মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

হারুন রশীদ'এর গল্প: যাত্রা ফেরত




যমদুতের সাথে সুসম্পর্কের কারণে শেষ মুহুর্তে বেঁচে গেল গোরখোদক ঠান্ডু মিয়া। বজ্রপাতটা ঠিক কান ঘেঁষে মাটিতে নেমে যাবার সময় কয়হাত দুরের বিশাল ইউক্যালিপটাস গাছটাকে দো-ফালা করে গেলেও টিকে গেছে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা হাড় জিরজিরে বুড়োটা।

নগরীর সবগুলো গোরস্তানে ঠান্ডু মিয়ার বিচরণ। ঝড়বৃষ্টি বাদলা যে কোন সময় মাটি খুঁড়ে লাশের জন্য ঘর তৈরী করা তার জন্য নস্যি। জীবনে যতবার কবরে নেমেছে অতবেলা ভাতও খায়নি পেট ভরে। যমদুতের সাথে পরিচয়ের সুবাদে দেশের এত দুর্যোগ, মহামারী, ভয়াবহ দুর্ঘটনা কোন কিছুই তার সাতাশি বছর বয়সী শরীরকে কাবু করতে পারেনি। কোন মুর্দার কিরকম বিছানা দরকার হয়, কোন আবহাওয়ায় কিরকম বাঁশ বিছাতে হয়, সবকিছু নখদর্পনে তার।

ঠান্ডু মিয়ার যাত্রা শুরু চৈতন্যগলির টিলাময় বাইশমহল্লার কবরস্থান থেকে। কৈশোরের মাঝামাঝি সময়। বাবা মারা গিয়েছিল জন্মের পরপর। মায়ের কাছে বড় হচ্ছিল। একদিন মাও তাকে রেখে চলে গেলে লোকমুখে প্রথম শুনে আজরাইল বা যমদুতের নাম। খুব রাগ হয়েছিল যমদুতের উপর। এতটা নির্দয় কেউ হয়? দুনিয়াতে দেখার কেউ নেই এরকম একজনকে পিতামাতাহীন করা। রাগ করে সে গোরস্থানে চলে আসে। যমদুতের দেখা পেলে কথা বলবে। যেখানে মাকে মাটিচাপা দিয়েছিল বস্তির দয়ালু লোকেরা। তাকে ভাতও খাইয়েছিল দুদিন। মা না থাকার দুঃখটা সে কদিন বাদেই ভুলে যায় খিদার যন্ত্রণায়।

কিন্তু কদিন খাওয়াবে বাইরের লোক? যে পাড়াতো খালা মা মরার পর "আয় কান্দিস না, আইজ থেকে তুই আমার পেটের ছাওয়াল, আমার কাছেই খাইবি" বলে বুকে টেনে নিয়েছিল কদিন যাবার পর দেখা গেল দুপুর হলেই সেই খালার দরোজা বন্ধ। "ভাইফুত ন কান্দিস, আঁরা থাইকতে তোর খন অসুবিধা নইবো", বলে যে পাড়াতো চাচা তাকে ঘরে নিয়ে মুরগীর ঝোল দিয়ে নানরুটি খাইয়েছিল সেদিন, সেই চাচা তাকে দেখে চিনতে পারে না কদিন বাদে। আস্তে আস্তে পাড়ার সব দরজা বন্ধ হয়ে গেলে খিদের সময় কবরস্থানে গিয়ে বসে থাকে। মায়ের কাছে ভাত খোঁজে।

মায়ের কাছে চাইলে একটা না একটা ব্যবস্থা হয়। মা তাকে একেকদিন ব্যবস্থা করে দেয় একেকভাবে। প্রায় প্রতিদিন কেউ না কেউ মরে। লোকজন দল বেধে খাটিয়া নিয়ে আসে গোরস্থানে। লাশ কবরে নামিয়ে চলে যাবার সময় তাদের পিছুপিছু মৃত বাড়ী গিয়ে দরজার বাইরে মলিন মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকে ঠান্ডু। এরকম বাড়ির বাসিন্দাদের কলিজা নরোম থাকে কদিন। মলিন চেহারার দরিদ্র লোকদের খুব কদর থাকে তখন। খাওয়া জুটে যায় তার। এভাবে একেকদিন একেক বাড়ীতে ভোজন সেরে, রাতে স্টেশানের প্ল্যাটফর্মে গিয়ে ঘুমোয়। যদি কোন দিন কেউ মারা না যায়, সে একটু বিপাকে পড়ে।

একবার পরপর তিনদিন কোন লাশ এলো না। সেকি কষ্ট তার! ভিক্ষা করার অভ্যেস না থাকলেও মাজারের পাশে বসে গিয়েছিল। সেখানেও গলাধাক্কা। তবু বহু কষ্টে তিনটা দিন পার করার পর চতুর্থ দিনে যখন খাটিয়া মাথায় টুপিওয়ালা লোকজন দেখা দিল, তখন ঈদের আনন্দে সে দৌড়ে কবরস্থানে পৌঁছে যায়। কিন্তু দ্রুত ছুটতে গিয়ে পা হড়কে ঢুকে যায় পাশের পুরোনো একটা কবরে। মাটি নরম হয়ে ছিল বৃষ্টিতে, কোমর পর্যন্ত দেবে যায় তার। লাশ দাফন করতে আসা লোকজন হায় হায় করে তাকে উদ্ধার করে।

কে একজন বললো, কবরে টানছে তাকে। মানে মউত। ভয় পেয়ে গেল সে। পাশেই মার কবর। মা কি তাকে ডাকছে কবরে?

আরেকজন জিজ্ঞেস করলো, 'কী করিস তুই এখানে?' সে কেন যেন মুখ ফসকে বলে ফেলে, 'কবরের কাজ করি।' দাফন করতে আসা লোকজন জনবল সংকটে ছিল বোধহয়। তাকে কবরের কাজে লাগিয়ে দিল অন্যদের সাথে। সেদিন আর পরবর্তী তিনদিন তাকে খাওয়া নিয়ে ভাবতে হলো না। ওই বাড়িতেই খেল। আর কিছু টাকা বকশিশও জুটে গেল শেষদিন।

সেদিন থেকে নতুন জীবন তার। মুর্দার আগেই কবরে নেমে কবর ঠিক করা, মাটির অবস্থা বুঝে ফিনিশিং লাইন টানা, মুর্দার গায়ে যেন মাটি না পড়ে সে ব্যবস্থা করা, কবরের উপর লাগানো ফুলের চারায় পানি দেয়া ইত্যাদি কাজ করে সে মোটামুটি ভালো আয় করতে থাকে। কিন্তু পরবর্তী পঁচাত্তর বছর যে তার কবরের সাথে কাটবে সেটা কল্পনাও করেনি তখন।

ফুলমতীর সাথে সংসারের ৬০ বছর পেরিয়ে গেলেও দুজন একা রয়ে গেছে। কোন সন্তান হয়নি তাদের। বংশরক্ষার কেউ নেই। ঠান্ডু মিয়া ছাড়া ফুলমতিকে দেখাশোনা করার কেউ নেই। এই বয়সেও দুজন দুজনকে আগলে রাখে একরকম। ফুলমতীর মুখের কথাও ফুলের মতো নরম। কখনো খোঁচা বা কাঁটার ছোঁয়া থাকে না কথার মধ্যে।

কিন্তু আজ সকালে কি মতিভ্রম হলো তার? ঘুম থেকে উঠে হাতমুখ ধুয়ে রান্নাঘরের দিকে যাবার সময় ঠান্ডু মিয়ার পায়ে লেগে ফুলমতীর অনেক শখের যোগাড় কাঁচের গেলাসটা ঠক্কাস করে মেঝেতে পড়ে গুঁড়ো হয়ে গেলো। অমনি ফুলমতীর মুখে একটা বিস্ফোরন ঘটলো, "মিনসের মিনসে মরণও হয় না তোর, চোখের মাথা খাইছস? আমার এত সাধের গেলাসটা ভাইঙ্গা দিলি? দুর হ আমার সামনে থেইক্যা........ইত্যাদি আরো অনেক অকথ্য গালিগালাজ।

তব্দা খেয়ে যায় ঠান্ডু মিয়া। ফুলমতীর মুখ দিয়ে এরকম বেশুমার বেমানান শব্দ কখনোই আশা করেনি সে। রাগে অপমানে এক কাপড়েই ঘর থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় চলে গেলো। ঝুম ঝুম বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছিল চতুর্দিক। শহর এলাকার একটা বাস আসতেই কিছু না ভেবে উঠে গেল বাসে। যাত্রীর ভিড় নেই। পেছনের দিকের আধভেজা একটা সীটে হেলান দিয়ে বসে রইলো। কোথায় যাবে জানে না। কিন্তু এই জায়গা ছেড়ে, এই দুনিয়া ছেড়ে, এই জগত ছেড়ে তার নিরুদ্দেশ হয়ে যেতে ইচ্ছে করছিল। বাসটা তাকে যেখানে খুশী নিয়ে যাক।

বাসের শেষ গন্তব্য যেখানে তার কিছুদূর পরেই কর্ণফূলীর মোহনা। অদূরে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ দেখা যাচ্ছে। বাস থেকে নেমে সোজা সমুদ্রের দিকে হাঁটতে শুরু করে নেভী রোড ধরে। বামপাশে নদী। নদীর ওপারে ছোট ছোট টিলা। বৃষ্টিতে সব নৌ চলাচল বন্ধ। জেদের তেজে এত জোরে হাঁটছিল যেন কোন জরুরী কাজে যাচ্ছে। লুঙ্গি শার্ট ভিজে সপসপ করছে হাঁটার তালে তালে। বাতাসের ঠান্ডা তীর বুড়ো হাড়ে কনকন করে বিধছে। বৃষ্টি ছাঁটে চোখে ঝাপসা দেখছে। কিন্তু অপমানের জ্বালা তার চেয়েও বেশী বলে কোন দুর্যোগ তার চামড়ায় আঘাত হেনে সুবিধা করতে পারলো না।

কিন্তু সে সমুদ্রের দিকে যাচ্ছে কেন? মরতে হলে রেল লাইন সবচেয়ে সোজা। এদিকে রেল লাইন নেই। কাছাকাছি জায়গার মধ্যে স্টীলমিল বাজার পর্যন্ত রেল লাইন আছে, কিন্তু ওই পথে রেল চলেনি বহুবছর। ভুল রাস্তায় চলে এসেছে। কদমতলী রেলক্রসিংএর দিকে যাওয়া দরকার ছিল। এখন ফিরে যাবার ভাড়াও পকেটে নেই। দশটাকা খরচ হয়ে গেছে আসার পথেই। মরতে গেলে তাকে আরো পনেরো টাকা যোগাড় করে মরতে হবে। কে দেবে টাকা? ভিক্ষা করার উপায় নেই এই নির্জন জায়গায়।

ধুশশশ.....খিদেও পেয়ে গেছে এসময়ে আবার। সকালের খাওয়াটা হয়নি এই ক্যাচালে। খিদে পেটে মরতেও কেমন লাগছে। টাকার যোগাড় কেমনে হবে? পাশের নির্জন একটা মসজিদের দানবাক্স দেখতে পেয়ে এগিয়ে গেল সে। ঝড়বাদলার মধ্যে আশেপাশের রাস্তায় কেউ নেই। মসজিদের টাকার উপর পরকালের হক আছে। সে তো পরকালেই চলে যাচ্ছে খানিক বাদে। যাবার আগে পরকালের তহবিল থেকে খানিক আগাম নেয়া যায় না? খিদের সময় নীতিকথা কাজ করে না। এদিক ওদিক তাকিয়ে দানবাক্সের তালায় একটা মোচড় দিতেই তালাটা ঠুস করে খুলে গেল।

কতটাকা আছে গোনার সময় নাই। খুব বেশী না, দু'পাঁচ টাকার নোটের সাথে কিছু চকচকে কয়েন। সবগুলো মুঠোর মধ্যে নিয়ে লুঙ্গির গিটের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল। তারপর জোর কদমে হাঁটা শুরু করলো বাস স্টেশানের দিকে। আঠারো নম্বর পৌঁছালে দোকানপাট মিলবে। তেলে ভাজা পরোটার ঘ্রাণ আর গরম চায়ের সুগন্ধী ধোঁয়ার চিত্রটা ভেসে উঠতেই খিদেটা আবারো বজ্জাতি শুরু করলো পেটের ভেতর।

প্রথমেই যে ঝুপড়ি দোকানটা পড়লো তাতে ঢুকে পেটপুরে চা-পরোটা-ভাজি খেয়ে নিল।

খিদেটা মরার পর রাগটা চাঙা হলো আবার। আজকে মরতেই হবে। কাছে ধারে মরার জায়গা খুঁজতে খুজতে ভাবতে থাকলো সে মরার পর ফুলমতী কি করবে? তার খবর পেয়ে সে কিরকম ভেউ ভেউ করে কাঁদবে, সকালের গালাগালির জন্য কিরকম অনুতপ্ত হয়ে মাথা কুটবে মেঝেতে এই দৃশ্যগুলো তাকে বিপুল আনন্দিত করলো। মরতেও সুখ সুখ লাগছে তার। ভাবতে ভাবতে বৃষ্টির ছাট উপেক্ষা করে হাঁটতে থাকলো ঠান্ডু। এখানে ব্যবস্থা না হলে স্টেশান রোডেই চলে যেতে হবে।

ঠিক তখনই পাশের বিরাট উচু ইউক্যালিপটাস গাছটার উপর একটা আঁকাবাঁকা অতি উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা নাজিল হলে মুহূর্তে গাছটা ফড়ফড় করে দুভাগ হয়ে পড়তে দেখে অবাক হবার আগেই আকাশ ভেঙ্গে একটা গর্জন নেমে আসলো এবং সে বুঝতে পারলো বজ্রপাতে মারা যাচ্ছে সে।

দুপুরের পর জ্ঞান ফিরলো হাসপাতালের মেঝেতে। মরেনি সে। কয়েক সেকেন্ড পর বুঝতে পারলো কাজটা কতো লজ্জাজনক হয়েছে। সে পরিষ্কার দেখেছে বজ্রপাতে গাছটা দুই ফাঁক হয়ে গেছে। গাছটার এত কাছে থেকেও সে বেঁচে থাকলো কিভাবে। নিশ্চয়ই যমদুত আবারো তাকে খাতির করেছে।

ওপাশে একটা নার্স দেখে সে ডাক দিতে চাইলো। কিন্তু একি? নিজের কন্ঠ তার নিজের কানেই গেল না। সমস্যাটা বুঝতে পারলো না সে। নার্স মুখ নাড়ছে, কিন্তু সে কিছু শুনতে পাচ্ছে না। পুরা কবরের নিস্তদ্ধতা।

অনেকক্ষণ পর ডাক্তার এসে দেখার পর জানলো যমদুত তার প্রাণ নেয়নি, কিন্তু কানটা নিয়ে গেছে। এখন থেকে ফুলমতীর কোন বাক্য তার কানে পৌঁছাবে না কোনদিন। ফুলমতীর জন্য এটাও কম শাস্তি না। বাড়ি ফিরে যাবার একটা যুতসই অজুহাত খুঁজে পেল সে।

মেঝেতে উঠে বসে কোমরের কাছে হাত দিয়ে লুঙ্গির গিটের ভেতর টাকার অস্তিত্বটা ছুঁয়ে ভাবতে লাগলো, পরকালের হিসেব থেকে আগাম কেটে নেয়া এই ক্ষুদ্রঋণের কী ব্যবস্থা হবে?


[রচনাকাল : মে ২০১১]


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন