বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২২

হাবিব আনিসুর রহমানের গল্প : পাথর


আমি পাথরগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলাম অপলক চোখে। বিদ্যুতের আলোয় ধবধবে সাদা সিরামিকের বাটিতে চকচক করছিল ছোটো ছোটো লাল নীল সবুজ রঙিন পাথরগুলো! দোকানের ভেতর বসে থাকা লোকটার দিকে তাকিয়ে বললাম -- নীলা আছে আপনার কাছে?

লোকটার পরনে সাদা লুঙ্গি সাদা ফতুয়া। হাতের দশ আঙুলে দশটা আংটি। দু’হাতের কব্জিতে দুটো কালো ব্রেসলেট, তাতেও পাথর বসানো। মাথায় সাদা বাবরি চুল। বুক পর্যন্ত ঝুলে পড়া লম্বা দাড়ি তার সাথে পাকানো বড়ো গোঁফ, সব সাদা। লোকটার বয়স ষাট পঁয়ষট্টি হবে। কিন্তু শক্ত সুঠাম দেহ। আমার চোখে চোখ রেখে লোকটা কিছু বলতে গিয়েও বললো না! বাধ্য হয়ে আবার জিজ্ঞাসা করলাম -- নীলা আছে আপনার কাছে?

কোনো কথা না বলে সে ঝুঁকে পড়ে তর্জনী দিয়ে বাটির পাথরগুলো সরাতে লাগলো। একটা তুলে এনে ছোট্ট পিরিচে রেখে আমার সামনে তুলে ধরল, কিন্তু কোনো কথা বলল না এবারও। তার এই নিরবতায় ভিতরে ভিতরে ফুঁসছিলাম আমি। একবার মনে হলো ধমক দিয়ে বলি, কথা বলছেন না কেনো? পিরিচের ওপর স্বচ্ছ নীল রঙের পাথরটার ওপর আলো পড়ে চকচক করছিল। বললাম-- এটা নীলা? সে মাথা নাড়লো অর্থাৎ নীলা।

দিন চারেক আগে একদিন সন্ধ্যা থেকে রাত এগারটা পর্যন্ত বড়ো বড়ো দোকানগুলোতে যখন নীলা খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত হয়ে বেরিয়ে আসছিলাম তখন ডায়মন্ড হাউসের সামনে দেখা নকীব আশরাফীর সাথে, আমাকে বললো-- নীলা খুঁজছো, পেয়েছো এখানে?

বললাম-- হ্যাঁ এখানে আছে তবে দাম...।

সে আমার হাত ধরে দূরে সরিয়ে এনে বলল-- শোনো, ডায়মন্ড হাউসগুলোতে আকাশ ছোঁয়া দাম চায়, এরা সব দু’নম্বরী, এই একই পাথর তুমি অন্য জায়গাতে পাবে খুব কম দামে।

বললাম-- কোথায় সেটা?

আশরাফী বলল-- গুলশান লেকের পূবদিকে, শাহজাদপুর গলির ভেতর পুরনো মসজিদের পাশে প্রাচীন একটা বটগাছ আছে, দেখবে ওই গাছটার নিচে ছোট্ট একটা দোকান, নাম চিশতিয়া, ওখানেই একটা কালো লোক বসে থাকবে, বয়স্ক কিন্তু বেশ গাট্টাগোট্টা, নাম জামাল চিশতি, তাকে বললেই পাবে। নকীবের কথাতেই এখানে এসে পেয়ে গেলাম চিশতিয়া।

আমি চাঁদটার দিকে তাকালাম, রাত বাড়ার সাথে সাথে চাঁদের আলোও বাড়ছে। চারপাশটা আলোর বন্যায় ভাসছে। চিশতিকে জিজ্ঞাসা করলাম-- এটা আসল পাথর?

সে এবার তার মুখটা ওপরনিচ করলো, অর্থাৎ হ্যাঁ আসল।

বললাম-- দাম কতো বলেন? কথাটা বলেই চিন্তা করতে লাগলাম, কাল রাতে ডায়মন্ড হাউসে আমাকে এই পাথরটাই দেখানো হয়েছিল, দাম বলেছিল পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা!

কোনো নীলাই অভিজ্ঞ জ্যোতিষের পরামর্শ ছাড়া পরা উচিৎ নয়। নানান কথা ভেবে আমি যখন বিখ্যাত জ্যোতিষ শাহ আযম মাশরাফীর সামনে বসেছিলাম তখন তিনি আমার জীবনবৃত্তান্ত শুনে বলেছিলেন, দেখি আপনার ডান হাতটা। গভীর ভাবে হাতের রেখাগুলো পর্যবেক্ষণ করে বলেছিলেন-- এখন খুব যন্ত্রণার মধ্যে সময় কাটছে আপনার, এইসব যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে একটা রত্ন লাগবে, লাগবে মানে খুব জরুরি। জ্যোতিষ মাশরাফী বলে যাচ্ছিলেন... এখন আপনার খাঁটি নীলার আংটি লাগবে আট রত্তি ওজনের, এর কম হলে চলবে না, নীলা ব্যবহার করলে আপনার জ্ঞান,গাম্ভীর্য, বৃদ্ধি পাবে, শনি গ্রহ থেকে ভালো প্রবণতা এনে অতিরিক্ত ভোগ প্রবণতা কমাতে সাহায্য করবে। শেষে একবার থামলেন মাশরাফী তারপর বললেন, নীলা ধারণ করলে অবৈধ যৌন সম্পর্কের ইচ্ছা নষ্ট হয়ে যাবে। খাঁটি নীলা পাথর আমার এখানে আছে, ইচ্ছে করলে নিতে পারেন, দাম পড়বে তিরিশ হাজার টাকা ।

পিরিচে রাখা নীল কিন্তু খানিকটা হালকা বেগুনি রঙের সুন্দর পাথরটার দিকে তাকিয়ে বললাম, দাম বললেন না, কতো?

অস্বাভাবিক কন্ঠ চিশতির, বেশ কর্কশ গলায় বলল-- এক হাজার টাকা।

আমি অবাক হয়ে বললাম-- এক হাজার! আমি দু’জাগায় জিজ্ঞেস করেছি তারা দাম বলেছে অনেক টাকা, তাহলে ?

সে ফ্যাশফেশে কন্ঠে বললো-- আপনে কি একদম খাঁটি নীলা চান?

-- হ্যাঁ, অবশ্যই খাঁটি নীলা চাই, আমি বললাম।

চিশতি দোকানের ভেতর থেকে একটা ভারি লোহার বাক্স এনে দুটো তালা খুললো তারপর ভেতর থেকে একটা কৌটা বের করল, কিছু সময় নিয়ে তার ভেতর থেকে একটা আংটি বের করে সাদা পরিষ্কার কাপড় দিয়ে মুছে আমার হাতে দিয়ে বললো-- খাঁটি নীলা বসানো দেখেন।

আমি খুব ঠান্ডা মাথায় পাথরটা দেখতে লাগলাম, লোকটা দোকানের ভেতরের অতিরিক্ত বাতিটা জ্বেলে দিয়ে বলল, এখন ভালো করে দেখেন।

দেখলাম কারুকার্য খচিত রুপোর সাদা আংটির মধ্যে বসে আছে স্বচ্ছ নীলবর্ণ কিন্তু খানিকটা হালকা বেগুনি রঙের অপরূপ সুন্দর পাথরটা! বাল্বের উজ্জ্বল আলোয় চক চক করতে লাগল। আংটি দেখে একেবারে মুগ্ধ, বিস্মিত আমি, ভাবলাম আগেরটা এক হাজার চেয়েছে এটা হয়তো পাঁচ হাজার চাইবে এই তো, এটাই নেবো আমি। বললাম-- এটা কোথাকার নীলা বলতে পারেন?

--কাশ্মীরের, নির্বিকার চিত্তে বলল সে।

-- এখানে আসলো কি করে,আপনারা কি ইমপোর্ট করেন?

--ইন্ডিয়ার এইসব জিনিস আসে চোরাপথে, এগুলো আপনি কোনোও হাউসে পাবেন না, এটা কাশ্মীরের খাঁটি নীলা, খুব ভালো করে দেখেন।

--আপনি কি ইন্ডিয়া যান?

-- হ্যাঁ, আজমীর শরীফ বাবার ওরশে যাই, তখন এগুলি আনি।

আমার মনে হলো সে আমাকে মিথ্যে বলছে না। বললাম-- এখন দাম বলেন?

চিশতি বলল-- বিশ হাজার টাকা, একটা পয়সাও কম হবে না।

-- পনের হাজার দিলে হবে? যদি হয় তাহলে এখনই নিয়ে যাবো আংটিটা।

সে মাথা নেড়ে আমার হাত থেকে আংটিটা নিয়ে কৌটার মধ্যে পুরতে যাচ্ছিল। আমি মানা করলাম, একটু দাড়ান।

পকেট থেকে টাকা বের করে গুণে দেখলাম, মোট পনের হাজার সাতশো পঞ্চাশ টাকা আছে। ওর হাতে টাকাটা দিয়ে বললাম, এখানে মোট পনের হাজার সাতশো পঞ্চাশ আছে, আগামীকাল বাকি টাকাটা দিয়ে যাবো, আংটিটা আমাকে দিয়ে দিন।

আমার আশঙ্কা হলো আমি এখন এটা নিতে না পারলে অন্য কেউ নিয়ে যাবে, কারণ এটা খাঁটি নীলা বসানো আংটি, চোরাপথে মাঝে মাঝে এমন মহামূল্যবান জিনিস চলে আসে, যারা এসব পাচার করে তারা নগদে যা পায় তা নিয়েই ছেড়ে দেয়।

লোকটা আমার কথা শুনে হ্যাঁ না কিচ্ছু বললো না, আংটিটা কৌটার মধ্যেই রেখে তালা দিয়ে দিল বাক্সে।

বাধ্য হয়ে বললাম, আচ্ছা সকালে দোকান খুলবেন কটায়?

-- দশটায়।

ঘড়ি দেখলাম। এখন রাত এগারটা। তখনও চারপাশের সবকিছু ভাসছে চাঁদের আলোয়।

গাড়ি ডান দিকে ঘুরালাম। সোজা আমার পার্কিং-এ গাড়ি রেখে লিফটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম আমি। দারোয়ান গনি নিত্যদিনের মতো আজও সালাম দিল আমাকে, কিন্তু আজ হঠাৎ প্রশ্ন করে বসলো-- স্যার, ম্যাডামরে দেখিনা কয়দিন, খাওন আইনা দিতে হইবো?

-- না, না, খাবার লাগবে না।

রাত বাড়ার সাথে সাথে চাঁদের আলোর তীব্রতা বেড়ে চলেছে। আমি আমার ফ্ল্যাটের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। উত্তর দিকে তাকালাম। দূরে হাইওয়ের দিকে চোখ গেল, ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে শাঁ শাঁ ছুটে যাচ্ছে গাড়িগুলো। নিচে তাকাতেই চোখে পড়লো সামনের গার্ডেনের পাশের সবুজ লনে দাঁড়িয়ে আছে গনি মোল্লা, তার পাশে মোটাসোটা একটা জাগুয়ার, না না একটা বিড়াল, কালো কুচকুচে গায়ের রং, আমি পাঁচতলার ওপর থেকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি বিড়ালটা, দুটো চোখ জ্বলজ্বল করছে।

রাত পৌনে বারটা। হঠাৎ মনে হলো দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে কেউ দাঁড়িয়ে আছে, ফিসফিস করে কথা বলছে! দ্রুত দরোজা খুলে ফেললাম। ঝিরঝিরে একটা বাতাস এসে ঢুকে পড়লো ঘরের ভেতর, আমার সামনে কেউ নেই! এখন খেতে হবে কিছু তারপর ঘুম।

কিন্তু ঘুমের বড়িতে কোনো কাজ হচ্ছে না এই কদিন! ফ্রিজে সকালে কেনা পাউরুটি আর ডিম ছিল টেবিলে এনে রাখলাম। ফ্রেশরুমে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে কিচেনে ঢুকলাম। ডিম ভাজি দিয়ে রুটি খেয়ে শুয়ে পড়লাম।

রাতে ঘুম আসে না কিছুতেই। আমার মনে হয়, আমার ঘুমের খুব দরকার, একটা বড়ি খেলে ঘুম আসতে চায় না, আজ দেড়খানা বড়ি খেয়ে নিলাম, তারপর ঢকঢক করে পানি। সময় যেতে লাগলো। তবু আমার ঘুম আসতে চায় না কিছুতেই, আধো ঘুম আধো জাগরণের ভেতর আমার ভেতরটা তোলপাড় করতে লাগলো। আজকে গাড়ি থেকে নামতেই গনি বললো, ম্যাডামরে দেখিনা কয়দিন। নিশ্চয়ই গনি আর সিকিওরিটির লোকগুলো আমাদের স্বামী-স্ত্রীর বিষয় নিয়ে নানান কথা বলবে। শারমিন অধ্যাপকের মেয়ে বলে সব সময় নীতিকথা শোনায়, পরোক্ষভাবে বোঝাতে চায় সে আর তার বাবা-মা খুব ভালো। বাবাকে ভালো বলে কিন্তু তার স্বামী অর্থাৎ এই আমি আদনান শরীফ, কই আমাকে তো শারমিন ভালো বলে না কখনও! ওর বিশ্বাস আমি যে পেশাতে আছি সেটা খুব খারাপ, ঠিকাদারীর সাথে পার্টির একজন কনিষ্ঠ লিডার আদনান ভাই,তার সাথে আমার চলাফেরাও ভালো লাগে না ওর! রাগ করে বাপের বাড়ি যাবো যাবো করে শেষ পর্যন্ত চলেই গেলো, এতো করে বললাম, আমার এখন খুব খারাপ সময় যাচ্ছে, একটা বিশাল কাজ ঝুলে আছে সামনে, ওটা পেয়ে গেলেই সব দুশ্চিন্তা চলে যাবে মাথার ভেতর থেকে, আমি আমার সাধ্যমতো সবধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, চারপাশে লোক লাগিয়েছি কিন্তু তাদের...।

শুনলো না চলে গেলো শারমিন, যাবার সময় বলে গেলো-- টাকা টাকা করে তুমি পাগল হয়ে গেছো। গত পরশু রাতে মিলা জানিয়েছিল, নওরীন গেন্ডারিয়া জিনসে বসে কফি খাচ্ছে, সাথে অপরিচিত এক লোক, লোকটাকে চিনতে পারলাম না মোটেও! তারপর থেকে ঘুরেফিরে বারবার মিলার কথাটাই প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো আমার চারপাশে...নওরীনের সাথে এক লোককে দেখলাম গেন্ডারিয়া জিনসে বসে কফি খাচ্ছে, লোকটাকে চিনতে পারলাম না!

গতকাল সকালে নওরীনকে ফোন দিয়েছিলাম, ফোন বন্ধ। রাতের বেলা আবার মিলার ফোন এলো...অদনান ভাই, একটু আগে নওরীনকে দেখলাম সেই অপরিচিত লোকটার সাথে নর্থএন্ড কফি রোস্টারে বসে কফি খাচ্ছে, আমি দুবার ফোন দিলাম কিন্তু সে ফোন বন্ধ রেখেছে।

আজ বেশ দেরী করে ঘুম ভাঙলো আমার। মনে হলো মোবাইল ফোনটা অনেকক্ষণ ধরে বাজছে। হুড়মুড় করে বিছানায় উঠে বসলাম। সমস্ত শরীর ঘেমে গেছে আমার! মনে হলো সারারাত দৌড়েছি আমি। নিজেকে খুব ক্লান্ত মনে হচ্ছে। ফোনটা এখনও বাজছে! কখন থেকে বাজছে কে জানে? ঘড়ি দেখলাম, ঠিক এগারটা। পর্দার পাশে একটু খোলা জানালা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে সমস্ত ঘরে। আকাশটা মেঘলা। বাইরে রোদ নেই। মনে হলো সারারাত বৃষ্টি হয়েছে। কেমন যেনো ঠান্ডা আর নিরবতা আমার চারপাশে। হঠাৎ মনে পড়লো- চিশতির নীলা! হায়! আমার নীলা! এখন কি হবে, মাঝ রাতের দিকে ঘুমটা এসেছিল, এখন বেলা এগারটা, দশটায় যেতে বলেছিল চিশতি। পাথরটা তাহলে হাতছাড়া হয়ে গেল নাকি? সকালে এসে নিয়ে গেল নাকি কেউ! এখন ফোনের কল হিস্ট্রি দেখার সময় নেই। নীলা হাতছাড়া করা যাবে না। দ্রুত চোখেমুখে পানি দিয়ে টাকা পকেটে পুরে কোনোরকমে নিচে নেমে গেলাম। নাস্তা হোটেলে সেরে নেব, সবার আগে চিশতির কাছে যেতে হবে।

গাড়ি থেকে নেমে দেখলাম চিশতির মুখটা মলিন। ওর মুখ দেখে ভীষণ ঘাবড়ে গেলাম আমি। পাথরটা বিক্রি করে দিয়েছে নাকি! আমার ভেতরের তোলপাড় চেপে রেখে বললাম-- দিন আংটিটা, পুরো টাকা এনেছি।

চিশতি যেটা বললো সেটা খুব খারাপ। সে বললো-- আমারতো ভীষণ ভয় করছে।

বললাম-- কেনো কেনো, ভয় কিসের?

-- কাল রাতে আপনি চলে যাবার পর একজন লোক আসছিল, সঙ্গে দুইটা মস্তান জাতীয় ছেলে, তারা যে কোনো ভাবেই হোক না কেনো খোঁজ পেয়েছে যে নীলা বসানো আংটিটা আমার কাছে আছে, আমি বলেছি আপনি পনের হাজার টাকা অ্যাডভান্স করে গেছেন সকালে এসে নিয়ে যাবেন, ওদের একজন বলেছে, আমরা পচিশ হাজার টাকা দেব, আংটি আমাদের দিন, আমি দিই নাই, বলেছি আগামীকাল সকাল পর্যন্ত দেখবো।

চিশতি মিথ্যে বলছে না, আমিও এমন আশঙ্কা করছিলাম। দ্রুত আমি পকেট থেকে বিশ হাজার টাকা বের করে চিশতির হাতে দিয়ে বললাম, তাড়াতাড়ি আংটিটা দিন আমি এখনই চলে যেতে চাই।

আংটিটা কাগজে মুড়িয়ে আমার হাতে দিতেই আমি গাড়িতে গিয়ে স্টার্ট দিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলাম, তখনই গিয়ারে হাত দেয়ার আগেই দুজন যুবক আমার পথ আগলে দাঁড়াল। একজন গাড়ির সামনে আর একজন আমার উইন্ডোর পাশে। বললাম, গাড়ির সামনে কেনো?

একজন বললো- চিশতিরে আমরা বলছি পচিশ হাজার দিমু, সে রাজি হইছে, আপনে আংটি ফিরাইয়া দেন ভাই, আংটি নিয়া যাইতে না পারলে বস আমাগো দুইটারে গুলি কইরা মারবো, আংটি দিয়া দেন ভাই।

আমি একটু ঘাবড়ে গেলেও আমি জানি আমার পকেটে একটা সাহস থাকে সবসময়, এটা এখন আমার নিত্য সঙ্গী।

উইনডোর পাশে দাঁড়ানো যুবক হঠাৎ আমার স্টিয়ারিঙের ওপর রাখা হাতটা চেপে ধরে বলল-- জলদি আংটি বাইর কর।

মনে হলো এরা কিছু চায়। পকেট থেকে পাঁচশো টাকার একটা নোট বের করে তাকে বললাম, এটা নিয়ে চলে যাও, মিষ্টি খেও।

সে জঘন্য ভাষায় গালি দিয়ে বললো-- তোরে যাইতে দিমু না, আংটি বাইর কর জলদি।

-- দেখো আংটিটা আমি টাকা দিয়ে কিনে এনেছি, তোমরা জোর করে কেড়ে নিতে চাও?

-- হ কাইড়া নিতে চাই, জলদি বাইর কর আংটি।

হঠাৎ যুবক আমার বুক পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিল । সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না। পকেট থেকে রিভলবারটা বের করে যুবকের বুকে ধরে বললাম, স্টিয়ারিং ছাড় কুকুরের বাচ্চা, গুলি করে মারবো তোকে। রিভলবার দেখে তারা ঘাবড়ে গিয়ে ছেড়ে দিল আমাকে। ওরা দুজন পিছন দিকে সরে যেতেই দ্রুত গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিলাম। ভাবলাম এখন ঘরে ফেরা ঠিক হবে না। সোজা আমি গুলশানে মিলার ফ্ল্যাটের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম। দূরে গিয়ে গাড়ির গতি কমিয়ে দিয়ে গুলশানের পরিচিত একটা রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়ালাম। নাস্তা সেরে তারপর মিলার ওখানে গেলেই হবে। এখন একটু রিলাক্স দরকার। স্টেরিওতে আমার প্রিয় গানটা ছেড়ে দিয়ে পকেট থেকে আংটিটা বের করলাম।

গাড়ির ভেতরে মাতাল করা গানের শব্দ, খুব পুরোনো সেই গানটা, বনিএমের সেই লম্বা কৃষ্ণসুন্দরী গেয়ে চলেছে-- লাভ ফর সেল...। সাড়ে বারটার দিকে ফোনের কল হিস্ট্রি দেখলাম, চারবার ফোন দিয়েছে নওরীন। নওরীনকে ফোন করার আগে আমি আংটিটা বের করে দেখতে লাগলাম ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে, সাদা রুপোর আংটির মাঝখানে চকচকে নীলা পাথরটা হাসছে আমার দিকে তাকিয়ে! আহা! একটা গাঢ় চুমু খেলাম। আঙুলে পরলাম আংটিটা, ওটা পরেই ফোন করলাম নওরীনকে। দুবার রিং বাজতেই নওরীন চিৎকার করে উঠলো-- আদনান ভাই, আমি পেরেছি, কাজটা আপনিই পাচ্ছেন।

আমি বললাম, তুমি এখনি গুলশানের স্কাই ভিউ রেস্টুরেন্টে চলে এসো, কোনো সমস্যা?

-- সমস্যা নেই তবে... লোকটা সারারাত, উহ! একেবারে হাঙরের মতো গিলে খেয়েছে আমায়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন