রিণি গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প : হেল্পলাইন নম্বর


বিরাট সবুজ গেটটা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেই বোঝা যায় এক স্তব্ধতার দুনিয়ায় প্রবেশ ঘটল।বাতাসও যেখানে নিঃশ্বাস বন্ধ রেখে এক অসীম রহস্যময়তার জালে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছে। এখানে ওখানে অযত্নে গজিয়ে ওঠা বট, আকাশমণি, ঝাউগাছগুলোও আকাশের দিকে মুখ তুলে নিবিড় অনুসন্ধান চালাচ্ছে বিনি সুতোয় গাঁথা সে গোয়েন্দা গল্পের; যার কোনো সমাধান কখনো হয় না! কেউ খুঁজে পায় না; আর যে পায় সে আর মনে রাখতে পারে না কি ছিল জটিলতা!কেমন করে মাকড়সার জাল কেটে জোনাকি আবার উড়ল! নিজের মনের আলোটুকু ছাড়া বাকি সবটাই তার কাছে হয়ে যায় নিকষ কালো আঁধার! সে আঁধার আলোর অধিক নয় কোনোদিনই!

ডাক্তারবাবুদের কাছে অবশ্য এসব ঘনীভূত ধোঁয়াশার তত্ত্বভেদ আছে!আছে বড় বড় নাম - ফ্রয়েড,ইউং, লাঁকা আরো কত কত... থেরাপি আছে কত ধরণের... মিউজিক থেরাপি,পাস্ট প্রোজেক্ট থেরাপি, ওয়ার্ক থেরাপি, প্লে থেরাপি, সিচুয়েশানাল থেরাপি আরো কত কি...স্নেহাশীষ বাবু তো এই ৬৪বছর বয়স পর্যন্ত একটাই থেরাপির কথা জানতেন, শক থেরাপি;তাও আবার ওই সিনেমা-সিরিয়াল দেখে।তাই প্রথম যখন গুনগুন কে অ্যাসাইলামে দেওয়ার কথা বলেন ডঃ নায়েক স্নেহাশীষ বাবু তখন আঁতকে উঠেছিলেন! অতো যন্ত্রণা দেওয়ার থেকে মেয়েটার পাগল হয়ে থাকাই বরং ভালো। স্নেহাশীষ বাবুকে বোঝাতেই ডঃ নায়েক কে কম বেগ পেতে হয়নি।

এই অবস্থায় গুনগুনকে বাড়িতে রাখাটা একেবারে সেফ নয় মি:সেন?

কিন্তু অ্যাসাইলামের যেসব খবর মাঝে মাঝে বাইরে আসে ওখানেও কি মেয়েটা সেফ!

এই অ্যাসাইলামটার সাথে আমি নিজে যুক্ত।আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি ওর প্রপার ট্রিটমেন্ট হবে এখানে।
আচ্ছা,আমি যদি বাড়িতে ২৪ঘন্টা ওর জন্য নার্সের ব্যবস্থা করি!
তাতে ওর ট্রিটমেন্ট টা কি করে হবে?? বাড়ির পরিবেশ টা থেকে ওকে বের করা দরকার!
আমি না হয় ওকে নিয়ে বেড়াতে যাব!
আপনি বুঝতে পারছেন না মি:সেন। ওর মধ্যে মারাত্মক ভাবে একটা সুইসাইডাল টেনডেনসি কাজ করছে। বাড়িতে রাখাটা রিস্ক হয়ে যাবে!

অগত্যা স্নেহাশীষ বাবুকে মেনে নিতেই হয়েছিল ডঃ নায়েক এর কথা।
যেদিন সাদা গাড়িটা গিয়ে পাড়ার ভিতরে এসে দাঁড়াল উঁকি ঝুঁকি পেরিয়ে বারান্দায়,বাড়ির ছাদে, গেটের সামনে ছোটোখাটো জটলা।অন্যের অসহায়তায় মানুষের কি নির্মম কৌতূহল! কিন্তু মেলোড্রামা দেখার আশায় জল ঢেলে দিয়েছিল গুনগুন নিজেই।কথা আর গান ছাড়া একমিনিটও যে থাকতে পারত না তার কথা বন্ধ হয়ে গেছিল সেই কবে থেকে। তিন মাস, হ্যাঁ, তিন মাস তো বটেই! স্নেহাশীষ বাবুর এখনো মনে পড়ে ছোট্ট তিন-চার মাসের গুনগুনকে ঘুম পাড়াচ্ছে ওর মা।আর ওইটুকু একরত্তি মেয়ে চোখ বন্ধ করে উ উ করে সুর করে চলেছে গলায়। সেই থেকেই তো ওর নাম হলো গুনগুন। ঘুমের মধ্যে গানের অভ্যেস অবশ্য ওর এখনো আছে।মানে ওর বাবা চলে যাওয়ার আগে অব্দিও ঘুমের মধ্যে হয় কথা বলত নয় গুনগুন করে গান গাইত! ভাই কতদিন পাশের ঘর থেকে উঠে ওকে ঠিক করে শুইয়ে দিয়ে এসেছে! সেই মেয়েটা আজ এতোগুলো দিন একটা শব্দও ব্যবহার করেনি। ডাকলে সাড়া দেয়নি;তাকায়নি পর্যন্ত! সেদিন গাড়িতে ওঠার সময়ও ও কোনো বাধা দিল না। শিল্পীর মা ওর চুলটা ভালো করে বেঁধে ওকে একটা চুড়িদার পড়িয়ে দিয়েছিল।স্নেহাশীষ বাবুই ধরে ধরে নিয়ে গিয়ে গাড়িতে ওঠালেন।উঠে পড়ল। একদৃষ্টে গাড়ির কোণার একটা জায়গায় তাকিয়ে থাকল।গাড়ি চলতে শুরু করল।
জীবনে একটা বড় ধাক্কা গুনগুন পেয়েছিল।ওর মা যখন ভাইকে ছেড়ে,ওকে ছেড়ে চলে গেল।কি মোহে যে পড়েছিল গৈরিকী! মেয়েটার কথাও ভাবল না। গুনগুন তখন ছোটো। ক্লাস ফাইভে পড়ে।ভাই আর পাঁচজন সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষের মতোই। গৈরিকী বোধহয় অন্যরকম জীবন চেয়েছিল।তাই কোনো পিছুটান রাখল না। সোমনাথের হাত ধরে বেরিয়ে গেল। গুনগুন শুধু জিজ্ঞাসা করেছিল তাতু,মা আর আসবে না?
স্নেহাশীষ বাবু কী উত্তর দেবেন ভেবে পাননি।ভাই-ই আগলে নিয়ছিল গুনগুন কে।তারপর থেকে দুই ভাইয়ের একমাত্র লক্ষ্য ছিল মেয়েটাকে সময় দেওয়া!ওর মনের মধ্যে ও যেন কোনো যন্ত্রণা পুষে না রাখে! গুনগুন মার জন্য খুব মন খারাপও করেনি। কেমন করে যেন বুঝেছিল মা'র কাছে ও আনওয়ান্টেড! তবে ওর বাপী আছে,তাতু আছে!আদরে, ভালোবাসায়,যত্নে মেয়েটার মনে কোনো দুঃখ ছিল বলে তো মনে হয়নি!
পড়াশোনা, গানবাজনা, সাঁতার সবই চলছিল।আস্তে আস্তে পেরোচ্ছিল পড়ার এক-একটা ধাপ।কলেজে উঠে থেকে তো ওরা বাপ-মেয়ে এক্কেবারে বন্ধু!দেখতে শুনতে বরাবরই ভালো মেয়েটা।তার ওপর অতো হাসিখুশি।নজরে তো পড়বেই।ওর বাবা তাই প্রথম থেকেই খোলামেলা আলোচনা করত এসব নিয়ে। গুনগুনও রোজ কলেজ থেকে এসে একপ্রস্ত গল্প করতে বসত।কোন ছেলে হোয়াটসঅ্যাপ এ কি লিখেছে।কে ক্লাসে বসে পড়া না শুনে ওর দিকে তাকিয়ে ছিল বলে প্রফেসরের বকুনি খেয়েছে।কে বন্ধুকে দিয়ে কবিতা পাঠিয়েছে। বলতে বলতে ঝলমল করত,হেসে গড়িয়ে পড়ত।ভাই জিজ্ঞাসা করত, তা, হ্যাঁ রে,তোর কাউকে পছন্দ হয়?
ধুস,কি যে বলোনা বাপী!
কেন রে?হতেই পারে?
নাআআ না, একজনও তোমার মতো নয়!
শোনো মেয়ের কথা!
স্নেহাশীষ বাবু হেসে উঠে বলতেন তুই কি সেই ছোটোবেলার মতো তোর বাপী কে বিয়ে করবি!
ইসস,কি ভালো হতো তাতু! মাই বাপী ইজ ওয়ার্ল্ডস বেস্ট বাপী!
সেই বাপী যখন দুম করে এক রাতের হার্ট অ্যাটাকে শেষ হয়ে গেল গুনগুন একটুও কাঁদেনি। কেমন পাথর হয়ে গেছিল। শিল্পীর মা,অন্য আত্মীয়-স্বজন চেষ্টা করেও ওকে কাঁদাতে পারেনি। শ্মশানে মুখাগ্নি করার সময়ও চোখ শুকনো খটখটে। শুধু যখন বডি নিয়ে চেম্বারে ঢোকানো হচ্ছে তখন বাপীর পায়ের আঙুল ধরে চেম্বারের মুখ অব্দি পৌঁছে গেছিল। বিল্টু ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয়।নইলে সেদিন বড় বিপদ ঘটতে পারত! তারপরও যে দু চারটে কথা বলেনি তা নয়।বাপীর কাজ করেছে।কলেজ যাব না বলেছে। সারাদিনে এক আধটা শব্দ হলেও বলেছে।
সেদিন সকালে উঠে স্নেহাশীষ বাবু দেখেন প্রায় ১০টা বাজতে চলল,কোনো সাড়াশব্দ নেই। শিল্পীর মা আজকাল একটু দেরি করছে। সকালের চা-জলখাবারটা ওরা জ্যেঠু ভাইঝি মিলেই করে নেয়। কিন্তু আজ এতক্ষণ ঘুমোচ্ছে!দরজা ভেজানোই থাকে।ঠেলে ঢুকেই নজরে পড়ে সামনের দেওয়ালে..
এতো রক্ত কোথা থেকে এলো?স্নেহাশীষ বাবু প্রায় আঁতকে ওঠেন। গুনগুন? গুনগুন?
এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখতে পাননা। ঘরের ভিতর ঢুকে খাটের পাশে দাঁড়াতে চোখে পড়ে খাটের কোণায় দেওয়ালের সাথে মিশে গিয়ে বসে আছে গুনগুন।ছুটে ওর কাছে গেলে ও আরো সরে যাওয়ার চেষ্টা করে।পারে না।দেওয়ালে আটকে যায়।স্নেহাশীষ বাবু আবার ডাকলে এবার ও নখ দিয়ে দেওয়াল আঁচড়াতে শুরু করে।স্নেহাশীষ বাবু দেখেন ওর পরনের ঢিলে পাজামা রক্তে মাখামাখি। মাটিতে থকথকে রক্ত।স্নেহাশীষ বাবু প্রচন্ড ভয় পেয়ে যান।কি করবেন বুঝতে না পেরে পাশের বাড়ির মৈত্র বাবুকে ডেকে আনেন।মৈত্র বাবুর স্ত্রীও আসেন।
একি! গুনগুন!কি হয়েছে! তুমি একটু দেখতো!
হ্যাঁ, গুনগুন কি হয়েছে মা? এদিকে আয়? আমার কাছে আয়?
আবার প্রবল ভাবে শুরু হয় দেওয়াল আঁচড়ানো! আঙুলের ডগা ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছোটে।
মি: মৈত্র বলেন,এই দেখুন দেওয়ালে কি লিখেছে!
লিখেছে!
হ্যাঁ,আপনি দেখেননি।
রক্ত দেখেছি।
রক্ত দিয়েই তো লিখেছে।সব হেল্পলাইন নম্বর!রেপ, অ্যাসিড অ্যাটেক, সেক্স ডিটার্মিনেশন...এসব কি সেন বাবু??
আমি বুঝতে পারছি না। মেয়েটার কি হলো!
ও এর মধ্যে কোথায় বেরিয়েছিল? ফেরার পর কিছু অস্বাভাবিক দেখেছিলেন?
কোথাও যায়নি তো। এ ক'দিন কলেজেও তো যাচ্ছে না।
মৈত্র বাবু এবার একটু ভুরু কুঁচকে তাকান স্নেহাশীষ বাবুর দিকে।বলেন,পুলিশে খবর দিতে হবে।আমি ভালো বুঝছি না।
স্নেহাশীষ বাবু হাঁউমাঁউ করে কেঁদে ওঠেন।
মৈত্র বাবু নিজেই পুলিশে খবর দেন। মহিলা কনস্টেবল একরকম জোর করেই গুনগুন কে হসপিটালে নিয়ে যায়। মুখটা ভালো করে ঢেকে দেয়। আফটার অল রেপ ভিক্টিম! গুনগুনের নানারকম শারীরিক পরীক্ষা হয়। পুলিশ তো প্রায় রেডি এফ আই আর লিখবে বলে। সন্দেহের তীর অবশ্যই বাড়ির একমাত্র পুরুষ স্নেহাশীষ বাবুর দিকে।এ নিয়ে মি: মৈত্রর সঙ্গে একদফা আলোচনাও হয়ে গেছে।
কিন্তু ডাক্তারের রিপোর্ট সম্পূর্ণ অন্য কথা জানায়। কোনোরকম কোনো হ্যামারেজের কোনো চিহ্নই নেই। শুধু তাই নয়, শি ইজ স্টিল ভার্জিন। ব্লিডিং কজেস ফর মিনস্ট্রুয়েশন। বাট শি হ্যাজ সাম মেন্টাল শক। প্লিজ কনসাল্ট উইথ সায়কায়াট্রিস্ট!
তারপরই স্নেহাশীষ বাবু নানাজনের পরামর্শ নিয়ে ডঃ নায়েক এর দ্বারস্থ হন।এর মধ্যে একদিন গুনগুন ফালাফালা করে নিজের দুহাত চিড়েছে।খুবলে মাংস তোলার চেষ্টা করেছে।তারপর যখন পরিমাণ মতো রক্ত বেরোতে শুরু করেছে তখন চলেছে দেওয়াল লিখন। শুধু হেল্প লাইন নম্বর। অসংখ্য; লোকাল ট্রেন থেকে মেট্রো,বাস,বড় বড় স্টেশন যেখানে যত মেয়েদের সুরক্ষা নম্বর সব।এবং সবকটি সঠিক।
ডঃ নায়েকের ওষুধ খেয়ে গুনগুন কয়েকটা দিন শুধু পড়ে পড়ে ঘুমোলো। স্নান করতে,খেতে সবসময় ওর চোখদুটো বন্ধ। শিল্পীর মা-ই যত্ন করে আজকাল ওর। স্নেহাশীষ বাবু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেন। কেমন অসহায় লাগে তার। আগে যতটা স্বাভাবিক ভাবে এগিয়ে যেতে পারতেন;ওর মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করে দিতে পারতেন;এখন কেমন সংকোচ হয়!অথচ গুনগুন তো তাতুর কোলেই খেলে ঘুমিয়ে বড়ো হলো।গৈরিকী চলে যাওয়ার পর তো আরো বেশি করে! গৈরিকী কে খবর দিতে চেয়েছিলেন স্নেহাশীষ বাবু।ওর বোন জানালো দিদি ইউ এস এ তে থাকে। এখনই এখনই আসা সম্ভব নয়।
আজকাল রাতেও স্নেহাশীষ বাবুর তেমন ঘুম হয় না।একটা উদ্বেগ পিঠের কাছে উঁচু হয়ে থাকে। সেদিন রাত প্রায় তিনটে! হঠাৎই দুম দুম আওয়াজ। তাড়াতাড়ি উঠে এসে দেখেন গুনগুন সর্বশক্তি দিয়ে দেওয়ালে মাথা ঠুকছে।বেশ খানিকটা রক্ত বেরিয়ে এসেছে কপাল ফেটে। স্নেহাশীষ বাবু আটকাতে গেলে গুনগুন প্রবল জোরে ধাক্কা দেয়। স্নেহাশীষ বাবু পড়ে যান।গুনগুনের চোখ মুখ ফেটে গলগল করে রক্ত নামছে।ও অদ্ভুত এক ভয়ার্ত দৃষ্টিতে একবার করে পিছনে দেখছে আর একবার করে দেওয়ালে দ্রুত হাতে নম্বর লিখছে। লিখতে লিখতে পড়ে যাচ্ছে।কোনোরকমে হাঁচোড়-পাঁচোড় করে আবার উঠছে, আবার লিখছে।
স্নেহাশীষ বাবু আর সহ্য করতে পারেন না।মাটিতে বসেই কাঁদতে আরম্ভ করেন।তারপর উঠে ডঃ নায়েক কে ফোন করেন। শেষপর্যন্ত অ্যাসাইলামেই জায়গা হয় গুনগুনের।
স্নেহাশীষ বাবু প্রথমে প্রত্যেক সপ্তাহে আসতেন। গুনগুন কে একটা ঘরে হাতে পায়ে চেন দিয়ে খাটের সাথে বেঁধে রাখা হয়।নয়তো ও ক্রমাগত নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করতে থাকে।নখ কেটে দেওয়া হলে দাঁত দিয়ে কামড়াতে থাকে নিজেকে।তাই এই ব্যবস্থা। চুলের যত্ন নেওয়া সম্ভব হয় না। নাপিত দেখলে গুনগুন ভয় পায়।তাই আয়ারাই যেমন তেমন করে চুলগুলো মুড়িয়ে কেটে দেয়। স্নেহাশীষ বাবু ওর ঘরের দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকেন। ওর নাম ধরে ডাকেন।ও যা যা খেতে ভালোবাসে নিয়ে যান। ডঃ নায়েক এর নির্দেশ মতো ওর ছোটোবেলার পুতুল, তানপুরা সবই একে একে জড়ো হয়। গুনগুন তাকিয়েও দেখে না। এক একদিন স্নেহাশীষ বাবু ওর পাশে চুপ করে বসে থাকেন। গভীর ভাবে খেয়াল করেন ওর ঠোঁট নড়ছে কি না!বলা তো যায় না, হঠাৎ করেই যদি ও স্বাভাবিক হয়ে যায়! আবার আগের মতো তাতু বলে যদি গলা জড়িয়ে ধরে!গান গেয়ে ওঠে! কিন্তু কিছুই হয় না। ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকলেও গুনগুনের দৃষ্টির পরিবর্তন হয় না।ওর চোখের মণি সরে না।ও কিছু দেখে না। মরার মতো তাকিয়ে থাকে। ডঃ নায়েক কে জিজ্ঞাসা করলে বলেন, ধৈর্য্য ধরতে হবে মি:সেন! মনের রোগ তো একটা দু ঘন্টার অপারেশনে সেরে যায় না। সময় লাগে। স্নেহাশীষ বাবু আর কিছু বলেন না। অ্যাসাইলামে যাওয়া কমিয়ে দেন।এই বয়সে এতো মানসিক চাপ তারও আর সহ্য হয় না।
সেদিন প্রায় একমাস বাদে গুনগুনের কাছে গেছেন। নিজের কাছেই নিজে অপরাধী হয়ে আছেন।মেয়েটা পড়ে আছে এখানে।একা একা কত কষ্ট বুকের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিল কে জানে! তাই তো আজ আর নিজের আয়ত্তের মধ্যে নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। গেট পার হয়ে সুড়কি পথটুকুতে কেউ বোধহয় শখ করে গাছ লাগিয়েছে।বেল, জুঁই,টাইমার থোকা থোকা ফুটেছে! মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়েছে!আজ কি গুনগুন কে একটু ভালো দেখব! ডাকলে সাড়া দেবে!
স্নেহাশীষ বাবু লম্বা করিডোর পেরিয়ে ওর ঘরের দরজা খুলেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন। গুনগুন সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় জানলার সঙ্গে বাঁধা, মেঝেতে পড়ে রয়েছে। ওর দুহাত, আঙুল,থাই হাঁটু রক্তে মাখামাখি।খানিকটা শুকিয়ে আঠার মতো চটচটে। কাছাকাছি মেঝেতেও রক্তের ছোপ। স্নেহাশীষ বাবুকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আয়া এগিয়ে আসে।মুখে চোখে তার বিরক্তি। কিছু যেন বলতে চায়। কিন্তু স্নেহাশীষ বাবু জিজ্ঞাসা না করলে বলতে পারছে না। শেষে আর অপেক্ষা না করে হাত নেড়ে বলতে শুরু করে, আপনার পেশেন্টকে কিছুতেই প্যাড পরানো যাচ্ছিল না। জোর করে পড়াতে গেলাম তো দেখুন আমায় খিমচে দিয়েচে। অতো জামাকাপড় নোংরা করলে কে রোজ রোজ কাচবে! আমাদের কি বাপু একটা পেশেন্ট নিয়ে কাজ! ও মাসিক সেরে গেলে আবার জামাকাপড় পড়িয়ে দেব ক্ষণ।
স্নেহাশীষ বাবু ওর দিকে তাকিয়ে কেমন মন্ত্রমুগ্ধের মতো কথাগুলো শোনেন। তারপর আস্তে করে দরজাটা ভেজিয়ে দেন।আজ আর ডাক্তারের খোঁজ করেন না। সুড়কি পথটা পেরোতে পেরোতে কোমরে ঘুনসি পড়া ছোট্ট গুনগুনের টলমলে শরীরটা মনে পড়ে যায়।চোখটা হঠাৎ অন্ধকার হয়ে যায়।
লোক জানাজানি হয়ে হসপিটালে নিয়ে যেতে যেতে সব শেষ। মি: মৈত্রই উদ্যোগী হয়ে পারলৌকিক ক্রিয়া সম্পন্ন করেন। ডঃ নায়েকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। গুনগুন তার তাতুর চলে যাওয়াটা আর জানতে পারে না। জানতে পারে না বিশ্ব সংসারে সে আক্ষরিক অর্থেই এবার একা! এবার সত্যিই তার একমাত্র ভরসা কতকগুলো হেল্প লাইন নম্বর! কারণ ততদিনে সে নিজেই হারিয়ে গেছে কতোগুলো জানাচেনা ভয়ের অজানা আশঙ্কায়!






রিনি গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৮২ সালে ব্যারাকপুরে। পড়াশোনা ব্যারাকপুর গার্লস হাই স্কুল, স্কটিশ চার্চ কলেজ ও পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। গবেষণা করেছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। গবেষণাধর্মী বই- বাংলা সাহিত্য ইতিহাসের ইতিহাস।
প্রথম উপন্যাস - করোনার দিনগুলি ও প্রেম
প্রথম কবিতার বই - প্রতিহিংসা ভরা খাতা
প্রথম ছোটগল্পের বই - চিচিকিচ ও অন্যান্য গল্প
বর্তমানে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে অধ্যাপনা করছেন। বাড়ি টালিগঞ্জ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ