“তাইর পাহাইরা কইলজা। কেমনে এমুন একটা কাম করল?” ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত আসনের মহিলা মেম্বারের মন্তব্য।
কীভাবে যে এমন একটা কাজ করলো তা কেউই ভেবে পাচ্ছে না। আর পাহাড়ের মতো কইলজা, মানে এত সাহসইবা বাবা-মরা মেয়ে ধুতুরা কোথায় পেল, তাও কারও কারও কাছে ভাববারই বিষয়। কিন্তু ধুতুরা এ নিয়ে ভাবেনি। কীভাবে, কখন, কোথায় গেল – তা ভেবে যায়নি। ঘটনা তার কাছে স্বাভাবিকই মনে হচ্ছে। যা করার কথা ছিল, সে তা-ই করেছে। উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নাসরীন আপার ডাকে ২৫ নভেম্বর একটা প্রোগ্রামে গিয়েছিল। সেখানে কোনো মেয়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেউ তার সাথে আকাম-কুকাম করলে মেয়েটির কী কী করতে হবে তা গল্প দিয়ে, নাটক করিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল। ধুতুরা তা মনে রেখেছে।
ধুতুরাদের পাড়া থেকেই এবার জয়ী ইউনিয়ন পরিষদের এই মহিলা মেম্বার বলছে, “পরনের শাড়িটা গাঙের লাহান ফাঁড়া। এ ছিঁড়া-ফাঁড়া কাপর পিন্দা ঐ থানা-হাসপাতাল আপিস-আদালত ঘুইরা আইয়া পরসে। আমগরে একবার পুছলও না!”
কাউকে না পুছা নিয়েই যত বিপত্তি। সবাই অপমানিত বোধ করছে। এ বোধ ধুতুরার থেকে উচ্চমার্গে অবস্থানজনিত জটিল মানসিকতা। ধুতুরার জন্মের আগেই বাবা ঠাটা পড়ে মরেছে। মা অন্যের বাড়ি কাজকর্ম করে ধুতুরাকে কলেজ পর্যন্ত পড়িয়েছে। সে চাকরি-বাকরি পায় না। এ-বাড়ি ও-বাড়ি ঘুরে ঘুরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পড়ায়। তাই ধুতুরার অভিভাবক যেন গ্রামের প্রত্যেকে। এমন মেয়ের উড়াউড়ি অভিভাবকের অভাব নেই।
ধুতুরা বেশি কিছু না ভেবেই বুঝেছে তার ছিঁড়া-ফাঁড়া কাপড় তো আর নিজের দোষে নয়। অন্যে তার শাড়ি ছিঁড়েছে। শরীরটাকে ফুঁড়েছে। কিন্তু মনটাকে পোড়াতে পারেনি। ঘোরাতে পারেনি। জুড়াতেও দিচ্ছে না। ধুতুরা জানে সে কোনো অন্যায় করেনি। কোনো অপরাধ করেনি। তার ওপর সংঘটিত অপরাধের বিচার চাইতে সে সংকুচিত নয়। সংশায়িত নয়। তার মনে কোনো দ্বিধা নেই। কাজেই শাড়ি ছেঁড়া না নতুন, ময়লা না ধোয়া ফকফকা – এ নিয়ে ভাবনা মাথায় আসেনি। আর তখন মগজে পোশাক বিষয়ক কোনো ভাবনাই আসেনি। মাথাটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। মনটায় শুন্য শুন্য অনুভূতি কাজ করছিল। উৎকট একটা অভিজ্ঞতার উপলদ্ধিতে সে তখন অ্যালবাট্রস পাখির মতো সমুদ্রের অপার জলরাশির ওপর যেন উড়ছে আর উড়ছে।
ধুতুরা মেম্বার-চেয়ারম্যানদের জয়-জিজ্ঞেস তো আগে বহুবার করেছে। ঘটনা না-ঘটার জন্য অনুরোধ করেছে। শুনেনি। কোনো কেউ সমাধান করেনি। এখন ঘটনা ঘটার পর আর তাদের বলে কি হবে! এসব পুছাপুছির দায়ভার সে নেবে কেন?
কাঁটা বিঁধেছে বলে ধুতুরা বাম পায়ের গোড়ালি মাটিতে চাপ দিয়ে হাঁটতে পারছিল না। তবুও সোজা চলে গেছে নাসরীন আপার অফিসে। অফিসে না পেয়ে বাসায়। আপাকে নিয়ে থানা হয়ে হাসপাতালে। ডাক্তারী পরীক্ষা করিয়ে, চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্র লিখিয়ে নিয়ে, বাজারে পাশের বাড়ির মোহনের দোকানে গিয়ে তার কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে ঔষধপত্র কিনে তবে বাড়ি ফিরেছে।
এখন রিপোর্ট নেয়া বাকি। এ রিপোর্ট এখন থানা, নাসরীন আপা আর কারা করবে করুক। ধুতুরা কোনো ফাঁক রাখেনি।
পাশের পাড়ার আরেকটা মেয়ে সাথে সাথে ডাক্তারের কাছে যায়নি বলে নাকি আলামত নষ্ট হয়ে গেছিল। প্রমাণ করতে পারেনি। নাসরীন আপা এখন যা করার করবে। তবে আরেকটা জিনিস ধুতুরা রেখেছে। সেটা পুলিশকেও বলেনি। কুকর্মার দলের সাথে পুলিশের খাতির। এটা পুলিশকে দিলে যদি আলামতটা হাতছাড়া হয়ে যায়! নাসরীন আপাকেও এটা বলেনি। সময়মতো হাজির করবে।
গ্রামে মুখে-মুখে ধুতুরার গল্প। তার মা একবার বললো, “এইডা নিয়া এতো জানান দিলি ক্যারে?”
ধুতুরার সোজা উত্তর, “জানান দিয়া অন্যায়ের কী করলাম? আমি তো অপরাধ করি নাই!”
“তর হগল সুমেই সাহস বেশি। যাক্কগা, যার নাই কেঐ হের আছে হেয়ঐ। উপরোলায় ঐ দেখবো নে” বলে অসহায় মা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
এইসব কথা মেনে বসে থাকলে যে কিছুই হয় না তা ধুতুরা জানে। বোঝে এবং মানে বলেই কারও জন্য ঠেকে থাকেনি। সোজাসুজি আইনের ঘরে গেছে।
এখানে অন্যায়ের কী হলো তা-ই তো ভেবে পাচ্ছে না। সাহসের কথা বললো দুয়েকজন।
সাহসের সাথে শারিরীক শক্তি থাকলে তো ঘটনা ঘটতো অন্যভাবে। আসামী হয়তো ধুতুরা হতো। ভোমরারে দেখিয়ে দিতো।
অন্যায় করল কে, অপরাধ করল কে আর ধুতুরার বিরুদ্ধে অপবাদ, অনুযোগ, অভিযোগ।
তবে ধুতুরা এসবের থোড়াই তোয়াক্কা করে।
“গাঙ দেখলে মুত আইয়ে আর লাং দেখলে আইস আইয়ে। তাই যহন-তহন যার তার সামনে হাসে ক্যান?” মহিলা মেম্বারের মন্তব্য।
ধুতুরা হাসে মনের আনন্দে। হাসলে গালে টোল পড়ে। আর সে টোলে তোমাকে চুমাতে হবে কেন? এ কথা কেউ বলে না। তার হাসার দোষ। গালে টোল পড়ার দোষ। ঘর থেকে বের হলে দোষ! দোষের আর সীমা-পরিসীমা নেই। তের নদী দোষ। এত নদী পাড়ি দিয়ে কি দোষ কাটানো সম্ভব!
মহিলা মেম্বার জিদে ফেটে পড়ছে। তাকে না-বলে উপজেলায় চলে গেছে। চেয়ারম্যানকে এস পি অফিসে জবাবদিহি করতে হচ্ছে কেন মেয়েটি ভোমরার বিরুদ্ধে অভিযোগ করার পরও কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
এখন ইউনিয়ন পরিষদের দলবল নিজেদের দোষ ঢাকতে ধুতুরার আচার-আচরণ বিশ্লেষণ করছে ও করাচ্ছে। পাটক্ষেত বড় হলেও ধুতুরা এর আইল দিয়ে গা ছমছম করা দুপুরে এ-বাড়ি ও-বাড়ি যাতায়াত করতো।
বিষয়টি আদালতে উঠেছে। জজ সাহেব ধুতুরার পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থান, আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে সামাজিক দায়িত্ব পালন করেছেন। নিজস্ব বিবেচনাবোধ প্রয়োগ করেছেন। মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা ও ইউনিয়ন পরিষদকে দায়িত্ব দিয়েছেন ধর্ষক ভোমরার সাথে ধুতুরার বিয়ে দিয়ে দিতে। বিয়ে-পরবর্তী সময়ে আর্থিক নিরাপত্তার জন্য ভোমরার বাবা ধুতুরার নামে বিয়ের আগে এক বিঘা জমি রেজিস্ট্রি করে দিবে।
আত্মীয়েরাও বেঁচে যায় ধুতুরার কুমারী পরিচয় ঘুচাতে পারলে। বিধবা, স্বামী পরিত্যক্ত, তালাকপ্রাপ্তদের চেয়ে কুমারী নারীর অবস্থান বেশি দুঃস্থ। তার অসহায়ত্ব বেশি। কুমারী মেয়ের কি এক অস্থাবর সম্পত্তি যেন হারিয়ে যাবে! আর হারিয়ে গেলেই গেল। অস্থাবর সম্পত্তির নামে তথাকথিত ইজ্জত-সম্মান। ধুতুরা এসব অস্থাবর সম্পত্তির সংজ্ঞায় বিশ্বাসী না।
ভোমরার মা এ মেয়েকে বৌ করে ঘরে রাখতে নারাজ। প্রকাশ্যে এ ঘোষণা না দিতে পারলেও ধুতুরার মাকে বলেছে বিয়ের পর মেয়ে মায়ের কাছেই থাকবে। ধুতুরার মায়ের তো মেয়ে ছাড়া আর কেউ নেই। আসলে ঘরে রাখবে না।
এক বিঘা জমি ও বিয়ে। এরপরও এ বিয়েতে ধুতুরা রাজি না হওয়ার কোনো কারণ, কোনো বারণ, কোনো যুক্তি, আর কী চুক্তি তা প্রতিবেশিরা খুঁজে পাচ্ছে না।
অবশ্য ধুতুরা রাজি কি রাজি না সে মতামত আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ নেয়ইনি। এমনকি জজসাহেবও না। তার পুনর্বাসনের চিন্তায়-ব্যবস্থায় আত্মীয়, প্রতিবেশি, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, সরকার, রাজনৈতিক নেতা প্রত্যেকে মাথা ব্যথায় ভুগছে। ভোমরার রাজনৈতিক পরিচয় কাউকে কাউকে একটু বেকায়দায় ফেলেছে। এক সাংবাদিকের সাথে ভোমরার অতীত সম্পর্কের জেরে পত্র-পত্রিকায় ঘটনাটি এসেছে। অবশেষে ধুতুরার নাম প্রকাশ না-করে হলেও বাড়িতে কয়েকটি চ্যানেলের টিভি ক্যামেরা এসেছে। ফেসবুকে ধুতুরার নামসহ এ খবরটির ছড়াছড়ি।
ধুতুরার মা নিজেও এ বিয়েতে রাজি না। তবে তা প্রকাশ করতে পারছে না। এদিকে ভোমরার মা আড়েঠাড়ে বুঝিয়ে গেছে, এ-দিনে দিন না। বিয়ে হোক। মামলাটি থেকে ভোমরা মুক্ত হোক। পরে বোঝাবে।
ধুতুরা নাসরীন আপাকে তার নারাজির শক্ত অবস্থানটি জানায়। কিন্তু নাসরীন আপা তবুও পীড়াপিড়ি বন্ধ করছে না। তিনি বলেন, এমন সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। তাছাড়া আদালতের রায় তো অবমাননা করা যাবে না। বিষয়টির ধুতুরাকে বুঝতে হবে। সবাই ধুতুরার মঙ্গলার্থে এর একটি মীমাংসা চাচ্ছে।
ধুতুরা দেখেছে ঘটনার সময় ভোমরার চোখের পাতা ছিল সাপের জিহ্বার মতো লকলকে। দাঁত যেন শকুনের ঠোঁট। মরা গরু খুবড়ে খাওয়ার মতো ধুতুরার শরীরে কামড় বসিয়েছে।
সাপের জিহ্বা আর শকুনের ঠোঁট গত পাঁচমাস যাবৎ শান্তিতে ঘুমুতে দিচ্ছে না, দুদণ্ডও স্বস্তিতে বসতে দিচ্ছে না। সব খাবারই বিস্বাদ লাগছে। কাজেই ধুতুরা সাপের জিহ্বা আর শকুনের ঠোঁটের সাথে প্রতিরাতে দাম্পত্য আচরণের শিকার হতে রাজি না। কিন্তু নাসরীন আপা বুঝাচ্ছেন নারীকে সাধারণত বিয়ের বাঁধনের দড়িতেই প্রতিরাতে ফাঁসি নিতে হয়। ধুতুরা বা নাসরীন এর ব্যতিক্রম কিছু নয়।
আইন-আদালত অবমাননা। অবজ্ঞা। বিয়ে। সাপের ত্রিশূলের মতো জিহ্বা ও শকুনের ঠোঁট নিত্যদিনের সঙ্গ। ধুতুরা মনে মেঘলা আবহাওয়ার মতো গুমোট ভাব নিয়ে, ত্রিসন্ধ্যার আকাশের মতো একাকিত্ব নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে।


1 মন্তব্যসমূহ
'অবশ্য ধুতুরা রাজি কি রাজি না সে মতামত আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ নেয়ইনি। /কিন্তু নাসরিন আপা বুঝাচ্ছেন নারীকে সাধারণত বিয়ের বাঁধনের দড়িতে প্রতি রাতেই ফাঁসি নিতে হয়। / কাঁটা বিঁধেছে বলে ধুতুরা বাম পায়ের গোড়ালি মাটিতে চাপা দিয়ে হাঁটতে পারছিল না। তবু সোজা চলে গেছে নাসরিন আপার অফিসে' ধুতুরাকে চেনানোর জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই লেখিকাকে। লেখাটার মধ্যে একটি শক্তি আছে, আর আছে আন্তরিকতা যা বার্তার ঘায়ে মুছে যায়নি, পাঠককে ক্লান্ত করেনি। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের নির্মোহ ও অকপট জীবন চিত্রন যেভাবে পাঠককে আলোড়িত করে, এ গল্পও তেমনি করে, স্থায়ী ছাপ রেখে যায়, ভুলতে দেয় না ধুতুরা ও তার চারপাশের গদ্যকে। কূর্নিশ জানাই লেখিকাকে।
উত্তরমুছুন