব্বার। আমরা তিনজন মিলে লুচি খাব।

ঘুম ভাঙল সকালবেলাতেই। তবে একটি দুর্ঘটনায়।

সিলিং ফ্যানে একটা চড়ুই পাখি ধাক্কা খেয়েছে। কিছু বোঝবার আগেই দেখি দু-চারটে খয়েরি রঙের পালক আমাদের চোখের সামনে ভাসছে। পাখিটা মেঝেতে পড়ে কাতরাচ্ছে। তরীর মুখ চুন। 

মুনমুন উঠে পড়েছিল। সে মেঝে থেকে পাখিটাকে তুলে নিয়েছে। তার দুই তালুর মাঝখানে বাচ্চা প্রাণীটি ঘাড় কাত করে শুয়ে আছে।

তরী কেঁদে উঠল, মা রক্ত!

পাখিটার চোখের নিচে পাখার ব্লেড লেগেছিল। সেইখান থেকেই রক্ত বেরিয়েছে খানিকটা। চোখের ভেতরটায় কী হয়েছে কে জানে!

তাকে খাটে শোয়ানো হল। ক'বার ফরফর করে পাখনা ঝাপটালো মাত্র। তারপর আবার চুপ। 

মুনমুন তার মুখে ফু দিচ্ছিল। আমি কী করব বুঝতে পারছিলাম না। তরী বাথরুম থেকে এক মগ জল নিয়ে হাজির।

পাখিটার মাথা ধুইয়ে দেওয়া হল। নরম কাপড় দিয়ে চোখের নিচ-টা মোছানো হল। তবু সে চোখ চাইছে না। খাটের উপর এমনভাবে শুয়ে আছে যেন সে তরীর বোন। সদ্য জন্মেছে। আমরা তিনজন প্রাণীটির উপর ঝুঁকে আছি। সে একবারও চোখ মেলে দিদিকে অভিবাদন জানাল না।

আপাতত লুচি-তরকারি মুলতুবি করা হল। তরীর মন খারাপ। চা-বিস্কিটে তার মন নেই। সে বলল, আচ্ছা পাখিদের জন্য ডাক্তার হয় না?

নিশ্চয় হয়। আমি ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু আমাদের এখানে তো সেরকম ডাক্তার নেই!

ইস্‌! তা হলে ও কিভাবে সারবে?

পাখিরা মানুষের থেকে অনেক বেশি সাহসী। আমরা যদি একটু যত্ন নিই তাহলে ও নিশ্চয় ঠিক হয়ে যাবে। তখন দেখবি আমাদের টা-টা করে ও কেমন উড়ে চলে যাচ্ছে।

বারে, ও আমাদের ছেড়ে চলে যাবে? তরী নিজের মনেই কী যেন ভাবল খানিক। তারপর মুখটা ছোট করে নিয়ে বলল, ও তো বাচ্চা। ওর বাবা-মাও নিশ্চয় এখন ওকে খুঁজছে। ও যখন ওর বাবা-মার কাছে চলে যাবে আমরাও ওকে টা-টা করব। 

নিশ্চয়!

আমার কথায় তরী অদৌ আশ্বস্ত হল কিনা বোঝা গেল না। থাকতে থাকতে সে খালি উঁকি মেরে পাখিটাকে দেখে আসে। সে ডানা ঝাপটালে তরী হাততালি দিয়ে ওঠে। আবার চুপচাপ শুয়ে থাকতে দেখলে কাউকে জোরে কথা বলতে দেয় না। আহ্‌, ওর ঘুম ভেঙে যাবে তো!

মুনমুন আলমারি থেকে কাপড় নামিয়েছিল। রোব্বারে সে আলমারি গোছাবে। এদিকে গতকাল অফিস থেকে ফেরবার পথে আমি থোড় কিনে এনেছিলাম। থোড় কাটা বেশ ঝামেলার। আমি বঁটির উপর ঝুঁকে চাকা-চাকা করে থোড় কাটছিলাম। কাটতে কাটতে আঙুল দিয়ে কষ ছাড়িয়ে নিচ্ছিলাম। থোড় কাটা অনেকটা চড়কায় সুতো বোনার মত।

তরী বলল, আচ্ছা বাবা, আজ কি তুই রান্না করবি? পাখিটা কী খাবে?

ওকে আমরা ভাত খেতে দেবো। পাখিরা তো ভাত খায়।

আচ্ছা, তাহলে ভাতটা নরম করে করবি। কিন্তু ও কি তরকারি খাবে না?

তরকারি দেবো বলছিস? ওর যদি ঝাল লাগে?

পাখিদের ঝাল লাগে না। আমি জানি।

ঐ ঘর থেকে মুনমুন তরীকে ডাক দিল। কবেকার একটা জামা পাওয়া গিয়েছে। সেই জামায় নাকি এখনো তরীর ছোটবেলাকার গন্ধ লেগে রয়েছে। মুনমুন কথা দিয়েছে এইরকম পুরনো ক'টা জামা দিয়েই সে পাখিটার জন্য বাসা বানিয়ে দেবে। তরীর আনন্দের অন্ত নেই। সে জামাখানা নিয়ে সারা বাড়ি মাথায় তুলল। ওদিকে পাখিটার তখন ঘুম ভেঙে গিয়েছে। সে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না। 

তরী ওর মার কাছে ছুটে গেল, মা!

গিয়ে দেখি পাখিটা নিস্পন্দ। মুনমুনের চোখে জল। তরী মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমি যেতে আমাকে ও জড়িয়ে ধরল। বলল, বাবা, মরে যাবার সময় খুব কষ্ট হয়, না? 

আমাদের বাড়ির পেছনে একটা ছোট্ট ডোবা রয়েছে। সেইখানে লোকজনে বিশেষ যায় না। সন্ধেবেলা ওখান থেকে ব্যাঙ ডাকার আওয়াজ পাওয়া যায়। চারধারে বুনো লতা-পাতার গাছ। কচুপাতা, জার্মানি লতা, কতরকম নাম-না-জানা গাছ যেন পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে সংসার পেতেছে। এগোতে গেলে ওদের মাড়িয়ে এগোতে হবে। ঠিক করলাম ওইখানেই চড়ুইটিকে কবর দেওয়া হবে। সাপ, ব্যাঙ, কেঁচোর মধ্যিখানে, লতাপাতার ছাওয়ায়, ঝিরঝিরে রোদের ভেতর যেন পাখিটি নিজের মাটি পেয়ে যায়।

কিন্তু একটা পাখি কি মাটি পেতে চায়, না আকাশ! আকাশ তো অখন্ড। আকাশের টুকরো হয় না। আমরা মাটিকে টুকরো করতে পেরেছি। টুকরো টুকরো মাটিতে পাখিটার জন্য বিছানা পাতব?

ছাদে তখন দুপুরের রোদ। পাখিটাকে চান করিয়ে একটা পাতলা চাদরে মুড়ে ফেলা হল। 

তরী বলল, আমি ওকে নিয়ে একটু বসব?

সে পাখিটিকে নিয়ে নিজেই ছাদ থেকে নেমে এল। নেমে এসে সোফায় বসে থাকল কতক্ষণ। ছোট ছোট হাত দিয়ে সে পাখিটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ডানার ভেতরে নরম লোম। সেই লোমের ভেতরে সে যেন থেমে যাওয়া হৃৎপিণ্ডের ধ্বক ধ্বক টের পেতে চাইছে। চোখের নিচ-টায়, যেখানে ফ্যানের ব্লেড লেগেছিল, সেখানে হাত বুলিয়ে মাফ চেয়ে নিচ্ছে। 

--তরী! আমি ওকে ডাকলাম। সে ইতোমধ্যেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বলল, চল বাবা।

কোদাল নিয়ে গিয়েছিলাম। আশপাশের লতাপাতা কেটে খানিকটা জায়গা তৈরি করা হল। নরম, ভেজা ভেজা মাটি। একবার কোদাল চালাতেই অনেকটা মাটি উঠে এল। সে গর্তটার দিকে তাকিয়ে খানিক থ। পাখিটাকে যেন নিজের বুকের মধ্যে নিয়ে নিতে চাইছে। চোখ থেকে দু'ফোটা জল নেমে এল।

কিছু বলতে হল না। সে নিজেই উবু হয়ে বসে পাখিটাকে মাটিতে শুইয়ে দিল। চাদরটা সরিয়ে নিল। তারপর দু'মুঠো মাটি দিয়ে আমার দিকে তাকাল। ওর সঙ্গে কথা বলতে পারি না।

মাটি চাপা দেবার পর সে একখানা কচুপাতা ছিঁড়ে কবরটার উপর পুঁতে দিল। জিজ্ঞেস করলে বলল, এইটা চিহ্ন। এইটা দেখে ওর বাবা-মা ঠিক ওকে খুঁজে নেবে দেখো!

চড়ুইটা কয়েক ঘন্টার জন্য আমাদের বাড়িতে এসেছিল। যাবার সময় আমার মেয়েটাকে বড় করে দিয়ে গেল।

খেতে বসে সে বিশেষ কথা বলল না। বিকেলবেলা বৃষ্টি নামল। সন্ধেবেলা ব্যাঙ ডাকল। তরী বলল, আচ্ছা বাবা, পাখিটার বাবা-মা এখনো নিশ্চয় তাদের বাচ্চাটাকে খুঁজছে, তাই না? ওরা কি খুঁজে পাবে?

বাবা-মায়েরা ঠিক নিজের বাচ্চাদের খুঁজে নেয়।

কিন্তু ওদের খবর পাঠাবে কে?

পাখিদের খবর পাঠাতে হয়না। দেখিস না ওরা কত দূর দূর থেকে, কত দেশ ঘুরে ঘুরে প্রতি বছর একই জায়গায় ফিরে আসে। ওদের ম্যাপ নেই, কম্পাস নেই; তবু ওরা ঠিক ঠিকানা চিনতে পারে।


আমিও তাই ভাবছিলাম। তরী চুপ করে যায়। তারপর বলে, ঐ ব্যাঙগুলো ডাকছে শোনো। ব্যাঙগুলো আসলে পাখিটার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে। কিন্তু মরে গেলে কি কেউ আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়?
তা তো জানি না।

আমার উত্তর তরীর পছন্দ হল না। সে বেশ চিন্তিত, পাখিটার মা-বাবা বুঝি এইখানে চিনে আসতে পারবে না। কত ঘর আমাদের এখানে। কোন্‌ ঘরের পেছনে কোন্‌ ডোবায় তাদের বাচ্চাটাকে কবর দেওয়া হয়েছে তা তারা জানবে কিভাবে? আচ্ছা বাবা, দাদাজী যদি আবার কবর থেকে ফিরে আসে তো রাস্তা চিনে এইখানে আসতে পারবে?

কবর থেকে কেউ কোনদিন ফিরে আসে না। মরে যাওয়া মানে তো মরে যাওয়া। একবার মরে গেলে আর কেউ পৃথিবীতে ফেরে না।

সেতো আমি জানি। তবু, যদি ফেরে, তাহলে কী এই রাস্তাঘাট চিনতে পারবে? তোর ছোটবেলায় এইখানে এত ঘর ছিল?

আমাদের ছোটবেলায় এই এইখানটায় শেয়াল ডাকত। আমি নিজেই কত ডাক শুনেছি।

কিন্তু তারা গেল কোথায়?

এই যে আমরা এত ঘরবাড়ি বানালাম! শেয়ালরা তো মানুষের সঙ্গে থাকতে পারে না। তাই তারা চলে গিয়েছে।

ইস! তরীর মন খারাপ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ কোন কথা বলে না। তারপর কী মনে পড়ায় আবার বলে, আমাদের একটা ভুল হয়ে গিয়েছে। 

কী ভুল?

পাখিটাকে যখন কবর দিই সে যেন একবার আমার দিকে চেয়ে ছিল।

এটা তোর মনের ভুল। তুই পাখিটাকে নিয়ে ভাবছিলিস সারাক্ষণ। সেইকারণে এরকম মনে হচ্ছে। পাখিটা মারা গিয়েছিল। সেইটা তুইও জানিস।

কিন্তু ও যদি আমার দিকে চেয়ে থাকে? হ্যাঁ বাবা, ও আমার দিকে চেয়েছিল। ঠিক মাটি দেবার আগেই চোখ খুলে তাকিয়েছিল।

তরী! তুই একজন বুদ্ধিমান মানুষ। এইসব কী বলছিস? একজন মরে গেলে কি সে আর বাঁচতে পারে?

কিন্তু আমার যে মনে হচ্ছে! ঠিক যেন দেখা পাচ্ছি এখন।

ওরকম মনে হতেই পারে। কিন্তু এটা নিয়ে আর চিন্তা করিস না।

দাদাজী যখন মারা যায়, তোরও এমন মনে হয়েছিল? যেন কবর দেবার আগে দাদজী ঠিক বেঁচে উঠেছে!


আমি ওর কথার কোন উত্তর দিই না। সেও চুপচাপ আমার পাশে বসে থাকে। হয়ত ব্যাঙের ডাক শোনে। হয়ত গাছের পাতা দেখে। রাতেরবেলা পাখিটার কবরের উপর দুটো-তিনটে ব্যাঙ লাফ কাটে, জল-ঢোঁড়া সাপ এলে আবার সেগুলো পালিয়ে যায় – এইসব ভাবে। কিংবা চোখ বুজলে দেখে পাখিটা তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। 

শুধু ঘুমতে যাবার আগে বলে ফেলে, আমরা না ভুল করে ফেলেছি!

পরেরদিন স্কুলে কি পড়াবে, তা নিয়ে মুনমুন ব্যাস্ত ছিল। কাজ শেষ করতে অনেক রাত হল তার। আমরা দুজনা এমনিই বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকলাম।

আমাদের দুজনার সামনে সারি সারি বাড়ি। শুধু বাড়ি, ছাদ, আবার বাড়ি। রাস্তায় আর গাড়ি নেই। সেটি যেন প্রবল পরিশ্রমের পর একটু জিরিয়ে নিচ্ছে। নিঃশ্বাস ছাড়ছে। তার গায়ে বাড়ির ছাওয়া এসে পড়েছে। খানিকটা অন্ধকার। আবার সেই ছাওয়া সরে গেলে হলুদ আলো। আমাদের রেলিঙ থেকে রাস্তাটা বেশিদূর অব্দি দেখা যায় না। 

রাতে তরী ঘুমতে পারল না। বুঝি স্বপ্নে পাখিটাকে দেখেছে। পাখিটার মা-বাবাকে উড়তে দেখেছে আকাশে। চাঁদ, নক্ষত্র, কালো আকাশ, আকাশের গায়ে কচুরিপানা, জার্মানি লতার বোনে সিলিঙ ফ্যানের ভাঙা অংশ – এইসব নিশ্চয় তাকে ভয় দেখিয়ে ছিল। 

মুনমুন তাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকল। আমি ভাবছিলাম আব্বার কথা। গোসল করানোর পর তাকে উঠোনে শোয়ানো হয়েছে। গলা অব্দি কাফন। নাকে তুলো গোঁজা। আচমকা যেন আব্ববা আমার দিকে তাকাল।

মা!

চড়ুই পাখিটাকে নিয়ে আমরা আর বিশেষ কথা বলিনি। এরকম দুর্ঘটনা যাতে আর না ঘটে সেকারণে জানলায় নেট লাগিয়ে নিয়েছি। তরী আবার স্কুলে যাচ্ছে। খেলছে। আবার ছবি আঁকছে। তার ছবিতে পাখি এসেছে। পাখিদের মা-বাবারা এসেছে। ব্যাঙের পিঠের উপর আমি আর মুনমুন দাঁড়িয়ে রয়েছি - এমনও একখানা ছবি এঁকেছে।

একদিন দুপুরবেলা স্কুল থেকে ফিরে তরীকে আর পাওয়া যাচ্ছে না।

তরী!

তরী?

সে কোথাও নেই। 

শেষপর্যন্ত তাকে বাড়ির পেছনের ডোবাটার কাছে পাওয়া গেল।


আচ্ছা বাবা, ঠিক কোন জায়গায় আমরা পাখিটাকে কবর দিয়েছিলাম। আমি কিছুতেই জায়গাটা খুঁজে পাচ্ছিনা।

কদিনেই ঝোপঝাড়ে জায়গাটা ভর্তি হয়ে গিয়েছে। আমরা তিনজন মিলে খোঁজবার চেষ্টা করলাম। কাছাকাছি কোন একটা জায়গা অনুমান করতে পারছিলাম বটে। কিন্তু সঠিক কোথায় কবরটি দিয়েছিলাম – তা আর খুঁজে পেলাম না।

তরীর মন খারাপ হয়নি।
সন্ধের দিকে কী বিদ্ঘুটে একটা ডাক পেলাম। শেয়াল নাকি!
আমরা তিনজন মিলে বেশ মজা করলাম।


৪টি মন্তব্য: