সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

ওয়াসি আহমেদ'এর গল্প : সুন্দিকাঠের আলমারি


মা মারা যাওয়ার পর সপ্তাখানেক নানা ঝক্কি-ঝামেলায় কেটে যেতে আমাদের বাবা ডাক্তার আলতাফ হোসাইন চৌধুরী মায়ের পরিত্যক্ত শাড়ি-গয়না-আসবাবপত্র বিলি-বণ্টনের ফাঁকে হঠাৎই আনমনে বলে উঠলেন, আলমারিটা আমার। বাবাকে ঘিরে বসা আমাদের চার ভাই-বোনের কানের পর্দায় কথাটা মৃদু টঙ্কার তুলেই ক্ষান্ত হলো না, আমরা অনুভব করলাম প্রায় অস্ফুট, হেঁয়ালিপ্রবণ কথাগুলো আমাদের শরীর-মনের গহন কুঠুরিতে লাটিমের মতো ঘুরে ঘুরে এক অনিঃশেষ গুঞ্জরণে মেতে উঠছে।

মা নেই, কিন্তু আমরা জানলাম, বাবা মাকে হারাতে চান না। আলমারিটা প্রকাণ্ড, বিয়ের সময় মাকে তার বাবার দেওয়া। দীর্ঘ একটা জীবন মা একে ব্যবহার করেছেন। ঘোর খয়েরি রঙের সাত ফিটেরও বেশি উঁচু পাহাড়প্রমাণ আলমারিটা মায়ের স্পর্শ-গন্ধ শ্বাস-প্রশ্বাসে প্রবল স্মৃতিজাগানিয়াই না, আমাদের ভাই-বোনদের এমনও মনে হলো, পাল্লা খুলে এর ভেতরে, অন্তহীন অন্তরে উঁকি দেওয়ামাত্র বাবা মাকে পেয়ে যাবেন।

তখন সকাল। সিলেট শহরের আম্বরখানায় আমাদের পৈতৃক বাড়িতে শেষ ডিসেম্বরের হিম বাতাস জানালার পরদা দুলিয়ে ভেতরে ঢুকেছে। অল্প দূরে একটা কাঁঠাল, একটা ঝাঁপ-ফেলা লিচু গাছের ওপারে হালকা ছাইরঙা পাঁচিল ঘিরে বিভোর রোদ। বাবা আনমনা ভঙ্গি ঝেড়ে ফেলে একনজর রোদটাকে দেখলেন, তারপর আমাদের দিকে ফিরে গোপন তথ্য ফাঁস করছেন এমনভাবে গলাকে চেপে প্রায় খাদে নামিয়ে বললেন, আলমারিটা সুন্দিকাঠের। আমরা কতটা শুনলাম, শুনলেও কী বুঝলাম, সেদিকে না গিয়ে থেমে থেমে যা বলে গেলেন, তা এই: আসামের হাউকা পাহাড়ের জঙ্গলে সুন্দিগাছের ছড়াছড়ি, রূপে-গুণে মেহগনির সমতুল্য এই গাছ বার্মা থেকে ব্রিটিশরা এনে লাগিয়েছিল। বিশাল বিশাল সুন্দিগাছের গুঁড়ি-কাণ্ড গৌহাটি থেকে ব্রহ্মপুত্রে ভেসে ভেসে কিছু পথ, তারপর কাছাড় জেলার ভেতর দিয়ে বরাক নদীতে আবার টানা সাঁতারে সুরমা-কুশিয়ারা হয়ে শেষমেশ সিলেটের কাজির বাজারে কাঠগোলায় এসে ভিড়ত। অল্প কথায় এত দীর্ঘ পথ, নদীর পর নদী পাড়ি দিয়ে বাবাকে হতোদ্যম মনে হলো না।

আমরা একে অন্যের দিকে তাকালাম।

মৃত্যু-পরবর্তী আচার-অনুষ্ঠান শেষ হতেই আমরা যার যার কাজকর্মে ফিরে যেতে তৎপর। আমি ও আমার সব ছোট বোন চলে আসব ঢাকায়, সঙ্গে আমাদের পরিবার। আমার ভাই চলে যাবে ইংল্যান্ডের নরউইচে, অন্য বোন ক্যালিফোর্নিয়ার ছোট শহর বারস্টোতে। বাবার পক্ষে আম্বরখানার শূন্য বাড়িতে থাকা সম্ভব নয় বলে বাবা চলে আসবেন ঢাকায়, থাকবেন আমার সঙ্গে বাবারই লালমাটিয়া ডিব্লকের নিজস্ব ফ্ল্যাটে। বাবা বললেন, আলমারিটা নেব।

আলমারি এল আমাদের পিছু পিছু, আমরা ঢাকায় পৌঁছার দুই দিন পর ট্রাকে চড়ে। কালচেসবুজ তেরপলে শরীর মুড়ে ফ্ল্যাটের গেটে পৌঁছানোর খবর পেয়ে বাবা তড়িঘড়ি স্যান্ডেলে পা গলাতে গলাতে নিচে নেমে গেলেন। শীতকাল, তারপরও থেমে থেমে বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়ছিল। তেরপলের গায়ে বিঁধতে গিয়ে ফোঁটাগুলো থেবড়ে থেবড়ে যাচ্ছিল। দেখলাম, বাবা গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। ফ্ল্যাটের সামনের রাস্তায়, ট্রাকের প্রায় গা-ঘেঁষে। বৃষ্টিতে এঞ্জিন-বন্ধ ট্রাক বা তেরপল যত না ভিজছে, তিনি ভিজছেন তার চেয়ে বেশি। সাদা আদ্দির পাঞ্জাবি ঘাড়ে-পিঠে লেপ্টে একাকার। বৃষ্টির ছাটে চশমার ঝাপসা কাচে ভোরের টাটকা ভেজা আলো।

বৃষ্টি ধরে আসতে তেরপলের দড়াদড়ি খুলে চারজন জোয়ান বেশ কিছুক্ষণ কসরত চালাল। কিন্তু কিছুতেই যখন ট্রাকের পাটাতন থেকে আলমারিকে বিচ্ছিন্ন করা গেল না, আমি আলো-দপদপ বাবার চোখে-মুখে এক চিলতে হাসির ঝিলিক দেখা দিয়েই মিলিয়ে যেতে দেখলাম। চারজনের সঙ্গে আরও দুজন যোগ হতে 'হেইও জোয়ান হেইও, ধরো মাস্তান হেইও' শোরগোলের মধ্যে ঘাড়-মাথাহীন শরীর দুলিয়ে আলমারিটা কাত হয়ে শুয়ে, কখনো খাড়া হয়ে, আবার কাত হয়ে ফ্ল্যাটের কারপার্কের ভেতর আড়াল হলো। তারপর আগে যা ভাবিনি তা-ই হলো। দেখা গেল, সিঁড়ি দিয়ে কিছুতেই ওঠানো সম্ভব নয়। এক হতে পারে মিস্ত্রি ডেকে পাল্লা, তাক-টাক খুলে, পুরো কাঠামোটাই ঠুকে ঠুকে সাবধানে আলগা করে যদি ওপরে, মানে চারতলায় নিয়ে আবার পেরেক ঠুকে, কবজা, চ্যানেল বসিয়ে সুন্দিকাঠের মায়ের আলমারিকে তার হবহু চেহারাটা ফেরত দেওয়া যায়।

কারপার্কের মোটামুটি নিরুপদ্রব একটা জায়গায় আলমারিকে দাঁড় করিয়ে বাবা ওপরে উঠে আসতে তাকে খুব যে আশাহত মনে হলো, তা না। চোখ থেকে চশমা খুলে ভেজা পাঞ্জাবির হাতায় কাচ মুছে ঝাপসা চশমাটাই নাকে চড়ালেন। তাকে যথেষ্ট স্থির ও অনুত্তেজিত দেখাচ্ছিল। যদিও সে-সময় কিছুটা হলেও তাকে অস্থির ও হতাশ দেখানোর কথা। নাজমা, আমার স্ত্রী চুপিচুপি এক ফাঁকে বলল, আব্বার জন্য খারাপ লাগছে। মিশু, আমাদের বারো বছরের মেয়ে দুপদাপ পায়ে নিচে থেকে আলমারিটা সরজমিনে দেখে এসে বলল, দাদা কি তার কাপড়চোপড় এখন থেকে কারপার্কে রাখবেন? ব্যাপারটা আমাকেও ভোগাল। এত পথ পাড়ি দিয়ে আলমরিটা এল, জন্মের পর তো ঘরের বাইরে বেরোয় নি, অথচ এখন ঘরে ঠাঁই পাচ্ছে না। বাবার আক্ষেপ হওয়ার কথা। তবে আমরা জানলাম, মুখে প্রকাশ না করলেও আক্ষেপ বা যন্ত্রণা যা-ই হোক, বাবা নিজের ভেতরে চেপেচুপে পুষে রেখেছেন। সেদিন দুপুরে বাবা সবার সঙ্গে শান্তভাবে ভাত খেলেন। খেয়েদেয়ে নিজের ঘরে শুয়ে শুয়ে সকালের খবরের কাগজ নেড়েচেড়ে টানা ঘুম দিয়ে উঠতে আমরা অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, তাকে খুব তরতাজা ও চাঙা দেখাচ্ছে।

সেদিন সন্ধ্যা নামতেই ঝুপঝুপ বৃষ্টি। একে ঠাণ্ডা, তার ওপর অসময়ের উপলক্ষহীন বৃষ্টি। দরজা-জানালা আটকে রাতে ডিম-খিচুড়ি চলবে কি না, এ নিয়ে নাজমা যখন কিছুটা দোটানায়, এমন সময় মিশু এসে খবর দিল, দাদা একা একা কথা বলছেন, মনে হয় দাদুর সঙ্গে। খবরটা মনে হলো আমার আগেই জানা উচিত ছিল। আলমারিটা তো মায়েরই ছিল, মা নেই বলেই একে টেনেহিঁচড়ে ঢাকায় আনা। আর আমরা ভাই-বোনেরা তো ধরেই নিয়েছিলাম, মায়ের শ্বাসপ্রশ্বাসময় আলমারির পাল্লা খোলামাত্র বাবা মাকে পেয়ে যাবেন। সত্যি সত্যি তাহলে পেয়ে গেছেন। তবু ওপরে যে তোলা গেল না, নিচে পড়ে রইল, এ নিয়ে চিনচিনে একটা দুঃখবোধ থেকে গেল।

রাত বাড়তে বৃষ্টি জোরালো ঝড়ে রূপ নিল, সঙ্গে আকাশ ভেঙে ঠাস্ ঠাস্ অঝোরে শিল পড়ার শব্দ। খাবার টেবিলে বসতে বসতে বাবা আমাদের চমকে দিয়ে বললেন, শোনো। কাকে বললেন? মুহূর্তের জন্য আমি ভাবলাম, তিনি হয়তো বলবেন, নিচে বৃষ্টির ছাটে আলমারিটা ভিজে যাচ্ছে, একটা কিছু করা দরকার। কিন্তু চোখ তুলে তাকিয়ে তার চেহারায় দুশ্চিন্তায় ছাপটাপ দেখলাম না, বরং ঝড়-ঝাপটা-শিলাবৃষ্টির কোলাহল ছাপিয়ে মনে হলো এক অলস প্রশান্তি তার চোখে-মুখে ছেয়ে আছে। মনে পড়ল, বিকেলে ঘুম থেকে ওঠার পর তাকে খুব তরতাজা আর চাঙা দেখাচ্ছিল। বাবা আবার বললেন, শোনো। অবাক হলাম, আমাকেই বলছেন। কিন্তু যতটা মনোযোগ দাবি করে স্বল্প বিরতিতে দু'বার ‘শোনো’ বললেন, সে তুলনায় যা শুনলাম--শুধু আমি না, নাজমা, সেই সঙ্গে মিশুও-- তাকে মেলাতে গিয়ে খানিকটা বেকায়দায় পড়তে হলো। বাবার পরনে গলাবন্ধ হালকা নীল সোয়েটার, সকালে বৃষ্টিতে ভিজেছেন বলে হয়তো গলার স্বর ভারী ভারী, বসার ভঙ্গিতে বিকেলের তরতাজা ভাব বজায় থাকলেও কথা বলার ধরনটা কিছুটা এলানো, খেইহারা। বাবা বললেন, এই রকম ঝড়-বৃষ্টি ছিল তোমার মায়ের আর আমার বিয়েতে। শিলও পড়ছিল খুব। বাবার মতো স্বল্পভাষী মানুষ খাবার টেবিলে গরম গরম খিচুড়ি সামনে নিয়ে নিজের বিয়ের গল্প ফেঁদে বসবেন, আমার বা নাজমার ধারণায় ছিল না। মিশু উগ্রীব হয়ে জানতে চাইল, রাতে বিয়ে ছিল? বাবা বলে চললেন, বৃষ্টিতে প্যান্ডেল ভিজে বাঁশ-টাসসহ ভেঙে পড়ল ঠিক বরের স্টেজের ওপর। না, মফস্বলে তখনো রাতে বিয়ে চালু হয়নি। দুপুরবেলা, ঠিক যখন রাণীর এজিন নিয়ে ভেতরবাড়ি থেকে আমার দুই চাচা ফিরে আসছেন, তখনই। টিপটিপ বৃষ্টি ছিল আগে থেকেই, তবে হাওয়াটা ওই সময় হঠাৎ জোরে তুফানের মতো উঠল। তোমার দাদা তো রেগে ফায়ার। প্যান্ডেলের নিচ থেকে আমাকে যখন টেনে বের করা হলো, কী অবস্থা! ময়লা পানিতে শেরওয়ানি ভিজে গেছে, চোস্তপায়জামায় কাদা। আর পাগড়ি তো খুঁজেই পাই না। সেটাকে মওকা বুঝে তোমার ছোটমামা মাসুক কোন ফাঁকে বগলদাবা করে পালিয়েছে। সিক্সে পড়ত, বলে কী, টাকা ছাড়া দেবে না। পাঁচ শ টাকা চায়, সে আমলে, বোঝা! ও যে কত বড় জালিম ছিল ছোটবেলায়, ভাবতে পারবে না। একবার আমার কোটের দুই পকেট ভর্তি করে পেশাব করে রেখেছিল। এখন চিন্তা করো, কত নামি সায়কিয়াট্রিস্ট, বোমা মারলেও মুখ থেকে একটা ফাজিল ওয়ার্ড বের করতে পারবে না। তবে ছোটবেলায় হি ওয়াজ রিয়েলি নটি, অ্যান্ড অলওয়েজ লাভড টু প্লে নটি উইথ মি। এত দূর এসে বাবা মাথা নিচু করে ধোঁয়া-ওড়া খিচুড়িতে হাত দিলেন। মিশু সঙ্গে সঙ্গে হইচই করে উঠল, তারপর তারপর? বাবা একটু সময় নিয়ে, যেন কী বলছিলেন তার খেই খুঁজে বললেন, এমন সময় শুরু হলো শিল পড়া! একেকটা ইয়া বড়, বলতে বলতে টেবিলে রাখা ভুনা ডিমের ডিশ দেখিয়ে মোক্ষম তুলনা করলেন, এর চেয়েও বড়, হাঁসের ডিমের সাইজের।

বাইরে তখনো খুটখাট খুচরা শিল পড়ার আওয়াজ পাচ্ছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল, আকাশ উজাড় করে হাঁসের ডিমের আকারের অযুত-নিযুত শিল গোলার মতো পৃথিবীর দিকে ছুটে আসছে, কুসুমভাঙা ঠাস্ ঠাস্ আওয়াজ বাতাসে তরঙ্গের পর তরঙ্গ তুলছে। টিনের চালায়, কংক্রিটের ছাদে, ডিশ অ্যান্টেনায়, বুড়িগঙ্গার ঘোর কালো জলে, পার্কে, স্টেডিয়ামে, গাছের মগডালে উজ্জ্বল হলদে আঠালো কুসুমের ঢল নামছে।

মিশুর গলায় বারকয়েক ‘তারপর তারপর’ শোনার পরও বাবা মাথা নিচু করে ধীরেসুস্থে কয়েক চিমটি খিচুড়ি মুখে পুরলেন। একসময় যখন মুখ তুললেন, তার চোখ দেখলাম আমার দিকেই তাক করা। গল্প শোনার যত আগ্রহই মিশু দেখাক, তিনি যেন ঠিক করেছেন তার সরাসরি শ্রোতা হতে হবে আমাকেই, অন্যরা শুনবে শুনুক। মুখের খাবার চিবিয়ে এক ঢোক পানি খেয়ে বললেন, আলমারিটা সুন্দিকাঠের প্রথমে বুঝতে পারিনি। কেউ কথা বলল না। বাবা এগোলেন, আসামের হাউকা পাহাড়ে বড় বন্য প্রাণী, মানে বাঘ-টাগ ছিল না। গাছপালা ছিল প্রচুর, তবে জঙ্গলই বেশি, বাঁশ-বেতের জঙ্গল। বিশেষ করে বিরনি চাল রান্নার উপযোগী চিকন নরম সুগন্ধি ডলু বাঁশ হতো খুব। ব্রিটিশরা ঠিক করেছিল, জঙ্গল আবাদ করে নামি-দামি গাছ লাগিয়ে রিজার্ভ টিম্বার ফরেস্ট করবে। লাগানো হলো গাছ, সেগুন, মেহগনি এসব। মাটি বা পানির কারণে চারা টিকল না। তখন কী মনে করে বার্মা থেকে সুন্দির চারা এনে লাগাতে খুব ভালো ফল পাওয়া গেল। শুরু হলো সুন্দির আবাদ। সেসব কত আগের কথা বলতে পারব না। তোমার নানার মুখ শোনা। উনি তো সাবডেপুটির চাকরি নিয়ে সারা আসাম চষে বেড়িয়েছেন। সিলেট তখন আসাম প্রোভিন্সের আন্ডারে, আর জান তো, করিমগঞ্জ ছিল সিলেটেরই একটা সাবডিভিশন, রেডক্লিফ হারামি করিমগঞ্জকে কেটে বেশির ভাগই দিয়ে দিল ইন্ডিয়াকে। তোমার নানার কাছে শুনেছি, আপারআসাম থেকে কাছাড় হয়ে সুন্দিকাঠের চোরাই চালান আসত শীতের মৌসুমে। নদীপথ, স্থলপথ মিলিয়ে কত দূরের রাস্তা পার হয়ে গাছের বিরাট বিরাট লগগুলো আসত, দেড় মাস দুই মাস লেগে যেত। চেরাই করার পর কাঠ না, মনে হতো পিচবোর্ড, এত হালকা-পাতলা। তবে চেরাইয়ের পর, তখন তো আর ডিহিউমিডিফায়ার ছিল না, রোদে শুকিয়ে ময়েশ্চার বের করা হতো, ওজনটা এতে আরও কমত। তোমার মায়ের আলমারি যে এত ভারী, এত লোক লাগল নামাতে, এর কারণ ড্রয়ার-ট্রয়ারগুলো অন্য কাঠের, সম্ভবত শিলকড়ই। তোমার নানা আলমারি তৈরির ভার দিয়েছিলেন তখনকার আমলে সিলেট শহরের নামজাদা ছুতার ভরত চান্দকে, নাইওরপুলে তার একটা শোরুম ছিল। কাজ পেয়ে ভরত খুশি হওয়ার পাশাপাশি ঘাবড়ে গেল। কারণ, তোমার নানা তাকে একটা ক্যাটলগ ধরিয়ে খাস ইংলিশ চেস্টের ডিজাইন দেখিয়ে হুকুম করেছিলেন, ভেতরটা ঠিক এর মতো হবে। আলমারির নেট হাইট হবে ঠিক সাত ফিট, ওপরের দিকে চারদিক বেড় দেওয়া ফ্রেমে আলগা ব্লক বসবে, হাইটটা তাতে আরও চার-পাঁচ ইঞ্চি বাড়বে। ঠাট্টা করে নাকি তোমার নানা বলেছিলেন, আমার রাণী তো বাটু না যে নাগাল পাবে না, একটু যা হালকা-পাতলা, তবে সংসার করে ওর শরীর-স্বাস্থ্য বাড়বে। আলমারির ডেপথ হবে পাক্কা তিন ফিট আর উইডথ পাঁচ ফিটের এক সুতাও কম না। ভেতরে জার্মান চ্যানেলে ড্রয়ার বসবে, যাতে হাত ছোঁয়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মাখনের ওপর দিয়ে ড্রয়ারগুলো পিছলে আসে।

বরফ-ঠাণ্ডা বিছানায় রাতে কম্বলের ভিতরে আড়াল হতে হতে নাজমা বলল, আব্বার জন্য খারাপ লাগছে। নাজমার খেয়াল নেই, সকালবেলা একই কথা সে আরও একবার একই কায়দায় উচ্চারণ করেছে। জবাব না দিয়ে ভাবলাম, বাবামায়ের বিয়েতে ঝড়-তুফানে প্যান্ডেল ভেঙে পড়ার ঘটনাটা কোনো দিন শুনিনি। বড়দের মুখে আমার জন্মের বহু আগের অনেক ঘটনার খবরই তো জানি, শুনে শুনে মনে হয় নিজের চোখে দেখা। প্যান্ডেলের ঘটনা বাদ পড়ল কী করে! আর আলমারি নিয়ে এত কথা—সেই আসামের জঙ্গল থেকে শুরু করে ভরত চান্দের ঘাবড়ে যাওয়া, তারপর হাইট-উইথ-ডেপথ একের পর এক বাবার মাথায় সাজানো থাকে কী করে! আলমারিটা অবশ্য মায়ের প্রিয় ছিল। নানার কথা ঠিক, সংসারে ঢুকে কয়েক বছরেই মায়ের লম্বা ছিপছিপে গড়নে পরিবর্তন এসেছিল। লম্বার সঙ্গে অনেকটা তাল মিলিয়ে চওড়া হয়েছিল শরীরকাঠামো। আলমারিটা মাকে মানাত। পাল্লা-খোলা আলমারির সামনে ন্যাপথ্যালিনের মাতোয়ারা সৌরভের আলোড়নে মাকে যখনই পেছন ঘুরে দাঁড়ানো দেখতে পেতাম, আমরা জেনে যেতাম আলমারিটা অবিসংবাদিতভাবে মায়ের, মা ছাড়া আর কাউকে এর উন্মুখ আধখোলা সুরভিত পাল্লার মুখোমুখি মানায় না। তার পরও এটা তো ঠিক, আমরা সুন্দিকাঠের খবর রাখিনি, আসামের পাহাড়-জঙ্গল ছেড়ে শীত মৌসুমে একের পর এক ব্রহ্মপুত্র, বরাক, কুশিয়ারা, সুরমায় ঝাক-বাঁধা কুমিরের মতো ভেসে আসার কাহিনিও আমাদের অজানা।

দু-চারদিন গেল। তারপর দশ-পনেরো। কারও মুখে আলমারি নিয়ে কথা নেই, বাবারও না। নাজমাকে বললাম, বাবাকে নিয়ে তোমার আর মন খারাপ করতে হবে না। নাজমা কৌতুহলী চোখে তাকাতে ভাবলাম, কথাটা ভেঙে কী করে বলি! তবু বললাম, বাবার কাছে আলমারির ইতিহাসটা ইমপোরটেন্ট, মায়ের চেয়ে মায়ের স্মৃতি, মানে আলমারি।

নাজমার কাছে যা প্রত্যাশিত, তা-ই করল। ঠোঁট উল্টিয়ে ইউনিভার্সিটির পয়লা সেমিস্টার পাড়ি দেওয়া সদস্য যুবতীর ঢঙে বলল, মানে?

-মানে হলো, মা বলতে তো এখন আলমারি; কিন্তু আলমারি তো আলমারিই, সুন্দিকাঠের। মা তো না, রাণী তো না। আবার বলবে, মানে?

-হ্যাঁ, বললাম।

আমি ধ্যাৎ বলে ব্যালকনিতে পা ফেলতে দেখি, একটা বড় চ্যাপ্টা গামলায় ডিটারজেন্ট গুলে ফুলে ওঠা উপচানো ফেনায় বাবা তার টিয়া রঙের পাঞ্জাবিটা একটু একটু করে ছাড়ছেন।

মাসখানেক যেতে আলমারি-প্রসঙ্গ যখন মাথা থেকে একরকম উধাও, তখন একজন কাঠমিস্ত্রির খোঁজ করতে যাকে পাওয়া গেল, সে প্রথমে খুচরা কাজে আপত্তি জানাল। পরে কী ভেবে বলল, দেখি। আলমারি দেখিয়ে কাজটা বুঝিয়ে দিতে সে বলল, পুরান লাকড়ি, খুইল্যা আবার ফিটিং করণে সমস্যা। কন তো কাইট্যা ছুডুমুডু একখান বানায়া দেই। ম্যালাদিনের পুরান কাঠ, চাপালিশ।

আমি বললাম, না না, সুন্দি।

--আবার কন।

--সুন্দি, সুন্দি। আসামের জঙ্গলে হয়।

—চাপালিশ।

--আরে সুন্দি। আসামের গহিন জঙ্গলে সুন্দি গাছের ছড়াছড়ি। ইংরেজ সায়েবরা এনে লাগিয়েছিল বার্মা থেকে। কত বড় বড় নদ-নদী পার হয়ে এই কাঠ আসত, একেকটা চালান দেড় মাস দুই মাস লাগত আসতে।

--সুন্দি-মুন্দি চিনি না।

—এটা সেই সুন্দি।

--চাপালিশ ছার, দ্যাশে ভরা।

--সুন্দি।

--চাপালিশ, চাপালিশ।

লোকটা দাঁড়ায় না, দাঁড়াতে তাকে আমিও বলি না।

এক সকালে বাবা বললেন, সুন্দির আসল গুণটা কিন্তু কাঠে না। কাঠ তো সবই ভালো, যদি না পোকা ধরে। সুন্দির আসল যা বৈশিষ্ট্য তা এর গায়ের গন্ধ-পাকা জামরুলের ঘ্রাণের মতো একটা মিষ্টি গন্ধ থাকে কাঠে। পালিশবার্নিশের পরও ঘ্রাণটা মুছে যায় না।

কাজকর্মব্যস্ততার মধ্যেও কীভাবে কিসের সঙ্গে যে জড়িয়ে পড়ি, নিজেরই অবাক লাগে! একদিন অফিসে বসে এক সহকর্মীকে সুন্দিকাঠের গল্প শোনাই। শেষমেশ এও বলি, মায়ের আলমারি, মারা যাওয়ার পর আমরা যেটাকে প্রচুর মেহনত করে ঢাকায় নিয়ে এসেছি, কিন্তু আজও ঘরে তুলতে পারিনি, সেটা অকৃত্রিম সুন্দিকাঠের।

অনেক দিন পর এক সন্ধ্যায় হোমওয়ার্ক ফেলে মিশুকে কানে মোবাইল চেপে থেমে থেমে টেনে টেনে কথা বলতে দেখে খটকা লাগে। শুনতে গিয়ে ভীষণ যে অবাক হই, তা না।

মিশু তার বন্ধুকে সুন্দি গাছের রূপকথা শোনাচ্ছে। বলতে গিয়ে নিজের অপছন্দের জায়গাগুলো আবার কাটছাটও করছে। হাউকা পাহাড়কে যে কেন হালনা বলছে, বুঝলাম না। তবে জামরুল হয়তো চেনেই না, তাই তো বলছে, কাঠের গায়ে যে কী মিষ্টি গন্ধ! একদম স্ট্রবেরির, খেয়ে ফেলতে ইচ্ছা করে।



রচনাকাল
২০০৮


২টি মন্তব্য:

  1. সুন্দি কাঠের mythটা কয়েকটা বাক্যে ভেঙে দিলেন, কিন্তু সেটা আর বিস্তৃত করলেন না, লেখার মহিমা এর মধ্যেই। কি চমৎকার গল্প! ওয়াসি আহমেদকে অভিবাদন!
    - দীপেন ভট্টাচার্য

    উত্তরমুছুন
  2. আমার ছোটমামার নাম মাসুক। আমার নানীর এইরকম সাত ফিট উঁচু গাঢ় বাদামী রঙের আলমারি ছিল। নানানানী নেই। আলমারিটাকে জড়িয়ে ধরে গতবার কত কেঁদে এসেছি। ওয়াসিভাইকে অশেষ ধন্যবাদ এমন অপূর্ব গল্পের জন্য।

    উত্তরমুছুন