অন্তর্মুখী স্বভাব এবং আরো নানাবিধ হিজিবিজি কারণে অনেকদিন বই নিয়ে সেভাবে লিখি নি। অতীতে কিছু লেখার সমালোচনা বা কাটা ছেঁড়া করে লিখতে গিয়ে দেখেছি, সেখানে 'লেখক' আমির ছায়া পড়ে- এইটা হলে ভালো হত, তীক্ষ্ণ হত এইসব ভেবেছি, লিখেওছি। অনেকেই পছন্দ করেন নি। পরে আমারও খারাপ লেগেছে। সে চেষ্টা আর করি না। আসলে,লেখা ভালো কী মন্দ সে বিচার তো আপেক্ষিক। লেখা কালোত্তীর্ণ হবে কী হবে না সে বিচারও করেন স্বয়ং মহাকাল। আপাতত, খেরোর খাতায় কয়েকটি বইয়ের নাম টুকে রাখা, পাঠককে জানিয়ে রাখা লেখকের নাম ,যাঁদের লেখা আমার বিচারে অন্যরকম, উল্লেখযোগ্য, অথচ স্বল্পপঠিত।
কুলদা রায়কে সেই বিচারে স্বল্পপঠিত বলা চলে না। খুব অল্প সময়ে কুলদা অনন্য একটি স্থান করে নিয়েছেন আজকের বাংলা লেখাজোকায়। কুলদাবাবুর লেখার মূল সুরটি , এক মহান সঙ্গীতের প্রিলিউডের মতো, এই বইতে, আখ্যান শুরুর আগেই উৎকীর্ণ- "The struggle of man against power is the struggle of memory against forgetting"- মিলান কুন্দেরার The book of laughter and forgetting থেকে একটি উদ্ধৃতি। কুলদাবাবুর লেখা নিয়ে এই সব কথা ফিরে ফিরে এসেছে লেখকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে, কুলদাবাবুর লেখা বিষয়ক প্রবন্ধে। খেরোর খাতার আজকের এন্ট্রিতে সে সবের পুনরাবৃত্তি অবান্তর। তদুপরি, ইতিহাস, স্মৃতি-বিস্মৃতি, গণস্মৃতি এবং সর্বোপরি প্রাচীন ইতিহাসের ভারি, স্থবির প্রেক্ষাপটের সামনে একক প্রস্ফুটিত জীবন আর বর্তমানের ক্রমাগত প্রেক্ষাপট বদলে যাওয়ার সামনে আমাদের তুচ্ছ, গতানুগতিক জীবনের বৈপরীত্য খেরোর খাতায় আঁটে না। আমার আজকের আঁকিবুকি তবে কেন?
গুরুচণ্ডা৯ প্রকাশনের এই সংকলনটির কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা লিখে রাখা দরকার মনে হল।
বস্তুত,কিছুদিন আগে রমাপদ চৌধুরীকে উদ্ধৃত করেছিলাম ছোটো গল্প আর উপন্যাসের ভিন্ন ভাব, ভিন্ন আঙ্গিক প্রসঙ্গে।রমাপদ চৌধুরী লিখেছিলেন, “রণক্ষেত্রের দামামা বেজে উঠল। লক্ষ লক্ষ সিপাহী, সান্ত্রী, অশ্বারোহী সৈনিক ছুটে এল উন্মত্ত আক্রোশে। বিপরীত দিক থেকেও ঝাঁপিয়ে পড়ল লক্ষ লক্ষ যোদ্ধা। ... ঔপন্যাসিক তখন কোনো মিনারের চূড়ায় উঠে নোটবুকে টুকে নেবেন সমস্ত দৃশ্যটা। রাজার অঙ্গে লাল মখমলের পরিচ্ছদ, মাথার মুকুটে মণিমুক্তাহীরের জ্যোতি, সেনাপতির দুঃসাহসিক অভিযান, সৈন্যদের চিৎকার, এসবের একটা কথাও বাদ দেবেন না ঔপন্যাসিক। ... যুদ্ধ জয়ের পর সৈন্যদল দেশে ফিরবে যখন, তখনও পিছনে পিছনে ফিরবেন ঔপন্যাসিক। শঙ্খধ্বনি আর সমারোহের আনন্দ ছিটিয়ে আহ্বান জানাবে গ্রামীণা আর নগরকন্যার দল। তাও লিখবেন ঔপন্যাসিক, বর্ণনা দেবেন তাদের, যারা উলুধ্বনির আড়ালে কলরব করে উঠল। তারপর তিনি ছোটগল্প লেখককে দেখতে পাবেন পথের ধারে, একটি গাছের ছায়ায় বসে আছেন উদাস দৃষ্টি মেলে। এ কোন উন্নাসিক লেখক? — মনে মনে ভাববেন ঔপন্যাসিক। কোনো মিনারের চূড়ায় উঠল না, দেখল না যুদ্ধের ইতিবৃত্ত, শোভাযাত্রার সঙ্গ নিল না, এ কেমনধারা সাহিত্যিক! হয়ত এমন কথা বলবেনও তিনি ছোটগল্প-লেখককে। আর তখন, অত্যন্ত দীর্ঘ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ চেয়ে তাকাবেন ছোটগল্পের লেখক, বলবেন হয়ত, না বন্ধু, এসব কিছুই আমি দেখিনি। কিছুই আমার দেখার নেই। শুধু একটি দৃশ্যই আমি দেখেছি। পথের ওপারের কোনো গবাক্ষের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করবেন তিনি, সেখানে একটি নারীর শঙ্কাকাতর চোখ সমগ্র শোভাযাত্রা তন্নতন্ন করে খুঁজে ব্যর্থ হয়েছে, চোখের কোণে যার হতাশার অশ্রুবিন্দু ফুটে উঠছে — কে যেন ফেরেনি, কে একজন ফেরেনি। "
বস্তুত,কিছুদিন আগে রমাপদ চৌধুরীকে উদ্ধৃত করেছিলাম ছোটো গল্প আর উপন্যাসের ভিন্ন ভাব, ভিন্ন আঙ্গিক প্রসঙ্গে।রমাপদ চৌধুরী লিখেছিলেন, “রণক্ষেত্রের দামামা বেজে উঠল। লক্ষ লক্ষ সিপাহী, সান্ত্রী, অশ্বারোহী সৈনিক ছুটে এল উন্মত্ত আক্রোশে। বিপরীত দিক থেকেও ঝাঁপিয়ে পড়ল লক্ষ লক্ষ যোদ্ধা। ... ঔপন্যাসিক তখন কোনো মিনারের চূড়ায় উঠে নোটবুকে টুকে নেবেন সমস্ত দৃশ্যটা। রাজার অঙ্গে লাল মখমলের পরিচ্ছদ, মাথার মুকুটে মণিমুক্তাহীরের জ্যোতি, সেনাপতির দুঃসাহসিক অভিযান, সৈন্যদের চিৎকার, এসবের একটা কথাও বাদ দেবেন না ঔপন্যাসিক। ... যুদ্ধ জয়ের পর সৈন্যদল দেশে ফিরবে যখন, তখনও পিছনে পিছনে ফিরবেন ঔপন্যাসিক। শঙ্খধ্বনি আর সমারোহের আনন্দ ছিটিয়ে আহ্বান জানাবে গ্রামীণা আর নগরকন্যার দল। তাও লিখবেন ঔপন্যাসিক, বর্ণনা দেবেন তাদের, যারা উলুধ্বনির আড়ালে কলরব করে উঠল। তারপর তিনি ছোটগল্প লেখককে দেখতে পাবেন পথের ধারে, একটি গাছের ছায়ায় বসে আছেন উদাস দৃষ্টি মেলে। এ কোন উন্নাসিক লেখক? — মনে মনে ভাববেন ঔপন্যাসিক। কোনো মিনারের চূড়ায় উঠল না, দেখল না যুদ্ধের ইতিবৃত্ত, শোভাযাত্রার সঙ্গ নিল না, এ কেমনধারা সাহিত্যিক! হয়ত এমন কথা বলবেনও তিনি ছোটগল্প-লেখককে। আর তখন, অত্যন্ত দীর্ঘ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ চেয়ে তাকাবেন ছোটগল্পের লেখক, বলবেন হয়ত, না বন্ধু, এসব কিছুই আমি দেখিনি। কিছুই আমার দেখার নেই। শুধু একটি দৃশ্যই আমি দেখেছি। পথের ওপারের কোনো গবাক্ষের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করবেন তিনি, সেখানে একটি নারীর শঙ্কাকাতর চোখ সমগ্র শোভাযাত্রা তন্নতন্ন করে খুঁজে ব্যর্থ হয়েছে, চোখের কোণে যার হতাশার অশ্রুবিন্দু ফুটে উঠছে — কে যেন ফেরেনি, কে একজন ফেরেনি। "
কিন্তু বস্তুত এটি একটি দৃষ্টিকোণ মাত্র- এই সব নয়। কুলদাবাবুর বহু লেখাই একই সঙ্গে উপন্যাস ও ছোটোগল্পের ভাব বহন করেছে। গল্পের চরিত্রগুলির বহুস্তরীয় উদ্বর্তন, গল্পের কেন্দ্রে বা পরিধিতে থাকা বিবিধ জনশ্রুতি, মিথ এবং লেখায় কথকতার আঙ্গিক যেভাবে কুলদাবাবুর লেখায় এসেছে, তাকে "ছোট প্রাণ, ছোট ব্যথা ছোট ছোট দুঃখকথা- নিতান্তই সহজ সরল, সহস্র বিস্মৃতিরাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি; তারি দু'চারিটি অশ্রুজল"- এর সংজ্ঞায় আঁটানো যায় না। অধিক পরিসর প্রয়োজন হয়ে পড়ে। গুরুচণ্ডা৯র এই সংকলনে গল্পের চয়ন, ক্রম ও আয়তন কুলদাবাবুর লেখাকে পাঠকের কাছে তার সমস্ত বৈশিষ্ট্য নিয়ে পৌঁছে যাওয়ার পরিসর দিয়েছে।
যেমন ধরুন, সংকলনের প্রথম আখ্যান ' দুটি হলুদ ইলিশের গল্প'। গল্পের শুরু -" ঠাকুরদার মনে হয়েছিল আমাদের বাড়িতে একজন অতিথি আসবেন'। এই লাইনটি আমার বিচারে আশ্চর্য একটি লাইন- প্রতিটি শব্দে একে একে খুলে যাচ্ছে দরজার পর দরজা- দরজাগুলি ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতির, ভিন্ন সম্ভাবনার, ভিন্ন জগতেরও সম্ভবত। ঠাকুরদা শব্দটি অতীত ছুঁয়ে রইল স্বভাবতই,"মনে হয়েছিল " শব্দবন্ধে যে সংশয় তা আখ্যানের আসন্ন জটিলতাকে নির্দেশ করছে , আর 'অতিথি আসবেন' এর আগে পরে কোনো দিনক্ষণের আভাসটুকু না থাকা পাঠককে কৌতুহলী করে তুলছে প্রথম থেকেই। একটি লাইনের কত ব্যঞ্জনা, ঈশারা যা পাঠককে হাতছানি দেয় এমন পথে যার শুরু হয়তো আন্দাজ করা যায়, শেষ দেখা যায় না। মহৎ উপন্যাসের উপযোগী লাইন যেমন হয়। অথচ এ গল্প উপন্যাস নয়। গল্পই। অথচ, উপন্যাসকে নিজের অভ্যন্তরে বহন করছে। পাঠক এহেন গল্পে ডুব দিয়ে থই পায় না তখন; পুষ্করণীর জলের তলায় মহাসমুদ্রকে আবিষ্কার করতে থাকে সে।
কুলদাবাবু বলেন- একটি গল্পে গল্পই থাকে-জীবনের গল্প, মৃত্যুর গল্প, অমৃত্যুর গল্প। এই অমৃত্যু থাকে বলেই মানুষ গল্পটি নিজের করে নেয়। ভুলতে পারে না। আলোচিত সংকলন জুড়ে অমৃত্যুকেই প্রত্যক্ষ করেছি।আশা রাখি, পাঠকও করবেন।
[প্রাথমিকভাবে গুরুচণ্ডা৯র খেরোর খাতায় লেখা হয়েছিল]
ইন্দ্রাণী দত্ত
কথাসাহিত্যিক
অস্ট্রেলিয়াতে থাকেন



0 মন্তব্যসমূহ